ধারাবাহিক : কবি হওয়ার সহজ পাঠ ~ রাজা | পর্ব - এক ( দুই পর্বে সমাপ্য)


কবি হওয়ার সহজ পাঠ

...তাহলে ব্যাপারটা হল যে, এমন উথলে ওঠা কবি বাজারে একজন কবি কি করে নিজেকে খুব তাড়াতাড়ি  খুব বড় কবি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। এর উত্তর খুঁজতে গিয়ে আমি কবিদের জীবন যাপন, বিশেষত তাঁদের হোয়াটস আপ আর ফেসবুকের কার্যকলাপ দেখে যেসব সিদ্ধান্তে পৌঁছেছি তারই কিছুকিছু আপনাদের সাথে ভাগাভাগি করে নিচ্ছি...


১/ আরামদায়ক বন্ধুত্ব পাতান

ফেবুতে আপনার বন্ধু সংখ্যা কত? ৫০০? ৬০০?
হবে না। সংখ্যা বাড়ান। কম সে কম ২০০০। কবি, অকবি (যদিও বিরলতম জীব), কবির স্বামী- স্ত্রী, বয়ফ্রেণ্ড, গার্লফ্রেন্ড, ভাই, বোন, মামা, কাকা যাদের খুঁজে পাওয়া যায় ফ্রেন্ড রিকুয়েস্ট পাঠান। রিকুয়েস্ট একসেপ্ট হলেই ইনবক্সে নিজের কবিতা সম্পর্কে একটু খুঁচিয়ে দিন। যেমন - "হাই কেমন আছেন? আপনি কি কবিতা পড়েন? কখনো আমার কবিতা পড়েছেন? ইয়েলো সিগনাল দেখলেই টুক করে দু'-একটা কবিতা চালান করে দিন।এরপর মানবিকতা বা যে কারণেই হোক, আপনার পোস্ট করা কবিতায় এনারা লাইক এবং কমেন্ট করবেনই। ২০০০ বন্ধুর মধ্যে যদি ১৫০ টাও লাইক আসে আপনার কাজ হাসিল।
কবিতা জগতের উজ্জ্বল প্রতিভা এবং মাথাদের সাথে (তলে - তলে এবং অতলে) সুসম্পর্ক গড়ে তুলুন। ওনাদের কবিতায় দুহাত খুলে লাইক আর কমেন্টের বর্ষা করুন। এর প্রতিদান, আপনার পোস্টেও হাতে-কলমে পাবেন। ওমুক শহরের তমুক দাদা নির্দ্বিধায় বলবেন আপনার শহরে আপনি ছাড়া কেউ লিখতেই পারে না। মানে ব্যাপারটা অনেকটা "তুমি আমাকে আরাম দাও, আমিও তোমাকে আরাম দেবো" এই গোছের আর কি।


২/ একটু হাটকে লিখুন

সহজিয়াদের দলে না ভিড়ে, অভিধান থেকে কঠিনতম শব্দ তুলে লিখুন। অথবা এবস্ট্রাক্ট কিছু লিখুন। যেমন ধরুন "বেড়ালের লেজের হলুদ/ ঘুমন্ত শরীর, মুখ/ রাতের সায়া খুলে যাচ্ছে।" লেখার স্টাইলটাকেও একদম আলাদা করে ফেলুন না, ভীষণ আধুনিক। যেমন - প্রথমে একটা দাড়ি (।) দিন (কেন জানতে চাইবেন না)। তারপর একটা হাড়ি বা গাড়ি লিখুন।তারপর দুটো দাড়ি (।।) দিন (ব্যাপারটা আরও পোক্ত হবে...) এবার স্তন (যৌনতার টাচ থাকা জরুরি। পাবলিক ভালো খায়) লিখে এমনভাবে কাটুন যেন সেটা দেখা যায়। এরপর আপনার এই নতুন ধারা কে আদর দেওয়ার অগ্রণী সম্পাদক/ কবি ঠিক জুটে যাবে। আর এই লেখা পরে কারোর যদি বালছাল মনে হয় তাহলে সেটা তার অশিক্ষার প্রমাণ। পাঠক মধ্যযুগে পরে থাকলে আপনার কি করার আছে?
এমন কবিতার পাশাপাশি বিদ্রোহী স্ট্যাটাস দিন রোজ। যেখানে প্রমাণিত হবে সবকিছুর বিরুদ্ধে একা আপনি দাঁড়িয়ে আছেন। কারোর হাগা পেলে লিখুন "হেগে পরিবেশ দূষণ করবেন না।" আর না হাগলে লিখুন, "শরীর কে কষ্ট দেওয়া পাপ"। আর হ্যাঁ, বাঙালি হয়ে জন্মে যে ভীষণ পস্তাচ্ছেন সেটাও উল্লেখ করুন বারবার (এতে আপনার বৈপ্লবিক ভাবমূর্তি আরও প্রকট হবে)। বিশ্বাস করুন কেউ আপনাকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেবে না যে, আপনার এই বাঙালি জন্মের জন্য তো আপনার বাবা- মায়ের ভুল টাইমিং দায়ী। ওনাদের বলুনএখানে খেপছেন কেন? কিম্বা এতো যদি অসুবিধে, এভিটেভিট করিয়ে পাঞ্জাবি, মাড়োয়াড়ি, বা যা ইচ্ছে একটা কিছু হয়ে যাচ্ছেন না কেন? কেউ মুখ খুললে অবশ্য ভাবার কিছু নেই। আপনার চামচারা, সরি, ফলোয়ারসরা (যারা আপনাকে DD জাঙিয়ার থেকেও বেশি বিশ্বাস করে) তো থাকবেই দুইয়ে দুইয়ে পাঁচ করে জবাব দেওয়ার জন্য।


৩/ খুব বড় এবং খুব ছোটো করে ভাবুন

সবার লেখায় ধার থাকতে হবে এমনটা কে বলেছে? ধার নয় তো ভারে কাটুন। বিখ্যাত কবির লেজ ধরে ঘুরুন। দু'একটা সংবর্ধনা-টংবর্ধনা ঠিক বাগিয়ে নিতে পারবেন। আধুনিকতম কবির মতো ভাবুন। ওঁনার চাল-ঢাল, ওঠা-বসা সব হুবহু অনুকরণ করুন। দেখবেন আপনার ফ্যানসংখ্যাও হু হু করে বেড়ে যাবে। এবার গুরুদেবের মতো আপনিও লিখুন-
"।কুকুর চেটে দিলেও/।।/অন্ডকোষ।।/ফাটা ফাটা তরমুজ।।/লাল/।উফ!!/মধু।।"
শেষে 'অন্ডকোষ' শব্দটি হালকা করে কাটতে ভুলবেন না যেন। ব্যাস আরকি ১৫৫ লাইক, ২৪ কমেন্টস (অদ্ভুত, অসাধারন ইত্যাদি), ৩ শেয়ার। এরপর চোখ বন্ধ করে ঘোষণা করে দিন এ যাবৎ অরুণেশ ঘোষ, পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত, সুজিত আধিকারী প্রমুখ কবিরা যে নিম্নমানের লেখা লিখেছে আপনি চাইলেই ওরকম লেখা দিনে রাতে দশ হাজার লিখতে পারেন। বিশ্বাস করুন অভিজাত কবি সমাজ কোনো প্রতিবাদ করবে না (কারণ এখানে এক অলিখিত শান্তি চুক্তি আছে 'অন্য কে না খুঁচিয়ে নিজেরটা গোছাও'), উল্টে দশ হাজারি কবি হিসেবে গিনেস বুকে নাম উঠতে পারে কিংবা বি.বি.সি. থেকে ইন্টারভিউ-এর অনুরোধ।
শুধু বড়ই কেন, ছোট করেও ভাবা যেতে পারে। পৃথিবীর সব থেকে ছোটো কবিতার বই লিখে ফেলুন না (গিনেস বুকে নাম নিশ্চিত)। লেখার মান-টান নিয়ে একদম ভাববেন না। লিখতেই পারেন- তুমি জল/ আমি পাতা (----- এর মাথা) ওসব নিয়ে কেউ মাথা ঘামাবে না। সব থেকে ছোটো কবিতার বই (পুচকি সোনা!) বলে কথা। আপনি তো রাতারাতি হিট।

[ক্রমশ...]



রাজা
Raja
Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS