Jyotirmoy Shishu

Jyotirmoy Shishu

Saturday, August 27, 2016

ধারাবাহিকঃ পুরুষ-নারী কেলেঙ্কারি - অধীশা সরকার

পুরুষ-নারী কেলেঙ্কারি
এক

** লেখা শুরু করার আগেই একটা বিষয় পরিষ্কার বলে দেওয়া ভালো। আমি গণমাধ্যমে অ্যাক্টিভ নই আর। এটা যেখানেই বেরোক, আমি জানি কিছু মানুষ নেহাৎ স্বভাবদোষেই প্রচুর বক্তব্য রাখবেন। ‘নারীবাদ’ শব্দটার জন্য, আমার লেখনশৈলীর কারণে একেবারেই নয়। রাখুন, আমি চাই রাখুন। কিন্তু আমার পক্ষে কোনো ফোরামেই তর্কে জড়িয়ে পড়া সম্ভব না। আমার মানসিক শান্তি আমার কাছে অমূল্য। আমি স্বার্থপর মানুষ। তাই, পাঠক অবশ্যই নির্দ্বিধায় মতপ্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন করলে কোনো তাৎক্ষনিক উত্তর পাবেন না। আমি দেখব অবশ্যই। এবং আপনার প্রশ্ন যদি আমার যৌক্তিক মনে হয়, পরের লেখায় উত্তর দেওয়া থাকবে। ধন্যবাদ। **


ভ্রান্তিবিলাস ও অন্যান্য

‘নারীবাদ’ শব্দটা একটা আজব ট্যাবু হয়ে দাঁড়িয়েছে আজকাল। হয়তো অনেককালই। জানতাম না। এসব ‘স্পর্শকাতর’ বিষয়ে খোলাখুলি এবং মুখোমুখি বুলি ফোটানোর মত সাহস অথবা ক্ল্যারিটি খুব কম লোকেরই থাকে। তার ওপর একজন ‘নারী’র সামনে। পাগল নাকি? কামড়ে দেয় যদি? তর্কপ্রিয় ভারতীয়র তর্কের পরিধি বড়ই লিমিটেড। মোট কথা, বিল্লিকে নিয়ে তার মুখের ওপর খিল্লি, থুড়ি... তার গলায় ঘন্টাটা কেউই বাঁধতে যেতে চায় না। 

এখন ফেসবুক থাকায় একটা সুবিধে হল, আড়াল থেকে বাক্যি ঝেড়ে কেটে পড়া যায়। ওই, অনেকটা মেঘনাদবধের মত আর কি। প্লাস, কারো পোস্ট পড়ে যদি ব্যঙ্গে আপনার ঠোঁট ৪০ ডিগ্রি বেঁকে যায়, তাহলে সেই ব্যাঁকা ঠোঁটের সেলফি তুলে পোস্ট করে তাকে ট্যাগ না করা পর্য্যন্ত পোস্টকর্তা (কর্ত্রী হয়তো) সেটা দেখতে পাবেন না। ফলে যা হয় আর কি। যা এমনিতে হয়তো মাটির নীচে অনেকদিনই ছিল তার শিকড় থেকে ফলসমেত গাছ মাটির ওপরেই দৃষ্টিগোচর হয়।
ইদানিং ‘মেন’স রাইটস’ বলে একটা উঠতি ট্রেন্ড দেখা দিয়েছে। কিছু আদ্যন্ত শহুরে, পুঁথিপত্তর সম্বলিত (অবশ্য অধিকাংশ সময়ই গূঢ় রিসার্চের মাধ্যমে হয়তো জানা যাবে যে তাঁদের পুঁথিপত্তর মূলত তাকের শোভা বাড়িয়ে থাকে) মানুষ বলতে শুরু করেছেন, ‘নারীবাদ’-এর হাইহিলের তলায় পুরুষের আইডেন্টিটি, তার স্বাধীনতা মথিত হচ্ছে, নারীবাদী মানেই সেই ঝান্ডা হাতে কন্ট্রোল ফ্রিক যে কিনা নারীবাদের দোহাই দিয়ে হিটলার-তন্ত্র চালায়, পুরুষরা বিপন্ন এর ফলে, অত্যাচারিত, নারীর সমানাধিকার নিয়ে কথা বলতে হলে ‘নারীবাদ’ শব্দের কি দরকার, ‘মানবতাবাদ’ বললেই তো চলে, ইত্যাদি। এবং, সবচেয়ে মজার কথা হল, এই বক্তব্যের ঘনঘটায় কিছু নারীরও অ্যাক্টিভ অবদান রয়েছে; শুধু যে পুরুষরাই একথা বলছেন তা নয়। এই চটজলদি মতামতের দুনিয়ায় চিন্তাভাবনা যে ঘেঁটে ঘ হবে সে তো জানা কথাইন্টারনেট সবাইকে বলতে দিয়েছে। এর ভালো দিক যেমন একটা বেশ বড়সড় মাস ওপিনিয়নের গঠন, খারাপ দিকটা হল ওপিনিয়ন গড়ে দু’মিনিটে গড়ে ওঠা। যাই হোক, এই দু’মিনিটের ওপিনিয়নের নিয়ন ঔজ্জ্বল্যে যা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে তা হল ‘নারীবাদ’ শব্দটার ইতিহাস, তার গড়ে ওঠা, তার বাস্তবায়ন এবং তার মেটামরফোসিস।
পুরুষতন্ত্র সভ্যতার আদি থেকে চলে আসছে, সে তো জানা কথা। কিন্তু এই ‘পুরুষতন্ত্র’ শব্দের মানে কি? শব্দের মানের ওপর যেমন তার ব্যবহার নির্ভর করে, তেমনই, বৃহত্তর ক্ষেত্রে, শব্দের মানেই স্থির করে দেয় সভ্যতা কোন দিকে যাবে। অনেকসময়ে, শব্দের মানে গুলিয়ে গেলে সভ্যতার চলার পথ ভুল হয়েও যেতে পারে। ভাষাবিদরা হয়তো উদাহরণ সহ এমন অনেক পথ-ভোলার সন্ধান দিতে পারবেন। আমি দেখছি শুধুই ‘পুরুষতন্ত্র’ শব্দটাকে।
এক আদিম সময়ে মানুষের আইডেন্টিটি নির্ধারিত হত তার গায়ের জোরের মাধ্যমে। মস্তিষ্কের ক্ষমতা তখনো আবিষ্কার করেনি মানুষ। পশু থেকে সবে ‘মানুষে’ উন্নীত হয়েছে তারা, আর সে কথা তখনো তাদের জানিয়ে দেয়নি কোনো ইতিহাসের বই। সেই সময়ে, একদল মানুষ যারা বাহুবলে আর একদল মানুষের চেয়ে উন্নত তারা দুর্বল প্রজাতির ওপর আধিপত্য স্থাপন করতে শুরু করে। জেন্ডার নির্বিশেষেই আর কি। আর, সার্বিকভাবে, ‘নারী’ নামে যে বাহুবলে দুর্বল প্রজাতি, তাদের ওপর ‘পুরুষ’ নামে বাহুবলে উন্নত প্রজাতি স্থাপন করে আধিপত্য। যে যত শক্তিশালী সে ততগুলো গোরু-ছাগল নিজের অধিকারে রাখে, আর ততগুলোই নারী। পশুসমাজে এ নিয়ম এখনো স্বীকৃত বটে। কিন্তু প্রগতি যে মানুষকে ছেড়ে কথা বলেনি। সে উন্নতির পথ ধরে এগোতে গিয়ে আবিস্কার করে, চাকা, আগুন এবং ভাস্কর্য্য ছাড়াও, অস্ত্র। এবং সেইসঙ্গেই সে এও আবিস্কার করে যে তার খুলির মধ্যে ভরে দেওয়া আছে অসীম ক্ষমতা, যার ওজন মাত্র আড়াইশো গ্রাম। বাহুবলের চেয়ে অনেক বেশীকার্য্যকরী জিনিস এটা, সেও আবিষ্কার হল।
এই আবিষ্কারের ফলে কিন্তু সমাজের প্রকৃত চেতনা জাগ্রত হয়ে ওঠেনি। তখনও না, আজও নয়। ক্ষমতা, তা সে যে ধরণের ক্ষমতাই হোক না কেন, ইতিহাসের গোড়া থেকে মানুষ সাধারণত অপব্যবহার করেই এসেছে। ফলে, মানুষ মস্তিষ্ক খাটিয়ে অস্ত্র বানিয়েছে, বোমা বানিয়েছে, হিরোসিমা বানিয়েছে, কাশ্মীর বানিয়েছে। এবং ক্ষমতার অপপ্রয়োগের সেই একই লজিকে (লজিক হলঃ লাঠি যার মোষ তার) ‘নারী’ নামক মানুষদের তাদের আইডেন্টিটির কারাগারে বন্দী করে রেখেছে। খুলির ভেতরে যে আড়াইশো গ্রাম, তার বিকাশ ঘটলে ক্ষমতার এই অসম বন্টন নাও থাকতে পারে, পুরুষের আধিপত্য সম্বলিত যে সমাজব্যবস্থা তা টলে যেতে পারে, এই ভয়, একটু দেরীতে হলেও, মানুষের মগজে সেঁধিয়েছে। সে যথাসম্ভব চেষ্টা করে এসেছে, বহু বহু বছর ধরে, নারীর মানসিক ও শারীরিক অগ্রগতি রুখে রাখার। তাকে ঘরের বাইরে বেরতে না দেওয়ার, তার পুস্তক অধ্যয়ন নিষিদ্ধ করার, তাকে ‘আদেশ’ পালনে অভ্যস্ত এক জীবে পরিণত করার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাকে সন্তান প্রজননের একটি ‘মেশিন’ বানিয়ে তোলার।
এ চর্চা আজকের নয়। খনার জিহ্বাখন্ডন হয়েছিল কেন, ভেবে দেখলে বোঝা যাবে যে নারীর বেশী কথা বলা সেই পৌরাণিক আমল থেকেই বিপজ্জনক ভাবা হত। দ্রৌপদীকে পাঁচ মরদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার রিচুয়াল দ্বারা প্রমাণিত হয়, নারীকে সামগ্রী বই তেমন কিছু হিসেবে দেখা হত না। এখানে একটা মজার ব্যাপার আছে। এই বিলিয়ে দেওয়ার রিচুয়ালে অংশগ্রহণ করেন আর এক নারী, কুন্তি। পুরুষতন্ত্র যে শুধু পুরুষের হাত ধরে এগিয়ে যায়নি তাও প্রামাণ্য। এ বিষয়ে বিষদে লিখব পরে। তার পর সেই মহাভারতেই, দ্রৌপদীকে বাজি ধরা হয় পাশাখেলায়। বাজি ধরেন তাঁর স্বামী, যুধিষ্ঠির। দ্রৌপদী জিজ্ঞেস করেন, যিনি নিজেই নিজেকে হেরে বসে আছেন, তিনি বৌকে বাজি রাখেন কোন অধিকারে? তারপর কেষ্টঠাকুর এসে শাড়ি জড়িয়ে দ্রৌপদীর ‘মান’ বাঁচায়। এই গোটা রিচুয়ালে এমনকি কেষ্টঠাকুরও পুরুষতন্ত্রের ধারক ও বাহক। বাঁচাতে চেয়ে থাকলে... তিনি ‘ভগবান’, অসীম ক্ষমতাশালী পুরুষ, পাশাখেলা বন্ধ করাতেও পারতেন। শাড়ির মিলের ঠিকাদার হওয়ার অর্থ, প্রশ্নোত্তরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই তোমার দ্রৌপদী, অবকাশও নেই, আপাতত শাড়ি জড়িয়ে নিজের দেহটাকে ঢেকে পুরুষতন্ত্রের মান বাঁচাও। আমি হলে শাড়িটা রিফিউজ করতাম। এমনিতেও তো একজনের সামনে কাপড় খোলে না সেই নারী, পাঁচজনের সামনে খোলে, লিটারালি। আরো পনেরো-কুড়িজন একটি অসামান্য সুন্দর নারীদেহ দেখতে পেলে এমন কি মহাভারত অশুদ্ধ হত? হত। মহাভারত ‘অশুদ্ধ’ হত। মহাভারতের অশুদ্ধি যদিও প্রয়োজন ছিল। বহু শতাব্দী পর সাবিত্রী হেইনসমের অভিনীত দোপদী মেহজেন সেই অশুদ্ধি সম্পন্ন করে দেখালেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ‘নারীবাদ’ সংক্রান্ত অ্যাক্টিভিজম, আলোচনা, শুরু হয়েছে অনেক দেরী করে, অনেক, অনেক দেরী করে।নারীরা সেই অর্থে সহ্য করেছেন অনেকদূর। কিন্তু যখনউনিশ শতকের আমেরিকা ও ইউরোপ সদ্যজাত ‘ডেমোক্রেসি’র ধুয়ো প্রথমে মানুষকে বোঝালো সব মানুষের বক্তব্যের অধিকার আছে, চয়নের অধিকার আছে, কিন্তু নারীর কোনো ভোটাধিকার নেই, অর্থাৎ বক্তব্য বা চয়ন কোনোটারই অধিকার নেই, তখন এত বেশীরকমভাবে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হল যে ‘নারী ঠিক মানুষ হিসেবে গণ্য নয়’ যে নারীরাও অবশেষে দেখতে পেলেন। বড় দেরী করে দেখতে পেলেন। তখনো ‘ফেমিনিজম’ শব্দের উৎপত্তি তেমনভাবে ঘটেনি। এমেলিন এবং ক্রিস্টাবেল প্যাঙ্কহার্স্ট মেয়েদের ভোটাধিকারের দাবী নিয়ে ব্রিটেনে শুরু করলেন ‘উইমেন্স সোশ্যাল অ্যান্ড পলিটিকাল উইনিয়ন’।এ ধরণের আরো সংগঠন গড়ে উঠল বিভিন্নপশ্চিমী দেশে। এই আন্দোলনকারীদের ‘সাফ্রাগেট’ বলা হত, এবং আন্দোলনটিকে বলা হত ‘সাফ্রেজ মুভমেন্ট’ অথবা ‘সাফ্রাগেট মুভমেন্ট’। তাঁরা সফল হয়েছিলেন তো বটেই, কিন্তু কিভাবে, তা নিয়ে খুব কম লোককেই কথা বলতে দেখা যায় নারীবাদ সংক্রান্ত আলোচনায়। আমার আশেপাশের বৃহত্তর জনসাধারণকে দেখি বাসে-ট্রেনে লেডিজ সিট-এর বিরোধিতা করে নারীবাদকে চ্যালেঞ্জ জানাতে। লেডিজ সিট বা মহিলাদের কোটা সিস্টেম যে পুরুষতন্ত্রের অবদান, নারীবাদের নয়, সেটা বোঝার মত হয় তাঁদের ঘিলু নেই, বা আগ্রহের অভাব। যাই হোক, ‘নারীবাদ’-এর উৎপত্তি হয়েছিল প্রথম বিশ্বে। বাকি বিশ্বগুলিতে, আমি মনে করি, নারীবাদী আন্দোলন আদৌ সেভাবে হয়নি। এর পর এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৬৮ সালে সিমোন ডে ব্যুভিওরের লেখা ‘সেকেন্ড সেক্স’ বইটি নারীবাদী আন্দোলনকে একটা বৃহত্তর ক্ষেত্র এবং একটা তাত্বিক কাঠামো দিয়েছিল। এ নিয়ে আরো লিখব পরে।
এই এখন যা বললাম, তার মধ্যে অনেক কিছুর টুকরো টাকরা গুঁজে দেওয়া হল। এটা খানিক টিজারের মত ব্যাপার। পরের লেখাগুলোতে এই প্রত্যেকটা টুকরো নিয়েই বিষদ আলোচনা করব। নারীবাদ সংক্রান্ত এক দীর্ঘ আলোচনার জন্য এই অবধি লিখে খানিক গৌরচন্দ্রিকা করা গেল। যদিও, এই আলোচনা শুধুমাত্র আমার নিজের নারীবাদ নিয়ে যা ধারণা, সেটাই। নারীবাদী রাজনীতি নিয়ে অনেক, অনেক কিছু লেখা হয়েছে। তার মধ্যে বেশ কিছু লেখা অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সুখপাঠ্য। এতৎসত্বেও নারীবাদকে আক্রমণ করার লোকের অভাব পড়ে না। আমি ফেসবুকে অনেকটা সময় কাটাই। আজকাল কম লিখতে লিখতে পুরোপুরি বন্ধ করেছি। এখন শুধু পড়ি। এই আজকেই কার এক স্টেটাসে চোখে পড়ল, নারীবাদ নাকি ‘লিঙ্গবৈষম্য’কে তোল্লাই দিচ্ছে। স্টেটাসটি যাঁর দেওয়ালে পাওয়া গেল, তিনি আপাতভাবে শিক্ষিত একজন মানুষ। শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর মতামত এতটা অযৌক্তিক হয়ে উঠতে দেখা যায় না। তবে ‘নারীবাদ’ শব্দটা নিয়েই তিনি এমন অবোধ হয়ে উঠলেন কেন? নারীবাদ, বাই ডেফিনিশন, লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার জন্যই সৃষ্ট, এটা বুঝতে কি এখনো অসুবিধে হয়?
এটা দেখেই মনে হল, আরো লেখা দরকার। ততক্ষণ লিখে যাওয়া দরকার যতক্ষণ ‘নারীবাদ’ শব্দটির মানে মানুষের কাছে পরিষ্কার না হয়। সমর্থন বা বিরোধিতার কোনো অর্থ দাঁড়াবে তারপর, তার আগে নয়।
(ক্রমশ) 

অধীশা সরকার
Adheesha Sarkar