Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS

একটি শিকারকাহিনি-র শেষ পর্ব : সর্বজিৎ ঘোষ

একটি শিকারকাহিনি-শেষ পর্ব

কল্কিকথা
প্রথম প্রথম সারাদিন একটা ঘরে নিজেকে আটকে রেখেছে অনিমেষ। আশ্চর্য হয়ে সে অনুভব করেছে, ক্রমশ খিদের ভাব চলে যাচ্ছে তার, চলে যাচ্ছে ঘুম। এমনকি আগুনে তার হাত পুড়ছে না, খোলা তারে হাত দিলে ঝটকা খাচ্ছে না। তার কুঁচকিতে যে প্রচুর চুলকানির দাগড়া দাগড়া ছোপ ছিল, রক্ত গড়াতো আর ইস্কুলে সাদা প্যান্টে সেই দাগ দেখে হেসেছিল আর চাঁটি মেরেছিল ক্লাস ফাইভের কিছু নিষ্পাপ শিশু, সেসব চুলকে আর তার আরাম হয় না। ঘড়ি ধরে একবার দম আটকে রেখেছিল, তিনশো ছাপান্ন ঘন্টা বাহান্ন মিনিট উনতিরিশ সেকেন্ড পর একঘেয়ে লাগায় বিরক্ত হয়ে দম নিতে শুরু করে আবার। এসবের মধ্যে কাজের কথা একটাই, ঘুম না হলেও ঘুম তার পাচ্ছিলই, পেয়েই চলেছিল। যাবতীয় সময় তার কেবল ঘুম পেতে থেকেছে, কিংবা এই গোটাটা, এই যাবতীয় ঘর-ঘুম-আগুন-নিঃশ্বাস সবই এক ঘুমের মধ্যে ভাবতে থাকা যে এবারেরটা অন্তত স্বপ্ন নয়, এইতো যা হচ্ছে সত্যিই হচ্ছে, এরকমই তো হয়...
কেবল এই ঘুম পাওয়ার বিরক্তিতেই বাইরে এসেছিল অনিমেষ। সময়ের হিসেব ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে, তার কেবল মনে পড়ে নিজেকে সে শুয়ে থাকতে দেখেছে, প্রবল ঘুমে চোখ বুজে আসতে দেখেছে, অথচ ঘুমোতে দেখেনি। এখানেই মনে পড়ে, সে যেন কীভাবে নিজেকে দেখে চলেছে, যেন একটু দূরে দাঁড়িয়ে, ছোলাভাজা চিবোতে চিবোতে তার মনে হচ্ছে নিজেকে দেখে গাড়ল ও প্রতিভাবান, নিজেকে শুয়োরের বাচ্চা বলে সে গাল দিচ্ছে এবং ভাবছে এই শটটা খানিক অল্প চিপ করে মারতে হতো, কিংবা গাল দেওয়াও আসলে তার ভান, তার আদতে কিছুই যায় আসে না। সুতরাং প্রবল ঘুমের তাড়নায় অনিমেষ মনে করতে পারেনি, সে কীভাবে ভাসতে শিখেছিল বাতাসে, মনে করবার কথাই মনে পড়েনি তার। কেবল বাইরে এসে অনিমেষের মনে হয়েছিল, খানিক সর্ষের তেল পেলে চোখে ডলে দেখতে পারে সে, যদি ঘুম পাওয়া থেমে যায়।
সুতরাং সেসময়ে সারা পৃথিবীর কাজ চলেছিল একেবারেই নিজের নিজের তালে, যা যা চলা থামিয়েছিল সেও কেবল তখন তাদের থামার কথা ছিল বলেই। এককথায়, সবই পূর্বনির্ধারিত বলে অনিমেষ ভেবেছিল, এবং তার ভাবনা দিয়েই এরপর থেকে সব প্যাঁচ খেলা হবে। অনিমেষ ঘুমচোখে চলে গিয়েছিল বাসস্ট্যান্ডে, আর বাসে উঠে খেয়াল করেছিল এখানে সর্ষের তেল পাওয়া যায় না এবং এখানে বড় ভিড়। 'ঘুম পাচ্ছে', একঘেয়ে গলায় সে বলেছিল। কেউ তার কথা শোনেনি, বরং পাশের মেয়েটি তার দিকে কড়া চোখে তাকিয়েছিল, ঢুলন্ত অনিমেষ তার গায়ে ঢলে পড়েছিল বলে। ঠিক সেইমুহূর্তে অনিমেষ প্রথম রাগতে দ্যাখে নিজেকে। এমনিতেই তার মনে হতো এতদিন ধরে, রাস্তায় যে কোনো পাঁচজন মানুষকে চড় মারলে ষষ্ঠজন তোমায় যেচে এসে পাঁচটাকা দিয়ে যাবে, এভাবে কত রাত সে কেবল ব্যথার হাতে বোরোলিন লাগিয়ে কাটিয়েছে, আর সেসব রাগ তার মাথায় চড়ে গেল মেয়েটিকে কড়া চোখে তাকাতে দেখে। অনিমেষ ভীষণ জোরে চকাস শব্দে মেয়েটির ঠোঁটে চুমু খায়, দুহাতে মেয়েটির মাথা চেপে ধরে, এবং আরেকটি চুমু খাওয়ার আগে যখন মেয়েটি মোচড়ামুচড়ি করছে আর বাসের লোকেরা চকিত হয়ে মজা দেখছে, অনিমেষ বলে, এক্ষুণি চাইলে দুচোখে আঙুল ঢুকিয়ে দিতাম, কিংবা ন্যাংটো করলে তো দেখব সেই এক বিচ্ছিরি দলা দলা মাংস, অতএব জামা পরিয়েই যে চুমু খাচ্ছি এতে খুশি হও মেয়ে। এখন, এতসব কথা অনিমেষ মুখে উচ্চারণ করেনি, বাসের মানুষ তাকে প্রচণ্ড হইহট্টগোলে ঢেকে ফেলছিল বলে তার বিরক্ত লাগতে শুরু করে, সে লহমায় দেখতে পায় ইঞ্জিনের উপর মলয় নামের সাদা বেড়ালটি, এবং অনিমেষ উচ্চারণ করে


এই বাসের সব লোক মরে যাক
এই যে এত ভিড়, এসবই তার কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়, এবং তার উচ্চারণমাত্রেই বাস থেকে সমস্ত লোক উবে গিয়ে আশ্চর্য শান্ত হয়ে আসে বাস। অনিমেষ সেই ফাঁকা বাসের পেছনের সিটে গিয়ে শুয়ে পড়ে, এবং এই এতদিনের দীর্ঘপ্রার্থিত ঘুম আসে তার।
অথচ, অনিমেষের মনে পড়বে ঘুম ভাঙলে, সে এরকম ছিল না। অবশ্য এরকম হয়ে যে তার কোনো আফসোস আছে তা নয়, তাও, যেমন কিছু জানা এড়ানো যায় না, তেমনই অনিমেষ এটাও জানবে। ছোটবেলায় তার বাড়ির দরজার পাশে কিছু বাঁশ আর লাঠি জমিয়ে রাখতে দেখেছে সে, দেখেছে কেমন পুরনো ঝুল তাদের গায়ে আর তাদের আড়াল থেকে কোনো কিম্ভূত পোকা বেরিয়ে আসবে, এমনই ভেবেছে সে ছোটবেলায়। তাকে জানতে হয়, এসব বাঁশ আর লাঠি এখানে এনে রেখেছিল তার বাবা, ১৯৯২ সালে, যখন তাদের পাড়ায় শোনা গিয়েছিল কলাবাগানের দিকে মোল্লারা অসময়ে আজান দিচ্ছে, আর কে যেন এসে বলেছিল, ওরা আসছে, তৈরি হও, মা বোনেদের ইজ্জত বাঁচাতে হলে ভাইসব... সেই থেকে অনিমেষ ভেবেছে, ওই লাঠি আর বাঁশেদের পেছনে, কোনোদিন যেখানে ঝাঁট পড়ে না, পোকাদের আস্ত একটা কলোনি আছে, অন্ধকার। ছোট থেকেই আরশোলার ডিম খুঁজে পেলে সেটা ফাটিয়ে মজা পেয়েছে অনিমেষ, আর তার পাতলা বাদামী খোলাটাকে প্রবল ঘেন্নায় গুঁড়ো করেছে। অথচ, এতসব সত্ত্বেও হত্যার পর মৃতদেহ সরাবার পদ্ধতি তার জানা ছিল না। যত খুন ধরা পড়ে, তা ধরা পড়ে আসলে মৃতদেহ লুকোবার অক্ষমতায়, হুমায়ুন আহমেদের কোন একটা গল্পে সে এরকম পড়েছিল --- মনে পড়বে তার। সুতরাং, তার বকেয়া আছে এখনো অব্ধি তেইশ লক্ষ তিপান্ন হাজার সাতশো বিয়াল্লিশটি হত্যা, কারণ ঠিক এতজনকেই তার কখনও না কখনও খুন করবার প্রবল ইচ্ছে হয়েছে, পারেনি কেবল মৃতদেহ লুকোতে শেখেনি বলে। নয়তো, কেবল নাকে ঘুষি মেরেই সে কিছু লোককে মেরে ফেলতো, আর প্রচুর লোকের আঙুল কামড়ে ছিঁড়ে নিতে পারতো।
অথচ, এক বাস মানুষের হত্যার বিনিময়ে পাওয়া যে ঘুম, যে ঘুমে অনিমেষ বারবার দেখেছিল মলয় নামের সাদা বেড়ালটি তার মাথার কাছে বসে আছে, থাবা চাটছে জিভ দিয়ে, সেই ঘুম তার টিকলো না। ঘুম ভেঙে যাওয়া মাত্র অনিমেষ দ্যাখে কোনো এক স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার জায়গায় বাসটা ভাসছে, এবং সে আন্দাজে বোঝে ব্যাপারটা ঘটছে জলের তলায়। এখন, জলে থাকার জন্যই তার ঘুম ভাঙল কিনা, কিংবা বাসটির ড্রাইভারসুদ্ধু মরে যাওয়ায় ব্রীজ ভেঙে জলে পড়েছে কিনা বাস, এতসব অনিমেষ ভাবেইনি। সে কেবল ভেবেছে তার ঘুম ভাঙার কারণ কী হতে পারে, এবং ভেবে ভেবে যা আবিষ্কার করেছে তা এইরূপ:
যে ঘুম আমার সবসময়ে পায় তা আমাতে নিয়ে আসবার একমাত্র পথ হত্যা, কারণ হত্যাই আমায় ঘুমছাড়া করেছে এবং হত্যাই আমায় ঘুমগ্রস্ত করে রেখেছে সর্বক্ষণ, অতএব আমায় হত্যার বিনিময়ে ঘুমে পৌঁছতে হবে, আর লাশ সরাবার কিংবা গুলি খাওয়ার কিংবা ফাঁসি যাওয়ার ভয় নেই যখন, তখন খানিক ঘুমের জন্য কিছু হত্যা করে ফেলা এমন কিছু খারাপ নয়, বিশেষত প্রাণসৃষ্টির আদিমতম উপাদানগুলির মধ্যে হত্যা স্বয়ং আছে, আর হত্যার মাধ্যমেই সমস্ত তর্কের অবসান ঘটানো সম্ভব, সমস্ত দ্বন্দ্বের শেষে হত্যা, সুন্দর অসুন্দর লাল সাদা কালো মোটা সবই মিলিয়ে যায় হত্যায়, বিশেষত কোনো লাশ যখন আমার হত্যায় পড়ে থাকে না, আমি লাশসুদ্ধ অদৃশ্য করে দিই হত্যার সাথেই, অতএব যা পড়ে থাকে তা এক অপরিসীম শূন্যতার দিকে নির্দেশ করে, যে শূন্যতায় পৌঁছতে পারলে এক অনন্ত ঘুমে আমি অধিকার পাবো, অতএব এ জগতকে শূন্য করে, কীট পশু পাখি গাছ নারী পুরুষ শিশু বুড়ো বুড়ি সবসুদ্ধ হত্যা আর অদৃশ্য করে আমি খানিক ঘুম পেতে চাই, যে ঘুম ভেঙে উঠে আসবার কোনো কারণ আর থাকবে না

মলয় নামের সাদা বেড়ালটি যা যা জানিয়ে দিয়েছিল অনিমেষকে:

হত্যা করতে হবে কোনো রাগ থেকে, বিরক্তি থেকে, ভয় থেকে, যদিও ভয় অনিমেষের পাওয়ার মতো আর বাকি নেই।

অনিমেষ একমাত্র মলয় নামের সাদা বেড়ালটিকে ভয় পায়, কারণ ওকে অদৃশ্য করে দেওয়া চলে না, একবার মৃত ও অদৃশ্য যখন আবার ফিরে আসে, তাকে পুনরায় হত্যা করতে অনিমেষের বিবেকে বাঁধে। এপ্রসঙ্গে অনিমেষ জানে না, তাকে খুঁজছে তাবড় রাষ্ট্রনেতারা , কারণ তারা সবাই তাকে হত্যা করতে চায়, কারণ তারা জানে অনিমেষ চাইলে যাবতীয় যুদ্ধ শেষ করে দিতে পারে লহমায়। এদিকে মলয় নামের সাদা বেড়ালরা যখনই আসে, তারা যে মৃত্যুর পরেরই অবস্থা, এমনকি প্রথম দেখা হওয়ার সময়েও মলয় নামের সাদা বেড়ালটি মৃত্যু থেকে ফিরে এসেছিল --- একথা জেনে অনিমেষ বিশেষভাবে ভয় পায়। আর রাষ্ট্রনেতারা অনিমেষের উপর হামলা করতে থাকে, আর অনিমেষের গায়ে গুলি লাগে না বোম লাগে না ছুরি ঢোকে না বিষ হজমিত হয় তার ভিতরে
অগত্যা ঘুম পাওয়া চোখে অনিমেষ খুঁজতে শুরু করে তার রাগের কারণসমূহ। প্রাইমারি ইসকুলের স্যার বিকাশবাবু একদিন তাকে উদমা ক্যাল দ্যান, কারণ দেওয়ালে আচড় কেটে আঁকাবাঁকা অক্ষরে লেখা "আন্টির ছেলে বোকাচোদা" সে জোরে জোরে পড়েছিল ক্লাসে। গতকাল বিকাশবাবুর বাড়ি গিয়ে অনিমেষ বলে এক গ্লাস জল খাবো, তারপর বিনা ভূমিকার জানায়, দেওয়ালে আসলে অতিরিক্ত বাঁকাচোরা অক্ষরে ও ভুল বানানে খানকির ছেলে লেখা ছিল, (খিস্তির বানান ভুল ধরতে কাউকে দেখিনি আমি) সে তার ক্লাস ওয়ানের অর্জিত বিদ্যায় যা বুঝতে পারেনি। তারপর বিকাশবাবুর নাম  করে সে মুঠি পাকায়

মৃত্যু হোক শালা, ক্যালাবি আমায়!
যেমন এর মধ্যে একদিন অনিমেষ গিয়েছিল পাহাড়ে, ওর আজকাল সূর্যাস্তে বেশ ভাল লাগে, রাগটা যেন খানিক বেশি হয়, সেই রাগের হত্যায় বড় আরাম। অথচ, সূর্যাস্তের সঙ্গে হত্যার কী সম্পর্ক তা নিয়ে অনিমেষ ভাবেনি, সে কেবল সন্ধ্যে নেমে আসাকে পছন্দ করতো না, তার মনে হতো সন্ধ্যে নেমে আসা মানা ঘুমের সময় হয়েছে এটা জানিয়ে দিচ্ছে কেউ, যে জানে অনিমেষের কেবল ঘুম পায়, আর ঘুমোতে গেলে তাকে হত্যা করতে হয়। পাহাড়ে সে কিছু মানুষকে খাদে ফেলেছিল, নিজেও ঝাঁপ দিয়েছিল তাদের সাথে, ক্রমাগত পাথরে ঠোক্কর খেতে খেতে মানুষগুলি যখন মাংসপিণ্ড হয়ে যেত কিংবা ময়দার লেচি, তখন অনিমেষ পাহাড় বেয়ে পড়তো যেন পার্কের স্লিপ চড়ছে, আর বাচ্চাবেলায় বিকেলের খেলার পর বাড়ি ফিরলে যেমন দেখতো মা ময়দা মাখছে তেমন হয়েছে মানুষদের চেহারা, অনিমেষ পাহাড়ের নীচে ঘুমিয়ে নিত টানা কয়েক সন্ধ্যে, আর মনে ভাবতো ছোটবেলায় সিনেমায় দ্যাখা একটা গান :
ময়দা এখন যদি হতে জলখাবারে লুচি পেতাম
পাহাড়ের ঢালে, ভীষণ শীতে আর কুয়াশায়, যে শীতলতা তার কাছে আরাম, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে লুচির স্বপ্ন দ্যাখা তারপর তার অভ্যাস হয়ে যায়
অনিমেষের রাগ হয় অতঃপর চারপাশের কিছু জীবজন্তুর ওপর। প্রথমেই সে তার বাড়ির সামনের ঝাঁকড়া অশ্বত্থাগাছটা হাপিস করে দেয়। এমনিতে মানুষ মারার চাইতে গাছ মারায় ঝক্কি বেশি, কিন্তু অনিমেষের দীর্ঘ রাগ ছিল গাছটির প্রতি, যে সময়ে সে রোজ অফিস থেকে ফিরতো আর গাহচের তলাটা পাখির হাগায় সাদা হয়ে আছে দেখতে পেত, আর দেখত তার কার্নিশে অশ্বত্থচারা গজাচ্ছে, তার বাড়ির পাঁচিল বাকিয়ে করতে হয়েছে বাড়ি তৈরির সময়ে, আর অনিমেষ যেহেতু গাছ কিংবা পাখিকে নিয়ে কাব্য কিংবা শোক দেখায়নি কখনও, কাজেই সেসব তামাদি হওয়া রাগ থেকে সে গাছটিকে উধাও করে দেয়, আর গাছ নিঃশব্দে উধাও হলেও তার হাজার হাজার পাখি আর কাঠবিড়ালি চেঁচাতে থাকে আর ঝটপট করতে থাকে উড়তে থাকে। সশব্দ হত্যায় ঘুমের ব্যাঘাত হতে পারে ভেবে অনিমেষ পাখি আর কাঠবিড়ালীদের উধাও করে দেয়, আর গভীর ঘুমে থাকাকালীন পাড়ার কত মানুষ তাকে অভিনন্দন জানাতে এসেছিল হতচ্ছাড়া গাছটা উধাও করা গেছে বলে, পাড়ার যাবতীয় বেদী গাছটা ফাটিয়ে দিয়েছে বলে, অনিমেষ সেসব অভিনন্দন গ্রহণ করতে পারেনি ঘুমের ভেতর।
অথচ চারপাশের মানুষ অনিমেষকে নিয়ে ভয় পায়নি, কারণ হত্যার বীভৎসতা অনিমেষের ধাতে নেই। মরা কী সহজ আর উৎফুল্লতায় স্বাদু, সেকথা আমাদের বুঝতে বড় দেরি হয়ে গেছে। অনিমেষের কাছে তেমন তেমন শনি মঙ্গলবারে, পনেরোই আগস্ট কিংবা বাইশে শ্রাবণে মরার লাইন পড়তো কতো! কতো দূর দূর থেকে মানুষ এসেছে, যারা সীমান্তে যুদ্ধে যেতে পারে না, সিয়াচেনে যাওয়ার পথে যারা বারবার ফিরে এসেছে মন কেমন করেছে বলে, তার লজ্জায় অনিমেষের কাছে মরতে আসে, আর চারপাশে সমাজে সংসারে বলে আসে দেশের জন্য প্রাণ দিতে চললাম। এমনিতে অনিমেষ দেশকে ভালবাসে, কিন্তু কানের কাছে দেশ দেশ বলে চ্যাঁচালে তার একদিন ঘুম ভেঙে গিয়েছিল আর সে বেরিয়ে এসে একসাথে যাবতীয় মুমূর্ষুকে মৃত্যু দিয়েছিল। আর একবার অনিমেষের মনে হয়েছিল সিনেমা হল আর রাস্তাঘাট আরো ফাঁকা হওয়া উচিৎ, এবং যারা সব ব্যাঙ্কের সামনে লাইন দিয়ে ঘামছিল আর যারা সিনেমা হলে উঠে দাঁড়িয়েছিল জাতীয় সংগীতকে শ্রদ্ধা জানাতে, অনিমেষ তাদের গায়ে দীর্ঘদিনের টক ঘেমো গন্ধ পেতে থাকে, এবং যাবতীয় ব্যাঙ্ক আর সিনেমা হল জনশূন্য করে সে একটি আঁতেল সিনেমা চালাতে আদেশ দেয় হলমালিককে, আর পেছনের সিটে ঘুমিয়ে পড়ে, আর এটা বলতে ভুলে গেছি যে ঘুমোলে ছোটবেলা থেকেই অনিমেষের নাল গড়ায়
ক্রমশ চালাক হতে থাকে অনিমেষ। একবার এতই রাগ হয়েছিল তার, পাড়ার একটি ল্যাম্পপোস্ট দেখে মনে হয়েছিল খানিক বাঁকানো, অথচ ল্যাম্পপোস্ট তো বাঁকানো থাকার কথা নয়, দুম দুম করে অনিমেষ প্রবল ঘুষি মারতে থাকে ল্যাম্পপোস্টের গায়ে, আর চিৎকার করে জানতে চায় কালোবাজারিদের ফাঁসির হিসেব। কালোবাজারিদের উপর রাগ ছিল না তার, এরকমই অনিমেষ জানে, কারণ কালোবাজারিদের কথা সে ভুলে গিয়েছিল, তাদের এসব ভুলে যাওয়া দেখেই মলয় নামের সাদা বেড়ালটি মিষ্টি হেসেছে। অনিমেষের হাতে ব্যথা হয় না, অতএব অনন্তকাল নীরব থাকার পর ল্যাম্পপোস্টটি পড়ে যায় ভেঙে, অনিমেষ তাকে অদৃশ্য করবার মন্ত্র আওড়ায়, অথচ অদৃশ্য হয় না সে। অনিমেষ মৃতকে হত্যা করবার মন্ত্র জানে না, জীবিত ছাড়া আর কিছুই সে হাপিস করতে পারে না। ফলে একটি ভাঙা ল্যাম্পপোস্ট রাস্তায় পড়ে থাকে, রোজ একটু একটু করে দৈর্ঘ্যে বাড়তে থাকে আর জড়িয়ে ফেলতে থাকে যাবতীয় বিচারালয় এবং চিড়িয়াখানা, ইস্কুল এবং আস্তাবল, থানা এবং ভাগাড়। সেই বেষ্টনীর চাপে প্রচুর মানুষ মারা যায়, অনিমেষ তাদের ততদিন অব্ধি সরায় না যতদিন না দুর্গন্ধে এসে জড়ো হয় যাবতীয় চিল শকুন। আসে প্রাগৈতিহাসিক হাড়গিলে পাখি, অনিমেষ তাদের সাথে একমাত্র আত্মীয়তা অনুভব করে। কাজেই সেসব হাড়গিলেদের হত্যা করবার পর মহালয়ায় পিতৃতর্পণে অনিমেষ হাড়গিলের নাম করেছিল।
অথচ এসব রাগের আর ভাঙচুরের মধ্যে থেকে ঘুম সেভাবে আসে না, যেভাবে এককালে এসেছে। অনিমেষ জানে না, তার সাথে ছায়ার মতো দ্যাখা যায় মলয় নামের সাদা বেড়ালটিকে, রাস্তা পেরোবার সময়েও যে কালোবর্ণ ধারণ করে না। অনিমেষ ক্রমশ নিজেকে দ্যাখে এক ঘরের ভিতরে, আসলে সে জানে না কীভাবে ঘরটা তার চারপাশে তৈরি হয়েছে, কারণ হঠাৎ একদিন ঘুম ভেঙে সে খেয়াল করেছিল গোলাপের দুই পাঁপড়ির মধ্যেকার সেই লাল আলোর ঘর তাকে ঘিরে আছে। যদিও অনিমেষ জানে হত্যা তার নেশা নয়, চাইলেই সে হত্যা বন্ধ করতে পারে এবং ঘুমঘোরের চোখ নিয়ে হেঁটে চলতে পারে রেললাইন দিয়ে, কোনো ট্রেনের ধাক্কায় সে মরবে না, অথচ এও মনে হয় পৃথিবীর যাবতীয় ব্যস্ত স্টেশন সে ধুধু প্রান্তর করে দিয়েছে, কেবল ছেড়ে রেখেছে টিকিট কাটার লোকদের আর ট্রেন চালকদের, যারা ফাঁকা স্টেশন আর ট্রেনে বসে থাকে, শূন্যতার মধ্যে উদ্দেশ্যহীন ছুটোছুটি করে। অনিমেষ জানতে পারে, যাবতীয় বেলাভূমি আর রেস্তোরা, মিউসিয়াম আর পাহাড়ে ওঠার বেসক্যাম্পে যত মানুষ ছিল, সব সে শেষ করে এনেছে। অগত্যা এরপর রাগ করবার উপযুক্ত আধার কী পাবে সে, আর রাগ না এলে ঘুমের ভিতর কীভাবে সে পৌঁছবে, এসবই সে ভাবতে থাকে আধা ঘুমে।

মলয় নামের সাদা বেড়ালটি যা অনিমেষকে জানায়নি:

ইচ্ছামাত্র হত্যা করে যত ঘুম অনিমেষ জমিয়েছিল, সেসব ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। বিরক্তি আর রাগজাত যা কিছু অনিমেষের অতিরিক্ত আয়েস, পল-অনুপলের জন্য গভীরতর ঘুম, যা অনির্দিষ্ট অনন্তের আভাসমাত্র দেয় কেবল, সেসবও ক্রমশ ফুরিয়ে এসেছে। হত্যা করবার মতো যথেষ্ট মানুষ আর গাছ আর কুকুর আর মৌমাছি সে বাঁচিয়ে রাখতে পারেনি, এমনকি এই বিপুল অনাসক্তি দিয়ে সে আসলে আরো জড়িয়ে পড়ছে জীবনে। খাদ্য-পানীয়-শ্বাসবায়ু-ভালবাসা ছাড়াই যেভাবে সে স্বচ্ছন্দ এই জীবনে, তা আসলে সেই অনন্তের থেকে ক্রমশ দূরে নিয়ে চলে যাচ্ছে তাকে।

শেষ যে হত্যাটি অনিমেষ করেছিল তা এইরূপ:
হারু ছিল এযাবৎ তার শাগরেদ। হারু পাখির মাংস খুব ভালবাসে। পৃথিবীর শেষ কয়েকজন বাসিন্দার মধ্যে যে মেয়েটি ছিল শিশু, হারু তাকে দু হাত দু পায়ে টানটান করে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিল, কারণ হারুর ধারণা ছিল এভাবেই মেয়েরা বড় হয়। আর হারু মেয়েটার নীচে একটা বিশাল কয়লার উনুন এনে বসিয়ে দিয়েছিল, কারণ হারু জানে উনুনের তাপে যেমন চ্যাপ্টা রুটি স্যাঁকা হয়ে ফুলে যায়, মেয়েদেরও সেভাবে সেঁকে ফোলাবার নিয়ম। বড় হলে মেয়েটি কোনো কাজে লাগবে কিয়ান অনিমেষ জানে না, অথচ শবের গন্ধে হাড়গিলে এলে ঘুমিয়ে থাকা চলে না অনিমেষের; অগত্যা ভাঙা ঘুমের কারণ খুজতে গিয়ে সব রাগ তার হারুর উপর পড়ে

সৃষ্টির যাবতীয় প্রাণ মরে যাক
অনিমেষ স্থির হয়ে থাকে, মেপে নেয় যাবতীয় নৈঃশব্দ, যা সে সৃজন করেছে, আর তারপর চলে যেতে থাকে হিমালয়ের দিকে, প্রচণ্ড শীতে কিংবা বর্ষায় তখন ন্যাড়া পাহাড় আর বাড়িঘর ভিজছে, আর অগ্নিকুণ্ডের ধারে কেউ নেই আগুন পোয়াবার মতো। নিজেকে সে প্রাণী ভাবতে পারে না আর, অথচ তার কাঙ্ক্ষিত ঘুম তখনো আসেনি। অনিমেষ ক্রমশ দেখতে পায়, তার পেছনে আবছা হয়ে ফুটে উঠছে মলয় নামক সাদা বেড়ালটির অবয়ব, তুষারের মধ্যে আরো উদাস আর লালচে দ্যাখাচ্ছে যাকে, আর অর্ধেক রাস্তা গিয়েই অনিমেষের সাহসে আর কুলোয় না, সে একটি নরম-লাল আলো বিকিরণকারী সাদা বেড়ালের চিরপরিচিত নাম 'মলয়' ক্রমশ ভুলে যায়। অনিমেষ ফিরতে চাইবে না লোকালয়ে, বরং তাকে বসতে দ্যাখা যায় তার শেষতম হত্যাটির আয়োজনে। স্মিতমুখে সে বসে দ্যাখে সূর্যাস্ত, দেখে ক্রমশ একটি লাল ঘরের ভিতর সে প্রবেশ করছে, আর শিয়রপাশে একটি সাদা বেড়াল, অথচ ঘুমের দিকে যাওয়ার আগে শেষবার অনিমেষ ভেবেছিল একবার ভেনিসে গণ্ডোলায় চাপবে।

ঘুমিয়ে পড়বার পর ক্রমশ অদৃশ্য হয় অনিমেষ, কেবল তার শেষ ইচ্ছেটুকু একের পর এক গন্ডোলা বানিয়ে স্তূপ করতে থাকে পৃথিবী জুড়ে।


কাঠ চেরার শব্দ আর ঘুণে ক্রমশ ব্যাপ্ত হয় সৃষ্টি।

















সর্বজিৎ ঘোষ
Sarbajit Ghosh

Popular Posts