Jyotirmoy Shishu

Jyotirmoy Shishu

Monday, February 6, 2017

একটি শিকারকাহিনি : সর্বজিৎ ঘোষ

একটি শিকারকাহিনি

মলয় নামের সাদা বেড়ালটিকে যখন বসে থাকতে প্রথম দ্যাখে অনিমেষতখন সে ছিল একটা অটোতে।

এখানে এসে প্রথমবারের মতো গল্পটা একটা লাল ঘরে ঢুকে যায়। লাল ঘরের আলো ছিল নরম লালআসলে লাল ঘরটা ছিল গোলাপের দুই পাঁপড়ির ভিতর গভীরে কোন এক বিন্দুতে আলম্বিত। সেই লাল ঘরের মেঝেও হওয়া উচিৎ লালকিন্তু অনিমেষ লাল মেঝের ঘর শেষ দেখেছিল তার মামাবাড়িতেদোতলার পুব দিকের ঘরটায়। সেই লাল ঘরেই মামা মামির ফুলশয্যে হয়অনিমেষ তখন বছর বারোর। মামির ছেলে মেয়ে হয়নিমামি ছিল ভীষণ মোটামামি দুপুরবেলা একা একা ভুল বকতে বকতে কখনো পড়ে যেত সেই লাল ঘরের মেঝে ফুঁড়েগোলাপের দুই পাঁপড়ির মাঝের ঘরটায় এসে পড়তোতার পর আরো আরো গভীরেঠান্ডা বেরঙ অন্ধকারে ভেসে পড়তোযেন নীচ থেকে লক্ষ লক্ষ হাত মামিকে ম্যাজিক করে হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখছেম্যাজিশিয়ানদের হাত অল্প অল্প নড়ছেভীষণ লাল একটা কিছু ঢেউয়ের মতো লকলক করছে চারদিকে ঘিরে। মামা রাতে অফিস থেকে ফিরে মামিকে খুঁজে পেত নাচিলছাদে গিয়ে খিদে পেটে ঘুমিয়ে পড়তো। মামির পোষা দুটো বেড়াল ছিলযাদের একটা ছিল সাদার মধ্যে বাদামী ছোপছোপ। সেটা ছিল খুব রোগামানুষ হলে নিমাই বলে আওয়াজ খেতো এমন রোগাসেটা একগাদা বাচ্চা দিয়েছিল একবার। সেসব বেড়ালদের মধ্যে কারো নাম মলয় ছিল না বলেই অনিমেষের ধারণা।


এখানে এটুকু বলে নেওয়া প্রয়োজনমলয়ই যে বেড়ালটির একমাত্র নামগাড়ির নীচে ওভাবে অন্ধকারে বসে থাকা সাদা বেড়ালটির যে এক এবং একমাত্র মলয় নামেই অস্তিত্বএটা অনিমেষ জেনেছিল আপনাআপনি। যে মুহূর্তে বেড়ালটিকে সে দেখেছিলচারপাশে অনেক ধুলো আর খানিক শীতলতার মধ্যেথেমে থাকা একটা গাড়ির নীচে বর্ণহীন অন্ধকারে বসেছেকিংবা বেড়ালের সেই ভঙ্গিকে বসা নাম দিয়ে হেসেছিল অনিমেষতখনই তার ভিতরে অম্বলের মতো টকস্বাদ জন্মেছিল। অনিমেষ বোঝেনিসমস্ত স্বয়ং জানার স্বাদই অমন টক হয়। তারপর যে কয়েক পল হৃদয়ে টকস্বাদ নিয়ে অটোয় বসেছিল অনিমেষতার মনে হচ্ছিল মলয় নামের সাদা বেড়ালটির অমন যে বসার ভঙ্গিসামনের দুটি পা মাটির সাথে সাড়ে সাতাশি ডিগ্রি কোণ করে রাখাসে ভঙ্গিতে খানিক আক্রমণ আছে। এরপরেই অনিমেষের মাথায় ধাঁধা লেগে যায়সে বুঝতে পারেনা আক্রমণ কিংবা উদাসীনতাকোনটা আসলে বেশি আতঙ্কের।

রাস্তার ধারে সন্ধ্যেবেলা অমন এক সাদা বেড়ালের বসে থাকায় কীই বা আশ্চর্য থাকতে পারেকিংবা কী কারণে অনিমেষ রাস্তায় দেখেছিল আরো দুটো কুচকুচে কালো কুকুরযারাও খানিক একই ভঙ্গিতে অনিমেষের দিকে চেয়েছিলএকথা অনিমেষ ভেবে পায়নি। মলয় নামের সাদা বেড়ালটির সঙ্গে তার চোখাচোখি হয়েছিল কিনা একথাও সে জানে নাকিন্তু সে এও জানে নামলয়ের চোখ ছিল বর্ণহীন অন্ধকারের মতো। এমত অন্ধকারে আজকাল অনিমেষ উৎফুল্ল হয়আজকাল সূর্যের আলো চোখে পড়লে তার হাঁচি হয়এবং অনিমেষ জানে না মলয় নামের সাদা বেড়ালটি তাকে আজকেই প্রথম দ্যাখেনি।

এপ্রসঙ্গে বলে রাখা ভালআমরা অনিমেষকে মাঝেমাঝে হারু বলে ডাকব। হারু এবং অনিমেষ একই ব্যক্তিকিংবা তাদের মধ্যে এক অর্ধভেদ্য পর্দা রয়েছে। পর্দা নিয়ে কিছু কথা বলার আগে অনিমেষের বাড়ি ফেরার কথা আরো একটু জানাতে হয়। অনিমেষ জানে না সে কোত্থেকে ফিরছে। এটি একটি মিথ্যে কথা হতে পারতোকিন্তু মলয় নামের সাদা বেড়ালটিকে দ্যাখার পর অনিমেষ ভুলে গিয়েছে তার যাত্রাপথগন্তব্যভুলে গিয়েছে তার যাবতীয় উৎস এবং শুঁড়িখানা। পৃথিবীর যাবতীয় বেড়ালের প্রতিই খানিক উদাসীনতা নিয়ে এতদিন তাকিয়েছে অনিমেষ। অথচমলয় নামের সাদা বেড়ালটি বহুদিন তার সঙ্গে ছিলখেয়াল করেনি সে। অনিমেষের মনে পড়েযতবার ট্রেনে চেপে কোথাও যায় সেভীষণ ভিড়ে তার যেন হঠাৎ মনে হয় নিমেষে সমস্ত ট্রেন ফাঁকা হয়ে যাক। ফাঁকা ট্রেনের ছবি কল্পনা করতে গিয়ে অনিমেষ বারবার দেখেছে মলয়কেঠিক তার উল্টোদিকের সিটে বসে আছেকিন্তু এখন সেই দ্যাখা মনে করতে পারছে না অনিমেষ। অনিমেষ জানেতার কোনো বক্তব্য নেইসে জানে না চাষবাস এবং ভেলা নিয়ে একা ভেসে পড়ার সাহস তার নেইতার পকেটে তেত্রিশ টাকা রয়েছে আর রাত তিনটের সময়ে তার ইচ্ছে হয়েছে কখনো কখনো ঘর থেকে বেরিয়ে হেঁটে যেতে। অথচসেই যে অর্ধভেদ্য পর্দাঅনিমেষ কখনোই সে পর্দা ঠেলে হারুর কাছে যেতে পারে না। অনিমেষের তাই কেবল ভুলে যাওয়া আছেআছে কেবল মলয় নামক সাদা বেড়ালটিকে দেখবার সেই মুহূর্তটুকুযখন তার প্রথমবারের মতো নিজেকে খানিক সাকার মনে হয়।

অনিমেষের আপাতত কোনো সমস্যা নেই জীবনে। অনিমেষ জানে জল কীভাবে বৃষ্টিচক্রের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়এবং অনিমেষ এও জানে দিনের বেলা মশা কামড়ালে ডেঙ্গু হয়। এসব কোনোদিন অনিমেষ তলিয়ে দেখতে যায়নি। সে চিরকাল থেকেছে খুব শান্তকেবল ভেবেছে কীভাবে রাতে বাড়ি ফিরে ঘুমোবে। অনিমেষ কেবল উদ্বিগ্ন হয়েছে বিছানায় ছারপোকা হলেকিন্তু সেটুকু কেবল উদ্বেগই। সহাবস্থান শিখে নিয়েছে অনিমেষযেভাবে সে দেখেছে মলয় নামের সাদা বেড়ালটি তার সাথেই ফিরেছে ঘরেদরজা ঠেলে ঢুকেছে আর গুটিসুটি মেরে শুয়েছে অনিমেষের চৌকিতেযে পরিচিতির ভরসায় মৃতদেহ শ্মশানে ঢোকেঅনিমেষ ভেবেছে রাতের দিকে হয়তো মলয় ঘুমন্ত অনিমেষের টুঁটি কামড়ে ধরবেকিন্তু অনিমেষের কোনো উদ্বেগ হয়নিসে শুয়ে পড়েছে। তার মনে এসেছে সেই গলির কথাযেটা দিয়ে রোজ সকালে তার পথ তৈরি হয়সে গলিতে চ্যাটার্জী'স লেখা বাগানওয়ালা গাড়িওয়ালা প্রচুর রোদ্দুরসমৃদ্ধ বাড়িটার কথা ভেবেছে সে শুয়ে। এখানেই আমরা ভুল করে ভেবে নিতে পারিঅনিমেষ অমন বাড়িতে থাকতে চায়। কিন্তু আসলে অনিমেষ তার ছোট্ট ঘরের বাইরে আর কোথাও থাকার কথা ভাবতে পারে নাএমনকি ঘরের বাইরে বাকি বাড়িটাও তার কাছে খানিক মাত্রাহীন বিন্দুর মতোএক মুহূর্তে সেটুকু অতিক্রম করে অনিমেষ কেবল ফিরে আসে ঘরেমলয় নামের সাদা বেড়ালটিকে খানিক আদর করা উচিৎ কিনা ভাবেযেভাবে সে মামিকে দেখেছে বেড়ালদের আদর করতে। অবশ্য আদর শব্দে অনিমেষের আপত্তি আছেআজ অবধি অনিমেষ কাউকে আদর করেনিকাউকে আদররত অবস্থায় নিজেকে কল্পনা করতে পারে না সে। মাছ খায় না অনিমেষঅতএব মলয় নামক বেড়ালটির সাথে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা সখ্যে যাওয়ার কথা ভাবতে ইচ্ছে করেনি তার।

সুতরাংএও স্পষ্টখাওয়া ব্যতীত অন্য কোনো প্রশ্নে কারো সাথে সখ্য কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা ভাবেও না অনিমেষ। তবুওসবটা কি আর এড়ানো যায়! যে গলি দিয়ে রোজ সকালে তাকে যেতে হয়তাতে দুটো বাম্পার আছে পরপর। এই যে রোজ দ্বিতীয় বাম্পারে পৌঁছে সে সিগারেটে পঞ্চম টানটি দেয়এতে কি সেই দ্বিতীয় বাম্পারের সঙ্গে তার কোনো সখ্য স্থাপিত হয়নি! এটুকু ছুটকোছাটকা যোগাযোগ বাদ দিলেমলয় নামক সাদা বেড়ালটি ছাড়া অনিমেষ আর কিছু নিয়ে এতক্ষণ ভাবেনি। এমনকি নিজেকেও অনিমেষ কোনো চালাকজাতীয় পদার্থ হিসেবে ভাবেনিকিংবা করুণা করে বলেনি আজ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো। খাওয়া এবং ঘুম নিয়ে অনিমেষের কোনোদিন কোনো সমস্যা ছিল না। দোকানে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে কেবল খানিক বিরক্ত হয়েছে অনিমেষতার মনে হয়েছে দুনিয়াটা খানিক ফাঁকা হলে আরো ভাল হত। অবশ্যফাঁকা দুনিয়া নিয়ে সে কী করবেএ প্রশ্ন করলে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকবে অনিমেষ।

পশুপাখি নিয়ে অনিমেষ যেভাবে ভেবেছেসেভাবে আর কোনোকিছু নিয়ে নয়। যে লাল ঘরে অনিমেষ এযাবৎ বাসা করে আছেসেখানে এককালে বৃষ্টি হলেই দুটি ভিজে কুকুর আস্তানা চাইতো এবং অনিমেষ একদিন দেখেছিল একটি সাপ ভেসে বেড়াচ্ছে তার খাটের নীচে থইথই জলে। সাপটিকে মেরে ফেলার কথা ভেবেছে অনিমেষকিন্তু তার মামি সাপ পছন্দ করতো বলেই অনিমেষের বিশ্বাস। সুতরাংমামির কথা ভেবেই সাপ মারেনি অনিমেষভেবেছে মামির ঘরে এত জায়গায় কোথায় হারিয়ে যাবে সেই সাপ! অথচমলয় নামের সাদা বেড়ালটি ঘরে এসেই জাগিয়ে তুলেছে সাপটিকেশীতঘুম পার করা প্রবল ক্ষিধে নিয়ে সাপটি ধীরে ধীরে উঠে আসবে অনিমেষের বিছানায়। অনিমেষ হারুকে ডাকেহারু খুব ভাল সাপ ধরতে পারে। হারু যখন চানের পরে চুল আঁচড়ায়চিরুনির মোটা দিকটা দিয়ে জট পড়া ভিজে চুল উলটে দেয়সাপের বাঁশির মতো শব্দ হয়। অনিমেষ চেষ্টা করেছে সেই শব্দ না শোনারকারণ সেই অর্ধভেদ্য পর্দা পেরিয়ে শব্দ যাতায়াত করবার কথা ছিল না। অথচহারামজাদা শব্দ ঠিক ঢুকে পড়ে লাল ঘরেযেখানে মামি এসে থুতনি নামিয়ে বসেছিলমামি চোখ তুলে শোনে শব্দসাপের মতো অল্প অল্প দোলে বলেই অনিমেষের মনে হয়। অনিমেষের কখনও কখনও সন্দেহ হয়সমস্ত শব্দ এবং সুর আস্তে আস্তে মানুষকে সাপ বানিয়ে ফেলছে। এ বিশ্বাস নিয়েই সে ঘুমিয়ে পড়েছিলকারণ সে জানতো কিছুদিন যাবৎ তার জিভ চিরে আসছেসাপ হয়ে না গেলেও অন্তত বিষদাঁতে সে পৌঁছে যাবেইএবং তখন যতই সাপ মাঝরাতে তার চাদরের নীচে ঢুকে আসুকতার ঘুম ভাঙবে না অস্বস্তি কিংবা আতঙ্কে। মলয় নামক সাদা বিড়ালটি যেহেতু কোনো বেজি নয়কিংবা বেজির রূপ ধরতে পারে এমত কল্পনা অনিমেষ করেনিতাই সে ঘুমিয়েছিল সেই রাত্রে।

অনিমেষের মনে পড়েআজ পর্যন্ত তেইশ লক্ষ তিপান্ন হাজার সাতশো বিয়াল্লিশটি মশা সে মারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। অবশ্যপ্রথমবারের চেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ার পর আবার চেষ্টা করে করে সে যেসব মশাদের মেরেছেতাদের কথা এই হিসেবে ধরবে কিনা একথা অনিমেষ ভেবে পায় না। খেয়াল করলে দেখা যায়মশাদের সাথেও গুনগুনানির সম্পর্ক রয়েছে। কেবল মলয় নামের সাদা বেড়ালটি কখনও সুরের কথা ইঙ্গিত করেছিল কিনাএতক্ষণে অনিমেষ আর তা মনে করতে পারেনি। যে মশারা তার উদ্যত চাপড় এড়িয়ে গেছেতারা যে কোনোদিন তার উপর প্রতিশোধ নেবেএকথা অনিমেষ ভাবতে পারেনা। এরকম কেবল গল্পেই হয়যাবতীয় হত্যা এসে টুঁটি চেপে ধরেসেকথা অনিমেষ জানে। অথচএতদূর কৈফিয়ত নিজেকে দেওয়ার কী প্রয়োজনমলয় নামের সাদা বেড়ালটির কাছেই তা জিগ্যেস করে ফেলেছিল অনিমেষ। বেড়ালটি তখন হাই তুলেছিল এবং ডান পা তুলে কান চুলকেছিলঅনিমেষ আর কিছু দেখেনি।

মাঝরাতে ঘুমের মধ্যে অনিমেষের যখন মাথা ধরেসে কি আদৌ বুঝতে পারে সে আসলে ঘুমোয়নিকেবল চোখ খুলে অপেক্ষা করেছে কখন মলয় নামের সাদা বেড়ালটি তার চোখে তাকাবে! অথচ বেড়ালটি স্মিতমুখে তাকিয়ে আছে তার দিকেইঅন্ধকারে অনিমেষ আন্দাজ করে তার সাদা রঙের গাঢ়তা পাল্টাচ্ছে। বেড়ালটির চোখ জ্বলার কথা অন্ধকারে। অনিমেষ ভাবেতাহলে কি যথেষ্ট অন্ধকার সে সৃজন করতে পারেনি তার ঘরেঅনিমেষ এবং হারু চিরকাল গর্ব করেছেঅন্ধকারে তাদের লাল ঘর বেশি উজ্জ্বল হয়। অথচসকাল হল যখনঅনিমেষ দেখলবাইরের আলো ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছেলাল রঙ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে তাদের ঘরেআর সাদা মলয়ের লোম ক্রমশ হলুদ আর আলোবিচ্ছুরণকারী হয়ে উঠছে। অনিমেষ সিদ্ধান্ত নেয়এত রোদে বাইরে বেরোনো যাবে না।

সুতরাংযে গতিতে সকাল হলোঅনিমেষ খানিক হাঁপিয়ে গিয়েছে সে গতির সাথে তাল রাখতে। অবশ্যতাল রাখতেই হবে এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি। কিন্তুতাল রাখার চেষ্টা করার অভ্যাস অনিমেষের মজ্জাগতযেমন এই হাঁপিয়ে যাওয়া এবং ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে পড়তে দ্যাখারেসের প্রথম লোকটা শেষতম প্রতিযোগী অনিমেষকে বারবার পেরিয়ে চলে যাচ্ছেএই লালঘরে সেসব কিছু তো নেই। লালঘরে অনিমেষ যদি থাকতে পারতো সবসময়যদি তার সেঘরে ঢোকা-বেরোনো নির্ধারিত হতো কেবল তারই ইচ্ছেয়তাহলে অনিমেষ নিঃসন্দেহে মামিকে থাকতে দিতো তার এই লাল ঘরে। মামির সাথে তার কোনো সখ্যই গড়ে ওঠেনিযেভাবে গড়ে ওঠেনি হারুর সাথেএই দুই গড়ে না ওঠাকে অনিমেষ এক শ্রেণিতে ফেলতে চায়। মলয় নামের সাদা বেড়ালটিকে যে হত্যা করতেই হবেনয়তো ঘরে অন্ধকার আসবে না তেমনএকথা অনিমেষ হঠাৎ বুঝতে পারে এবং আহ্লাদিত হয়যেন এই সমাধানই সে চেয়েছে এতক্ষণ।

অতঃপর অনিমেষ জেগে জেগেই একটি স্বপ্ন দেখছিল। সে দেখছিল, (স্বপ্ন প্রসঙ্গে 'দ্যাখাশব্দের প্রয়োগে অনিমেষ নিজেকে দীন ভাবে) কোনো এক কুয়াশাঘেরা সকালে শহরের পথে পথে কোনো গাড়ি নেইকেবল মানুষ আর তাদের নিজস্ব মলয় নামের সাদা বেড়ালরা হাঁটছেকিংবা হাঁটছে কেবল মানুষেরা আর বেড়ালরা বসে আছেযাবতীয় চলমানতাকে কাঁচকলা দেখিয়ে অনিমেষ দেখেছিল একটি শহর কেমন ক্রমশ চলবার ভ্রমে আক্রান্ত হচ্ছেআর এক এক করে মানুষ উবে যাচ্ছে। মলয় নামের সাদা বেড়ালরা তখনো নিশ্চলযেন কোনো মন্ত্র পড়ে কিংবা তুকতাক করে মানুষদের ফিরিয়ে আনতে তারা সক্ষমঅথচ সেসবে তাদের প্রবৃত্তি নেই। অনিমেষ তখন ছুরি খুঁজতে যায়হারু যে দীর্ঘদিন ছুরি চালানো প্র্যাক্টিস করেছেআর ক্রমশ রক্তাক্ত হতে হতে অনিমেষ ভেবেছে বিছানায় ছারপোকার বাড় বেড়েছেএতসব ইতিহাস মুহূর্তে অভিনীত হয়। ছুরি নিয়ে মলয় নামক সাদা বেড়ালটির রগে বসিয়ে দেয় অনিমেষবেড়ালটি ক্রমশ লাল হতে থাকে আর ঘরের সমস্ত লাল রঙ শুষে নিতে থাকেএতকিছুর মধ্যেও অনিমেষ ভাবে ছেলেবেলায় পড়া শিকারকাহিনি আর পায় না কেন বাজারে। ঘর ক্রমশ অন্ধকার হলে অনিমেষ ঘুমিয়ে পড়েমলয় তখন লাল ও উজ্জ্বল দেহ নিয়ে ক্রমশ আবছা হয়ে আসেঅনিমেষের বিছানার চাদরে ছাপা একরৈখিক বেড়ালের ছবি দেখে মুচকি হাসে মলয়।

অনিমেষ যখন জেগে উঠলোতার ভীষণ রাগ হয় চারপাশের উপরকারণ চারপাশ ছিল বর্ণহীন। অনিমেষ তখন হত্যার সাধনায় বসেকারণ কেবল হত্যাই রঙ ফিরিয়ে দিতে পারে সহজে। কিন্তুমলয় নামক বেড়ালটি মৃত্যুমুহূর্তে কিছু অভিশাপ দিয়ে গিয়েছিল অনিমেষকে। অনিমেষ ক্রমশ জানতে পারেসে চাওয়ামাত্র যে কাউকে হত্যা করতে পারবেকেবল ইচ্ছেটুকুর জোরে। নিজের ভিতরে টক স্বাদ অনুভব করে অনিমেষ।               

(দ্বিতীয় পর্বে সমাপ্য)














সর্বজিৎ ঘোষ
Sarbajit Ghosh