Saturday, August 5, 2017

কাগজের নৌকা : The Story behind an Independent Film (Part 2)

~কাগজের নৌকা~
The Story behind an Independent Film.

…তারপর কেটে গেছে বছর দেড়েক। এর মধ্যে কাজের সূত্রে প্রায় রোজ দিনই কাটত নতুন মানুষ এবং জায়গার অন্বেষণে। ওই এক এক করে অডিশন নিয়ে বা ছবি দেখে যে নন্দিনী পাওয়া যাবে না তত দিনে বুঝে গেছি। “মে ফারস পে সাজদা কারাতা…” – ওরকম এমনি এমনি হয় না। নতুন একটাও ফিল্ম শুট করিনি, তবে পুরনো ভাবনা চিন্তাগুলো মাথাচারা দিয়ে উঠছিল মাঝে মধ্যেই। এর মধ্যেই একাদশ শ্রেণী তে আলাপ এক বান্ধবীর সঙ্গে দেখা- রাজশ্রী। প্রথম দিন দেখেই, হুট করে একটা উরদু শব্দ মাথায় এসেছিল- আকিদাত। ওই নিয়ে একটা সিনেমা করার কথা ছিল, তাই ব্যাপারটা থেকে যায় আমার মধ্যে। প্রেমে পড়লাম কি? না সে প্রসঙ্গ এখানে থাক, তা অন্য যায়গায় লেখা হছে, আগামী কোন ছবি তে নিশ্চয়ই দেখা যাবে, এই লেখাটায় ওটা ঢুকিয়ে, কেন নির্দেশক পেস্ট্রির প্যাকেট হাতে , অভিনেত্রীর অফিসের সামনে দাড়িয়ে থাকে, সে কথা থাক। তবে ওই আকিদাতের রেফেরেন্সটা প্রয়োজনীয়। বার বার আলাপের ফলে, ওকে দেখে, ওই ভাবটা যে যেকোনো প্রেমিকের মধ্যে আসবে, সে বিষয় সন্দেহ কাটছিল। শুধু আমি ভাবলেই তো হল না, সবার মানশপটে তা না এলে, সিনেমার প্রয়োজনীয়তা থাকে না। ওর সব ছবি দেখে খানিকটা সংশয় হল, একটা ছবিতেও ওরকম লাগছে না, অথচ আমি যখনি ওর সাইড ফেসটা ৭০ ডিগ্রিতে দেখি, ওকে নন্দিনীই লাগে। সুতরাং আনুরোধ, এবং মুখের ওপর না। দু বছরের অপেক্ষার বাদে পেয়েছি, রণে ভঙ্গ দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। আমার করুণ মুখ এবং পাগলামির ব্যাপ্তি দেখেই বোধহয় অবশেষে রাজি হলেন। অগত্যা শুট সুরু, কিন্তু বেশ ধীর গতিতে।
আগের লেখাতেই লিখেছিলাম, সেই আগেকার মত নিঃস্বার্থ বন্ধুর আশা এখন আর করি না শুটের সময়। তবে পৃথিবী বড়ই অদ্ভুত, মাত্র দু তিন ঘন্টার আলাপে, রাজশ্রীর দুই বন্ধু মুমুল এবং সঞ্জয় দা, তাদের বাড়িতে নন্দিনীর অন্তঃদৃশ্য শুট করার অনুমতি দিল। এই অন্তপুরটা না পেলে নন্দিনীর চিত্রগ্রহণের ছন্দই বাঁধা পড়ত না। ক্যামারার মোশনের সঙ্গে রাজশ্রী থেকে বিছুরিত নন্দিনীর আলো আঁধারের মোশনের ছন্দ না মিললে, সম্বভই নয়। বহু নিঃস্বার্থ নাম এই সিনেমাটার সঙ্গে আস্তে আস্তে জুড়ে গেছে- অর্ণব, সায়ন, রোহিত, মুমুল, সঞ্জয় দা এবং স্নেহা। তথাকথিত প্রফিট বা লাভ্যংস ছাড়া যে মানুষ এখন পাগলামো সহ্য করে, আর সেই সহনশীলতার ফলে তৈরি হয় অজস্র কাগজের নৌকো- সত্যি মানুষে বিশ্বাস হারানো পাপ।


বেনারস পর্ব
নন্দিনীকে আমি প্রথম থেকেই তথাগতর থেকে দূরে ঠেলেতে চাইছিলাম, যাতে সংশয়টা দৃঢ় হয়, বেনারস নামটা তাই মাথার মধ্যে মাঝে মধ্যেই ঘুরত। হুট করে, এক ভোরবেলায় রাজশ্রী নিজেই যখন শহরটার নাম নিল, ঠিক দু সেকন্ড-এ ঠিক করি বেনারসে শুট করব। নো বাজেট ইন্ডি ফিল্ম, কম মাইনের চাকরি নিয়ে দুটো শহরে শুট করা দুঃসাহসই বটে, কিন্তু রাজশ্রী পাশে থাকায় সে দুঃসাহস নিতে দু’বার ভাবতে হয়নি। তোর জোর করে বেনারসের টিকিট কাটা, থাকার যায়গা বন্দবস্ত ইত্যাদি করে, স্লিপার কোচে চলল আমাদের শুটিং টিম- আমি, রাজশ্রী আর স্নেহা।
অমন মৃত্যু উপতক্যায় পৌঁছেই আমি খানিকটা থমকে গেছিলাম। শুট তো হবে, কিন্তু বেনারসের নিজের যা গুণ, সেসব সব গুণ আমার সিনেমার মধ্যে এসে পড়লেই বিপদ। ওত ক্ষমতা নেই যে ওই আদি অকৃত্তিম শহরের আত্মা কে ফিল্ম বন্দি করে নিয়ে ফিরব। তাও, নদীর এপার, অপার, নৌকোয় সব নিয়ে শুরু হল শুটিং। এমনিতে আমি পাব্লিক স্পেসে শুট করে অভ্যস্ত, তাই অই ভিড়ে এমনিতেই সাবলীল। অবাক করার মত সাবলীলতা আমার সঙ্গী দুজনের। এক জন নির্দ্বিধায়ে একটার পর একটা শট দিয়ে চলেছে, আরেক জন, বৃষ্টি পড়লে ক্যামেরায় ওপর ছাতা ধরা থেকে শুরু করে কাগজের নৌকো পর্যন্ত বানানো -সবেতেই আছেন। নতুন লোকেশানে, এত কম সময় এতটা শুট করে ফেলা সম্ভব হয়েছিল , ওদের জন্যেই। আমাকে ক্যামেরা ছাড়া অন্য কোনোদিকে মন দিতে হয়নি। দ্রুত গতিতে মাত্র চারটে শিডিউলে শেষ চিত্রগ্রহণ পর্ব।
পুরো দু বছর শুটিং জুড়ে অজস্র মুহূর্ত এসেছে যা নিয়ে লিখলে, অবশ্যই “ শুটিঙের গল্প” তৈরি হয়ে যাবে। কিন্তু সে সব লিখলাম না, কারণ এই ফিল্ম করে ঐগুলোই প্রাপ্তি। প্রিয় বন্ধুর সঙ্গে শুরু করে, শেষ করতে করতে আরেকজন প্রিয় বন্ধু খুঁজে পাওয়ার অদ্ভুত এই সমাপতন টাই বিশেষ হয় থাকবে। তবে শেষ করার আগে, কিছু জরুরী কথা বলে রাখা দরকার। ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্ম বানাতে যেরকম প্রচুর উৎসাহ, আত্মবিশ্বাস এবং স্বপ্নের প্রয়োজন, তেমনি প্রয়োজন যুক্তিবাদী রাজনীতি, প্রাকটিস এবং স্কিলের। এই স্কিল প্রপনেন্টটা যত দিন না শান দেওয়া হচ্ছে, সে যতই পাসের মুমূর্ষু মানুষকে বাঁচিয়ে রাখার ইচ্ছা বা স্বপ্নে থাক, শল্য চিকিৎসা না জানলে, মৃত্যু অবধারিত। আর এই পতন ব্যাক্তিগত নয়, তা প্রভাব পারিপার্শ্বিক-এ পড়তে বাধ্য। মিডিয়ামটার রাজনীতি এবং প্রযুক্তি যদি পরিস্কার না হয়, তাহলে যাদের জন্যে করা, অর্থাৎ মানুষ, তারাও এটাকে হাস্যস্পদ ভাববে। মানুষ সাড়া না দিলে, বুঝতে হবে, গন্ডগলটা আমাদেরই। আর এই স্বেচ্ছা মৃত্যুর ফাঁদে, আমারই আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাব।
বেঁচে থাকার কথাতেই লেখা শেষ করি, তথাগত আর নন্দিনীর কাগজের নৌকোর চিঠি একে ওপরের কাছে পৌঁছেছে কি না, তা নিয়ে সত্যি সংশয় হতে পারে, তবে আমার বিশ্বাস, সব চিঠিই এক দিন না একদিন ঠিক পৌঁছোয়, শেষ অবধি, তাই তার প্রত্যুত্তরের আশায় মানুষ বাঁচে, ভালোবাসা বাঁচে। আরও একটা ছবি তৈরি হয়...

(ক্রমশ)















অনির্বান সরকার

Anirban Sarkar

Sunday, July 30, 2017

কাগজের নৌকা : The Story behind an Independent Film.

~কাগজের নৌকা~
The Story behind an Independent Film.

কাগজের নৌকো-র ভাবনা আসে একদিন রকের আড্ডা থেকে, আমি তখন সদ্য দিল্লীর চাকরি ছেড়ে কলকাতায়, আর শুভ্র এমবিএ পাশ করে, ব্যাঙ্গালোর থেকে ফিরে জয়েনিং ডেটের অপেক্ষায়। দুজনেরি হাত খালি, তাই পুরোনো রকের আড্ডা বেশ জমে উঠেছিল।
আমি যে সিনেমা করব, বা এটাই করতে চাই, তারও পাঁচবছর আগে, সেটা আমার আর ওর প্রায় একি সঙ্গে মাথায় ঢোকে।কয়েকটা বিদেশি ভালো শর্ট ফিল্ম দেখে, এবং দেশিয় কিছু জঘন্য কাজ দেখে। প্রথম ছবির গল্প অপেক্ষা নিয়ে, শুভ্রর ভাবনা, গল্পটা আমাকে, বলার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই স্ক্রিপ্টটা লিখে ফেলি। কয়েকদিন ধরে, কিভাবে কি দেখানো হবে, এই নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে, আমার আর শুভায়নের মধ্যে, প্রায় গনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আমাকে নির্দেশক মনোনীত করা হয়। এদিক ওদিক ফিল্মের বই জোগার করে পড়া, টেকনিক গুলো শেখা, দু রাতে এডিটিং সফটওয়্যার শিখে নেওয়া ওই সময়টাতেই। নায়িকা যোগার করে, দু মাসে পড়াশোনা ইত্যাদি ভুলে শুটিং হল প্রথম ছবির, “তুমি আসবে বলে”। তা সে ছবি আর এল না, ভিডিও কাটের সময় খুব ভরসা ছিল পরে ডাব করে নেওয়া যাবে, কিন্তু সেইটা আর হয়ে উঠল না। পাতি এক্সপিরিয়ন্স এবং স্কিলের অভাবে ছবিটা শেষ হল না। তার পরে ও উৎসাহের কমতি নেই, পরের স্ক্রিপ্ট রেডি করল শুভ্র। এবার যদিও প্রথম ভাবনাটা আমার মাথায় আসে, এক সুন্দরী মহিলার সঙ্গে তার কিছু দিন আগেই, শুভ্র সাকুল্যে কুড়ি ফিট মতন হেঁটেছিল, আর বাকি পুরোটাই খাপছাড়া আলাপ চারিতা। সেই ভাবনা নিয়েই “টোয়েন্টি ফিট অফ টুগেদার নেস”, ও গল্প লিখল, স্ক্রিন প্লে তৈরি হল। আগেরবার আমি বিস্তর ছড়িয়েছি, এবার ওই নির্দেশক।


এর মধ্যে বলে রাখা ভালো, প্রথম বার আমি সিনেমাটোগ্রাফি করিনি, ভয়, পারবনা বলে। কিন্তু সিনেমাটোগ্রাফার নায়িকার মাথা কেটে দেওয়ার কারণে (অদ্ভুত ভাবে সেই ব্যাক্তি রাজশ্রীর একটি ছবি সেই সময় তুলেছিল, সেই ছবিটাতেও মাথাকাটা), শেষ কয়েকটা দৃশ্য আমি আর দিপু ডুয়াল ক্যামেরায় তুলেছিলাম। এবার তাই আমিই করব সিনেমাটোগ্রাফি। বিনা পয়সায় সিনেমা বানানো, কিন্তু আয়োজনের কমতি নেই। বৃষ্টির দরকারে রেনমেসিন বানানো হয়েছে, অরিজিৎ, অর্ঘ্য, শুভায়ন, শোভন, ত্রিজিত এবং দীপু প্রায় সবকিছু জোগাড় করে দিত। বাল্ব দিয়ে থ্রিপয়েন্ট লাইট সেট-আপ, ঘর পরিস্কার, সেট সাজানো, থারমোকল ধরা, লাইট ধরা, সব! আজ এদের কারুর সঙ্গেই সিনেমার সম্পর্ক নেই, তবে আজ কাল যাদের কাজ করতে দেখি, এই উৎসাহ এবং ডেডিকেসন কোনটাই বিশেষ দেখিনা। আমি বা শুভ্র বারবার ধ্যারাবার সত্বেও, প্রত্যেকবার একি উৎসাহে কাজ করে গেছে। দিপুর সঙ্গে প্রচুর সময় কেটেছে ফ্রেম শেখায় একসঙ্গে, রেফেরেন্স ফ্রেম দেখা, ভোরে উঠে নিখাদ ঘন্টার পর ঘন্টা ক্যামেরা নিয়ে প্রাকটিস। মনে পরে অরিজিত একবার বিনাপয়সায় গাড়ি পর্যন্ত জোগাড় করে দিয়েছিল।

এরপরে এই সিনেমা তৈরি মুলপদ্ধতি এবং ভাবনা নিয়েই, আমার আর শুভ্রর প্রায় অনেকদিন বাক্যালাপ এবং মুখ দেখাদেখি দুই বন্ধ ছিল। এর মধ্যে দুজনেই আলাদা আলাদা কাজ রিলিজ করেছি, তা সে ঝামেলা মেটার কিছুদিনের মধ্যেই ও ব্যাঙ্গালোর আর আমি দিল্লি। তাই দুবছর আগের ওই রকের আড্ডার সময়টাতেই দাবী উঠে আসা বাধ্য যে একসঙ্গে অন্তত একটা কাজ শেষ করতেই হবে। এতদিনে আমি বেশ কিছু ডকুমেন্টারি আর অ্যাড ফিল্মএর কাজ করে ফেলেছি, আর শুভ্র সিনেমা বানানো থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছে। হুট করে একদিন প্রশ্ন করল কম্যুনিকেসন কি কি ভাবে হতে পারে, বিস্তারিত আলোচনার পর বাড়ি ফিরতেই, আমার মাথায় কাগজের নৌকোর ভাবনাটা এল। খুব তাড়াতাড়ি তথাগতর চিঠিগুলো লিখে ফেলা হয়, এবং তারপরেই নন্দিনীর। তথাগতর শুট খুব তাড়াতাড়ি চারদিনের কাজেই শেষ, রোজদিনই বৃষ্টি, কোমর জলে নদীতে নেমে শুট। তারপর কিছুদিন চলল নন্দিনীর খোঁজ। কাউকেই আমার পছন্দ হয়না, আসলে সে এমন হবে, যাকে দেখে আমি প্রথমেই থমকে যাব, আর যারা ছবিতে দেখবে, অন্তত একটু প্রেম থাকলে মনে ভাববে “মে ফারস পে সাজদা কারতা হু কুছ হোশমে কুছ বেহোশি মে”। এমন দাবি দিলে, কঠিন হয়ে, অতএব পাওয়া গেলনা নন্দিনী।
আমি শুধু ঠিক করলাম, এটা না শেষ করে, আর নিজের অন্য ফিল্মের একসেকন্ডও শুট করবনা।

(ক্রমশ)















অনির্বান সরকার

Anirban Sarkar

Monday, July 24, 2017

সখী : গুলশনারা খাতুন

সখী

দোতলার ল্যান্ডিং পেরিয়ে আড়াই তলার মুখে ফ্ল্যাটটা। এখানে  বিল্ডিংগুলোর কনস্ট্রাকশন এরকমই। এক চিলতে জমি পেলেই তা দিয়ে জিকজ্যাক করে ফ্ল্যাট তুলে আখাম্বা বাড়ি তুলেছে মালিকরা। ল্যান্ডিং-এর আলোটা মাস পেরলে সারাবে বোধহয়। ব্যাগ হাতড়ে চাবি দিয়ে ফ্ল্যাটটা খুলতেই এক নিশ্বাস অন্ধকার। মোবাইল টর্চে এখন এলইডি আলো। বছর ঘুরলেও এ ঘরের দেওয়ালগুলো চেনা লাগে না দিতির। সেবার বোন এসে ঘরে একগাদা কায়দার আলো রেখে গেছে। সুইচ টিপলে দিত নিলচে দেওয়াল ঘরে লাল-নীল-সবজে আলোর রামধনু এফেক্ট। অবশ্য এই একবুক অন্ধকারটা আজকাল গা সওয়া হয়ে গেছে দিতির। বেশি আলোতে কেমন চোখ ধাধিয়ে যায়। ব্যাগটা মেঝে ফেলে সিগারেট জ্বালতেই সামনের দেওয়াল থেকে মা যেন নাক সিটিয়ে উঠল। সেই বাড়িতে প্রথমবার সিগারেট ধরা পড়তে মায়ের মুখটা যেমন হয়েছিল, আজও সেই এক্সপ্রেশন ইনট্যাক্ট। ভাল আছ তো মা?’ দিতি মনে মনে জিজ্ঞেস করে। মা-ও যেন ছবি থেকেই মুখ ঘুরিয়ে নেয়। গেল বার বোন এসেছিল যখন, তখন বোনের মোবাইলে মায়ের হাসি-হাসি ছবি দেখে দিতির কান্না-কান্না পাচ্ছিল। দিতি আবার দেওয়ালটার দিকে তাকায়। কিরকম ঘর জোড়া সুখে স্মৃতি। দেওয়লা আলমারিটা পাশে একটা বইয়ের তাক। উল্টো দিকে দিতির খাটের পাশে একটা ল্যাপটপ আর টি-টেবল। আর নীলচে দেওয়ালে সুখের ছয়লাপ। বাবা-মায়ের কোলে ছোট্ট দিতি। ঠাম্মু পাশে দিতি আর বোন। দার্জিলিং-এ মায়ের কোলে দিতি। মা আর বাবা আগ্রায়। কেমন যেন সব পাওয়ার জগৎ। দিতি হাসে। মনে মনে ভাবে,

সে তুমি যতই মুখ ঘুরিয়ে নাও মা। এই দেখো কেমন আমি তোমাদের চোখের সামনে।
নাহ। ডাক্তার এবার দেখাতেই হবে। আজকাল বড্ড চোখে জল আসে। দিতি বিশ্বাস করে এটা চোখের সমস্যা।


দিল্লিতে এই এক কারবার। অফিস চার পিস লোক কাজ করলেও দেখানেপনা প্রচুর। এই যেমন কুড়িয়ে জনা ২০ লোক দিতির অফিসে। কিন্তু তাতে দুখানা কেবিন, কিউবিকল, ক্যাণ্টিন, ডিজিটাল লাইব্রেরি মিলে এলাহি ব্যাপারে কমতি নেই। দেবারুনদা আর জয়াদি মিলে একেবারে আগলে রেখেছে। প্রায় তিন পুরুষের দিল্লিবাসি দেবারুণদা নিজের দায়িত্বে বাড়ির দুটো ঘর নিয়ে এই অ্যাড এজেন্সিটা শুরু করেছিল। এখন ক্রিয়েশন’-এর বয়স ৮। শহর ছেড়ে রাজধানী নির্বাসনে এটাই আপাতত দিতির ওয়ান্ডার ল্যান্ড। মালিক আর মালকিনকে বেশ পছন্দ দিতির। স্নেহ-ভালবাসার কমতি নেই। মাইনের দিন এদিক-ওদিক হয় না। দিতির যেবার জ্বর হল, দেবারুণদার বাড়ি থেকে খাবার আসত একা মেয়েটার কথা ভেবে। তবু জয়াদি বা দেবারুণদা বাঙালি গ্যাদ্গেদে আবেগ একেবারেই দেখায়নি। দিতির বাড়ি, একলা থাকার ইতিহাস ঘাটেনি কেউই। তাই উড়ু দিতিও কেমন টিকে গেল। দিতি সিগারেট জ্বালালে সিনিয়র কপি এডিটর পরমিত ম্যাম নাক সিটিয়ে তাকায়। অনেকটা মায়ের মতো। দিতির টিকে যাওয়ার আর একটা কারণ।



নিউজপেপার বা চ্যানেল নিয়ে আপডেট থাকা নিয়ে ছুঁৎমার্গ থাকে না অনেকের। সুপ্রিম কোর্টের সামনে দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় কিলবিলে কালো কোর্ট আর কালো মাথা দেখলে দিতি মনে মনে তারিখ পে তারিখআউড়ে নিজে নিজেই হাসে।

এই আর এক হয়েছে ৩৯৯ যেন পচনধরা মর্গের পাশ দিয়ে যাচ্ছে এমন ভাবে নাকে রুমাল চাপা দেয় চিত্রদীপ। অফিস ফিরতি চিত্রর গাড়িতে ড্রপ পেলে ফেরার ভাড়াটা বাঁচে দিতির। যন্তর-মন্তর পেরোতেই দেখে গেল মানুষগুলোকে।

- রং মেখে বেরিয়েছে দেখো। বিশ্বের ছক্কা আর লেবুর দল।

- তোর মুখে রং দিয়েছে?

- হিজড়েগুলোকে দেখলেই গা জ্বলে। ট্রেনে-বাসে ধরে ধরে হ্যারাস করে। আর ভাই লেবু আমি নিতে পারলাম না। সুন্দরী মেয়েগুলো মেয়েদের লাগাচ্ছে ইয়ে মানে ইন্টিমেট হচ্ছে ভাবলেই কেমন বঞ্চিত লাগে।

- চুতিয়া।

- কি?

- বাড়ি এসে গেল। নামব।

- ওহ।

বাড়ি ফিরে স্নান করে দিতি। গায়ে থুতু ছিটিয়ে দিলে কেমন গা ঘিনঘিন করে যেন। এই ছেলে নাকি জেএনইউ সোশিওলজি টপ।

সেবার সিমলিপাল থেকে একটা ডেক্সটপ ক্যালেণ্ডার কিনেছিল। বটপাতায় অ্যাক্রলিক দিয়ে সার দিয়ে মাস, দিন, বছর। দিনটায় চোখ পড়তে দিতি টের পায় চোখের সমস্যাটা। কেমন আছে কে জানে? বার্থ ডে মান্থ করে এখনও? চিলেকোঠায় ইতিহাস বই পড়ে থাকে?


- ছাড় প্লিজ। কাকিমা চলে আসবে।

- উফ চুপ কর প্লিজ। তোর ঘাড়টা এত সুন্দর।

- প্রিয়াআর না প্লিজ।

- আই উইল ইট ইউ আপ।

- আই লাভ টু বি ইন ইউ।

প্রিয়া হেসে ফেলত। দিতির নাকে নাক ঘষে দিত। কে জানে কেন, কপালের চুমুটুকুর জন্য দিতির এত আকুলতা। বাড়ি ফিরে সারারাত এপাশ-ওপাশ করত। ডায়েরি লিখত আপনমনে। প্রিয়াকে নিয়ে মা অবশ্য কিছু বলেনি। মেয়ের বন্ধু বাড়ি আসে, থাকে তাতে সমাজের জাত যায় না।

ভুলটা ধরিয়েছিল রণই। কত যুগ যেন পেরল। সুদীপদার কোচিং-এর শেষ দিন। পার্ট টু ছুটি পড়বে। রণ পিছু পিছু গড়িয়া মোড় অবধি এসেছিল। রাত নটার বৃষ্টির কলকাতা প্রায় নিশ্চুপ, নিরালা।  প্রিয়াকে পিছন থেকে জাপটে ধরে টি-শার্টে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছিল।

- what the hell রণ?

- কী মনে হয়? আমি বুঝিনি? বুকের সাইজ তো পাতিলেবুর মতো। টিপলে দু আঙুলে আসে। খানকি, লেবু শালা। আমি বুঝি না প্রিয়ার সঙ্গে তোর গা ঘেষাঘেঁষি? আমায় দিয়ে টেপাবি? আর ওকে দিয়ে রড ঢোকাবি?

এসব কি ভাষা। ছাড় তুই আমায়।

- ভাষা? ইউ চিট। আমায় চুমু খেতে তোর লজ্জা করে? প্রিয়ার বাড়ি যাতায়াত দিনরাত। মাগি।

- মাইণ্ড ইয়োর টাংগ। প্রিয়া আমার বন্ধু। আমরা গ্রুপ স্টাডি করি।

গ্রুপ চুদি। মেরে পুঁতে দেব শালা। সবাই জানে প্রিয়া লেবু মাল। ছিঃ শালা। আমার কপালেও লেবু জুটল।

হতভম্ব দিতি দাঁড়িয়ে ছিল বৃষ্টিতে। প্রেম হতে হয় তাই রণ ছিল। কিন্তু এই ছেলেটাই কি রণ ছিল?

তারপর বসন্ত এসেছে। রণ চলে যেতে মনখারাপটা বেশ কিছুদিন ছিল যদিও। রাতটুকু আর ঘুম ভাঙলে দিতির একা একা লাগত। নতুন ক্লাস আর নতুন ক্যাম্পাস। দিতির বসন্তে প্রিয়া।

- আমার খুব খারাপ লাগে রে। রণ খুব ভালবাসত আমায়।

- চুপ কর। ভালবাসলে লোকে ওইভাবে অ্যাবিউজ করে?

- জানি না। আমি কি ঠকালাম রণকে

প্রিয়া কথা বলতে দিত না। চুমুতে ঠোঁট বুঝে আসে। চিলেকোঠার ঘরে একটা দোলায় দিতি প্রিয়া কোলে ঘুমিয়ে পড়ত।

ঠাম্মু মারা যাবার পর দিতির চলে যাবার ভয়টা খুব পেত। বোনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদত। কেমন একটা চলে যায় সবাই। ছেড়ে। একা করে।

- আমি তোকে কখনও ছেড়ে যাব না।

- প্রমিস?

- চিলেকোঠার দিব্যি।

দিতি কেন যে এত লজ্জা পায়। একান্নবর্তী পরিবারে এক মেয়ে প্রিয়া। দিতিদের বাড়িতে জন্মদিনের চল বলতে ওই একটু পায়েস। মাটন কষা আর পোলাও। মায়ের রান্নার হাত একেবারে ফাইভ স্টার যাকে বলে। শুধু যেবার দিতিকে লুকিয়ে সিগারেট খেতে দেখে ফেলেছিল, তারপর থেকে নাক সিটকে মা আর পায়েস রাঁধাই বন্ধ করে দিল। প্রিয়ার জন্মদিনে চকোলেট কেকের সাইজ দেখে দিতির চোখ কপালে। এ মেয়ের বার্থ ডে মান্থ হয়।

- আমায় কী দিবি জন্মদিনে?

- কী চাস?

- পরে বলব।

অনলাইন শপিং দিতি তখনও শেখেনি। ডিল্ডোটা দেখে আঁতকে উঠেছিল।

- এটা পেলি কোথায়?

- একটা সাইট আছে।

- কেউ জানতে পারলে?

- আমার বার্থডে গিফট।

তারপর এক, দুই, তিন, কতদিন। চিলেকোঠা নামের স্বর্গপুরীটাকে সাজাবে প্ল্যান করেছিল তো দুজনে বিয়ের পর। দিতি শুধু শুনত। ভাবত মা কে ঠিক ম্যানেজ করে নেবে। আর বাবা? হ্যাঁ, বাবাকেও।

দিনযাপনের অবসাদে কিছু ক্লান্তি আসে। শহরের পালটে যাওয়া দিতি দেখেছে কতবার। হাত ধরে বৃষ্টি ভিজেছে দুজনে। তবু সপসপে শরীরে ক্লান্তি আাসেনি। সেদিন লোডশেডিং হল। চিলেকোঠায় নাকি মোমবাতি রাখা থাকে। ঠিক শীৎকার শেষে আর একটা চিৎকার। প্রিয়ার মা অবশ্য এহেন নোংরামিবাড়িতে জানান দিতে কসুর করেননি। চুলের মুঠি ধরে মারতে মারতে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল মা। দিনরাত একঘেয়ে লাগত মায়ের কান্না। বোনকে এক সপ্তাহে হস্টেলে পাঠিয়ে বাবাই বলেছিল, ‘তাড়াতাড়ি নিজের ব্যবস্থা নিজে করে নাও। সমাজে থাকি। আমরা এসবে নেই।মা শুধু নাক সিটকে ছিল। মোবাইলটাকে নিস্ক্রিয় পাথর মনে হত। ক্যাম্পাসের কানাঘুষোয় প্রিয়ার বিয়ের খবরের থেকেও বেশি চমক ছিল সহপাঠীদের আচরনে। এক ঝটকায় প্রিয় বুদ্ধিবাদী, স্বাধীনমনস্ক সবাই কেমন যেন দিতিকে নাক সিটকে দেখে।

মা কে খুব ভালবাসি রে। আমি অবাধ্য হলে মা মরে যাবে। জানিস তো হার্টের প্রবলেম। খুব ভাল সময় কাটিয়েছি দিতি আমরা। ভুল বুঝিস না। পারলে তুইও বিয়ে করে নে।

প্রিয়া। সেদিন কতদিন পর যেন দিতি মেইল চেক করেছিল কি কারণে।


নাহ দোতলার ল্যাণ্ডিং-এ আজও আলো নেই। দিতি এক নিশ্বাস অন্ধকার ঘরে লাল-নীল আলো জ্বলছে। আর ২১ এপ্রিল। বার্থ ডে মান্থ শেষ হলে মেয়েটা ভারি দুঃখ পেত। সিগারেট শেষ হলে ধুপকাঠি জ্বালিয়ে দেয় দিতি। ঘাড়ে বিন্দু-বিন্ধু ঘামগুলো কত যে স্বপ্নের কথা বলে। কাল অফিসে নতুন প্রজেক্টের রিপোর্ট জমা দিতে হবে। হিন্দিটা বেশ ভালই রপ্ত হয়েছে। জেএনইউ ফেরত চিত্রদীপ মাঝরাতে টেক্সট করে। দিতি ভাবে খিস্তি দেবে। থাক, নাক সিটকালে মাকেই সবচেয়ে সুন্দর দেখায়।

ল্যাপটপের আলোয় নীলচে দেওয়ালে মানবীর অশরীরি ছায়া কেমন। সিগারেটের ধোঁয়া উড়ছে আর পুড়ছে। দিতি মনে মনে হাসে। নতুন প্রজেক্ট ক্লায়েন্ট অ্যাকসেপ্ট করলে দিতির মাইনে বাড়ল বলে। তখন নাহয় একবার কুফরি ঘুরে আসা যাবে। নাহ, মায়ের একটা জামদানি। নাহয়, তোলাই থাকল আলমারিতে। প্রজেক্ট এর ফাইল খোলে দিতি। এলজিবিটি বিয়ে নিয়ে একটা ইউটিউব অ্যাড বানাতে চাইছেন ক্লায়েন্ট, প্রিয়া, প্রিয়ম্বদা সিং। বছর ৫০-এর এই অ্যাক্টিভিস্ট ক্রিয়েশন’-এর পুরনো ক্লায়েন্ট। নতুন ওয়ার্ড ফাইল খুলে লেখা শুরু করে দিতি। নাম দিল সখী












গুলশনারা খাতুন
Gulshanara Khatun


Friday, July 21, 2017

সোনালি আপেল ও প্রিয়তম এবং চরিত্র, দিন ও পিতা : কৃতি ঘোষ

সোনালি আপেল ও প্রিয়তম
মানুষ চিরকাল অন্ধকূপের মধ্যে কাটাতে ভালোবাসে। এদিকে যাব না, ওদিকে যাব না – আমি বসে থাকবো শুধু। এমনটা বললে কোনও ছায়াছবির মত পথ আগলে রাখা যায় ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত প্রকৃতিতে বাঁচা যায় না। বাঁচার কোনও অর্থ নেই মানে অর্থের বেঁচে থাকার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। না, আমি গুলিয়ে দিচ্ছি না, প্রস্তর ভেঙে কারুর মূর্তিও তৈরি করছিনা আপাতত। এই যে সাময়িক প্রয়াস তার অর্থ আমার প্রত্যয় ঘটেছে। আমি উচ্চস্থানে বাস করছি আপাতত। এখানে কবিতার প্রয়োজন নেই, মৃত্যুর প্রয়োজন নেই। এখানে সমুদ্রের ফেনা আরেকটা অ্যাফ্রোদিতির জন্ম দিতে পারবেনা। সূর্যের দেবতা এখন অকর্মণ্য হয়ে শিস দিচ্ছে খানিক।
নদীতটে বসে কার কথা মনে পড়ে? কার ভ্রু উঁচিয়ে তাকানোয় বাষ্পীভুত হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে বেশি? কে সেই দীন-দরিদ্র ও কবির মাধ্যমে অমর হওয়া প্রেমিক? এসো প্রেমিক, জল ভেঙে জরায়ুতে এসো। তোমাকে জন্ম দিই একবার। এখানে তরল অনুভূতিরা গাছে গাছে হেলান দিয়ে বসে থাকে। সোনালি আপেলের মত লোভ আছে বিস্তর। তবে দেখানোর শখ নেই। বালি বালি রোদ আছে। বিনে পয়সার চাবুক আছে। চাবুক কথা বললেই ছোটে। পিঠ বেয়ে সাপের মত হিসহিস করে চাবুক। দেখোনি?
সমুদ্রে যেও না আর। ওখানে সুন্দরী মাছ পড়ে আছে খুব। তোমার ভয় নেই? ভয় নেই বিকিয়ে যাবার? ভয় নেই কাবু হয়ে বসে থাকার কোনে? উৎসবের আনন্দ ভালো দীর্ঘ জীবনের চেয়ে। দীর্ঘ ভাবে পোকার খাদ্য হওয়ার চেয়ে কবর অনেক ভালো। প্রেম ও বিষাদের ক্ষমা হয় না কখনও। এদের কেবল পরিবর্তন হয় রূপ, রঙ - বাজি রেখে হেরে যাওয়ার।
এয়োরা নদীঘাটে বসে কেন? ওদের বাড়ি নেই? ওরা জানে না, তুমি ওইদিকে যাবে আমাকে ছেড়ে? সব কবিতাই প্রেমের হয় কেন? বিপ্লবেও প্রেম কেন খাদ্য হয়? আমাকে জিতিয়ে দাও খিদে, আমি উড়বো না। আমার ডানা উপহার দিয়েছি তিন প্রহরের দেবতাকে।
ওরা দেবতা বলে – ঈশ্বর বলে না। বলে না ঈশ্বরের মৃত্যু ঘটেছে – নারীর সাথে সহবাসের কারণে। ওরা বলে না ঈশ্বর কামুক ও ভিখারি। ঈশ্বরের পুত্র নেই – ওগুলো মিথ। ঈশ্বরের প্রসবযন্ত্র নেই – ওগুলো মিথ্যে। মিথ্যে আর গুজবের পার্থক্য করতে শেখো। শেখো মিথ্যেকে সত্য বানানোর নির্মম প্রক্রিয়া।
আহা দিবস! আহা কর্তব্যহীন দিবস! আমি তার সহিত সাক্ষাৎ করতে জঙ্গলে গিয়েছিলাম। সে আমাকে সোনালি আপেল দিয়েছে। বলেছে এখান থেকেই সভ্যতার শুরু। বলেছে অ্যাফ্রোদিতির মৃত্যু নেই। সে অমর ও বিনম্র। অহংকারের মাথা নেই তার। সে অ্যাফ্রোদিতির অপেক্ষা করছে। আমি সাফোকে দেখিনি, পড়েছি শুধু কিছু শব্দ ও অক্ষরের বৃত্ত। আমাকে অহংকার মুক্ত করো হে সাফো – নতুবা সে আমাকে গ্রহণ করবে না।



চরিত্র, দিন ও পিতা
চরম রাহাজানি ঘটে গ্যালো এসবের মাঝখানে
এসব বলতে, চিরদিনের আলুথালু সময়ের যাত্রা বোঝায়।
নিয়ত দৈনিক চাহিদাগুলো মিটে গেলে হঠাত করে তার দ্যাখা পাওয়া যায়।
এখানে চরিত্রের সংকট রয়েছে।
অর্থাৎ, যা বা যাকে আমি দ্যাখাতে চাইছি সে বা তার কোনও অবয়ব হয়না।
অবয়ব হওয়াটা প্রয়োজনীয় নয়। তবুও...
অলিগলি বাদ দিয়ে গম্ভীর গুহামুখে ঢুকে পড়বার মতন
তাকে চাওয়া যায় না।
চাওয়া যায় না কারণ, সে অতীব বাস্তব
বাস্তবরা দীর্ঘদিন রয়ে যায় যাপনের সাথে। তারা এদিক-ওদিক ঘুরে ফিরে বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ে।
আমি বাড়ির মধ্যে ঢুকবো না।
এই প্রথম চরিত্রে আমি এলো, কারণ তার প্রবেশের পথ আপাতত উন্মুক্ত।
ফলে তাকে গুহামুখে ঢুকিয়ে নেওয়ার পরেও আমি থেকে যাবে।
আমি ঝোপঝাড় পেরিয়ে গুহামুখে তুলসী গাছ বসাবো – চেতনাকে বিছিয়ে রাখবো মোরামের পথে
মা, তোমার চোখে জল ক্যানো মা?
তুমি কি দেখতে পাওনা আমি তারাদের মধ্যে মিশে যাচ্ছি?
তারা আমিকে ছাড়া পথে হাঁটছে না।
এই যে অস্বাভাবিক সঙ্কট, আশঙ্কাকে ভেঙে গুঁড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে গ্যালো মাঝ রাস্তা বরাবর।
আমি এসো, তোমাকে জন্মদিনের আনন্দের এক মুঠো প্রেম দেবো
আমি বসো, যাতায়াতের মাঝখানে এখানে নশ্বরতার কোনও স্থান নেই
আমি ঘুমোও – রাংতা মোড়া দিনে তোমাকে তামাকের ঠান্ডা দেবো
আমি আমি আমি
আমি গুহামুখে ঢুকে যায়
একে একে প্রবেশ করে তারা, সে ও তিনি
মঞ্চে এখন দিলদরিয়ার খিদে
তুমি জানো না রে দিন আমার,
চরিত্র কেবল শান্তির হয়
মা হয় প্রশান্তির
পিতার কোনও ঘর থাকে না
বুকের ভিতর শুয়ে পিতা গুছিয়ে ন্যায় আগামী দিনের শান্তিগুলো
পিতা তোমাকে নিয়ে জাহান্নামে যাবো
তুমি ঘিভাতের স্বপ্নে সন্তানকে ভরিয়ে দিও পিতা
চেতনা খিদের, চেতনা ঘুমের, চেতনা আগামীর, চেতনা চরিত্রের
পিতা এগিয়ে এসো –
শয়তান তোমাকে আপেল দিয়েছে – তার আস্বাদনে আমাকে জন্ম দিও প্রিয়










কৃতি ঘোষ
Kreeti Ghosh

Tuesday, July 18, 2017

ঈশ্বরের ভেজা ডানা : আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়

ঈশ্বরের ভেজা ডানা

চেনা মেঘ, ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া হ্যালোজেন কফ থুতুর দাগ পেরিয়ে যখন উঠলাম কলেজস্ট্রিটের বাসে, তখন আমি সেই বাসের একমাত্র প্যাসেঞ্জার। না একটু ভুল হচ্ছে কোথাও, ছিল আরেকজন। জানলার ধারে সিট ছিল আজ, তাই বসা হল না। গোটা বাস ফাঁকা পেয়ে কিছুতেই বুঝতে পারলাম না কোথায় বসা ভালো! জয়িতা রেগে আছে হয়তো, রাগবে না ই বা কেনো। রোজই কাজ সেরে উঠে ঘুমিয়ে পড়ি রাত্তির হয়ে গেছে বলে। কথা দিই যে কথা বলব, পেরে উঠি না! এরপর অশান্তি হয় কিছুটা, প্রতিবারই হয়। তাও জানি সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারলে গলে যাবে ও। যায়ও প্রত্যেকবার! ও একটা সাংঘাতিক স্বপ্ন দেখে মাঝে মাঝে, কুঁকড়ে যায়। আমায় পায় না। মেয়েটা হয়তো ভুলই করছে। হাওড়ায় এর আগে কখনও প্রজাপতি দেখিনি আমি, স্টেশন চত্ত্বরে, পাক খেতে খেতে বাসে উঠে পড়েছে আমার পিছু পিছু। তারপর হারিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বাসটা প্রাইভেট, টুকটুক করে কচ্ছপের মতো পেরোচ্ছে ব্রীজ। আজকাল আর ভিড় ভালো লাগে না। নিতে পারি না বেশি। এত মত এত ভাব এত আদর্শ, সাধুও বলে তাই, ও নিজেও এড়িয়ে চলে ভিড়, দক্ষ হাতে, আমি শিখি, যেমন শিখি বাস খালি থাকলে ড্রাইভার কন্ডাক্টররা কীভাবে কাছের হয়ে ওঠে। আমাদের অনেক কিছুই মেলে। সেগুলো একদিকে ফেলে, না-মেলাগুলো যাপন করি প্রাণপন। হাঁটতে হাঁটতে কোথাও তো পৌঁছোবো! দু’পা এগিয়ে গেলে তো শুরুর বিন্দুও অভিমত বদলায়, দেখিনি পিছনে সেও কোনো স্বার্থ খোঁজে কি না! খুঁজলেই বা কী। কালাকার স্ট্রিটের মুখের জ্যামটা গল্পে আসে আমার, রোজই, মা বাবা কে শোনাই সময় পেলেই। শুনেছি বড়বাজার থানায় নাকি বিরাট ঘুষের লেনদেন অথচ এই মোড়ের সেই পুলিশ ভদ্রলোককে আমি পাঁচ বছর এভাবেই দেখছি, কিরকম বাবা বাবা দেখতে, ইনি কি ঘুষ নিতে পারেন? প্রজাপতিটা চমকে দিল হঠাৎ, কোলে রাখা ব্যাগের একটা কোনায় বসল ভালো করে। এখনও যায়নি ব্যাটা। কি জ্বালা! অন্য জেলায় চলে এলি যে আমার সাথে! ফোনটা শুদ্ধেন্দুদারই। আগেও করেছে দাদা কয়েকবার। রিসিভ করতে গেলেই কেটে যায় খালি। কি অদ্ভুতভাবে এবার ধরে ফেললাম ফোনটা, ‘আকাশ একটু কালিঘাট মেট্রোর সামনে আসতে পারবে?’ পারবই তো, আজ আমার আর কাজটা কী! একটু দাঁড়ান, রাস্তা ভেবে নিই কীভাবে যাব। চিতপুর রোডের কাছে এসে গিয়ার ফাঁসল বাসে ঘোঁ ঘোঁ শব্দে নড়ে বসল প্রজাপতি। আমি কিছুদিন যাবৎ সব সমস্যাই খুব সাবধানে মিটিয়ে ফেলতে পারছি, কেন জানি না... এতে কোনো ঐশ্বরিক সূত্র আমি খুঁজতে যাই না। শব্দে শব্দে উড়ে গেল প্রজাপতি, সুপ্রিয়র ফেরার রাস্তায় পরে কালিঘাট। দাঁড়েতে বলি। বলি আমি পৌঁছে যাব নিশ্চিন্ত থাক, আর অনেকদিন বাদে দেখা হচ্ছে তাই তৈরী হয়ে থাক। আমি কিন্তু আর সেরকম ফাজিল নেই আজ। আজ বেশ মেঘলা হয়েই আছি। হয়তো ছটা পনেরো বাজবে ভাই। দাঁড়াস। সুপ্রিয় দাঁড়াবে। হাসিমুখেই দাঁড়াবে। সেটা জেনেও সঙ্কোচ হয় দেরি হলেজানি না কীভাবে এরম হয়। আজ শেষ টুকরোর মোগলাইটায় যে আক্রমণ টা করলাম দুজনে, এ নেহাতই স্কুল জীবনের স্মৃতি, এরকম মেঘলা যাপনে তার কোনোই স্থান নেইকিন্তু এটা তো তুই, তুই সুপ্রিয়, তুই আমার ধেড়ে বয়েসের বন্ধু। কোনোদিন পাশাপাশি খোপে গল্প করতে করতে মুতেছি আমরা? না! তাহলে তুই কিকরে জানলি আমার এই স্মৃতি? কেন করে দেখালি সেই ঘটনা? আমায় কী পড়ে ফেলেছিস তোরা? ঈশ্বর কি ঘুমিয়ে পড়েছেন? লোভে লোভে বসে আছি বাসে। একদম মোড়ের মাথায় নেমে হাঁটব সেন্ট্রাল এভিনিউ ধরে। মেট্রোর উদ্দেশ্যে। আর ভুলে যাব কাকে কি কথা দিয়েছি, কোথায় এসে প্রজাপতি বসেছে, রাস্তা পেরোতে গিয়ে অবাঙালি মেয়েটা হঠাৎ কিরকম তাকিয়ে ফেলল আমার চোখে, ভুলে যাব সব। ওই মেয়েটা জানবে না আমি ওর বাদামি চুল দেখে জয়িতার কথা ভাবছিলাম। কনডাক্টর বুঝতেই পারবে না আমি দেখেও ছেঁড়া নোট টা নিয়ে নিয়েছি চুপচাপ। প্রজাপতি টা জানবে না আমি কত টাকার টিকিট কেটে কোথায় নামব। এইতো পারছি, আমার ঘামে ভেজা এম জি রোড, আমার সিটি কলেজ, গু লেপ্টে থাকা ফুটপাথ ছেড়ে এই তো বাঁক নিচ্ছে আমার সব কিছু। আমি কি তাহলে আমার ইচ্ছেতেই বাঁচব বাকিটাও? জামা টান করতে গিয়ে দেখলাম কাঁধে বসে আছে সে। নেমে এসেছে আমারই সাথে। জয়িতা, সাধু, সুপ্রিয়, তন্ময় বা শুদ্ধেন্দুদা কেউ পাঠায়নি ওকে। কাউকে চেনে না ও। কিংবা হয়তো চেনে। আমি জানি না কি করব এবার, ওকে কী উড়িয়ে দেব? যদি ও স্বপ্ন হয় আমার! হা ঈশ্বর বহুদিন পর তোমায় নিজের মধ্যে পাচ্ছি। উড়ে যেও না...






আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়

Akash Gangopadhyay

Friday, July 14, 2017

তামুজ এবং আমি ~ একটি দীর্ঘ কবিতা : বেবী সাউ

তামুজ এবং আমি

অতঃপর শূন্যতা নেমে আসে
হাঁটু পেতে বসে ঈশ্বর
বকরূপী ধর্ম
নীতিবাক্য যত নিশ্চল
কোথাও প্রলয়ের ধ্বনি বেজে ওঠে
কোথাও বা পায়ের শব্দ
ভুল করে পুষে রাখি ভ্রম
ভ্রমণে উঠে আসে নিকেলের স্বর
দমবন্ধ অবস্থান

তামুজ হে! অবসর এই
শুরু করো দীর্ঘতম চিঠি
পাঠ করো,
শ্রবনের মাঝে এইটুকু সমর্পণ
দেখো, ধৈর্যহীন হয়নি মৃত বাজের আত্মা
পঙ্গুত্ব নিয়ে বসে আছে শেষ উপাখ্যান
রক্তহীন এই মাটি জুড়ে
বায়ু জুড়ে
এখনও অপেক্ষা করে দীর্ঘদিন
সমস্ত ধর্মপুরুষদের ছেড়ে জেগে উঠবে
প্রেম, কাল হীন,কামহীন, অনন্ত

এখনও লালপায়া অষ্টাদশী সবটুকু ভেঙে যাওয়া স্বপ্নে পুষে রাখে জোড়া দেওয়া কাঁচ
এখনও প্রসাধনে সেজে আছে সন্ধ্যে তারা
শৃঙ্গারে সুখী বেনারসী
শাঁখ বাজে
পাঠ করো পাঠ করো
 প্রিয় তামুজ, আমার প্রথম কৌমার্য

 দেখো ওই শহরের খাঁজ
সেখানেই যৌনপিশাচের দল
রাতভর হত্যা করেছে প্রেম
প্রেমিকার মন
ব্লাউজের হুকে ঠোঁট কেটে গেছে
সেপটিপিনে লেগে মাংসের গন্ধ
তবুও রাতভর থামে নি'কো
রাতভর উল্লাস করেছে নৃত্য
লিঙ্গ উপাসক তারা
দুধ ঘৃত জলে অবগাহন নয় শুধু
নিপুন কৌশলে শিখেছে হন্তারক পন্থা

তারপর! তারপর

ওরা ঘুমিয়েছে রোদে
শহর নেমেছে পথে
ছদ্মবেশ প্রেমহীন চোখে ফের দহন করেছে বুক
সারাদিন পরোক্ষ এক পিশাচীয় খেলা
উউফফ!
আর না, তামুজ, প্রেম আমার
একবার শুধু পাঠ করো এই দীর্ঘতম চিঠি
ভুল তোমার বানানের আঙ্গিক
ছত্রে ছত্রে সরল বালকের চাহিদা
তাতেই ভরে যাবে এ ধর্ষিত বুক
ভেঙে যাওয়া পাহাড়ের চূড়া
আবার সংশ্লেষ হবে তাতে
আবার জেগে উঠবে প্রেম
সমস্ত পুরুষকে যে মেয়ে ভেবেছে প্রতারক বলে
বিশ্বাসে আঘাত গুরুতর জখম
ফেরাও তামুজ হে, আমার প্রথম কৌমার্যের প্রেমিক

তুমি তো পুরুষ নও, লিঙ্গ ভেদে
দেখিনি কখনও
ভ্রম আমার?
এটাও ভ্রম!
সমস্ত সত্যি ভেবে নির্দ্ধিধায় তুলে দিয়েছি হাত
গোলাপের পাপড়ি ঠোঁটে এগিয়ে দিয়েছি চুম্বন
আকন্ঠ পিয়াসীর মতো পান করেছ আমার স্তন
প্রেম নয়প্রেম নয়?
সমস্তটাই ছলনা?
অন্য কোন পুরুষ ছুঁয়েছে বলে এই দেহপ্রান্ত
নশ্বর দেহ
তাতেই সব প্রেম উড়ে গেছে তোমার!
তাতেই তুমিও শেণ্য চোখ দিয়ে জরিপ করেছ বারবার
শহরের মতো!
ধিক্কার দিই কাকে!
কাকে বলি নশ্বর এই দেহভাগ ছাড়া
কোথাও ছুঁতে পারেনি নিশাচর পিশাচের দল
শলাকার মতো ওই উত্তপ্ত ক্ষুধা
উপভোগ করেছিল ওরা যখন
একমনে আমি তোমাকে চেয়ে গেছি তামুজ
ভেবেছি তোমার ওই প্রথম আলিঙ্গনের কথা
কোন পুরুষ ঢোকে নি মনে
কোন স্পর্শ ছুঁতে পারেনি ওই সতীচ্ছদের দ্বার
যা কিছু ঘটেছে ওরা চেয়েছে বলে
আমি তো তোমাকে সমর্পণ করে গেছি দিনরাত
ভেবেছি তোমার প্রথম স্পর্শ
ভেবেছি তোমার প্রথম শিহরণ
দুভাগ করে দেখো এ বুক
লেগে আছে শুধু তোমার চুম্বনের দৃশ্য

তামুজ হে, যেওনা।
চৌকাঠে দেখো ওই মৃত আত্মারা ঘোরে
আশ্রয় নেই
স্নেহ ভালোবাসা নেই
পিতা নেই
ভাই, বন্ধু, সখা
নারী অভিযোগে চিহ্নিত করেছে শহর
শুধু নারী! শুধু ভোগ্য পণ্য
নখের আঁচড়ে ভেঙে গ্যাছে প্রেম
তামুজ একবার দেখো মন
এখনও কারো স্থান নেই তাতে

ফিরে গ্যাছে, আমার প্রথম কৌমার্যের প্রেমিক
শহর ধর্ষণ করার আগে
যে প্রথম ভেঙেছিল সতীচ্ছদের দ্বার
বুঝিয়েছিল প্রেম আসলে মিশে থাকে মনে
অর্ধেক শতাংশে মনের বাস
দিনের পর দিন ভোগ করেছে
নিপলে ঘষেছে ঠোঁট
সদ্য উত্থিত শ্মশ্রু

আজ

ঘর নেই সংসারে
ভোগ আছে শুধু




বেবী সাউ

Baby Shaw