Jyotirmoy Shishu

Jyotirmoy Shishu

Thursday, March 2, 2017

Hello Darkness, My Old Friend : বহ্নিশিখা সরকার

Hello Darkness, My Old Friend

খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা নয় যদিও, অথচ মাঝে মাঝে অকেজো কথাগুলি মাথার ভিতরে ঘুরে বেড়ায় নোঙর করবে বলে। আমি জায়গা দিলাম তাদের। রাস্তা এগিয়ে যায় সামনে আর আমি ভিড় বাসে জানলার ধারে বসার সিট পেয়ে ভাবি জীবনে বুঝি হামেশাই এমন মিরাকেল হয়। মানব সভ্যতার অপ্রাসঙ্গিক কথোপকথনের হাত থেকে বাঁচবো বলে কানে তুলে নেই গান। গান বাজে, চুলে আসে দমকা হাওয়া। গড়িয়া থেকে গড়িয়াহাট যাওয়ার মাঝখানেই কোথাও আছে পৌনে দশ নাম্বার প্ল্যাটফর্ম। যে জগতে এইবার আমি পৌঁছাই সেখানে বয়স বাড়েনা, সময় নড়ে না। একটা পাগল খরগোশ দেখতে পাই। চোখ জুড়িয়ে ঘুম আসে। স্বপ্নে আবার স্বপ্ন আসে তবু চোখ থাকে খোলা। এমন মাহেন্দ্রক্ষণে গানের কথার অর্থ বুঝে যাই, আগে সুরের কারচুপি আমায় সিন্দুকে রাখা কথাগুলোকে বুঝতে দেয় নি।
রাস্তায় দেখি আমার কানে শোনা গান ইজেলে আঁকা হচ্ছে। গান বেজে চলে, সায়মন অ্যান্ড গারফাঙ্কেল—

Hello darkness, my old friend,
I've come to talk with you again,
Because a vision softly creeping,
Left its seeds while I was sleeping,
And the vision that was planted in my brain
Still remains
Within the sound of silence


তখন ছিলাম কোথায় জানি না, দেখলাম রাস্তা অন্ধকার; বোধহয় লোড শেডিং। অন্ধকার ভয় পেতাম খুব ছোটবেলায়, মেজো বেলায় সমঝোতা করে নিয়েছিলাম আর বড় হয়ে এইটেই আমার আশ্রয় এতদূর বোঝা হয়ে গেছে। আকস্মিক একফালি অন্ধকারে দেখতে পেলাম বাধাকপির কয়েকটা ছেঁড়া পাতা, বোঁচা টমেটোর বিদায় গাঁথা রচনা করছে ভ্যানওয়ালা। সবাই সবার পসরা নিয়ে চৌকাঠের পিঁপড়েগুলোর মতন চলে যাচ্ছে। ওরাও কি ভয় পায় যেমন আমি পেতাম ছোটবেলায় অন্ধকারে বাহানা পেলেই ঐ নোংরা লোকটা যখন কাছে আসতো? জানি না। ধপ করে জ্বলে উঠলো সমস্ত আলো আর চোখে লেগে গেলো ঝিলিমিলি, সবার চোখেই লেগে আছে। আমার ডাক্তার বলেছিল ছোটবেলা আমাদের ভিতরে বীজ বুনে যায়, সে বীজ হয় মহীরুহ। আমি এখন কোথায় আছি? টিকেট চাইতে আসেনি যখন দূরেই আছি কোথাও।

In restless dreams I walked alone
Narrow streets of cobblestone,
'Neath the halo of a street lamp,
I turned my collar to the cold and damp
When my eyes were stabbed by the flash of a neon light
That split the night
And touched the sound of silence

আমি ঠিক কবে থেকে একা? বাবার অহংকার যখন মায়ের অন্ধকারে প্রবেশ করেছিল, আমি অন্ধকার থেকে আরও অন্ধকারের যাত্রা শুরু করলাম যে মুহূর্ত থেকে। মা বুকের দুধ দিল, বাবা পোশাক দিল, সর্ষের তেল মেখে আমসত্ত্বের মতন ফেলে রাখা হল, একদিন শিক্ষার বোঝা চাপিয়ে দেওয়া হল, দেখা হল একদল অসহায় মুখের সাথে এবং আমাদের জানোয়ার থেকে অমানুষ হওয়ার যাত্রা শুরু হল। আমরা অধিকাংশই প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত পশু হলাম। এবার শুধু উপযুক্ত সার্কাসের অপেক্ষা। তবু যখন ভালবাসা নামক সোনার পাথর বাটিতে দুধ খেয়েছি, আমাদের ফণা খানিকের জন্য শান্তি পেয়েছে। ছোবল মেরেছি যত্রতত্র তবু তাতেও আর উপায় কই, বিষদাঁত তো কবেই উপড়ে ফেলে দেওয়া হয়েছে। ট্র্যাফিক সিগন্যালটা একটা অন্তহীন অপেক্ষার মতন, যদিও নির্দিষ্ট সময়। এটা বড্ড অস্বস্তিকর জিনিস! কারণ কার জন্য কতক্ষণ অপেক্ষা করা উচিৎ তার মার্জিনও যদি ঠিক করে দেয় অন্য কেউ তবে আমাদের আর হাতের পাঁচ রইল কৈ! এখন শীত প্রায় গত; লগ্নজিতা তার নাঁকি গলায় “বসন্ত এসে গেছে” বলে হেঁদিয়ে মরে গেলো। লাল-সবুজ-হলুদ আলোর বিরক্তি আমায় দেখতে দিচ্ছেনা সামনের কিছুই। ভিড় বাসে বগলের গন্ধের বীভৎসতাটুকুই জানায় নেহাত নাকটা আছে, তবে আমের মুকুলের সুবাসের দুয়ারে দিয়েছে কাঁটা।

And in the naked light I saw
Ten thousand people, maybe more
People talking without speaking,
People hearing without listening,
People writing songs that voices never share
And no one dared
Disturb the sound of silence

কলকাতা ৩২-এ ঢুকলেই মনে হয় এইতো আমার স্বপ্ন সাধের রংমহল। আমার ভালবাসার রাজপ্রাসাদে নিশুতি রাত গুমরে মরে না বরং গাঁজার ধোওয়ায় ইয়ে রাত ভিগি ভিগি, ইয়ে মাস্ত নিগাহে হয়ে ওঠে। আমিও ঐরকমই কোনও হঠাৎ ভালো থাকার খোঁজ পেতে চলেছি। টিকিট নিতে এলো দাদা অর্থাৎ আমার কাছে-পিঠেই কোথাও নামতে হবে। আমি আকছার ভুলে যাই আমার গন্তব্য তাই টিকিট দাদাকে বলি; সে ভাড়া নিয়ে যে অব্ধি আমার অধিকার সেখানে গিয়ে গলাধাক্কা দেয়। ৮বিএর মোড়ে এলে ঐ “এ জগতে কেউ কারো নয়”-এর বোধটা আরও চাগাড় দিয়ে ওঠে। সিগন্যালের তোয়াক্কা করে কিছু ‘আন-কুল’ লোক আর কুলেরা গাড়ির মাঝখান দিয়ে রাস্তা পারাপার হয়। পঙ্গু ভিক্ষুকটা নিজেকে হ্যাঁচরায়। ভীষণ তাড়া সবার- ধরে থাকতে নেই, থেমে থাকতে নেই, ফিরে যেতে নেই, ফেরত নিতে নেই। বিশ্ববিদ্যালয়ের যুবাদের শিক্ষিত হাসির রবকে গ্রামাঞ্চল থেকে আসা একদল কুৎসিত ছেলে-বউএর অচেনা শহরে হারিয়ে যাবার উৎকণ্ঠা দাপিয়ে রাখে। কেউ শুনতে পায়না, দেখতে পায় না কারণ পেলে মৌমাছির বিনবিনুনির মতন বিরক্তিকর শব্দ শুনতে থামত বটে। বসন্ত এসে গেছে!

And the people bowed and prayed
To the neon god they made
And the sign flashed out its warning,
In the words that it was forming
And the signs said,
"The words of the prophets are written on the subway walls
And tenement halls
And whisper'd in the sounds of silence

আমায় নামিয়ে দেওয়া হল আমার ম্যাজিক কার্পেট থেকে। আমি এখনও জানিনা আমি কোথায়! একজন পুরুষ আমায় দেখে হাসি মুখে এগিয়ে এলো, আমার বাগযন্ত্র তার বলা কথার উত্তরও দিল। আমি কি বলে থাকতে পারি পুরুষকে জানি না। সে আমায় টেনে নিয়ে গেলো বিদ্যাশিক্ষার মন্দিরে। এখানে টাকা দিলেই বিদ্যা পাওয়া যায়; যেন এক কংক্রিটের তৈরি মস্ত বেশ্যা। ঘণ্টা আর ধুপকাঠির উগ্র গন্ধ- ভক্তের ভগবান বীর্যপাত করেছেন বোধহয়। পরম আনন্দে সবাই সেই সাদা তরল চেটে খাচ্ছে, পর্ণগ্রাফি ছবিতে যেমনটা দেখি। উত্তেজনা হল খুব! কিন্তু আশেপাশে খুব অন্ধকার নয়—কেউ দেখে ফেলবে নাতো যদি ছুঁয়ে দেখি নিজেকে! নাহ! ঘোর কেটে গেলো তার মানে। ঘোরে থাকলে লোকে কি ভাবল না ভাবল তার তোয়াক্কা করতুম না।

বহ্নিশিখা সরকার
Banhisekha Sarkar