Jyotirmoy Shishu

Jyotirmoy Shishu

Shreya Thakur


অর্জুন – ১

বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে নামার সময় কেমন যেন একটা ডিমের কুসুমের মত রঙ হয়।সকালে বিশুদার চায়ের দোকানের ডিমের পোচের মত। ডিমের পোচকে আবার সানি সাইড আপ বলে নাকি!
আজকে রাইটিং এক্সারসাইজ প্র্যাক্টিস করবো ভাবতে ভাবতে জানলা থেকে সরে এলাম। ভয়ানক গরম পড়েছে, এই গরমে বিয়ার খেলে ভাল্লাগবে। হেনিকেন ছাড়া আমার আবার মুখে রোচে না কিছু। স্বাতীদি বলে বড়লোকের বেটি! বলুকগে, হেনিকেনের রংটা ঠিক অর্জুনের চোখের মত ভাবতে ভাবতে ঢক করে মেরে দিতে মন্দ লাগেনা কখনোই।
বিয়ার বলতে মনে এলো, আজ আলু ছাড়া ঘরে কিছু নেই। চাল, আছে হয়ত, দু একটা পেঁয়াজ, শুঁটকো আদা, এক মুঠো ডাল খুঁজে পেলে চালে ডালে বেশ...
এই মরা বিকেলের আলো বড় আলস্যি ধরায়।
ডিমের কুসুম রংটা ময়লা হয়ে এসেছে। এখন গলি দিয়ে রুপা কাকিমার প্রেমিকের বাইক বেরিয়ে যাবে। সে যাক,কিন্তু জান্তব গর্জন, বাইকের, প্রাগইতিহাসিক, মানিক বন্দ্যো সব মাথার মধ্যে জট পাকিয়ে যাচ্ছে তখন দেখি গেটের ল্যাচ কি টা খুলে তিনি ঢুকলেন।
চমকে গেলাম, একটু আগে বিয়ারে তার চোখের রঙ মিশিয়ে মনে মনে চুমুক দিচ্ছিলাম, আসলে সামনে এলেই দেখতে পাব চোখ দুটো মিশমিশে।
নাক লাল দেখছি দূর থেকে, ঠান্ডা লাগিয়েছে মনে হয়। থাক তাহলে আজ চুমু খেতে দেওয়া যাবে না। ইনফ্লুয়েঞ্জা ব্যাপারটা আমার এক্কেবারে পোষায় না।
নুড়ি বিছানো পথে পায়ের আওয়াজ হচ্ছে, হালকা সবুজ জামা, জিন্স, পায়ে কিটো। হাতে একটা কি যেন নিয়ে আসছে চটের ব্যাগে করে। সবুজ সবুজ মুখ তুলে উঁকি মারছে... দেখেছ! গাছ নিয়ে আসছে নাকি!
কাছাকাছি হতেই জিগ্যেস করলাম,
-"ওটা আবার কি?"
-"ভালো পুঁইশাক পেয়ে গেলাম তোমাদের বাজারে, সঙ্গে একটু চিংড়ি এনেছি। চচ্চরি খাই না বহুকাল। ভাবলাম তুমি যদি বানিয়ে দাও।"
-"রাত্রিবেলা পুঁই চচ্চরি খাবেন?"
-"হোক রাত্রি, ইচ্ছেটাই আসল।"
পাগল কতরকমের! বলা নেই কওয়া নেই হুট হাট চলে এসে এরকম আবদার! অর্জুনের এই স্বভাবটাই...
হেসে হাত বাড়ালাম, "দিন।"
-"দাঁড়াও,আরেকটা জিনিষ।"
ব্যাগ থেকে বেরোলো খবরের কাগজে মোড়া ছোট্ট টব। কচি কচি পাতা উঁকি মারছে কাগজ পেরিয়ে। দু তিনটে লাল ফুল।
-"কি গাছ বলোতো?"
-"রঙ্গন!! আপনি কি করে..."
হাসল। বেশ সুন্দর দাঁতের পাটি। তারপর বলল, "বাইরেই দাঁড় করিয়ে রাখবে সোহিনী?"
-"এবাবা, না না, আসুন।"
বারান্দায় জুতো ছেড়ে অতঃপর ঘর। ঘর আর কি, একটা পুঁচকি আউট হাউস। একফালি খাট জানলার পাশে। ছোট্ট টেবিল আর চেয়ার। তাঁর আবার খাটে গিয়ে বসা চাই ধুলো পায়ে। সে বসুক, ঝেড়ে নেব পরে।
-"ঠান্ডা লাগিয়েছেন দেখছি!"
-"ঐ একটু..."
-"দাঁড়ান আদা দিয়ে চা করে আনি!"
-"অত ব্যস্ত হওয়ার কি আছে সোহিনী।"
-"উফ, একটু খানি সময় লাগবে, দাঁড়ান না আপনি..."
ছুট্টে পাশের খুপরি রান্না ঘরে গিয়ে ব্যস্ত হয়ে চা বানানোর প্রস্তুতি নিচ্ছি। আসলে চা নয়, এখন ও ঘরে না যাওয়াই ভালো। আমার যে বুকের মধ্যে ভয়ানক আনন্দ হচ্ছে, উথাল পাতাল। একটু সামলে নিই।
সামলানো আর চা বানানো এক সময় শেষ হলো। যত্ন করে নতুন কেনা কফি মগটা পাশের ঘরে নিয়ে গিয়ে দেখি...
জানলা দিয়ে ঝিরঝির করে সন্ধ্যের হাওয়া আসছে, টেবিলের ওপরের রঙ্গন তখন কাগজ মুক্ত, মাথা দোলাচ্ছে তালে তালে। সামনের দরজাটা খোলা। অর্জুন চলে গেছে, কিন্তু, আমি জানি, আবার আসবে সে।



অর্জুন - ২

নির্মাল্যর ছাদে আজ সান্ধ্য আড্ডার প্ল্যান জেনে মন খুশ হয়ে গেলো। ওর ছাদটা ঘ্যামা।বেশ বড়, আর হাওয়া ধার করে নিয়ে আসে চারপাশ থেকে। সামনের পাঁচিল থেকে উঁকি মারলে ছোট্ট একটা পুকুর মত দেখা যায়, আর ক্লাইভ হাউসের গল্প। দমদমের মত ঘিঞ্জি জায়গায় অমন ছাদ, আহা, শীতের দুপুরে লেপে ঢুকে যাওয়ার আনন্দ আড্ডায়। তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে রাজস্থানি স্লিপারটা ছিঁড়ে ফেলেছি, এখন মুচি পাওয়া যাবে না। এক হাতে জুতো তুলে নিয়ে লেংচে লেংচে হাঁটছি, কোনো মানে হয়! সব আমার অসাবধানতা! নির্মাল্যদের গেটের সামনে পৌঁছে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলা গেল। জুতো জোড়া আজ রাতের মত ভুলে গেলেও হবে।কিন্তু বিধি বাম, সিঁড়িতে পা রেখেছি, দেখি হুড়মুড় করে অলকা নেমে এল। চুড়া করে চুল বাঁধা, হাতে খুন্তি।
-"এই ভাই এসেছিস, জলদি চার প্যাকেট সিগারেট কিনে আন!"
-"কি হলো!" আমি তো অবাক!
-"ল্যাদখোর গুলো একটাও নড়ছে না, এদিকে সিগারেট শেষ, ভাগ্যি তুই এখনই ঢুকলি।"
-"তুই কি রান্না করছিস নাকি!"
-"মদের চাট। তুই যা না, এই নে টাকা।"
বোঝো, জুতোর কথা বলার আগেই অলকা হাওয়া হয়ে গেল।
অগত্যা খালি পায়ে আবার অবতরণ। রাস্তার উল্টোদিক থেকে চারটে সিল্ক কাট আর স্পেশালের প্যাকেট কিনে সবে নির্মাল্যদের বাড়ির দিকে ফিরেছি, দেখি অর্জুন! গেট ঠেলে ওদের বাড়িতে ঢুকে গেল। আরে! ভারি মজা তো! এও কি নির্মাল্যর চেনা নাকি!
তাড়াতাড়ি রাস্তা ক্রশ করে সঙ্গ নিতে যাব, বেয়াক্কেলে একটা চারচাকা সামনে পড়ে গেল।
সবকিছু মেনে নিয়ে যখন ছাদের চৌকাঠ পার করলাম, দেখি তিনি আয়েস করে ছাদের পাঁচিলে ঠেসান দিয়ে বসে গান গাইছেন... মহিনের ঘোড়াগুলি।
সিগারেটের প্যাকেট যথাস্থানে চালান করে একটু পাশের দিকে বসলাম।
চোখ বুজে গান চলছিলো,কিভাবে যেন টের পেয়ে গেল। চোখ খুলে সোজাসুজি তাকিয়ে বলল, "চলো সোহিনী ক্লাইভ হাউস দেখে আসি।"
নির্মাল্য মন দিয়ে বিয়ারের বোতল গুণে গুণে বের করছিলো, অন্যমনস্ক ভাবেই বলল, "এখন গিয়ে কোনো মজা নেই, আরেকটু রাত না হলে..."
আমি তাড়াতাড়ি বলে উঠলাম, "যাই না, এখনো তো অন্যরকম লাগতে পারে।"
নির্মাল্য মুখ তুলে ওর পেটেন্ট হারামি হাসি দিয়ে বলল, "হ্যাঁ তো যা না! মানা করেছি?"
উঠে পড়লাম দুজনে, তারপর খেয়াল হলো, জুতো! আমার আবার এমন বেয়াদব পায়ের সাইজ, সকলের জুতো হয়ই না। কুছ পরোয়া নেই, খালি পায়েই হাঁটবো। দেখলাম অর্জুনও জুতো না পরেই বেরোলো।
দমদমে নির্মাল্যদের পাড়াটা একটেরে, অত ঘিঞ্জি নয় আগেই বলেছি। হাঁটছি দুজনে, চুপচাপ, সন্ধ্যে বলে গরমও কম। একটুক্ষণ পরে অর্জুন বলল,"তুমি সংস্কৃতের টিচার হবে সোহিনী?"
বলে কি পাগলটা! ক্লাস এইটে রেজাল্ট খারাপ হয়েছিলো এই কালান্তক সংস্কৃতের জন্য! উত্তর দিলাম না। আবার চুপচাপ।
-"ভাষাটা মরে গেছে জানোতো। পচা গন্ধ পাই এখন হাওয়ায়।"
-"আমরা সংস্কৃতে কথা বলি না বহুকাল মনে হয়।" রাগ হচ্ছে আমার, এই সুন্দর সন্ধ্যেবেলায় আবোল তাবোল বকছে।
-"সেটা কথা নয়, কথা বলা আমরা অন্য অন্য ভাবে করি। এই যে তুমি আজকাল মুজতবা আলীর মত কথা বলছো..."
-"আর আপনি কমলকুমার হওয়ার ব্যর্থ চেষ্টা করছেন!"
উদাত্ত কন্ঠে হেসে উঠলো অর্জুন,এই হাসিটার সময় গজ দাঁত দেখা যায়। ভয়ানক চুমু খেতে ইচ্ছে হলো আমার। তারপর হাত বাড়িয়ে বলল, "চলো..."
সন্ধ্যেয় চুঁইয়ে নামছে রাত্রি, একটা রিকশা চলে গেল হর্ন বাজিয়ে, দুটো মানুষ খালিপায়ে হাঁটছে অল্প চুপচাপ রাস্তা দিয়ে।







মহাজাগতিক

In the world of mediocrity, geniuses suffer from crisis….

গত দুদিন ধরে সম্পূর্ণ স্পেস প্রিজনটা ঘুরে দেখেছে অর্জুন, মোলায়েম দিনযাপনের ব্যবস্থা, আর একাকীত্ব, নিঃসীম শূন্যতা, শব্দহীন ও বটে। এই খানেই আগামী বছর দশেক তাকে কাটাতে হবে, চিত্তশুদ্ধি বা শাস্তি, যাই বলা হোক না কেন এই ব্যবস্থাকে, মুক্তি নেই, মুক্তি চাওয়ার উপায়ও নেই। দূরের কোনো স্পেসশিপ থেকে প্রিজনটা দেখলে মনে হবে একটা অতিকায় স্বচ্ছ বুদ্বুদ ভেসে চলেছে মসৃণ সর্পিল গতিতে, আরো একটু খুঁটিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, ওই অতিকায় বুদ্বুদ আসলে ধারণ করে আছে একটা মানুষের শাস্তি স্বরূপ খাঁ খাঁ শূন্যতা। তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর মানুষ আস্তে আস্তে প্যানজিয়া আর কালচারাল মেল্টিং পটের ধারনায় বিশ্বাস করতে শুরু করে। আমেরিকা আর চিনের তীব্র ধংসাত্মক মনোভাব মানুষকে স্তব্ধ করে দিয়েছিলো, তাই যুদ্ধের শেষে নিজে থেকেই জেন ধর্মমতের অহিংসা জখম পে মরহামের মত ছড়িয়ে পড়ে সমগ্র গ্লোবাল ভিলেজের কনসেপ্টে। আর তার সর্বপ্রথম প্রভাব এসে পড়ে ক্যাপিটাল এবং কর্পোরাল পানিশমেন্টে। যা আজ অর্জুনকে ভোগ করতে হচ্ছে। আওয়ার আর্থের প্রাথমিক কতগুলো কাজের মধ্যে এটাই ছিলো অন্যতম, অপরাধী কে শাস্তি দাও এমনভাবে যেন তা সহিংস না হয়, হিংসা না ছড়ায়। বরং তাকে আত্মশুদ্ধির সুযোগ দাও, সময় দাও অনুতাপের। তাই জন্যেই স্পেস প্রিজনের অবতারণা, এবং আয়রনি এটাই, যিনি এর প্ল্যানার ছিলেন তাকেও শেষ জীবনটা কাটাতে হচ্ছে এমনই কোনো স্পেস প্রিজনে, সৃষ্টি তার স্রষ্টাকে গ্রাস করে নিয়েছে। মুখ বিকৃত হয়ে ওঠে অর্জুনের, অনুতাপের সময় দাও, নাকি তার জীবনের কিছু অমূল্য সময় কেড়ে নাও, বন্ধ করে দাও সলিটারি কনফাইনমেন্টে, প্রতি মুহূর্তে, প্রতি পলে একাকীত্বর যন্ত্রণায় তার পায়ের নখ থেকে মাথার চুল পর্যন্ত অপরাধ বোধে পাগল করে রাখো! ইতিহাসের অধ্যাপক ছিলো অর্জুন, ছিলো না, এখনো আছে, শুধু ছাত্র নেই, ক্লাস নেই, সেমিনার নেই। ডুকরে কেঁদে উঠতে গিয়েও সামলে নেয় সে, জল খায়, তারপর আবার ঝিমিয়ে যায়। গত দুদিন তবু কিছু করার ছিলো, দেখার ছিলো, কৌতূহল। এখন তাও নেই, শুধু পাথুরে সময়। স্বচ্ছ বিশেষ পলিমার দিয়ে তৈরি প্রিজনটার দুটো লেয়ার আছে, একটা ইনার লেয়ার, যার মধ্যে সে বন্দি, আরেকটা আউটার লেয়ার, যার বাইরে অনন্ত মহাকাশ। ইনার লেয়ারের একদিকের দেওয়াল জুড়ে বই রাখা, তার পছন্দসই বিষয়ের। সে তো হবেই, অ্যারেস্ট হওয়ার পর রীতিমত তার কাউন্সেলিংও হয়েছে, তখনই সমস্ত বিষয় আর্থ হিউমান প্রোটেকশান জেনে নিয়েছে। এখন চারদিকে শুধু  বই, ভিসুয়াল, নোটপ্যাড... কিন্তু ইচ্ছে করছে না! স্পেস প্রিজনের দশটা বছর, মানে পৃথিবীতে পঞ্চাশ বছরের সমান, শর্বরী কি বিশ্বাস করবে তখনো, খুনটা ও ইচ্ছে করে করেনি। অপেক্ষা করবে তার জন্য। করবে না, কারণ আজ নয় কাল ওর মনে এটাই গেঁথে যাবে যে সে খুনি, সেইই খুনি। মুখ ফিরিয়ে নতুন করে ঘর বাঁধবে। যেদিন নিয়ে আসা হচ্ছিলো অর্জুনকে স্পেস প্রিজনের জন্য, শেষ দিন, শর্বরীর ডাগর চোখের অবিশ্বাস আর যন্ত্রণা তীরের মত বিদ্ধ করছিলো তাকে, করছে, করেই যাচ্ছে। আর থাকতে পারলো না অর্জুন, দুহাতে মুখ ঢেকে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, “শর্বরী, শর্বরীইই, বিশ্বাস করো, আমি শুধু মেয়েটাকে বাঁচাতে চেয়েছিলাম নরপশুর হাত থেকে।”

Trapped in a burning house, I think there is no way out…

ঠিক কতগুলো বছর বা মাস কেটেছে জানেনা সে, জানার ইচ্ছেটাই মরে গিয়েছে আসলে। এটুকু জানা আছে খালি, মহাকাশের হিসেবে ছয় মাস অন্তর অন্তর মেন স্পেস স্টেশান থেকে রসদ যোগান দিতে স্পেসশীপ আসে। তায় এসেছে মনে হয় বার চারেক, অথবা তার বেশি, প্রথম বারের পরই হিসেব রাখা ছেড়ে দিয়েছিলো। প্রথম বার যখন রকেট এলো, সে কি উত্তেজনা! নাসা যেবার স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ সর্বসাধারণের দেখার সুযোগ করে দিলো, তার তখন কতই বা বয়েস, বছর বারো, বাবার হাত ধরে গিয়েছিলো, তখন দেখেছিলো মানুষের উত্তেজনা। তেমনই সমস্ত উত্তেজনা যেন স্নায়ুকেন্দ্রে জমা হয়ে থির থির করে কাঁপছিল যখন স্পেসশীপটাকে এগিয়ে আসতে দেখেছিলো, মানুষের মুখ দেখবে কয়েক যুগ পর, আহ, কথা বলার একটা সুযোগ। অবতারণের পর একই রকম আশা টুকরো হয়ে গিয়েছিলো মানুষের পরিবর্তে মানুষ রূপী প্লাস্টিক আন্ড্রোয়েড রোবোট গুলো কে দেখে। হ্যাঁ আরটিফিসিয়াল ইন্টেলিজেন্সে তারাও কথা বলে, হাসে, রেস্পন্স করে, একদম মানুষের মত! কিন্তু এত্ত নিখুঁত, এত্ত প্লাস্টিক তাদের সাড়া দেওয়া, ঘেন্না করতো তার। শর্বরী এটা নিয়ে মস্করাও করেছে অনেকবার।
ধরো তোমার একটা আন্ড্রয়েড প্রেমিকা হলে কেমন হয়?
- কেন শর্বরী, এত সুন্দর একসাথে থাকা পোষাচ্ছে না তোমার?
- আহা ওরা কেমন সুন্দর, কিরকম মোলায়েম চেহারা, নিখুঁত… তাছাড়া তুমি যেমন চাও তেমন শুনবে কথা। আমার মত প্রতি ঘণ্টায় ঘণ্টায় রেগে যাবেনা। তোমার চকলেটের খরচও কমবে।
- চকলেটের খরচে আমি দেউলিয়া হয়ে যাচ্ছি এমন তো নয়, তাছাড়া আমার যে ভীষণ ভাবে মানুষী চাই। শরীরের ঘ্রাণ চাই। না মানুষী বলা ভুল হবে, আমার তোমার গন্ধ চাই।
তারপর শর্বরীর গলার মধ্যে মুখ গুঁজে দিতো সে। চুলের মধ্যে ইতস্তত আঙুলের খেলা টের পেতে পেতে শর্বরীর ফিসফিস করে বলা কথাগুলো কানে আসতো, “ওরা কিন্তু খারাপ না, অন্তত আমাদের থেকে অনেক ক্ষেত্রেই সৎ।”
ম্লান একটা হাসি ফুটে উঠলো অর্জুনের মুখে, হয়ত সেদিন ওই মেয়েটা আন্ড্রয়েড মানুষী হলে এগিয়ে আসতো, কে জানে, আসতো কি? প্রোগ্রামিং করা জীবন ওদের। কয়েকটা কোড চেঞ্জ করে দিলেই আর আসতো না। ইনেভিটেবেল ছিলো তার এই সলিটারি কনফাইনমেন্ট। মানুষকে পালটায় ক্ষমতা আর আন্ড্রয়েড মানুষ কে বদলায় মানুষের হাতে বানানো আর পরিবর্তিত কোডিং ডিকোডিং। মানসিকতা কোনোভাবেই পরিবর্তন সম্ভব কি, হয়েছে কি আদৌ?
মনের মধ্যে হাজার বার ইতিহাসের সমস্ত ঘটনা পাতা উল্টে দেখেছে সে, তার সাথে ঘটে যাওয়া ঘটনা একশ হাজার লক্ষ বার ঘটে গিয়েছে। মহাভারতের সময় থেকে এখনো পর্যন্ত। কতটা উন্নতি হয়েছে মানব সভ্যতার সাইকোলজিকালি? জেন ধর্মমত, অহিংসা, কিন্তু এখনো কেন এভাবে সত্যির নামে সত্যির অপব্যবহার হয়! তবুও সে মানুষ চায়, একটা মানুষ, একটু কথা বলতে চায় সে। আন্ড্রয়েড রোবোটদের এখনো সহ্য হয় না তার, তাদের প্রশ্নের উত্তরে হ্যাঁ বা না ছাড়া কিছু বলে না। মানুষের আশাতেই অপেক্ষা ছিলো প্রথম স্পেসসীপ আসার, জীবনের কৃপণ মুঠি সেটাও তাকে দিতে পারলো না। সেইদিন স্পেসশীপ চলে যাওয়ার পর অট্টহাসি হেসেছিলো সে, অনেকক্ষণ। তারপর নোটপ্যাডটা টেনে নিয়ে চিঠি লিখতে বসেছিলো, শর্বরী কে। মুক্তি পেলে এক যোগে ওকে দিয়ে আসবে, যেখানেই যার সাথে থাকুক ও।

Cigarettes After Sex…

কফিটা বড্ড ভালো দেয়। ঘুমভাঙ্গা জীভে গরম কফির স্বাদে প্রথম এইটাই মনে হলো।
- কফিটা দিব্যি বুঝলে, আরেক মাগ হবে নাকি?
- হলে তো মন্দ হয় না। তবে চিনি কম, আগের বার কিটকিটে হয়েছিলো।
- হুমম। আনছি
উঠে প্যান্ট্রি সেক্টরে যায় অর্জুন, পিছন পিছন তার অল্টার ইগোও এসে ঢোকে।
- তোমার থেকে আমি কফিটা বেটার বানাই।
- থাক হয়েছে হে! আর লোক হাসিও না।
- লোক কোথায়, শুধু আমি আর তুমি তো, সে না হয় তুমি আমার খরচে একটু হাসলেই।
- কথা শিখেছো বলে কথা বলাটা আজকাল বড্ড সহজ হয়ে গেছে তোমার সাথে, ভাল্লাগে।
- থীসিস টা শেষ করবে কবে? মানুষের ঐতিহাসিক মানসিক বিবর্তন না কি যেন ভাট!
- করবো, আলোচনা আছে তোমার সাথে।
দু মাগ কফি এনে রাখে অর্জুন সেন্টার টেবিলে, একবার এটা থেকে চুমুক দেয়, একবার ওটা থেকে। নিজের মত একটা মেক শিফট সঙ্গী বানিয়েছে সে। একবার সে কথা বলে, একবার তার হয়ে সে কথা বলে। নোটপ্যাড আর বই গুলো টেনে নেয়, থিতু হতে হবে, হবেই! সে জানেনা কত বছর কেটে গিয়েছে, সে জানেনা আর ঠিক কত বছর আর শাস্তির মেয়াদ বাকী। সে শুধু মানিয়ে নিতে চাইছে, বাঁচতে চায় সে, কে না চায়। শর্বরীকে মনে হয় এক যুগ আগের স্বপ্ন, যদিও তাকে লেখা চিঠি গুলো সে বাঁচিয়ে রেখেছে সযত্নে, হিডেন ফোল্ডারে। আর এখনো শরীর জেগে উঠলে শর্বরীর সাথে মানস সঙ্গম করে সে, তীব্র প্রেম আছে অন্তরলীন। এখন সে শুধু পড়ে, লেখে,  একা একা বকবক করে আর উদ্ভ্রান্তের মত মহাকাশের দিকে তাকিয়ে বসে থাকে। স্পেসশীপও আসেনা কতদিন, আসুক, তবু রোবোট গুলো কে দেখা হয়, শব্দ পাওয়া যায়, শব্দ। রেকর্ডেড শব্দ না, জান্তব, সদ্য সৃষ্ট। পাগল হয়ে যাবে সে, তীব্র পাগল, আত্মহত্যা করবে? কিন্তু কি লাভ! আবার বাঁচিয়ে তুলবে! উপরন্তু মনিটরড করে রাখবে! সে আরো ভয়ানক, সারাদিন কে যেন দেখছে তোমাকে। বিঁধছে তার চোখের দৃষ্টি, অথচ তুমি তাকে ছুঁতে পারো না, ক্ষমতা নেই। আজকেও তেমনি ভাবেই কেটে যেত, নোটপ্যাডে খানিক টাইপ করে শূন্য দৃষ্টিতে শূন্যের দিকে তাকিয়ে ছিলো সে, যখন হঠাত স্পেস শীপের কাঠামো টা চোখের সামনে স্পষ্ট হতে লাগলো। বুকটা ধক করে উঠলো তার, আরো একটা ছয় মাস অতিক্রান্ত, মেয়াদ কমে এলো আর একটু। ধীরে ধীরে স্পেসশীপ টা নেমে এলো নির্দিষ্ট টারম্যাকে। তারপর খুলে গেলো প্রিজনের এন্ট্রান্স।আর তাকে অবাক করে প্রবেশ করলো সেই অফিসার, প্রথম দিন এখানে আসার সময় যে এসেছিলো তার সাথে। কিন্তু সেদিনের সে ঝকঝকে বছর সাতাশের সঙ্গে এখনকার মধ্যবয়স্ক ভারী গড়নের মানুষ টার মিল শুধু হাসিতে আর চোখের চাহনিতে। এবং অবশ্যই গলার স্বরে, যেটা মুখ খোলার পর অর্জুন বুঝতে পারলো। আপন মনে শীর্ণ গালে হাত বুলিয়ে ভাবল, তার ই তো কত পরিবর্তন হয়ে গিয়েছে। পৃথিবীর আলো বাতাস হাসি কান্নার একটা দাম তো দিতেই হয়। স্মিত মুখে হাসল অফিসার, তারপর নরম গলায় জিজ্ঞেস করলো,
- কেমন আছেন?
তিক্ত স্বাদ একটা মুখের মধ্যে ছড়িয়ে গেলেও মার্জিত ভাবে উত্তর দিলো সে, “যেমন দেখছেন।”
একটু নিস্প্রভ হলেও অফিসার চট জলদি সামলে নিলো, তারপর বলল “আপনার জন্য একটা সুখবর নিয়ে এলাম।”
- অন্ধের কি রাত্রি, কি ই বা দিন।
- এমন বলবেন না, আমাদের সার্ভে তে দেখা গিয়েছে যেকজন আছেন সলিটারি কনফাইনমেন্টে তাদের মধ্যে একমাত্র আপনিই সেরকম ভাবে কোনো ট্রাবল দেননি। অন্যরা তো নাভিশ্বাস তুলে দিয়েছিলো… যাকগে ছাড়ুন, আপনাকে আমরা মেয়াদের শেষ সময়টুকু একটা উপহার দেবো মনে করেছি।
- উপহার?!
- হুম, আমাদের একটু নিশ্চিন্ত রাখার জন্য।
উজ্জ্বল এক মুখ হেসে উত্তর দিলো অফিসার, বেশ সতেজ হাসি, তারপর আরেকজন আন্ড্রয়েড অফিসারের দিকে ফিরে বলল,
- জুলেখাকে পাঠিয়ে দাও।
অবাক হয়ে গেলো অর্জুন, জুলেখা আবার কে। কি হচ্ছে এসব, কিসের উপহার।
- অফিসার, আমি কিন্তু কিছু বুঝছি না…
অফিসার হাত তুলে তাকে থামিয়ে দেওয়ায় কথা শেষ করা গেলো না। ততক্ষণে জুলেখা নাম্নী বিস্ময় ঢুকে পড়েছে।
ঈষৎ শ্যামলী এক রমণী, আয়ত চোখ, সাদাসিধে বিনুনি বাঁধা, পরনে সাদা স্পেসস্যুট… ছন্দপতন শুধু ফিরোজা নীল চোখ। হতবাক অর্জুনের মুখের দিকে তাকিয়ে অফিসার বলল, “আপনার উপহার, মেয়াদের শেষ কদিন এ আপনাকে সঙ্গ দেবে। যেভাবে চান, ঠিক সেভাবেই। স্পেশালি প্রোগ্রামড আন্ড্রয়েড রোবট ফর স্পেস প্রিজন। ইচ্ছে মত অন বা অফ করার ব্যবস্থাও আছে। মেয়াদের তো বেশিদিন নেই আপনার, শুভেচ্ছা নতুন জীবন যাপনের।”
- শুনুন শুনুন, এসব কি, আরে… আমি একে নিয়ে কি করবো?
অর্জুনের প্রশ্নে কর্ণপাত না করে অফিসার দলবল নিয়ে বেরিয়ে গেল। সীল হয়ে গেলো এন্ট্রান্স আবার। মহাশূন্যের মাঝখানে শুধু রইলো স্থবির অর্জুন আর এক্সপ্রেশানলেস জুলেখা।

A thousand years…

কতক্ষণ এভাবে কেটেছে অর্জুন জানেনা, মাথাটা যেন এবার ফেটে যাবে, ক্লান্তি নেমে আসছে শিরায় ধমনীতে। সরে গেলো সে জুলেখার শরীর থেকে। ঘেন্না আর অবসাদ একসাথে মিশে গেলে কি তৈরি হয় জানা নেই তার, কিন্তু অনুভূতি ঠিক সেটাই। এই নিয়ে প্রতিবার, প্রবৃত্তি আর বিতৃষ্ণার লড়াইতে প্রবৃত্তি প্রথমে জিতলেও বিতৃষ্ণাই শেষ পর্যন্ত জিতে যায়। উঠে বসলো জুলেখা, “কি হলো?” কিছু না বলে জুলেখার দিকে তাকিয়ে রইলো অর্জুন, নিখুঁত গড়ন, ডাস্কি স্কিন, একরাশ এলো চুল পড়ে আছে পিঠের ওপর, গলায় একটা কালো তিল, আরো খুঁটিয়ে দেখলে কানের পিছনে আবছা অফ/অন করার কালো মুসুর ডাল সমান সুইচটাও দেখা যাবে... আর সবচেয়ে অসহ্য ফিরোজা নীল চোখ! সমস্ত কৃত্রিমতা ওখানে সঞ্চিত যেন! তেতো জলে মুখটা ভরে উঠল তার।
কিছু অসুবিধা হচ্ছে?” আবার জিগ্যেস করলো জুলেখা। চেহারার সাথে মানানসই ভরাট গলাও প্রোগ্রামিং করা হয়েছে।
কিছু না। আমার ভালো লাগছে না।” উঠে পরলো অর্জুনও। তারপর পোষাকটা কোনোরকমে জড়িয়ে প্যান্ট্রি সেক্টরে এলো। কফি বানাবে। শর্বরী প্রতিবার আদরের পর বিড়াল ছানার মত গুটি সুটি পাকিয়ে ঘুমোতো, আর সে কফি বানিয়ে একটা মুভি চালিয়ে পাশে আধশোয়া হয়ে… “সরুন, আমি করে দিচ্ছি।”
ভরাট গলাটা চিন্তায় ছেদ ফেলে দিলো।
- তোমাকে বলেছি না আমি না বললে আমাকে সাহায্য করার দরকার নেই।
আচ্ছা।” গলায় কি একটু বিদ্রোহর আভাস, নাকি অভিমানের। ধুর, ওসব মনের ভুল। সবই প্রোগ্রামিং এর খেলা, এই সমস্ত উন্নতি করে মানুষের মানসিক উন্নতি হচ্ছে কি, প্রযুক্তি আর মানসিক উন্নতি কি সম্পর্কিত। মার্ক্স কি বলেছিলেন, নীৎশে কি বলেছিলেন, এখন সেটা কতটা মানা হয়। কত বদলে গেছে পৃথিবীটা কে জানে!
কফি নিয়ে মেন সেক্টরে এসে বসলো সে। জুলেখাও পায়ে পায়ে এসেছে এই ঘরে। ওকে দেখলেই কেমন যেন প্লাস্টিক প্লাস্টিক গন্ধ পায় সে, এখনো পেলো। জুলেখা একটু এদিক ওদিক ঘুরে দেওয়ালের কাছে গিয়ে বাইরেটা দেখছে। মুগ্ধ হওয়াও প্রোগ্রাম করা হয় নাকি! একটুক্ষণ পর সে বলে উঠলো, “কি দেখছো?”
- অসীম শূন্যতা।
- ও
- খেয়াল করে দেখবেন সমস্ত মহাকাশ টা আসলে অঙ্ক, একটা সিরিজ অফ নাম্বার থিওরি।
- বাব্বাহ! ভালো কথা ইনপুট করানো হয়েছে তো তোমার মধ্যে।
- এখানে না এলে অনুভব করতাম না আসলে আমি কত তুচ্ছ, অপ্রয়োজনীয়।
ব্যঙ্গ হাসি হাসতে গিয়ে থমকালো অর্জুন, শেষ কথাটা কোথাও বিঁধল কি?
অনেকক্ষণ সব চুপচাপ, অস্বস্তি হচ্ছে তার। তখন জুলেখাই মুখ খুলল, “আপনি আমাকে সহ্য করতে পারেন না, আমি না এলেই আপনার ভালো ছিলো।”
মুহূর্তে মাথাটা গরম হয়ে গেলো অর্জুনের, কফির মাগটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, ঠিক, আমি তোমাকে ঘেন্না করি। শুধু তোমাকে না, তোমাদের সম্পূর্ণ দুনিয়াটাকেই, তোমাদের স্রষ্টা, আমার স্বজাতি, তাদেরকেও।”
নির্বাক নীল ফিরোজা দৃষ্টি তাকিয়ে রইলো শুধু। অর্জুনের ইচ্ছে করছিলো চোখ দুটো কোনোভাবে মুছে ফেলে সামনে থেকে, উপায় থাকলে শালীকে সে ছুঁড়ে বের করে দিতো প্রিজন থেকে।
- শোনো, যতদিন আমি একা ছিলাম, কষ্টে ছিলাম, কিন্তু তবু সয়ে ছিলাম। তোমাকে উপহার দেওয়ার নাম করে নরক উপহার দেওয়া হয়েছে আমাকে। তুমি নরক, তোমার সবকিছু থেকে আমি প্লাস্টিক মৃত্যু গন্ধ পাই। অভিশাপ তোমরা, মানুষের অবক্ষয়ের অভিশাপ। আজ তোমাদের একজনের জন্যই…”
- আপনি শান্ত হোন, প্লিজ।
জুলেখা এগিয়ে এসে দুই হাতে ধরতে চায় তাকে। তীব্র ঘেন্নায় সরে যায় সে, তার পর দুই হাতে খামচে ধরে জুলেখার হাত। ফিসফিস করে বলে, “তোমাদের বোধ নেই, অনুভূতি নেই, আসলে তোমরা ভয়ানক এক না মানুষ। আমার ক্ষমতা থাকলে…” তার নখ গুলো বিঁধতে থাকে জুলেখার নরম চামড়া পেরিয়ে পেশির মধ্যে। “দেখো তোমাদের যে কোনো বোধ নেই তার প্রমাণ।” পাশবিক  উল্লাসে জুলেখার মুখের দিকে তাকিয়ে হঠাত প্রবল ধাক্কা খায় সে। মুখ বেঁকে গেছে জুলেখার, আর নির্বাক ফিরোজা নীল দৃষ্টি এখন অশ্রুসজল যন্ত্রণা কাতর। ফোঁটায় ফোঁটায় যা গড়িয়ে নামছে নাকের পাশ দিয়ে। শক খেয়েই যেন হাতটা ছেড়ে দেয় অর্জুন, আর ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে জুলেখা। ছুটে চলে যায় ঘর থেকে। একরাশ না বোঝা অনুভূতি বোবা করে দেওয়ায় অর্জুন আসতে আসতে দেওয়ালের কাছে গিয়ে দাঁড়ায়, আপন মনে বিড়বিড় করে, মহাশূন্য আসলে কম্বিনেশান অফ আ সিরিজ অফ নাম্বার। সব নাল আর ভয়েড।

If someone wants a bird’s life…

- চেনা রাস্তায় ঐ পাখিদের মত দিন যাপন, করে আজ আপন, পাখিদের সুরে সুরে গাই, এ ভাবে তাই, পাল্টিয়ে যাই।
চুপ হয়ে গেলো অর্জুন, জুলেখা মুখ তুলে তাকালো।
- কি হলো?
- শর্বরীর প্রিয় গান ছিলো, হয়ত এখনো আছে। এটা গাইত আর বলত এটা শুনলেই নাকি অনির্বাণের সাথে ফ্লারট করতে ইচ্ছে করে। যত্ত ইয়ার্কি! রাগিয়ে দেওয়া আমায়।
- অনির্বাণ কে?
- আমার ইউনিভার্সিটির প্রিয়তমেষু বন্ধু, হোস্টেল মেট।
- আচ্ছা ব্রোম্যান্স!
ফিচেল হেসে জুলেখা বলে উঠলো, শর্বরীর বুঝি আপনাদের দুজনকেই পছন্দ ছিলো?”
- বলতো তো সেরকমই, আসলে না। গভীর মেয়ে ও। বুকের মধ্যে পুকুর ছিলো ওর, কথায় চলকে পড়ত।
- তারপর?
- তারপর আর কি… কিছুই না।
লম্বা নিশ্বাসে কথাটা শেষ করে অর্জুন।
জুলেখা একটুক্ষণ তাকিয়ে রইলো, তারপর বলল, “এত কম কথা বলেন কেন? আসলে তো এক সমুদ্র কথা জমে আছে।”
- তাই জন্য প্রি প্রোগ্রামড পুতুল পাঠানো হয়েছে আমার কাছে। রেকর্ড করার জন্য। বন্দীর জীবনী।
- সে আপনি যা ভাববেন।
সিরিয়াস মুখে বলল জুলেখা, “তবে কথা গুলো বললে আপনারই ভালো, আমারও।”
- তোমার কেন?
অবাক হলো অর্জুন।
- সে আপনি বুঝবেন না মশাই।
ফিক করে হেসে ফেলল জুলেখা, তারপর বলল, “কিচেনে আসুন না, স্যান্ডুইচ বানাই আর আপনার কথা শুনি।”
- সে কি বাহুল্য নয়?
- বাহ প্রিজন সেলে থাকতে থাকতে বাহুল্য আর বাহুল্য বর্জন শিখে গেছেন তো, রাষ্ট্র যন্তরের সাফল্য।
- কিসের সাফল্য? আমি বিপ্লবী ছিলাম না তো। শুধু সাহায্য করার কৃতজ্ঞতা ভোগ করছি। তোমার এক বোন কে বাঁচানোর ফলাফল।
- জানি। আর সেখানেই বিপ্লবী হয়ে গেলেন।
- কিভাবে?
- রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে গেলেন।
- আত্মরক্ষা ছিলো, আমি মাথায় আঘাত করতে চাইনি। কিন্তু গলা টিপে ধরায় হাতের কাছে পেপার ওয়েট টা ছাড়া আর কোনো উপায় ছিলো না আমার।
- বাঁচাতে গিয়েছিলেন কেন? আমরা ওভাবেই তৈরি। হিটলার বলে এক রাষ্ট্রনায়ক, অনেকদিন আগে, শুনেছি সীমান্ত অঞ্চলের সৈন্যদের জন্য সেক্স ডল বানানোর সাজেশান দিয়েছিলেন। আমরা অবশ্য নিতান্তই সেক্স ডল নই।
- এটার কোনো ভিত্তি নেই জুলেখা, এই হিটলারের কথাটার।
- ইতিহাসের অধ্যাপক আমার থেকে ভালো জানবেন।
অস্বস্তি হচ্ছিলো অর্জুনের, সেও তো, প্রথম দিকে কদর্য ব্যবহার করেছে। মুখ ফিরিয়ে মহাকাশের দিকে তাকিয়ে রইলো, কথা ঘোরানো যায় না কি…
- চিজ দেব তো?
সম্বিত ফিরলো তার, যাক কথা ঘুরে গেছে। কি মনে হতে সে বলল, “সরো, আমি বানাবো।”
- ইচ্ছে করছে?
- হ্যাঁ, রোজ তুমি বানাও, আজ আমি তোমায় বানিয়ে খাওয়াই। অবশ্য…
 চারজিং এর প্যানেলের দৃশ্যটা ভেসে উঠলো চোখের সামনে। মৃদু হেসে জুলেখা বলল, “হ্যাঁ খাবো। অসুবিধা নেই।”
কথা ঘুরে যাওয়ার নিষ্কৃতি নিয়ে স্যান্ডুইচ মেকারে সব সাজাতে লাগলো অর্জুন।
জুলেখা এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে এটা সেটা নিয়ে নাড়াচাড়া করতে করতে বলল,” শর্বরী কে বড্ড ভালোবাসেন না, এখনো?”
অন্যমনস্ক অর্জুন বলল, “হুম।”
হালকা একটা “আচ্ছা” ভেসে আসায় সচকিত হল তারপর, “কেন?”
- দেখতে ইচ্ছে হয় না তাকে?
- হত, প্রথম দিকে, তারপর অভ্যেস। ওই আর কি…
- আপনি চলে গেলে আমার যদি আপনাকে দেখতে ইচ্ছে হয়?
- অ্যাঁ ?
- কিছু না।
ফিক করে হেসে পাশের ঘরে চলে গেলো জুলেখা, আর পাউরুটি হাতে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো অর্জুন।

I shall go by, dragging my burden of love….

জুলেখা, স্পেসশীপ আসছে!” রুদ্ধশ্বাসে কিচেনের দরজায় ছুটে এসে দাঁড়ায় অর্জুন। ধীরে সুস্থে ফিরে তাকালো সে, পুকুর সমান ফিরোজা চোখ, টলটলে,
- জানি, তোমার মেয়াদ শেষ, নতুন জীবনের শুভকামনা অর্জুন।
- আমি… আমি যাব না।
ফিকে হাসি হেসে অর্জুন কে জড়িয়ে ধরে জুলেখা, বলে, “কি বাচ্চাদের মত হচ্ছে এটা? এতদিন পর পৃথিবী তে ফিরবে…”
- কার কাছে?
চুপ হয়ে যায় চারপাশ হঠা, কিছু কিছু নিঃশব্দ সময় বড় বাঙময়। তারপর অস্পষ্ট গলায় জুলেখা বলে, “শর্বরী, নয়ত নতুন কেউ আসবে। ভালোবাসা তো ফুরিয়ে যায় না, তাই না অর্জুন?”
- চমৎকার বলো, এতদিন তোমার কাছে থেকে এখন নতুন কাউকে খুঁজতে বেরোবো!
- জীবন তো অন্বেষণ, এই যে আমার আর তোমার দেখা হওয়া। তৈরি হয়ে নাও, স্পেসশীপ এলো বলে।
- আর তোমার কি হবে? বলোতো?
- আমার…
- ইউসলেস জাঙ্ক করে রেখে দেবে তোমাকে, আমি স্পেসশীপে পা রাখার সঙ্গে সঙ্গে ইউ উইল বি ইন্যাক্টিভেটেড। ইউ উইল বি অ্যা জাঙ্ক। মৃত। তুমি... তুমি…
ফোঁপাতে শুরু করে অর্জুন।
- আমি তোমাকে আমার কাছে নিয়ে যাব, আমার সাথে থাকবে তুমি। থাকবে না? বলো?
আবার ফিকে হাসি হাসে জুলেখা, তারপর দুই হাত বাড়িয়ে বলে, “এসো। আমার কাছে।”
গলার মধ্যে মুখ ডুবিয়ে দেয় অর্জুন, আর টের পায় লম্বাটে আঙুল গুলো চুলের মধ্যে বিলি কাটছে।
বাইরে তখন শার্সি ছুঁয়ে থমকে আছে নক্ষত্র ক্ষচিত আকাশ, স্পেস শীপটা বিন্দু থেকে বড় হয়ে উঠছে।









   শ্রেয়া ঠাকুর

Shreya Thakur