Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS

কাঞ্চনজঙ্ঘার ছায়া : শোভন ভট্টাচার্য

কাঞ্চনজঙ্ঘার ছায়া

তুষার বাহিত হাওয়া
এখন শাসন করছে রাত্তিরের ম্যাল।
সমস্ত টুরিস্ট প্রায় ফিরে গেছে হোটেলের ঘরে।
লামা সাধুদের মতো জেগে আছে সারিবদ্ধ পাইন।
কাছে দূরে উঁচুনিচু সমস্ত পাহাড়
প্রাণের প্রদীপ যত জ্বেলেছিল মোহিনী সন্ধ্যায়
একে একে নিভে আসছে সব।
দার্জিলিং ম্যালও তার বাণিজ্যিক বাহু
গুটিয়ে নির্বাণ মন্ত্রে ধ্যানস্থ এখন।

#
ব্রিটিশের ভূত আছে এই দার্জিলিং-এ;
‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-র ছবি বিশ্বাসসুলভ বাঙালিরা
এখনও সপরিবার ছেলেমেয়েজামাইশ্যালক
সমেত প্রতিবছর এখানে আসেন।
থাকেন ব্রিটিশ-ধাঁচে বানানো বাংলোয়।
খাদের রেলিং-ঘেরা সবুজ লবিতে টি-টেবিল
তাদের মহৎ-জন্ম-যাপনের সেরা অবকাশ।

#
আর আসেন নিতান্তই মধ্যবিত্ত শ্রেণি।
সারাদিন এই ম্যাল তাদের কেনাকাটায়, ক্যাচোরম্যাচোরে
চেনা যায়না পাহাড়ের কোনও শীর্ষ ব’লে।

#
আমি নিজে এর আগে দু’বার
দার্জিলিং জেলার সবচেয়ে
উঁচু যে পাহাড়ে থাকে মানুষ, সেখানে
পাঁচদিনের পায়ে হাঁটা পথ ঘুরে ফেরার সময়
শহরে নেমেছিলাম।
কেভেন্টার্সে কফি, গ্লেনারিজে ব্রেকফাস্ট
খেয়েও আমার মন ভরেনি ততটা।
মায়ের চাদর আর বাবার জাম্পার
কিনে ফিরে গেছি অসহায়।
কিন্তু আমি সতত নিশ্চিত
এবারে যে সৌভাগ্যের অধিকার নিয়ে আমি এখানে এসেছি
কাঞ্চনজঙ্ঘার মুখ না দেখতে পাওয়ার গ্লানি তুচ্ছ তার চেয়ে।
কেননা এবার বউ-মেয়ে
ছাড়াও সফর-সঙ্গী বাবা-মা আমার;
যে বাবা-মা ইতিপূর্বে হিমালয় পাহাড় দেখেনি কোনও দিন;
আজ আমি তাদের এক কৃতার্থ সন্তান।
কাজেই এ শুধু একটা ভ্রমণকাহিনিমাত্র নয়;
এ এক প্রেমিক, পিতা, পুত্রজন্ম সিদ্ধির বিষয়।


#
বিগত তিনদিন
ওদের সবাইকে নিয়ে
এ-পাহাড় সে-পাহাড় ঘুরে বেরিয়েছি।
গাড়িতে যদিও, তবু, নেমে নেমে, থেমে থেমে
সে-চলায় অবকাশ ছিল।
পাইনের জঙ্গলে দেখা মেঘ রোদ মেঘ রোদ মেঘ...
আলোছায়া, সুখদুঃখ, হাসিকান্নাময় জীবনেরই
আশ্চর্য প্রতীক।
আরোই আশ্চর্য কথা, উভয়ই সুন্দর।
ফার্নের ঝালর আর পাথরের খাঁজে খাঁজে ফুটে থাকা অযত্নের ফুল,
ফুলের মতোই ফুটে থাকা ছোটো বাড়ি,
আমাদের দু’চোখ সার্থক
করে দিল প্রতি বাঁকে বাঁকে বারংবার।

#
বাতাসিয়া লুপ থেকে ঝুঁকে দেখা সেই টয়ট্রেন
খাদের অনেক নীচে বাঁক নিল হুইসেল বাজিয়ে;
তারপর উঠে এল কীজানি কীভাবে, কোথা দিয়ে... !

#
পৃথীবির উচ্চতম স্টেশন-শিরোপা পিঠে নিয়ে
মেঘমগ্ন ‘ঘুম’ যেন বাস্তবিকই ঘুমে অচেতন।
মনাস্ট্রির বুদ্ধদেব মেঘের ভেতরে দিয়ে ডুব
ঘুমেরও অতীত ঘুমে দেখাচ্ছেন নির্বাপিত মায়ার স্বরূপ।
সেই শিক্ষা নিয়ে যেন মেঘমেদুর পাইন-শ্রমণেরা
করে আছে এক্কেবারে চুপ।

#
আর একদিন গঙ্গামাইয়া ঝর্ণা দেখতে গিয়ে
আমি আর সুরমা উঠলাম
সেই শিলা-বাগিচার মাথায়, যেখানে
টুরিস্ট সচরাচর পৌঁছাবার চেষ্টাই করে না;
সকলেই ঝর্ণাতলে ছবি তুলতে পেরে ধন্য হয়।
ফলত সে-জায়গা এত বিশুদ্ধ নির্জন
আমাদের কাছে আসতে প্ররোচনা দিয়েছিল ঝর্ণাটি নিজেই।

#
প্রতি পদক্ষেপে আমি মায়ের শ্বাসকষ্টের খবর নিয়েছি।
সবেমাত্র পাঁচবছরে পা-দেওয়া মেয়ের হাত ধ’রে
শিখিয়েছি ওঠা-নামা জীবন্ত পাথরে।
আজকেই তো ভোরবেলায়
তখনও সূর্যের আলো লালচে আভা ছাড়েনি সবটুকু;
বাবাকে বন্ধুর মতো পাশে নিয়ে নেমেছি ম্যালের
তলা দিয়ে ঝুলে যাওয়া আশ্চর্য রাস্তায়।
বাঁপাশে ম্যাল-পাহাড়, ডানপাশে রেলিং;
তার ওপারে অথই খাদের
পাড় খুঁজে পেতে চাইছে সাঁতারু মেঘেরা।
কিছুদূর নেমে গেলে বাঁদিকে ছিমছাম ছোটো বাড়ি;
‘সি. আর. দাশ এ-বাড়িতে প্রয়াত হয়েছিলেন’
পথচারী কাউকে পেলে, ডেকে বলছে ধবধবে ফলক;
মেঘ সে-বাড়ির গায়ে হাত বুলিয়ে যাচ্ছে সারাদিন।

#
সারাদিন ঘুরে ফিরে যখন সবাই ক্লান্ত
স্বস্তি পেতে চাইছে হোটেলেই;
প্রত্যেক রাত্রির মতো আজও আমি বেরিয়েছি;
অচেনা গোপন এক রহস্য-ভ্রমণে।

#
কাঞ্চনজঙ্ঘার মুখ এ-ক’দিনে একবারও দেখিনি;
কিন্তু আজ, এই প্রায় ঘুমে ঢুলে পড়া দার্জিলিং
আমাকে দেখাল এক অদৃশ্য শৃঙ্গের স্বপ্নাভাস।
এর আগে অজস্রবার বিভিন্ন পাহাড় থেকে সে-শৃঙ্গের যে রূপ দেখেছি
এ-রূপ আকৃতিগত ভাবে সেই রূপই অবিকল;
কিন্তু এই চিরতুষারের গায়ে কোনও উদয়-অস্তের আলো নেই।
মেঘের সাগরপারে, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে রয়েছে
কাঞ্চনজঙ্ঘার ছায়া।

#
নেপাল, উত্তরপূর্ব ভারত, ভুটানসহ এক
বিশাল ভূখণ্ড তার দৃষ্টি-আওতায় পেতে রেখে
জন্মকর্ম শিক্ষাদীক্ষা দিয়ে
দক্ষিণা স্বরূপ নিয়ে রয়েছে দাঁড়িয়ে।
উত্তরে তিব্বত-চিন
পৌরাণিক মানসের হাতছানি প্রাচীন...

#
একটা গোটা উপমহাদেশ
যে-শৃঙ্গের ছায়ায় লালিত।
ছবিতে, শিল্পকলায়, স্তবে আর পোশাক-আশাকেও
যার স্পষ্ট ছায়া আছে। জনমানসের চেতনায়
যে-রূপ থাকার কথা ছিল --
অখণ্ড ও অনির্বাণ, সদা সমাহিত;
বুদ্ধের পার্শ্বস্থ মুদ্রা যে-রূপে শায়িত...

#
তথাপি রাষ্ট্রের ধারণায় বোনা মানুষের মন
আরও ক্ষুদ্র খণ্ডনের দাবি তুলে করে হইচই।
প্রতিহিংসাপরায়ণও হয়ে ওঠে,হলে সেই দাবির খণ্ডন।
‘অহিংসা, পরম ধর্ম’ --
তথাগত-কথা, কেউ মেনে চলে কই!

#
কাঞ্চনজঙ্ঘার ছায়া, তবুও শুশ্রুষা করে সমস্ত ক্ষতই।
সমস্ত পাথরে, প্রাণে, বিপুল প্রজ্ঞার মতো আজও
তবু স্থির জেগে থাকে প্রকৃতির অখণ্ড-বন্টন।










শোভন ভট্টাচার্য

Sovan Bhattacharya

Popular Posts