Skip to main content



Rangan Roy

আনপ্লাগড লেখা – ১

নব ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে এখনও রেডিও থেকে বের হয়ে আসেন বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র। সস্প্যানে বসানো দুধ উথলে উঠলেই কলমের মুটকি খুলে বের হয়ে আসে স্টেশন মাস্টার... আমরা কিছু স্টেশনের সমীক্ষায় পার করেছি পুলিশ, রেল, রেডিও। অনেক স্টেশন মাস্টার কে মাস্টারদা বলে ডাকলেই আমার দাঁত ব্যাথা করে ওঠে... আমি আরো একবার কুজোর জলে মুখ ধুয়ে বুকসেলফ গড়িয়ে তুলে ফেলি তীব্র সন্মোহন, কিউবাকৃতি বরফ চিমটে করে ফেলে দিই তোবড়ানো ডেকচি... কাঁচের বোতল ভেঙ্গে চুড়ে ঘোর কেটে যেতে চায়, জ্বর ভেঙে লেখার টেবিল থেকে সব ফেলে দিলে আরো একবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কথা মনে আসে। সেলুলয়েড ফ্রেমের চশমার কাঁচ ঝলসে ওঠে যা কিছু দৃশ্যমান, অকপট স্বীকারোক্তির মত আবেগ ঘন গাম্ভীর্যে... লোডশেডিং লোডশেডিং খেলায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট গন্ডারের শৃঙ্গ কেটে নিয়ে পালিয়ে যাচ্ছে পোচার... প্রতিদিন যারা ডুয়ার্সে চলে যায় আর লিখতে বসে চিলাপাতার অন্ধকার নেমে আসে কলমে, এভাবে চলতে থাকলে টাঙ্গিয়ে দাও হ্যাঙ্গার জীবন যেভাবে টাঙ্গিয়ে রেখেছো অনেকটা। তরবারির জং খুলে খুজে নাও পথ চলা, আবারো রাস্তা বিষয়ক হলে ক্ষতি নেই, অথচ রাস্তার অপর নাম ও জলের অপর নাম যদি এক হয় তাহলে আমি প্রেমোমিটার আবিষ্কারের নেশায় বুঁদ হয়ে যেতে পারি... নাহলে যে মা চিৎকার করে উঠছেন গর্ভবেদনায় এবং অজস্র মা মা গন্ধের ভিতর রক্তের ধাতব গন্ধ, শিবির ছিড়ে ব্লাডগ্রুপ জেনে নাও... দাতাকর্ন নয় তোমার আমার হিমোগ্লোবিন বদল হয়ে যাচ্ছে।
  এরপর লিখিত কিছু সেলফির অবশিষ্টাংশ ফেলে শোনা যাক “বিনা যুদ্ধে নাহি দিব সূচ্চাগ্র মেদিনী”। টাকার জন্যই আজকাল আমার অশোকস্তম্ভের দরকার পড়ে যায়, অশোক স্তম্ভের দিকে তাকিয়ে অজস্র থ্যালাসেমিয়ার শিশু কেঁদে উঠছে... আলোকের ঝলসানি সামলে টিউব শিশুর পিতারা রক্ত খুজে চলেছেন... রক্তের সন্ধানে পুস্তিকা মালা ঘেঁটে অবশেষে ধৃতরাষ্ট্রের ডায়েরী খুলে বসলাম।





খেজুরে লেখা

"খেতে পারি কিন্তু কেন খাবো" এই স্লোগান তুলে কেউ কেউ যদি আমরন অনশনে বসে পড়ে তবে সে বিষয়ে আমাদের কিছু বলবার নেই। পানু শেষ হয়ে গেলে যেমন চটি গল্পে কাজ চালিয়ে দিতে পারি সেই দৃষ্টি তে তোমার দিকে তাকাতে পারিনা বলেই তুমি আমার মন খারাপ করে দিতে জানো। আমি আন্দোলন টান্দোলন করিনা কোনদিন। সেরম ভাবনা বারবার বিপ্লবের কথা মনে পড়ায়। এই যেমন এই লেখাটাই ধরা যাক, মানে কথা "লিখবো লিখবো করছি কিন্তু লিখতে পারছিনা" গোছের এক জগাখিচুড়ির জন্ম দিচ্ছে। তো খেঁজুরে আলাপ ব্যাতিরেকে এবার যদি 'ফেবুর' দেওয়ালে একটা গরম গরম স্ট্যাটাস জুড়ি তো বেশ হয়। রস বোধ কে দুরে ঠেলে কট্টর ভাবে যদি লিখে দিই, "অনেক হয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা, এবার একটু হিন্দু রাষ্ট্র হওয়া যাক।" তবে প্রথমেই তথাকথিত হিন্দুরা চরম খিস্তি খেউর শুনিয়ে আমাকে আনফ্রেন্ড করবেন। মুসলিম দের তুলনায় লক্ষণীয় ভাবে হিন্দুরা আমাকে দুষবে শিবসেনার খোঁচড় বা আর.এস.এস এর চ্যালা বলে। আহাহা "আমি কোন পথে যে চলি কোন কথা যে বলি" -  কিছুই বলবার নেই বলেই এতকথা শুনিয়ে দিচ্ছি, তাহলে ভাবুন তো বলবার থাকলে কি কেলেঙ্কারিই না বেঁধে যেতো!!!
আবার এই কথাটাও আমি ভেবে পাইনি যে কেউ কেউ বলছেন "অর্থই অনর্থের মূল" আবার কেউবা "একমাত্র অর্থেরই অর্থ রয়েছে বাকি সব অর্থ হীন" নাকি রামকৃষ্ণ দেবের বাঙ্গাল সংস্করণ টাই মেনে নেবো "ট্যাহা মাটি মাটি ট্যাহা।" 'নাহ! সত্য সেলুকাস কি বিচিত্র এই দেশ'!
আরও একটা বিষয় আমার কাছে গোলমেলে ঠেকে যায় তা হলো 'তেন ত্যাক্তেন ভুঞ্জিথা'।শঙ্করাচার্য্য ও ম্যাক্সমূলার এর সমাধান করে যাননি। মানে যেতে পারেননি। সন্ন্যাসী রা যেমন বলেন 'নি:স্বার্থ ভাবে ভালোবাসো।'আমি যদি কোন মেয়ে কে ভালোবাসি আলবাত নি:স্বার্থ ভাবেই বাসবো তবে সন্ন্যাসী দের কথা বাবদ আমি ভোগ করতে পারবো না, অর্থাৎ প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সারায় আমি উত্তর দিতে পারবোনা। জোরজবরদস্তি নিজেকে অবদমিত করবো, প্রকৃতির সাথে বেইমানি করবো। প্রসঙ্গক্রমে আমি যদি সেইসব সন্ন্যাসী দের বেইমান বলি তবে আমি যে রামকৃষ্ণ মিশনের ছাত্র সে কথা কেউ বিশ্বাস করবেনা। আমি সন্ন্যাসী বেষ্টনে মানুষ হয়ে এখন তাদের বিরুদ্ধে কথা বললাম অর্থাৎ বিদ্রোহ ঘোষণা, এতবড় বিশ্বাসঘাতকতা ওনারা মানবেন কেন? জুলিয়াস সিজারের মতো ওনারা নিশ্চয়ই বলবেন না, "ইউ টু... ব্রুটাস!!!" আমি আবার পালিয়ে বেড়াবো মুখ লুকিয়ে - জলশহর থেকে তিলোত্তমা।
আহা, নীলাব্জ কি লাইন শুনিয়ে গেলো এইমাত্র - "আমি ভিজলে কেউ ভেজেনা, তুমি ভিজলে পুরো শহর ভিজে যায়।"
কদ্দিন নাটকের রিহার্সালে যাওয়া ছেড়ে দিয়েছি,
কবিতা লেখা ছেড়ে দিয়েছি

জলপাইগুড়ি শহরে থাকা ছেড়ে দিয়েছি... দূর মফস্বলে হোস্টেলের ঘরে-দেওয়ালে দেওয়াল লিখন হয়ে উঠছে আমার একমাত্র জীবন যাপন। এখন আর কিছু বলবার অবকাশ নেই, তুমিও শোনবার অবকাশ হারিয়েছো কিছুদিন। কিছু দিনেই কিরম পাল্টে যাচ্ছে ডিয়ার, "হাইলি সাসপিশাস"!!!




যে শুরুগুলো গল্প হয়ে যেতে পারত

সবাই বের হচ্ছে। সবাই ঢুকছে। রজত ঢুকছেনা। দাঁড়িয়ে আছে। অনেক্ষন। সে কোথায় যাবে? এমন কোন জায়গা আছে যেখানে সে তার দিনের কয়েকটা মূহুর্ত সুন্দর ভাবে কাটাতে পারে? নাহ! হঠাৎ দূরে মিছিল দেখা গেলো একটা। সিপিএম বন্ধ ডেকেছে। রজত দিশেহারা হয়ে পড়ছে। ভীড়ের স্রোতে মিশে যাওয়া যেতে পারে - এইসব ভাবতে ভাবতে তার মাথায় ভয়ানক ব্যথা শুরু হলো। অজস্র শুয়োপোকা তার দিকে যেন অগ্রসর হচ্ছে। বাবা শুয়োপোকা কে ছ্যাঙা বলে।

বিক্রমের মন ভালো নেই। বিক্রমের কিচ্ছু ভাল্লাগছে না। কেউ তাকে বুঝছেনা। সে কোথায় যাবে? মাথাটা পাগল পাগল, ওহ্!


আমাকে যখন কেউ সিগারেট অফার করে আমি তৎক্ষণাৎ তা প্রত্যাক্ষান করি। যদি কেউ কারণ জিজ্ঞেস করে যে আমি কেন ধুমপান করিনা, তাহলে আমি বেশ চাঁচাছোলা ভাষায় জবাব দিই - " বাবার কষ্ট করে উপার্জন করা পয়সা সিগারেটের মত অতিবাজে অপ্রয়োজনীয় বস্তুর পিছনে ধ্বংস করার মানসিকতা আমার নেই।" (হুবহু এই কথাটাই যে বলি তা নয়। তবে মূল বিষয় বস্তু এই থাকে) তো আমার এমন ঝাল বা টক বা তেতো কথা শুনলেই আমার এক বান্ধবী বলে ওঠে, "তোর সবতাতেই বাড়াবাড়ি, নিজের গরীবিয়ানা ইচ্ছে করে জাহির করা বা প্রতিক্ষেত্রে ডুকরে ডুকরে বলার কি মানে?"

গ্যালাক্সি অ্যাপার্টমেন্ট। এই নামটা যখন খুজে বেড়াচ্ছিলাম তখন বাম জমানার পতন হয়েছে, এবং তখন ভারতীয় সময় রাত সাড়ে আটটা। গ্রীনিচ সময় ধরে বলতে বল্লে তা হবে আমার ওপর রীতিমতো জুলুমবাজী। কেননা ভূগোল আমার প্রিয় বিষয় গুলির একটি হলেও ভূগোলের অঙ্ক কষতে আমি একফোঁটাও মজবুত না। তবে ভূগোলেরই একটা অংশ খুঁজতে আমি জলশহরে ঘুরে ঘুরে ছায়াপথ হয়ে যাচ্ছি।


রাত্রিকালীন এসএমএস এর প্রত্যুত্তর হিসাবে প্রথমেই কি প্রত্যাখ্যাত হবে? আই লাভ ইউ? বরং কিছুক্ষণ আগে মুখোশ খুলে শুধু আমি এসে দাঁড়িয়েছি তোমার সম্মুখে। কোন রণক্লান্ত ঘোড়া নয়, যুদ্ধের প্রস্তুতি পর্ব। সমুদ্রের সফেন মাখানো বালুচর থেকে ফিরে যাওয়া সোলেমানের ঘোড়া নয়, আমি মোজেসের ঘোড়া হয়ে পার হতে চাই ভূমধ্যসাগর্। 'তোমার সম্মুখে সমস্ত সমুদ্র মিথ্যা হয়ে যায়' এমন আবেগ জর্জরিত কথার পূর্বাপ্রেক্ষিতে হেঁটে হেঁটে ফিরে যেতে পারি চারু মজুমদারের বাড়ি -
এটা কি গল্প হচ্ছে?  নাকি কবিতা?  নাকি নেহাতই একটা বিষয় বস্তু হীন বাংলা লেখা? ধুস! তাগাদা খেয়েও গল্প এগুচ্ছেনা মাইরি!

দুর্ধর্ষ সময়ে বৃষ্টি নামলো। মা একটু আগেই খিচুড়ি বসিয়েছে। ওহ্ এবার অন্তত বৃষ্টির মধ্যে গরম খিচুড়ি ও পাঁপরভাজা খাওয়ার সৌভাগ্য মিলবে। জানালায় দাঁড়িয়ে বৃষ্টি দেখছি। আমগাছের ডাল বেয়ে চুয়ে চুয়ে জল পড়ছে আর পিঁপড়েগুলো সদ্য ঘর ভেঙ্গে যাওয়ায় মহাতঙ্কে ছটফট করছে। গর্ত থেকে বেড়িয়ে ওরা সবাই বোধহয় ছোটাছুটি করতে করতে গালমন্দ পাড়ছে ওপরওয়ালাকে। ওদের নিজস্ব ভাষাটা কেমন? আমি কেমন ভাবপ্রবণ হয়ে পড়লাম। সন্ধ্যায় একবার অঞ্জলির বাড়ি যেতে হবে। ও আজ সন্ধ্যায় একা বাড়িতে আমার জন্য অপেক্ষা করবে বলেছে। ওহ্! বৃষ্টিটা কমলে দুটো সুবিধা হবে, পিঁপড়ের ঘর বাঁচবে - আমি অঞ্জলির ঘর যেতে পারবো। কিন্তু বৃষ্টি কমলে কি নিজের ঘরে বসে খিচুড়ি -পাঁপড়ভাজা খাওয়ার আনন্দটা পাবো? বাস্তবিকই কোন ঘর আমার চাই? কোন বাসায় আমি আনন্দ পাবো? 'ভালো'বাসাটা অ্যাপ্রুপিয়েট কোথায়?

এরপরের স্টপেজেই নামতে হবে। প্রচন্ড ভীড় বাস। আমার গায়ের উপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে সব দাঁড়িয়ে আছে। ঘেমে নেয়ে একসা অবস্থা। আমার পাশেই একজন প্রেগন্যান্ট মহিলা দাঁড়িয়ে… বসার জন্য ছটফট করছেন। বোঝাই যাচ্ছে খুব কষ্ট হচ্ছে ওনার্। উঠে দাঁড়ালাম।
-      বসুন এখানে দিদি।
মহিলাটি একবার আমার দিকে তাকালো ,তারপর পাশে দাঁড়ানো লোকটির দিকে। পাশের লোকটির চোখে অসম্ভব খুশির ঝিলিক। মহিলা বসলেন। আমি দাঁড়ালাম।
-      ইয়াংম্যান, তোমার মত ছেলে আজকাল দেখা যায়না। মানুষের কষ্টটা অনুভব করতে জানো। খুব ভাল্লাগলো। কি নাম তোমার ভাই?
ভীড় বাসের সবাই আমার দিকে জুলজুল চোখে তাকিয়ে।যেন চিড়িয়াখানার কোন আজব জন্তু দেখছে। নাম বল্লাম। আসলে আমি ওনাকে ঠিক বসতে দেওয়ার উদ্দেশ্যে উঠে দাঁড়াইনি। সামনেই স্টপেজ। এই গরমে ভীড়ের চাপে বসে থাকতেই বেশী কষ্ট হচ্ছিলো। ফাঁকতালে পরোপোকারীর শিরোনাম জুটে গেলো।




গোপনে কবিতা ছাড়ান

OLX এ কবিতা বিক্রি করলে নাকি ভালো টাকা পাওয়া যায়! আমার কবিতার কোন দাম নির্ধারণ হয়নি। যা পাবো তাতেই বেচে দেবো। এরপর একদিন একটা লোক চলে এলো, কবিতা কিনে নিলো। টাকা পেলাম। আমি ও জোকার মানে আমার দ্বিতীয় চরিত্র খুব খুশি। তারপর কিছুদিন কাটলো - খবর পেলাম একটা লোক নতুন কবি হয়েছে, তার কবিতায় নাকি আমার সিগ্নেচার, সুপ্রিমকোর্ট রায় দিলো - এত দিন নাকি আমিই ওনার কবিতা চুরি করে নিজের নামে চালিয়েছিলাম। বলুন ধর্মাবতার, আমি গরু খাইনি শুয়োর খাইনি - কবিতা লিখেই বিচার পেয়ে গেলাম। তারপর দেখা গেলো জোকারের মাথার মধ্যে রোদ পড়েছে মাথার ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে আমার ধড়... কেউ যেন কানে কানে বলে গেলো 

'গোপনে কবিতা ছাড়ান', এরপর থেকে প্রায়ই এরকম স্বপ্ন 

"গোপনে কবিতা ছাড়ান।
আপনি কি কবিতা লেখেন? যার জন্য সমাজ কি আপনাকে কবি না বলে "কোবি" বলে খিস্তি করে? তাহলে চলে আসুন আমাদের এখানে। আমরা অত্যন্ত যত্নের সাথে কবিতা ছাড়িয়ে দি। মনে রাখবেন এই চিকিৎসার কোন সাইডএফেক্ট নেই।"

সত্যিই এরপর থেকে প্রায়ই এরকম স্বপ্ন। হাত - পা - মাথাওয়ালা স্বপ্ন, ভীষণ লোডশেডিং হওয়া স্বপ্ন - আমার শরীরে সূর্যের এফেক্ট সাইড হয়ে যেতে লাগলো। একটু ফিসফাস, একটু যৌনতা, একটু তছরূপী... অ্যাসাইলাম গুলো ভারী ভরপুর হয়ে উঠছে, দুপুরে যেসব হরিতকী পাতা ছড়ানো রাস্তা - স্লিভলেস মেয়েদের বগলের চুল - ক্লিভেজ... রিফিলের মত খালি হয়ে আসছে মাথা, রিলিফ ফান্ড গুলো জোকার কে তুলে নিয়ে গেছে হঠাৎ! এভাবে বাঁচা যায় বলুন?

জোকার হারিয়ে গেলো, নভেম্বর চলে এলো। এখন সময় বিপ্লবকে কবিতার মোড়কে পুরে ডায়েরি তে ফেলে রাখবার। চেল্লামেল্লি করবো না, কবিতা লিখবো না, স্বপ্নও দেখবো না আর – শুধু রোদ্দুর দেখবো, রোদ্দুর বেয়ে লেনিনের 'হাসমুখ' আমার জানালায় এসে পড়বে, আমি কার্ল মার্ক্সের সাথে লকআউট চাবাগানের পথে হাঁটবো। 


মনোলগ : ০৬/০১/২০১৭

"এবং আরো কিছু ভুল করবার জন্য আমাকে আরো কিছুকাল থেকে যেতে হবে!"
-      রতন দাশ

আমি নিজের মত এঁকে নিতে পারবো। ভুল হলে হবে। তবুও তো নিজের মতো। অদ্রিজার আঁকা পোর্ট্রটে আমি শুধু পার্টিকুলার কোন এক জনের মুখের সমস্ত রেখা লক্ষ্য করতে পারবোকিন্তু নিজের মত নয়। যেভাবে অদ্রিজা দেখাবে ওভাবেই দেখতে বাধ্য। আমি নিজের মত দেখতে চাইছিহয়তো আমার ইচ্ছা হলো পুজার দীর্ঘ চুল বাঁধার ছবিটাতে চুলগুলো এলোমেলো হোক - ঘাড় ও গলার পাশ দিয়ে নেমে আসুক বা ভেজা চুল পাতলা পিঠে ভারী ভাবে লেপ্টে আছে - চোখের পাতায় তিরতির করছে বৃষ্টির জল… নাহ্এসব আমাকেই আঁকতে হবে। কেউ আমায় সন্তুষ্ট করতে পারলোনাসম্ভব নয়। ইজেলক্যানভাস ভেঙেচুরে এইসব আঁকিবুকি অনিবার্য ভাবে আমারই জন্য

এই সেদিনও আমি 'কালাশনিকভ'এর মানে জানতামনা। যখন জানলাম তখন থেকেই মাথার ভিতর শুধু একটাই ধুন "কালাশনিকভ - কালাশনিকভ"... কি যে এক অদ্ভুত ধূন জানিনা। এরকম হয়। অনেকেরই হয়তো হয়। আমারও আগে হয়েছে। অথচ দ্যাখো AK 47 আমি বাঁটুল দি গ্রেট থেকেই শুনে আসছি। কালাশনিকভ কে আমি আমার মত করে কিছু একটা ভেবে নিয়েছিলাম। সেটাও এখন মনে পড়ছেনা।


দীর্ঘ ৮দিন পর ফিরে এসেছি। শুনে মনে হচ্ছে না যে দীর্ঘ '৮বছরটাইপটেবিলে পুরু ধুলোর আস্তরনজেরক্স করা নাটকের ফটফটে সাদা স্ক্রিপ্টটার প্রথম পাতাটা কিরকম অস্বাভাবিক ফ্যাকাসে হয়ে হয়ে গেছেধুলো গুলো লক্ষ্য করার বিষয় হয়ে উঠছেঅনিবার্য ভাবে - ব্যাক্তিগত ভাবে আতসকাচ দিয়ে ধুলো লক্ষ্য করা একটা ফালতু কাজ… যেমন এই লেখাটা… কিন্তু কি করবো বলো এ লেখা তো আমাকে লিখতে হবেইআমাকে লিখতেই হবেআমাকেই লিখতে হবে - "কমন ধরলে লেখাটা জীবনের ওষুধের মতো। একটা খারাপ লেখা লিখতে চাইছি কেননা বাজে লেখা গুলোকে ঝেড়ে ফেলতে হবে।

দীর্ঘ একমাস লিখিনি। লেখা থেকে সরে এসেছি। 'লাইক এ রোলিং স্টোনথেমে গেলে শ্যাওলা অবধারিত সত্য। ভাবছি এখন থেকে রোজ ডায়েরি লিখব। তাহলে লেখার অভ্যাসটা থাকবে। নয়তো গ্যাপ পূরন করা বড্ড চাপের্। পূর্নিমার চাঁদ দেখলেই যেমন ওয়্যার উলফ্… তারপর নেকড়ে থেকে মানুষে রূপান্তরিত হতে যে কষ্ট হতো বলে পড়েছি অনেক ইংরেজি নভেলে… আমারো সেরকম ফিলিংস হচ্ছে। লিখতেই পারছিনা। এই যে এইমাত্র বল্লাম ডায়েরি লেখার কথাএটা বোধহয় এই নিয়ে ৭বার ভেবেছিকিন্তু

এই ভাবনাগুলোকে এঁকে দিতে হবেএঁকে ফেলতে হবে। অ্যাবস্ট্রাক্ট পেইন্টিং তো অ্যাবস্ট্রাক্ট ভাবনাজাত শিল্প। যেমন ফোনের ভিতর দিয়ে যে কথা গুলো আসছে তার কোন মূর্ত প্রতীক নেই। শব্দ।

স্বপ্ন। একটি বিমূর্ত চলচ্চিত্র। ছবি। তাতেও শব্দ হয়। আমরা শুনতে পাই। ঘুম থেকে উঠে লিখতে পারিনা। মনে থাকেনা। মনের মত বিমূর্ত এক জিনিস আর একটি বিমূর্ত ভাবকে ধরে রাখতে পারেনা সর্বদা। এই গ্যাপ গুলোতে কিছু লেখার উপাদান পড়ে থাকে। এগুলো নিখুঁত নামিয়ে ফেলতে হবে খাতায় কলমে। আমার মস্তিষ্কে যে সবচেয়ে বড় প্রম্পটার বসে আছে তার সাথে সুকুমার রায়ের কথোপকথনটাও বিমূর্ত -

"আয় তোর মুন্ডুটা দেখি/আয় দেখি ফুটোস্কোপ দিয়ে/দেখি কত ভেজালের মেকি/আছে তোর মগজের ঘিয়ে/কোনদিকে বুদ্ধিটা খোলাকোনদিকে থেকে যায় চাপাকতখানি ভসভসে ঘিলুকতখানি থকথকে ফাঁপা।"

আজ অর্পিতা দি ফোন করেছিল। দুটো লেখা শোনালো ফোনে। গদ্য। অনেকদিন পর লেখা শুনলাম। লেখার থেকে যে দূরত্ব হয়ে গিয়েছিল তার যেন মিসিং লিঙ্ক পেলাম। ম্যাজিক রিয়ালিজমের সাথে সুর রিয়ালিজমের এক বিস্তারিত যোগাযোগ আমাকে খিল্লি ভর্তি জীবনের কথা মনে করাচ্ছিল। যেখানে গাঁজার ঠেকে অনেক বন্ধু জুটে যায়। কবিতা লেখার জন্য অনেক বন্ধু জুটে যায়। নাটক করার জন্য অনেক বন্ধু জুটে যায়। একা থাকার জন্য নিজেকেই খুঁজে পাওয়া যায়না।



লখনৌ তে তো একটাও কবিতা প্রেমী পেলামনা। নাকি অনুসন্ধানই করিনি। ভয়যদি কবিতা শুনিয়ে দেয়আর আমার কাছ থেকেও কিছু শুনতে চায়আমি যে এখন লিখতেই পারছিনা!!!


সেলুন এবং স্বাধীনতা দিবস

প্রথম দৃশ্য
চোচা চলে এসে দাঁড় করালাম সাইকেল। ফাঁকা বসে আছে রামদা। রামদা কোনদিন হাতে 'রামদা' তুলে এগিয়ে এলেও ওকে মানাবে না। সবাইকে সবকিছু মানায়না। এবার প্রস্তুতিপর্ব শেষ। চেয়ারের হাতলে গদির চামড়ার ফাটল বরাবর বেরিয়ে এসেছে হলুদ রঙের স্পঞ্জ, চশমাটা খুলে বসতে গিয়েই চোখে পড়লো সেই স্পঞ্জের গায়ে লেগে আছে কিছু গুড়িগুড়ি চুল। চশমা খুললে অনেক কিছু দেখা যায় এমন একটা কথা মাথায় চিন্তা করতে করতে 'ঝুপ' করে ভুলে গেলাম আমার সাইকেল চলাকালীন মানসিক প্র্যাকটিসের কথা। কি কাটিংয়ে চুলটা কাটতে দেব। কি কাটিংয়ে চুলটা কাটতে দেব?

দ্বিতীয় দৃশ্য
অগত্যা রামদা ছিটিয়ে দিল জলের স্প্রে। তারপর চিরুনি - কাঁচি। আমার ঝরে পড়া চুলগুলোর আনুমানিক বয়স ১৩ বছর্। ১৩ তো আনলাকি বরাবর? জলের চাপে জমাট বাঁধা টুকরো টুকরো চুলের গোছা পড়ে আমার সাময়িকভাবে পাওয়া সাদা রঙের অ্যাপ্রনটা কালচে হয়ে যাচ্ছে। অনেকক্ষণ ধরে নিজেকে পর্যবেক্ষণ করার মোক্ষম সময় এই চুল কাটার দিনগুলি। চোখের তলে কালি পড়েছে, গালে একটা ব্রণ, থুতনির কাছে একটা ছোট্ট তিল, চোখের কোনে এখনো কাতর রয়ে গেছে... শেভিঙ ক্রিমের দাপটে আমার মুখটা এবার ভরে উঠলো। অত্যন্ত নিখুঁত শিল্পীর মত ব্রণ বাঁচিয়ে ক্ষুর চালাচ্ছে রামদা। হাত একটু কাঁপছে কি? ক্ষুর গলায় নেমে এলো। ফেনা গুলো হাতের চেটোয় জমিয়ে রাখছে রামদা। আবার হাত চালাচ্ছে, এত কাঁপছে যে আমার সমস্ত কিছু কেঁপে উঠছে। আর এই কাঁপুনিতে আমার করোটির সমস্ত ঘিলু কুলকুল করে মনে করিয়ে দিলো আমার ভেবে আসা চুলের কাটিং টা, কিন্তু ততক্ষণে আমার চুলের জন্মান্তর শুরু হয়ে গিয়েছে। হাতের চেটোয় জমিয়ে রাখা ফেনায় দাড়ির অংশবিশেষ লক্ষ্য করতে করতে রামদা সেটা চেঁছে রেখে দিচ্ছে একটা ক্রিমের কৌটোর মুটকিতে। ফিটকিরিতে যে কয়েকটা ছোটছোট দাড়ির কুচি তা আমার গালের স্পর্শে চিড়বিড় করে উঠলো, ঠিক তখনই সকালের স্বচ্ছ সেলুনে দ্বিতীয় কাস্টোমারের প্রবেশ।


তৃতীয় দৃশ্য
- কিরে রাম, আজ তো ১৫ই আগস্ট! আজও দোকান খোলা রেখেছিস?
- কি করবো শ্যামদা, গতকালই বিষ্যুদবার গেছে। আর কত লস্ করব?
আমি ততক্ষণে আমার নতুন ধরনের মাথা এবং মুখ নিয়ে আয়নায় ব্যাস্ত। নিজের পতিত পুরাতন বয়স্ক চুলদাড়ি গুলো দেখতে দেখতে বলে বসলাম - 'স্বাধীনতার বয়স হয়ে গেছে।'
- তা যা বলেছো যদু, স্বাধীনতা কে এবার বৃদ্ধাশ্রমে রেখে আসতে হবে।' রামদা ও শ্যামদা উভয়েই হেসে উঠলো এই নতুন মজাকে। আমার ততক্ষণে চোখ চলে গেছে পরামানিক সমিতির একটি বিশেষ তালিকায়, যেটি সেলুনের দরজায় টাঙানো, এতক্ষণ চোখ পড়েনি (চশমা খুলে রাখার দরুনও হতে পারে) - তাতে চুলের কিকি কাটিং করতে কিকি খরচাপাতি তা সবিস্তারে লেখা। বি:দ্র: এর স্থানে "শর্তাবলী প্রযোজ্য হইবে ১৫ই আগস্ট হইতে"

চতুর্থ দৃশ্য
আমি ততক্ষণে আমার নতুন রকমের উর্বর বা অনুর্বর মাথায় হাত রেখেছি। রাম ও শ্যামকে ত্যাগ করিয়া আমায় মধুর খোঁজে বেরোতে হবে


অনন্ত এবং আমি, আমি এবং অনন্ত

একটা নাটকে আমায় 'অনন্ত' নামে একটি চরিত্র দেওয়া হয়েছিল। আমি কিছুতেই চরিত্রে ঢুকতে পারছিলামনা। রিহার্সালে কথা শুনতে হত - 'তোমার দ্বারা কিস্যু হবেনা।' তারপর যেদিন আমি অনন্তের ভিতর ঢুকলাম অনন্ত আমার ভিতর ঢুকে বসলো। আর সে নড়তে চায়না। আমি এবার বের হতে চাইলাম। পারলাম না। পাগলের মত আয়নার সামনে দাপাদাপি করে অনন্তকে টেনে হিঁচড়ে বের করতে করতে রেডিয়ামের মুখোশ পড়ে বেরিয়ে আসলো অনন্ত – ওর চোখ আমার মত, নাক আমার মত, কান আমার মত, সবই আমার মত। আমি আয়নায় তাকালাম – আমার মুখটা ধীরে ধীরে মুখোশ হয়ে যাচ্ছে। অনন্ত বেরিয়ে এলো, আমার মুখটাকে নিয়ে অনন্ত চলে গেলো। তখন থেকেই আমি আমার আসল মুখটা খুঁজে চলেছি… সদর গার্লসের নীলসাদা পোশাকের বালিকাদের দেখি – ওরা আমায় দেখে সভয়ে নাক সিঁটকে সরে যায়। আমি করলার উপত্যকায় দোলনা ব্রীজের নিচে শুয়ে থাকি, সূর্যের দিকে আমার শরীর উন্মুক্ত থাকে…

আমার বড় বড় চুল দাড়িতে আটকে থাকে নাটকের প্রপস্… মুখোশটা খুলতে পারছিনা বলেই আমায় কেউ কোন নাটকের দলে নিচ্ছে না। আমি গ্রীনরুমে ফিরে যেতে চাই, আয়নার পাশে বাল্ব-মেকআপ কিঞ্চিৎ বুক দুরুদুরু… নাহ্, মাথার ভেতর সব গন্ডগোল হয়ে যাচ্ছে। আমার সমস্ত শরীর মানুষের মাংস দিয়ে তৈরী, নীল রঙের লুঙ্গিটা খসে পড়লেই আদিম পোশাক পড়ে দাঁড়িয়ে থাকবো ট্রাফিক সিগন্যালে… আমার ঠোঁট অনেকদিন সিগারেটের ছোঁয়া পায়নি, কিন্তু মুখোশ সিগারেট খাচ্ছে দেখলে অনেকে লজ্জা পেতে পারে - অনেকে ভয় পেতে পারে - অনেকে অস্বস্তি বোধ করতে পারে... সবার চিন্তা আমার মাথায় এসে জট পাকাচ্ছে কেন?

সাবধান!  দেশপ্রিয় পার্ক আসছে। ট্রামলাইন থেকে ছড়িয়ে পড়তে পারে স্বাধীনতা।


স্বাধীনতার ওপারে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রয়েছে অনন্ত। আমাদের আশেপাশে ঘুরে বেরাচ্ছে ওয়ার্ম হোল। অনন্ত ঢুকে পড়ছে আর বেরিয়ে আসছে। মুখোশ মুখ নিয়ে চলে এলাম অডিটোরিয়াম। সমস্ত উইংস জুড়ে অজস্র মানুষ এসে মিলিত হচ্ছে ফোকাসে, শাওয়ার হলো বেবি ফলো এবং স্পটলাইট জুড়ে নাটক এগিয়ে চলেছে। অনন্ত ফিরে আসছে, কন্ট্যাক্টলেন্স থেকে ঠিকরে বের হচ্ছে কাল্পনিক অশ্রু... দর্শকাসন ছুড়ে দিচ্ছে করতালি। পর্দা সরানোর খেলা খেলতে খেলতে সার্কাসের বাঘ ঝাপিয়ে নামলো আর নাটক দেখার অপরাধে আমার হাত পৌঁছে গেল আইনের সাথে করমর্দনে। বলুন ধর্মাবতার, আমি গরু খাইনি শুয়োর খাইনি  নাটক দেখেই বিচার পেয়ে গেলাম! তারপর দেখা গেল অনন্তের মাথার মধ্যে এসে পড়েছে সকালের আকাশে টাঙানো রোদ - মাথার ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে আমার ধড়।

আমি ক্রমশ ঢাকা পড়ে যাচ্ছি। আমি ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছি। আমি ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছি।



ফাঁকা মঞ্চ। অন্ধকার্। দৃশ্যপট নেই। উইংসের আড়ালে প্রম্পটার নেই। গ্রিনরুমে আর্টিষ্ট নেই। অডিটোরিয়ামে দর্শক নেই। একটা সরু আলোর রেখা নেমে আসছে ধীরে ধীরে, সেই আলো জুড়ে ওড়াউড়ি করছে হাজার প্রজাপতি। আমি সমস্ত আলোটা নিতে চেষ্টা করছি। মাথাটা ভারী হয়ে আসছে, যেন এই মাত্র মস্তিষ্ক ফেটে বেরিয়ে আসবে অভিনয়, আর অভিনয় মানেই অনন্ত… সমগ্র থিয়েটারে অনন্ত ছড়িয়ে পড়েছে... সেধিয়ে যাচ্ছে অনন্তে…




তমসো মা
কানু কহে রাই –
- কহিতে ডরাই
ধবলী চরাই মুই।
আমি রাখালিয়া
মতি কি জানিনা পিরিতি
প্রেমের পসরা তুই

এবার তবে কয়েল থেকে শুরু করা যাক। যেভাবে টেবিলের তলা থেকে পাক দিয়ে উঠছে ধোঁয়া আর মশারা তা দ্রুত এড়িয়ে পালিয়ে যেতে চাইছে। সমস্ত ঘর সিগারেট আর কয়েলের ধোঁয়ায় আবছা হয়ে আসছে। চোখ জ্বালা করছে। চশমা খুলে রেখে চোখে হাত দেওয়া হলো। লাল। দ্রত উঠে পড়লো চেয়ার সরিয়ে। প্লাস্টিক আর মেঝেতে ঘষাঘষি লেগে একটা শব্দ উঠলো। টেবিলের কোণে কিঞ্চিৎ ধাক্কা খেতে খেতে জানালা খুলে দিলো সে। একঝলক অন্ধকার লাফিয়ে ঢুকে পড়ে অভিভূত করে দিলো তাকে। টাটকা বাতাস আসছেনা। আশ্চর্য! বাইরের পৃথিবী থেকে ভেসে আসছে পেঁচার গম্ভীর অথচ ঠান্ডা একটা ডাক। থেমে থেমে। টেবিলের উপর স্তুপীকৃত বইপত্রের ভিতর একটা কম্পনের শব্দগোটা ঘর প্রায় কাঁপিয়ে দেবে। জানালা থেকে সরে এলো সে। অবাক বিস্ময় আর কিঞ্চিৎ ক্রোধ বা বিরক্ত মিলেমিশে মুখের এমন একটা ভাষা তৈরী হয়েছে যাকে সঠিক ভাবে খাতায় নামানো সম্ভব নয়। অন্ধকার আকাশ ঘরে ঢুকে ইতিউতি চাইছে। বইপত্র-কাগজ সরিয়ে অবশেষে পাওয়া গেলো মুঠোফোনকিন্তু ততক্ষণে রিঙ্ কেটে গেছে। রাগের চোটে একটা বই আচমকা সে ছুড়ে রাখলো টেবিলে আর বইয়ের কোনের ধাক্কায় ছিটকে পড়লো পেয়ালা। তলানি চা গিয়ে ভিজিয়ে দিলো মেঝে সহ পড়ে থাকা বাকি কাগজপত্রে। রাগটা আরোও বেড়ে চললো। ড্রয়ার খুলে আর একটা সিগারেটের প্যাকেট খুঁজতে গিয়ে মনে পড়লো শেষ সিগারেটটা সে এইমাত্র শেষ করে উঠে দাঁড়িয়ে জানালা খুলেছে। আবার জানালায় ফিরে গেলো সে। আবার কল এলো। সে ফিরে তাকালোনা। হা করে অন্ধকার গিলতে লাগলো। একটি তারা খসে পড়ছে - তারা খসা দেখলেই নাকি উইশ করতে হয়। যা চাওয়া হয় তাই পাওয়া যায়। সে কি চাইবে ভাবতে ভাবতেই তারা হারিয়ে গেছে। সমস্ত আকাশে একটাও তারা নেই। জানালার শিকে নাক ঠেকিয়ে সে দাঁড়িয়ে আছে। মেঝেতে চিনামাটির কাপের ভাঙা টুকরো - চায়ের অবশিষ্টাংশ - বিস্কুটের গুড়ো - সিগারেটের ছাই মিলেমিশে একটা পদার্থ তৈরি হচ্ছে। জানালা দিয়ে পুকুরের আঁশটে গন্ধ - দূরে যেন জোনাকির গন্ধও পাওয়া যাচ্ছে - আচ্ছা জোনাকির কি গন্ধ হয়কিন্তু সে হলফ করে বলতে পারে এইমাত্র একটা নতুন গন্ধ সে পেয়েছে যাকে কোন গন্ধের সাথেই মেলাতে পারছেনা। এরম কেন হচ্ছে?  হোয়াট দ্যা ফা--- গালিগালাজ কাকে দেবে। পিছিয়ে এলো সে। টেবিল থেকে তুলে নিলো মুঠোফোন। ছুড়ে মারলো পিয়েল ল্যাম্পটায়। একটা প্রচন্ড কাচ ভাঙার শব্দআর তারপর সব অন্ধকার। অন্ধকার এসে অন্ধকারে মিলে গেল। মাঝখানে দাঁড়িয়ে রইলো সে - তার আর অন্ধকারের ঠিক মাঝখানে একটা রেডিয়ামের ঘড়ির ব্যবধান। খুলে ছুড়ে দিলো জানালা দিয়ে, 'টুপকরে পুকুরে পড়লোজল একটু আন্দোলিত হল - সে দেখতে পারছেনা অন্ধকারেতবে স্পষ্ট যেন বোঝা যাচ্ছে - জল গোল হয়ে দু'দিকের পাড়ে ঢেউয়ের মত এগিয়ে আসছে। সবাই একই সমান্তরালে মিলিয়ে যাচ্ছে - সে দেখতে পাচ্ছেনা আর কিছু... জলের ব্যবধান যেন খাঁচা 

খাঁচার অন্ধকার ছিলো খাঁচায়
বনের অন্ধকার ছিল বনে
একদা কি করিয়া মিলন হলো দোঁহে।

এভাবেই বোধহয় মিলন হয়। মিলন। একটা দারুন শব্দ। যেদিন প্রথম তার পুরুষাঙ্গ মাধ্যাকর্ষণের বিপরীতে উঠে আসলো সেদিন থেকেই এই নতুন অনুভূতি  জানালার শিক বেকিয়ে ফেললে ভালো হতো। হাতড়ে হাতড়ে দরজা - তারপর একছুটে বাইরেপুকুরের ধার দিয়ে ছুটলোমাঠ - আলপথ - ঝোঁপ - অর্জুন আর শাল গাছ - একটা খাড়ি - তারপর হঠাৎ একটা প্রানবন্ত শহর ... গ্রাম থেকে পালিয়ে শহর - শহর থেকে পালিয়ে গ্রাম...
বাঁশির শব্দের মতো শোনা যাচ্ছে - ঐতো ঝোপের আড়ালে কৃষ্ণ হাতে বাঁশিআর রাধা সমস্ত পোশাক খুলে নগ্ন হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে - তাদের চোখেমুখে আসন্ন পরিতৃপ্তির আভাস  কৃষ্ণ বাঁশি নামিয়ে রাখলোতার ঠোঁটে হাসিহাত দুটো এগিয়ে আসছে দুটো বিপুল পৃথিবী ধরবার নেশায়।
সে ঘুরে দাঁড়ালো - পকেটে হাত ভরলো - ধুর সিগারেট নেই। বুকটা হাসফাঁস করছেএতক্ষণ দৌড়লো - বসে পড়েছে সেচোখে নেমে আসছে রাশিরাশি অন্ধকার...

"ঐ পথে 'বাগিলাযাইতে আড়াই মাইলমিষ্ট নিমপাতা,এক সহজিয়া আউলের সমাধিকে ঘিরে দোলের দিনের
নৌকার গলুই ঠেকা পাড়ে কর্দমের নম্র মুখর অনামা
রঙের নিস্পন্দ হুল্লোড়ে রিক্তের
অতিরিক্তের ঐ জেগে ওঠা।"

মা আজ সন্ধ্যা প্রদীপ দিয়েছিল তুলসী তলায়বাবা আজ হুকো নিয়ে দাওয়ায় বসে গল্প করছিল মোড়লের সাথেআর সে বই - জানালা - মেঝে এসব ছেড়ে আত্মা খুলে রেখে গেছে মিলনের কাছে।
মাঝে মাঝে তার ধাঁধা লেগে যায়মহাজীবনের খন্ডকাল মস্তিষ্কে নড়াচড়া করেপ্রবল ভাবে জানান দেয় অন্ধকারে আলো। ঘুম থেকে উঠেই অনেকসময় মনে পড়েনা কোথায় আছিরাত কি শেষ হয়েছেজানালার চোরা ফাঁক দিয়ে কুচি কুচি আলো এসে চোখে লাগেআর মা পাশ থেকে ডেকে ওঠে - "বাবাওঠ্"। সেই আলোর স্মৃতি তার পরম সুখের শৈশব বড় মায়াময়প্রথম আলো দর্শন কি অভাবনীয়!
গ্রামে নতুন আলো আসছে। এখনো পোল পড়ছে। সব জায়গায় পড়েনি। তাদের বাড়িতে সবার আগে চলে আসাতেই তার ক্রোধ - শহরের আলো - গ্রামের অন্ধকার... প্রাণ হাঁচোর পাচোড় করছে। আবার সিগারেট মনে পড়ে তার। মনে পড়ে সিগারেটের শেষ হয়ে যাওয়া। হস্টেলের রুমে একটা সিগারেট যখন চারজনের হাতে ঘোরে আর অন্তিম হাত থেকে কখন সে সিগারেট পাবে এই ব্যবধানে যে মধুর অপেক্ষা 

"তারপর শুরু হ'ল সেই গল্প
রাতের ঠোঁটে হেঁটে যাচ্ছেন চ্যাপলিন
সিন্দুক থেকে ভেসে আসছে হাততালি
ঘরে নাচছে ফুলদানি 
পাতায় পাতায় যতখানি গিয়েছিলাম
ঠিক ততখানি ফিরে এসেছি সুতোয় সুতোয়"
(চার্লি / শ্যামল সিংহ)
মেঘের আড়াল থেকে চাঁদ বেরিয়ে এলোপুকুরে চকচক করছেমনে হচ্ছে যেন দুধ পুকুরমাথায় তুমুল আলোড়ন হচ্ছে তার। খুব কষ্ট হচ্ছে, "আমায় অসৎ থেকে সতেঅজ্ঞানতার অন্ধকার থেকে জ্ঞানের আলোকেমৃত্যু থেকে অমৃতে নিয়ে চলো।"
জানালা ও পুকুরের কোন সখ্যতা সে কোনদিন দেখেনি। জানালা ও পুকুর এতদিন কাছাকাছি আছেমিলন হয়নি। কৃষ্ণ ও রাধা চলে গেছে হাত ধরাধরি করে। ঝোঁপের আড়ালে জোনাকিরা ঝিঝিরা নিজস্ব আলো ও শব্দে মশগুল। এই টলটলে পুকুরে চাঁদের আলোয় যখন পশুরা রাত্রির তৃষ্ণা নিবারণ করবেশব্দটা কি 'কুবোকুব - কুবোকুবহবেনাকি এক অপার্থিব মালকোষ।
দুটো টিকটিকি পরস্পরকে দেখছে। যেন অসীম কাল ধরে দেখছে। তাদের দেখা হওয়ার কোন শেষ নেই। ধৈর্য্যচ্যুতি নেই। কিন্তু সে ভয়ানক ধৈর্য্যহীন। এখন আর কিছুই ভালো লাগছে না। পুকুরে একটু নামা যেতে পারে। এখন কেউ দেখবেনা। খুব ধীরে ধীরে সে সমস্ত পোশাক -টীশার্ট - প্যান্ট -গেঞ্জি - জাঙিয়া খুলে ফেললো। এসে দাঁড়ালো অবশেষে পুকুরের সামনে। দেখছে। তার আর পুকুরের পরস্পরকে দেখার যেন কোন শেষ নেই। টলটলে পুকুরের বুকে একটা প্রকান্ড ডাইভ একান্ত জরুরী। সে আর পারছেনা। হাঁফিয়ে  উঠেছে। অধুনান্তিক, তার যত ক্রোধ - জলের ভেসে আসা শ্যাওলার মত পুরু স্তরে সঞ্চিত হচ্ছে ঘাটে। সিড়ি গুলো নেমে যাচ্ছে জলে। উল্টো করে বললেসিড়িগুলো উঠে আসছে ওপরে - তার পায়ের কাছে। ভেজা কার্পেটের মত শ্যাওলায় তার পাতিরতির করছে সমস্ত অঙ্গ। জল এসে ভিজিয়ে যাচ্ছে আঙুল। কোন মাছ ঘাই মেরেছে এইমাত্রআর দূরে কোথায় শেয়াল ডেকে উঠলো।


টীকাভাষ্য
প্রত্যেকেরই একটা ফেরার জায়গা থাকে। কিন্তু বাস্তবিকই কি মানুষ কোথাও ফেরেফিরতে পারেযেমন একটা যাওয়ার জায়গার মানুষের ভীষণ প্রয়োজনঠিক তেমনই ফেরারও। এই স্থান গুলো বাস্তবিকই শূন্য। কোথাও ফেরার নেই  যাওয়ার নেই।

ঋণ স্বীকার্ঃ চন্ডীদাসরবীন্দ্রনাথ ঠাকুরভাস্কর মিত্রশ্যামল সিংহবৃহদারণ্যক উপনিষদ্ এবং নীলাদ্রি বাগচী।











রঙ্গন রায়
Rangan Roy

Comments

Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS