Jyotirmoy Shishu

Jyotirmoy Shishu

Rupsa Kundu

AlterEgo

অনিন্দ্যসুন্দর বসেছিল, বসে বসে দেখছিল ভাতের সশপ্যান উপুড় করলে ফ্যান কিভাবে গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ে। ফুটপাথ এর ধারে হোটেল, ফুটপাথে রান্না, ফুটপাথে ধোয়া মোছা আর ফুটপাথ থেকে দুই ফুট উঁচু কাঠের বেঞ্চ এ পরিবেশন। এই মুহূর্তে মধুর বউ উপুড় হয়ে ভাতের মাড় গালছিল; আর অনিন্দ্যসুন্দর সেটাই দেখছিল হাঁ করে। বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে ছড়িয়ে যাওয়া মাড়...

একটা লোক তাড়াহুড়ো করে হেঁটে যেতে গিয়ে ছপাত করে সেটা মাড়িয়ে দিতেই ফুটপাথ এর উপর ফ্যান এর প্রবাহমানতা থেকে লাফিয়ে উঠে ত্রাহি ত্রাহি রব করে উঠল খিদে। প্রচণ্ড খিদে নিয়েই অনিন্দ্যসুন্দর এখানে এসেছিল; তারপর খিদের মুখে কয়েক কাপ চা আর উপর্যুপরি সিগারেট এর মলম পড়াতে খানিক্ষন কিছু বোঝা যায়নি। সে একটু জোরেই হাঁক দিল এবার - 'কিরে মধু; খেতে টেতে দিবি তো নাকি!' আর মধুও তার স্বভাব সুলভ ভঙ্গিতে এক খদ্দের এর পয়সা মেটাতে মেটাতে অন্য হাতটা তুলে আর খানিকটা সময় চেয়ে নিল অনিন্দ্যসুন্দরের থেকে। এমন রোজই হয়। খাবারটা এক্ষুনি এসে পড়লে আর তারপর গোগ্রাসে খেয়ে ফেল্লেও যে খিদে মিটবে না, তার এই গোপন খবর যেনে গ্যাছে মধু। কিকরে জানলো তা নিয়ে অনিন্দ্যসুন্দর আর মাথা ঘামায়নি। মধু তার হাতটা রোখকে ভঙ্গিতে তোলে। কড়া, রুক্ষ, হলুদের দাগ অলা হাত। পাঁচটা আঙুলকে পাঁচ মিনিট সময় ভেবে প্রথমবার ভুল করেছিল অনিন্দ্যসুন্দর। মাঝে মাঝে খিদেয় মাথা ঝিম ঝিম করলে ওই তালুর মধ্যে অনন্তকালের হাঁড়িতে মোটা চালের অফুরন্ত ভাণ্ডার দেখতে পাওয়া যায়।
অনিন্দ্যসুন্দর মধুর দোকানে প্রায় রোজকার খদ্দের। রুটি, ভাত, মাংসের ঝোল ইত্যাদির সাথে চাও পাওয়া যায়। কোন কোন দিন দোকানে বসেই সন্ধ্যেটা কাটিয়ে খেয়ে দেয়ে ঘরে যায় সে। মধুর বউ হেসে হেসে কথা বলে, জিজ্ঞেস করে - বাড়ি কবে যাবেন?
অনিন্দ্যসুন্দর এর বয়েস পঁয়ত্রিশ। শ্যামবর্ণ, হাল্কা দাড়ি গোঁফ, রোগা। আলাদা আলাদা করে কিছু বলা না গেলেও তাকে সুন্দর দেখতে। সুন্দরের থেকেও বলা ভালো অন্যরকম। আলগা, একটু মেয়েলি - বলে অফিসের সহকর্মীরা। কিন্তু ঠিক ওই জন্যেই চোখ যায় ওর দিকে। মহিলারা নিজেদের মধ্যে বলাবলি করে অনিন্দ্যসুন্দর এর স্ত্রী বা প্রেমিকা ভাগ্যবান। বলে দীর্ঘশ্বাস ফেলে ছোট্ট করে।
অনিন্দ্যসুন্দরকে দেখলেই তার পিছনে একটি মহিলাকে কল্পনা করা যায়। নাকফুল আর ঈষৎ বড় চশমা পরা এক সুখি মহিলা তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে ছায়ার মত। মাঝে মাঝে তার শাড়ির রঙ বদলে যায়। অথচ অনিন্দ্যসুন্দর একা, সম্পূর্ণ একা এবং অভুক্ত...



Introspection 1

কাঁহাতক লুকিয়ে রাখা যায়! বলব বলব ভাবি অথচ বলা হয়না। কিছু কথা এমনি, যাদের বলে ফেলার ইচ্ছা তীব্র তবু সেই সকল তীব্রতাকে এক করে কথারা ঠিক উল্টোমুখে ঝাঁপ দেয়। বলা যায়না। কিছুতেই বলা যায়না। তারা মাথার চুল থেকে পায়ের নখ পর্যন্ত ঘুরপাক খেতে খেতে সব লণ্ডভণ্ড করতে থাকে আর তারপর একসময় ঠাণ্ডা হয়ে যায়, দম বন্ধ করা কোল্ড স্টোরেজ এর মত গাদা দিয়ে পরে থাকে এ ওর ঘাড়ে। তারপর অভ্যাস বশ্যতায় ওই শীতলতাই জড়িয়ে জড়িয়ে যায়, কাশ্মীরি শাল এর মত পরে নিই ওকে।
জানুয়ারির শুরু। তবু শীতটা আসব আসব করেও যেন আসছেনা। অথবা বলা যায় জাঁকিয়ে বসছেনা দু দণ্ড। ফিল্ম ফেস্টিভাল, পার্ক স্ট্রীট এর ভোজবাজি, মরশুমি আমোদ সমস্ত শেষ। মেয়েটি পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যাস্ত। হবেইতো, এম এ এর ফাইনাল পরীক্ষা। আর ঐযে ছেলেটা; ভীষণ কাজের চাপে। ঘড়ির কাঁটা টিক টিক করে পেরিয়ে গেল একটার ঘর। রাত একটা। চারিদিকে মোটা মোটা বই খাতা, বড় বড় ফাইল; সমস্তটা মাথায় গুঁজে সকাল দশটা দশের মেট্রো ধরতে হবে। কিন্তু জায়গা কোথায়? দাঁত মুখ চেপে আর দুটো লাইন পড়তেই মেয়েটির বমি পেয়ে যায়। সিগারেট এর শেষ টান এর সাথে ছেলেটার দুচোখ উপচে পড়ে। অথচ আজ দুপুরবেলায় ক্যান্টিন এর আড্ডায়, বিকেলে ক্লাব এর ফুর্তিতে ওরা একবারও বেরিয়ে আসেনি! মেয়েটি পাঁচ বার একই নাম্বার ডায়াল করেছে। কথা বলেছে - উঠলি?, ব্যাস্ত আছি, ডিনার করলাম, তুই?, আচ্ছা ঘুমোতে যা, গুড নাইট...
বলেছে তো। তবে উপুড় হয়ে এখন কি ঢেলে দিচ্ছে কমোডে। অ্যাসিডিটি? বর্জ্য? ফ্লাশ করে দিলে জলের ঘূর্ণিতে মাটির তলায় চলে যাবে। চিন্তা কি? তবু চিন্তা হয়। যেকোনো গাছের থেকে এই গাছের বাড় সবচেয়ে বেশি, চিন্তার গাছ। সাপের মতন এঁকে বেঁকে যাওয়া ডালপালা জড়িয়ে থাকে একটা একটার সাথে। ফল হয়না, ফুল হয়না। এমন নিষ্ফলা গাছ, তবু আমাদের সবার বাগানে অনেক; অনেকখানি জায়গা জুড়ে থাকে। রক্তবীজের মত বাড়ে, একটা ডাল কেটে ফেললে দুদিন পর সেই ক্ষতের থেকে জন্ম নেয় আরও তিনটে ডাল। এত ভার, এত ডালপালা, এত জট, এত মানুষ উঠতে বসতে নিত্য দিন। অথচ কি আশ্চর্য কেউ কারো পিঠে হেলান দিয়ে বসছেনা দুই মিনিট। কেউ বলছেনা - 'আচ্ছা তোর একটা চিন্তা আমি নিলাম, আমায় দে'। বলবে কিভাবে? তার কি কম আছে?!
ওরা তাই রোজ সকালে ওঠে, কালো কফি বা গ্রিন টি খেয়ে স্নানে যায়। স্নান সেরে পরিপাটি জামাকাপড়, মানানসই গয়না, ঘড়ি, জুতো, স্মার্ট ফোন এ ট্যাক্সির বুকিং, অফিস, কলেজ, লাঞ্চ, গসিপ, সোশ্যাল জোন, ড্রিংক... তারপর হদ্দ হয়ে এলিয়ে পড়ে বিছানায়। তবু একটা দিন সময় করে বসা হয়না। কেউ কাউকে বলেনা, একটা ছুটি নিয়ে চল বারান্দায় বসি। বিকেলের হাওয়ার একটু আলগা হলে; দুজন মিলে ছাড়িয়ে নেব জটগুলো। নাহ, হয়না!
তার চেয়ে এই বেশ ভাল। বমি করে এক গ্লাস ঠাণ্ডা জল ঢক ঢক করে খেয়ে আবার এসে বস। আস্তে আস্তে চোখের জল মুছে নাও। ঝাপটা দাও চোখেমুখে। আয়নায় না দেখাই ভাল, ফিরে এসো। অন্যমনস্ক ভাবেই প্যাটার্ন ড্র করে লক স্ক্রিন খুলে ফেলবে জানি আর নিল সাদা চৌকো বাক্সতে আলতো চাপ দিলে  আনলিমিটেড দেওয়াল খুলে যাবে। সেখানে লেখ, হিজিবিজি কাটো, ভ্যাংচাও, কাদা ছুঁড়ে মারো, বিপ্লব বা সেলিব্রেট করো, কেউ কিচ্ছু বলবে না। তারপর স্ক্রোল করে করে মিলিয়ে নিয়ো তোমাদের সার্বজনীন গোপনীয়তাগুলো, ঘুমোতে যাওয়ার আগে।




রূপসা কুন্ডু

Rupsa Kundu