Skip to main content



ক্লোরোসিস : অভিষেক ঝা


~ক্লোরোসিস~

সকরকন্দের মাটি লাগা এক ভোর বা বিকেলে বড় তৃপ্তি করে প্রেম ঠুকরে ঠুকরে পেটে চালান করছিল এক কাউয়া । দুটি তার ভাগ পাচ্ছিল। আরও দুটি ভাগ না পেয়ে, না-থাকা জিভবা দিয়ে লাল ঝরাচ্ছিল । প্রয়োজনের সময় তৃপ্তি সহকারে খাদ্যগ্রহন --- এর চেয়ে সহজিয়া নিষ্পাপ দৃশ্য আর কীইবা রয়েছে খাদ্যাভাবের এই  পৃথিবীতে? তাই এই সহজ বিকাল বা ভোরের ফ্রেমে সবচেয়ে বেশী করে ছড়িয়ে  রয়েছে প্রেম। ঠোঁটে মাংসের কুচি লেগে থাকা কাকের চোখের যে সুগভীর আনন্দ তা দেখে খানিক দূরে দাঁড়িয়ে থাকা পিঠালু গাছটা দুটি পাতা ঝরিয়ে দিল পারা স্বচ্ছ রাধিকার পুকুরের বুকে। এক পাক নিষ্পাপ আনন্দে আরেক ঠোকরে খানিক মাংস ছিঁড়ে নিল আরেকটি কাক। কয়েক ঠোকর পর মাংস পিণ্ডটা ঝুপ করে পড়ে গেল জলে। হোঁৎকা মাগুর ঘাই মারল। তার নাগাল এড়িয়েও দু-এক কুচি চায়ের পাতার মত থিতোতে থিতোতে তলার পাঁকে সবসময় স্বপ্ন দেখার মরিয়া চেষ্টায় চোখ মুদে থাকা সেই কাছিমের গায়ে এসে বসল। এখানে শ্যাওলা, পাঁক, মরে যাওয়া মাছের কাঁটা, বালু, গুগলির কঙ্কাল, শামুকের খোল, ছেঁড়া শাড়ির পাড়, এয়োতি চিহ্ন, ডুবে মরা রাধিকার গল্প -- সব কিছু কাছিম-শরীর হয়ে আছে।
এ বাড়িতে যেদিন বউ হয়ে আসল সে, অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছিল। বকুলফুলের গাছের দিকে এক ভাবে তাকিয়েছিল তার জন্য বরাদ্দ হওয়া ঘরটা থেকে। বকুলফুলের গাছটাও বোধহয় একমনে দেখছিল তাকে। পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকলে চোখ খুলে রাখা মুশকিল হয়ে পড়ে খানিক পর। বকুলের গন্ধে চোখ খুলে রাখা মুশকিল হল তার। চোখ বন্ধ করলেই ঘিরে ধরে দুপুর। এ জন্মেই ছিল তো? নাকি অনেক জন্মের আগের সেইসব দুপুর? শালুকের শিকড়ে পৌঁছতে নিঃশ্বাস বন্ধ করে ডুবে যাচ্ছে সে। কালচে সবুজ জলের নিচে শণের মত ঘাস পেরিয়ে সাপের দল হয়ে একভাবে দুলে যাচ্ছে শালুকদের শিকড়। একসাথে প্রার্থনা করছে যেন শিকড় পাওয়ার। গলার কণ্ঠায় চিনচিনে এক কামড় আর হিসহিস ভাবে গোলাপ বলে চলেছে, “বকুলের মালা, বকুলের তাগা, বকুলের টিকলী, বকুলের বিছা , বকুলের তোড়া পরতে হবে তোকে। পরবি তো?” সবুজ জলের নিচে তার চোখ নরম ভাবে বন্ধ হয়ে আসে। পনেরোতে’তে পা দিতে তার তখনও দুই বছর বাকি। “কী গো ফুলবউ, মায়ের  কথা মনে পড়ছে বুঝি?” পপিতা-মাঈ জিজ্ঞাসা করে। তার চোখ জুড়ে হিসহিসে ভাবে নড়ে চলেছে শালুকের শিকড় আর বকুলের গন্ধে ম-ম করছে এই ঘরের বিহান বেলা। তিল মোদক হাতে নিয়ে লাল পাড় ঘিয়া ঢাকাই-এর খুঁটে পয়সা বেঁধে এই বাড়ির মহিলারা ভিড় জমাতে শুরু করেছে নতুন বউ দেখতে। “এই নাও বিবির আনা”, “রাখো এই আকবরী মোহর”, “মহীপালী মুদ্রাটা রাখো দেখি”।
তেঁতুল দিয়ে চকচকে করে নিচ্ছে সে তার প্রাপ্ত ভিক্টোরিয়ার মুদ্রা, আকবরের  মোহর, মহীপালের রৌপ্য মুদ্রা। তার জন্য গামারি কাঠের ছোট্ট একটা ঠাকুর  সিংহাসন বানিয়ে আনা হয়েছে। সেখানে সে লক্ষ্মী, সরস্বতী, চৈতন্য, কালীর সাথে এই মুদ্রাগুলিকেও রাখে। সংসারে সুখ শান্তি থাকে তাহলে, তার মা, শাশুড়ী বলে দিয়েছে।  সেই  সিংহাসনের এক কোণে ছোট্ট লাল রঙের পুঁটুলিতে বাঁধা আছে শুকিয়ে যাওয়া কিছু শালুকের শিকড়, তার বাপের বাড়ি থেকে আনা। অনেকটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা বাড়িটার সব জায়গায় তার অবাধ যাতায়াতের সুযোগ ছিল না। ঠোঁট ফুলিয়ে কাঁদত খুব প্রথম- প্রথম। শাশুড়ী নিজ হাতে হাতিপাউয়া লুচি আর বোঁদে খাইয়ে দিত। সে নিজের যাতায়াতের জায়গাটুকুকে খুব গভীর ভাবে চিনতে লাগলো প্রাথমিক কান্নাকাটি মিটে যাওয়ার পর।
পিছনের বাগানের কাগজি লেবুর গাছের শিকড়তলে এক শঙ্খিনী বাস করে। সে  জানত না, কেউ তাকে বলার প্রয়োজন বোধ করেনি।  প্রথম প্রথম ভাবত  গন্ধগোকুল। চাঁদের রাতে আতপ চালের গন্ধে ভরে উঠছে পুরো বাগানটা। হঠাৎ পরিত্রাহি চিৎকার ঝোপের টুনটুনির বাসা থেকে। সে দেখে একটি টুনটুনির বেরিয়ে থাকা মাথা নিয়ে সরে যাচ্ছে বিশাল সেই লতা। গায়ে চাঁদ পড়ে অদ্ভুত এক রামধনু ছিটকে আসছে। তার খুব ভাল লাগছে। সে একমনে তাকিয়ে থাকছে সাপের খাদ্যগ্রহন, ঝিম মেরে স্থির থাকার সময়টুকুর দিকে। তারপর ধীরে ধীরে চোখ যাচ্ছে কাগজি লেবুর শিকড়তলে পুরো দেহটির উধাও হয়ে যাওয়ার পুরোটায়। তার কোনো ভয় আসে না। লেবুর পাতার গন্ধ বুক ভরে নেয়।
“চলো, একদিন রাধিকার পুকুরে চুপিচুপি স্নান করে আসি”, পপিতা-মাঈ লোভ দেখায়। সে তো বরাবরের লোভী। সুবিশাল এক দীঘির সামনে আরও সুবিশাল হয়ে যে দুপুর পড়ে আছে, তাদের ছেদবিন্দুতে তারা স্নান করছে। পাশে একটা পিঠালু গাছ। সে ডুব দিয়ে  বুরবুরি কেটে যেতে চাইছে ভিতর জলে। এসব জলের তলে অজস্র অবদমন মুখ বুজে মাটি হয়ে বুদ্বুদ হওয়ার ক্ষণের অপেক্ষায় কত কাল ধরে চুপ হয়ে থাকে। যারা শ্বাস বন্ধ করে জলের তলে যেতে পারে তাদের ঘিরে ধরে সেই দমবন্ধকর অবদমনরা। এই সুবিশাল দু্পুরের সামনে সুবিশাল এই দীঘি সেইসব অবদমনকে খানিক  ভুলতে চেয়ে  তাদের সাহায্য নেয়। স্বপ্নসম হয়ে ওঠে  সময়। সে ও পপিতা-মাঈ স্থির চোখে দেখে দীঘির তলে জমা হওয়া সবকিছুকে। স্থির চোখে তারা মুগ্ধ হয়ে দেখে তাদের শরীর। স্থির চোখে জলের তল থেকে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে এক  কচ্ছপ। মাটি ও বালির  মত সে চোখ। স্থির। স্থি্র একসময় বুক চাপ দেয়, ধরপড়িয়ে ভেঙে যায় সব। অনেক অনেক দিন পর ঘরে বসে সে হেসে গড়াতে গড়াতে সেই চুপস্নানের গল্প আবার করছিল তার বোনের সাথে। ঘর জুড়ে তখন দীঘির তল। আর একটা ছোট্ট বুদ্বুদ সুবিশাল দুপুরের দীঘি হয়ে যাওয়া অংশটা শরীরে নিয়ে উপরে উঠতে শুরু করেছে তার শরীর জুড়ে।
“লাবণ্যের মা কেমন আছে রে?”
“তোর কথা জিজ্ঞাসা করে। জানতে চাই কেমন আছিস।”
“আর কিছু বলে না?”
“কী?”
“আমায় দেখা করতে বলে না?”
“চন্দ্রপুলি করলে দিয়ে যায়। তখনও তোর কথা বলে তো।”
চন্দ্রপুলির খেতে বড় ভালো লাগে তার। বাইরের খোলসটা মৃদু দাঁত বসিয়ে কামড় দিলেই জিভ জুড়ে ছড়িয়ে পড়ে ক্ষীর। গোলাপেরও খুব ভালো লাগত। লাবণ্যের কন্যাপুতুলের সাথে সে তার কন্যাপুতুলের বিয়ে দিত। ভাদ্রের গুমোট বিকেলে তার মা হাতিপাউয়া লুচি ভাজত কন্যাপুতুলের বিয়ের খাতিরে। সে আর লাবণ্য বড় যত্নে সাজাতো ভাসিয়ে দেওয়ার ডালা। ঘাস, পাতা, খড়ি, লতা, টগর দিয়ে। খরি আর হলুদ দিয়ে আলপনা আঁকত ডালায়। কাপড় দিয়ে একটা ছাউনিও করে দিত। পুতুলগুলো যাতে রোদ জলে কষ্ট না পায় ভাসতে ভাসতে। ডালাটা যখন বড়কা জোলার রোদ গোলা জলে ভাসতে ভাসতে রোদ মতো হয়ে আসত, শেষ বিকালের মাজুয়ানায় তখন তার আর লাবণ্যের খুব কান্না পেত। সেইসব কান্না ভুলিয়ে দিত গোলাপ। ঘাম জ্যাবজ্যাবে তার শরীরে জিভ ঘষে ঘষে জাগিয়ে তুলত  যাবতীয় গ্রন্থি।এত জল, এত জল তার শরীরে! তার আর গোলাপের হাতের রেখাগুলো তখন পরস্পরের হাতের ঘাম চিনতে ব্যস্ত।
খোলা চোখে কড়িবর্গার দিকে তাকিয়ে আছে সে। গুনছে এক, দুই, তিন... । ঠাকুরদালান থেকে সন্ধ্যা আরতির আগেই চলে এসেছে। শরীর খারাপ শুনে চলে যেতে বলেছে সবাই। পপিতা-মাঈকেও সে আসতে বলেছ দ্রুত। দরজায় টোকা পড়ে।  পিলসুজ নিয়ে পপিতা-মাঈ। “তোমার তো এখন শরীর খারাপ হওয়ার কথা নয় ফুলবউ?”। “তুমি যে সেদিন বললা, তোমার নীলাম্বরী পরার ইচ্ছে খুব এয়োতি সাজে?”। “পাগল!”। “কেউ আসবে না এখন”, “না”, “রাধিকার পুকুরে স্নান করতে যাবো না কোনোদিন আর...” , “কেউ দেখে ফেললে?”। পিলসুজের আলো ঠিকরে পড়ছে আয়নায়। সে নীলাম্বরী জড়িয়ে দিয়েছে পপিতা-মাঈ এর গায়ে। নিজ হাতে পরিয়ে দিচ্ছে সব এয়োতি চিহ্ন। “ভাতারখাকির শখ দেখো”, তার চোখের গভীরে ছায়া মেলেছে কাগজি লেবুর শিকড়তল। অনেকদিন আগে বর মরে যাওয়া পপিতা-মাঈ সালঙ্কারা লাজে তাকিয়ে আছে তার দিকে। বাইরে সান্ধ্যকালীন উলুধ্বনি।
বিয়ের তিন বছরের ভেতর এ বাড়ির ভিতর ঘর অবধি চিনে ফেলেছিল সে। বিশাল জাম গাছটার কোটরে বাস করা চারটে প্যাঁচা কখন ইঁদুর নিয়ে আসে মুখে সে  জানে।হেমন্তের মরা  জ্যোৎস্নায় ধানের গোলায় ঘুরে বেড়ানো এ বাড়ির মরে যাওয়া কুমারী মেয়েদের  ছায়াদের সাথে তার আলাপ পরিচয় হয়ে গিয়েছিল।সে জানে কুবো পাখির ডাকের  ফাঁকে ফাঁকে এ বাড়ির দাই-মা পপিতা-মাঈ মুখ দিয়ে হাত চেপে কী এক ব্যথায় খানিক কেঁদে নিচ্ছে। ঠাকুরের পায়েস রান্নার সময় সে তার জা-এর পায়ের তোড়ার দিকে বুকঝিম নিয়ে তাকিয়ে থাকে। পায়েস খানিক ধরে যায়। শাশুড়ী  ঝাঁঝিয়ে ওঠে। তবু বারবার চোখ যায়।শীতের হিমঝুরা রাতে ঝুমঝুম করে  কেবল শজারু ঘুরে ফেরে না সেরেস্তা ঘরের চালে, তার মরে যাওয়া গোলাপফুল লাবণ্যময়ী তার খোলা চুল দেখতে আসে সেই ঝুমঝুমের ভিতর দিয়ে।  তুলসীর পাশে বসে বলছিল তাদের মা, জ্যাঠাইমা, ন’পিসি। তিল বিনিময়  করে সে আর লাবণ্য গোলাপফুল হয়েছিল। লাবণ্য আত্মহত্যা করলে নিয়ম মেনে অশৌচও পালন করেছিল সে। উনুনের কাঠ শব্দ করে ফাটে। পোড়া  পায়েসের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে বাড়িময়। আর এসবের মধ্যিখানে সে দুই বার  পোয়াতি হয়ে যায়। এত যত্নআত্তি, কত্ত খাতির -- তারপরেও দুইবারই পেট ঝরে যায়। আবার পেট হয় ।
“এইগুলো যে করিস, ভয় লাগে না গোলাপ?”, ইঁদারার জল থেকে এইসব রাতে লাবণ্যময়ী তার গা ধোয়ার সময় উঠে আসে ।সে ভারি অবাক হয়ে ভাবত প্রথম প্রথম যে লাবণ্য তো এ ইঁদারায় ঝাঁপ দেয়নি। তাহলে সে কী করে এ ইঁদারা  থেকে উঠে আসে! ভাবার কোনো কিনার না পেয়ে সে এই নিয়ে ভাবা ছেড়ে দেয় একসময়। “পাপের ভয় নাই তোর?”, লাবণ্যের গলায় উষ্মা। চুল ঝাড়তে ঝাড়তে শোনে সে। “আমার নিজেকে পাপী ঠেকত গোলাপ, তোর মত এতকিছু না করেও”, লাবণ্য যেন নিজেকেই বলছে। “আমার মনে হত আমি একটা খারাপ মেয়ে আর তোকেও খারাপ করে দিচ্ছি”, লাবণ্যের গলা দলা পাকাচ্ছে। ইঁদারার যে শ্যাওলাময় জগৎ থেকে উঠে আসে সে, সেই শ্যাওলারা ইঁদারার গা বেয়ে উঠে লাবণ্যকে আবার শ্যাওলায় পরিণত করছে। চারদিকে তাকিয়ে ভেজা শাড়িটা ছেড়ে গামছা জড়িয়ে নেয়  সে। “আমরা কি পাপ করতাম গোলাপ?” প্রায় শ্যাওলা হয়ে আসা লাবণ্যের  জিজ্ঞাসা। “অ বউমা সর্দি লেগে যাবে তো, এখন অসাবধান হোয়ো না”, খানিক দূর থেকে তার শাশুড়ি গলায় উদ্বেগ নিয়ে বলে ওঠে।
এসব ভোর বা বিকেলে পপিতা-মাঈ বড় যত্ন করে তার চুলে বিলি কেটে দেয়। তার থোক থোক বুক থেকে চোষে কত্ত নিচের ঘরে থাকা যখের জীবন। পপিতা-মাঈ ঠোঁট চিপে কিছু বলতে চায়, সে ঠোঁট দিয়ে বন্ধ করায় সে ঠোঁট। দক্ষ দাই-হাত জানে কোথায় কতটুকু চাপ দিয়ে চিরে দিলে বেরিয়ে আসবে হাত পায়ের আভাস না হওয়া সেই রক্তমাখা মাংসপিণ্ড। তারা জানে কোথায় সে মাংসপিণ্ড রেখে আসলে  কেউ খুঁজেই পাবে না তার বারবার পেট ঝরে যাওয়ার কারণ। সে জানে এইবার নিশ্চিত তার সতীন আসবে। “সেই শুরুর দিন থেকে উনাকে বারবার বারণ করে আসছি। আমার শরীর ছোঁবেন না। ঘিনঘিনে লাগে...”, আগের দুইবারের মত আবার বলে ওঠে সে।


অভিষেক ঝা
Abhishek Jha

Comments

Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS