Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS

এক অন্ধকার বিষণ্ণতার বোধ: একটি দেশদ্রোহী গদ্য - অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

এক অন্ধকার বিষণ্ণতার বোধ: একটি দেশদ্রোহী গদ্য

এইসব উপজাতি [?] শুধু যে অটল সংকল্প নিয়ে নিজেদের রক্ষা করে তাই নয়, তারা শত্রুদেরও অত্যন্ত বেপরোয়া সাহসিকতা নিয়ে আক্রমণ করে। তাদের মনের এমন একটা শক্তি আছে যা বিপদের আশঙ্কা কিংবা মৃত্যুভয়ের থেকে জোরালো।
নাগা জাতি সম্বন্ধে একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তার মন্তব্য, আনুমানিক ১৮৪০ খ্রীষ্টাব্দ 

রিশাং জেগে আছে—শীত, ১৯৫২ 
রিশাং সাখরি’র বয়স হইয়াছে। নয়-নয় করিয়াও নব্বুই তো হইবে। রিশাং যদিও বলিতে পারে না তাঁহার বয়স কত। কানে শোনে না। চোখে দেখে না। জলের নীচে তাকাইয়া দেখা জগতের মতো ঝাপসা আর ঘোলাটে তাহার জগৎ। কখনও পেচ্ছাপ-পায়খানা বিছানাতেই করিয়া ফ্যালে। শরীর ও জীবনের অসহায়ত্বের নিকট সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করিয়া মল ও মূত্রের কর্দমাক্ত মাখামাখির ভিতর চুপচাপ শুইয়া থাকে। ভাষাহীন চোখে ফ্যালফ্যাল করিয়া চায়। নষ্ট মার্বেলের মতো রিশাং-এর চোখের মণি তখন যেন এই জগতের নয়, অন্য কোনও জগৎ হইতে তাহা আসিয়াছে। তবু নাতনির বকবক শুনিবার ভয়ে কখনও দেয়াল ধরিয়া ধরিয়াও যায়। একাই যায়। কাহাকেও ডাকে না। কিন্তু শৌচাগার অবধি পৌঁছাইবার পূর্বেই যাহা হইবার হইয়া যায়। তখন আর পথ চিনিয়া বিছানায় ফিরিতেও পারে না। অকুস্থলেই বসিয়া পড়ে। ঘরের ঢালু দিক দিয়া হলুদাভ প্রস্রাব বহিয়া যায়। ভয়ে ডাকিতেও পারে না। কথা বলিলে কাঁপা-কাঁপা লম্বা একটা চিকন সুর বাহির হয় গলা দিয়া। বসিলে একটা পুঁটুলির মতো গোল দলা হইয়া থাকে। মনে হয়, এখুনি গড়াইয়া পড়িয়া যাইবে। শুধু কানে যখন রেডিও গুঁজিয়া শুইয়া থাকে, অসম্ভব জ্বলজ্বল করে বৃদ্ধের চোখ। দাঁতহীন মুখের দুই মাড়ি পরস্পর চাপিয়া ধরে। ব্রিটিশের বেয়নেটে চোয়াল দুইটা ভাঙিয়া ভিতরের দিকে ঢুকিয়া গিয়াছে। গালের দুই পাশে গ্রীষ্মকালীন খরাসর্বস্ব দুইটা পুকুর যেন। তাহাদের তলদেশ বুঝি মুখের ভিতর একে-অপরের প্রান্তভূমি চুম্বন করিয়াছে। কানে কিছুই শোনে না। তবু রেডিওটা তাঁহার চাই। ফিজোর নামটা যদি একবার শুনা যায়। ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দে এই রিশাং-এর প্রতিরোধ বাহিনীর কাছেই অস্ত্র নামাইয়া আত্মসমর্পণ করিয়াছিল এক রেজিমেন্ট ব্রিটিশ বাহিনী।  

ইতিহাস—বর্তমান—ভবিষ্যৎ
অদ্য যাহা ইতিহাস, একদিন তাহাই ভবিষ্যৎ ছিল। কেম্ব্রিজের ইতিহাসের এক অধ্যাপক এমনটাই বলিয়া থাকেন তাঁহার ছাত্রদের। আমরা যাহারা ‘ষত্ব ণত্ব বিধিতে সিদ্ধ’ শিক্ষিত শহুরে মানুষ তাহারা ইতিহাস ও ভবিষ্যতকে প্রস্রাবরত পুরুষের ডান ও বাম পদ সদৃশ দুই পার্শ্বে ছড়াইয়া মধ্যিখানে যথায় মূত্রত্যাগ করিতেছি, তাহার নাম দেওয়া হইয়াছে বর্তমান।

তবে একটা ইন্টারভিউ হয়ে যাক—ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২
’৫২ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি, দিল্লিতে প্রচণ্ড শীতে সাংবাদিক বৈঠক করিতেছেন ঊনচল্লিশ বৎসরের ছোটোখাটো চেহারার, ফর্সা, রোগাপাতলা এক কবি ও আগুনখেকো নেতা আংগামি জাপু ফিজো। যাঁহার মুখের ডানপার্শ্ব পক্ষাঘাতজনিত কারণে বেশ খানিকটা বাঁকা। তামাম ভারতের সাংবাদিক হতবাক হইয়া শুনিতেছে তাঁহার কথা। ফিজো বলিতেছেন,
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম আমরা চালিয়ে যাব। এবং একটি স্বতন্ত্র নেশনের প্রতিনিধিরূপে নেহরুর সঙ্গে আবার একদিন দেখা হবে বন্ধুত্বপূর্ণ বন্দোবস্তের জন্য।
ঝাড়খণ্ড নেতা জয়পাল সিংহ ফিজোর সম্মানে এক দ্বিপ্রাহরিক ভোজের আয়োজন করিয়াছেন। রাষ্ট্রীয় ভবনের ডাইনিং প্লেসে বিরাট ও সুদৃশ্য খাবার টেবিলে কাচের বাটি হইতে চিকেন রেজালা তুলিয়া দাঁতে কাটিতে-কাটিতে জয়পাল ফিজোকে বলিলেন,
দেখুন, ভারতকে আরও টুকরো টুকরো ক’রে নতুন পাকিস্তান বানানোয় আমাদের সম্মতি নেই। আপনি বরং স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের দাবি না ক’রে উত্তর-পূর্বে একটা উপজাতীয় রাজ্য গঠনের জন্য সংগ্রাম করুন। যেমন আমি করছি ঝাড়খণ্ড নিয়ে।
উত্তরে কবি তাঁহাকে জানাইলেন, 
আপনারা ইতিহাস আর ভূগোলে বড্ড কাঁচা। আপনাদের অবস্থান থেকে আমরা আপনাদের নর্থ-ইস্ট। আমি এখানে একটু সংশোধন ক’রে দিচ্ছি, আমরা আপনাদের ভারত রাষ্ট্রের নর্থ-ইস্টে অবস্থিত ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দুই, আমরা কোনও উপজাতি নই। একটা স্বতন্ত্র জাতি। আমাদের ভাষা কোনও উপভাষা নয়। আমাদের সংস্কৃতি কোনও উপ-সংস্কৃতি নয়। আপনি বোধহয় জানেন না যে, আমরাই, নাগারাই সবচেয়ে বেশি স্বশাসিত। আপনার এইসব না-জানাগুলো দোষের নয়। আপনারা নিজেদের দেশে জাতীয় আন্দোলন করেছেন। ইংরেজদের সাথে চিঠিপত্র লেখায় আপনারা অনেকদিন ছিলেন ব্যস্ত। জানার সময় পাননি। আমাদের দেশে সত্যাগ্রহ করতে তো যাননি আপনারা। কোনও আইন অমান্য করতেও যাননি। কোনও গান্ধী টুপি পরা কংগ্রেস নেতা কখনও এইসব পাহাড়ে আসেননি। আজকে আপনারা নিজেদের দেশে ক্ষমতায় এসেছেন এবং আমাদেরকে ভারতের সাথে জুড়ে দিতে চাইছেন। বেশ তো, তবে একটা ইন্টারভিউ হয়ে যাক। আপনাকে একটা প্রশ্ন করি, বলুন তো, এই যে আমাদের এখানে আমরা নাগা, মিজো, খাসি, জয়ন্তীয়ারা একসাথে থাকি, আমাদের নামে এই নাগা-মিজো-খাসি-জয়ন্তী পাহাড়গুলোর নাম হয়েছে নাকি এই পাহাড়গুলোর নামেই আমাদের নাম? আপনি ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়েছেন মিস্টার ইন্ডিয়া। বলুন? কী যোগ্যতা আছে আপনার যে আমরা আমাদের নেশন আপনাদের হাতে তুলে দেব? আমাদের মধ্যে জাতিভেদ নেই, আপনাদের আছে। আমাদের মধ্যে লিঙ্গবৈষম্য খুবই কম, আপনারা প্রগতিশীলেরা এখনও এর থেকে বেরুতে পারেননি। ভারতের মানচিত্রের সাথে আমাদের কোনও টান নেই। আপনাদের টানটা কী বলুন তো? ভারতের অন্যান্য জায়গার লোকেদের থেকে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক আমরা। আপনাদের সভ্য মানুষদের মতো শেয়ার মার্কেটে ব’সে চেঁচামেচি করি না। 
ভোজসভা শেষে ফিজো যখন বাহির হইয়া আসিতেছেন তখন দোর্দণ্ড্যপ্রতাপ পরাক্রমশীল রাজার কোনও দূত যেরূপে তুচ্ছ বিদ্রোহীর সম্মুখীন হয় সেইরূপে জয়পাল ফিজোর সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইলেন। এই শীতেও জয়পালের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ফিজো জয়পালের সেই ঘামগুলির দিকে তাকাইয়া বলিলেন,
আপনি হয়ত জানেন সাতচল্লিশ সালে আমি এসেছিলাম এখানে গান্ধীর সাথে দেখা করতে। উনি ঠিক কী বলেছিলেন আমায়, আপনার জানা উচিত। উনি বলেছিলেন, আমরা চাইলেই স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারি। কেউ আমাদের ভারতে যোগ দিতে বাধ্য করতে পারে না। দিল্লি যদি সৈন্য পাঠায় তাহলে তিনি নিজে নাগা পাহাড়ে এসে আমাদের সঙ্গে লড়বেন। গান্ধী এও বলেছিলেন, উনি দিল্লিকে বলবেন, একজন নাগাকেও গুলি করবার আগে তারা যেন গান্ধীকে গুলি করে।      
গাড়িতে উঠিয়া আবার নামিয়া আসিলেন ফিজো। পাদানিতে ডান পা রাখিয়া জয়পালকে হাতের ইশারায় ডাকিলেন। জয়পাল নিকটে আসিলে ফিজো বলিলেন,
আমি ফিরে গিয়ে আপনাকে ইন্টারভিউয়ের রেজাল্ট পাঠিয়ে দেব।

শুধু হাড় আর হাড়—অক্টোবর, ’৫২
ফিজো অরণ্যাবৃত পর্বতে ফিরিয়া গেলেন। নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিল খোনোমা গ্রামের আংগামি নাগাদের লইয়া গ্রামে গ্রামে গড়িয়া তুলিল গৃহরক্ষী দল। ঊনিশ শতকের শেষার্ধে এই গ্রামের লোকেরাই রহস্যময় কুয়াশার ভিতর জাগিয়া উঠা পাহাড়ের চুড়ায় শ্বেত সমুদ্রের দ্বীপে আর অরণ্যাবৃত পর্বতমালায় আংগামি রিশাং সাখরির নেতৃত্বে রুখিয়াছিল হানাদার ব্রিটিশ সৈন্যকে। এইবারে আরও একটা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইল এই গ্রাম। ঊনিশ শতকের সেই বিপ্লবীদের সন্তান-সন্ততিরাই রাত্রি জাগিয়া পোস্টার লিখিল। ‘স্বাধীনতা চাই এখন, স্বাধীনতা চাই অনন্তকাল’। ‘এটাই আমাদের প্রাণের কথা, এটাই হবে আমাদের মরণকালেরও কথা’। অসমের রাজ্যপাল আকবর হায়দারির সচিব নাগা নেশন পত্রিকায় আন্দোলনকে ব্যঙ্গ করিয়া লিখিলেন এক কুকুরের গল্প। যাহার মুখে ছিল এক টুকরা হাড়। ফিজো বলিলেন, শুধু হাড় আর হাড়। ওর কি ধারণা আমরা কুকুর? অক্টোবরে দিল্লিকে ফিজো পাঠাইলেন তাঁহার চরমপত্র। তাহাতে লিখিলেন,
এমন একটা জিনিসও নেই যাতে ভারতীয় আর নাগাদের মধ্যে মিল আছে। ভারতীয়দের দেখা মাত্র আমাদের মনে এক অন্ধকার বিষণ্ণতার বোধ জেগে ওঠে।  


পাপা, ওরা চলে যাচ্ছে—এপ্রিল, ’৫৩
       কোহিমায় নেহরুর সভা। সঙ্গে বর্মার প্রধানমন্ত্রী উ নু। নেহরু পরিয়া আছেন তাঁহার বিখ্যাত জহর কোট। কন্যা ইন্দিরাও তাঁহার পাশে। মঞ্চে নেহরু প্রবেশমাত্র নাগা শ্রোতারা সভা ত্যাগ করিয়া উঠিয়া গেলেন। যাইবার সময় স্বীয় অন্তর্বাস নামাইয়া পশ্চাদ্দেশ অনাবৃত করিয়া দেখাইতে ভুলিলেন না। মঞ্চে তখন মাইক্রোফোন বসিয়া গিয়াছে। তাহাতে কানেকশানও আনিয়া দিয়াছেন সাউন্ড মেকানিক। ইন্দিরা তাঁহার পিতাকে বলিলেন, পাপা, ওরা চলে যাচ্ছে। পরিষ্কার শুনা গেল সেই কথা।  

জ্বলছে প্রাণে অনেক জ্বালার চকমকি আজ
       অসম রাইফেলসের এক বিরাট ডিভিসন তো ছিলই, এইবার আরও এক রেজিমেন্ট গোলন্দাজ, সতেরো ব্যাটেলিয়ন ইনফ্যান্ট্রি আর অসম রাইফেলসের পঞ্চাশটি প্ল্যাটুন হড়হড় করিয়া ঢুকিয়া পড়িল নেফায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত বিপুল অস্ত্র লইয়া ফিজোও সাজাইলেন তাঁহার প্রতিরোধ বাহিনী। তাহার সেনাধ্যক্ষ হইলেন জেনারেল কাইটো। তাঁহার অধীনে চারিজন সেনাপতি। যাঁহাদের সৈন্যদলে রহিল ব্যাটেলিয়ন আর কোম্পানি। জাপানি আর ব্রিটিশ রাইফেল, স্টেন গান, মেশিন গান, হাতে নির্মিত গাদা-বন্দুক আর প্রত্যক্ষ সংগ্রামের জন্য দাও লইয়া প্রায় পনেরো হাজার গেরিলা সৈন্য তুয়েনসাং-এর জঙ্গলে দাঁড়াইয়া রহিল ভারতীয় সৈন্যকে মোকাবিলার জন্য। ইহা এমন এক দেশ যেস্থলে ভালোমতো ঘাঁটি গাড়িয়া থাকা একটা ছোট প্ল্যাটুন একটা ডিভিসনকে, একটা কোম্পানি একটা আস্ত আর্মি কোরকে রুখিতে পারে। একবার তাহাদের বাপ-ঠাকুর্দা এই জঙ্গলেই ব্রিটিশকে রুখিয়াছে। এইবার তাহাদের পালা। পায়ের নীচে যে পিষ্ট হয়, সরকারি বুটের চাপকে তাহার অধিক কে চিনিতে পারে? ব্রিটিশ চলিয়া গিয়াছে। তাহার বুট পরিয়াছে ভারত। রাজা যায় রাজা আসে। রং বদলায় বুট বদলায় না। বুটের নীচে প্রকৃত পেরেক হইয়া জন্ম নিল কয়েক সহস্র তরুণ আংগামি। ওদিকে মহান ভারতীয় সেনাবাহিনী তাহাদের নৃশংসতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইল। নিরস্ত্র নাগাদের মারিয়া তাহাদের উলঙ্গ মৃতদেহ টাঙানো হইল গাছে। ফিজো তাঁহার সেনাবাহিনীর সহিত এইবার গড়িলেন অনিয়মিত সেনাদল। গ্রামে গ্রামে প্রস্তুত হইল ছোট ছোট স্বেচ্ছাসেবী দল, বার্তাবহ দল, নারী স্বেচ্ছাসঙ্ঘ। গঠিত হইল নাগাল্যান্ডের ফেডেরাল সরকার। অঙ্কিত হইল স্বাধীন নাগাল্যান্ডের জাতীয় পতাকা। তবে, আরও একটি কাজ বাকি ছিল ফিজোর। ভারতকে তাহার ইন্টারভিউয়ের ফলাফল জানানো। নয়া দিল্লি ইহার সাত দিন পর একটি খাম পাইল। খাম খুলিয়া দ্যাখে তাহাতে একটি শাদা কাগজ। কাগজে লিখা, ‘ডিসকোয়ালিফায়েড’। নিম্নে আংগামি জাপু ফিজোর সহি।
চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়
বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন শান্তির সহায়ক শক্তি। শ্বেত কপোত উড়িতেছে তাহার দু’ডানা মেলিয়া। বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন নির্জোট শক্তির পক্ষে। বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন বাঁকে করিয়া গান্ধীর শান্তির ললিত বাণী লইয়া যায়। বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বশান্তির পক্ষে। বহির্দুনিয়ায় ভারতের তখন বহুত্ববাদের কথা। বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন সোশ্যালিস্টিক প্যাটার্ন অব ভিউ।
বহিরাগত এবং সাংবাদিক প্রবেশ রুদ্ধ করিয়া এহেন বহির্দুনিয়ার সম্পূর্ণ অগোচরেই ভারতীয় সেনাবাহিনী তখন তাহার বন্দুকের নল হইতে উৎসারিত ক্ষমতা লইয়া নেফায় ঢুকিয়াছে এবং তাহার ‘ক্লিন অ্যান্ড সাকসেস্‌ফুল’ অপারেশন সম্পন্ন করিতেছে।
ইহারও কয়েক যুগ পর সারা দেশ মাতাইয়া দিবে একটি গান। সঙ্গে তাহার পাগল করা বাজনা আর মদালসা কন্ঠ। চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায় চোলি কে পিছে। প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা।

ফিজো কোথায় গেলেন!
       ’৫৬ হইতেই ফিজো নিখোঁজ। যুদ্ধ চলিতেছে। ফিজোর নেতৃত্বেই চলিতেছে। কিন্তু ফিজো নাই। ওই কুয়াশা আর জঙ্গল ছাকনি দিয়া ছাকিয়াও ফিজো নাই। গ্রাম জ্বলিতেছে। গির্জা জ্বলিতেছে। আসল লোকটার দেখা নাই। ’৫৬-তেই ফিজো বর্ডার পার হইয়া বর্মায়। সেখান হইতে পূর্ব পাকিস্তান। সেখান হইতেই আন্দোলন পরিচালনা। কিন্তু এইবারে সময় হইয়াছে ‘ভারত’ নামের এই তথাকথিত শান্তির দূতের ঘুঙ্ঘট উত্তোলনের। জলের তলায় ডুবিয়া থাকা প্রাণী যেভাবে হঠাৎ ভুস্‌ করিয়া উঠিয়া আসে, ’৫৯ সালে ফিজো আচমকাই উঠিয়া আসিলেন লন্ডনে। পুরাটাই ডুবসাঁতারে আসা। পূর্ব পাকিস্তান হইতে এল-সালভাদোরের একটি জাল পাসপোর্ট জোগাড় করিলেন। সোজা সুইটজারল্যান্ড। যোগাযোগ হইল দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য আন্দোলনের কর্মী মাইকেল স্কটের সহিত। তাঁহারই সাহায্যে ইংলন্ডে আসিলেন ফিজো। একের-পর-এক সাংবাদিক সম্মেলনে গণপ্রজাতান্ত্রিক ভারত রাষ্ট্রের সামূহিক ঘোমটা উন্মোচিত হইল। বিলাতের সংবাদপত্র ভরিয়া গেল ভারত সরকার ও সেনাবাহিনীর ধর্মে ও কর্মে মহান এই দুর্ধর্ষ কীর্তিতে। দিকে দিকে রব উঠিল ‘এন্‌কোর এন্‌কোর’।
       দিকে দিকে ভারতও অন করিল তাহার মিডিয়া মেশিন। আচমকা মৎস বাহির হইয়া আসিলে কিছু ত্রাহিমধুসূদন শাক তো দরকার হইবেই। দিবালোকে অকস্মাৎ উন্মুক্ত লজ্জাস্থান আচ্ছাদনে তৎপর হইয়া অতঃপর তাই ভারতীয় সরকারি মিডিয়া অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনে জানাইলেন যে, ফিজো ম্যাট্রিক ফেল। তিনি প্রথম জীবনে মোটর-পার্টসের ব্যবসায় ব্যর্থ হইয়াছেন। অতঃপর বীমা কোম্পানির দালালি করিতে গিয়াও সফল হন নাই। পক্ষাঘাতে তাঁহার মুখও বিকৃত হইয়াছে। অতএব ইত্যাদি এবং এমতসব ব্যর্থতা ও বিফলতার ভগ্নমনোরথের ভগ্ন চক্র দ্বারা তাঁহার মানসিক গঠন নির্ধারিত হইয়াছে।

শীত, ’৫৯
এই শীতেই বোধহয় মরিয়া যাইবে রিশাং। জ্বরে আর হাঁপানিতে কাহিল। চোখে দেখে না। কানে শোনে না। তবু রেডিওটা কানে গুঁজিয়া আছে। বয়স ৯৯। আর কিছুই মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে, সেই যেন কত শ’ বছর আগে, যেন এই জন্মেরও আগে, তুয়েনসাং-এর ঘন জঙ্গলে অস্ত্র মাটিতে রাখিয়া তাঁহার সামনে হাত তুলিয়া দাঁড়াইয়া আছে ব্রিটিশ রেজিমেন্ট। প্রস্রাবে মাখামাখি হইয়া, প্রস্রাবের এই ঝাঁঝাল ও উগ্র গন্ধকেও তাঁহার মনে হয় জঙ্গলের পাতা আর কুয়াশার গন্ধ। হাতের রেডিওটিকে মনে হয় গ্রেনেড। বয়স ৯৯। চোখে দেখে না। কানে শোনে না। আর কিছুই মনে পড়ে না।    

পুরু ও আলেকজান্ডার
       এ গল্প ইতিহাসের গল্প নয়। গল্পেরও একটা ইতিহাস থাকে, যদি সেই ইতিহাসের দিকে তাকাই তবে হয়ত দেখিব, আজ যাহা ইতিহাস একদিন তাহা অভীষ্ট ও কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ ছিল না। যেহেতু ইহা গল্প, তাই কল্পনায় কিছু গোরুও থাকিবে। উহাদিগের মধ্যে কিছু গোরু যেমন গোমাতা হইবেন, কিছু গোমাতা বৃক্ষারোহণও করিবেন। কিছু গোরু দুর্ভিক্ষে খরায় মাঠে-ঘাটে জলহীন ডোবায় মরিয়া পড়িয়া থাকিবে। সেই গোরুগুলা অবশ্য গোমাতা হইবে না। আমরা বরং গাছে উঠা গোরুটার সহিত একটু কথা বলি। দেখি সে কী বলিতেছে। 
      
আমিঃ ও গোরু, তুমি গাছে উঠিয়াছ কেন!
গল্পের গোরুঃ আমাকে তো তুমিই তুলিয়াছ গাছে। এখন নামিব কী প্রকারে বলো
আমিঃ নামিবে পরে। এইবেলা নামিলে আবার ঘাস চিবাইতে শুরু করিবা। আমার কথা শুনিবা না
গ.গোঃ কী শুনিতে চাও বলো
আমিঃ যাহা জানো তাহাই বলো
গ.গোঃ আমি অনেক কিছুই জানি। তুমি কোনটা শুনিতে চাও সেইটা বলো
আমিঃ এই গল্পের শেষে কী হইল? 
গ.গোঃ কী আবার হইবে। তুমি মনে করো একটা বাটী পাইলে। বাটীতে দশটা ঘর। দশটা ঘরে দশ জনা লোক। তাহার মধ্যে একটা ঘরে তুমি কোনও কালেও যাও নাই। সেই ঘরের লোকটাকেও তুমি চেনো না। একদিন যখন তুমি গোটা বাটী নিজের নামে করিতে গেলে, তখন সেই একটা ঘরের লোক বলিল আমি তো তোমাকে চিনি না। তুমিও আমাকে চেনো না। তুমি কখনও আমার সহিত আসিয়া গল্প করো নাই। তুমি খালি বাকি ন’জনের ঘরেই গিয়াছ, চা পান করিয়াছ, পান খাইয়াছ। পান খাইয়া ঠোঁট আরক্ত করিয়া ফস্‌ করিয়া দিয়াশলাই দিয়া সিগ্রেট জ্বালাইয়াছ। সিগ্রেট জ্বালাইয়া ঊর্ধ্বপানে ধুম্র ত্যাগ করিয়াছ। এখন আমার ঘর আমাকে আলাদা করিয়া দাও। আমি তোমার বাটী হইয়া থাকিব না। এই তো গল্প।
আমিঃ তুমি ফিজোর কথা বলো
গ.গোঃ ফিজো একটা চিঠি লিখিয়াছিল, তাহা জানো?
আমিঃ চিঠি? কাহাকে লিখিয়াছিল?
গ.গোঃ কাহাকেও না
আমিঃ কাহাকেও না মানে?
গ.গোঃ আরে, ফিজো একজনকে চিঠি লিখিয়াছিল, তাহার নাম কাহাকেও না
আমিঃ কী লিখিয়াছিল তাহাতে?
গ.গোঃ সে জানিতো আলাদা বাটী তাহার হইবে না
আমিঃ  হইবে না কী প্রকারে? 
গ.গোঃ কী করিয়া হইবে বলো, তাহার ঘরের একদিকে চীন, একদিকে বর্মা, আরেকদিকে পূর্ব পাকিস্তান। এই প্রকার স্থানে আলাদা বাটী হয়? হইলেও কে দিবে?
আমিঃ তাহা হইলে এত হাঙ্গাম সে করিল কেন?
গ.গোঃ দ্যাখো, আমি তো গোরু। যদি দেশের সব ঘাস ফুরাইয়াও যায়, আমাকে যদি মানিয়া লইতেই হয় যে আমাকে এখন হইতে পোকামাকড় আর হাঁস-মুরগি ধরিয়া খাইতে হইবে, তথাপি কি আমি ঘাস খাইবার কথা ভুলিতে পারিব, বলো? যুদ্ধে পরাজয় বরণ করা যাইতে পারে, কিন্তু জীবনে কি পরাজয় বরণ করা যায়?  

’৬৩-র পয়লা ডিসেম্বর নাগাল্যান্ড রাজ্য গঠিত হইল। ’৬৪ সালে নাগাল্যান্ডের ব্যাপটিস্ট চার্চ গঠন করিল পীস মিশন। সেপ্টেম্বরে নাগাল্যান্ডের রাজ্যসরকার আর ফেডারাল রিপাবলিক অব নাগাল্যান্ডের মধ্যে যুদ্ধবিরতির চুক্তি হইল। ওই মাসেই নাগা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সহিত আলোচনায় বসিল ভারত সরকার। এই আলোচনায় মুখামুখি হইলেন নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিলের নেতা আইজ্যাক স্যু এবং ভারতের বিদেশ সচিব ওয়াই. ডি. গুণ্ডেভিয়া। আলোচনার শুরুতেই আইজ্যাক বলিলেন,
আজ আমরা এখানে দুই নেশন হিসেবে পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছি—নাগারা আর ভারতীয়রা।   

…………………………………………………......
[‘নাগা ক্রনিকল্‌’; ‘নাগাল্যান্ড : দ্য নাইট অব দ্য গেরিলাজ’; ফিজোর লেখা ‘এ ফেট অব দ্য নাগা পিওপল্‌ : অ্যান অ্যাপীল টু দ্য ওয়ার্ল্ড’ প্রভৃতি বই এবং বিশেষ ক’রে ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ’র ‘ইন্ডিয়া আফটার গান্ধী : দ্য হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ডস্‌ লার্জেস্ট ডেমোক্র্যাসি’—এই বইগুলো থেকে দু’হাত ভ’রে তথ্য, নথি, রেফারেন্স ব্যবহার করেছি। ব্যবহার করেছি সুমনের দু’টি গানের লাইন। একটি বহুল প্রচারিত হিন্দি গানের কলিও। এ লেখাকে ফিকশন না ব’লে ফিল্মের ভাষায় ডকুমেন্টারি বলা যায়।—লেখক]

২৩ জুন, ২০১৬



অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

Arjun Bandyopadhyay

Popular Posts