Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS

Debasmita Bhowmik

ইস্কুল এবং টুকিটাকি বেড়ে ওঠা
লাল্লা লাল্লা লোরী, দুধ কি কটোরি..."
এই গানটা আমার ছোটবেলায় শোনা নয়। বেশ বড় অবস্থাতেই গানটা শুনেছিলাম কোনো একটা নাটকে। আমার বয়স এখন পঁচিশ। এই পঁচিশটা বছর চোখ কান বন্ধ করে বেশ কাটিয়ে দিয়েছি। এখনো যে খুব চোখ খুলতে ইচ্ছে করে এমনটাও নয়। তবে মাঝে মাঝে কিছু কিছু 'পাল্টে যাওয়া' চোখে পড়ে যায়।
আজ সকালে আমি বাবার সাথে বাবার ইস্কুল যাচ্ছিলাম। এই স্কুলে আমিও একসময় পড়েছি। পাঁচ বছর। না। তবু আমার স্কুল নয়। বাড়ি, স্কুল, কলেজ, পাড়া, প্রেমিক, বন্ধু এদের আমি কোনোদিনই খুব জোর গলায় নিজের বলে দাবী করিনা। ব্যাপারটা বাবা মা এর ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য তবে কিছু বায়োলজিক্যাল প্রমাণ এর চোটে মুখ খুলিনা এই বিষয়ে।

আমাদের বাড়ি পেরোলেই ছিল রবি সাহুর বাড়ি। জঙ্গলের মতো বিশাল জায়গা, এখানে আগে বিস্কুট ফুল ফুটতো। মধ্যিখানে একটা বাড়ি। দুএকবার ঢুকেছিলাম। বেশ অন্ধকার। গা ছমছমে। রবিকাকু ছোটবেলায় আমার মুখোশধারী দৈত্য ছিলো। আর ওর ঘরের ছাদ থেকে ঝুলে থাকতো একগাদা প্লাস্টিকের টিয়াপাখি, লাল পালক লাগানো। আমার ধারণা ছিল রবিকাকু নির্ঘাত আমার মতো বাচ্চাদের ধরে টিয়াপাখি বানিয়ে ঝুলিয়ে রাখে। রবিকাকুর সেই বাড়ি আজ বন্ধ। দরজার সামনে গরুর গাড়ির লোহার চাকা রাখা।

তারপর মামনিদির বাড়ি। মামনিদি উচ্চশিক্ষিত, গুণী, বড়লোক বাবা মায়ের একমাত্র মেয়ে। আমরা যখন ক্লাস এইটে পড়ি তখন মামনিদি ওদের বাড়ির দুধওয়ালা গোবিন্দদার সাথে দিল্লী পালিয়ে গেছিলো। এখন আর মামনিদির বাড়ির ছাল ওঠা টিয়াপাখিটা ট্যা ট্যা করে ডাকে না।
কিছুদূর গেলে একটা বটগাছ। তার নীচে আজকাল দেখি শিবঠাকুরের একটা থান গজিয়ে উঠেছে। আমি যখন বাসে করে ইস্কুল যেতাম তখন এর ছিটে ফোটাও ছিলো না।
যুগশ্রী সঙ্ঘের মাথায় এখন শুনেছি xxx CD বিক্রি হয়। আগে এই অঞ্চলের সবথেকে অভিজাত সম্প্রদায়ের সংস্কৃতি চর্চার জায়গা ছিলো ক্লাবটা।
মিঠুদার মিষ্টির দোকানে এখন ক্ষীরের প্যাড়া নয় স্টে ফ্রীর প্যাকেট দেখতে পাচ্ছি।

চোখে আমার কোনোদিনই তেমন কিছু আলাদা করে পড়ে না। সূর্যাস্ত, সূর্য্যদয়, সুন্দর ফুল... না দেখিয়ে দিলে চোখে পড়েনা আমার। তাহলে কোথায় থাকি আমি? জানিনা। নাকি জানি?
কিছু কিছু মানুষ ডাকবাক্সের মত হয়। তাকে ঘিরে কত কিছু, কত প্রেম, কত কান্না, কত দরকার, কত কিছু... কিন্তু ডাকবাক্সের জন্যে কি কেউ চিঠি লেখে?
আমার এই আলগা বাসস্থানটা আমার বেশ লাগে। তাই কাশ্মীরের সাম্প্রদায়িক অবস্থা, সিরিয়ার শিশু মৃত্যু, দিল্লির ধর্ষণ... চুকচুক শব্দ তৈরি ছাড়া তেমন কোনো হেলদোল তৈরী হয় না।
বাকীরা যখন এত ভেঙে পড়ে সামগ্রিক অবস্থা নিয়ে, তখন কেমন যেন মনে হয় আমি ঠিক মানুষ গোছের নই বোধহয়। কিছুতেই কেন যায় আসেনা আমার? বোম মেরে দেশের পর দেশ উড়িয়ে দিচ্ছে, হাজার হাজার লোক বলা নেই কওয়া নেই হাওয়া হয়ে যাচ্ছে , পুরো একটা বিকলাঙ্গ প্রজন্মের জন্যে অপেক্ষা করছে পৃথিবী। তাতেও আমার যায় আসে না? কেন আমার মনে হয়না বিপ্লবটাই জরুরী? কেন এত কিছু এত স্বাভাবিক আমার কাছে?

ভাবতে ভাবতে স্কুল পৌঁছই। সামনেই সিধু কানহুর মূর্তি। হাতে দা, তীর ধনুক।

বুঝি যে বাচ্চারা ক্লাস ফাইভেই পরিচিত হয় বেঁচে থাকার আর সত্য রক্ত ঝরানোর সাথে তাদের কাছে মৃত্যু উপত্যকাই দেশ। তার কাছে বিবর্ণতাই পৃথিবী।
তার কাছে Indian army, isis, তালিবান, লাদেন, আমেরিকা, পাকিস্তান সব এক। তার কাছে সব রক্তের রং লাল এবং অত্যন্ত স্বাভাবিক।



তখনো মেয়েটা স্কুলে ভর্তি হয়নি, থাকার বাড়িটা মাটির। ভাড়া থাকে। নতুন বাড়ি তৈরী হচ্ছিল তাদের।
নতুন বাড়ি যাওয়ার দিন এলো। মেয়েটা জানালার মরচে ধরা রড ধরে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিছুতেই যাবে না। কিছুতেই না। সবাই নতুন পুতুলের লোভ দেখিয়েছে। কিন্তু সে শুনবেই না।
ভাড়াবাড়ির মালিকের একটি ছেলে পাগল। কথা বলতে পারেনা গুছিয়ে, খেতে পারেনা নিজে হাতে চোদ্দ বছর বয়সেও। ছেলেটি অন্যদের মারত ওই মেয়েটিকে অন্যরা খেলতে না নিলে, জ্বর হলে রাত জাগত, কোলে নিয়ে ঘুরত ঝোপে ঝাড়ে, পায়ে আলতা পরিয়ে দিত।

অথচ যাওয়ার দিন একবারও মেয়েটাকে যেতে মানা করেনি। বরং মহানন্দে ট্রাকে জিনিস তুলছে।

মেয়েটি রড ছেড়ে দিয়ে চুপচাপ ছেলেটির ঘরে যায়। বালিশের পাশ থেকে তুলে নেয় ঘুমের ওষুধটা। রাতে ঘুম না হলে ছেলেটার কষ্ট হয়।
............….....................................
মেয়েটি ক্লাশ ফাইভে পড়ে।

তার স্কুল যাওয়ার পথে মেনরোডের ফাঁকা মাঠ।
বাবার পেছনে বসে পরীক্ষা দিতে যাওয়ার সময় তার মনে হয় রাস্তার দুপাশের মাঠ খাদে তলিয়ে যাচ্ছে।
…................................................
মেয়েটির বয়স আঠেরো।

রোজ ঘুমের ঘোরে দেখতে পেলো ঘরের চারটে দেওয়াল আর ছাদ থেকে নেমে আসছে অসংখ্য মাকড়শা, মেঝে থেকে উঠে আসছে কেন্নোরা। সে বিছানায় কুঁকড়ে বসছে কিন্তু দেখতে পাচ্ছে তার খাটের রং সাদা থেকে কালো হচ্ছে আস্তে আস্তে।
...................................................

একটা ছায়া... দুটো ছায়া
তৃতীয়... চতুর্থ... আর গোনা যাচ্ছে না।

ছায়া দিয়ে শহর তৈরী হয়.... তৈরী হয় বাড়ি... ছায়া রাস্তা...
ছায়াদের অরিগামি, তাদের উন্মাদ যৌনতা চোখে লাগে। কিন্তু আমি জানি আমি স্বপ্নে আছি। তাই চোখ বন্ধ করে ফেলার অবকাশ আমার নেই।

ধীরে ধীরে ছায়াদের হাতে অস্ত্র আসে... খুন... প্রত্যেকে। ঠান্ডা রক্ত পায়ে লাগে। চ্যাটচ্যাটে, গন্ধ পাচ্ছি।

কিন্তু স্বপ্নে তো গন্ধ পাওয়া যায়না। চমকে উঠে বসে পড়ি।

লাইট জ্বেলে দেখি পাশবালিশটা রক্তে ভেজা।

..................................................

মেয়েটির বয়স পঁচিশ।




ক্লাস নাইনে ফার্স্ট বেঞ্চে বাম দিকে বসে ঋলামালা মান্ডি। শ্যামলা গায়ের রং, ছিপছিপে চেহারা, ছোটো ছোটো অবাধ্য চুলগুলো ঝুঁটি করে টেনে বাঁধা। রোজ করে আসা পড়ার মতোই নিয়মিত তার পরিষ্কার পাট পাট ওড়না, কপালে চুলের কুচি আর মিষ্টি হাসি। শুধু নিয়মিত নয় তার চোখটা। কখনো শান্ত কখনো রাতজাগার কালো ভরদুপুরেও আনাগোনা করে।

ঋলামালা ক্লাস নাইনে পড়লেও তার বেণীমাধব আছে কিনা আমি জানিনা তবে তার বাবার যে সেলাই দিদিমনি বর্তমান তা তাঁর কলিগ হওয়ার সুবাদে আমার অজানা নয়। ভদ্রলোক ইতিহাস পড়ান, অবসরে মাদল বাজান, আর মাঝে মাঝে রাতে বাড়ি ফেরেন না। সেই দিন গুলো ঋলামালার মা যন্ত্রনায় জেগে থাকেন আর ঋলামালা পেটে খিদে আর চোখে মেঘ নিয়ে দুলে দুলে ভূগোল পড়ে, পৌষ্টিক তন্ত্রের ছবি আঁকে।

ঋলামালার এই সময়টাকে আমি খুব চিনি। কাছ থেকে ভীষণ দেখেছি। নিজ গৃহে পরবাসী হয়ে যাওয়া... সম্পর্কের সমীকরণ গুলো পালটে যাওয়া চিনি। এর পর ঋলামালা বড় হবে, শরীরের মাপ বদলাবে, চারপাশ বদলাবে... যেটা বদলাবে না সেটা ওর রোজ একা হয়ে যাওয়া, যেটা বদলাবে না সেটা ওর ইনসোমনিয়া। ধাক্কা খেলে কথা বলতে চাইবে, কিন্তু অভিব্যক্তিগুলো জড়িয়ে মড়িয়ে দুর্বোধ্য হয়ে যাবে রোজ।

- ঋলামালা? মানে কি তোর নামের ?
- ঝর্নার জল।




    কিশোরী নাম নিয়ে
লিখতে চাওয়া একটি মেয়ে

A Woman, Who Wanted to

Write as a Girl

Popular Posts