Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS

পানশালার মনোলগ : অর্ক চট্টোপাধ্যায়

পানশালার মনোলগ

দুপুরের পানশালা। চড়া রোদ বাইরে। মদের থেকেও বেশি রোদের জন্য ভেতরে ঢুকলো হিমাংশু। উইকএন্ডের দুপুর।পানশালায় ভাঁটা। ফাউন্টেন থেকে একটা বিয়ার নিয়ে কোণের ফাঁকা সিঙ্গল টেবিলে গিয়ে বসলো। নীথর শহরতলীর দুপুরে ভেতর-বাইরে এক হয়ে রয়েছে। একদিকের দেওয়াল-টিভিতে ক্রিকেট—অ্যাশেজ সিরিজ, আর অন্যদিকে হর্স রেস ঘিরে কয়েকজন বৃদ্ধের জটলা। অদূরের টেবিলে দুটি মেয়ে কথা বলতে বলতে বিয়ারে চুমুক দিচ্ছে। হিমাংশুর দিকে পিঠ করে যে মেয়েটি বসে আছে তার মুখ দেখতে না পেলেও বাঁ পায়ের হাঁটু অব্দি উঠে আসা কালো চকচকে লং-বুট হাতের সাথে তাল ঠুকে ওঠানামা করছে, কখনো হাঁটুর ঠিক নিচে, কখনো আবার গোড়ালির কাছাকাছি ভাঁজ হয়ে যাচ্ছে। হিমাংশু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে, কিম্বা দেখতে। মেয়েটির সব কথা তার লং-বুটের সরব ভাঁজগুলোর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। কথাগুলো বুজে আসছে ভাঁজ-শব্দে। হিমাংশু বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে টেবিলে রাখা সিডনী মর্নিং হেরাল্ডে চোখ দিলো। সংবাদ-শব্দ সরব হয়ে উঠতে লাগলো। মগজে তার দৃশ্যের মৌচাক।
গোটা কাগজ জুড়ে ইউরোপের রিফিউজি ক্রাইসিস নিয়ে রিপোর্ট। সিরিয়া এবং মধ্য প্রাচ্যের নানা দেশ থেকে কাতারে কাতারে লোক জার্মানীতে ঢুকছে। তাদের হাসি-কান্নায় ভাঙা মুখ, কোলে বাচ্চা, খুলে রাখা জুমড চটি জোড়ার ছবি। টার্কির ৩ বছরের আয়্লানের বালিতে গুঁজে থাকা নীথর মুখ। এই ছবিটা শেষ দু-তিনদিন ধরে অনবরত সোশাল মিডিয়ায় ট্রল করছে, দেখেছে হিমাংশু। না, সে শেয়ার করেনি, কোথাও বেঁধেছে, কোথায়, কি, তা ঠিক করে বলা মুশকিল। ফেসবুক টুইটারের এই অবাধ মৃত্যু-মৃত্যু খেলায় এবং জ্ঞান আর নৈতিকতার লড়াইয়ে সচরাচর ঢুকতে ইচ্ছে করে না ওর। পছন্দগুলো ‘লাইক’ হয়ে গেছে, সারাদিন আকাশ থেকে খসে খসে পড়ছে। টার্কির ৩ বছরের শিশু মৃত্যুর বোট থেকে ফটোগ্রাফের আগ্রাসী দৃষ্টির বোটে উঠে সোশাল মিডিয়ার দেওয়ালে দেওয়ালে অনুকম্পা আর বাণীবাণ হয়ে উঠেছে। আয়্লান কি ভাবছে এই সব ট্রলিং নিয়ে? সমুদ্রে কি ট্রলার চলছে এখনো? তার বাবা কি এখনো মরে যাবার কথা বলছেন ইন্টারভিউয়ে? হিমাংশু পাতা উল্টে এগিয়ে চলে। শেষ ক'দিন ধরে অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া তোলপাড় রিফিউজি ইনটেক নিয়ে। 
বর্তমান সরকার লিবারালদের। বছরখানেক ধরেই টনি অ্যাবটের তথাকথিত 'বোট পলিসি' নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে।
নো পেপার্স? টার্ন ব্যাক দ্যা বোটস! নো পেপার্স, দেন ইউ কান্ট লিভ হিয়ার!
এইসব পোস্টারে ছেয়ে গেছে সিডনী। হিমাংশু এখানে গবেষক। কিন্তু তা বলে কি সে রিফিউজি নয়? তার পেপার্স আছে বটে, তাও ‘অস্ট্রেলিয়া ফর অস্ট্রেলিয়ানস’ জাতীয় আন্দোলনে যখন শহর মেতে ওঠে আর একই মিছিলের পাশাপাশি চলে প্রতি-মিছিল, টিভিতে সেইসব দৃশ্য দেখতে দেখতে সব কেমন গুলিয়ে যায় হিমাংশুর। কোনটা মাল্টিকালচারালিজম আর কোনটা রেসিজম ঠিক ঠাহর হয় না। সবই কেমন টোকেন টোকেন শোনায়, এই কঠিন-সহজ সিনিসিজমের দিনকালে। থিসিসের মাঝে মাঝে হাল্কা হতে কাছের এই পানশালায় চলে আসে। সেদিন তার বন্ধু তাকে ভয় দেখাচ্ছিল, বলছিল, তার মাপমত হাঁটা দরকার। ২২-২৪ ঘন্টা টানা গেম খেলতে খেলতে এক গেমার বালক নাকি ডিপ ভেইন থ্রম্বসিসে মারা গেছে। হিমাংশু প্রম্পটলি বলে উঠেছিলো, 'হ্যা, আমিও যাবো, তবে থ্রম্বসিসে নয়, থ্রম্বথিসিসে!' কলেবরে বাড়তে থাকা ওয়ার্ড ডকের ভার্চুয়াল পাতা নিয়ে কামড়াকামড়ি চালিয়ে যাবার ফাঁকে এই দুপুর-রাতের পানশালা কমার্শিয়াল ব্রেক এনে দেয়। তার কাছে পার্সোনাল হলেও পানশালায় কমার্শিয়াল। থিসিসে রক্তপাত হয়, রক্তপাতেও আনন্দ হয়। আইসিসের পারভার্শনের মতই কি?
কাগজ থেকে চোখ তুলে তাকায় হিমাংশু। ইংল্যান্ডের একটা উইকেট পড়লো। কয়েকজন প্রৌড়ের কলরব আর বিয়ার মাগের ঠোকাঠুকি। তার কাছের দেওয়াল-টিভিতে পার্লামেন্টের সেশন, লাইভ ফ্রম ক্যানবেরা। লেবার আর লিবারালদের মধ্যে জোর বিতর্ক হচ্ছে পার্লামেন্টে রিফিউজি ক্রাইসিস নিয়ে ওপেন ডিবেট করা উচিৎ কিনা তা-ই নিয়ে। ইহারে কয় বিতর্ক নিয়ে বিতর্ক। হিমাংশু বিয়ারে সিপ নিয়ে ফলো করে যায়। আরো বেশি সংখ্যক রিফিউজি নেওয়া উচিত অস্ট্রেলিয়ার, 'হিউমানিটারিয়ান ক্রাইসিস' ‘আইসিস’, ‘রেসপন্স’--এইসব শব্দ লোফালুফি চলছিলো। গণতন্ত্রের রিয়ালিটি শো। কাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে প্রবেশের? খ্রীস্টান নাকি মুসলিম? ধর্মের নিরিখে কি বর্ডার পেরোবার পাসপোর্ট মিলবে? সিরিয়ায় যুদ্ধ করতে কেন সৈনিক পাঠিয়েছিলো অস্ট্রেলিয়া? প্রশ্নগুলো কঠিন আর উত্তরও তো অজানা। হিমাংশু চোখ তুলে তাকালো। পাশাপাশি অনেকগুলো বাদামী ঘোড়া একে একে হার্ডল ক্রস করে চলেছে। কে জিতবে? কার ওপর বাজি রয়েছে? এরা কোন দেশের নাগরিক? হিমাংশু খবরের কাগজে চোখ ফেরালো। মাথার ভেতর মনোলগ চলতে থাকলো। নিসঙ্গতায় ডায়ালগ না থাকলে মনোলগই যেন বল-ভরসা।
অস্ট্রেলিয়ান টেলিভিশনে দেখা একটা বিজ্ঞাপন মনে পড়লো হিমাংশুর। একটা লোক গলায় বোর্ড ঝুলিয়ে টাউন হলের সামনে দাঁড়িয়ে। তাতে লেখা: “ফাক রিফিউজিস”। একের পর এক লোক বোর্ড পড়ে লোকটাকে গাল দিচ্ছে, শেষে একজন মারধোর করতে তেড়ে আসছে। কাট টু টাউন হল। লোকটা। এবার গলার বোর্ডে লেখা “ হেল্প রিফিউজিস। ডোনেট।” কেউ কোনো উচ্চবাচ্চ না করে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। UN এ কূটনীতির মুনাফা না মানবতাবাদের দোহাই? নাকি দুটোই নাকি কোনটাই না? কেন ইনটেক? কেনই বা টার্ন ব্যাক? সব গুলিয়ে গেলো হিমাংশুর। অদূরে টেবিলটায় মেয়েদুটো উঠে দাঁড়ালো। হিমাংশু লং-বুটজোড়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। শব্দ উত্পাদন করতে করতে ভাঁজে ভাঁজে বেরিয়ে গেলো ওরা। 
হিমাংশু দুনম্বর বিয়ার নিয়ে নিজের টেবিলে ফিরে এলো। ডানহাতের দেওয়ালে একটা ইনফিনিটির সাইন। লাইন ড্রয়িং অফ এ মেজ। ভার্টিকাল এইটের দুটো গোলাকার অংশ জুড়ে অসংখ্য জটিল পথ পথান্তর। কোন পথে কোথায় পৌঁছনো যাবে হলফ করে বলা মুশকিল। কোথায় বাধা আসবে, থেমে যেতে হবে, অপেক্ষা করতে হবে অনুপ্রবেশের—জানা নেই। কিন্তু এইটের মাঝামাঝি যেখানে ওপর নিচের দুটো শূন্য একে অপরকে ক্রস করেছে, সেখানে সাদা পাতার ওপর একটা ছোট্ট মাকড়সা বসে রয়েছে। প্রথমে বুঝতে পারেনি হিমাংশু। তারপর একটু কাছে গিয়ে বুঝলো, না মাকড়সাটা আর্ট-ওয়ার্ক বা ড্রয়িং নয়। সেটা জ্যান্ত, ঠায়, ইনফিনিট এইটের মাঝখানে। আগামীর পথ খুঁজছে। সে কোন শূন্যের নাগরিক? তাকেও কি ইনটেকের কথা ভাবতে হয়? হিমাংশুর সব কেমন গুলিয়ে ঘেঁটে যায়। তাড়াতাড়ি করে বিয়ারটা শেষ করে টেবিল থেকে উঠে শেষবার তাকালে দেখে মাকড়সাটা আর নেই গোলকধাঁধার কোথাও। সে কি আদৌ ছিলো ওখানে? তার কি দরকার হয়েছিলো ওখানে থাকার? হিমাংশু পানশালা থেকে বেরিয়ে এলো রাস্তায়। ১০ মিনিটের হাঁটা পথ অফিস। আবার থিসিস থেকে থ্রম্বথিসিস। রক্তপতন আর সমাপতন। বালিতে মুখ বসে গেছে তার। আলতো ঠোঁটে বালিতে গর্ত করে একটা একটা করে শব্দ সেঁধিয়ে দিচ্ছে মাটির গভীরে। বালির ওপর আর দাঁড়াবে না পাদুটো। ঢেউগুলো পিছিয়ে পিছিয়ে সমুদ্রের বুকে ফিরে গেলে দাঁড়িয়ে থাকা পায়ের আশপাশে এরকম গর্ত উঁকি মারে। পায়েরা ঢুকে যায় গর্তে। গোটা শরীর একটু টলমল করে ওঠে তখন। এখন দেবে যাওয়া বালির মধ্যে দাঁড়ানো শরীরের গল্প শেষ হয়েছে। মুখের ভেতর আজকাল বালির গন্ধ পাওয়া যায়।



অর্ক চট্টোপাধ্যায়
Arka Chattopadhyay

Popular Posts