The Making of 'Fading Clouds' : রঙিন মেঘের গান - ৩

‘Fading Clouds’

একটি ইন্ডি-ফিল্মের গল্প


ঙিন মেঘের গানঃ ৩

ফেডিং ক্লাউডস সিনেমাটির নেপথ্যে এমন অনেক মানুষ জড়িয়ে আছেন যাদের নিস্বার্থ পরিশ্রম ছাড়া এ ছবি সম্ভব হতনা। যেমন অনকুর। অনকুরের সাথে আমার আলাপ বহুবছর আগে। কিন্তু আবার নতুন করে বন্ধুত্ত্ব হল ফেডিং ক্লাউডস এর এক বছর আগে। আমি তখন পাই -এর সাথে ইন্সটলেশন আর্ট বোঝার চেষ্টা করি, এবং পাই একটি পার্ফর্মেন্স আর্ট ফেস্টিভ্যাল করে kipaf সেটি অরগানাইজে সাহায্য করি। ততদিনে আমি বুঝে গেছি যে, খুচরো ফ্রিলান্স করে খরচপাতি বেশ দিব্য চলে যাচ্ছে, কিন্তু কোনও ভবিতব্য দেখছি না। আমি ঠিক করলাম যেভাবেই হোক একটা সিনেমা বানাতে হবে, প্রোডিউসারের জন্য অপেক্ষার কোনও মানে হয়না। কোনও প্রোডিউসার একদিন সকালে ঘুম ভেংে আমাকে ফোন করে এক কোটি টাকা দেবেন না। অনকুরের সাথে এইসব আলোচনা চলছিল, তারপর ২০১৫র ভ্যালেন্টাইন্স ডে, অনকুর আমাকে বলল যে ওর পরিচিত এক ভদ্রলোক ইন্ডিপেন্ডেন্ট ছবি নিয়ে উতসাহী তার সাথে দেখা করার জন্য। সেইমতো আমি আর অনকুর সাউথ সিটিতে গেলাম সৌম্য দার সংে দেখা করতে। সেদিন সাউথ সিটি জুড়ে নবযুগলদের সেলফির হিডিক। খিল্লি করে আমি আর অনকুরও একটা সেলফি তুলে পোস্ট দিলাম। সৌম্যদার সাথে মিটিং হল, সৌম্যদা উতসাহিত করলেন প্রচুর।


বাড়ি ফেরার পথে অনকুর বলল স্ক্রিপ্টটা দ্রুত লিখে ফেলতে, কিন্তু আমার কপাল এবং অক্ষমতা যে আমি স্পেস না দেখে কিছুতেই ভাবতে পারিনা। লেখা আটকে যায়। আমার সিনেমাতেও তাই স্পেস একটি বিশেষ চরিত্র হয়ে ওঠে। যে কারনে আমি ঠিক সেট-এ শুটিং করতে পছন্দ করিনা। সমস্য বাড়ল, কিছুতেই লিখে উঠতে পারিনা আর অনকুর ততই খিস্তি করে। অনকুরের ভুমিকাটা বেশ মজার। ও একদিকে আমার বন্ধু, অপরদিকে এডিটর। শুধু সিনেমার এডিটর নয়, বরং অনেকক্ষেত্রে আমার অপরিমিত কথাবার্তা নিয়ে এডিট করে, খিস্তি দেয়।  যদিও তার পরিবার রাজনৈতিক কারনেই বাড়িছাড়া কিন্তু অনকুরের সবচেয়ে বড় গুণ বা দোষ সে কারো পক্ষপাতিত্ত্ব করেনা। বরং কড়া ভাষায় যুক্তিতে ঝেড়ে কাপড় পরিয়ে দেয়। অনকুর অত্যন্ত ক্রিটিক্যালি থিংকার এবং তার রাজনৈতিক অবস্থান নিয়ে বদ্ধপরিকর, একই সাথে উত্তুরে ফাজিল, যে ফাজলামির সাথে আমি ছোটবেলা থেকেই পরিচিত "শামবাজারে" বড় হওয়ার সুবাদে।
এমন এক সময় যখন আমার ব্যাংক এ মাত্র ১৭৮টাকা পড়ে তখন অনকুর একদিন হটাতই আমাকে নিয়ে গেল ববির বাড়িতে, সে গল্প আগেই বলেছি। কিন্তু যেটা বলা হয়নি যে আমার এই দুরাবস্থার সময় অনকুর এই মদ্যপান, খাওয়াদাওয়া ছাড়াও আমার পকেটে মাঝে মাঝেই কিছু টাকা গুজে দিত। যদিও তার পরিবারের অবস্থা এমন কিছু স্বচ্ছল নয়, তাও দিত। আমি জানি এই লেখাটি পড়ার পর অনকুর আমাকে সেই উত্তুরে ফাজলামির সুরে বলবে- এবার টাকাগুলো ফেরত দে বাওয়া!!
ববির বাড়ি আমার পছন্দ হয়ে গেল, যেন একটা মিসিং লিনক খুজে পেলাম গল্প আর চিত্রনাট্যে। অনকুর একজন ফিল্ম এডিটর এর পাশাপাশি আমার বিশেষ পরামর্শদাতা হিসেবে পাশে থেকেছে বরাবর এক অদৃশ্য গার্জেনের মতো।

তারপর একদিন সৌম্য দা বলল যে এভাবে হাতে হাতে ক্রাউড ফান্ডিং না করে একটি ওয়েবসাইট এর মাধ্যমে করতে। সেইমতো ওয়েবসাইটের পিচিং এ গেলাম আমি আর মৃন্ময়। অদ্ভুতভাবে পিচিং এ জিতে গেলাম এবং রানার আপ হলাম। এক বিশাল সাইজের চেক নিয়ে অনকুরের সাথে দেখা করতে চেরিপিক্সে এলাম। যেখানে সেদিন রাত্রে অনকুর কাজ করছিল। ছোটবেলায় স্কুলের ফুটবল ম্যাচ জিতে কাপ নিয়ে ফিরে আসার মতো ব্যাপার। বলে রাখা ভালো চেরিপিক্স হল সৌম্যদা আর পত্রাদির পোস্টপ্রোডাকশন হাউস। এরাই আমাদের ছবির পোস্টপ্রোডাকশনের দায়ীত্ত্ব নিয়েছেন। সেদিন রাত্রে চেরিপিক্সে আমরা তিনজন ছাড়া আর কেউই ছিলনা, তাই তিনজনে কি করে ছবি তুলব বুঝতে পারছিলাম না। অবশেষে আমাদের সিনিয়ার আরেক মৃন্ময় দা মৃন্ময় নন্দীর দেখা পেলাম, মৃন্ময়দা চেরিপিক্সের নিবিড় অংশ। একসময় আমাদের ছাত্রবেলায় মৃন্ময় দার ক্যামেরা দেখে অনুপ্রাণিত হয়েছি। মৃন্ময়দা আমাদের আগের প্রজন্মের একজন সেরা চিত্রগ্রাহক এবং আমাদের সত্যজিত রায় ফিল্ম এন্ড টেলিভিশন ইন্সটিটিউট এর সিনিয়ার। অনেক দ্বিধা কাটিয়ে মৃন্ময়দাকে অনুরোধ করলাম একটা ছবি তুলে দেওয়ার জন্য। একজন এমন মাপের চিত্রগ্রাহক এর হাতে ফোন ক্যামেরা দিয়ে ছবি তুলতে বলা যথেষ্ট অপমানজনক, কিন্তু মৃন্ময়দা হাসিমুখে ছবি তুলে দিলেন। আমি অবাক হলাম যে কি সাবলীল ভাবে মৃন্ময়দা সামান্য ভ্রুকুঞ্চন ছাড়াই হাসিমুখে এটা করলেন। বুঝলাম বড় মাপের মানুষেরা বোধহয় এমনই হন।



যেমন সৌম্যদা, সৌম্যদা নেশায় সিনেমা কিন্তু আসলে উনি আমাদের দেশের এক বড়মাপের স্ট্যাটিস্টিকস গবেষক। তার মার্কেট রিসার্চ সারা ভারতে অন্যতম। কিন্তু যেভাবে আমাদের সাথে কথা বলেন তাতে বোঝাই যায়না। সহজ ভাষায়, মজা করেন, আবার সিরিয়াস কথাও বলেন। জটিল বিষয়গুলিতে আমাদের ঢুকতেই দেন না, নিজেই জটিলতা ছাড়িয়ে উত্তরগুলি আমাদের দিয়ে দেন, সহজেই, বিনা আড়ম্বরে।
ছবি শুরুর আগে একদিন আমার আর অনকুরের সৌম্যদার সাথে দেখা করার কথা এদিকে অন্য একটি কাজ থাকায় আমার আর অনকুরের অনেক লেট হচ্ছে। সৌম্যদাকে একবার আলিয়াস ফ্রসে-র সামনে অপেক্ষা করতে বলি আবার উনি যখন সেখানে পৌছে গেছেন তখন বললাম পার্ক স্ট্রিট এর মিউজিক ওয়ার্ল্ড এর সামনে আসতে। যদিও মিউজিক ওয়ার্ল্ড দোকানটি বহুদিন আগেই উঠে গিয়ে কিসব রেস্টুরেন্ট না আইসক্রিম পার্লার হয়েছে, তাও এখনো আমরা আমাদের ছোটবেলার মিটিং/ডেটিং পয়েন্ট হিসেবে মিউজিক ওয়ার্ল্ড-ই বলি।
সৌম্য দা পার্ক স্ট্রিট এল, তার আগে অনকুর আমাকে টেনশনে যথেচ্ছ খিস্তি করে ফেলেছে যে আমি সৌম্যদাকে ঘোরাচ্ছি বলে। আমাদের দুজনের পকেটে সামান্য টাকা। সৌম্যদা প্রায় জোর করেই আমাদের ফ্লুরিজে নিয়ে গেল মিটিং করার জন্য। আমি কিছুটা কুন্ঠিত থাকি সবসময়। সৌম্যদা অনায়াসে তা কাটিয়ে দিল। অনকুর ইয়ার্কি মেরে বলল-  কি রে নিজেকে অঞ্জন দত্ত মনে হচ্ছে নাকি? ফ্লুরিজে প্রোডিউসার এর সাথে মিটিং? মিটিং হল পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে সর্বোচ্চ ১০ মিনিট কিন্তু খাওয়াদাওয়া চলল ৩০মিনিট।

প্রতি পদে যখনই কিছু প্রয়োজন হয়েছে সৌম্যদা অবলীলায় তার সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে, যেন এমনটাই তার করার কথা ছিল, যেন আমরা সিনেমা বানিয়ে দেশ উদ্ধার করে দিচ্ছি। হাসিমুখে অবলীলায় কোনো চুক্তি ব্যাবসায়ীক ভাগাভাগির গপ্পো ছাড়াই সৌম্যদা এসব করে গ্যাছে। কেন কি কারনে কেউ স্ক্রিপ্ট না পড়ে ছবির পোষ্ট প্রোডাকশন এর সমস্ত দায়ভার বহন করতে রাজি হয়ে যেতে পারে আমার জানা নেই। আমার বিশ্বাস কারোরই জানা নেই। কারন এমনটা কখনোই হয়না। কিন্তু হল, এবং কেন যে হল, তার উত্তর সৌম্যদা একমাত্র দিতে পারবেন। আমাকে দেখতে ইম্প্রেসিভ নয়, আমার আগে প্রচুর ফিল্ম এওয়ার্ড আছে এমনটাও নয়, কিন্তু তা সত্তেও সৌম্যদা তার পুরোটা দিয়ে এগিয়ে এলেন।

আমার মনে হয় আমাদের নামকরণের সাথে সাথে আমাদের মনে তার একটা প্রভাব পড়ে, তাই আমরা আজীবন চেষ্টা করি আমাদের নামের উপযুক্ত হয়ে উঠতে,নাহলে নাম পালটে ফেলি। যেমন হিমালয় হিমু হয়ে ওঠে। ব্যাক্তিগত অভিজ্ঞতায় দেখেছি মানুষ তার নামের মর্যাদা রাখে। সৌম্য দাও এমনই এক মানুষ যার সাথে কথা বললেই তার সৌম্য চেহারা এক অদ্ভুত পজেটিভ এনার্জি দেয় প্রত্যেককেই। আমরা চিত্রনাট্য লিখি বটে কিন্তু আমাদের অলক্ষে বসে বিধাতা কি সব অদ্ভুত লজিক মিলিয়ে আমাদের নিয়ে যে চিত্রনাট্য রচনা করেন তা বোঝার ক্ষমতা সত্যিই আমাদের নেই। আমরা শুধু অবাক হই! 









   সুমন মজুমদার

Suman Majumder
Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS