Saturday, April 8, 2017

জোকারের বালের যুগ্যি নয় ওরা : পুরন্দর ভাট

জোকারের বালের যুগ্যি নয় ওরা

বাঁকুড়া মিমস পেজটা বোধয় ফেসবুক বন্ধ করে দেবে। এই পেজটি বহুবার বিতর্কে জড়িয়েছে। পিডোফিলিয়া নিয়ে একবার বিতর্কে পড়েছিল, বর্ণবিদ্বেষী, নারীবিদ্বেষী পোস্ট করে বিতর্কে জড়িয়েছে, এবার ক্যান্সার পেশেন্টদের কেমোথেরাপির ফলে টাক পড়ে যাওয়া নিয়ে রসিকতা করে বিতর্কে জড়িয়েছে। বহু লোকে রিপোর্ট করেছেন পেজ। সিগনেচার ক্যাম্পেন হয়েছে পেজটাকে সরাবার জন্যে। অনেকেই এমন বলছেন যে যাঁরা ওই পেজটাকে লাইক করেছে তারা যদি আনলাইক না করে তাহলে আনফ্রেন্ড করে দেবে। অর্থাৎ এই রামনবমী আর ভোঁতা তলোয়ার নিয়ে লম্ফ ঝম্পর বাজারেও খানিকটা ফুটেজ খেয়েছে পেজটা। এবার আসা যাক বিতর্কর প্রসঙ্গে।

প্রথমেই যেটা পরিষ্কার করে দেওয়া দরকার যে "ইয়ার্কি মারবার একটা লিমিট আছে, ক্যান্সার পেশেন্ট নিয়ে ইয়ার্কি বা মেয়েদের মাসিক হওয়া নিয়ে ইয়ার্কি মারা প্রচন্ড ইনসেন্সিটিভ" - এই যুক্তির একটা অংশ সঠিক কিন্তু অন্য অংশটা গরুর গোবর। সঠিক হলো "ইনসেন্সিটিভি" আর গোবর হলো "লিমিট আছে।" লিমিট যদি টানেন সেটা কোথায় টানবেন? কেউ ক্যান্সার পেশেন্ট নিয়ে ইয়ার্কি মারাকে লিমিট অতিক্রম করা বলবেন আর কেউ বলবেন গরুকে নিয়ে ইয়ার্কি মারা হলো লিমিট। একটা লিমিট টানাকে সমর্থন করলেই অন্য লিমিটের বিরোধিতা করবেন কী ভাবে? তাই এই লিমিট টানার ব্যাপারটা হলো গোবরের মতো। বিশ্বের সব কিছু নিয়ে ইয়ার্কি মারতেই পারে কেউ, আমি তার প্রতিবাদ করবো, কিন্তু তার জন্য তাকে জেলে পুরে দেবো বা তার বলার বা লেখার অধিকার কেড়ে নেবো না। লিমিট টানতে থাকলে পেহেলাজ নিহালনিকে বরং একবার রোজ সকালে প্রণাম করে নেওয়া দরকার। একটা লিমিট ভালো আর অন্যটা ভালো নয় এটা আপনি কোনো ভাবেই স্বাধীনতার যুক্তি মেনে প্রমাণ করতে পারবেন না। আমি বলছি না যে সব লিমিট সমান, আমি বলছি না যে গায়ের রঙের জন্য কাউকে নিয়ে ইয়ার্কি মারা আর ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে ইয়ার্কি মারা এক, আমি বলছি না যে একটায় লিমিট টানলে আরেকটাতেও টানতে হবে। কিন্তু একটা করা যাবে আর অন্যটা করা যাবে না এই তর্ক করতে গেলে আপনাকে বাইরে থেকে কিছু যুক্তি আমদানি করতে হবে, স্বাধীনতার পক্ষে উদারবাদ যে যুক্তিগুলো দেয় সেগুলো দিয়ে প্রমাণ করতে পারবেন না। বাইরে থেকে মানে শুধু বাকস্বাধীনতার উদারবাদী ব্যাখ্যায়  আটকে না থেকে, ইতিহাস, অর্থনীতি ইত্যাদির প্রেক্ষাপট টেনে এনে তবে যুক্তি সাজাতে হবে। গডেলস ইনকমপ্লিটনেস থিওরেমের মতো বিষয়টা।  সেই কাজটা কিন্তু বেশ কঠিন, এবং সেটা করতে গেলেই অনেক "ক্যান্সার নিয়ে ইয়ার্কি মারা উচিত না" অবস্থানের সমর্থককে কিন্তু হারাতে হতে পারে কারণ নতুন যুক্তিমালার অনেক কিছু তাদের আবার পছন্দ হবে না। কিন্তু তার আগে একটা মৌলিক বিষয় নিয়ে ভাবা দরকার। সেটা হলো ইয়ার্কি বা মজা বা জোক ব্যাপারটা কি?

    
এই প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ। বাঁকুড়া মিমসের যে "জোক" বা ইয়ার্কি নিয়ে লোকে ব্যথিত সেগুলো এক ধরণের বুলিয়িং। বুলিয়িং-এর অর্থ হলো কারুর কোনো দুর্বল জায়গায় খোঁচা দিয়ে মজা নেওয়া। সেই দুর্বল জায়গা কারুর ক্ষেত্রে ধর্ম হতে পারে, কারুর ক্ষেত্রে দেশপ্রেম হতে পারে, কারুর ক্ষেত্রে গৌমাতা হতে পারে, কারুর ক্ষেত্রে অভিনেতা দেব হতে পারেন, কারুর ক্ষেত্রে জাত হতে পারে, কারুর ক্ষেত্রে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা হতে পারে, অধিকাংশ সুস্থ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের ক্ষেত্রে ক্যানসার আক্রান্তের প্রতি সহমর্মিতা অথবা ধর্ষিতার প্রতি সহমর্মিতা হতে পারে। এই দুর্বল জায়গায় খোঁচা মেরে কাউকে ব্যথিত করে মজা নেওয়া, অর্থাৎ এই  বুলিয়িং ব্যাপারটা কি ঠিক? ঠিক বা ভুল কি না জানি না কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই এটা করি। হিন্দুত্ববাদীদের যখন চাড্ডি, গোমাতার সন্তান বলি সেগুলো তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসে আঘাত দিয়ে মজা নেওয়া, চাড্ডিরাও তেমনই চীনের দালাল, চুমু বিপ্লবী ইত্যাদি বলে বামপন্থীদের রাজনৈতিক বিশ্বাস অথবা উদারবাদীদের  চেতনায় আঘাত দেওয়ার চেষ্টা করে। তাই কাউকে "অফেন্ড" করাকে জোক হিসেবে  গণ্য করা যায় কী না তার উত্তর এখানেই রয়েছে, সকলেই যখন সেটাকে মজা নেওয়ার জন্য করে থাকি  তখন উত্তরকে "হ্যাঁ" বলে ধরে নেওয়া উচিত,  অন্যের দিকে আঙ্গুল তুলে লাভ নেই। অর্থাৎ বুলিয়িং কে যদি জোক বলে মেনে নিই আর আমরা যদি এই বিষয়ে একমত হই যে আমরা কেউ পেহেলাজ নিহালনী অথবা বাংলাদেশের নাস্তিক কোপানো মোল্লা নই তাহলে যেটা দাঁড়াচ্ছে সেটা হলো যে কোনো কিছু নিয়ে বুলিয়িং করে মজা নেওয়া যেতেই পারে। তার সমালোচনা করবো কিন্তু তার বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেব না।

এবার আসা যাক বাঁকুড়া মিমস এর উদ্দেশ্য এবং মানসিকতার প্রসঙ্গে। ওরা এসব বিতর্ক তৈরী করে তার একটা কারণ প্রচার পাওয়া কিন্তু সেটাই সব নয়। ওদের উদ্দেশ্য মানুষের বাকস্বাধীনতার প্রতি সহ্যশক্তি পরীক্ষা করা। ওরা প্রমাণ করতে চায় যে ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করা প্রগতিশীল মানুষও কোথাও একটা গিয়ে মৌলবাদীদের মতো আচরণ করবে। তারা হয়তো ধর্ম নিয়ে নোংরা কথায় আঘাত পায় না কিন্তু অন্য বিষয়ে পায় আর সেই সব স্থানে আঘাত দিতে পারলে তাদেরকে দিয়েও মৌলবাদীদের মতো আচরণ করানো যায়। ওরা ব্যাটম্যানের জোকারের ভূমিকা নিতে চায়, জোকারের বিখ্যাত ডায়ালগ মনে করুন - "See, their morals, their code... it's a bad joke. Dropped at the first sign of trouble. They're only as good as the world allows them to be. I'll show you, when the chips are down, these... these civilized people? They'll eat each other." দুঃখের বিষয় যে অনেকেই  তাদের সঠিক প্রমাণ করে দিচ্ছেন। আর এতেই  তথাকথিত উদারবাদীদের  হার। কারণ উদারবাদও কিছু নৈতিকতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, ব্যক্তিস্বাধীনতা  সেই নৈতিক মূল্যবোধগুলোর  মধ্যে প্রধান  কিন্তু সেটাই সব নয়, বাকি নৈতিক দিকগুলোর সাথে যখন ব্যক্তিস্বাধীনতার সংঘাত হয় তখন এনারা সংকটে পড়েন, কী  করবেন বুঝে উঠতে পারেন না।

আর এখানেই আমরা বামপন্থীরা উদারবাদীদের থেকে আলাদা। আমাদের  কাছে বাকস্বাধীনতা প্রচন্ড গুরুত্বপূর্ণ  কোনো বিষয় নয়। আমি বুলিয়িং  করে মজা নিই কিন্তু আমি মনে করি বুলিয়িং করা যায় শুধু শক্তিশালীকেই, ক্ষমতাশালীকেই। যেহেতু তাদের  দুর্বলতার জায়গা নিয়ে  তাদের অন্যদের দমিয়ে রাখতে অসুবিধে হয় না তাই তা নিয়ে খোঁচা মেরে তাদের একটু তিক্ত করে দেব, ক্ষনিকের জন্যে তাদেরকে ক্ষমতার জায়গা থেকে নামিয়ে হাস্যস্পদ করে দেব। ধর্ষণ নিয়ে ইয়ার্কি মারবো কিন্তু সেটা ধর্ষককে ছোট করতে, ধর্ষিত কে নয়। বর্ণবাদ নিয়ে ইয়ার্কি মারবো কিন্তু সেটা শ্বেতাঙ্গদের নিয়ে, কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ে নয়, অথবা তাদের নিয়ে মারলেও খোঁচা মারার তীব্রতা কম হবে। বাঁকুড়া মিমস-এর এরকম কোনো মূল্যবোধ নেই, কিন্তু সবাইকে "অফেন্ড" করে এমন দাবি অন্তত তাদের করা উচিত  না। ধর্ম নিয়ে তাদের খোঁচাগুলো রীতিমতো জোলো, হিন্দু দেব দেবতা নিয়ে তাও কিছু নিরীহ ইয়ার্কি মেরেছে মোহাম্মদ বা আল্লাহকে নিয়ে তাও দেখিনি। মুসলিমদের নিয়ে কিছু মিম আছে কিন্তু মোহাম্মদ নিয়ে নয়। অবশ্য ভগবান, মোহাম্মদ এসব নিয়ে ইয়ার্কি মারলে জান মাল খোয়াবার ভয় আছে, জেলে  যাওয়ার ভয় আছে। সকলেরই অধিকার আছে খুন অথবা গ্রেফতার হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচানোর। কিন্তু আরো অন্য কিছু নিয়েও বানানো যেত তো? যেমন শহীদ হওয়া সেনা অথবা স্বাধীনতা আন্দোলনের শহীদদের নিয়ে? সেসব করলে গালাগাল জুটবে, কিন্তু খুন বা এফআইআর বোধয় হবে না। কিন্তু তারা সেসবও করেনি। তাদের টার্গেট মূলত উদারবাদীরা, তাদেরকেই  বুলি করতে চায় ওরা। এর কারণ উদারবাদীরা যাকে বলে "সফ্ট টার্গেট।" কিন্তু এসব করে নিজেদের অন্তত ব্যাটম্যানের জোকার বলে নিজেদের পিঠ চাপড়ানোটা হাস্যকর। জোকার কিন্তু বুলি করতো ক্ষমতাকে।

দুর্বলকে খোঁচা মেরে মজা নেয়  যারা আমি নিশ্চিত যে বিপ্লব হলে তারা ক্ষমতাশালী শ্রেণীর পক্ষে দাঁড়াবে। তাই এরা আমার কাছে শ্রেণী শত্রুই, অনেক উদারবাদীর মতোই। 














পুরন্দর ভাট

Purandar Bhat