Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS

তমসো মা : রঙ্গন রায়

তমসো মা
কানু কহে রাই –
- কহিতে ডরাই
ধবলী চরাই মুই।
আমি রাখালিয়া
মতি কি জানিনা পিরিতি
প্রেমের পসরা তুই

এবার তবে কয়েল থেকে শুরু করা যাক। যেভাবে টেবিলের তলা থেকে পাক দিয়ে উঠছে ধোঁয়া আর মশারা তা দ্রুত এড়িয়ে পালিয়ে যেতে চাইছে। সমস্ত ঘর সিগারেট আর কয়েলের ধোঁয়ায় আবছা হয়ে আসছে। চোখ জ্বালা করছে। চশমা খুলে রেখে চোখে হাত দেওয়া হলো। লাল। দ্রত উঠে পড়লো চেয়ার সরিয়ে। প্লাস্টিক আর মেঝেতে ঘষাঘষি লেগে একটা শব্দ উঠলো। টেবিলের কোণে কিঞ্চিৎ ধাক্কা খেতে খেতে জানালা খুলে দিলো সে। একঝলক অন্ধকার লাফিয়ে ঢুকে পড়ে অভিভূত করে দিলো তাকে। টাটকা বাতাস আসছেনা। আশ্চর্য! বাইরের পৃথিবী থেকে ভেসে আসছে পেঁচার গম্ভীর অথচ ঠান্ডা একটা ডাক। থেমে থেমে। টেবিলের উপর স্তুপীকৃত বইপত্রের ভিতর একটা কম্পনের শব্দ, গোটা ঘর প্রায় কাঁপিয়ে দেবে। জানালা থেকে সরে এলো সে। অবাক বিস্ময় আর কিঞ্চিৎ ক্রোধ বা বিরক্ত মিলেমিশে মুখের এমন একটা ভাষা তৈরী হয়েছে যাকে সঠিক ভাবে খাতায় নামানো সম্ভব নয়। অন্ধকার আকাশ ঘরে ঢুকে ইতিউতি চাইছে। বইপত্র-কাগজ সরিয়ে অবশেষে পাওয়া গেলো মুঠোফোন, কিন্তু ততক্ষণে রিঙ্ কেটে গেছে। রাগের চোটে একটা বই আচমকা সে ছুড়ে রাখলো টেবিলে আর বইয়ের কোনের ধাক্কায় ছিটকে পড়লো পেয়ালা। তলানি চা গিয়ে ভিজিয়ে দিলো মেঝে সহ পড়ে থাকা বাকি কাগজপত্রে। রাগটা আরোও বেড়ে চললো। ড্রয়ার খুলে আর একটা সিগারেটের প্যাকেট খুঁজতে গিয়ে মনে পড়লো শেষ সিগারেটটা সে এইমাত্র শেষ করে উঠে দাঁড়িয়ে জানালা খুলেছে। আবার জানালায় ফিরে গেলো সে। আবার কল এলো। সে ফিরে তাকালোনা। হা করে অন্ধকার গিলতে লাগলো। একটি তারা খসে পড়ছে - তারা খসা দেখলেই নাকি উইশ করতে হয়। যা চাওয়া হয় তাই পাওয়া যায়। সে কি চাইবে ভাবতে ভাবতেই তারা হারিয়ে গেছে। সমস্ত আকাশে একটাও তারা নেই। জানালার শিকে নাক ঠেকিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে। মেঝেতে চিনামাটির কাপের ভাঙা টুকরো - চায়ের অবশিষ্টাংশ - বিস্কুটের গুড়ো - সিগারেটের ছাই মিলেমিশে একটা পদার্থ তৈরি হচ্ছে। জানালা দিয়ে পুকুরের আঁশটে গন্ধ - দূরে যেন জোনাকির গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে - আচ্ছা জোনাকির কি গন্ধ হয়? কিন্তু সে হলফ করে বলতে পারে এইমাত্র একটা নতুন গন্ধ সে পেয়েছে যাকে কোন গন্ধের সাথেই মেলাতে পারছেনা। এরম কেন হচ্ছেহোয়াট দ্যা ফা--- গালিগালাজ কাকে দেবে। পিছিয়ে এলো সে। টেবিল থেকে তুলে নিলো মুঠোফোন। ছুড়ে মারলো পিয়েল ল্যাম্পটায়। একটা প্রচন্ড কাচ ভাঙার শব্দ, আর তারপর সব অন্ধকার। অন্ধকার এসে অন্ধকারে মিলে গেল। মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইলো সে - তার আর অন্ধকারের ঠিক মাঝখানে একটা রেডিয়ামের ঘড়ির ব্যবধান। খুলে ছুড়ে দিলো জানালা দিয়ে, 'টুপ' করে পুকুরে পড়লো, জল একটু আন্দোলিত হল - সে দেখতে পারছেনা অন্ধকারে, তবে স্পষ্ট যেন বোঝা যাচ্ছে - জল গোল হয়ে দু'দিকের পাড়ে ঢেউয়ের মত এগিয়ে আসছে। সবাই একই সমান্তরালে মিলিয়ে যাচ্ছে - সে দেখতে পাচ্ছেনা আর কিছু... জলের ব্যবধান যেন খাঁচা

খাঁচার অন্ধকার ছিলো খাঁচায়
বনের অন্ধকার ছিল বনে
একদা কি করিয়া মিলন হলো দোঁহে।

এভাবেই বোধহয় মিলন হয়। মিলন। একটা দারুন শব্দ। যেদিন প্রথম তার পুরুষাঙ্গ মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে উঠে আসলো সেদিন থেকেই এই নতুন অনুভূতি জানালার শিক বেকিয়ে ফেললে ভালো হতো। হাতড়ে হাতড়ে দরজা - তারপর একছুটে বাইরে, পুকুরের ধার দিয়ে ছুটলো, মাঠ - আলপথ - ঝোঁপ - অর্জুন আর শাল গাছ - একটা খাড়ি - তারপর হঠাৎ একটা প্রানবন্ত শহর ... গ্রাম থেকে পালিয়ে শহর - শহর থেকে পালিয়ে গ্রাম...
বাঁশির শব্দের মতো শোনা যাচ্ছে - ঐতো ঝোপের আড়ালে কৃষ্ণ হাতে বাঁশি, আর রাধা সমস্ত পোশাক খুলে নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে - তাদের চোখেমুখে আসন্ন পরিতৃপ্তির আভাস কৃষ্ণ বাঁশি নামিয়ে রাখলো, তার ঠোঁটে হাসি, হাত দুটো এগিয়ে আসছে দুটো বিপুল পৃথিবী ধরবার নেশায়।
সে ঘুরে দাঁড়ালো - পকেটে হাত ভরলো - ধুর সিগারেট নেই। বুকটা হাসফাঁস করছে, এতক্ষণ দৌড়লো - বসে পড়েছে সে, চোখে নেমে আসছে রাশিরাশি অন্ধকার...

"ঐ পথে 'বাগিলা' যাইতে আড়াই মাইল, মিষ্ট নিমপাতা,
এক সহজিয়া আউলের সমাধিকে ঘিরে দোলের দিনের
নৌকার গলুই ঠেকা পাড়ে কর্দমের নম্র মুখর অনামা
রঙের নিস্পন্দ হুল্লোড়ে রিক্তের
, অতিরিক্তের ঐ জেগে ওঠা।"

মা আজ সন্ধ্যা প্রদীপ দিয়েছিল তুলসী তলায়, বাবা আজ হুকো নিয়ে দাওয়ায় বসে গল্প করছিল মোড়লের সাথে, আর সে বই - জানালা - মেঝে এসব ছেড়ে আত্মা খুলে রেখে গেছে মিলনের কাছে।
মাঝে মাঝে তার ধাঁধা লেগে যায়, মহাজীবনের খন্ডকাল মস্তিষ্কে নড়াচড়া করে, প্রবল ভাবে জানান দেয় অন্ধকারে আলো। ঘুম থেকে উঠেই অনেকসময় মনে পড়েনা কোথায় আছি? রাত কি শেষ হয়েছে? জানালার চোরা ফাঁক দিয়ে কুচি কুচি আলো এসে চোখে লাগে, আর মা পাশ থেকে ডেকে ওঠে - "বাবা, ওঠ্"। সেই আলোর স্মৃতি তার পরম সুখের শৈশব বড় মায়াময়, প্রথম আলো দর্শন কি অভাবনীয়!
গ্রামে নতুন আলো আসছে। এখনো পোল পড়ছে। সব জায়গায় পড়েনি। তাদের বাড়িতে সবার আগে চলে আসাতেই তার ক্রোধ - শহরের আলো - গ্রামের অন্ধকার... প্রাণ হাঁচোর পাচোড় করছে। আবার সিগারেট মনে পড়ে তার। মনে পড়ে সিগারেটের শেষ হয়ে যাওয়া। হস্টেলের রুমে একটা সিগারেট যখন চারজনের হাতে ঘোরে আর অন্তিম হাত থেকে কখন সে সিগারেট পাবে এই ব্যবধানে যে মধুর অপেক্ষা

"তারপর শুরু হ'ল সেই গল্প
রাতের ঠোঁটে হেঁটে যাচ্ছেন চ্যাপলিন
সিন্দুক থেকে ভেসে আসছে হাততালি
ঘরে নাচছে ফুলদানি
পাতায় পাতায় যতখানি গিয়েছিলাম
ঠিক ততখানি ফিরে এসেছি সুতোয় সুতোয়"
(চার্লি / শ্যামল সিংহ)
মেঘের আড়াল থেকে চাঁদ বেরিয়ে এলো, পুকুরে চকচক করছে, মনে হচ্ছে যেন দুধ পুকুর, মাথায় তুমুল আলোড়ন হচ্ছে তার। খুব কষ্ট হচ্ছে, "আমায় অসৎ থেকে সতে, অজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোকে, মৃত্যু থেকে অমৃতে নিয়ে চলো।"
জানালা ও পুকুরের কোন সখ্যতা সে কোনদিন দেখেনি। জানালা ও পুকুর এতদিন কাছাকাছি আছে, মিলন হয়নি। কৃষ্ণ ও রাধা চলে গেছে হাত ধরাধরি করে। ঝোঁপের আড়ালে জোনাকিরা ঝিঝিরা নিজস্ব আলো ও শব্দে মশগুল। এই টলটলে পুকুরে চাঁদের আলোয় যখন পশুরা রাত্রির তৃষ্ণা নিবারণ করবে, শব্দটা কি 'কুবোকুব - কুবোকুব' হবে? নাকি এক অপার্থিব মালকোষ।
দুটো টিকটিকি পরস্পরকে দেখছে। যেন অসীম কাল ধরে দেখছে। তাদের দেখা হওয়ার কোন শেষ নেই। ধৈর্য্যচ্যুতি নেই। কিন্তু সে ভয়ানক ধৈর্য্যহীন। এখন আর কিছুই ভালো লাগছে না। পুকুরে একটু নামা যেতে পারে। এখন কেউ দেখবেনা। খুব ধীরে ধীরে সে সমস্ত পোশাক -টীশার্ট - প্যান্ট -গেঞ্জি - জাঙিয়া খুলে ফেললো। এসে দাঁড়ালো অবশেষে পুকুরের সামনে। দেখছে। তার আর পুকুরের পরস্পরকে দেখার যেন কোন শেষ নেই। টলটলে পুকুরের বুকে একটা প্রকান্ড ডাইভ একান্ত জরুরী। সে আর পারছেনা। হাঁফিয়ে  উঠেছে। অধুনান্তিক, তার যত ক্রোধ - জলের ভেসে আসা শ্যাওলার মত পুরু স্তরে সঞ্চিত হচ্ছে ঘাটে। সিড়ি গুলো নেমে যাচ্ছে জলে। উল্টো করে বললে, সিড়িগুলো উঠে আসছে ওপরে - তার পায়ের কাছে। ভেজা কার্পেটের মত শ্যাওলায় তার পা, তিরতির করছে সমস্ত অঙ্গ। জল এসে ভিজিয়ে যাচ্ছে আঙুল। কোন মাছ ঘাই মেরেছে এইমাত্র, আর দূরে কোথায় শেয়াল ডেকে উঠলো।


টীকাভাষ্য
প্রত্যেকেরই একটা ফেরার জায়গা থাকে। কিন্তু বাস্তবিকই কি মানুষ কোথাও ফেরে? ফিরতে পারে? যেমন একটা যাওয়ার জায়গার মানুষের ভীষণ প্রয়োজন, ঠিক তেমনই ফেরারও। এই স্থান গুলো বাস্তবিকই শূন্য। কোথাও ফেরার নেই যাওয়ার নেই।

ঋণ স্বীকার্ঃ চন্ডীদাস, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভাস্কর মিত্র, শ্যামল সিংহ, বৃহদারণ্যক উপনিষদ্ এবং নীলাদ্রি বাগচী।











রঙ্গন রায়
Rangan Roy

Popular Posts