Skip to main content



Preetha RoyChowdhury


আবর্ত                                 

জেলের উঁচু দেওয়ালের বাইরে ঠাঠা রোদে দাঁড়িয়ে থাকার মধ্যে পাশ দিয়ে অল্পবয়েসি ছেলেছোকরাদের বারবার ঘুরে তাকানোএপাশ ওপাশের বাড়ির মধ্যে বাটি চালাচালির মাঝে, “এ মেয়েটার বাড়ি কোথায় গো?” ক ঘণ্টা হলো মাঝে মাঝে মোবাইলে চোখ রেখে বুঝে নেওয়া এখান থেকে শ্যেনদৃষ্টিতে দেখতে থাকা তার বৈধ সম্পর্কেরা ফিরে গেল কি না তারা ফিরলেতবেই তার একঝলক দেখা হবার সুযোগদোষী নির্দোষ চেনে না সেশুধু জানে গরাদের ওপারে তার ভোর কয়েক মিনিটের... তারপর আবার সপ্তাহব্যাপী রাত টানা পনেরো দিন হলো তার চোখ বিনিদ্রহিংসে করে সে আকাশকে কেমন একটানা মেঘের অজুহাতে কেঁদে চলেছেচোখ রাঙাবারগায়ে কালি দেবার কেউ নেই তার গোঙানোও অপরাধ তার বৈধ সবের প্রতি সমস্ত কর্তব্য সেরে এই যে ভোর না হতেই ছুটে আসাএ জানলে ছি ছি করবে না বুঝি কেউছি ছি করুক পরোয়া নেইকিন্তু পুড়তে থাকা সেই ছোটবেলার সজনে গাছটা আর দেখতে চায় না সে যখন ককিয়ে উঠেছিলোগাছটাকে মেরো না তোমরাজ্যেঠিমা গাল টিপে বলেছিলোশুঁয়ো পোকা ছেয়ে ফেলেছেওর পুড়ে যাওয়াই মঙ্গল... 

না পুড়ে গেলে যে পাপ উড়ে উড়ে আশেপাশের সবার ঘরদোর ছেয়ে ফেলবেপাপবৈকিকি হবেসবাই যখন জানবেতার সিঁথিতে দুজন এঁকেছে রক্তের আলপথ?

তিন ঘণ্টা হতে চললোএরা ফেরত যায় না কেনমাথা ঘুরছে তার রোদে তাকাতে পারে না আর সামনে ভ্যানওয়ালার পাশে উঠে বসে কিছুক্ষণ অবশেষে... অবশেষে... ছুট ছুট ছুট... নাম অ্যানাউন্স করছে ওরা “ভরসা আছে?”

আছে
বাড়ি থেকে ওরা এসেছিলো
জানিওদের দেখেই আমি বেরিয়ে গেছিলামপাশের রাস্তায় ছিলাম দাঁড়িয়ে...”
এই টানা তিন ঘণ্টা তুমি...!!!!!!”
ভালো আছো তুমি?”
নিজের বরকে দেখতে এসেছোএভাবে অপেক্ষা তাইতাই না বিবি?
কথা দিচ্ছি সামনের সপ্তাহে বাইরে তোমার সামনে দাঁড়াবো” 

#

অন্ধকার অন্ধকার ভোর... বাচ্চা মেয়েটা স্কুল ড্রেস পরে লাফাতে লাফাতে হাজির খড়ের চাল ছাওয়া বারান্দাতে তার কালু আর নরমকে দেখতে রোজকার মতো রক্ত... রক্ত... শুধু রক্ত দেখে ভয়ে চিৎকার করে উঠলো মেয়েটা তার কালুতার নরমকইখাঁচা ভেঙে কালুকে মেরে রেখে গেছে কোন হুলোআর এক কোণে বসে নরম কাঁপছে তিরতির করে আমার আদরের একজোড়া খরগোশের জোড়া ভেঙে দিলে কেন?” ওপরে তাকিয়ে স্কুলের সিস্টারদের শেখানো প্রেয়ারের জিসাসকে অভিমান জানায় সে কেঁদে স্কুলে যায়আর প্রেয়ারের সময় কিছুতেই চোখ বন্ধ করে নাকপাল বুক একাঁধ ওকাঁধ করে না তার হাত শুধু দাঁতে দাঁত চেপে থাকে

পরদিনখাঁচা খুলে ভোরে বের করে আনে নরমের প্রাণহীন শরীর মা বলছিলো জ্যেঠিমাকে, “কি আশ্চর্য বলুন মেজদিএরাও স্বামী স্ত্রীর মতোপ্রেমিক প্রেমিকার মতোই ভালোবাসেবলে নাতোমাকে ছাড়া বাঁচবো নাকিন্তু বাঁচে না... তাই না?”

#

খবর এসেছে জামিন মঞ্জুর হয়নি... খবর আসেনিতার মানুষটার ফেরার তার বৈধতায় সে হীরে পরেসোনায় মোড়ায় নিজেকেঢেলে দেয় সংসারের জন্যতার একমাত্র সন্তানের জন্যতার স্বামীর প্রতি কর্তব্যে তার পাঁক লাগা অবৈধতায় সে পরে থাকে নিউ মার্কেটের বাইরে কেনা স্টেনলেস স্টিলের আংটিপরম বাঁধন এও এক

প্রশ্ন করে সেরাধাকে তোমরা অবৈধ বলো না কেনপাঁক ছেটাও না কেনদ্রৌপদী মেনে নিয়েছিলো পঞ্চস্বামী... মেনে নিয়েছিলোস্বেচ্ছায় যদি পঞ্চস্বামীর স্ত্রী হতোতাকে কি বারনারী বলতে তোমরা?

#

ক্লাস টেনের কম্পালসারি ক্লাস হতো যৌনশিক্ষার খ্রিস্টান সিস্টাররা কনভেন্টের সুশিক্ষা দিতে চেষ্টা করতেন সপ্তাহব্যাপী এই কার্যক্রমে বলতেনকোনো পুরুষের কথা মনে আনলেও অশুচি হয়ে যেতে হয় কেবলমাত্র বিবাহিত স্বামীর স্থান শরীরে বা মনে শুচিতা নিয়ে তখন থেকেই তর্ক করতো বাচ্চা মেয়েটা বকাঝকা কম খায়নি বেখাপ্পা কথা বা যুক্তির জন্য তবু মেয়েটা বড্ড তর্কবাগীশ চুপ করে গেলেও মেনে নেয় না সবকিছু এমনি এমনি তাই কি বেয়াড়া মেয়েটা ভালোবাসে লাগামহীন?

#

কি পেলে আমাকে ভালোবেসেকিছুই তো দিইনি... সামাজিক স্বীকৃতিদেদার টাকাপয়সাগয়নাগাটি... তবে কেন?”

ভালোবাসলে ওসব পেতে হয়জানতাম না তুমি... তোমাকে পেয়েছি আচ্ছাতুমি কেন ভালোবাসলে আমাকেঅবশ্য ভালো তো প্রথমেই বাসোনি প্রথম থেকেই জানতে আমি ঘোরতর সংসারীজানতে দাওনি তুমিও সংসারী খেলতে নেমেছিলেবলো?”

খেলতে নেমে বুঝতে পারিনি কখন সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছি আমার সব অপূর্ণতাকে ভরিয়ে দিয়েছোনিজেকে নিংড়ে ভালোবেসেছো আমায়... হেরে গেছি তোমার ভালোবাসার সামনে দেরি করে ফেলেছি অনেকতবু বুঝেছি তোমাকে জড়িয়ে আমার বাঁচা... থেকো

#

বর্ষার জল পেয়ে বেড়ে উঠছে যুবতী তুলসী উঠোনে... টবে... তাদের ঘরসংসার... ফিরবে কবে?

শরীরী-অ

সকাল হতে না হতেই গায়ে পড়া শুরু। সারাদিন বিরমহীন ফস্টিনস্টি চলবে। চলবেইসূর্যের তেজের সাথে ছায়া ছায়া গাছেদের ঢলানিগিরি শুরু। বাছবিচার নেইরাস্তাছেঁড়াফাটা বুড়িকালুয়া কুত্তাঅলকাদির পুকুরঘাটে খোলা পায়ের গোছ। এসব সবাই দেখে না।

দত্তবাড়ির খড়খড়ির ফাঁক কাকের চোখে মিশে থাকে। সামনের নতুন ফ্ল্যাটে নতুন চারা। সন্ধানী চোখ ধারে খুঁজে নেয় ধারবাকি খাতার মাসকাবারি। মাসেরা হাত ধরাধরি করে খাতায় বসে পেট চালাবার ইজারা দেয়।

সরকারী ইস্কুলে মেয়েরা শাড়ীমেয়েরা ক্লাস এইটমেয়েরা শাড়ির সাথে জুতো মোজা হনহন। মেয়েগুলো রোগারোগা পালক। পালক কুড়োবার নেশায় চিত্তরঞ্জন বয়েজের সেকেলে গেঁয়ো গেঁয়ো নামের মিছিল।

কলার তোলাশার্টের গোঁজ খোলা সাইকেলদের কাছে চাইনিজ ঝলকানি রিংটোন। রবার্ট ব্রুসেরা গলি গলিতস্য গলি।

সেতুর নাম বিকেল চারটে। টিউশান পড়ার নামআমি রানি তুই রাজাআব তো আজা। ফুচকা নয় চুড়মুড়। এবার চারটে নম্বরের জন্য ফেল করেছি... তাতে কিসময়ের নাম পরের বার।

সন্ধে নামতে ছায়াগাছেদের ঢলাঢলি শেষ। শহুরে ফ্ল্যাটে শাঁখ বাজে না। পাড়ায় পাড়ায় বাবা লক্ষ্মীদের ফেরা।

বিলিতির দোকান আশকারায় ভরা। আগামীকাল কি ড্রাই ডেতেড়ে বৃষ্টি এলোআর সিনেমা সিনেমা খুপরিগুলোয় পাঁকাল মাছেদের ভিড় জমে গেল। এখানের রাস্তায় হাম্বারা হাঁটে না। পয়সা খোলাম হয়ে উড়ে আসছে। পাঁকের গন্ধে মাতোয়ারা নিশিগন্ধা।


রিক্সাদেরও ছেলেমেয়েরা রাস্তায় বসে নামতা মুখস্থ করে। ওপরে আরামকেদারায় বসে জার্মান কফিতে হাল্কা হাল্কা চুমুক মেরে খিদের আর্দ্রতা লিখিহাঘরের রাস্তাঘুম লিখিদুএকটা সস্তা খিস্তি... দয়ার সাগর হই। কাঠি তৈরিচলে এসো বৈরি। ডিনারে টিবেটান ডিলাইট।

জ্যোৎস্না দেখা আজকাল লুকিয়ে। ওসব ন্যাকামি কেউ দেখে ফেললেই মানইজ্জত হাওয়াই শার্টের পেঁজা কলার।

বাবার ঘেমো ছেড়ে ফেলা জামা চড়িয়ে বাবার কায়দায় মেয়ে বাবারই স্কুটারে দাঁড়িয়ে মুখে স্কুটার চালিয়ে সটান জীবনের পথে। মা হাসেদেখো দেখো মেয়ের কাণ্ড। মেয়ে মেয়ে মেয়েপালা। তুই যা করবিতাই কাণ্ড।

গাছেদের কাণ্ডে কতো প্রেম খোদাই হয়ে থাকে। প্রেমিক প্রেমিকারা একে অপরের চুপিচুপি প্রেমেদের সাথে সংসার পাতে।

পাতে পাতে পড়তে থাকে কমবেশি সুস্বাদু বকেয়াদের ফিরিস্তি। আর ইস্তিরি করা জামাকাপড়েরা সকাল সকাল ফস্টিনস্টিদের দেখেও না দেখে ছুটতে থাকে বিরতিহীন অন্ধগলি ধরে। রাস্তার আশেপাশে চোখের কোনায় হঠাৎ হঠাৎ ছিটকে এসে লাগে ছিন্নভিন্ন অনেক কিছু। বারুদ বা রক্তের আঁশটে এলাকাতেও নির্বিকার থাকার নাম হয়ে যায় ছায়া... ছায়া...।

ছায়া তোর বাড়ি কোথায়ছায়া তুই সাবান মাখিসছায়া তোর কবিতা লেখার খাতায় হিসেব লিখিসছায়া তুই হিসেবের সাথে নিকেশও লিখিসসব শেষে যোগফলে পাকাস গণ্ডগোল। আর তার প্রহর গুনেগুনে রাত চলাচল করে র‍্যাম্পেবিল্লিচলন! তাতে কি একটুও ভয় পায় ওই পুঁচকে টুইটটুইট সবুজ গ্রিলেতার বেখাপ্পা তরোয়াল লেজ নাচিয়ে এপাশ ওপাশ। দেওয়ালে শুরু হয় সূর্যের মাতব্বরি। মাতব্বরি বৈকিওপারের সুপুরি গাছের পাতাগুলো এপারের দেওয়ালে এসে ম্যালেরিয়ায় ভোগেপুকুরের ছায়ায় ডুব দিয়ে স্নান সেরে নিতে বলে একা চড়ুই।

চড়ুইগুলো ইদানিং মোমবাতি মিছিলে যাবার হুমকি দিতে শিখেছে। বলেছে মোবাইল থেকে শেকড়ে ফিরতে। নাহলেনাহক পালকের ছড়াছড়ি দেখে হেসে কুপোকাত হয় ব্যালকনির কালচে মর্চে গ্রিলেরা। আর ওখান থেকে কার অঙ্কের মাস্টারমশাই চিল্লিয়ে ওঠে, “মাথা ভর্তি গোবরতোর...। এই গালিচাওই গালিচা ঘুরতে ঘুরতে মোবাইলের টাওয়ারগুলো একসাথে গলাগলি কাঠগড়ায়। চল চল আদালতচল চল শামলা... আচ্ছাঘাম হচ্ছে কি প্রচণ্ডওদের বাড়ির ছাদে তোয়ালে শুকোচ্ছে মেয়েলি। পুরুষেরা ভেসে তার কামড়ে বাতাস আটকে বলে দিচ্ছেএখানেই মৌরসিপাট্টা। ওই বাগানে নাকি গঙ্গাফড়িঙের চাষ হয় আজকাল?

পরিচয়পত্রের ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে তুলসিপাতাদের সাথে ষড়যন্ত্রে নিম ফুলেদের দৌরাত্ম্য। ইন্দ্রের সভায় কে নেচেছিলোতা নিয়ে জোরদার শোরগোল। তাতে কিরে সখিতুই তো ছিলি না। অমন প্যাঁচামার্কা মুখে ওখানে ঢুকতে দেবে কে রেতবে তোর ওড়নার কোনো একদিন নিরুদ্দেশ হওয়া সাজে। খোঁজ খোঁজ খোঁজ... গ্রাম ওলটপালট। হেই দেখহেই দেখনিলাজ মেয়েছেলেস্বভাবচরিত্তির ভালো ছিলো নাকো। ঠিক হইচেবেশ হইচে। পড়ার ভুত ঘুচে গেচে। হুই দেখহুই দেখবাপ মা কাঁদে। বিহানবেলায় মোমের বড়ো তেজ। ছুঁচ সুতো ছাড়া সেলাই শিকেচিলি নাকাল করবিকাল...।

রঙিন জলে সাদাকালো ভিড়। সেপিয়া গুলো আজকাল চলে না। অকারণ কোনো থুৎনির ভাঁজে কাঁপও ভাসে না। দুয়োরে দুয়োরে অপেক্ষারত ভাতের থালা হাতে মায়েরা। ইজরায়েল লিখিগাজা লিখিকিন্তু বিশ্বকাপটা জার্মানি নিয়ে গেলোহায় হায় উথলাই। পোষাচ্ছে কি পোষাচ্ছে নাজানা নেইতবু বিভিন্ন হ্যাঙ্গারে ভালো থাকা আর তস্য ভালো থাকারা ঝোলে। বাঁচতে বাঁচতে বাছতে থাকে অষ্টম আশ্চর্য। শেকড়ের টানে যত রস উঠে এসেছিলো উঠোন জুড়েসবাই এখন পরদেশি। তাদেরও নানান তাঁবেদার। তাঁবেদারি হাতে হেমলক। আআআআহ! বাচ্চাদের সামনে থালায় পরিবেশন করে নাচোরপকেটে রাখা থাক ঘাম জবজব।


ঘেমে নেয়ে একসা। কালোয়াতির টিকিট চাই। বিদ্গধ প্রমাণকি গাইছে ছাই বুঝি না। নাকে নাকে মুখের চরম বিকৃতির সাথে সাথে মাথা দোলানো চলছে বকনা বাছুরের মতো। কিকালচারআহা! সামনের দোকানটায় স্টিমড মোমো দারুণকালোয়াতির সাথে পেটের কালোয়াতি চলেছেশেষ হলে বাঁচি। বউটা বড়ো বেশি বোঝেমালদার শ্বশুর দেখতে গিয়ে এখন গিটকিরিবাণ গিলে গিলে হজমিগুলির প্রয়োজন দিন দিন বেড়ে চলেছে। ঝিমঝিম লাগার মাঝে মনে হয়দশ মাসের লাফালাফি সব বৃথা।










   পৃথা রায় চৌধুরী

Preetha RoyChowdhury

Comments

Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS