Tuesday, July 18, 2017

ঈশ্বরের ভেজা ডানা : আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়

ঈশ্বরের ভেজা ডানা

চেনা মেঘ, ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া হ্যালোজেন কফ থুতুর দাগ পেরিয়ে যখন উঠলাম কলেজস্ট্রিটের বাসে, তখন আমি সেই বাসের একমাত্র প্যাসেঞ্জার। না একটু ভুল হচ্ছে কোথাও, ছিল আরেকজন। জানলার ধারে সিট ছিল আজ, তাই বসা হল না। গোটা বাস ফাঁকা পেয়ে কিছুতেই বুঝতে পারলাম না কোথায় বসা ভালো! জয়িতা রেগে আছে হয়তো, রাগবে না ই বা কেনো। রোজই কাজ সেরে উঠে ঘুমিয়ে পড়ি রাত্তির হয়ে গেছে বলে। কথা দিই যে কথা বলব, পেরে উঠি না! এরপর অশান্তি হয় কিছুটা, প্রতিবারই হয়। তাও জানি সামনে গিয়ে দাঁড়াতে পারলে গলে যাবে ও। যায়ও প্রত্যেকবার! ও একটা সাংঘাতিক স্বপ্ন দেখে মাঝে মাঝে, কুঁকড়ে যায়। আমায় পায় না। মেয়েটা হয়তো ভুলই করছে। হাওড়ায় এর আগে কখনও প্রজাপতি দেখিনি আমি, স্টেশন চত্ত্বরে, পাক খেতে খেতে বাসে উঠে পড়েছে আমার পিছু পিছু। তারপর হারিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে। বাসটা প্রাইভেট, টুকটুক করে কচ্ছপের মতো পেরোচ্ছে ব্রীজ। আজকাল আর ভিড় ভালো লাগে না। নিতে পারি না বেশি। এত মত এত ভাব এত আদর্শ, সাধুও বলে তাই, ও নিজেও এড়িয়ে চলে ভিড়, দক্ষ হাতে, আমি শিখি, যেমন শিখি বাস খালি থাকলে ড্রাইভার কন্ডাক্টররা কীভাবে কাছের হয়ে ওঠে। আমাদের অনেক কিছুই মেলে। সেগুলো একদিকে ফেলে, না-মেলাগুলো যাপন করি প্রাণপন। হাঁটতে হাঁটতে কোথাও তো পৌঁছোবো! দু’পা এগিয়ে গেলে তো শুরুর বিন্দুও অভিমত বদলায়, দেখিনি পিছনে সেও কোনো স্বার্থ খোঁজে কি না! খুঁজলেই বা কী। কালাকার স্ট্রিটের মুখের জ্যামটা গল্পে আসে আমার, রোজই, মা বাবা কে শোনাই সময় পেলেই। শুনেছি বড়বাজার থানায় নাকি বিরাট ঘুষের লেনদেন অথচ এই মোড়ের সেই পুলিশ ভদ্রলোককে আমি পাঁচ বছর এভাবেই দেখছি, কিরকম বাবা বাবা দেখতে, ইনি কি ঘুষ নিতে পারেন? প্রজাপতিটা চমকে দিল হঠাৎ, কোলে রাখা ব্যাগের একটা কোনায় বসল ভালো করে। এখনও যায়নি ব্যাটা। কি জ্বালা! অন্য জেলায় চলে এলি যে আমার সাথে! ফোনটা শুদ্ধেন্দুদারই। আগেও করেছে দাদা
কয়েকবার। রিসিভ করতে গেলেই কেটে যায় খালি। কি অদ্ভুতভাবে এবার ধরে ফেললাম ফোনটা, ‘আকাশ একটু কালিঘাট মেট্রোর সামনে আসতে পারবে?’ পারবই তো, আজ আমার আর কাজটা কী! একটু দাঁড়ান, রাস্তা ভেবে নিই কীভাবে যাব। চিতপুর রোডের কাছে এসে গিয়ার ফাঁসল বাসে ঘোঁ ঘোঁ শব্দে নড়ে বসল প্রজাপতি। আমি কিছুদিন যাবৎ সব সমস্যাই খুব সাবধানে মিটিয়ে ফেলতে পারছি, কেন জানি না... এতে কোনো ঐশ্বরিক সূত্র আমি খুঁজতে যাই না। শব্দে শব্দে উড়ে গেল প্রজাপতি, সুপ্রিয়র ফেরার রাস্তায় পরে কালিঘাট। দাঁড়েতে বলি। বলি আমি পৌঁছে যাব নিশ্চিন্ত থাক, আর অনেকদিন বাদে দেখা হচ্ছে তাই তৈরী হয়ে থাক। আমি কিন্তু আর সেরকম ফাজিল নেই আজ। আজ বেশ মেঘলা হয়েই আছি। হয়তো ছটা পনেরো বাজবে ভাই। দাঁড়াস। সুপ্রিয় দাঁড়াবে। হাসিমুখেই দাঁড়াবে। সেটা জেনেও সঙ্কোচ হয় দেরি হলেজানি না কীভাবে এরম হয়। আজ শেষ টুকরোর মোগলাইটায় যে আক্রমণ টা করলাম দুজনে, এ নেহাতই স্কুল জীবনের স্মৃতি, এরকম মেঘলা যাপনে তার কোনোই স্থান নেইকিন্তু এটা তো তুই, তুই সুপ্রিয়, তুই আমার ধেড়ে বয়েসের বন্ধু। কোনোদিন পাশাপাশি খোপে গল্প করতে করতে মুতেছি আমরা? না! তাহলে তুই কিকরে জানলি আমার এই স্মৃতি? কেন করে দেখালি সেই ঘটনা? আমায় কী পড়ে ফেলেছিস তোরা? ঈশ্বর কি ঘুমিয়ে পড়েছেন? লোভে লোভে বসে আছি বাসে। একদম মোড়ের মাথায় নেমে হাঁটব সেন্ট্রাল এভিনিউ ধরে। মেট্রোর উদ্দেশ্যে। আর ভুলে যাব কাকে কি কথা দিয়েছি, কোথায় এসে প্রজাপতি বসেছে, রাস্তা পেরোতে গিয়ে অবাঙালি মেয়েটা হঠাৎ কিরকম তাকিয়ে ফেলল আমার চোখে, ভুলে যাব সব। ওই মেয়েটা জানবে না আমি ওর বাদামি চুল দেখে জয়িতার কথা ভাবছিলাম। কনডাক্টর বুঝতেই পারবে না আমি দেখেও ছেঁড়া নোট টা নিয়ে নিয়েছি চুপচাপ। প্রজাপতি টা জানবে না আমি কত টাকার টিকিট কেটে কোথায় নামব। এইতো পারছি, আমার ঘামে ভেজা এম জি রোড, আমার সিটি কলেজ, গু লেপ্টে থাকা ফুটপাথ ছেড়ে এই তো বাঁক নিচ্ছে আমার সব কিছু। আমি কি তাহলে আমার ইচ্ছেতেই বাঁচব বাকিটাও? জামা টান করতে গিয়ে দেখলাম কাঁধে বসে আছে সে। নেমে এসেছে আমারই সাথে। জয়িতা, সাধু, সুপ্রিয়, তন্ময় বা শুদ্ধেন্দুদা কেউ পাঠায়নি ওকে। কাউকে চেনে না ও। কিংবা হয়তো চেনে। আমি জানি না কি করব এবার, ওকে কী উড়িয়ে দেব? যদি ও স্বপ্ন হয় আমার! হা ঈশ্বর বহুদিন পর তোমায় নিজের মধ্যে পাচ্ছি। উড়ে যেও না...






আকাশ গঙ্গোপাধ্যায়

Akash Gangopadhyay