Jyotirmoy Shishu

Jyotirmoy Shishu

Shahed Anwar

১৯ডিসেম্বর ১৫। ১১:৫৪টা রাত।

দুয়েকদিন ধরে মনে হচ্ছে আমি প্রেমে পড়ছি, ইদানিং কলেজ থেকে আশার সময় একটা মেয়ের সাথে ক্রস হচ্ছে। ব্যাপারটা প্রথম প্রথম আমলে না নিলেও এখন নিচ্ছি। বুঝতে পারছি না কেন এমন হচ্ছে। আমি কি আবার সর্বনাশের দিকে পা বাড়াচ্ছি? মেয়েটিকে দেখার জন্য সন্ধ্যায় নিয়মিত বের হই, আমার বাসার রাস্তা দিয়ে যায়। সাথে বান্ধবি থাকে। প্রতিদিন দেখতে পাই না বলে প্রচন্ড রাগ হয়।

আমি এখনো জানিনা মেয়েটি আমার জুনিয়র নাকি সিনিয়র। ধ্যাএএত, এটা মোটেই ঠিক হচ্ছে না। ঠিক একই ভাবে আমি ক্লাস এইটে পড়ার সময় টেনের এক আপুর প্রেমে পড়ছিলাম। তার মাশুল এখনো দিতে হচ্ছে। আমি কি আবার নতুন মাশুলের কর গুনছি? মনে হয় আমার উচিৎ শিক্ষা হয়নি, আরও কঠিন একটা শিক্ষা হওয়া দরকার।

কাল রাতে বেশিক্ষণ পড়তে হয়েছে। ঘুমালাম দেরি করে। অসহ্য মাথাব্যথা নিয়ে ঘুমাতে হল। বেশিক্ষণ হয়নি, ঘুমের মধ্যে কে যেন ডাকছিল, সকাল হয়েছে বোধহয়। নাহ, আরেকটু ঘুমাতে হবে। কম্বল দিয়ে মাথা জড়িয়ে নিলাম, কোন শব্দ যেন না শুনি।

কিছুক্ষণ পর আবার কে যেন ডাকছে নিম্নস্বরে। 'এই, এই আরেকটু সরে ঘুমাও না, আমি ঘুমাতে পারছিনা তো, এদিকে আমি খাট থেকে পরে যাচ্ছি, আর তুমি পুরো খাট দখল করে আছ।' আমি একটু সরে শুলাম, যেন এটাই স্বাভাবিক। 'এই, আর কতোক্ষণ ঘুমাবে, আজ না তোমার পরীক্ষা?
  - উফ্‌…!!!
  - মাথাব্যাথা করছে কি, চুল টেনে দেব?

ও হাত বাড়িয়ে চুল টেনে দিচ্ছে। আমি অতল ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

ব্যপারটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু, বিশ্রীরকমের। নিজেকে বোঝাতে পারছিনা। আমি তাকাব না তাকাব না করেও তাকাই। বেশিক্ষণ তাকাতে পারি না লজ্জায়। ভয়ও হয় - যদি ব্যাপারটা বুঝে ফেলে, নইলে চোখের ভাষা পড়তে কষ্ট হত না। আমার এতদিনের যুক্তিবাদী মনটা কোন যুক্তিই মানছে না। ভেতর থেকে সুনীল বলে ওঠে, ভালবাসার পাশেই একটা অসুখ শুয়ে আছে। আমি বলি, না সুনীল,  ওটা অসুখ নয়, ওটা প্রেম ওটা ভালোবাসানীরাকে তুমি যেটা বলো




১৩জানুয়ারী ’১৬। ১১:১৩টা রাত

বিপুকে আমার খুব বেশি মনে পড়ে না। মাঝে মাঝে মনে পড়ে। আমার স্কুলবন্ধু। বাচ্ছা টাইপের ছেলে, মনে হবে সিক্সের ছেলে ভুল করে এইটের ক্লাসরুমে ঢুকে পড়েছে। ওর বাবা ভূমি অফিসে চাকরি করতেন। অফিসের পাশে মাটির তৈরি  ঘরটাতে থাকতেন। বদলি হয়ে যাওয়ায় বিপুকে আমরা বেশিদিন পাইনি।  যমজ ছিল ওরা। তবুও আমার বিপুকে চিনতে ভুল হতো না। ক্লাসের মাঝখানে এসে ঠিক আমার পাশেই বসত। মাঝেমাঝে আমাকে নোট লিখে দেয়ার আবদার করতআমার হাতের লেখা যে সুন্দরএরকম আশা করা ভুল। ওকে আমার মনে পড়ার একটা উপসর্গ আছে। সারাদিনের তেজী সূর্য বিকেলের দিকে ক্লান্ত হয়ে এলে আমার বিপুকে মনে পড়ে যায়।

অনেকদিন পর আমার পুরনো রুমমেট সাদী ভাই এসেছেন। ওনার কিছু বাজার করার কথা। দুপুরের দিকে আমরা নিউ মার্কেট যাওয়ার জন্য বেরিয়েছি। বাসে জানালার পাশের সিটে বসতেই মাঘমাসের সূর্যের দুর্বল তেজ আমার চোখে পড়লো। সেই পুরনো রোদ, যা আমি বিভূতিভূষণের 'অপরাজিত'-য় পেয়েছি; বিপুদের ভূমি অফিসের পাশে থাকা বাড়িটার মাটির দেয়ালে সেই রোদকে আমি দেখেছি। উঠোনে দাঁড়িয়ে ডাকলাম, বিবেএএক... বিবেএবাসায় বিবেক আছে?

ভেতর থেকে শুনতে পেলাম, বিপু, বিপু, তোকে কে যেন ডাকছে।

বিপু এলোনা। অনেক্ষণ পর রবীন্দ্রনাথের 'হঠাৎ দেখা' কবিতার মেয়েটি এলেন খোলাচুলে। 'বিপু বাড়ি নেই, কোথাও খেলছে হয়তো।'

আমি নির্বাক হয়ে গেলাম। ওরকম মূর্তির মত পেলব চোখ আমি আজও দেখিনি। কানে বাজছে এখনো, বিপু বাড়ি নেই, বিপু বাড়ি নেই। এই বাড়ি না থাকা বিপুকে আর পাইনি, এখন কোথায় আছে কে জানে! আমি আর কোনদিন বিপুকে পাবনা। মৃত্যুই একমাত্র বিচ্ছেদ নয়, আরো অনেক বিচ্ছেদ রয়েছে এই জীবনে।



২৯মার্চ, ’১৬। ০১:৪৭টা রাত

বৃষ্টি হবে,  সো সো করে বাতাস বইছে। অন্তরে বাঁশি বাজে এমন বাতাসে। বৃষ্টি আর রবীন্দ্রনাথ এক হয়ে আছে বাংলা সাহিত্যে। বৃষ্টি হচ্ছে অতঃপর রবীন্দ্র-সঙ্গীত। কিন্তু আমি শুনছি উস্তাদ রশিদ আলি আর অর্পিতা চ্যাটার্জীর গাওয়া 'বাপি বাড়ি যা' মুভির 'সাজনা, বার্সে হ্যা কিউঁ আখিয়াঁ' গানটি। আমার মতে বৃষ্টি নিয়ে বাংলায় যত গান আছে তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথের বৃষ্টির গানগুলোকে পেছনে ফেলে দিয়ে এটিই প্রথম স্থানে উঠে আসবে। অথচ গানটিতে বৃষ্টি তেমন কোন বর্ণনা নেই, কেবল চোখের পানিকে বৃষ্টির সাথে তুলনা করা হয়েছে। এই একটা গান এই নিয়ে সতেরোবার শুনছি। আমার চোখ জানালার বাইরে, সামনের বাসার দেয়ালেল্যাম্পপোস্টের আলো এসে দেয়ালে পড়েছে। রিটায়ার নেয়া এক আর্মির বিল্ডিং।

আর্মি!!!... আবার আর্মি, তনুহত্যার পর থেকে এই আর্মি শব্দটা একটা আতংক। তনুহত্যা আমার উপর প্রভাব ফেলেছে তার মৃত ছবিগুলো দেখার পর। কী বীভৎসভাবেই না মেয়েটাকে মারা হয়েছে! মেঝেতে রক্তের দাগগুলো চোখে ভাসছে। আচ্ছা তনুর মা এখন কি করছেন? তিনি হয়তো এশার নামাজ পড়ে জায়নামাজ থেকে এখনো ওঠেন নি। কিংবা তসবি হাতে খাটে হেলান দিয়ে আছেন। আঙুল থেমে আছে, তিনি ঝিমুচ্ছেন। রাতের খাবার খাননি। ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামার সাথে সাথে উনার হালকা ঘুম পেল। হঠাৎ কানের কাছে শুনতে পেলেন, মা...। উনার ঘুম ভেঙে গেল। দ্রুত পেছনে ফিরে তাকালেন, কেউ নেই, জানালার পর্দাটা বৃষ্টির ঝাপটায় দোল খাচ্ছে শুধু। মেয়েহারার ব্যথাটা মোচড় দিচ্ছে। তার মেয়ে নেই এটা মানতে কষ্ট হচ্ছে। আচ্ছা তনু এখন কি করছে? ওর কবর কি এরই মধ্যে ধ্বসে পড়েছে? এতো আগে ধ্বসে পড়বার তো কথা নয়?

হয়তো বৃষ্টির পানিতে  তাড়াতাড়িই ধ্বসে গিয়েছে। ঠিক যেমন নতুন উপসর্গ পেলে আমরা পুরাতনকে ভুলে যাই।
















শাহেদ আনোয়ার
Shahed Anwar