Monday, July 24, 2017

সখী : গুলশনারা খাতুন

সখী

দোতলার ল্যান্ডিং পেরিয়ে আড়াই তলার মুখে ফ্ল্যাটটা। এখানে  বিল্ডিংগুলোর কনস্ট্রাকশন এরকমই। এক চিলতে জমি পেলেই তা দিয়ে জিকজ্যাক করে ফ্ল্যাট তুলে আখাম্বা বাড়ি তুলেছে মালিকরা। ল্যান্ডিং-এর আলোটা মাস পেরলে সারাবে বোধহয়। ব্যাগ হাতড়ে চাবি দিয়ে ফ্ল্যাটটা খুলতেই এক নিশ্বাস অন্ধকার। মোবাইল টর্চে এখন এলইডি আলো। বছর ঘুরলেও এ ঘরের দেওয়ালগুলো চেনা লাগে না দিতির। সেবার বোন এসে ঘরে একগাদা কায়দার আলো রেখে গেছে। সুইচ টিপলে দিত নিলচে দেওয়াল ঘরে লাল-নীল-সবজে আলোর রামধনু এফেক্ট। অবশ্য এই একবুক অন্ধকারটা আজকাল গা সওয়া হয়ে গেছে দিতির। বেশি আলোতে কেমন চোখ ধাধিয়ে যায়। ব্যাগটা মেঝে ফেলে সিগারেট জ্বালতেই সামনের দেওয়াল থেকে মা যেন নাক সিটিয়ে উঠল। সেই বাড়িতে প্রথমবার সিগারেট ধরা পড়তে মায়ের মুখটা যেমন হয়েছিল, আজও সেই এক্সপ্রেশন ইনট্যাক্ট। ভাল আছ তো মা?’ দিতি মনে মনে জিজ্ঞেস করে। মা-ও যেন ছবি থেকেই মুখ ঘুরিয়ে নেয়। গেল বার বোন এসেছিল যখন, তখন বোনের মোবাইলে মায়ের হাসি-হাসি ছবি দেখে দিতির কান্না-কান্না পাচ্ছিল। দিতি আবার দেওয়ালটার দিকে তাকায়। কিরকম ঘর জোড়া সুখে স্মৃতি। দেওয়লা আলমারিটা পাশে একটা বইয়ের তাক। উল্টো দিকে দিতির খাটের পাশে একটা ল্যাপটপ আর টি-টেবল। আর নীলচে দেওয়ালে সুখের ছয়লাপ। বাবা-মায়ের কোলে ছোট্ট দিতি। ঠাম্মু পাশে দিতি আর বোন। দার্জিলিং-এ মায়ের কোলে দিতি। মা আর বাবা আগ্রায়। কেমন যেন সব পাওয়ার জগৎ। দিতি হাসে। মনে মনে ভাবে,

সে তুমি যতই মুখ ঘুরিয়ে নাও মা। এই দেখো কেমন আমি তোমাদের চোখের সামনে।
নাহ। ডাক্তার এবার দেখাতেই হবে। আজকাল বড্ড চোখে জল আসে। দিতি বিশ্বাস করে এটা চোখের সমস্যা।


দিল্লিতে এই এক কারবার। অফিস চার পিস লোক কাজ করলেও দেখানেপনা প্রচুর। এই যেমন কুড়িয়ে জনা ২০ লোক দিতির অফিসে। কিন্তু তাতে দুখানা কেবিন, কিউবিকল, ক্যাণ্টিন, ডিজিটাল লাইব্রেরি মিলে এলাহি ব্যাপারে কমতি নেই। দেবারুনদা আর জয়াদি মিলে একেবারে আগলে রেখেছে। প্রায় তিন পুরুষের দিল্লিবাসি দেবারুণদা নিজের দায়িত্বে বাড়ির দুটো ঘর নিয়ে এই অ্যাড এজেন্সিটা শুরু করেছিল। এখন ক্রিয়েশন’-এর বয়স ৮। শহর ছেড়ে রাজধানী নির্বাসনে এটাই আপাতত দিতির ওয়ান্ডার ল্যান্ড। মালিক আর মালকিনকে বেশ পছন্দ দিতির। স্নেহ-ভালবাসার কমতি নেই। মাইনের দিন এদিক-ওদিক হয় না। দিতির যেবার জ্বর হল, দেবারুণদার বাড়ি থেকে খাবার আসত একা মেয়েটার কথা ভেবে। তবু জয়াদি বা দেবারুণদা বাঙালি গ্যাদ্গেদে আবেগ একেবারেই দেখায়নি। দিতির বাড়ি, একলা থাকার ইতিহাস ঘাটেনি কেউই। তাই উড়ু দিতিও কেমন টিকে গেল। দিতি সিগারেট জ্বালালে সিনিয়র কপি এডিটর পরমিত ম্যাম নাক সিটিয়ে তাকায়। অনেকটা মায়ের মতো। দিতির টিকে যাওয়ার আর একটা কারণ।



নিউজপেপার বা চ্যানেল নিয়ে আপডেট থাকা নিয়ে ছুঁৎমার্গ থাকে না অনেকের। সুপ্রিম কোর্টের সামনে দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় কিলবিলে কালো কোর্ট আর কালো মাথা দেখলে দিতি মনে মনে তারিখ পে তারিখআউড়ে নিজে নিজেই হাসে।

এই আর এক হয়েছে ৩৯৯ যেন পচনধরা মর্গের পাশ দিয়ে যাচ্ছে এমন ভাবে নাকে রুমাল চাপা দেয় চিত্রদীপ। অফিস ফিরতি চিত্রর গাড়িতে ড্রপ পেলে ফেরার ভাড়াটা বাঁচে দিতির। যন্তর-মন্তর পেরোতেই দেখে গেল মানুষগুলোকে।

- রং মেখে বেরিয়েছে দেখো। বিশ্বের ছক্কা আর লেবুর দল।

- তোর মুখে রং দিয়েছে?

- হিজড়েগুলোকে দেখলেই গা জ্বলে। ট্রেনে-বাসে ধরে ধরে হ্যারাস করে। আর ভাই লেবু আমি নিতে পারলাম না। সুন্দরী মেয়েগুলো মেয়েদের লাগাচ্ছে ইয়ে মানে ইন্টিমেট হচ্ছে ভাবলেই কেমন বঞ্চিত লাগে।

- চুতিয়া।

- কি?

- বাড়ি এসে গেল। নামব।

- ওহ।

বাড়ি ফিরে স্নান করে দিতি। গায়ে থুতু ছিটিয়ে দিলে কেমন গা ঘিনঘিন করে যেন। এই ছেলে নাকি জেএনইউ সোশিওলজি টপ।

সেবার সিমলিপাল থেকে একটা ডেক্সটপ ক্যালেণ্ডার কিনেছিল। বটপাতায় অ্যাক্রলিক দিয়ে সার দিয়ে মাস, দিন, বছর। দিনটায় চোখ পড়তে দিতি টের পায় চোখের সমস্যাটা। কেমন আছে কে জানে? বার্থ ডে মান্থ করে এখনও? চিলেকোঠায় ইতিহাস বই পড়ে থাকে?


- ছাড় প্লিজ। কাকিমা চলে আসবে।

- উফ চুপ কর প্লিজ। তোর ঘাড়টা এত সুন্দর।

- প্রিয়াআর না প্লিজ।

- আই উইল ইট ইউ আপ।

- আই লাভ টু বি ইন ইউ।

প্রিয়া হেসে ফেলত। দিতির নাকে নাক ঘষে দিত। কে জানে কেন, কপালের চুমুটুকুর জন্য দিতির এত আকুলতা। বাড়ি ফিরে সারারাত এপাশ-ওপাশ করত। ডায়েরি লিখত আপনমনে। প্রিয়াকে নিয়ে মা অবশ্য কিছু বলেনি। মেয়ের বন্ধু বাড়ি আসে, থাকে তাতে সমাজের জাত যায় না।

ভুলটা ধরিয়েছিল রণই। কত যুগ যেন পেরল। সুদীপদার কোচিং-এর শেষ দিন। পার্ট টু ছুটি পড়বে। রণ পিছু পিছু গড়িয়া মোড় অবধি এসেছিল। রাত নটার বৃষ্টির কলকাতা প্রায় নিশ্চুপ, নিরালা।  প্রিয়াকে পিছন থেকে জাপটে ধরে টি-শার্টে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছিল।

- what the hell রণ?

- কী মনে হয়? আমি বুঝিনি? বুকের সাইজ তো পাতিলেবুর মতো। টিপলে দু আঙুলে আসে। খানকি, লেবু শালা। আমি বুঝি না প্রিয়ার সঙ্গে তোর গা ঘেষাঘেঁষি? আমায় দিয়ে টেপাবি? আর ওকে দিয়ে রড ঢোকাবি?

এসব কি ভাষা। ছাড় তুই আমায়।

- ভাষা? ইউ চিট। আমায় চুমু খেতে তোর লজ্জা করে? প্রিয়ার বাড়ি যাতায়াত দিনরাত। মাগি।

- মাইণ্ড ইয়োর টাংগ। প্রিয়া আমার বন্ধু। আমরা গ্রুপ স্টাডি করি।

গ্রুপ চুদি। মেরে পুঁতে দেব শালা। সবাই জানে প্রিয়া লেবু মাল। ছিঃ শালা। আমার কপালেও লেবু জুটল।

হতভম্ব দিতি দাঁড়িয়ে ছিল বৃষ্টিতে। প্রেম হতে হয় তাই রণ ছিল। কিন্তু এই ছেলেটাই কি রণ ছিল?

তারপর বসন্ত এসেছে। রণ চলে যেতে মনখারাপটা বেশ কিছুদিন ছিল যদিও। রাতটুকু আর ঘুম ভাঙলে দিতির একা একা লাগত। নতুন ক্লাস আর নতুন ক্যাম্পাস। দিতির বসন্তে প্রিয়া।

- আমার খুব খারাপ লাগে রে। রণ খুব ভালবাসত আমায়।

- চুপ কর। ভালবাসলে লোকে ওইভাবে অ্যাবিউজ করে?

- জানি না। আমি কি ঠকালাম রণকে

প্রিয়া কথা বলতে দিত না। চুমুতে ঠোঁট বুঝে আসে। চিলেকোঠার ঘরে একটা দোলায় দিতি প্রিয়া কোলে ঘুমিয়ে পড়ত।

ঠাম্মু মারা যাবার পর দিতির চলে যাবার ভয়টা খুব পেত। বোনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদত। কেমন একটা চলে যায় সবাই। ছেড়ে। একা করে।

- আমি তোকে কখনও ছেড়ে যাব না।

- প্রমিস?

- চিলেকোঠার দিব্যি।

দিতি কেন যে এত লজ্জা পায়। একান্নবর্তী পরিবারে এক মেয়ে প্রিয়া। দিতিদের বাড়িতে জন্মদিনের চল বলতে ওই একটু পায়েস। মাটন কষা আর পোলাও। মায়ের রান্নার হাত একেবারে ফাইভ স্টার যাকে বলে। শুধু যেবার দিতিকে লুকিয়ে সিগারেট খেতে দেখে ফেলেছিল, তারপর থেকে নাক সিটকে মা আর পায়েস রাঁধাই বন্ধ করে দিল। প্রিয়ার জন্মদিনে চকোলেট কেকের সাইজ দেখে দিতির চোখ কপালে। এ মেয়ের বার্থ ডে মান্থ হয়।

- আমায় কী দিবি জন্মদিনে?

- কী চাস?

- পরে বলব।

অনলাইন শপিং দিতি তখনও শেখেনি। ডিল্ডোটা দেখে আঁতকে উঠেছিল।

- এটা পেলি কোথায়?

- একটা সাইট আছে।

- কেউ জানতে পারলে?

- আমার বার্থডে গিফট।

তারপর এক, দুই, তিন, কতদিন। চিলেকোঠা নামের স্বর্গপুরীটাকে সাজাবে প্ল্যান করেছিল তো দুজনে বিয়ের পর। দিতি শুধু শুনত। ভাবত মা কে ঠিক ম্যানেজ করে নেবে। আর বাবা? হ্যাঁ, বাবাকেও।

দিনযাপনের অবসাদে কিছু ক্লান্তি আসে। শহরের পালটে যাওয়া দিতি দেখেছে কতবার। হাত ধরে বৃষ্টি ভিজেছে দুজনে। তবু সপসপে শরীরে ক্লান্তি আাসেনি। সেদিন লোডশেডিং হল। চিলেকোঠায় নাকি মোমবাতি রাখা থাকে। ঠিক শীৎকার শেষে আর একটা চিৎকার। প্রিয়ার মা অবশ্য এহেন নোংরামিবাড়িতে জানান দিতে কসুর করেননি। চুলের মুঠি ধরে মারতে মারতে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল মা। দিনরাত একঘেয়ে লাগত মায়ের কান্না। বোনকে এক সপ্তাহে হস্টেলে পাঠিয়ে বাবাই বলেছিল, ‘তাড়াতাড়ি নিজের ব্যবস্থা নিজে করে নাও। সমাজে থাকি। আমরা এসবে নেই।মা শুধু নাক সিটকে ছিল। মোবাইলটাকে নিস্ক্রিয় পাথর মনে হত। ক্যাম্পাসের কানাঘুষোয় প্রিয়ার বিয়ের খবরের থেকেও বেশি চমক ছিল সহপাঠীদের আচরনে। এক ঝটকায় প্রিয় বুদ্ধিবাদী, স্বাধীনমনস্ক সবাই কেমন যেন দিতিকে নাক সিটকে দেখে।

মা কে খুব ভালবাসি রে। আমি অবাধ্য হলে মা মরে যাবে। জানিস তো হার্টের প্রবলেম। খুব ভাল সময় কাটিয়েছি দিতি আমরা। ভুল বুঝিস না। পারলে তুইও বিয়ে করে নে।

প্রিয়া। সেদিন কতদিন পর যেন দিতি মেইল চেক করেছিল কি কারণে।


নাহ দোতলার ল্যাণ্ডিং-এ আজও আলো নেই। দিতি এক নিশ্বাস অন্ধকার ঘরে লাল-নীল আলো জ্বলছে। আর ২১ এপ্রিল। বার্থ ডে মান্থ শেষ হলে মেয়েটা ভারি দুঃখ পেত। সিগারেট শেষ হলে ধুপকাঠি জ্বালিয়ে দেয় দিতি। ঘাড়ে বিন্দু-বিন্ধু ঘামগুলো কত যে স্বপ্নের কথা বলে। কাল অফিসে নতুন প্রজেক্টের রিপোর্ট জমা দিতে হবে। হিন্দিটা বেশ ভালই রপ্ত হয়েছে। জেএনইউ ফেরত চিত্রদীপ মাঝরাতে টেক্সট করে। দিতি ভাবে খিস্তি দেবে। থাক, নাক সিটকালে মাকেই সবচেয়ে সুন্দর দেখায়।

ল্যাপটপের আলোয় নীলচে দেওয়ালে মানবীর অশরীরি ছায়া কেমন। সিগারেটের ধোঁয়া উড়ছে আর পুড়ছে। দিতি মনে মনে হাসে। নতুন প্রজেক্ট ক্লায়েন্ট অ্যাকসেপ্ট করলে দিতির মাইনে বাড়ল বলে। তখন নাহয় একবার কুফরি ঘুরে আসা যাবে। নাহ, মায়ের একটা জামদানি। নাহয়, তোলাই থাকল আলমারিতে। প্রজেক্ট এর ফাইল খোলে দিতি। এলজিবিটি বিয়ে নিয়ে একটা ইউটিউব অ্যাড বানাতে চাইছেন ক্লায়েন্ট, প্রিয়া, প্রিয়ম্বদা সিং। বছর ৫০-এর এই অ্যাক্টিভিস্ট ক্রিয়েশন’-এর পুরনো ক্লায়েন্ট। নতুন ওয়ার্ড ফাইল খুলে লেখা শুরু করে দিতি। নাম দিল সখী












গুলশনারা খাতুন
Gulshanara Khatun