Skip to main content



Arka Chattopadhyay

 আপোষ (Making Do) : ইতালো কালভিনো

এক যে ছিল রাজ্য যেখানে সবই ছিল বারণ।
যেহেতু শুধু ডাঙ্গুলি খেলা বারণ ছিল না, রাজ্যের লোকজন মাঠেঘাটে একজোট হয়ে ডাঙ্গুলি খেলে সময় কাটাত।
  
যেহেতু নিষেধের নিয়মগুলো এক এক করে এবং বেশ জোরালো কারণসহ লাগু করা হয়েছিল সেগুলো নিয়ে কারুর মনে কোন দ্বন্দ্ব বা অভিযোগ ছিল না। সবাই সহজেই সেসব আইনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল।
এভাবেই অনেকগুলো বছর কাটলো। একদিন কনস্টেবলরা দেখল সব জিনিস নিষেধ করার আর কোন কারণ নেই। তাই তারা সংবাদ-প্রেরকদের হাতে খবর পাঠালো যে প্রজারা এখন যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন।
দূতেরা মাঠেঘাটে যেখানে লোকেরা একজোট হত সেখানে পৌছলো।
"শোনো সবাই শোনো", তারা ঘোষণা করলো, "আজ থেকে আর কোনকিছুই বারণ নয়।"
লোকজন ডাঙ্গুলি খেলেই চললো।
"কি বুঝলে?" তারা বলতে লাগলো, "যা ইচ্ছে তাই করতে পারো সবাই।"
প্রজারা উত্তর দিলো, "বেশ তো, আমরা ডাঙ্গুলি খেলছি।"
সংবাদ-প্রেরকেরা অতীতের বহুবিচিত্র এবং বর্ণময় কর্মযজ্ঞের কথা তাদের মনে করালো; আবার তাদের জানালো যে চাইলে এখন তারা পুনরায় সেইসব করতে পারে। কিন্তু প্রজারা কর্ণপাত না করে নিজেদের মত ডাঙ্গুলি খেলে যেতে লাগলো। রুদ্ধশ্বাসে স্ট্রোকের পর স্ট্রোক নিয়ে চললো।
তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা অরণ্যে রোদনের সামিল দেখে হতাশ দূতের দল কনস্টেবলদের কাছে ফেরত গিয়ে গোটা ব্যপারটা জানালো।
তারা বললো, "এই ব্যপার? বেশ তো, এক কাজ করো না, ঘোষণা করে দাও যে ডাঙ্গুলি খেলা নিষেধ।"
এই নতুন নিষেধাজ্ঞা শোনামাত্র প্রজারা রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দূতেদের হত্যা করলো।

তারপর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে তারা আবার ডাঙ্গুলি খেলতে লাগলো।






দ্য আন্তিগোনে পোয়েমস
মারি স্লেইট

(১)
আমার করোটির ভেতর (সব)
ওই ক্ষুধার্ত বায়স-ধ্বনি
আগুন
অত্যাচারের ডাকে ডাকে

আমার হৃদয়ের ভেতর (শুধু)
ওই শেষ কম্পন
ফিসফিসে গানের মধ্যে
যন্ত্রণা


(২)

আঁধার সূর্যের মেয়ে
আমার কটিদেশের বন বন 
টকটকে ভোরের ওপর দিয়ে
মুছে দিয়ে যাই

আমার চূড়া আগুনের কাছে
বরফ-পাগলামি বয়ে আনছে
উচ্ছ্বাস আরাম এনে দ্যায়
আমার বেদনার ঠোঁট জুড়ে

(৩)

আমাদের বেঁচে থাকা
জন্ম মৃত্যুর মাঝে পলক
সারাক্ষণ মৃত্যু ছুঁয়ে থাকা
এরই নাম সূর্য

(৪)
এমন এক উত্তেজনা
যা সব রসাতল
পেরিয়ে যায়

ইথার
ভরে দ্যায়
প্রত্যেক ফাটলে ।

(৫)

কালো
এক ছুরিগুলোর দুঃখ।

আমার হৃদযন্ত্রের ভেতর। 
মোচড়টায়।

রক্তজীবন আমার
নিকষ।

(৬)

...আর এইটুকু, পৃথিবীর সঙ্গোপন
অন্ধকারে বাঁধা

হে প্রাচীন সূর্যের ঈশ্বর

তোমার রাক্ষসের রোষলীলা,
তার আগুন, আমার রাজ্যপাট...

(৭)

এই ধূসর সকালে
আছে বলতে
তোমার উরুর
লম্পট একাকিত্ব

আমার উরু
আড়াআড়ি

প্রক্ষিপ্ত।

(৮)

কালো কুঁড়ি
মুছে দ্যায়
মরুভস্মের এলাকা

(৯)

এই স্বর
কথা বলতে ভীত

শব্দের
নির্মম ধাতুতে
ভীত।

যে শব্দ চেঁছে ন্যায়। 
যে শব্দ ক্ষত দ্যায়। 
যে শব্দে শান্তি থাকে না।

যদি উচ্চারণ শুরু করি
এই স্বর জুড়ে
বিস্তীর্ণ ব্যথার 
আর্তনাদে 

এর আতঙ্কের প্রতিধ্বনি অনিঃশেষ হয়ে উঠবে । 

(১০)

নির্বাসনে

আমি রক্তের ওপর হাঁটি
একটি শিরারেখা লিখি 
পুরুষ উৎপন্ন করি

নির্বাসনে

চীৎকার বয়ে নিয়ে চলি
প্রতিশোধের দিকে ফিরি
নিজের ফেরার অপেক্ষা করি


নির্বাসনে। 


অনুবাদ: অর্ক চট্টোপাধ্যায়
Translation: Arka Chattopadhyay






উত্তম থেকে মধ্যম পুরুষ: সুমনের গানে রাজনীতি আর ভালবাসার কামনাপাঠ

সুমন চট্টোপাধ্যায় থেকে কবীর সুমন – সময়ের অনুক্রমে দুদশক পর ওঁকে নিয়ে লিখতে বসে প্রত্যেকবারের মত এবারও বাধ সাধছে দূরত্বহীনতা, বাধ সাধছে আমার বেড়ে ওঠার লতায় পাতায় ওঁর গানের সরব এবং অরব উপস্থিতি। আর যা বাধ সাধছে তা হলো আমার সাঙ্গীতিক প্রশিক্ষণের অভাব। আমি সাহিত্য এবং দর্শনের ছাত্র; তাই এই লেখার শুরুতেই আমার সাঙ্গীতিক অপারগতা স্বীকার করে নিয়ে সুমনের গানের এক বিষয়ভিত্তিক এবং সাহিত্য ও দর্শন লালিত আলোচানা করার চেষ্টা করব। চেষ্টা করব কারণ লিখতে তো হবেই। লেখার যে দায় আছে আমাদের। আমাদের সময়ের অন্ধকারে সুমনের যদি অহর্নিশ গান বানানোর দায় থাকে তবে আমার তথা আমাদের দায় হলো সেই সময়ের শরিক হয়ে সুমনের গানকে প্রতি-প্রতর্কের আলোয় তুলে ধরা। সুমনের গানের অভিসন্ধি এমন এক প্রতর্ক যা তার প্রত্যুত্তরে আরো প্রতর্ক, আরো অভিসন্ধি দাবি করে। এভাবেই তাঁর গান রাজনৈতিক সংলাপ তৈরী করে। সুমন নিজেই লিখেছেন 'দেখাতে পারিনি আমি কোনো উপমায়/ যে আমিকে তুমি তার সময়ে দেখোনি'। সুমনের উত্তরকালে আমরা কি সুমনের সমসময়ের এই আমি'কে তুলে ধরতে পারবো? উত্তরকালের কাছে সমকাল নিজেই অতীত! সে কি বুঝে নিতে পারে আমির জটিল চলন, তার বর্তমান থেকে তার অতীতে যা নির্মাণ করে তার ভবিষ্যৎ। হয়ত তখন আর সমকাল সেখানে এসে একা চ্যাপলিন হয়ে বসবে না, হয়ত তখন আমরা এক অন্য সুমনকে পাবো, এই সুমনকে নয়। সেই কারণেও বর্তমানের এই ঘটমানতার কাছে আমার বা আমাদের দায় থেকে যায়: সুমনকে নিয়ে প্রতর্ক নির্মাণের দায়।


ইতালির দার্শনিক জর্জীয় আগাম্বেন বলেছেন প্রকৃত সমসাময়িক তিনি যিনি তাঁর সময়ে থেকেও সেই সময়ে বিচরণ করেন না। প্রকৃত সমসাময়িকের সাথে তাঁর সমসময়ের এক জটিল দ্বান্দ্বিক সম্পর্কের কথা বলেছেন আগাম্বেন – ‘It is that relationship with time that adheres to it through a disjunction and an anachronism.' সুমনের গান সমসাময়িকতার এমন এক স্বাক্ষর যা সময়ের সঙ্গে এই দ্বিবিধ সম্পর্ক অনবরত বজায় রেখে চলেছে। এই গান আমাদের সময়ের বিবেক পাহারাদার, আমাদের নৈতিক সংবাদদাতা আবার সমসময়ের ক্ষমতাতন্ত্রের দিক থেকে যা কিছু প্রভুত্ত্বকামী এবং সংখ্যাগুরু তাদের প্রতিস্পর্ধী। সুমনের গান কালোত্তীর্ণ এবং সেই অর্থে সময়হীন কিন্তু এখানে সেই প্রসঙ্গ ব্যতিরেকেই আমাদের সমসাময়িকতার দ্বন্দ্বকে বুঝতে হবে। সমসাময়িক তাঁর সময়ের সঙ্গে ওই প্রতিস্পর্ধার সম্পর্ক তৈরী করতে পারেন বলেই অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে একটা দূরত্ব থেকে নিজের সময়কে বিশ্লেষণ করতে পারেন। আগাম্বেন বলেছেন – ‘The contemporary is he who firmly holds his gaze on his own time so as to perceive not its light, but rather its darkness.' দুদশক পেরিয়ে গেল এই প্রেমহীন সময়ের অন্ধকারে বসে গান বানাচ্ছেন নাগরিক কবিয়াল। জোনাকিকে ধরে এনে অন্ধকারটাকেই তো চিনিয়ে দিতে চাইছেন, মন্থন করতে চাইছেন। এই কারণে সুমন কাউকে তার নিজের সময়ে দেখার ওপর এতো গুরুত্ব দিচ্ছেন। আগাম্বেনের বয়ানে সমসাময়িক মানুষটি তাঁর সময়কে তফাৎ থেকে দেখতে পারেন বলেই তাকে ভাগ করে একটি সময়কে অন্যান্য সময়গুলোর সাথে মিলিয়ে দিতে পারেন: '[...] he is also the one who, dividing and interpolating time, is capable of transforming it, and putting it in relation with other times.' সুমনের গান এক ইতিহাস রচনা করতে পারে যা হয়ে ওঠে এক সময় দিয়ে অন্য সময়কে বদলে দেবার ইতিহাস। সুমনের গান এমনই এক বদলে দেবার ইতিহাসের মুখ চেয়ে থাকে। তাই বোঝাতে না পারলেও তাঁর কাব্য দিয়ে সুমন অন্য এক সময়ে বসে হাফিজের প্রথম প্রেমিকাকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করতে থাকেন। সময়টাকে কামড়ে ধরে বাঘের শিকার ধরার মত 'দুঃসময়' টাকেই ধরে আনে তাঁর গান।  

সুমনের গানে বারবার যেসব অনুষঙ্গের পুনরাবৃত্তি দেখা যায় তাদের অন্যতম হলো প্রেম এবং রাজনীতিকে এক একক বন্ধনীর মধ্যে নিয়ে আসা। প্রেমের গানকে তিনি বিদ্রোহের গানে পরিণত করেছেন এবং বিদ্রোহকে প্রেমে। প্রশ্ন করেছেন 'প্রেমিকা আমার কবে বিদ্রোহ হবে?' সুমন বলেছেন, ৭০ এর শেষে ভারতীয় রাগসঙ্গীৎ ছেড়ে নিজের গান রচনা করতে শুরু করার পেছনে ছিল সমসময়ের রাজনীতিকে ধরতে চাইবার ইচ্ছা; এখন যে রাগসঙ্গীতকে (বাংলা খেয়াল) তিনি রাজনৈতিক আঙ্গিকে পরিণত করতে উদ্দ্যোগী হয়েছেন। সুমন লিখেছেন 'ঠোঁটে ঠোঁট রেখে ব্যারিকেড করো প্রেমের পদ্যটাই/বিদ্রোহ আর চুমুর দিব্ব্যি শুধু তোমাকেই চাই'; চুম্বনকে ব্যারিকেডের রূপকের কাছে এনে তিনি রাজনৈতিক প্রতিরোধ আর প্রেমকে এক করে দিয়েছেন। যে বাতাস তাঁর গানে বদলের নিশান হয়ে ঘুরে বেরিয়েছে সেই বাতাসও প্রেম আর প্রতিরোধকে মিলিয়ে দিয়েছে:

'ধারা পাল্টায় মাও সে তুঙের চীন
প্রেম পাল্টায়, শরীরও পাল্টে যায়
ডাকছে জীবন, আয় পাল্টাবি আয়।'

এমন আরো অনেক উদাহরণ দেওয়া যায় কিন্তু আমার মনে হয় না সুমনের শ্রোতাদের কাছে রাজনীতি ও প্রেমের এই মিলমিশ নিয়ে কোনো দ্বিমত থাকবে। আমরা বরং দেখি সুমনের গান কিভাবে এই মিলমিশ ঘটায়। এই ঘটানোটা শুধু টেকনিকের ব্যপার বলে আমার মনে হয় না। সুমনের গানের সৃজনী বিশ্বাসের অন্তর্লীন নান্দনিকতা প্রভাবিত করে এই যোগাযোগকে। সুমনের গানের লিরিককে আশ্রয় করে রাজনীতি ও প্রেমের অন্তরঙ্গতা নিয়ে এবার কিছু কথা বলা যাক। 

১৯৯২ সালে 'তোমাকে চাই' ক্যাসেটের সমনামী 'তোমাকে চাই' গানটি দিয়ে সুমনের উত্থান এবং এত বছর পরেও হয়ত জনপ্রিয়তার বিচারে এই গানটি দিয়েই সুমনপ্রেমীদের বাইরে অধিকাংশ লোক তাঁকে চেনেন। এই গানটি সুমনের লেখা এবং সুর করা সেরা গান কিনা তা বিতর্কস্বাপেক্ষ এবং আমি সেই বিতর্কে যেতে চাই না। তবে আমার মনে হয় 'তোমাকে চাই' সুমনের গানের একেবারে মূল ভাবটিকে আমাদের সামনে এসে হাজির করে; ভাব বলছি, কিন্তু এটা আদৌ কোনো ভাব বা ভাবনা নয়; এটা এক সক্রিয়তা যাকে আমরা 'সম্বোধন' বলতে পারি। সুমনের গান আহ্বানের গান; গণসঙ্গীতের নন্দনপুষ্ট স্বতত এই সম্বোধনক্রিয়া 'তোমাকে চাই'-এর অন্তর্লীন চালিকাশক্তি। সুমনের গানের ভরকেন্দ্রে রয়েছে এই রাজনৈতিক সংলাপ যা 'আমি' থেকে 'তুমি'র দিকে নির্মাধ্যম সেতুবন্ধনের চেষ্টা চালিয়ে যায়। অলংকারশাস্ত্রে যাকে বলে 'Apostrophe' বা কারুর উদ্দেশে প্রতক্ষ উচ্চারণ, সুমনের গানের সর্বত্র এমন এক তোমাকে চাওয়ার ডাক শোনা যায়। ওই ডাকের মধ্যে দিয়েই ওঁর গান আমাদের উদাসীন থাকতে বারণ করে; সাড়া দিতে আহ্বান জানায়। তাই ওঁর গানে 'তুমি'র আধিক্য। এই 'তুমি' গানের শিকড়ে সংলাপসম্ভাবনার মন্ত্র সঞ্চার করে। গান এক থেকে বহুর দিকে হাত বাড়ায়, সম্মিলিত হবার ইচ্ছা যুগপদে প্রেম এবং রাজনীতির কমিউনের দিকে এগিয়ে যায়। আর এই কারণেই সুমনের গানে প্রেম রাজনীতি আর রাজনীতি প্রেম হয়ে ওঠে। এই দুইয়ের পারস্পরিক পরিবর্তন বিপ্লবের স্বাক্ষর হয়ে যায়।

উত্তম পুরুষ (আমি) থেকে মধ্যম পুরুষগামী (তুমি) এই সম্বোধন সুমনের গানে রাজনীতি এবং প্রেমের সমার্থকতা তথা তাদের সমীভবন-গ্রন্থি। সুমনের গান এই সম্বোধনের প্রতিশ্রুতিকে ধারণ করার মাধ্যমেই রাজনীতি আর প্রেমকে মিলিয়ে দিতে পারে। প্রেম আর প্রতিস্পর্ধার রাজনীতির যোগসূত্র হলো আমির একাকিত্ব থেকে সমন্বয়ের দিকে যাত্রা করা আর এই যাত্রায় তুমির প্রতি বন্ধুতা অবস্যম্ভাবী। সুমন বারবার তাঁর গানে এই তুমিকে নানাভাবে মোবিলাইজ করেন। চুম্বন এখানে ব্যারিকেডের আকার ধারণ করে। সুমনের গানে তুমির ছড়াছড়ি, কখনো কখনো অন্তরঙ্গার্থে 'তুই', কিন্তু সেই তুলনায় 'সে' খুব কম। অল্প কয়েকটি গান যেখানে সুমন প্রথম পুরুষ (সে) ব্যবহার করেন সেখানে প্রায় অনিবার্যভাবে তার চলে যাবার কথা থাকে, যেমন 'সে চলে গেলেও থেকে যাবে তার স্পর্শ আমারই হাতের ছোঁয়ায়' কিম্বা 'ফিরিয়ে দিইনি নিজেই গিয়েছে চলে'র মত উদাসী বিরহযাপনের গানে। 'তুমি'র মধ্যে যে রক্তমাংসের উপস্থিতি আছে 'সে'র পরোক্ষতায় সেই স্পন্দন অনুপস্থিত। তাই কখনো কখনো বিরহের অনুপস্থিতির 'সে'কেও তিনি 'তুমি' তে পরিণত করেন, যেমন 'বাতাস গাইছে গান' এর মধ্যে 'তুমি কেন সাথে নেই' কিম্বা 'গালিবের গানে' 'মনে রেখে দিলাম এখানে/তুমি ছিলে কবিতায় গানে'। 'তোমাকে ভাবাবোই ভাবাবো', 'তুমি এলে' 'তুমি চললেই', 'তোমার কথার রং', 'তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা', 'তোমার সঙ্গে একা', 'তুমি বললেই হবে', 'তোমাকে দেখছি' 'দেখছি তোকে', 'হারিয়ে যেও না' 'তুমি তোমার গল্প বলো ', 'তোমার তুলনা', 'কাঙালপনা', 'খোদার কসম জান', 'তুই হেসে উঠলেই', 'বন্ধু কি খবর বল', 'হাল ছেড়োনা বন্ধু', 'এক মুহুর্তে ফিরিয়ে দিলে', 'গান তুমি হও' 'কখন তোমার দেখা পাব' 'ফেরারী দিনে তুমি এলে সহসা', 'কেননা তুমি তো', 'জনতার হাতে হাতে ঘোরো তুমি নিশানের মত'--এই তালিকা অসমাপ্য। সুমনের গান পদে পদে এমন অজস্র তুমি উগরে দ্যায়। এভাবে সে শ্রোতাদের সাথে যেমন নিবিড় এক নাড়ির টান তৈরী করে, তেমন লালন করে প্রেম এবং বদলের রাজনীতি উভয়েরই গভীরে থাকা মানুষের এই সংযোগসম্ভাবনাকে। বন্ধুত্ব এভাবে রাজনৈতিক হয়ে যায়। গান হয়ে ওঠে মানবশৃঙ্খল গড়ে তোলার অতলস্পর্শী ডাক।

এই আহ্বানের ভেতরে যতটা প্রেম থাকে, ততটাই থাকে রজনৈতিক প্রশিক্ষণের অঙ্গীকার: 'তোমাকে আমি পথে নামাবোই /যতই ঘরে বসে থাকো  না'। এই আহ্বানে থাকে বিশ্বাস: 'তুমি বললেই হবে'র মত কথা দিয়ে রুখে দেবার প্রত্যয়। প্রিয়তমাকে অভিবাদন জানাতে গিয়ে 'বোমা নয় গুলি নয় চকলেট, টফি রাশি রাশি' সেই প্রতিশ্রুতিই জানিয়ে যায়। যে তুমি কে শহরের অলি গলি থেকে মফস্বলের উপকন্ঠে খুঁজে ফেরে সুমনের সন্ধানী আমিকন্ঠ, সেই সর্বত্র উপস্থিত টুকরো টুকরো 'তুমি' রাজনৈতিক অভ্যুত্থান এবং প্রেমের অঙ্গীকারকে অমোঘ যুগ্মতায় মুগ্ধ করে রাখে। 'তোমার সাথেই' কেবল একা হওয়া যায় সুমনের গানে। এমনকি বাবার মৃত্যুতে লেখা গান 'তুমি তো চললেই' এর ভেতরেও চলে যাবার সমষ্টি এক অদ্ভূত প্রতিরোধের বয়ান তুলে ধরে: 'তুমি তো চললে সক্কলে যায়/থাকতে এসেছি ভাবতে ভাবতে সবাই পালায়'। তুমির দিকে এই চলন প্রেমের গানেও মানব্সমষ্টির স্বপ্ন নিয়ে আসে:

'ওই বৃষ্টি যেখানে তোমার চোখের জলে
অন্য কারুর দুঃখের কথা বলে
সেইখানে হবে দেখা
তোমার সঙ্গে একা'।

'আমি' থেকে 'তুমি' হয়ে এই ডাক যখন 'অন্য কারুর দুঃখের কথা' বলে যায় তখন তা প্রতিরোধের সমষ্টিকে স্পর্শ করে। 'হারিয়ে যেও না' গানেও 'আমি' থেকে 'তুমি' হয়ে সুমনের গান ছুটে যায় এক মানবশৃঙ্খল তৈরী করতে:

'এখনো জীবনের কোথাও না কোথাও বিরল ভরসার সাহসী সুরভি
এখনো রোদ্দুর সহসা জ্বেলে দ্যায় বিদ্রোহের রঙে রক্তকরবী
হারিয়ে যেও না হারিয়ে যেও না রক্তকিংশুক দিনের আশা
এখনো লালে লাল ভোরের আকাশে পাঠায় সুখবর ভালবাসা
এখনো কিছু হাত হতাশা রুখছে বাতাসে কাঁপছে প্রাণের স্লোগান
এখনো কিছু মুখ মুখর কন্ঠ সজীব রাখছে আগামীর গান।'

অর্থাৎ এক থেকে দুইয়ে কিম্বা 'আমি' থেকে 'তুমি'তে গিয়ে থমকে যায় না এই আহ্বান, 'মাঠঘাট বন পেরিয়ে' এই আহ্বান বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন মানুষের হাতকে জুড়ে দ্যায় কামনার এককত্বে।

একাকিত্বের নেতিকরণ সুমনের সাঙ্গীতিক নন্দনজগতে যতটা রাজনৈতিক ততটাই রোম্যান্টিক। রাজনীতি আর প্রেম উভয়কে চালনা করে আদিম এক কামনাবীজ যা সুমন সলিলের গানের 'ঝুর ঝুর ঝরে গ্যাছে কামনার ফুল' থেকে 'ছত্রধরের গানে'র তীরের ফলায় খুঁজে পান, যে তীরের ফলায় কামনা লেগে থাকে। এই কামনার ডাকেই এক হয়ে যায় প্রেম আর প্রতিরোধ। 'জুয়া' গানে এই কামনা 'অনুভব' হয়ে ভালবাসার চাওয়াকে পাল্টে দেবার স্বপ্নের কাছে নিয়ে যায় : 'গ্রাম থেকে গ্রামে ডাক্তার যাবে কবে?' একদিকে যেমন রাজনৈতিক গানে প্রেম চলে আসে অবলীলায় তেমনি প্রেমের গান রাজনৈতিক হয়ে ওঠে যখন একটি মনের অন্য মনকে স্পর্শ করা 'বিস্ফোরণ' এনে দ্যায়। 'ভালবাসা শত যুদ্ধেও জেতা যায়না'র মত আদ্যন্ত প্রেমের গানেও তাই সুমন গেয়ে ওঠেন: 'একা মেয়েটার নরম গালের পাশে/প্রহরীর মত রাত জাগে ভালবাসা'। এখানে রাজনীতির ভিতর ভালবাসা নয়, বরং ভালবাসার শিকড়ে রাজনৈতিক সক্রিয়তার পাহারা বসিয়ে দ্যান সুমন। রাজনীতি ও প্রেমের এই সংলাপ তাই একপাক্ষিক থাকে না।

তোমাকে ডাকা আর তোমার আসার মধ্যবর্তী ছেদবিন্দুতে সুমনের গানের বসত। সুমনের গান এখানে অপেক্ষারত। সে জানে 'উত্তর আসবে না, তুমি আসবেই আমি জানি'। এই আসার আশায় এক হাইপোথিসিস রয়েছে অনন্ত ডাক দিয়ে যাকে আঁকড়ে ধরে সুমনের গান। যে 'তুমি' এলে 'ভোরের সংলাপ' আর 'আলোর সংরাগ' 'আঁধারে মাখিয়ে দেওয়া যেত', সেই তুমি না আসলে গানের শরীরে যে বিষন্নতা তৈরী হয় সেই না পাওয়ার গানও ছুঁয়ে যায় সমসময়ের অন্ধকারকে: 'আঁধার কাটে না, দশক চলে যায়', 'সুদিন আসে না, এসেছে অসময়, দিনের পরে দিন, বৃথাই অপচয়' কিন্তু তবুও এই গান আসার সম্ভাব্যতা নিয়ে উজাগর রয়ে যায়। গান বলে: 'তুমি এলে সফল হয়তো, হতো সময়, কিছুটা নয়তো, দুরাশায় ভরে দেওয়া যেত'। যেখানে 'হয়' আর 'হয়তো'র মাঝে তৈরী হয়, আবার বুজে যায় অবুঝ এক ফাঁক, সেখানে উড়ে এসে জুড়ে বসে এই গান, তৈরী করে ন্যায় একফালি সম্ভাবনা, একটুর জন্য না ক্ষয়ে যাওয়া আশার ওই অবশেষ। 'আমি' থেকে 'তুমি' হয়ে সবাইকে ছুঁয়ে যাওয়া এবং সাড়া দিতে আমন্ত্রণ জানানোর এই আহ্বান সুমনের গানে প্রেম ও রাজনীতির গভীরে কামনার বিশস্ততার প্রতীক হয়ে ওঠে। এই বিশস্ততা সাফল্য বা ব্যর্থতার ওপর নির্ভর করে না বলেই বলা যায়, 'উত্তর আসবে না তুমি আসবেই আমি জানি'। প্রতিরোধ ব্যর্থ হলে যেমন তার গুরুত্ব এক বিন্দু কমে যায় না, তেমনি এই 'তুমি' না আসলেও তার আদর, ডাক এবং আহ্বান চলতে থাকে। যে আসবে না তার জন্য অপেক্ষা করে যাওয়াই যে প্রতিরোধের শর্ত তা স্যামুয়েল বেকেটের ভবঘুরেদের মত সুমনের গানও হাড়ে হাড়ে হারে হারে বোঝে আর তাই 'রোববার' গানটি শেষ হয় উদাত্ত এই উচ্চারণে:

'সাড়ে পাঁচটায় তুমি আসবে, ঠিক যেমনটি তুমি আসতে, প্রতি রোববার
তুমি আসবে না আর কোনদিন আর কোনদিন আর কোনদিন,
তবু ধরা যাক আজ রোববার
ধরে নিলাম আজকে রোববার, ধরা যাক আজ রোববার।'

এই গানে সব থেকে জরুরি কথাটুকু হলো ঐ 'ধরা যাক'। প্রতিশ্রুতি যেখানে প্রেম আর প্রতিরোধকে মিলিয়ে দ্যায় সেখানে সে এক বিশুদ্ধ হাইপোথিসিস হয়ে ওঠে। অসম্ভব হলেও ওই অসম্ভবকে আহ্বান করা যায়। বিপ্লব যতই অসম্ভব মনে হোক, আজন্ম একাকীর কাছে প্রেম যতই দুরূহ মনে হোক, গাণিতিকভাবে 'ধরে নেবার' মধ্যে দিয়ে সত্যিই সেই প্রতিশ্রুতিকে ধরে নেওয়া যায়, ধরে রাখা যায়।

সুমনের গানের এই আহ্বান 'আমি' থেকে 'তুমি', এক থেকে দুই হয়ে বহুর দিকে এগিয়ে যায় রাজনীতি আর প্রেমকে দুপাশে রেখে। ফরাসী দার্শনিক এল্যান বাদিউর কাছে এটাই হলো প্রেমের গতিপথ: এক থেকে দুই হয়ে প্রেম তার জগতের সম্ভাব্য অসীমত্বের দিকে যাত্রা করে। একজন মানুষের সাথে যখন আরেকজন মানুষের সহসা সাক্ষাৎ হয় তখন ব্যক্তি-এককের উর্দ্ধে দুজনের বিনিময়ের এক জগৎ তৈরী হয় যা ক্রমশ একার সীমানা অতিক্রম করে অনন্ত অসীমের দিকে চলে যায়। সুমনও এইভাবে তাঁর  দর্শকদের অনেক অনেক নয়নতারা দেখে নিতে চান অনুষ্ঠান চলাকালীন অডিটোরিয়ামের আলো জ্বালানোর আহ্বান করে। প্রেম এখানে প্রতিস্পর্ধী হয়ে ওঠার সাহস রাখে, ব্যক্তিস্বার্থের ওপরে অসীমের আকাশে মানবসমষ্টিকে তুলে ধরতে চায়। সুমনের গানের এই ডাক বন্ধুতার আদলে রাজনৈতিক পরিসরের শিকড়টিকে ধরে রাখে তার প্রতিশ্রুতির বলিষ্ঠতায়। এই বন্ধুতার মাধ্যমে প্রেম আর রাজনীতির চুম্বন সম্পন্ন হয়। এরিস্টটল তাঁর Nichomachean Ethics গ্রন্থে এই বন্ধুতাকেই রাজনীতির সমষ্টিবদ্ধতার প্রথম শর্ত হিসেবে চিন্হিত করেছিলেন:

'In that case, he needs to be concurrently perceiving his friend- that he exists, too- and this will come about in their living together, conversing and sharing their talk and thoughts; for this is what would seem to be meant by "living together" where human beings are concerned, not feeding in the same location as grazing animals [...] For friendship is community, and as we are in relation to ourselves, so we are in relation to a friend [...]'.


 এরিস্টটল এখানে অনেক পশুর একসাথে বিচরণ করার থেকে মানব কমিউনকে আলাদা করেছেন যে সক্রিয়তার মাধ্যমে তার আকর হলো বন্ধুতা। এই বন্ধুতা একাধারে প্রেম ও রাজনীতির আহ্বানে পুষ্ট আর সুমনের গানে 'তুমি'র প্রতি নিয়ত নির্দেশ এভাবে ভালোবাসাকে তার প্রতিস্পর্ধী সম্ভাবনার সাথে যুক্ত করে দ্যায়।


পানশালার মনোলগ

দুপুরের পানশালা। চড়া রোদ বাইরে। মদের থেকেও বেশি রোদের জন্য ভেতরে ঢুকলো হিমাংশু। উইকএন্ডের দুপুর।পানশালায় ভাঁটা। ফাউন্টেন থেকে একটা বিয়ার নিয়ে কোণের ফাঁকা সিঙ্গল টেবিলে গিয়ে বসলো। নীথর শহরতলীর দুপুরে ভেতর-বাইরে এক হয়ে রয়েছে। একদিকের দেওয়াল-টিভিতে ক্রিকেট—অ্যাশেজ সিরিজ, আর অন্যদিকে হর্স রেস ঘিরে কয়েকজন বৃদ্ধের জটলা। অদূরের টেবিলে দুটি মেয়ে কথা বলতে বলতে বিয়ারে চুমুক দিচ্ছে। হিমাংশুর দিকে পিঠ করে যে মেয়েটি বসে আছে তার মুখ দেখতে না পেলেও বাঁ পায়ের হাঁটু অব্দি উঠে আসা কালো চকচকে লং-বুট হাতের সাথে তাল ঠুকে ওঠানামা করছে, কখনো হাঁটুর ঠিক নিচে, কখনো আবার গোড়ালির কাছাকাছি ভাঁজ হয়ে যাচ্ছে। হিমাংশু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে, কিম্বা দেখতে। মেয়েটির সব কথা তার লং-বুটের সরব ভাঁজগুলোর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। কথাগুলো বুজে আসছে ভাঁজ-শব্দে। হিমাংশু বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে টেবিলে রাখা সিডনী মর্নিং হেরাল্ডে চোখ দিলো। সংবাদ-শব্দ সরব হয়ে উঠতে লাগলো। মগজে তার দৃশ্যের মৌচাক।
গোটা কাগজ জুড়ে ইউরোপের রিফিউজি ক্রাইসিস নিয়ে রিপোর্ট। সিরিয়া এবং মধ্য প্রাচ্যের নানা দেশ থেকে কাতারে কাতারে লোক জার্মানীতে ঢুকছে। তাদের হাসি-কান্নায় ভাঙা মুখ, কোলে বাচ্চা, খুলে রাখা জুমড চটি জোড়ার ছবি। টার্কির ৩ বছরের আয়্লানের বালিতে গুঁজে থাকা নীথর মুখ। এই ছবিটা শেষ দু-তিনদিন ধরে অনবরত সোশাল মিডিয়ায় ট্রল করছে, দেখেছে হিমাংশু। না, সে শেয়ার করেনি, কোথাও বেঁধেছে, কোথায়, কি, তা ঠিক করে বলা মুশকিল। ফেসবুক টুইটারের এই অবাধ মৃত্যু-মৃত্যু খেলায় এবং জ্ঞান আর নৈতিকতার লড়াইয়ে সচরাচর ঢুকতে ইচ্ছে করে না ওর। পছন্দগুলো ‘লাইক’ হয়ে গেছে, সারাদিন আকাশ থেকে খসে খসে পড়ছে। টার্কির ৩ বছরের শিশু মৃত্যুর বোট থেকে ফটোগ্রাফের আগ্রাসী দৃষ্টির বোটে উঠে সোশাল মিডিয়ার দেওয়ালে দেওয়ালে অনুকম্পা আর বাণীবাণ হয়ে উঠেছে। আয়্লান কি ভাবছে এই সব ট্রলিং নিয়ে? সমুদ্রে কি ট্রলার চলছে এখনো? তার বাবা কি এখনো মরে যাবার কথা বলছেন ইন্টারভিউয়ে? হিমাংশু পাতা উল্টে এগিয়ে চলে। শেষ ক'দিন ধরে অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া তোলপাড় রিফিউজি ইনটেক নিয়ে। 
বর্তমান সরকার লিবারালদের। বছরখানেক ধরেই টনি অ্যাবটের তথাকথিত 'বোট পলিসি' নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে।

নো পেপার্স? টার্ন ব্যাক দ্যা বোটস! নো পেপার্স, দেন ইউ কান্ট লিভ হিয়ার!
এইসব পোস্টারে ছেয়ে গেছে সিডনী। হিমাংশু এখানে গবেষক। কিন্তু তা বলে কি সে রিফিউজি নয়? তার পেপার্স আছে বটে, তাও ‘অস্ট্রেলিয়া ফর অস্ট্রেলিয়ানস’ জাতীয় আন্দোলনে যখন শহর মেতে ওঠে আর একই মিছিলের পাশাপাশি চলে প্রতি-মিছিল, টিভিতে সেইসব দৃশ্য দেখতে দেখতে সব কেমন গুলিয়ে যায় হিমাংশুর। কোনটা মাল্টিকালচারালিজম আর কোনটা রেসিজম ঠিক ঠাহর হয় না। সবই কেমন টোকেন টোকেন শোনায়, এই কঠিন-সহজ সিনিসিজমের দিনকালে। থিসিসের মাঝে মাঝে হাল্কা হতে কাছের এই পানশালায় চলে আসে। সেদিন তার বন্ধু তাকে ভয় দেখাচ্ছিল, বলছিল, তার মাপমত হাঁটা দরকার। ২২-২৪ ঘন্টা টানা গেম খেলতে খেলতে এক গেমার বালক নাকি ডিপ ভেইন থ্রম্বসিসে মারা গেছে। হিমাংশু প্রম্পটলি বলে উঠেছিলো, 'হ্যা, আমিও যাবো, তবে থ্রম্বসিসে নয়, থ্রম্বথিসিসে!' কলেবরে বাড়তে থাকা ওয়ার্ড ডকের ভার্চুয়াল পাতা নিয়ে কামড়াকামড়ি চালিয়ে যাবার ফাঁকে এই দুপুর-রাতের পানশালা কমার্শিয়াল ব্রেক এনে দেয়। তার কাছে পার্সোনাল হলেও পানশালায় কমার্শিয়াল। থিসিসে রক্তপাত হয়, রক্তপাতেও আনন্দ হয়। আইসিসের পারভার্শনের মতই কি?
কাগজ থেকে চোখ তুলে তাকায় হিমাংশু। ইংল্যান্ডের একটা উইকেট পড়লো। কয়েকজন প্রৌড়ের কলরব আর বিয়ার মাগের ঠোকাঠুকি। তার কাছের দেওয়াল-টিভিতে পার্লামেন্টের সেশন, লাইভ ফ্রম ক্যানবেরা। লেবার আর লিবারালদের মধ্যে জোর বিতর্ক হচ্ছে পার্লামেন্টে রিফিউজি ক্রাইসিস নিয়ে ওপেন ডিবেট করা উচিৎ কিনা তা-ই নিয়ে। ইহারে কয় বিতর্ক নিয়ে বিতর্ক। হিমাংশু বিয়ারে সিপ নিয়ে ফলো করে যায়। আরো বেশি সংখ্যক রিফিউজি নেওয়া উচিত অস্ট্রেলিয়ার, 'হিউমানিটারিয়ান ক্রাইসিস' ‘আইসিস’, ‘রেসপন্স’--এইসব শব্দ লোফালুফি চলছিলো। গণতন্ত্রের রিয়ালিটি শো। কাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে প্রবেশের? খ্রীস্টান নাকি মুসলিম? ধর্মের নিরিখে কি বর্ডার পেরোবার পাসপোর্ট মিলবে? সিরিয়ায় যুদ্ধ করতে কেন সৈনিক পাঠিয়েছিলো অস্ট্রেলিয়া? প্রশ্নগুলো কঠিন আর উত্তরও তো অজানা। হিমাংশু চোখ তুলে তাকালো। পাশাপাশি অনেকগুলো বাদামী ঘোড়া একে একে হার্ডল ক্রস করে চলেছে। কে জিতবে? কার ওপর বাজি রয়েছে? এরা কোন দেশের নাগরিক? হিমাংশু খবরের কাগজে চোখ ফেরালো। মাথার ভেতর মনোলগ চলতে থাকলো। নিসঙ্গতায় ডায়ালগ না থাকলে মনোলগই যেন বল-ভরসা।
অস্ট্রেলিয়ান টেলিভিশনে দেখা একটা বিজ্ঞাপন মনে পড়লো হিমাংশুর। একটা লোক গলায় বোর্ড ঝুলিয়ে টাউন হলের সামনে দাঁড়িয়ে। তাতে লেখা: “ফাক রিফিউজিস”। একের পর এক লোক বোর্ড পড়ে লোকটাকে গাল দিচ্ছে, শেষে একজন মারধোর করতে তেড়ে আসছে। কাট টু টাউন হল। লোকটা। এবার গলার বোর্ডে লেখা “ হেল্প রিফিউজিস। ডোনেট।” কেউ কোনো উচ্চবাচ্চ না করে পাশ কাটিয়ে চলে যাচ্ছে। UN এ কূটনীতির মুনাফা না মানবতাবাদের দোহাই? নাকি দুটোই নাকি কোনটাই না? কেন ইনটেক? কেনই বা টার্ন ব্যাক? সব গুলিয়ে গেলো হিমাংশুর। অদূরে টেবিলটায় মেয়েদুটো উঠে দাঁড়ালো। হিমাংশু লং-বুটজোড়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। শব্দ উত্পাদন করতে করতে ভাঁজে ভাঁজে বেরিয়ে গেলো ওরা। 

হিমাংশু দুনম্বর বিয়ার নিয়ে নিজের টেবিলে ফিরে এলো। ডানহাতের দেওয়ালে একটা ইনফিনিটির সাইন। লাইন ড্রয়িং অফ এ মেজ। ভার্টিকাল এইটের দুটো গোলাকার অংশ জুড়ে অসংখ্য জটিল পথ পথান্তর। কোন পথে কোথায় পৌঁছনো যাবে হলফ করে বলা মুশকিল। কোথায় বাধা আসবে, থেমে যেতে হবে, অপেক্ষা করতে হবে অনুপ্রবেশের—জানা নেই। কিন্তু এইটের মাঝামাঝি যেখানে ওপর নিচের দুটো শূন্য একে অপরকে ক্রস করেছে, সেখানে সাদা পাতার ওপর একটা ছোট্ট মাকড়সা বসে রয়েছে। প্রথমে বুঝতে পারেনি হিমাংশু। তারপর একটু কাছে গিয়ে বুঝলো, না মাকড়সাটা আর্ট-ওয়ার্ক বা ড্রয়িং নয়। সেটা জ্যান্ত, ঠায়, ইনফিনিট এইটের মাঝখানে। আগামীর পথ খুঁজছে। সে কোন শূন্যের নাগরিক? তাকেও কি ইনটেকের কথা ভাবতে হয়? হিমাংশুর সব কেমন গুলিয়ে ঘেঁটে যায়। তাড়াতাড়ি করে বিয়ারটা শেষ করে টেবিল থেকে উঠে শেষবার তাকালে দেখে মাকড়সাটা আর নেই গোলকধাঁধার কোথাও। সে কি আদৌ ছিলো ওখানে? তার কি দরকার হয়েছিলো ওখানে থাকার? হিমাংশু পানশালা থেকে বেরিয়ে এলো রাস্তায়। ১০ মিনিটের হাঁটা পথ অফিস। আবার থিসিস থেকে থ্রম্বথিসিস। রক্তপতন আর সমাপতন। বালিতে মুখ বসে গেছে তার। আলতো ঠোঁটে বালিতে গর্ত করে একটা একটা করে শব্দ সেঁধিয়ে দিচ্ছে মাটির গভীরে। বালির ওপর আর দাঁড়াবে না পাদুটো। ঢেউগুলো পিছিয়ে পিছিয়ে সমুদ্রের বুকে ফিরে গেলে দাঁড়িয়ে থাকা পায়ের আশপাশে এরকম গর্ত উঁকি মারে। পায়েরা ঢুকে যায় গর্তে। গোটা শরীর একটু টলমল করে ওঠে তখন। এখন দেবে যাওয়া বালির মধ্যে দাঁড়ানো শরীরের গল্প শেষ হয়েছে। মুখের ভেতর আজকাল বালির গন্ধ পাওয়া যায়।



রুখসত

আশির কোঠায় পৌঁছোবার পর যখন আশেপাশের অনেককিছু ফিকে হয়ে আসে, দিন-রাত গুলিয়ে যায়, তখনো দূরে ছোট ছোট কয়েকটা আলো স্পষ্ট হয়ে থাকে। কিসের আলো? তা কি আর স্পষ্ট করে বোঝা যায়? মনে হয় ঐসব স্পষ্ট অস্পষ্ট আলো মৃত্যুর কাছে এক পশলা বৃষ্টি চেয়ে হাপিত্যেশ করে বসে আছে।

--"বশির মিঞা, কি হালত বলো দেখি? বৃষ্টি তো থামছেই না। হয়ে যাচ্ছে, হয়েই যাচ্ছে।"

--"তোমরা তো আর কলকাতায় বন্যা দেখোনি, তাই বলছো। সাতের দশকের শেষের পালা। কি বারিশ কি বারিশ! আমি তখন সবে চল্লিশ পেরিয়েছি। যেদিন আকাশ জওয়াব দিয়ে দিল, তার আগের রাতে আম্মার ইন্তেকাল। এতো পানি, এতো পানি, গোর দিতে যাওয়ার উপায় নেই, ইয়া আল্লাহ!" 
দূরের আলোগুলো একে অপরের সঙ্গে জুড়ে গিয়ে অক্ষর তৈরী করছিল। নিরঙ্কুশ অন্তরীক্ষ। নক্ষত্রের অক্ষরমালা আলোয় আলোয় একাকার। সময় চলে গেছে আট আটখান দশকের পার।  যেখানে জোড় ছিল না, সেখানেও আলো জুড়ে যাচ্ছে আর যেখানে জোড়ার কথা দেওয়া ছিল সেখানে অন্ধকার ঘিরে।  

--"আম্মাকে রুখসত করলেন কি করে?"

--"ইন্তেজার। সব শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও ইন্তেজার শেষ হয়না। বারিশ তখন নিজের এক শহর গড়েছে কলকাতায়। বুঝলে জনাব! বাড়ির ভেতর আম্মার শরীর। শক্ত হচ্ছে। শরীরে পানি জমছে। পানি। বাইরে ঝরছে, ভেতরে জমছে।"

--"তারপর?"

আলোগুলো সরতে শুরু করেছে। একে অপরের থেকে দূরে। অজ্ঞাত কোন কারণে ওদের চলে যেতে হচ্ছে। কেউ কি ওদের শাসিয়েছে? চলে যেতে বলেছে? প্রায় এক শতকের বসত ছেড়ে চাপা অভিমান নিয়ে শহর ছাড়ছে মৃদুমন্দ দহনআলো।
বশির মিঞার নামাজ শেষ। টুপিটা উল্টানো। যেন হাঁ করে তাকিয়ে আছে। তার ভেতর একটা পুরোনো কার্ড। খুললে দেখা যাবে, কলকাতা মেডিকেল কলেজ ওয়ার্ড মাস্টারের আইডি কার্ড। মিঞাকে চেনাই যাচ্ছে না। কম করে চল্লিশ বছর আগের ছবি। মুখে তখনো তেমন একটা বয়েসের ছাপ পড়েনি।

৭৮ এর বন্যায় মিঞার বাড়ির সবাই মারা যায়। তিন দিন মেডিকেল কলেজ থেকে বেরোতে পারেননি বশির। একের পর এক রোগী আসছিল। সামলানো যাচ্ছিলো না। বেড ভর্তি হয়ে মানুষ তখন হাসপাতালের মেঝেতে। ফোনলাইন কাজ করছিল না। তিনদিন পর ঘরে ফিরে দেখেন, ঘর, বিবি, বেটিজান--কেউ নেই। একমাত্র কার্ডটা রয়ে গেছে। সেবছরই নতুন করে করানো। এ শহর অনেক কিছু ভুলে যায়। তাই অনেককে চলে যেতে বলে। বশির মিঞার নামাজ শেষ। আশেপাশের সবকিছু ফিকে হয়ে গেছে।





অর্ক চট্টোপাধ্যায়
Arka Chattopadhyay

Comments

Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS