Jyotirmoy Shishu

Jyotirmoy Shishu

Tuesday, January 31, 2017

দ্রিম দ্রিম-৩ | মোমরঙ : দোয়েলপাখি দাশগুপ্ত

দ্রিম দ্রিম-৩ | মোমরঙ

একটা নিরিবিলি ঘরে দাঁড়িয়ে আছি আমি। পাশের হলঘর থেকে কোলাহল আসছে। লোকজনে গমগম করছে ঘরটা। হাসির হররা... ওয়াইন গ্লাসের টুংটাং... মোমের আলো। খাবারদাবার, সুগন্ধি... দামী পোশাকের, ভেলভেটের, সুয়েডের খসখস... আমি ঘরটার দিকে মুখ করে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছি। খুব কম সময়ের জন্য পাচ্ছি বাবাকে। এর মধ্যে যতটা দ্রুত গুছিয়ে নিয়ে দেখাতে হবে আমার কাজ। আমার কাছে ছাপানো কিছু কি আছে? আমি কোনও পোর্টফোলিও করেছি? আমার ক্যামেরা ভর্তি ছবি। প্রচুর ছবি। ডেভেলপ করিনি। ডার্ক রুমে ঢোকা হয়নি বহুদিন। কিন্তু আমি করছি বাবা। অনেক কাজ করছি। তুমি ব্যস্ত তাই... বাবা একবার এঘরে এলেন। উনি আমার সঙ্গে বেশি কথা বলেন না। কারওর সঙ্গেই না। বাবাকে ঘিরে আছেন প্রচুর মানুষ। আর্ট গ্যালারি, ক্রিটিক, ছাত্র অনেকে। এঁদের মাঝে আমার যাওয়ার কথা নয়।

      
কাঠের মেঝে। সেখানে লম্বা লম্বা ছায়া এসে পড়েছে মোমদানির। তিরতির করে কাঁপছে ছায়াগুলো। নরম হলুদ তেলরঙের মতো হয়ে আছে চারপাশ। কালচে খয়েরি একটা আবছায়ার মধ্যে আমি। মুখোমুখি বাবা। চেস্টনাট রঙের একটা সিন্দুকে হেলান দিয়ে দাঁড়ালেন। হাতে একটা গবলেট। বাবাকে দেখি আমি। সর্বাঙ্গে দামী পোশাক। দামী শুধু না, বিদেশি। স্প্যানিশদের মতো দেখতে লাগে বাবাকে। বাবার মুখ অন্য। চুল অন্য। উচ্চতাও যেন একটু কম। আমিও অন্য। পুরুষ একজন। যুবক। আমার গলায় ঝুলন্ত ক্যামেরা। তার স্ট্র্যাপ আঙুলে নিয়ে খেলা করি আমি। বাবা আমার দিকে তাকিয়ে থাকেন। তারপর... কয়েক মুহূর্ত পর হলঘরে ফিরে যান। আমি পিছন ফিরে এঘরের দেওয়ালের সামনে আসি। অন্ধকার ঘিরে ধরতে থাকে আমাকে। দেওয়াল জোড়া জানালা। ভারী পর্দা সরিয়ে আমি জানালার পাল্লা খুলে দিই। যতদূর চোখ যায় ততদূর জল। ঢেউ এসে নিঃশব্দে ভাঙছে কালো পাথরের দেওয়ালে, আঘাত করে করে। কালো জল। কালো... নিস্তব্ধ... বিরাট। দেখে মনে হয় কলকাতার বাড়ির নীচে একবার বন্যায় যেমন জল এসে দাঁড়িয়েছিল এক রাতে। মনে পড়ে দীঘার কটেজের সামনের মাঠে দোলনায় দুলছি আমি। ছোট। আমার কোলে একটা খেলনা। আর দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি ফুঁসছে, ফুলেফেঁপে উঠছে জল। প্রকান্ড ঢেউ এগিয়ে আসছে বালিয়াড়ি পেরিয়ে, হোটেলের গেট পেরিয়ে, পাঁচিল ডিঙিয়ে, লন পেরিয়ে আমার দোলনার দিকে। আমি মাথা উঁচু করে দেখছি দুটো লোহার চেন ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ করে দুলছে। আর তার অনেক ওপরে গোল হয়ে ঘুরছে গাংচিল।

জানালার সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ ভাবি আমি। কালো পাথরের এরকম কাসলে সিঁড়ি বেয়ে বেয়ে ঘুরে ঘুরে নেমেছিলাম আমরা এই কিছুদিন আগেও। আমি আর আমার কিশোরবেলার প্রথম প্রেম। হাত ধরে দুজনে। হাওয়া দিচ্ছিল আমাদের মুখে চোখে ঝাপটা। ওর চুল অনবরত উড়ে উড়ে এসে পড়ছিল মুখে। আমাদের ফ্রকের নীচগুলো উড়ছিল। হ্যাঁ তখনও তো মেয়েই ছিলাম আমি। কিশোরী। দোলনায় দুলছিলাম যখন, তখনও তো। আমার কোলে ছিল একটা পুতুল। কিন্তু এখন আমি যুবক। আমার উচ্চতা বেড়ে গেছে। নতুন উচ্চতা থেকে আমি দেখি পর্দাগুলো আর ভারী নেই। ছাইরঙা হালকা ফুলছাপ দেওয়া পর্দাগুলো দুলছে। আলতো হাওয়ায়। মৃদু। তার মোম, তেলরঙ, হলুদ চুঁইয়ে পড়ছে ঘরে। বাইরের কালো, শান্ত জল আর ভেতরের নরম হলুদ আমি ধরে রাখব ভাবি। আমার ক্যামেরা হাতে নিই।












দোয়েলপাখি দাশগুপ্ত
DoelPakhi Dasgupta