Skip to main content



কবির গদ্য ~ দীপ শেখর চক্রবর্তী


বালকের ডুবন্ত নীল জাহাজ

বালকের জীবনের সবথেকে গভীরতম ব্যথা হয়ত এই যে সে মায়ের হাতের গরসের মাপে যে পৃথিবী চিনেছিল সেই পৃথিবী দিনদিন এত বড়,এত জটিল হয়ে উঠছে যে দুগালে আটছে না। মায়ের সুতির শাড়ি মেলা দুপুরের রোদে বসতবাড়ির সিড়িটায় বসে আসন্ন শীতের হাল্কা নীল রঙের আকাশটা দেখে বালকের মনে হত এ জীবন পোষা বেড়ালের থাবার মতোই নরম। থাবা চেটে চেটে সে বেড়াল যেমন উপযুক্ত এক কার্নিশ খুঁজে নিয়ে পার করে দেয় এক একটি দুপুরজন্ম তেমনই বালক ছেলেবেলার দীঘির পাশে বসে কেবল জলের চিকচিক দেখতে দেখতেই পার করে দিতে পারে এ জীবন। বালকের খুব ভয় হয় একদিন এই দীঘির পাশের পথে পায়ের দাগ,দুপুর ঘুমোনো পুরনো আমলের বাড়ির মেটে রঙ, কাজিপাড়ায় চপের দোকানের ফুলুরি ছেড়ে দূরে কোথাও চলে যেতে হয় তবে কী হবে ওর জীবনে?
অথচ কোন বালকই কি বোঝে কবে সে বড় হয়ে গেছে? বিকেলবেলা ঘন রঙের সালোয়ার পড়ে যে মেয়েটা ওর মাঠ থেকে ঘরে ফেরার পথে উল্টোদিক থেকে পড়তে যেত, বালক কি জানে সেই মেয়েটি আজ কোন দূর দেশে চলে গেছে ঘর করতে। মেয়েটির ঐ পড়তে যাওয়ার ব্যাগের ছবিটি খালি দুলতে থাকে বালকের সামনে।এ সময় কেমন হিংস্র পশুর মতো খুঁজে চলে বালককে আর ও লুকিয়ে লুকিয়ে বাঁচে। পুরনো ছাদের শ্যাওলার পেছনে,রঙিন মাছের পাখনার তলায়, মায়ের পুরনো বউটুপির ভেতরে লুকোতে লুকোতে বালক খালি প্রতিদিন ভাবে এভাবে লুকোনো আর কতদিন?
একদিন ঠিক ধরা পড়ে যাবে। তবুও বালক অপেক্ষা করে থাকে গভীর শীতের রাতে মেলার মাঠ পার করে এসে পা ধুয়ে নেয়। পুরোনো বাড়িরা সব ঠিক আছে। কারো কোনো অসুখ করেনি। নিশ্চিন্ত। রাতের খাবার খেয়ে এরোপ্লেনগুলো গুনে বালক লেপের ভেতর চোখ বুজে ভাবে
এক ইশকুল বালিকা এসে হাত ধরে নিয়ে যাবে এমন চিরলুকোনোর দেশে যেখানে আর কেউ খুঁজে পাবেনা। দুজনে সারারাত তারাদের নীচে বসে গাইবে বালক বালিকার গান। সমস্ত কেটে যাওয়া ঘুড়ি যে গানে ফিরে আসবে ওদের জীবনে।
বালক, বালিকা ও ঘুড়ি। এই হল সংসার।
বালক প্রতিদিন লেপের ভেতর বসে গুহা ভাবে।গুহার ভেতর দিয়ে বালিকার পথ।
বালক ভাবে, ও একা হয়ে যাবে।
একা মানে একা নয়
কাউকে সাথে নিয়ে একা।

স্মৃতির ভেতর ডুবে থাকে এমন নিঃস্ব দুই হাত যা প্রত্যাখান জানে। অথচ কী পায় মানুষের সরলতম হৃদয়ের চাওয়া? কচুবনের পাশ থেকে সরু পায়ের রাস্তায় দুয়েকটা শামুক শিশু। শীতের মোটা উলের সোয়েটারে লেগে থাকা মায়ের হাত, উল বোনা গন্ধ। জ্যোৎস্নায় নদীর চিকচিকে বালির চরে কোন অতৃপ্ত কিশোরী প্রেতের হাত ধরে ক্রমাগত জলের দিকে এগনো।
এই তো কবি। হেমন্ত যখন শীতের প্রেমে পাগল হয়ে ভুলেছে নিজস্ব ব্যস্ততা - এই তো কবি। অজস্র মৃত অক্ষরের স্তূপের গভীরে এক বালক লন্ঠন হাতে ডুবে চলে সমুদ্রের গভীর থেকে রত্ন খুঁজে আনবে বলে। এই তো কবি। অথচ কত অপচয়। সামান্য মুখের বিজ্ঞাপনে ভরে যায় পাতার পর পাতা। অথচ হাত? এমন হাত যা কিশোরীর বুক থেকে প্রথম প্রেমের স্পর্শ হয়ে ওঠে। জোনাকির জ্বলবার জন্য খুলে খুলে ছড়িয়ে দিতে পারে সমস্ত অন্ধকার। আগুনের শিখার মতো জ্বলে জ্বলে পোড়া গন্ধ তোলে। এমন হাত কই?
এখন জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে দামোদরের পবিত্র বালির স্তর। আমি নেই। ছিলাম হেমন্ত সৎকার দুপুরে। বালি মনে রেখেছে দুটি পায়ের বিশ্বাস। সমস্ত আলোর লোভ পেরিয়ে যে এক নিঃস্ব প্রকৃতির কাছে আসে। বহুদিন টলে টলে যে ভুলে গেছে চলার কৌশল।
বলে - কবির সমস্ত হল এক অতৃপ্ত কিশোরী প্রেতের হাত ধরা। হেমন্ত সৎকার করা রাতে জ্যোৎস্নায় চরিত্র হারানো বালির পথ ধরে জলের দিকে এগনো।
অক্ষরে এমন ব্যথা যেন মেয়েটির প্রথম কুয়াশার সর কেটে যাওয়া।

দুচোখে অক্ষর জড়িয়ে নিয়ে ঘুম আসে তাড়াতাড়ি। হেমন্তের এই দুপুরগুলো যেন কমলা মাসির শত অত্যাচার সয়ে বরের কাছে থেকে যাওয়ার মতো বোবা। আমাদের ঘরের মেঝেতে কি বিপুল লাল ছড়িয়ে রয়েছে তা কমলা মাসি জানে। ঘষে ঘষে সে রক্তের দাগ মুছে নিতে ওর হাতে মরে যেত কড়া। চোখ শুকনো অথচ সেই দীর্ঘ ক্ষণ ভিজে থাকা মেঝে পেরোতাম আমি। কমলা মাসির মৃদু তিরস্কার যেন অকাল শঙ্খধ্বনি। হেমন্তের সন্ধেতে ম্যারাপের মাঠে বসে নাটকের মাদুরে বসে মনে হত এ জীবন কী আশ্চর্য এক টান। ঐ রাতের আকাশে দূর থেকে ভেসে আসে মানুষের জীবনের অস্পষ্ট ব্যথা। শহরতলির ভিড়ে ঠাসা রেলগাড়ি থেকে নেমে সদ্য মাতৃহারা এক যুবক যেমন তল পায় না শূন্যতার, তেমনই আমি। অথচ মাটির যেটুকু নরম পায়ে লেগে ছিল তা দিয়ে এখনো অবহেলার ঘাসের ওপর হেঁটে যেতে পারি। এখনো মায়ের ছড়িয়ে রাখা দুপা পার হয়ে খেলতে যেতে পারে বেগুনি রঙের শাড়িমেলা ছাদের পাশের মাঠে। এখনো বালিকার নরম হাত মুঠোয় চেপে নিয়ে এই আশ্চর্য জীবনের প্রতিটি সেপাইয়ের উদ্যত বর্শার পথ আমি পার হয়ে যেতে পারি। চাঁদের আলো মন্ড করে লুকিয়ে রেখে আসতে পারি বুড়ো বটগাছ তলায়, বাতি জ্বালিয়ে নিতে পারে যাতে বৃদ্ধ অশীতিপর জোনাকি। অথচ নিরন্তর যে অবহেলার বিষ ওরা খাইয়ে সভ্য মানুষের মতো করে তোলে সেই বিষ খেয়ে আমি কোথায় মরব? যে সাড়ে সাত হাত জমি আমি কিনে রেখেছিলাম সেখানে কোন দুরন্ত চতুর ব্যাপারী লুকিয়ে রেখেছে তাল তাল সোনা। পথ পাইনা, শুধু রাতভোর জাগি। নিজের যে ক্ষীণ আলো বাঁচিয়ে রেখেছি তার ওম নিয়ে। হেমন্তের শিশির অকাল ফোঁটা কাশফুল হয়ে শুয়ে আছে মাঠে। কোন বৃদ্ধ কামিনের রাতভোর ঘুমহীন চোখ। দূর পথে যেতে যেতে আমার দৃষ্টির পথে একবার তাকায়। সে পথ ধরে প্রথম সূর্যের রেখা নিয়ে আসে মসজিদের সুরের টান, অস্পষ্ট অক্ষর। প্রথম ট্রেন করে শহরের পথে যায় অসংখ্য কৃষক সন্তান। তাদের পা সেনাদের যুদ্ধে যাওয়ার থেকেও দ্রুততম।
রাত হলে
শাদা খাতা ও আমি পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকিয়ে বসে থাকি যদি একটি সামান্য পথ পাওয়া যায়।
একটি সামান্য বিশ্বাসের পথ। যে পথ দিয়ে বালক হেঁটে যায়। ঘুরন্ত লাটাই থেকে তার ধীরে ধীরে তার খুলে যায় সুতো।







দীপ শেখর চক্রবর্তী
Deep Sekhar Chakrabarty

Comments

Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS