The Making of 'Fading Clouds' : রঙিন মেঘের গান - ২

‘Fading Clouds’

একটি ইন্ডি-ফিল্মের গল্প



রঙিন মেঘের গান - ২

পাসিং শব্দটির বাংলা প্রতিশব্দ কি আমি জানিনা। ইংরাজিতে পাসিং ক্রাউড বলে একটা শব্দ আছে, সিনেমাতেও আছে, ধরুন নায়ক নায়িকা রাস্তায় একটি দৃশ্য, সেখানে তাদের পিছনে আউট অফ ফোকাসে হেটে যাবেন পাসিং ক্রাউড।

রাস্তাঘাটেও রাস্তা দিয়ে হেটে যাওয়া অগুন্তি মানুষের মদ্ধে ভাল করে দেখলে এমন কিছু মুহুর্ত দেখা যায় যা সিনেমার চেয়েও দামী। লেখা বা সিনেমা চিরকাল এই অলক্ষে ভীড়ে মিশে থাকা মানুষের জীবনযাপন থেকেই উপাদান নিয়ে এসেছে। তাই একজন লোকের নামের চেয়ে, সে কিভাবে ভাত খায় কিংবা বাসে গুতোয় তা আমার কাছে অনেক বেশি গুরুত্ত্বপুর্ণ।

ফেডিং ক্লাউডস নামটি ঠিক করা গেল, এর আগে নাম ঠিক করেছিলাম পাসিং ক্লাউডস। আমাদের জীবনে এমন অনেক চরিত্র থাকে, যারা আসে, আবার চলেও যায়, শুধু রেখে যায় কিছু স্মৃতি। এমনই কিছু চরিত্রের দেখা হওয়া আবার নিজেদের পথে মিলিয়ে যাওয়ার গল্প নিয়েই এই ছবি। তারপর মনে হল এই চরিত্ররা শুধু চলে যায় এমনটাও নয়, ক্রমে ঝাপসা হয়ে আসে আমাদের জীবন থেকে। নাম ঠিক হল ফেডিং ক্লাউডস। যারা যেন এসেছিল একদিন ঝাপসা হয়ে যাবে বলেই।


চরিত্র খোজা শুরু হল, অবশ্য একটি চরিত্রকে খুজতে হয়নি বেশি। সত্রাজিত সরকার। আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু, একসময় একসাথে চাকরিও করেছি কিছুদিন। সত্রাজিত থিয়েটার করে ব্রাত্যজন-এ। কিন্তু এটা একমাত্র বিষয় নয়। আসলে সিনেমার চরিত্রটি একজন একা মানুষ, যে বাড়িতে একা থাকে, দীর্ঘদিন একা বাড়িতে যারা কাটিয়েছেন তারা জানেন যে কি ভয়ংকর নৈশব্দ নেমে আসে সন্ধ্যে নামলেই, বিশেষত সেই বাড়িতে যেখানে একদা অনেক লোক থাকতেন। সত্রাজিত দমদমে ঠিক এমনই একটি জীবনযাপন করেছে দীর্ঘদিন। সম্পুর্ণ একা। ওর বাড়িতে যখনই যেতাম দেখতাম কিভাবে একজন মানুষের ঘর এলোমেলো থাকতে থাকতে তা অভ্যাসে পরিণত হয়। একাকীত্ত্ব অর্থাভাব এবং নৈশব্দ। চরিত্রটি লেখার সময়েই তাই সত্রাজিতকে ভেবেই লিখেছিলাম। সত্রাজিত ততদিনে থিয়েটারে আরো ব্যাস্ত হয়ে পড়েছে, কিন্তু যেহেতু আমার অত্যন্ত কাছের বন্ধু এবং চরিত্রটি হুবহু প্রায় তার জীবনযাপনের মতো জীবনযাপন করে তাই সত্রা রাজি হয়ে গেল অভিনয় করতে।

বাকি চরিত্রের জন্য খুজছিলাম এমন এক মহিলাকে যাকে সেই অর্থে গ্ল্যামার কুইন বলা যাবেনা। সমস্য হল টেলিভিশনের দৌলতে আজকাল সকলেই দুইশেড চড়া মেক আপ করে গ্ল্যামারে ছড়াছড়ি, তার উপর শর্ত হল যে মেক আপ ছাড়া শুটিং করতে হবে। এমন সময় কে যেন বেশ বলল যে বেণীর সাথে কথা বলে দেখতে, তার আগে আরেক গ্ল্যামার কুইনের সাথে দেখা করেছিলাম, তাকেও যেমন আমার এই চরিত্রের জন্য পছন্দ হয়নি, তেমনি তারো আমাকে পছন্দ হয়নি। বেণীর একটিই অভিনয় দেখেছিলাম, আমাদের ইন্সটিটিউট এর সিনিয়ার শমীমিত্রর প্রোজেক্ট ফিল্মে অভিনয়, আর কিচ্ছু দেখিনি।

একদিন সন্ধ্যায় বেণীর বাড়িতে দেখা করতে গেলাম। এখানে বলে রাখা ভালো যে আমায় কেউ ছবির গল্প জিজ্ঞেস করলে আমি বেশ ঘাবড়ে যাই, কারণ আমার ছবিতে গল্প বলে তেমন মুচমুচে কিছুই থাকেনা প্রায়। আমার ছবির গল্প প্রায় এক লাইনে শেষ হয়ে যায়। এবং আমার দ্বিতীয় সমস্যা আমি বেশি উত্তেজিত হয়ে কথা বলতে গেলে জড়িয়ে পেচিয়ে তুতলিয়ে এমন ছড়াই যে উল্টোদিকের লোকটি বেশ বিরক্ত হয়। আমি যতটা চেনা মহলে মুখর ততটাই অচেনা মহলে নীরব।
বেণী গল্প জানতে চাইল, আমি ছড়িয়ে একসা। বেণী বলল-

- তুমি যে কি বলছ আমি বিন্দুমাত্র বুঝতে পারছিনা। তুমি জল খাবে? খাবার খাবে কিছু? খেয়েছ সারাদিন?
- না মানে হ্যা জল, আপনি স্ক্রিপ্ট পড়লেই বুঝবেন ফিল্মটা। আমি স্ক্রিপ্ট দিয়ে দেব
- তোমার কাছে স্ক্রিপ্ট আছে?
- হ্যা এই নিন,
- বেশ এবার তুমি এখানে বসে থাকো আমি পুরো স্ক্রিপ্টটা পড়ব,
- এখনই পড়বেন?
- হ্যা এখনই পড়ব, আমি তোমার কথার মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছিনা!

শুরু হল স্ক্রিপ্ট পড়া। গম্ভীর বেণী মন দিয়ে স্ক্রিপ্ট পড়ে চলেছে, আর আমি বসে বসে ভাবছি এবার কি করব!! জলের গ্লাস হাতে নিয়ে খাবো কি খাবোনা এইসব ভাবছি, একবার উঠে যাওয়ার চেষ্টা করলাম সামনে থেকে সিগারেট খাওয়ার বাহানায়, কিন্তু বেণী উঠতে দিলনা। পরিস্থিতি একেবারে ভাইবা পরিক্ষার মতো, আমার সামনেই আমার খাতা দেখা চলছে। এই সময়গুলো খুবই দীর্ঘ হয়, কিছুতেই সময় কাটতে চায়না। বেণী পড়ে চলেছে আর আমি তার দিকে তাকিয়ে আছি, দেখলাম তার কপালে একটা কাটা দাগ, এবং সেটি লুকানোর নায়িকাসুলভ ভঙ্গী নেই। ততক্ষনে আমি স্থির করে ফেলেছি যে বেণীই আমার ফিল্মের এই চরিত্রটি।
অবশেষে স্ক্রিপ্ট পড়া শেষ হল,

- দ্যাখো পড়ে তো বেশ ইন্টারেস্টিং লাগছে, কিন্তু চরিত্রটা কথা বলেনা কেন!!
- মানে একা থাকে শহরে...
- বেশ বুঝলাম, ছবিটা কি করে করবে বলতো? টাকা পয়সা জোগাড় হয়েছে?
- না মানে ক্রাউড ফান্ডিং করছি।
- বুঝলাম মানে আমাকে পয়সা কড়ি দিতে পারবেনা তাইতো?
- না দেব, পেলেই দেব।
- ছাড়ো সেসব, কবে শুট করবে?
-এই পুজোর আগেই শুরু করে দেব।
- মেক আপ এর কি হবে? বার সিংার মানে বেশ চড়া মেক আপ করতে হবে।
- মানে, মেক আপের বাজেট নেই আসলে,

৫ সেকেন্ড নীরবতা



- বেশ আমি রাজি, চরিত্রটি আমার ভালো লেগেছে। কিন্তু অনন্ত সময় দিতে পারব না কিন্তু। আর একজন মফস্বল থেকে আসা বার সিঙ্গার মেয়ে আমি দেখিনি, আমাকে সেই প্রিপারেশনে সাহায্য করতে হবে তোমায়।

যদিও বেণীকে এই প্রিপারেশনে আমি বিন্দুমাত্র সাহায্য করে উঠতে পারিনি, ক্রাউড ফান্ডিং এ ব্যাস্ত থাকার দরুন, সে নিজেই একা একা শহরের বারগুলোতে ঘুরেছে, বার সিঙ্গারদের সাথে কথা বলেছে এবং তাদের হুবহু কপি করে ফিরেছে। এবং শুটিং এর সমস্ত মেক আপ সে নিজে করেছে। অভিনয়ের পাশাপাশি তার মেক আপ এর এই গুন আমাকে সত্তিই মুগ্ধ করেছে। একটি ছবি যেখানে সে পয়সা পাবেনা, পরিচালক কে আগে চেনেনা, প্রায় কোন ভবিতব্য নেই, এমন এক ছবির জন্য সে যে পরিশ্রম করেছে তা বর্ণনা করার ভাষা আমার নেই।

তৃতীয় জন তালাত আমার দীর্ঘদিনের বন্ধু মুম্বাইতে গত ৭বছর ধরে লড়ে যাচ্ছে ভালো চরিত্রের খোজে, ওকে ফোন করলাম, বললাম যে এক ট্যাক্সি ড্রাইভারের চরিত্রে ওকে আমার প্রয়োজন। তালাত গল্প শুনে হিন্দিতে বলল যে-

- কিন্তু আমি গাড়ি চালাতে জানিনা কিন্তু।
- ঠিক আছে শিখে নিবি,
- বেশ ডেট কনফার্ম করে তার একমাস আগে আমাকে জানাস।

তিনবার ডেট পাল্টালো। অবশেষে ফেব্রুয়ারিতে যখন তালাত এসে শুটিং শুরু করল মাত্র ১৫ দিনের নোটিসে, তখন সে শুধু মাত্র ১০দিন গাড়ি চালানো প্র্যাকটিস করে আসতে পেরেছে। শুটিং এ আমরাও ঘাবড়ে আছি, তালাতও ঘাবড়ে আছে গাড়ি চালানো নিয়ে। কিন্তু খুব একটা অসুবিধা হলনা, শুধু ভীড় রাস্তায় চালানোর সাহস পাচ্ছিলনা অবশেষে শিয়ালদার ভিড়ে ট্যাক্সি চালানোর একটি সিন যখন বাদ ডেব ভাবছি তখন সে বলল- আরে ইয়ার এক এক্টর রিস্ক নেহি লেগা তো কৌন লেগা। বলে গাড়ির স্টিয়ারিং এ গিয়ে বসল। আমার সমস্ত ছবির ক্যামেরাম্যান আমার সহপাঠী মৃন্ময় আমাকে বলল টেনশন করিস না, ও পারবে। মৃন্ময় জানে যে আমার টেনশনের রোগ প্রবল, এবং জীবনে এমন এমন সময় ও আমাকে শান্ত করেছে যা বলার নয়, আমাদের টাইমিং খুব মেলে, দীর্ঘদিন এক সাথে কাজ করা নাকি বন্ধুত্ত্ব কে জানে।

চতুর্থ চরিত্র অবর্ণা, ওকেও অনেকদিন চিনি, দেখা হলেই বলত যে ছাড় তুই তো আমাকে কোনদিন চান্স দিবি না! ওকে বললাম একটি চরিত্র করার জন্য।

এছাড়া একজন বৃদ্ধ অভিনেতার প্রয়োজন বেনীর মামার ভুমিকায় অভিনয় করার জন্য, ছোট্ট চরিত্র, কিন্তু দারুন গুরুত্ত্বপূর্ণ। কাউকে পেলাম না, সিনিয়ার বয়স্ক অভিনেতারা অনেক টাকা চাইলেন, সিনেমার শুটিং এর আর মাত্র এক সপ্তাহ বাকি কিন্তু চরিত্র ঠিক হয়নি, এমন সময় তিন্নি ওরফে শ্রেয়শী চৌধুরী আমার বন্ধু এবং এই সিনেমার সহযোগী পরিচালক। তিন্নি বলল যে একজন আছে তার পরিচিত, যিনি কিনা আর্টিস্ট এবং তিন্নির এক বন্ধুর মামা। মামার ছবি দেখলাম এবং ঠিক করলাম যে একেই কাস্ট করব, প্রথমে কনফিডেন্স পাচ্ছিলাম না, অবশেষে তিন্নি ভরসা যোগালো ওনাকে কাস্ট করার বিষয়ে। ভদ্রলোকের নাম মিলন দেব, পেশায় ভাস্কর, নেশায় টুকিটাক অভিনয় করেন।যদিও আমরা পুরো শুটিং এ ওনাকে মামা বলেই ডেকেছি। ভদ্রলোক শুটিং এ কামাল করে দিলেন জাস্ট।

(ক্রমশ...)

প্রথম অংশ











   সুমন মজুমদার

Suman Majumder
Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS