Friday, June 10, 2016

মিস্টার টি আর অমিতাভ বচ্চন: ঋতম সেন

মিস্টার টি আর অমিতাভ বচ্চন

৯ই ডিসেম্বর ২০১৫ বিকেল পাঁচটা বাজতে দশে আমি আমার পাড়ার মোমোর দোকানে বসে মোমো বিক্রেতা রবিনের সঙ্গে দুঃখের গল্প করছিলাম। অনেক রকমের দুঃখ, অর্থকষ্ট তার মধ্যে প্রধান। অর্থকষ্টের জন্য রবিন ল্যাব্রাডরের গায়ে ছেটানোর এন্টিবায়োটিক কিনতে পারছে না, এবং আমি ওর হাফ প্লেট চিকেন মোমোর দাম বাকি রাখতে বাধ্য হচ্ছি। কথা বলতে বলতে আমরা আবিষ্কার করলাম আমাদের চারিদিকে যারা বসে আছে, যেমন পাশের প্লাস্টিকের টেবিলের এক মুশকো পলিটিকাল হাফ নেতা, (যার সবসময়ে বুক ধড়ফড় করে) এবং তার চিমসে চ্যালা, (যে কি গুরুর বুক ধড়ফড়ের কারণ? ), তাদের পাশের টেবিলের প্রেমিক প্রেমিকা (যারা পাশাপাশি বসে হোয়াটস্যাপ করতে করতে মুখেও কথা বলছে), রাস্তার ওপারের রোলের দোকানের খোকন (যে প্রাণপণে মাংস কষছে) , তার খদ্দের (যার মুখ দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু উত্তেজিত গলা শোনা যাচ্ছে) তারা প্রত্যেকে একটাই বিষয়ে কথা বলছে। আজ নাকি এখানে অমিতাভ বচ্চন এসেছে। আমি ঘাবড়ে গিয়ে রবিনকে জিজ্ঞাসা করলাম, এই সত্যিই এখানে অমিতাভ বচ্চন এসেছে নাকি? রবিন উত্তর দিলো, সে কি তুমি জানো না? ওইজন্য তো আমি আজ হেঁটে এলাম, দেখো বাইক নেই। আমি বললাম সে কি? রাস্তাঘাটে ভিড়?পাবলিক খিট খেয়ে বাইক ফাইক নিয়ে নিচ্ছে? আমার সাইকেলটাকি বাড়িতে রেখে আসবো নাকি? রবিন এক গাল হেসে বললো, না না আমার দাদা বাইকটা নিয়ে বেরিয়েছে। বাইকবাহিনী বেরিয়েছে না? আবার অবাক হলাম, বাইকবাহিনী মানে? রবিন বললো, আরে তুমি কিছুই জানো না, কুড়ি তিরিশটা বাইক ঘুরছে তো পেছন পেছন। বচ্চনের কনভয়ের পেছনে। যেখানে যাচ্ছে সেখানে ছুটছে, যদি একবার দেখতে পায়। সিপিএম, তৃণমূল, নির্দল সব পার্টির বাইক আছে,  ইউনিটেড বাইকবাহিনী। আমি আর কি বলবো ভাবলাম, হায় হায় কোথায় সিংহবাহিনী আর কোথায় বাইকবাহিনী। সঙ্গে সঙ্গে পাশের সিগারেটের দোকানের চিমসে দোকানদার (যে কিনা খুন জখম রাহাজানি অগ্নিকান্ড সুনামি ভূমিকম্প সবকিছুর পেছনেই খুব সাবলীলভাবে ‘মেয়েছেলের কেস’ আবিষ্কার করতে সিদ্ধহস্ত) গলা বাড়িয়ে বললো সে কি আর আছে, সে তো চলে গেছে। রবিন দেখি খুব উত্তেজিত হয়ে- চলে গেছে? চলে গেছে মানে? দেখি দাদাকে ফোন করি তো... বলে লাফিয়ে উঠে জিন্সের পকেট থেকে মোবাইল বের করে বাইকের খোঁজ করতে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। আমি মোমোর দামটা না দিয়েই সুট করে আমার সেকেন্ডহ্যান্ড সাইকেলটায় উঠে ছিলিমের আড্ডার দিকে প্যাডেল করতে শুরু করলাম।
সেখানে গিয়েও দেখি লোকে অমিতাভ বচ্চনকে নিয়েই কথা বলছে। এখানে কথার ধরণটা একটু অন্যরকম । মোমো বা রোল খেতে খেতে লোকজন আসল অমিতাভ বচ্চনকে নিয়ে কথা বলছিলো, মানে লোকটা এই মূহুর্তে ক্যামেলিয়ায় থাকছে, সকালে কনভয় নিয়ে বেরিয়েছে, শান্তিনিকেতন ঘুরবে কি? এইসব বিষয়। গাঁজাখোররা দেখি বাস্তব অমিতাভ বচ্চনকে একটু অবহেলাই করে, আলোচনা করছে অমিতাভ বচ্চনের অভিনীত ক্যারেক্টারগুলোকে নিয়ে। ইয়ে দোস্তি বা , আজ ভি ম্যায় ফেকে হুয়ে পয়সে নেহি উঠাতা থেকে আরম্ভ করে জুম্মা বা আজ কি রাত এইসব রসালো আলোচনাও হচ্ছে দেখে আমি সাগ্রহে সেখানে যোগদান করলাম। রসিকরা জানেন এই রকম উড়ু উড়ু ধোঁয়াটে অবস্থায় স্বভাবতই একটু বাজে বকতে ইচ্ছে হয়। আর আমার মত অল্পবিদ্যে মধ্যবিত্ত আঁতেল তো থিওরি কষার কোনো সুযোগই ছাড়ে না। ফলে আমি অমিতাভ বচ্চন অভিনীত বেশিরভাগ সুপারহিট ক্যারেক্টারই আদপে সোশালিস্ট রিয়ালিস্ট প্রোটাগনিস্ট, সে হয় কুলি না হলে শ্রমিক, আদপে খেটে খায়, প্রলেতারিয়েতের প্রতিনিধি, এবং সেই জন্যেই তার ফ্যান ফলোয়িং এত বিশাল, এই লাইনের খুবই সরলীকৃত একটি বক্তব্য ছাড়বো ছাড়বো করছিলাম হঠাৎ শুনি, ইয়েসসস। বলা হয়নি এই ইয়েস নো ভেরিগুডটা হল তরুণদার মুদ্রাদোষ, মাঝে মাঝেই তরুণদাকে ইয়েসস বলতে শোনা যায় বিভিন্ন রকম প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে।তরুণদার  সঙ্গে  আমার  পরিচয় শ্যামডাঙার এই  ছিলিমের  আড্ডায় । বীরভূমের  চরম  শীতে সারাদিন  কাজে  অকাজে  কাটিয়ে  এই  আড্ডাটায়  সন্ধ্যের  দিকে  মাঝে  মাঝে  আমি  আসি,  কোনো  কোনো  দিন  রুটিন  সামলে  সময়  হলে  তরুণদাও ...। তার  রুটিনের  কথাটাও  বলা  জরুরি। কাজের  রুটিন  নয় –  সে কি কাজ করে আমি খুব একটা জানি না। রুটিন বলতে আমি তার প্রতি সন্ধ্যার দুটি নিপ এর কথা বোঝাচ্ছি। ভুবনবাটির মদের দোকানের সামনে  বসে তরুণদা  রোজ রাত্রে দুটি কোয়ার্টার ওল্ড মঙ্ক শেষ করে। রোজ দুটো, তার বেশি নয়, কমও নয়। কবে থেকে সে এই কাজটা করে চলেছে সে নিজেও ভুলে গেছে আমার ধারণা, তবে তার সন্তানের জন্মের আগে থেকে নয় নিশ্চয়ই।স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়তে পড়তে তরুণদার একটি ছেলে হয়। তারপর কি হয় সে গল্প বলতে গেলে এই গল্পটা শেষ হবে না। তবে তরুণদার সেই প্রেম যে এখনো কন্টিনিউ করেছে তার সাক্ষী সুশীলা রামানের একটি গান, ‘ইয়ে মেরা দিওয়ানাপন হ্যায় ইয়া মহব্বত কা সুরুর / তু না সমঝে তো ভাই ইয়ে তেরা নজরো কা কাসুর’। অনেকেই শুনেছেন, বিভিন্ন বারে প্রচলিত গান, তার মধ্যে প্যারিস বার উল্লেখযোগ্য। এই গানটা শুনলেই তরুণদা ইমোশনাল হয়ে পড়ে শ্বশুরবাড়ির কুখ্যাতি শুরু করে, ফলে গানটা আমরা একটু সাবধানে ব্যবহার করি। 
যাই হোক তরুণদা ঢুকে চাটাইয়ের ওপরে নিজের সামনে একটি কোয়ার্টার স্থাপন করে বাবু হয়ে বসে টুপিটা খুললো। স্বভাবতই আড্ডায় আওয়াজ উঠলো, কি তরুণ আজ কি দ্বিতীয়টা এখানে বসে হবে?আমরা দেখবো? তরুণদা বললো নো। রুটিন সেরে আমি ভুবনবাটি থেকে বেরিয়েছি। এটা তোমাদের জন্য। ইয়েসস। শীতকালে একটু গলা ভেজানোর ও শরীর গরম করার তরল পেলে কার না ভালো লাগে। তরুণের ধন্য ধন্য শুরু হয়ে গেল। আর তরুণদা যে আজ কোনো এক বন্ধুর দেওয়া একটি বেশ উঁচু পেডিগ্রির তরল রুটিনমাফিক প্রথম কোয়ার্টারের পর, সেই ফাঁকা বোতলটাতেই ঢেলে নিজের পানাভ্যাস মিটিয়ে এসেছে, সে কথাও সে জানিয়ে দিতে ভুললো না। ধন্য ধন্য ক্রমশ একটু থিতিয়ে এলে আমিই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কি তরুণদা? জানো আজ এখানে অমিতাভ বচ্চন এসেছে? তরুণদার মিটিমিটি চোখ উজ্জ্বল হয়ে উঠলো, যেন এই প্রশ্নটার অপেক্ষাই করছিলো, মুখ দিয়ে ফের বেরোলো ইয়েসস। লোকে যা বোঝার বুঝেছে, নির্ঘাত তরুণ কিছু ঘটিয়েছে। কৌতুহল মেটাতে বেশি দেরি হল না।
তরুণদা শুরু করলো- সকালে তো আমি এখান থেকে ছিলিমটিলিম খেয়ে বেরোলাম। প্রচন্ড ক্ষিদে পেয়ে গিয়েছিলো, বাড়ি গিয়েই তাই চান করতে গেলাম, আমার আবার চানটা একটু বেশিক্ষণ করতে হয়। ইয়েসস।
তরুণদা থেমে গেলো। আমি প্রশ্ন করলাম, চান করে কি করলে? তরুণদা আমার অজ্ঞতায় বেশ একটু দুঃখিত হয়েই বা যেন বললো কেন খেলাম? মা মুরগী রেঁধেছিলো পেঁপে দিয়ে , সুন্দর। (মাঝে মধ্যে এখনো, একটু বেশি টাল্লি হয়ে বাড়ি ফিরলে মা নাকি তরুণদাকে খাইয়েও দেয়! ধন্য জগজ্জননী !!) পেট ভরে খেয়ে ঘুমিয়ে পড়লাম। আমি বললাম ওহ। তরুণদা বললো ইয়েসস, তারপর যা ঘুমটা হল না ভাই কি আর বলবো, একেবারে দু ঘন্টা ঘুমিয়ে আমি উঠলাম ঠিক সাড়ে চারটের সময়ে। উঠে দাঁত মাজলাম, তারপর বেরোলাম, নোওও, বেরিয়ে আবার ফিরলাম। বাইকটা নিতে ভুলে গেছিলাম, তারপর বাইকটা নিয়ে বেরিয়ে সোজা গিয়ে থামলাম হচ্ছে বাজারে উৎপলের দোকানের উলটোদিকে। (এখন আর বাজারটাও নেই, উৎপলের দোকানটাও নেই কারণ এই টাউনটা স্মার্ট সিটি হচ্ছে ও রাস্তা চওড়া হচ্ছে) ডানদিকে তাকালাম এবং দেখলাম এক গাড়ি আর্মি চলে গেলো, তাদের বন্দুকগুলো বার হয়ে আছে বাইরে। তারপর দেখলাম আরও এক গাড়ি আর্মি, এবং এরা সকলেই মেয়ে। এইবার আমি বুঝলাম কিছু একটা হচ্ছে। আর তারপরে কি হল জানো?  আমি বললাম কি বলো? তরুণদা বললো- তারপর একটা বিশাল সাদা গাড়ি আমার আর আমার বাইকের সামনে এসে একটু স্লো হয়ে গেল। জানলার কালো কাঁচটা নেমে গেল, একটা লোক সোজা আমার মুখের দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো, তারপর গাড়িটা চলে গেল, লোকটাও বাইরে দেখতে দেখতে চলে গেল। আর গাড়িটার পেছন পেছন আরো তিনটে গাড়ি চলে গেল, সিকিউরিটি। আমি প্রথমে বুঝতেই পারলাম না কিছু। তারপর রাস্তাটা পেরিয়ে উৎপলের পাঁঠার মাংসের দোকানে হাজির হলাম। উৎপল কি একটা করছিলো। ওকে জিজ্ঞেস করলাম, এই উৎপল এক্ষুনি এখান দিয়ে কে গেল রে? উৎপল বললো, কি করে জানবো বল, কত লোকই তো যায়। নোওও আমার মাথাটা ঘেঁটে গেছিলো একদম, ফলে আমি একটু বসলাম। আর দেখলাম অন্যদিক থেকে পঁচিশটা বাইক আসছে।
আমি বলে ফেললাম বাইকবাহিনী। তরুণদা বললো ইয়েসস, তারা দেখলাম একেবারে উৎপলের দোকানের সামনেই থামলো, আর ডাকু, রবিনের দাদা আমার কাছে এসে বললো তরুণদা হল না বুঝলে, পেলাম না। আমি জিজ্ঞাসা করলাম কি পেলি না রে খ্যাপা? ডাকু বললো বচ্চনকে দেখতে পেলাম না।
কিছুক্ষণ সবাই চুপ। তারপর সেই নৈঃশব্দ ভেঙে তরুণদাই আবার বলে উঠলো, ইয়েসস। তখন আমি বুঝতে পারলাম আমি কাকে দেখেছি। বা কে আমায় দেখেছে। এবং আমি সময় দেখলাম, ইয়েসস ৯ তারিখ, বিকেল পাঁচটা বাজতে দশ। ইয়েসস। মিস্টার টি মিটস বিগ বি।
ব্যাস, হই হই হুল্লোড় শুরু হয়ে গেল, সকলেই খুব আনন্দিত, আড্ডায় এরপর থেকে তরুণদার নতুন নামই হয়ে গেল, মিস্টার টি। আর আমি এই গল্পটা পেলাম, যেটা শেষ হবে না যদি না টাইমস অফ ইন্ডিয়ায় প্রকাশিত একটি খবরের কিয়দংশ উদ্ধৃত করা হয়-
“Amitabh Bachchan to travel over 300 km for his shoot in Burdwan   
Dec 9,2015, 08.57PM IST TNN
Amitabh Bachchan is currently shooting in Kolkata..... According to sources, the actor will be commuting from Kolkata to Burdwan town, located near Santiniketan, travelling nearly 300 km Daily, as he did not like the hotel in Bolpur-Santiniketan. ...the actor was keen on visiting Rabindra Bhavana,,,, However since the museum remains closed on Wednesday, he was not able to fulfil his desire. Following this, Big B checked into a hotel in the same area, but he said to have left after a few minutes as he was not happy with.. the hotel.....”
বিগ বি যখন বিরক্ত হয়ে বোলপুর ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, সেই মোক্ষম সময়েই যে মিস্টার টির সঙ্গে তাঁর সাক্ষাৎ ঘটেছিলো, সে বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই...।।

ঋতম সেন
Ritam Sen