Skip to main content



সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সর্বশেষ ভয়েস রেকর্ডিং ~ একটি টগবগে সাক্ষাৎকার


~ সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের সর্বশেষ ভয়েস রেকর্ডিং বিষয়ক গৌরচন্দ্রিকা ~

          
এই অডিও ফাইলগুলো কোথা থেকে কিভাবে এলো তার ভূমিকা খুব অল্প কথায় লিখতে গেলেও দুটো গল্প বলতে হয়। প্রথম গল্প 'ব্যাস' পত্রিকার এবং অবশ্যই স্নিগ্ধেন্দু আর সন্দীপনের। ২০০৪ সালে, সম্ভবত, ব্যারাকপুরের কোনো এক লোকাল বাসে স্নিগ্ধেন্দুর সঙ্গে সন্দীপনের পরিচয়। স্নিগ্ধেন্দু তখন তার এক সুনীলপন্থী বন্ধুকে সুনীল কেন মিডিওকার এবং সন্দীপন লেখক হিসেবে সুনীলের থেকে কেন বহুগুনে এগিয়ে সেইসব বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। বন্ধুটিও মানতে নারাজ স্বাভাবিকভাবেই। আমরা যারা মধ্যবিত্ত পরিবারের সংস্কৃতিবান পরিবেশে জন্মে 'শুকতারা' আর 'আনন্দমেলা' পড়তে পড়তে বড় হয়ে উঠেছি ওই বয়সে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে পৃথিবীর মহানতম লেখকদের একজন মনে করা এবং নিজেদের নীললোহিত ভাবাটাই তাদের নিয়তি একপ্রকার; পুঁজিনির্ধারিত নিয়তি, যে পুঁজি কিনা বাংলাসাহিত্যের বাণিজ্যিক ধারাটিকে ফুলিয়েফাঁপিয়ে তোলার উদ্দেশ্যে নিয়োজিত। আমাদের মতো বাবলু, বুবলু, বাবান, বাবাই, বুবাই ও বুবুনদের ক্রীতদাস ক্রীতদাসীর আখ্যান বা বিজনের রক্তমাংসের বাস্তবতা গ্রহণ করে উঠতে পারার জন্য প্রয়োজন ছিল জীবনে একবার অন্তত কোনোরকম কোনো অস্তিত্বগত বিপন্নতা তথা ক্রাইসিসের মুখোমুখি হওয়া। বলাবাহুল্য, অনেকের জীবনেই সেরকম কোনো ক্রাইসিস আসেনা। অন্তত সেই বয়সে। ফলে তারা এটাই বুঝে উঠতে পারেনা যে সন্দীপনের লেখালিখিকে আদেও সাহিত্য বলা যায় কিনা; কারা ছাপে এসব, কারাই বা পড়ে, ইত্যাদি। যাই হোক, সেই ঝগড়া চলাকালীন বাসের উল্টোদিকের সিট্ থেকে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করে ওঠেন, "তুমি সন্দীপন পড়েছো?" দেখা যায় স্বয়ং সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বসে আছেন। স্নিগ্ধেন্দু তো "আররররররে!" --- সেই আমলে সে কলেজছাত্র এবং 'জাগরুক' নামক একটি আপাদমস্তক বিশুদ্ধসাহিত্যপন্থী ছোটপত্রিকার সংগে যুক্ত হয়ে সেখানে তথাকথিত অশ্লীল সাহিত্য ছাপানোর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। 'ব্যাস'-এর জন্ম তখনও হয়নি। এরপর এই বিশুদ্ধ ভার্সেস অশ্লীল লাইনেই স্নিগ্ধেন্দুর জাগরুকমণ্ডলীর সহিত মনকষাকষি-খিস্তাখিস্তি এবং আমাকে একসাথে পত্রিকা প্রকাশ করার প্রস্তাব দেওয়া। আমি তখনও উচ্চমাধ্যমিকের গন্ডি পেরোইনি। এটাসেটা পড়ে ফেলেছি বটে কিন্তু সোজাভাষায় বলতে গেলে বাংলাসাহিত্যের বাল বুঝি। তারও প্রায় ছয়-সাত মাস পরে "ক্রোধোন্মত্তর সংলাপ", "সংবর্ত" ইত্যাদি নাম পেরিয়ে "ব্যাস" নামটির উঠে আসা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া যে প্রথম সংখ্যার ক্রোড়পত্রের বিষয় হবে বাংলাসাহিত্যে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা। কি থাকবে সেখানে? --- না, নামজাদা প্রতিষ্ঠানবিরোধী ভাবমূর্তিওয়ালা 'বা-লে'-দের সাক্ষাৎকার থাকবে (আশা করি পঠনকারীর জন্য নিচে "বা-লে" বিষয়ক ফুটনোট দেওয়ার প্রয়োজন নেই)। এই সাক্ষাৎকার গ্রহণের সূত্রেই চৌঠা ডিসেম্বর, ২০০৫, স্নিগ্ধেন্দুর সাথে আমার এবং দেবার্ঘ্যর সন্দীপনদার চেতলার অহীন্দ্র মঞ্চের নিকটবর্তী বাড়িতে যাওয়া। লালাদা,  মানে প্রচেতা ঘোষ  উপস্থিত ছিলেন সেখানে সেদিন খেয়াল আছে। স্নিগ্ধেন্দু তদ্দিনে সাংবাদিক, 'আজকাল' পত্রিকার জন্য হুগলী জেলা থেকে খবর পাঠায়। ফলে ওর ফোনে, যা কিনা আমাদের তৎকালীন নোকিয়া ১১০০ মডেলের থেকে অনেকটাই অ্যাডভান্সড, কথাবার্তা রেকর্ড করে নেওয়ার সুবিধাটি ছিল। কিন্তু সেই আমলে সম্ভবত ডেটা কেবল হতো না বা হলেও সিআইএ জানতো, আমি জানতাম না। ফলতঃ পরে কোনো একদিন, ২০০৬ সালের মার্চ মাসের পরই হবে, কারণ তার আগে আমার নিজের কম্পিউটার ছিল না, ব্যান্ডেলের বাড়িতে বসে ফোন থেকে রেকর্ডিংটা চালিয়ে হেডফোনের মাইক্রোফোন দিয়ে অডিওটা কম্পিউটারে রেকর্ড করে নেওয়া হয়। স্নিগ্ধেন্দুর স্বভাব ছিল অনবরত বকবক করে যাওয়া। এই দ্বিতীয় রেকর্ডিং-এর সময়ও সে তার ডিএনএতে প্রোথিত সেই স্বভাবের বাইরে যেতে পারেনি সম্পূর্ণভাবে। তারই ফলস্বরূপ তৃতীয় ট্র্যাকটির শুরুতে আমার "চুপ" বলে চেঁচিয়ে ওঠা শুনতে পাওয়া যাচ্ছে।


মৃত্যু মানুষকে মহান করে দেয়। সেই পদ্ধতিটি আমি চাক্ষুষ করিয়াছি। সন্দীপনের মৃত্যুর পর বন্ধুদের মধ্যে ধীরে ধীরে সন্দীপন জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন। বিশুদ্ধসাহিত্যপন্থীরাও মৃত্যুর ম্যাজিক কাঠির ছোঁয়ায় সন্দীপনের লেখা পড়তে গিয়ে মাঝে মাঝে কেঁদেও ফেলতে শুরু করে এমনকি। প্রথম তাদের মাথায় ঢোকে অস্তিত্বের দ্বৈততা তথা বহুমুখীনতার জায়গাটা। "একহাতে খড়ি, অন্যহাতে ডাস্টার"-এর মতো একহাতে সিগারেট আর একহাতে লাইটার ধরে কেউ কেউ বুঝতে পারেনা তার কোনটা সত্যি। কেউ কি তাকে বিশ্বাস করবে; ধন্দে পরে যায় তারা! অথচ এই রিয়ালাইজেশন সন্দীপনের মৃত্যুর আগে তাদের হয়নি। মানে বিশুদ্ধসাহিত্যপন্থীরা যে আসলে ঢ্যামনা, সে বিশ্বাস আমার ছিলই; সন্দীপনদার মৃত্যু সেই বিশ্বাসকে আরও বাস্তবিক ভিত্তি খুঁজে পেতে সাহায্য করে।

সাক্ষাৎকারের ঠিক আট দিন পর এক দুপুরবেলা আমি আর স্নিগ্ধেন্দু কলেজস্ট্রীটে উদ্দেশ্যহীন ঘুরে বেড়াচ্ছি, এমন সময় ফোন এলো অদ্রীশদার। সন্দীপনদা মারা গেছেন। মৃতদেহ দেখতে আমার ভালো লাগেনা বিশেষ, সে কোনো আত্মীয়রই হোক, অথবা লেখক, অথবা নামজাদা কোনো সেলিব্রিটির। মৃতদেহরা মৃতদেহই হয়। তারপরও রবীন্দ্রসদনে যে গিয়েছিলাম,  সেটা মূলত স্নিগ্ধেন্দুর উৎসাহে। গিয়ে দেখলাম নাকে তুলো গোঁজা মৃতদেহ একটা শোয়ানো আছে, জীবিত অবস্থায় যাকে সবাই লেখক অথবা "না-লেখক" সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় বলে জানতো। ভীড় কম ছিল না খুব একটা। অনেকের মুখেই বেশ দুঃখ-দুঃখ হাবভাব। আমিও চেষ্টা করছিলাম দুঃখ পাওয়ার কিন্তু খালি মনে পরে যাচ্ছিলো, "সত্যি তো, নাকি বই পড়ে শিখেছো?"..."বা, এইরকম প্রচলিত বলে..."

এরপরের গল্পটি তেরো বছর পরের। এর মাঝের গল্প নিয়ে পরে কখনো সময়সুযোগ করে লেখা যাবে নিশ্চয়ই। ২০১৮ সালের জুন মাস। মে মাসে আইএফসি তথা স্বাধীন চলচ্চিত্র সংসদ তৈরী হয়েছে আনঅফিসিয়ালি। তার আগে "জাঁ-লুক গোদার হ্যাড নো স্ক্রিপ্ট"-এর মতো ছবি কেউ যে কলকাতা শহরে স্ক্রিনিং করতে চাইবে সেরকম সম্ভাবনা দেখিনি। কিন্তু আমার আইএফসি-র বন্ধুরা চাইলেন। ফলে খোঁজ করতে হলো মাস্টার কপির। গত চারবছরে দু'বার বাসাবদল হয়েছে। একটু ডিপ্রেসডও ছিলাম নিজের কাজকর্ম নিয়ে। মানে "আসমানী জহরত" তথা "ওয়ান রুপি ফিল্ম প্রোজেক্ট" যে পরিমানে হইচই ফেলে দিয়েছিলো আর তারপর সেই উদ্যোগের যা পরিণতি হলো তাতে পয়সা কামানো ছাড়া আর অন্য কোনোদিকে নজর দেওয়ার চেষ্টাও করিনি। ওই দীপাংশুর সাথে দুএকটা কাজ, লেট ৬৬এ, তাও মূলত ওর উদ্যোগেই। আমার দিক থেকে একটু প্রায়শ্চিত্তের মতো। আমেরিকা আর ইউরোপের চেটে চেটে পাপ তো আর কম করছি না, আবার না করেও উপায় নেই। পুঁজিবাদের রমরমা বাজারে স্টারভিং আর্টিস্ট-এর মিথ-এ বিশ্বাস অটল রেখে বসে থাকার মানে হয়না কোনো। নিজের কাজকর্মকে অস্বীকারই করতে শুরু করেছিলাম প্রায়। ফলে পাখির ডিমে তা দেওয়ার মতো নিজের ছবির মাস্টার ডিস্কের ওপর অন্ড চাপিয়ে বসেছিলাম না সেইসময় এক্কেবারেই। ধারণাই ছিলোনা ছবিটার আদেও ফিজিক্যাল কপি  রয়েছে কিনা কোথাও। সেরকম সময়ই ঘটনাটা ঘটলো। ঠিক হলো জুন মাসের ২৯ তারিখ আরও কিছু শর্ট ফিল্মের সাথে "জাঁ-লুক গোদার হ্যাড নো স্ক্রিপ্ট" দেখানো হবে। তাও কিনা খোদ টালিগঞ্জের একটা স্টুডিওর ভিতর। ফিল্ম সার্ভিসেস ষ্টুডিও, গল্ফ ক্লাব রোড। ব্যাপারটা শুনে এতটাই মজা লাগলো যে সিরিয়াসলি মাস্টার ডিস্কটা খুঁজতে শুরু করলাম। সেই ডিস্ক পাওয়া যায়নি, মানে যেটায় শুধু আমার ছবিটা রাইট করা ছিল। স্নিগ্ধেন্দুর "স্যান্ডবুক" পেলাম অবশ্য।আমার বাড়ি থেকে অনেক ডিভিডি চুরি হয়েছে, কে জানে আমার ছবিটাও কেউ ভালোবেসে নিজের মনে করে নিয়ে গেছে কিনা! অবশেষে "ফাইভ নো বাজেট ফিল্মস"-এর একটা চালু কপি পাওয়া গেলো ব্যান্ডেলের বাড়িতে। সেখান থেকে রিপ করে ছবিটা জমা করলাম। গোটা পদ্ধতিতে লাভের লাভ এই ফাইল তিনটে খুঁজে পাওয়া গেলো পুরোনো সিডি-ডিভিডি ঘাঁটতে ঘাঁটতে। এটাই সন্দীপনের শেষ সাক্ষাৎকার, এবং সম্ভবত অন্তিম ভয়েস রেকর্ডিং। এরকমভাবেই হয়তো একদিন সুবিমল মিশ্র-র কল রেকর্ডিংগুলোও খুঁজে পেয়ে যাবো। সুবিমলদার আবার খুব ভয় ছিল, উনি মারা গেলে ওঁর সব ছবি-ভিডিও আমরা যদি আনন্দবাজারকে বেচে দিই! তা এক্ষণে কথা দিয়ে গেলাম, না, বেচবো না! এইরকমই তাঁবুঘর কিংবা অন্য কোনো অবাণিজ্যিক পত্রিকা অথবা ওয়েবজিন-এর হাতেই তুলে দেব সব। সুবিমলদা নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।



অনমিত্র রায়
Anamitra Roy

Comments

Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS