Jyotirmoy Shishu

Jyotirmoy Shishu

Tuesday, February 14, 2017

কয়েকটি কুকুরের চিৎকার : সুমন মজুমদার

কয়েকটি কুকুরের চিৎকার

তীর্থ ট্রেনে বাড়ি ফিরছিল। সকালে বেরিয়েছে দুই-তিনটে জায়গা ঘুরে, বেশ অনেকগুলো তামাক খেয়ে বেশ হাবুডুবু হয়েই ট্রেনে উঠেছিল শিয়ালদা থেকে। দশটা তিরিশের বনগাঁ লোকাল, এই নামে একটা সিনেমাও হয়ে গেছে বোধহয়। এসময় ভীড় থাকার কথা নয়, বসার সিট অন্তত পাওয়া যায়, যুদ্ধ না করেই। তীর্থ সিনেমা দেখতে ভালোবাসে, তবে আজকাল বিশেষত ডিসকভারি এবং ট্রেভেল চ্যানেল-ই সে দেখে। কি সুন্দর দেখায় চায়না অথবা ইস্টার্ন এশিয়া। সবুজ ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে সুন্দর হাসিমুখের মানুষ তাদের রঙ বেরং এর খাবার, জামাকাপড়। তীর্থ ঠিক করে রেখেছে যে সে এশিয়ার এই দেশগুলোয় একবার অন্তত যাবেই। আজকাল এমনকিছু কঠিন খরচপাতি-ও পড়েনা। দুবার কাসৌল যাবার পয়সা জমাতে পারলেই যাওয়া যায়।

তীর্থর তামাক খেয়ে নেশা হয়ে গেলে চশমাটা ভারি লাগতে থাকে, এসময় তার সন্দেহ হয় চোখের পাওয়ার কমে গেছে কিনা, অথবা তীর্থ মনে মনে ঠিক করে আগামী চশমাটা ফাইবার-এর বানাবে। কাঁচের ওজন ভারি। তীর্থর মনে হয় যেন চশমা পরে থাকার ফলে সে আশেপাশে কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছেনা, এ সময় মাথা ভারি লাগে, চোখ অন্ধকার হয়ে আসে। তীর্থ নিজেকে সামলে ফেলে এই সময়গুলোতে। চশমা খুলে ফেলে, গভীর শ্বাস নেয়। বেশি বাড়াবাড়ি হলে চোখে জল ছেটায়। অনেকদিন আগে ডাক্তার লো-প্রেশারের কথা বলেছিল, সেটাও একবার মনে পড়ে যায়।


শিয়ালদার পরের স্টেশন বিধাননগর রোড। বিধাননগর রোড থেকে একজন অফিস ফেরত লোক তীর্থর পাশের সিটে বসে। এবং বাকিদের মত অভ্যাসবশত নিজের মোবাইল ফোন নিয়ে ঘাটাঘাটি শুরু করে দেয়। তীর্থর মোবাইল ফোন এন্ড্রয়েড নয়। তার পুরানো ফোনে “সুপার জুয়েল কোয়াস্ট” নামের একটা খেলা আছে। সেটা আসলে রঙ মিলান্তি। তীর্থ অনেক বার খেলার চেষ্টা করেও জুয়েল পায়না। তবু অত্যন্ত বোর হলে সেটাই খেলার চেষ্টা করে, আবার বোর হয়ে সেটাও রেখে দেয়। 

দমদম স্টেশনে ট্রেনটি অনেকক্ষন দাঁড়িয়ে পড়ে সিগনালে। তীর্থ আড়চোখে দেখে পাশের সিটে বসা লোকটা মোবাইলে আসা ছবি দেখছে, একজন অফিস কলিগের আরেক অফিস কলিগের সাথে ঘনিষ্ট দৃশ্য, সাইবাবার ছবি এবং শেয়ার করার অনুরোধ, বিশালাকৃত স্তনবাহক মহিলা, দীর্ঘ লিঙ্গ বিশিষ্ট পুরুষ(চোখে সানগ্লাস পরে), নরেন্দ্র মোদির হাসিমুখ, সানি লিওন, সুন্দর খাবারের ছবি, বিশাল রিসর্টমার্কা বাড়ি, আবার নগ্ন মহিলা এবং আইসক্রিম, আবার নরেন্দ্র মোদি তবে এবার কমিকস। ভিডিওতে এক বোকা মানুষের ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাওয়ার প্র্যাঙ্ক, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের আবৃতি, দুজন মহিলা মারামারি করছে তার ভিডিও। ষাঁড়ের ধাক্কায় চিপে যাচ্ছেন এক বৃদ্ধ, তীর্থ আড়চোখে এগুলো দেখে আর জানালার দিকে মুখ ফিরিয়ে নেয়। এমনসময় ঘটিগরমওয়ালা পাস করার সময় তীর্থর পাশের ভদ্রলোক তার কাছ থেকে পাঁচ টাকার, বেশি করে ঝাল দিয়ে, গরম ঘটিগরম কেনেন। 

ঘটিগরম চিবোতে চিবোতে ভদ্রলোক একটি ভিডিও চালান। ভিডিওতে একটা খাঁচা থেকে একটি এশিয়ান ছেলে, একটি লোহার শিক দিয়ে অদ্ভুত কায়দায় খাঁচা থেকে মুরগির মতো একটা করে কুকুর বের করছে, লোহার শিকটির মাথায় একটা আঙটা লাগানো তাতে কুকুরগুলোর গলা আটকে যাচ্ছে, কুকুরগুলো প্রাণপণ চিৎকার করছে, তারপর ছেলেটি একটা লোহার লম্বা হাতলওয়ালা হাতুড়ি দিয়ে কুকুরটির মাথায় জোরে একটা বাড়ি মারছে, কিছুক্ষণের নীরবতা, কুকুরটির চিৎকার শোনা যাচ্ছেনা, তারপর আবার আরেকটি কুকুরের চিৎকার তারপর হাতুড়ির আওয়াজ।

তীর্থ ভিডিওটি শুরু হওয়ার সাথে সাথে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, কিন্তু কুকুরদের আওয়াজ তার কানে এসে এমনভাবে ধাক্কা মারছিল যে সে মোবাইলের দিকে না তাকিয়েও, পাশ থেকে ভেসে আসা মোবাইলের সাউন্ডে পুরো দৃশ্যটি দেখতে পাচ্ছিল, তার বমি পাচ্ছিল, চোখে অন্ধকার হয়ে আসছিল। তীর্থ আর থাকতে না পেরে পাশের লোকটিকে একরাশ ঘেন্না নিয়ে ভিডিওটি বন্ধ করতে বলল। ভদ্রলোক কিছুটা অবাক হলেন, একটু হাসির ঝিলিক উকি দিল তার মুখে, হাসিমুখে জানতে চাইলেন ওনার মোবাইলে উনি কি দেখবেন তাতে তীর্থর কোনও আলাদা অসুবিধা হচ্ছে কিনা? তীর্থ কি বলবে বুঝতে পারল না, সত্যিই ওনার মোবাইলে উনি কি দেখবেন তা ঠিক করে দেওয়ার অধিকার তীর্থর নেই। কিন্তু তীর্থ জানে এই সাউন্ডটা তার কানে এসে পৌছালেই, তার মাথা ঘুরতে শুরু করবে। বাজারে গিয়ে মুরগি কাটা দেখলে যেমন হয়। তীর্থ বলল ওনার মোবাইলে উনি যা ইচ্ছা করুন কিন্তু সাউন্ডটা অফ করে দিতে। কারন সাউন্ড কানে এসে পৌছালে পাশের লোক অর্থাৎ তীর্থর খুবই অসুবিধা হচ্ছে। ভদ্রলোক তাই করলেন। সাউন্ড অফ করে ভিডিওতে বাকি কুকুরগুলোকে মারার ভিডিওটি দেখতে শুরু করলেন। তীর্থ সিট ছেড়ে উঠে অন্য জায়গায় চলে যাওয়ার সময় লক্ষ্য করল ভদ্রলোক ও তার আশেপাশের সিটের লোকেরা তীর্থর দিকে মুচকি হাসি হাসছে।







সুমন মজুমদার

Suman Majumder