Thursday, June 22, 2017

তিনটি কবিতা : সুপর্ণা মন্ডল

পান্ডুলিপি
ভুল করে ঠিক লেখা হয়ে যায়
আবার ঠিক করতে গিয়ে ভুল।
ঠিকটাকে ভুল আর
ভুলটাকে ঠিক করতে গিয়ে দেখি
পান্ডুলিপি ইতিমধ‍্যে জমা পড়ে গেছে।



উৎসর্গপত্র
যদি কখনও কবিতার বই লিখি
তার নাম দেবো “এসব অনেক আগের লেখা”।
উৎসর্গপত্রে তোর নাম থাকবে না ঠিকই
থাকবে একটা শূন্যর ধুধু পাতা
যে শূন‍্যতা আমাকে দেওয়া তোর একমাত্র উপহার।



প্রাপ্তি
তোমার অপ্রকাশিত কবিতার স্তূপে
প্রেমপত্র খুঁজতে গিয়ে আমি
সুইসাইড নোট পেয়ে গেছি।















সুপর্ণা মন্ডল

Suparna Mondal

Monday, June 19, 2017

অনন্ত এবং আমি, আমি এবং অনন্ত : রঙ্গন রায়

অনন্ত এবং আমি, আমি এবং অনন্ত

একটা নাটকে আমায় 'অনন্ত' নামে একটি চরিত্র দেওয়া হয়েছিল। আমি কিছুতেই চরিত্রে ঢুকতে পারছিলামনা। রিহার্সালে কথা শুনতে হত - 'তোমার দ্বারা কিস্যু হবেনা।' তারপর যেদিন আমি অনন্তের ভিতর ঢুকলাম অনন্ত আমার ভিতর ঢুকে বসলো। আর সে নড়তে চায়না। আমি এবার বের হতে চাইলাম। পারলাম না। পাগলের মত আয়নার সামনে দাপাদাপি করে অনন্তকে টেনে হিঁচড়ে বের করতে করতে রেডিয়ামের মুখোশ পড়ে বেরিয়ে আসলো অনন্ত – ওর চোখ আমার মত, নাক আমার মত, কান আমার মত, সবই আমার মত। আমি আয়নায় তাকালাম – আমার মুখটা ধীরে ধীরে মুখোশ হয়ে যাচ্ছে। অনন্ত বেরিয়ে এলো, আমার মুখটাকে নিয়ে অনন্ত চলে গেলো। তখন থেকেই আমি আমার আসল মুখটা খুঁজে চলেছি… সদর গার্লসের নীলসাদা পোশাকের বালিকাদের দেখি – ওরা আমায় দেখে সভয়ে নাক সিঁটকে সরে যায়। আমি করলার উপত্যকায় দোলনা ব্রীজের নিচে শুয়ে থাকি, সূর্যের দিকে আমার শরীর উন্মুক্ত থাকে…

আমার বড় বড় চুল দাড়িতে আটকে থাকে নাটকের প্রপস্… মুখোশটা খুলতে পারছিনা বলেই আমায় কেউ কোন নাটকের দলে নিচ্ছে না। আমি গ্রীনরুমে ফিরে যেতে চাই, আয়নার পাশে বাল্ব-মেকআপ কিঞ্চিৎ বুক দুরুদুরু… নাহ্, মাথার ভেতর সব গন্ডগোল হয়ে যাচ্ছে। আমার সমস্ত শরীর মানুষের মাংস দিয়ে তৈরী, নীল রঙের লুঙ্গিটা খসে পড়লেই আদিম পোশাক পড়ে দাঁড়িয়ে থাকবো ট্রাফিক সিগন্যালে… আমার ঠোঁট অনেকদিন সিগারেটের ছোঁয়া পায়নি, কিন্তু মুখোশ সিগারেট খাচ্ছে দেখলে অনেকে লজ্জা পেতে পারে - অনেকে ভয় পেতে পারে - অনেকে অস্বস্তি বোধ করতে পারে... সবার চিন্তা আমার মাথায় এসে জট পাকাচ্ছে কেন?

সাবধান!  দেশপ্রিয় পার্ক আসছে। ট্রামলাইন থেকে ছড়িয়ে পড়তে পারে স্বাধীনতা।

স্বাধীনতার ওপারে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রয়েছে অনন্ত। আমাদের আশেপাশে ঘুরে বেরাচ্ছে ওয়ার্ম হোল। অনন্ত ঢুকে পড়ছে আর বেরিয়ে আসছে। মুখোশ মুখ নিয়ে চলে এলাম অডিটোরিয়াম। সমস্ত উইংস জুড়ে অজস্র মানুষ এসে মিলিত হচ্ছে ফোকাসে, শাওয়ার হলো বেবি ফলো এবং স্পটলাইট জুড়ে নাটক এগিয়ে চলেছে। অনন্ত ফিরে আসছে, কন্ট্যাক্টলেন্স থেকে ঠিকরে বের হচ্ছে কাল্পনিক অশ্রু... দর্শকাসন ছুড়ে দিচ্ছে করতালি। পর্দা সরানোর খেলা খেলতে খেলতে সার্কাসের বাঘ ঝাপিয়ে নামলো আর নাটক দেখার অপরাধে আমার হাত পৌঁছে গেল আইনের সাথে করমর্দনে। বলুন ধর্মাবতার, আমি গরু খাইনি শুয়োর খাইনি  নাটক দেখেই বিচার পেয়ে গেলাম! তারপর দেখা গেল অনন্তের মাথার মধ্যে এসে পড়েছে সকালের আকাশে টাঙানো রোদ - মাথার ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে আমার ধড়।

আমি ক্রমশ ঢাকা পড়ে যাচ্ছি। আমি ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছি। আমি ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছি।

ফাঁকা মঞ্চ। অন্ধকার্। দৃশ্যপট নেই। উইংসের আড়ালে প্রম্পটার নেই। গ্রিনরুমে আর্টিষ্ট নেই। অডিটোরিয়ামে দর্শক নেই। একটা সরু আলোর রেখা নেমে আসছে ধীরে ধীরে, সেই আলো জুড়ে ওড়াউড়ি করছে হাজার প্রজাপতি। আমি সমস্ত আলোটা নিতে চেষ্টা করছি। মাথাটা ভারী হয়ে আসছে, যেন এই মাত্র মস্তিষ্ক ফেটে বেরিয়ে আসবে অভিনয়, আর অভিনয় মানেই অনন্ত… সমগ্র থিয়েটারে অনন্ত ছড়িয়ে পড়েছে... সেধিয়ে যাচ্ছে অনন্তে…













রঙ্গন রায়

Rangan Roy

Saturday, June 17, 2017

আমরা একটা সিনেমা বানাবো [তৃতীয় ভাগ] - হিয়া মুখার্জী

আমরা একটা সিনেমা বানাবো
৫।
জংগলের মধ্যে কাঠের কেবিন।
তিনজন মানুষ
খুব নিপুণভাবে
তাদের ছায়া পাল্টাপাল্টি
করে নিচ্ছে।
তিনজন মানুষ
খুব নিঁখুতভাবে
তাদের ডানা পাল্টাপাল্টি
করে নিচ্ছে।
এসবের অনেকটা দূরে
ঘুমের মধ্যে
মেরিঅ্যান
একটা হাইওয়ে দেখতে পাচ্ছে
দেখতে পাচ্ছে হাইওয়ে জুড়ে
উঁচু হয়ে থাকা
বিষন্ন মাছের স্তূপ।
আর আসন্ন বিস্ফোরণ
মাথায় রেখে
দরজার পাল্লায়
ওর মায়ের শীর্ণ আঙুল
নীলভাবে
ক্রমাগত
জ্বলে যাচ্ছে।



৬।
সাবানের বিজ্ঞাপন
তার হা হা চুল খুলে
নায়িকাকে
গিলে ফেললো ক্রমশঃ
আর
জলপাই বনের ভিতর
পতপত করতে থাকলো
নিঃঙ্গ
একটা পতাকা।
গ্যালোবার
আমরা গল্পে
তুমুল নিয়নে
ভালোবাসাবাসির কথা
বলেছিলাম।
অথচ
এবারের শীতে
নতুন করে
বলার মত
আর কিছুই নেই
বুঝে
একটা বিশাল উঁচু
সাদা দেওয়ালের
মুখোমুখি দাঁড়িয়ে
আমরা
প্রকৃত দুঃখবোধে
দপদপ করে উঠলাম।




হিয়া মুখার্জী

Hiya Mukherjee

Friday, June 16, 2017

দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন এবং “ভালো থেকো” [প্রথম পর্ব] - বহ্নিশিখা সরকার

দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন এবং “ভালো থেকো”

সাগর আর ঝিনুকের মধ্যে ভালোবাসা নেই। মন্দবাসাও নেই। সাগরের ঝিনুককে ভুলে যাবার দায় নেই, আর ঝিনুকের সাগরকে মনে রাখবার অধিকার নেই। ওরা কেবল জড়িয়ে আছে। বন্ধন নেই আবার মুক্তিও নেই। সাগর ছেলেটি বড্ড কেজো, আমি জানি না যদিও কিন্তু সে এমনটা দাবি করে। ঝিনুক মেয়েটা পাগল, আমি জানি না, সে এমনটা দাবি করে। সাগর কোনও এক কর্পোরেট জঙ্গলে বন্দী আর ঝিনুকের ঠিকানা নেই কোনও।

সাগর আর ঝিনুকের কবে দেখা হয়েছিল জানি না, এই টেকনোলজির যুগেও হুজুগে ওরা চিঠি লেখে। চিঠিতে কেবল কবিতা লেখে, যেগুলো  আমার হাতে পরেছে এসে কোনও ভাবে। তাই দিয়ে দিলাম...

পুরনো কথা
ঝিনুক,
শেষ শ্রাবণ দিন, বেলা ছিল গোধূলি।
    কণে দেখা আলোর রেশমি হিজাব ছিল, ভাগ্যিস!
     নয়ত ধরা পরে যেতো ভাষায় মোড়া রহস্য।

পাখির ডানার ভাঁজে ভাঁজে যে কথা-গান-গল্প
      আজীবন আবডালে থেকে যায়, তেমন গোপন-
ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতায় হারিয়ে যায় যেসব কথা
      তেমনটাই আধপাগলা,

অন্ধকারের ঠোঙ্গায় মুড়ে খুব চুপি চুপি
    শেষ শ্রাবণের তেলেভাজা গন্ধ পাঠাব তোমায়
চোখ জড়ানো ঢুলুঢুলু সব পুরনো কথা

ধরা দেবেনা কেউ, কিচ্ছুটি টের পাবেনা কখন্‌
         পুরনো কথার দল তোমার স্বপ্নের
             মেঘবালিকা হয়ে উঠেছে।

ইতি, সাগর
১২ই জুলাই, ২০১৫, মুম্বাই




বারণ
 ডাকনাম ধরে ডেকো না সাগর,
          উত্তাল হয় মাটি।
কাঠ পেন্সিল ইজেল আঁচরে
          ছায়ার শিকড় কাটি।

দিগন্ত জুড়ে ‘আমি’ আমি শুধু
       যতটা ফিরিয়ে দিলে-
তার চেয়ে বেশি ছড়িয়ে দিলাম
       তোমার বুকের নীলে।
ইতি, ঝিনুক
১৪ই জুলাই, ২০১৫, কলকাতা





কেমন যেন
ঝিনুক,
তুই অযুত অক্ষ দ্রাঘিমা দূরে
তবু জানি আজ বর্ষার দিন।
তোর শরীর জড়িয়ে উঠেছে আমার দেওয়া নীল শাড়িটা
সরীসৃপের মত

বাড়িতে বুঝি খিচুরি আর ডিম ভাজা?
আচ্ছা অগোছালো দুয়েক গোছা চুল
তোর কালো টিপটার গা বেয়ে গড়িয়ে গেছে আজ?

খোলা পিঠ তোর অপেক্ষা করে আছে কি
আমার হাতের ছোঁয়া পাবার জন্য?
মিষ্টি স্বাদের লিপ বামে ভেজা ঠোঁট কি
অপেক্ষা করে আমার বেইমান ঠোঁট দুটোর?

আমার এখানে অনেক ঝড়, অনেক বৃষ্টি
রোজ ঝড়, রোজ বৃষ্টি।

ইতি, সাগর
১৫ই আগস্ট, ২০১৫, মুম্বাই




রাগ করেছি বলে
একঘেয়ে কাজে আর অকাজে ব্যস্ত থাকার
ভান করে অনেক লোক ঠকিয়ে ফিরবে
যখন বাড়ি,
মন যখন ভীষণ রকম কফির জন্য
আকুল করবে,
বেইমানের মত তখন প্রশ্ন করবে
- "ধরে রাখবি?"
মুখ ঘুরিয়ে অন্ধকারে বলব,
- "যেতে দেবো"

ইতি, ঝিনুক
১৮ই আগস্ট, ২০১৫, কলকাতা




প্রেমিকার ফোন পেলাম
ঝিনুক,
কাল প্রেমিকার সাথে কথা হল অনেকক্ষণ।
যৌন আলাপ, নগ্ন ছবি আদান প্রদান,
আরও কিছু লং ডিস্টেন্স আদিখ্যেতা।
সে ফোনই করে আর-
চিঠি কেবল তুই লিখিস।

জানি, মুখ বুজে থাকবি কিন্তু
আমি হাল ছেড়ে দিচ্ছি ধীরে ধীরে,
যেমন করে লোকে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে।
প্রেমিকা আমায় অনেক কিছু হতে বলে
কিন্তু আমি আর 'আমি' ছাড়া আর কিছুই
হয়ে উঠতে পারি না।

হোঁচট খাব, পরেও যাবো তবু চলা থামাবো না
ওকে যে বড্ড ভালোবাসি।
ও যে রোজ মাঝ রাতে মাথায় সিঁদুর নিয়ে
আমার স্বপ্নে আসে।
কাল রাতে রবীন্দ্রনাথের 'বাঁশীওয়ালা' পড়ছিলাম।
  
সদ্য হামাগুড়ি দিয়ে ভালবাসতে শিখছি,
আমার প্রেমিকা বহুকালের পরিব্রাজিকা।
এক ছুটে চলে যেতে ইচ্ছে করে কিন্তু
আমার যে বড্ড ঘুম পায়,
স্বপ্নে কেবল প্রেমিকাকে দেখতে ইচ্ছে করে-
আবার নতুন কোনও রকম ভাবে।

ইতি, সাগর
২০শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫, মুম্বাই

(ক্রমশঃ)













বহ্নিশিখা সরকার
Banhisekha Sarkar

Tuesday, June 13, 2017

বিদিশা কোত্থাও নেই : সুপ্রিয় সাহা

বিদিশা কোত্থাও নেই
প্রত্যেকটা ধারনাকে ভেঙে দিতে প্রমান লাগে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ। কিছুদিন যাবত পর্ণ সাইট গুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমার জন্মগত ধারনা ভেঙে যাচ্ছে যে, ওরাল সেক্স শুধুমাত্র বহিরবিশ্বেই বহুল প্রচলিত, সেখানকার ছেলেমায়েরাই তাতে স্বাভাবিক!! বেশ কিছু এমএমএস বা লিকড ভিডিও ডাউনলোড করে দিনের পর দিন লক্ষ্য করলাম কত অবলীলায় আমাদের দেশীয় মেয়েরা আঁখের খেতের ঘেরাটোপে, পার্কের নির্জনে কিমবা স্কুল বাথরুমে কখনও স্কুল শাড়ী খুলে কিমবা বোরখার ঘোমটা হটিয়ে মুখে চালান করছে পুরুষঠ পুরুষাঙ্গ। এইসব ঘটনা আমার পূর্ব ধারনাকে ভেঙে দিতে সাহায্য করেছে শুধু, কিন্তু ওরাল সেক্স নিয়ে আমায় কোন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিতে পারেনি। বরং এগুলো আমায় বিচলিত করেছে, বার বার করে মনে পড়িয়ে দিয়েছে বিদিশাকে।
বিদিশাকে নিজের মতো করে পাওয়ার কোন বন্দবস্ত আমি করে রাখতে পারিনি কিমবা সেও করে দিতে চায়নি। তার কোন ফোন নাম্বার নেই আমার কাছে। নেই কোন স্থায়ী ঠিকানা। সে কোন ঈশ্বরও নয় যে আমি তাকে ডাকলেই ঘোমটা হটিয়ে নজরানা দেবে আমায়, বরং এটা স্বীকার করতে কোন অসুবিধে নেই যে তার কোন ছবিও নেই আমার হাতে। কেন নেই কেন নেই এসব ভেবে আপনারা যারা মাতাল হচ্ছেন তাদের এই লেখা পড়ার বয়স হয়নি এখনও-এছাড়া আমার কীই বা বলার থাকতে পারে!
কোন এক শনিবারের বিকেল শেষে শহুরে ধুলো থিতিয়ে চাকার দাগ মিটে যাচ্ছে এমন অন্ধকার। আমি আছি কিমবা নেই হয়তো পৌঁছে যাব এইমাত্র কিমবা যাবনা জানি না। শীত পড়ছে। যেসব শীতে কোলকাতার মানুষ গায়ে রঙ্গিন স্বপ্ন জড়ায় এমন শীতে সেখানে এখন শুধুই দীর্ঘশ্বাস। বাড়ি ফেরার পালা, লাঠির মাথায় উঁচু করে আটকে থাকা সদ্য টিয়ার বাচ্চা, পায়ের আঠা ডানায় জড়াজড়ি, অপেক্ষা আর অপেক্ষার শুরু কবে তার মনিব ভুলে যাবে খাঁচার ছিটকিনি। দূরে ভেঙে যাওয়া অজয়ের পাড়। একটু পরেই একতারা কাঁদবে। লক্ষ্মীসায়রে এখন একাকীত্ব ঘনাবে। ক্রমশ একা হতে হতে তার জল এখন শুধুই স্থির।
এমনই এক সন্ধ্যায় আমি বিদিশাকে কাছে টেনে নিই, হাতে ধরিয়ে দিই ফেলে যাওয়া অক্ষত মাটির ভাঁড়। সোনাঝুরির মেলা ভেঙ্গেছে প্রায় সময় পেরিয়ে গেছে গোটা দুটো দিন। এমন দিনে, এমন মাতাল সন্ধ্যেয় কেউ কোত্থাও নেই, অথচ কী ভীষণ ভাবে আছি আমরা। জ্যান্ত দুটো মানুষ। বিদিশার সাথে আমার দেখা হওয়ার কোন কথা ছিল না আসলে কখনই তো থাকেনা কথা। কিন্তু কিছু কথা না থাকলেও তো মানুষ কথা রেখে দেয় ঠিকই। এখন বন্ধ চায়ের দোকান। নিকানো , আলপনা দেওয়া তার মাটির উনুন। বিদিশা সেই আলপনায় সাঁওতালদের রেখাচিত্র খুঁজতে ব্যস্ত। আমি বলি, এই যে আলপনা, সে তো এই মাটির উনুনের আঁচে পুড়েই মরবে, তবুও কেন দেয় বলতো?
বিদিশা হাসে। তার হাসি এখানকার শীতের মতই বড্ড তীক্ষ্ণ। নিভে যাওয়া উনুনের উপর থেকে স্বপ্নিল কেটলি এনে গরম চা ঢেলে দিই তার হাতে ধরা মাটির কাপে। তারপর বসি তার পায়ের নীচে। একটা তালগাছের গুঁড়ি, বিদিশার কাপড়ের স্পর্শে উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হচ্ছে ক্রমাগত। আমার হিংসে বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাড়িয়ে দিচ্ছে  ছুঁতে চাওয়ার স্বাদ।
এখন নিভন্ত সোনাঝুরির দল, কেউ কুড়িয়ে নিয়ে গেছে তাদের ঝেড়ে ফেলা মায়া। দীর্ঘ পথ বেয়ে এখনি ফিরল যে সাঁওতালি পুরুষ তার ঘরে উঁকি দেওয়ার ইচ্ছে জাগে বিদিশার। তাকে নিরস্ত্র করে আমার অভিমানে বুক বুজে আসে, আমিও তো রোজ রোজ পার করি তীব্র এক রাস্তা! সন্ধ্যের আলো আরও কমে এলে ওর ঠাণ্ডা লাগে। আমি আমার শাল খুলে বিদিশাকে জড়াই না, বরং সেই আরও একটু ঘন হয়ে আসে আমার কাছে। এও কি একপ্রকার বিশ্বাসঘাতকতা! কে জানে! আমরা এগিয়ে যেতে চাই। আমারদের সুনীল কে মনে পড়ে। কোন এক গভীর রাত্রে তিনি নাকি এখানেই গান ধরেছিলেন, আজ জ্যোৎস্না রাতে... কিন্তু এখনও আকাশে চাঁদ ওঠেনি, হতে পারে আজ জ্যোৎস্না নয়। আসলে বিদিশা আমাকে ভুলিয়ে দেয় সব সময়জ্ঞান।
হতে পারে এখন গভীর রাত কিমবা নয়। লক্ষ্মীসায়রের বুকে এখন আমরা দুজন ছাড়া কিছু সোনাঝুরি। এই শীতেও আমরা পাশাপাশি শুয়ে। শরীরের নীচে নরম পাতা দেবে যায় কিছুটা। ভালো লাগে। বিদিশাকে গল্প বলি -
এই যে দেখছ সায়রের ওই দূরের কর্নার, ওখানে একটা পাথরকে এখানে সকলেই খুব জাগ্রত মনে করে। বিদিশার চোখ দুটো ড্যাবডেবে হয়ে ওঠে। শরীরটা আরও একটু টেনে নেয় আমার দিকে। আমি গোটা চাদরটা দিয়ে ঢেকে নিই নিজেদের।
     যারা এখানে নতুন সংসার করে, মানে ধরো নতুন বিয়ে হল, বা বিয়ে না করেও যারা নতুন সংসার পাতছে বা চাইছে, তারা সংসারের যাবতীয় টুকিটাকি যা লাগবে, সেসব যদি এই দেবীর কাছে মানত করে, তবে কিছুদিনের মধ্যেই নাকি সব ব্যবস্থা করে দেয় এই জাগ্রত দেবী।
বিদিশা আমার কথা শোনে। আমি তার মুখ থেকে কিছু শোনার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে থাকি। কিন্তু আমাকে নিরাস করে সে তার মুখটা শুধু বাড়িয়ে দেয় আমার আরও কাছে। আমি ডুবে যাই এই দেবীর আহ্বানে।
কখন যে চাদর সড়ে যায় খেয়াল থাকেনা। খুব দ্রুততায় নেমে আসি নীচে। সমস্ত লক্ষ্মীসায়র যেখানে তার গভীরতা নিয়ে অপেক্ষা করছে আমার জন্য, শুধু আমারই জন্য। লালায় ভরে ওঠে মুখ, তবুও তৃষ্ণা মেটে কই! হটাৎ আমি উঠে পড়ি ওর পেটের উপর। ওর নরম বুক জোড়া থেকে আশ্চর্য এক তরল গড়িয়ে নামছে নাভির দিকে। আমার জাং ভিজে জ্যাবজেবে। আমি মুখ থেকে একে একে চুল গুলো বার করে সমস্ত লেপটে দিই সেই নরম আঠায়। ক্রমশ লোমশ হয়ে ওঠে ওর হৃদপিণ্ড। বলি- তোমার বয়স বাড়ছে বিদিশা। বড্ড চুল উঠে যাচ্ছে।
সে শুধুই হাসে। আমার শীত শীত ভাব আসে। ব্যাখ্যা না থাকার মতো এক অজানা ভয় ঘিরে ধরার আগেই কামড়ে ধরি তার কামার্ত ঠোঁট। আমাদের মুখ ভিজে যাচ্ছে, ভরে উঠছে চুলের মতো সরু লিকলিকে কিছু পোকায়। তবুও আমরা কেউই পরাস্ত হতে চাই না। বরং এই ভালোলাগাটাকে আয়েশ করি নিজেদের মতো।
এখানে কোন পাহাড় নেই। তবুও এক পাহাড়ি অলসতা ঘিরে ধরে? সায়রের জল আমায় ভীষণ ভাবে টানে কি টানে না জানি না, তবুও অতলে নেমে যাবার ইচ্ছে হয়। বাতি নিভে যাচ্ছে পাশের পাড়ায়। সোহাগে সোহাগে ভরে উঠছে মেঠো সব শরীর, এমন চিন্তা শুধুই ক্লান্তি বয়ে নিয়ে আসে। এসব সময়ে আমার গ্রাম্য কুকুর হতে হচ্ছে করে, খড় বিচুলি থেকে শুষে নিচ্ছি শেষ ওম। বিদিশা ঈশারা করে গভীর রাত, ঘরে ফেরার সময় বাড়ন্ত।
এই উলঙ্গ রাত। বিদিশাকে কোলে তোলার ইচ্ছে আমায় জাগায় না। আমরা পাশাপাশি হাঁটি, একে অন্যেতে মিশে গিয়ে হাঁটি। শুধু হাঁটতেই থাকি। দূরে আমাদের হোটেল দেখা যায়। তার মিটমিটে জ্বলতে থাকা আলোর রেখা দেখা যায়। দেখা যায় গেটে হয়তো আমারই জন্য অপেক্ষারত দারোয়ানের আবয়ব। তখনও বিদিশার দীর্ঘশ্বাস আমার কানের লতিতে।















সুপ্রিয় সাহা

Supriya Saha

Sunday, June 11, 2017

ভালু : ডাকনামে সমুদ্র

 ভালু

আমরা সবাই জড়ো হয়েছিলাম একটা সর্ষেক্ষেতে। আসলে আগের বছর এখানে সর্ষেচাষ হয়েছিলো। তারপর একবছর আর কিছুই হয়নি। তাও নামটা থেকেই গেছে। আম্মু আর দিভাইকে পাচ্ছিলাম না। ওদের নাকি জঙ্গলের দিকে নিয়ে গেছে। রশিদ এর প্যান্টের দড়িটে খুলে যাচ্ছে। ওর আম্মুকেও নিয়ে গেছে। রশিদ কাঁদছিলো বোকার মত। আব্বু তো বল্লো, একটু বাদেই আম্মু আর দিভাই চলে আসবে। রশিদের আম্মুও। আজ সাত নম্বর রোজা। আব্বুর রোজা ভেঙে গেছে। একবার খারাপ কথা বলেছে আব্বু। বাড়িতে খারাপ কথা বলে না আব্বু। রশিদের এর বাবার মত মাকে মারেও না। রশিদ একবার রাতে ওর আব্বু আম্মু কে কিসব করতে দেখেছিলো। আমার আব্বু আম্মু কেন ওসব করে না? আমি কেন দেখতে পাই না? আম্মুরা এখনো ফিরছে না জঙ্গল থেকে। ওদিক থেকে পচা পচা গন্ধ আসছে। কুকুর পচলে যেমন গন্ধ আসে। আম্মুরা জঙ্গলে কি করছে? ইসস। ওদের সাথে গেলে ভালো হতো। রশিদ আর আমি একবার লুকিয়ে জঙ্গলে গেছিলাম। তারপর আর যাওয়া হয়নি। ওই জঙ্গলে এখন কিরকম সব লোক থাকে। আব্বু বলে, ওরা জওয়ান। ওদের বন্দুক থাকে। রশিদ একবার ওদের কাছে বন্দুক চেয়েছিলো। একটা লোক বলেছিলো, আগে তোর আম্মি কে নিয়ে আয়। রশিদের আম্মি সেদিন রশিদকে খুব মেরেছিলো। কি হতো একবার গিয়ে বললে? বেশ মজা হতো।

আম্মুরা ফিরে এসেছে। সবাই খুব কাঁদছে। ইসস আম্মির গলায় কেমন কালশিটে। আম্মু কাঁদছে। রশিদের মা পেট চেপে মাটিতে শুয়ে। সবাই এসেছে, দিভাই খালি আসে নি। আব্বু ওই লোকগুলোর কাছে গিয়ে কিসব বলছে। ওরা হাসছে। দিভাই কি জঙ্গলে হারিয়ে গেছে? ভালু আছে নাকি ওই জঙ্গলে। দিভাই কে কি ভালু...

দিভাই এর সাথে সাহিন ভাইয়ের শাদি হওয়ার কথা ছিল। দিভাই ছাড়া গ্রামের সবাই ফিরে এসেছে। জঙ্গলের দিক থেকে খুব পচা পচা গন্ধ আসছে। অনেকগুলো কুকুর একসাথে মরে গেলে যেমন গন্ধ আসে আর কি... দিভাই এর একটা ভালু আছে। সাহিন ভাই দিয়েছিলো। লাল রঙের। সেটা জড়িয়ে আজ ঘুমালে নিশ্চয় দিভাই মারবে না।
















ডাকনামে সমুদ্র
Ocean in the name

Thursday, June 8, 2017

পানশালার মনোলগ : অর্ক চট্টোপাধ্যায়

পানশালার মনোলগ

দুপুরের পানশালা। চড়া রোদ বাইরে। মদের থেকেও বেশি রোদের জন্য ভেতরে ঢুকলো হিমাংশু। উইকএন্ডের দুপুর।পানশালায় ভাঁটা। ফাউন্টেন থেকে একটা বিয়ার নিয়ে কোণের ফাঁকা সিঙ্গল টেবিলে গিয়ে বসলো। নীথর শহরতলীর দুপুরে ভেতর-বাইরে এক হয়ে রয়েছে। একদিকের দেওয়াল-টিভিতে ক্রিকেট—অ্যাশেজ সিরিজ, আর অন্যদিকে হর্স রেস ঘিরে কয়েকজন বৃদ্ধের জটলা। অদূরের টেবিলে দুটি মেয়ে কথা বলতে বলতে বিয়ারে চুমুক দিচ্ছে। হিমাংশুর দিকে পিঠ করে যে মেয়েটি বসে আছে তার মুখ দেখতে না পেলেও বাঁ পায়ের হাঁটু অব্দি উঠে আসা কালো চকচকে লং-বুট হাতের সাথে তাল ঠুকে ওঠানামা করছে, কখনো হাঁটুর ঠিক নিচে, কখনো আবার গোড়ালির কাছাকাছি ভাঁজ হয়ে যাচ্ছে। হিমাংশু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে, কিম্বা দেখতে। মেয়েটির সব কথা তার লং-বুটের সরব ভাঁজগুলোর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। কথাগুলো বুজে আসছে ভাঁজ-শব্দে। হিমাংশু বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে টেবিলে রাখা সিডনী মর্নিং হেরাল্ডে চোখ দিলো। সংবাদ-শব্দ সরব হয়ে উঠতে লাগলো। মগজে তার দৃশ্যের মৌচাক।
গোটা কাগজ জুড়ে ইউরোপের রিফিউজি ক্রাইসিস নিয়ে রিপোর্ট। সিরিয়া এবং মধ্য প্রাচ্যের নানা দেশ থেকে কাতারে কাতারে লোক জার্মানীতে ঢুকছে। তাদের হাসি-কান্নায় ভাঙা মুখ, কোলে বাচ্চা, খুলে রাখা জুমড চটি জোড়ার ছবি। টার্কির ৩ বছরের আয়্লানের বালিতে গুঁজে থাকা নীথর মুখ। এই ছবিটা শেষ দু-তিনদিন ধরে অনবরত সোশাল মিডিয়ায় ট্রল করছে, দেখেছে হিমাংশু। না, সে শেয়ার করেনি, কোথাও বেঁধেছে, কোথায়, কি, তা ঠিক করে বলা মুশকিল। ফেসবুক টুইটারের এই অবাধ মৃত্যু-মৃত্যু খেলায় এবং জ্ঞান আর নৈতিকতার লড়াইয়ে সচরাচর ঢুকতে ইচ্ছে করে না ওর। পছন্দগুলো ‘লাইক’ হয়ে গেছে, সারাদিন আকাশ থেকে খসে খসে পড়ছে। টার্কির ৩ বছরের শিশু মৃত্যুর বোট থেকে ফটোগ্রাফের আগ্রাসী দৃষ্টির বোটে উঠে সোশাল মিডিয়ার দেওয়ালে দেওয়ালে অনুকম্পা আর বাণীবাণ হয়ে উঠেছে। আয়্লান কি ভাবছে এই সব ট্রলিং নিয়ে? সমুদ্রে কি ট্রলার চলছে এখনো? তার বাবা কি এখনো মরে যাবার কথা বলছেন ইন্টারভিউয়ে? হিমাংশু পাতা উল্টে এগিয়ে চলে। শেষ ক'দিন ধরে অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া তোলপাড় রিফিউজি ইনটেক নিয়ে। 
বর্তমান সরকার লিবারালদের। বছরখানেক ধরেই টনি অ্যাবটের তথাকথিত 'বোট পলিসি' নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে।

Tuesday, June 6, 2017

রোহিণীর সাথে, এই ত্রিশ বত্রিশ বছরে... : দীপ শেখর

রোহিণীর সাথে, এই ত্রিশ বত্রিশ বছরে... 





কাল রাতে লম্পট বৃষ্টিটা পড়লে বুঝলাম
প্রেমের দালালটা আবার ধরবে ধরবে করছে, টাকা চাইবে
চাঁদের জ্বর প্রায় একশো এক, জ্যোৎস্নার ঘরে বাবু নেই
আমি কাল রাতের ঐ নীল শাড়ি পড়া মেয়েটির কাছে আশ্রয় চাইবো, ডাকবো রোহিণী, বেঁচে যাবো।


ভালোবাসা নয়, ভালোবাসার আত্মারাই সবথেকে সহজে ভালোবাসে
এসব বুঝে আমি প্রেমিকের আত্মাটা নিয়ে খানিক নাড়াচাড়া করেছি কাল দুপুরে
আমার পুরনো জীবনকে এখন ট্রাঙ্ক থেকে বার করে নিয়ে আসতে হবে
হৃদয়কে বৃষ্টি ভেজানোর কোনও উপায় জানা আছে কি এ দেশের আইন-ব্যবস্থার?

Saturday, June 3, 2017

মিলিয়ন ডলার নাইটমেয়ার : অদ্বয় চৌধুরী

মিলিয়ন ডলার নাইটমেয়ার

—     চোখ মেলতেই ঝলসানো আলো। চোখ ধাঁধানো। সামনে একটা ভেজানো দরজা। সামান্য এক চিলতে ফাঁক আছে। সেই ফাঁক গলে বেরিয়ে আসছে ওই ঝলসানো আলো। উজ্জ্বল হলুদ। মাঝেমাঝে গেরুয়া ছোপ। দরজার ওপারে একটা বড় ঘর। তার চারিদিকে গনগনে আগুন। তবে তা স্পর্শ করে না আমায়। কিন্তু গরম আঁচ ছুঁয়ে যায়। ঘাম ঝরে। জ্বালা করে— শরীর, চোখ। চোখ দিয়ে জল ঝরে। উপরে, ঘরের ছাদ থেকে, ঝুলছে অসংখ্য মৃতদেহ। মানুষের। মাথা নীচের দিকে, পা উপরে। গোটা শরীরটাই দলা পাকিয়ে ছোট হয়ে গেছে আগুনে পুড়ে। বডিগুলো সবকটাই আগুনে ঝলসানো। বিভৎস চেহারা। কালচে লাল রং। সাদা রঙের এক ডাইনিং টেবিল, নীচে, ঘরের ঠিক মাঝখানে। ঘরের সেই আগুনে-আলো উধাও হয়ে যায়, হঠাৎ। বদলে, সাদা ঝকঝকে আলো ভরিয়ে দেয় ঘর। ভাসিয়ে দেয়। ঘরের উত্তাপও উধাও। বরফ-ঠাণ্ডা স্রোত নেমে যায় শিরদাঁড়া বেয়ে। আমি বসে আছি সেই টেবিলটার এক মাথায়। আমার সামনে একপ্লেট ঝলসানো মাংস। তন্দুরি। আমি ওই কালচে লাল মাংসপিণ্ড খেতে লাগি, ধিরে ধিরে। সেই লম্বা টেবিলের উলটো প্রান্তে একটি অবয়ব ফুটে ওঠে হঠাৎ। আবছা। তারপর ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক যুবক। স্যুট-টাই পড়া। চোখে চশমা। নিখুঁতভাবে দাড়ি কামানো। স্মার্ট চেহারা। ছেলেটি মাথা নাড়ে আস্তে আস্তে। মনে হয় আমার এই তন্দুরি খাওয়া, তার স্বাদ উপভোগ করা— সবই ও দেখেছে। ঠিক বোঝা যায় না। তখনই সে কথা বলে ওঠে।
—     সো, মিস্টার সিংহানিয়া, এই পার্টিকুলার নাইটমেয়ারটি রেকার করে আপনার ঘুমের মধ্যে? বারবার? প্রতি উইকে তিনবার থেকে ছ’ বার?

সিংহানিয়া বয়স্ক মানুষ। ষাট পেরিয়েছে। ভারী চেহারা। হাত-পা ছেড়ে, চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছে। বরফখণ্ডের মতো ফ্যাকাসে, শুষ্ক, কঠিন মুখচোখ। খানিক ক্লান্তির ছাপ আছে তাতে। টেবিলে রাখা ড্রিঙ্কস-এর গ্লাসের গায়ে ঘরের চিলড্ টেম্পারেচারের ছোঁয়া লেগে রয়েছে। সাদা ভাপ ধরেছে। সামনে বসে থাকা ধোপদুরস্ত ছেলেটা তার থেকে অনেক ছোটো। সিংহানিয়া ভালো করে মাপতে থাকে ছেলেটাকে। তার ছোটো ছোটো কুতকুতে চোখে। এবং তার কথার উত্তর দিতে থাকে। বরফের মতোই ঠাণ্ডা গলায়।
—     ইয়েস, দিস ইজ ইট।
ছেলেটি তার দু হাতের থাবার মধ্যে একটা মোটা ফোল্ডার ধরে রেখেছে। টেবিলের উপরে। সেই ফোল্ডারটা খোলে। ভালো করে দেখে খানিকক্ষণ; উলটে পালটে। ফোল্ডারটা খোলাই থাকে।
—     ডক্টর মুখার্জী রিপোর্ট পাঠিয়েছেন আমাদের অফিসে। আপনি লাস্ট থার্টি থ্রি ইয়ার মোর অর লেস এই স্বপ্নটি— আই মিন, এই দুঃস্বপ্নটি দেখছেন। ফার্স্ট টাইম দেখেন ইন দ্য ইয়ার এইটি ফোর। তারপর আবার বছর দুয়েক বাদে। নাইনটি এইট থেকে আরও একটু ফ্রিক্যোয়েন্ট। বছরে একবার-দুবার। লাস্ট সেভেন অ্যান্ড হাফ ইয়ার রেকারিং পিরিয়ডটা অ্যালার্মিংলি রাইজ করেছে।
চোখদুটো আরও কুঁচকে ছোটো হয়ে যায় সিংহানিয়ার। একটু নড়ে বসে সে। সবকিছু মনে করার চেষ্টা করে বোধহয়। খানিক পরে ঘাড় নেড়ে সায় দেয়।
—     ইয়েস, টু থাউজ্যান্ড নাইন থেকে আই অ্যাম আন্ডার মেডিকেশন। আন্ডার ডক্টর মুখার্জী। তাতে কিছুটা ফল পেয়েছি। সাময়িক। কিন্তু, কিয়োরড হইনি। আসলে, আমার বিজনেস আর এই নাইটমেয়ারটি এক সঙ্গেই বেড়ে উঠেছে।

Wednesday, May 31, 2017

Kashmir: Rebel with a Cause - Arjun Bandyopadhyay

Kashmir: Rebel with a Cause
Why and how are people making the choice to join the movement? 

The self-representations of Kashmiri people who are creating their destinies; they freely (?) make the choice to militarize their bodies and transform their identities. Kashmiri fighters are the most visible agents of social change in redefining the self-identity. Given the everyday violence of war in Kashmir, Kashmiri people are making radical choices in the struggle for survival. People living in these extreme conditions realize that survival in war is not fully congruent with the notions of survival in peace. In the context of peace, it is difficult to understand that to survive and live with dignity amidst the crisis of war may require one’s participation in the very same violence that destroyed one’s sense of dignity and integrity. Violence is a means of survival as well as a means of communicating resistance and the integrity of a struggle for self determination to the Indian army. The cultural and physical landscape of war provides amongst the most felicitous spaces for the rise of resistance and struggle. The Kashmiri struggle is embedded in such a landscape of war. It is important to acknowledge people’s participation in Kashmir, rather than dismissing the people as shaped by false consciousness while they attempt to forward a movement within a nationalist struggle. In examining the expressions of violence in the contests between the military powers of the state and resistant Kashmiri nationalist movement, Kashmir is urging us to look into the processes — ‘a distinctive set of beliefs and structures’. When the own political expressions of the people have been suppressed, all the peaceful means of protest have been attacked. What other way is there to change things? The only way left is to pick up the stones and fight for a better life.  People are making the choice to transform their identities, militarize their bodies, and participate in the front lines of battle. Their choices are not easy. When they join the movement, they must discipline their minds and their bodies in preparation for war. They are resolved to the understanding that their intimate relationships with their families are forever transformed; that they will not have access to them, that the likelihood of death is more real than that of survival in war, and that their experiences are forever radically transformed in their own eyes and in the eyes of their community. To this extent, there is little evidence of a duped mind or a false consciousness in the choices that they make to join the struggle. This kind of death, this kind of violence is not in vain because new generations are emerging to continue the struggle. It is not a senseless death, but rather one endowed with purpose, with vision, with integrity, and with the determination that freedom in the territories of the Kashmir will be realized. My intent here is not to romanticize the violence or valorise people’s sacrifice. Rather, I am suggesting that we need to understand the self-representations of people in the Kashmir, how they choose to become active in the violence of war, and how they choose to participate in a movement that is committed to the violence of armed struggle. The material reality of everyday violence is one that hundreds of Kashmiri face each day in Kashmir. The Indian army’s searches and ‘clearing’ operations to weed out the insurgent presence of the Kashmiri struggler continue to result in the disappearances and deaths of Kashmiri women and men. In this context, people are making the choice to transform themselves and their identities from the norms of traditional civil society to the norms of violence and war. Popular assumptions about the brainwashing and conscription of people to act as fodder for the movement, not only reveal a bias that is partially shaped by stereotypes, but also reveal a gap in understanding the choices that Kashmiri people are making.

















Arjun Bandyopadhyay 

নারী বিদ্বেষ আর তার ভাষা : পুরন্দর ভাট

নারী বিদ্বেষ আর তার ভাষা

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় নারী বিদ্বেষ নিয়ে একটি ফেসবুক বিতর্কে অংশ নিই এবং সেই বিতর্কে যা যা কথা আর বলা হয়ে ওঠেনি সেগুলো এক জায়গায় করে বলে রাখতে পারলে ভালো হয় - এই মনে করে এই লেখার অবতারণা।
প্রথমেই বলি যে আমি নারীবাদী নই কারণ নারীবাদের পক্ষে বা বিপক্ষে মতামত রাখার মতো যথেষ্ট লেখাপড়া আমার নেই। অনেকেরই ভুলভাল ধারণা আছে যে মহিলা এবং পুরুষকে সমান অধিকারের দাবিদার মনে করা মানেই তা নারীবাদ। এটা একেবারেই নয়, সেরকম হলে তাকে মানবতাবাদ বললেই হয় কারণ মানবতাবাদ সকল মানুষকে সমান অধিকার দেওয়ার কথা বলে, লিঙ্গ নির্বিশেষে। নারীবাদ সমাজে মহিলাদের সমান অধিকার দেওয়ার কথাই বলে তবে তাদের মতবাদ অনুযায়ী সমস্ত অধিকারের লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে নারী অধিকারের প্রশ্ন থাকা উচিত কারণ নারীর বঞ্চনা মানবসভ্যতার সবচেয়ে আদিম বঞ্চনা। হরেক রকমের নারীবাদ আছে, এমন কি রক্ষণশীল নারীবাদ, ক্রিশ্চান নারীবাদ, ইসলামী নারীবাদ প্রভৃতিও আছে। এসবের কোনটা ঢপ আর কোনটা ঠিকঠাক তাই নিয়ে যথেষ্ট পড়াশুনো না থাকার দরুন কোনো কথা বলা সমীচীন হবে না। তবে সুবিধের বিষয় হলো যে নারী বিদ্বেষ নিয়ে মতামত রাখতে গেলে নারীবাদী হওয়া বা নারীবাদ নিয়ে পড়াশুনো থাকার খুব একটা প্রয়োজন নেই, তা ছাড়াই বক্তব্য রাখা যায়।

Sunday, May 28, 2017

ফাঁকা বরাবর : জ্যোতির্ময় বিশ্বাস

ফাঁকা বরাবর


ক.

আমার আজকাল কিছুই অভ্যাস হচ্ছে না
শেষ হয়েছিলে তুমি

তুমি, শেষ হয়েছিলে।




খ.

যে ফাঁকায় গড়ে উঠলো ঘরবাড়ি
দেহ, পিরীতি, তুমি, তোমরা ইত্যাদি
আমি
সে তীর্থ কি ফেরৎ পাবো!

পাবোনা তো। জানি।



Tuesday, May 23, 2017

তিনটি কবিতা : শানু চৌধুরী

ভাগাড়
হেঁটে যাই পথের বুকে
ভাগাড় দেখে ফেলি চোখের পর্দায়

ময়লা স্তুপে ধ্যানস্থ শিশু
সদ্যোজাত খেলনার ভাঙা টুকরো

অস্বাস্থ্য ব্যাঞ্জো বাজবার পথে
রোজ অজানা উচ্ছিষ্টের  লড়াই

সব্জি কাটা হয় ন্যুব্জ হওয়া ঘরে
উনুনের পাশে জ্বলন্ত পেট

শকুন নেই এই শহরে
ছিনিয়ে নেওয়ার প্রতিদ্বন্দ্বী নালার ভ্রুনে

বুলডোজার লক্ষ ইতিহাস ফেলে
ইতরের দিকে ঝড়ের ইঙ্গিত রেখে যায়



ঘষা কাঁচ
এই ঘষা কাঁচের বর্ডারে
আমাদের বাষ্পের ক্লাস

ধ্রুপদী শব্দের ভিতর হারিয়ে যাই
যখন ছোটদের সিনেমা ভিজে যায়

রাস্তা, স্যাঁতসেঁতে রংরুট
সমস্ত স্বপ্নবাড়ির চুপিসার

আদর করছে শরীর বৃষ্টিকে?

কফিকাপ কতটা দূরে পড়ে আছে
কান্না ভাগাভাগির পর

জানালার  পর্দা ওড়ার নেশায়
যেটুকু নশিন