Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS

Debrup Sarkar

প্রতিফলন

অর্ণব একটা আয়না পরে ন্যায়। আস্ত একটা আয়না। অথবা অসংখ্য আয়নার একটা আস্ত সন্নিবেশ। যাই হোক! এই সবই পরে ন্যায় অর্ণব। তার হাঁটু, কোমর, বুক, বগলের লোম বেয়ে পিল-পিল করতে থাকে গোছা গোছা আয়না।
এই সব পরে-টরে নিয়ে অর্ণব আমায় প্রশ্ন করে যে তাকে এখন ক্যামন দ্যাখাকচ্ছে?
- বেশ। ঠিকই আছে।
ঠোঁটে গোঁজা সিগারেটটা নামিয়ে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলি।
- কোমরের কাছের আয়নাগুলো একটূ ঢিলে লাগছে বুঝলি!
এরপর অর্ণব তার কোমরের কাছের আয়নাগুলোর মধ্যে দিয়ে একটা সরু আয়নার বেল্ট চালান করে দ্যায়। চরম নার্সিসাসে জর্জরিত অর্ণব শেষবার নিজেকে যাচাই করে নিতে ড্রেসিং-টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়ায়। তখন অর্ণবের গায়ে ঝুলে থাকা আয়নাগুলো আর ড্রেসিং-টেবিলের আয়নাটা পরস্পরের দিকে যেন হাঁ করে তাকিয়ে আছে। উভয়ের মধ্যেই উভয়ের অনন্ত প্রতিফলন। ড্রেসিং-টেবিলের আয়নার পেটে অনায়াসে ঢুকে গ্যাছে অর্ণবের গায়ের আয়নাগুলো। আবার ওর গায়ের অসংখ্য আয়নার পেটে একটা করে ড্রেসিং-টেবিলের আয়না, তার মধ্যে আবার প্রতিটা গায়ের আয়না। সে এক অদ্ভুত মায়া-খেলা। এইসব দেখতে থাকে অর্ণব। হাঁ করে। যেন জ্যান্ত একটা বিস্ময় বেরিয়ে আসছে ওর চোখ-মুখ থেকে। একটা গোটা আয়না পড়ে নিলে যা হয় আরকি! নিরলস দৃষ্টিতে সে শুধু তাকিয়েই থাকে।
- কীরে চল! দেড়ি হচ্ছে কিন্তু। রাত হয়ে গেলে রেড হতে পারে।
আমার কথায় সম্বিত ফেরে অর্ণবের। আমি দরজা ঠেলে বাইরে আসি। অর্ণব বেরোয়। বাইরে থেকে দরজা বন্ধ করে দ্যায়। আর সাথে সাথে হাজারটা দরজা বন্ধ হয়ে যায় অর্ণবের গায়ে। এরপর আমরা রাস্তায় নামি। এরকম অসংখ্য আয়না পরে রাস্তায় বেরোনো খুব একটা সহজ বা সুলভ ঘটনা নয়। অসংখ্য চোখ এসে গেঁথে যায় অর্ণবের শরীরে - হাতে গলায় কানে উরুতে আরো কতো জায়গায়। কেউ কেউ মন্ত্রমুগ্ধের মতো অনুসরণ করে আমাদের। পিছু-পিছু। আর তাদের প্রতিবিম্ব অনুসরণ করতে থাকে উলটো দিক থেকে। অর্ণবের পিঠে। সময়ে সময়ে তাদের সাথে অর্ণবের দূরত্ব বাড়তে কমতে থাকে। সেই মতো অর্ণবের পিঠের প্রতিবিম্বের আকারও ছোট বড়ো হতে থাকে। অথচ তারা কখনোই বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় না। সটান লেপ্টে থাকে অর্ণবের পিঠে। ফলত অর্ণবের ভারী ভারী বোধ হয়। তার আর এই আয়নাদের ভালো লাগছে না। সে বিড়বিড় করতে করতে এগোতে থাকে।

আমি বুঝতে পারি। অর্ণবের অভিযোগ। রাগ হওয়াটাই স্বাভাবিক। গোটা একটা পাড়া বয়ে চলা এত সহজ নয়। পাশ দিয়ে চলে যাওয়া অটোটা সজোরে আটকে যায় অর্ণবের কোমরে। আবার ছোট হতে হতে মিলিয়ে যায়। রেবেকা কাকিমা রাস্তার কলে কাপড় কাচছিলো। অর্ণব সামনে দিয়ে যেতেই তার কনুই আর পেটের কাছের আয়নাগুলোয় অসংখ্য রেবেকা কাকিমা এসে ঝুলে পড়লো। সে মুখ্যু মানুষ। একজন থেকে এতোজন হয়ে যাওয়ায় কাজের সুবিধা হবে ভেবে সে খুশি হয়। অথচ তার সাথে সাথে কাপড়ের পরিমানও ততগুণ বেড়ে যায়। যাহোক, সেসব ফেলে আমরা এগিয়ে যাই।

জোড়া জোড়া অনুসন্ধিতসার ঘেরাটোপ টপকে অবশেষে আমরা লেবুবাগানে এসে উপস্থিত হই। তখন সবে সন্ধে নামছে। ফলত ধীরে ধীরে লেবুবাগানের সেই স্যাঁতস্যাতে গলিকে জমে উঠতে দেখি আমরা। যথাযথ পরিমানে পাউডার, লিপস্টিক ও টাইট কাপড় সহযোগে বেশ কামার্ত আস্তরণে সেজে উঠেছে সেখানকার মেয়েরা। এদের মূল গল্পটা হলো প্রথম দর্শনেই যতটা সম্ভব আবেদন নিয়ে নিজেকে মেলে ধরা। এই আবেদন যত সহজ ও সূক্ষ্ম হবে ততটাই সম্ভাবনাময় হয়ে উঠবে এদের গ্রহণযোগ্যতা। তারপর গ্রাহকের বিচারে মনোনয়নের পর প্রতিটা গল্পই একই রকম সরলরৈখিক। এদের হাসি, ভঙ্গি, চলন – এই সবকিছুই প্রতিফলিত হতে থাকে অর্ণবের শরীর জুড়ে। ফলত বোঝা গ্যালো এই অবাঞ্ছিত প্রতিফলন গ্রাহকদের বেশ অস্বস্তিতে ফেলেছে। যাহোক, যাবতীয় বিভ্রান্তির মায়া কাটিয়ে আমরা ঢুকে যাই সরকারি কাউন্টারের অলিন্দে। সামান্য মদ্যপানই আমাদের সাময়িক উদ্দেশ্য।
আমরা কাউন্টারের গোবেচারা মদ্য সরবরাহকারী ভদ্রলোকটিকে বেশ বিপাকে ফেলি এরপর। সে একটা কাঁচের বোতল এগিয়ে দেওয়ার পরই তার অসংখ্য প্রতিফলন ঘটে যায় অর্ণবের দেহ জুড়ে। একটা বোতলের অর্থের বিনিময়ে প্রদেয় মদের বোতলের পরিমান নিয়ে ফলত জটিলতা দ্যাখা যায় তার মধ্যে। সে বারবারই ভাবে যে একটির বদলে সে অসংখ্য বোতল আমাদের সরবরাহ করেছে ও তার অনুপাতে তার প্রাপ্য যথাযথ নয়। স্বাভাবিক ভাবেই অর্ণবকে সরে যেতে হয় সেখান থেকে। অনায়াসেই একটি বোতল নিয়ে এরপর আমরা উঠে যাই ওপরের ছাদে। গ্লাস, জল ও মদের যথেষ্ট সম্ভার সমেত নিজেদের সাজিয়ে নিই সেখানে। সামনের মদ্যপানরত এক বৃদ্ধ কখন যে সবার অগোচরে অর্ণবের বুকের ওপর বেশ আয়েশেই বসে পড়েছে তা জানার আর উপায় থাকে না। মদের বোতলটির হাজার হাজার প্রতিফলন দ্যাখা যায় অর্ণবের শরীরে। ফলে আপাত দৃষ্টিতে এত বিপুল পরিমান পানীয় কীভাবে আমাদের দুজনের পক্ষে খাওয়া সম্ভব তা নিয়ে বাকীদের কৌতুহলের শেষ থাকে না। সে সব উপেক্ষা করেই আমরা মদ্যপান চালিয়ে যেতে থাকি।
তখনো আমরা বুঝে উঠতে পারিনি এক অনর্থক ঝঞ্ঝাট অপেক্ষা করছে আমাদের জন্য। হঠাৎই মৃদু সোরগোল পরে যায় ও অতি দ্রুত খালি হয়ে যায় পানশালা। নীচে থেকে একজন উঠে এসে জানায় কিছুক্ষণের মধ্যেই রেড হওয়ার সমূহ সম্ভাবনার কথা। আমরা সামান্য অবশিষ্ট সামান্য মদ তৎক্ষণাৎ গলায় চালান করি ও উঠে পড়ি। অতিরিক্ত সুরক্ষার জন্য কাউন্টার থেকে টোকেন ও চালান নিতে ভুলি না আমরা। তখন সেখানে সবার চোখে মুখেই এক অদ্ভুত দুশ্চিন্তার ছাপ। বিগত কিছু মুহুর্ত পূর্বেকারও যাবতীয় রঙ ও উল্লাস হারিয়ে শুনশান হয়ে যাওয়া গলিটা ধরে এগিয়ে যাই আমরা। স্বাভাবিক ভাবেই আমাদের পাকরাও করা হয় গলির মুখে। মদ্যপের যাবতীয় লক্ষনের স্ফূরণহীনতা ও অপ্রকাশ্যে মদ্যপানের কারণে আমাদের নিয়ে ঠিক কী করা হবে, সে নিয়ে বেশ চিন্তিত হয়ে পরে পুলিশকর্মীরা। তাছাড়া আমরা জানাই কেবল সরকারি কাউন্টারে মদ্যপানের জন্যই আমাদের উপস্থিতির কথা। টোকেন সহ চালানও দ্যাখানো হয় উপস্থিত কর্মীদের। সবকিছু ছাপিয়ে তাদের সকলেরই দৃষ্টি স্থির অর্ণবের পোশাকের দিকে। এরূপ অস্বাভাবিক পোশাকে আবৃত একটি ইন্টারেস্টিং চরিত্রকে ছেড়ে দিতে তারা কোন মতেই নারাজ। তারা জানায় এরূপ পোশাক ব্যবহার অনৈতিক। প্রকৃত প্রস্তাবে অবিরাম প্রতিফলনে অনায়াসেই ধরা দ্যায় সমাজের যাবতীয় ভালো-খারাপ। ফলত সহজেই বিবিধ ফাঁক-ফোঁকরগুলো উন্মুক্ত হয়ে পড়ে। যা কোনো অবস্থাতেই কাঙ্খেয় নয়। দেখতে দেখতে আমরা রসিকতার পাত্র হয়ে উঠি পুলিশকর্মীদের কাছে। ছোটবাবু হঠাৎ অর্ণবের বুকের কাছে ঝুঁকে তার চুল ঠিক করে ন্যায়। এসব স্বাভাবতই অর্ণবের কাছে তুমুল অস্বস্তিদায়ক হয়ে উঠছিলো। অবশেষে দীর্ঘ নাজেহালের পর শ’দুয়েক টাকা ফাইন করে আমাদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
আমি বুঝতে পারি কোনো অবস্থাতেই অর্ণব আর এজাতীয় পোশাক বরদাস্ত করতে পারছে না। রাস্তার ধারে পরে থাকা একটা ন্যাকড়া জাতীয় কাপড়ের দিকে সে ছুটে যায়। তুলে নিয়ে লুঙ্গির মতো জড়িয়ে ন্যায় কোমরে। তারপর দ্রুত হাতে একে একে সে সব আয়নার টুকরো গা থেকে খুলে ছুঁড়ে ফেলে দিতে থাকে রাস্তায়। সব আয়নার টুকরো খোলা হয়ে গেলে সে এগিয়ে যায় বাড়ির দিকে। আমি কিছুতেই এই আয়নাগুলোর মায়া কাটিয়ে অর্ণবকে অনুসরণ করতে পারছিলাম না। রাস্তায় পড়ে থাকা কয়েকটা টুকরোয় দেখলাম আদুল গায়ে, কোমড়ে একফালি কাপড় জড়ানো অর্ণবের ক্রমশ দূরে সরে যেতে যেতে এক সময় মিলিয়ে যাওয়ার প্রতিফলন।

হঠাৎ লক্ষ্য করি একদল সন্ধিতসু মানুষ ছুটে আসছে ছড়িয়ে থাকা সেই আয়নার টূকরোগুলোর দিকে। অচেনা মুখের ভীড়ে সেখানে রয়েছে রেবেকা কাকিমা, আমাদের নাস্তানাবুদ করা পুলিশকর্মীরা কয়েকজন। কাউন্টারের লোকটির পাশেই ছুটে আসছে লেবুবাগানের কয়েকজন কর্মী, খদ্দের। তাদের মাঝে রয়েছে সেই মদ্যপ বৃদ্ধটিও। তারা শীঘ্রই ছুটে এসে যত দ্রুত সম্ভব সম্ভাব্য সর্বাধীক পরিমানে আয়নার টুকরো সংগ্রহ করতে থাকে। কেউ কেউ কয়েকটা তাদের বুকে, পিঠে লাগিয়ে পরখ করে ন্যায়; আবার কেউ যত্নে সংগ্রহ করে রাখে হাতের ব্যাগটির ভেতর। আমিও আর সামলাতে পারিনা নিজেকে। আমার হাতদুটো অজান্তেই এগিয়ে যায় আমার নাগালে ছড়িয়ে থাকা কয়েকটা আয়নার টুকরোর দিকে...

দেবরূপ সরকার

Debrup Sarkar


Popular Posts