দ্বারকা : সর্বজিৎ ঘোষ

দ্বারকা

দেখলাম বিশাল এক ফ্ল্যাটবাড়ির নীচে হা হা করছে শূন্য।

বার্তা আসিল, জল বাড়ছে। সমুদ্র এগিয়ে আসবে এবার। আগাইতে গেলে অনেকটা পিছাইতে হয়। বার্তা আসিল, অজীর্ণ বালিয়াড়ি জেগে উঠেছে দিগন্তবিস্তৃত। মানুষ ছুটে ছুটে যাচ্ছে ঝিনুক কোড়াবে বলে। ঝিনুক কোড়াতে কোড়াতে অঘোরীপনা করে উঠল একদল খলখলে প্রেমিক। মৃতমাংসে ভোজ দেবে, ঝিনুকের খোলে ধার থাকে বড়জোর দেড়জনের গলার নলি কাটার মতো। অথচ ততক্ষণে মৃতদের প্রাণ পুনস্থাপিত হইবারে আসে ঝিনুকগর্ভে। গজাইতে চায় মাংসল পদ, কিছু মৃতদেহ বালিয়াড়িতে পড়ে থাকে ফিরতি সমুদ্রের আশায়। লোনাজলে মৃতদেহ দীর্ঘকাল সতেজ থাকে। লোনাজল ঢুঁড়িয়া সতেজ দ্বারকানগরী আবিষ্কারে মত্ত যাদবকুল। অখিল ভারত নলখাগড়া কোম্পানী উহাদের স্পনসর করিয়াছে।
যাদবকুলের অজস্র শাখা আছে। তথাপি দোকানের গায়ে বড় বড় করে লেখা, 'আমাদের কোনো শাখা নেই।' এমত মিথ্যাচারে অবশ্য পরমায়ু বাড়ে, যেমন বাড়ে ঝিনুকের সুরুয়া খেলে। কচি কচি ঘাস কিছু এতদিন নেতিয়ে ছিল লোনাজলে, হাওয়া পেয়ে তারা বাড়িতেছে, ফনফন করিতেছে, অথচ ঘাড়ের কাছে মৃত্যু আসিয়া পড়িল যে --- ঘাসেদের সতর্ক করিয়া দিবার মতো কেহ নাই ত্রিভুবনে। যাবৎ পশুপাখি জারোয়া সেন্টিনেলিজ অবশ্য আপন আপন সামগ্রী সমিধ উত্তরাধিকার অসমাপ্ত কন্ডূয়ন অতৃপ্ত চোদন লইয়া ভাগলবা হইল উচ্চভূমিতে। সভ্যতা এমত সংকটকালে তাহার ভৃত্যীভূত পূর্বপুরুষদের পদাঙ্ক অনুসরণে লজ্জাবোধ করে না --- বরং কথা দেয়, দুর্যোগ কমে গেলে তাদের উৎসর্গ করে 'বাবা কেন চাকর' চলচ্চিত্র নির্মাণ করবে।

ফ্ল্যাটবাড়িতে উৎসব চলছে। রাত বাড়ল, সমুদ্রের খবর আনতে আনতে ক্লান্ত দ্বারবান নৌকো গড়তে গেল। সিন্ধবাদ হবে। দেখলাম ফ্ল্যাটবাড়ির ফাঁকা গ্যারেজে একা দাঁড়িয়ে আছি। চারিদিকে থাম, ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দিয়েছে গাড়ি --- খলবল হাসি শোনা যায় মহাশিশুর, বাক্সে যেন ঠাসাঠাসি হল খেলনাগাড়ি। দেখলাম চারিদিকে শূন্য লিফট ওঠানামা করছে, কেবল লিফট ওঠবার নামবার ঘটাং ঘটাং শব্দ, আর সুরেলা কন্ঠে কেউ বলছে দরজা বন্ধ করতে, দরজা বন্ধ করতে, দরজা বন্ধ করতে, প্রিলিউডে দেড় সেকেন্ডের জলতরঙ্গ এখন সভ্যতার একমাত্র সুর। লিফটের ওঠানাম দেখিয়া মত্ত দাদুরি গিলোটিন ভাবিল, আর আপন মস্তক স্থাপন করিয়া দিল লিফটতলে। এতদিনে কুয়োর ব্যাঙ বদনাম বুঝি ঘুচিল।

একেকটা লিফট নেমে আসছে আর বেরিয়ে পড়ছে রাতের কেচ্ছা, ময়লা জামাকাপড়, ঘর উপচে নোংরা জল ঘড়িয়ে এল লিফট বেয়ে, কারা সব মুখোশগুলো শুকোতে দিয়েছিল বারান্দায়, হতচ্ছাড়া ভুলোমনের দল ক্লিপ লাগাতে ভুলে গেছে, আহা সব চিত্ররূপময় মুখোশ উড়ে উড়ে পড়ছে নীচে। এসব মুখোশ নৌকোর দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখবে, দ্বারবান ভাবল। একের পর এক শিশুদের তাদের মায়েরা ধরে এনেছে এই নিঃঝুম গ্যারেজে। গ্যারেজ এখন তাদের কলকাকলিতে ঝলমলে। কোলাপসিব্‌ল গেটের ফাঁকে বাচ্চাদের হাত গুঁজে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মায়েরা, ঘাড় ধরে রেখেছেন তাদের, দুই হাত লিফটগহ্বরে গুঁজে অপেক্ষা করছে বাচ্চারা, কখন নেমে আসবে লিফট, দড়ি বেয়ে ভার উঠে গেল আস্তে আস্তে, আর কিছু সুহাসিত নুলো বাচ্চা তাদের মায়েদের সঙ্গে বেরিয়ে আসছে। মায়েরা কোলে শিশু নিয়ে চোখ বড় বড় ছল ছল করে তাকিয়ে থাকতেন একদা, তখন তাঁদের বলা হত গণেশজননী। যদিও আমরা সরস্বতীর শিশুকালের ছবি দেখি না, চ্যাপ্টাবুক সরস্বতীকে কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে বলা যাবে না, হা মন্ত্র হো মন্ত্র করে পিঠে চাবুক আর ছুরি আর শেকল মারবে যত মনভাঙা ব্রাহ্মণপণ্ডিত। সেই গণেশজননী, হা হতোস্মি, আজকাল আস্তে লেডিস কোলে বাচ্চা নামে খ্যাত হলেন। এত দুঃখের মধ্যে, ভগবন, বাচ্চাদের হাত থেকে আর কী হবে! লেখাপড়া তো কোনোকালেই শিখিল না, উজবুকের দল শিখিল না নখাবলোকনে দেখে নেওয়া সভ্যতার মেয়াদ চুরি করছে কোন ব্যাটা ছিঁচকে চোর, আর উহাদের হাত থাকিয়া কী হবে ভগবন, হাত থাকিলেই ব্যাটারা ফিদা হুসেন হয়ে ন্যাংটো সরস্বতী আঁকিবে, আরেকহাতে হ্যান্ডেল মারিতে শিখিবে অল্পবয়সে।

দ্বারবান লিফটের শূন্যগহ্বর থেকে ছিপ দিয়ে তোলে একের পর এক কচি সুকোমল হাত। নৌকোর দাঁড় হবে। অথচ, নৌকো নিয়ে ভাবনাচিন্তা কতদূর এগিয়ে গেল, এদিকে সমুদ্রের দ্যাখা নাই। সমুদ্র ভীষণ ল্যাদখোর হইয়া পড়িয়াছে। তাহার সে ঢেউও নাই, সে গর্জনও নাই, কাব্যপ্রতিভায় সুড়সুড়ি প্রদানের যাবতীয় পাপ বহন করিতে করিতে সে ক্লান্ত। তাহার ঢেউ গুনিয়া শব্দ শুনিয়া কত কবি তরে গেল, অথচ তাহার কেবল কোথাও যাওয়া হইল না, বিষম অজাচারে সে কেবল খাবলে চলিল তীরস্থ বেলাভূমি। নদী, দুদিনের ছোকরা ছুকরি সব, যাত্রার নাম ধরিয়া কতকিছু দেখিল, এইখানে ওইখানে কতখানে গেল, আর সমুদ্র কেবল মধ্যবিত্তের পুরি দীঘা! আজকাল চিল শকুনের ন্যায় কোমরে দড়ি বাঁধিয়া ওড়ে কত মানুষ, এসব নষ্টামি করবার সুযোগ পায় কেবল সমুদ্রতীরেই। দুঃচ্ছাই করিয়া এসব কেত্তন ডুবাইবে বলে সমুদ্র সরিয়া গেল, অথচ ল্যাদের কারণে তার আর ফিরিতে ইচ্ছে করে না। মানুষগুলা সব দখল করিতে আসিতেছে তাহার ছেড়ে যাওয়া জমি, আর জ্ঞানপাপী মানুষেরা উচ্চৈস্বরে ভয় করিতেছে সমুদ্র ফিরিয়া আসিবে ডুবাইয়া দিবে, আর লোভী এবং জ্ঞানপাপী মানুষেরা সমুদ্রের পরিত্যক্ত ভূমিতে নুড়ি কুড়াইতেছে। দূর থেকে এই ভয় এবং লোভের সহাবস্থান দেখিতে বেশ লাগে সমুদ্রের।

যেভাবে দূর থেকে দেখেছি, এক পশ্চিমা মুসলমানকে বাসের উপর থেকে টেনে নামানো হল। তার বুলিতে সে আদো আদো উচ্চারণ করল বাংলা, আর বিশুদ্ধ শিষ্ট বাঙালীরা শুনেও দেখল না তার পূর্ব পাকিস্তানী বউবাচ্চার কথা, পূর্ব পাকিস্তানী বাসার কথা, সেই বাসার দেওয়ালে বাচ্চার জন্যে সে গড়ে দিয়েছিল কিনা কোনো বইয়ের তাক, প্রাণের ভিতর থেকে বিপ্লবী বাংলা জয় এবং মৃত্যু, মৃত্য এবং জয়, জয়ীর মৃত্যু, মৃতের জয় ঘোষণা করল আর তার পাগড়ি সমেত মাথা ছেঁচড়ানো হল পাথর দিয়ে, আর এসব ডুবিয়ে ভাসিয়ে দিয়ে পথে নামতেও তো ল্যাদই লাগে, মানব তো সমুদ্রজাতক, সভ্যতা সমুদ্রজাতক, ঝড় সমুদ্রজাতক, লবণ সমুদ্রজাতক, প্রশান্তি সমুদ্রজাতক, টাইটানিক সমুদ্রজাতক, গোয়ালন্দের ডুবে যাওয়া স্টিমার সমুদ্রজাতক, সেই স্টিমারে কেবল মুরগির ঝোল আর ভাত রান্না হয়েছিল, সেই স্টিমারে কেবল ছোটকাকা আর মোমিন আলি যাচ্ছিল, সারেঙের নাম ঈশ্বরী পাটনী আর স্টুয়ার্টের নাম চাঁদ সদাগর, আর এক পাগলিনীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল পাগলাগারদে যে চেঁচিয়ে  চেঁচিয়ে বলত সেঁউতি তো সোনা হচ্ছে না! অথচ তাদের ছিল না কোনো জ্যাক কিংবা রোজ, জ্যাক কিংবা রোজ টাইটানিকেরই জোটে। সেই সপ্তডিঙা টাইটানিক গিলেও খিদে মেটেনি সমুদ্রের, হতচ্ছাড়া বুড়ি, আর কী গিলতে চাস?

জলস্তম্ভ দ্যাখ যাচ্ছে দিগন্তে। এগিয়ে আসছে সমুদ্র। জোড় হাতে বসো, নুলো এবং রাতকানারা, বলো:
এখানে তো নেই কোনো খাণ্ডববন, সেসব তো আগেই উড়িয়ে পুড়িয়ে খেয়ে নিয়েছি, ক্ষুধামান্দ্যের ওই এক চমৎকার ওষুধ, আর এখানে নেই কৃষ্ণার্জুন, আর নেই অজস্র মাংসল প্রাণী। কতকাল সন্তান বিসর্জিলুম সাগরে, তীর্থ মেনে ছুঁড়ে দিয়েছি রুগ্ন ডাব, আলো ফোটার আগে শৌচকর্ম সেরে পেছন ধুয়ে নিয়েছি ঢেউতে। ক্ষুধামান্দ্য হলে অতএব পুনরায় ফিরে যাবে সমুদ্র, জ্যাক খাবে রোজ খাবে ব্যবসা চুমু অস্কার খাবে, জলস্তম্ভ গুটিয়ে যাবে ধরা পড়া পরকীয়া প্রেমিকের নুনুর মতো, আর কিছুকাল নুলো ঠুঁটো হয়ে ভাবব নুড়ি কোড়াচ্ছি উত্তরাধিকারে

আমায় অব্ধি খাওয়ার আগেই সমুদ্রের ক্ষুধামান্দ্য হোক।   















সর্বজিৎ ঘোষ

Sarbajit Ghosh