Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS

Avijit Pal


প্রথম চর্যাগীতিকোষবৃত্তি
গাছ হয়ে উঠছে শরীর। ইন্দ্রিয় বেয়ে গজিয়ে উঠছে পাঁচ শাখা। মনের রন্ধ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছে ক্রমশ একটা চঞ্চলতা। গুরুপন্থায় সবিশ্বাসে খুঁজতে চাই সেই পরমকাঙ্খিত মহাসুখের পরিমান। সিদ্ধাসনে বসে লুইপাদ নির্দেশ করে একা। সব ফুরিয়ে গেলে সমাধি নামে ক্যানভাসে। সমাধিকেও সামান্যবৎ মনে হয়। দুঃখ-সুখের দড়ি টানার খেলার পর একা দাঁড়িয়ে থাকে মৃত্যুমুখী চেতনার আবহ। শূন্যতার দিকে চেয়ে দেখি। নির্বিঘ্ন আকাশের মতো শূন্যতার দিকে। লক্ষ্য রাখি একা। লুইপাদ সঙ্গ দেয়। হাতে কলমে শিখিয়ে দেয় বাকি সব মিছে…



দ্বিতীয় চর্যাগীতিকোষবৃত্তি
কাছিম দোহনে দোনা ভরে আসে। বিপ্রতীপ সময়ে কুমীরের আয়ত্তে এসে যায় আকাঙ্ক্ষিত গাছের তেঁতুল। বিয়াতিকে ডাকি। নির্দেশ করি বাহিরকে ঘরে নিয়ে আসার। গোপনে চুরি যায় কর্ণভূষা। অবৈধ সময় জেকে বসে ক্যানভাসে। পতি পরিবার ঘুমিয়ে গেলে জেগে বসে বধুটি। নেমে আসে কামনার আবহ। অসূর্যস্পর্শ্যা স্পর্শগম্য হয়ে ওঠে কামনগরে। হেঁয়ালি বাঁধে কবি কুক্কুরীপাদ। গান গায়। একা একা হাসে। তাঁর গানের মানে আমাদের অগম্য হয়ে ওঠে...



তৃতীয় চর্যাগীতিকোষবৃত্তি
শুঁড়িবউ আলগোছে ঘন্টিকারন্ধ্রে সিঁধিয়ে নেয় নেশাতুর দুই মানক দ্রব্য। সেঁধে দেয় সম্ভূতা ঘটের রন্ধ্রে। চিকন চিয়ান বাকড়ে বাঁধে লোকজ সুরার গাঁজ। অবলীলা আর নৈপুণ্য বেঁধে ওঠে তেজাক্ত সন্দর্ভে। অজর-অমরত্বের অধিকার পেয়ে যায় দৃঢ় হতে চাওয়া দায়বিলাসীর কাঁধ। দূর থেকে যোগশাস্ত্রীয় দশম দ্বারের চিহ্ন দেখা যায়। সংগ্রাহক ছুটে আসে। ক্রমশ স্থিত হয়। চিনে নেয় বহুকাঙ্ক্ষিত তার চৌষট্টি ঘড়ার পসরা। স্থানু হয়ে রয়ে যায় ঘরের ভেতর। চেনা ছবি দেখে একা বাঁকা হাসি হেসে ওঠে বিরূপাপাদ। নির্দেশ করে ছোট কলস থেকে সরু নাল বেয়ে সুধামদ শোধনের। আমি চিত্তশোধনের পাঠ নিতে বসি বিরূপার পাশে একা একা...



চতুর্থ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি 
পুনশ্চ যোগিনীর সঙ্গে তীব্রতর আলিঙ্গন করি। আবদ্ধ হই কমলকুলিশ ঘেঁটে। ক্ষণসময় ব্যাপ্ত হয়ে ওঠে নিকষ মৃত্যুর মতো। ঠোঁটের উপর চুম্বন আঁকি। মোহাতুর হয়ে উঠতে এখনও অনেক পাঠ বাকি আমাদের। মণিমূলের গা বেয়ে উঠে আসে যাপনগুলো। বন্ধ ঘরে এঁটে রাখি একান্তযাপনের তালাচাবি। কেটে ফেলি চাঁদ-সূর্য মাপা বিধিদীপ্ত সময়। গুণ্ডরীপাদ সিদ্ধাসনে বসে আমায় শেখায় সুরতক্রিয়ার রীতিপদ্ধতি। শিখি। অভ্যেস করি। সিদ্ধতায় জেগে উঠি। সমাজবদ্ধ নর-নারীর মাঝে তুলে ধরি আমাদের ব্যতিক্রমী বিজয় পতাকা।



পঞ্চম চর্যাগীতিকোষবৃত্তি 
পুনশ্চ আমার চেনাদিনের নদীটির বুকে যৌবনের বেগ আসে। তীর বেয়ে জমে ওঠে  আমার আজানুলম্বিত কদর্যযাপনের ক্লেদ। কবি চাটিলপাদের হাত ধরে হাঁটি ধর্মসাঁকো উপর দ্বৈত পদগমনে। পারাপার করতে শিখি একা একা। নিচ দিয়ে বয়ে যায় আমার বেগবতী। ঘোর কেটে আসেমোহতরু কাটি। অদ্বয়টাঙ্গী হাতে ধরতে শিখি নিপুণতায়। আঘাত করি। প্রতিটি পদক্ষেপ সাজিয়ে তুলেছি ভোরের গন্ধে। নির্দিষ্ট কথায় মধ্যমার্গে স্থিতধী হই। অগ্রসর হতে শিখি সাঁই চাটিলপাদের হাত পা শরীর ছুঁয়ে। নিকটবর্তী উন্মুক্ত বোধিচিত্ত হাতছানি দিয়ে ডাকে। সন্ধান করে ফিরি...



ষষ্ঠ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি 
একটি সঙ্গ ত্যাগ করে আরেকটি সম্পর্কের মায়াজালে বুঁদ হই। চারিদিক থেকে সারা দেয় মায়াবী পার্থিব প্রতিবন্ধক সাংকেতিক বেড়ার দল। পুরাপ্রাচীন সূত্র ধরে অঘোষিত স্বাদু মাংসপিণ্ডের জন্য হরিণ হয়ে ওঠে স্বয়ং হরিণাবৈরী। কবি ভুসুকু ব্যাধ হয়ে ওঠে আলটপকা। সন্ধান করে ফেরে আত্মগহনে। হরিণ খুঁজে ফেরে হরিণীর যাপনচিত্র। একটা নিভৃতযাপনের ঘর। পারিপার্শ্বিক জৈবিক চাহিদা ম্লান হয়ে আসে সময়ের আনুগত্যে। আত্মবিশ্বাসহীন হরিণ বন ছেড়ে পালায় দ্রুত। দূর থেকে আরও গোপন দূরে। ক্যানভাসে এসে লেগে থাকে খুরের চিহ্ন। সিদ্ধাসনে বসে ভুসুকুপাদ সাধনমার্গীয় সংকেত বুনে চলে। মূঢ়ের কাছে অপ্রকাশক থেকে যায় তাঁর সংকেতযাপনের ইতিকথা।




সপ্তম চর্যাগীতিকোষবৃত্তি 
আল আর আঁধারে বন্ধ হয়ে আসছে আলোময় দৃশ্যমান পথ। কাহ্নপাদের মন ক্রমশ ভারি হয়ে ওঠে। স্বগতোক্তি ধ্বনিত হয়। নিশ্চুপে। খুঁজে ফেরে কোনো এক নিভৃতযাপনের ঘর। আদিম মনোগোচর। ধর্মের প্রতি একটা ঔদাস্য আসে। সাধনার সংকেতবাহী তিন-তিনের সংজ্ঞা পরিস্ফূট হয়। তিন মিশে যায় নির্দিষ্ট হয়ে থাকা একে। বিচ্ছেদ জমে ওঠে পার্থিব ভাবনায়। পুনঃ আগতেরা সবাই ফিরে যায়একা দুঃখযাপনে বসে থাকে কাহ্নপাদ। বিশিষ্টমনা হয়ে ওঠে স্থিরচিন্তায়। হৃদয় নড়ে ওঠে। মহাসুখ কাছেই জমে আছে কোথাও। সন্ধান করে ফেরে...





অষ্টম চর্যাগীতিকোষবৃত্তি
সোনায় ভরে তুলি আমাদের করুণা-নাও। সোনার পাশে রূপো অনাকাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠে। পসরা সাজাই। শূন্যতার পসরা। আনন্দ হাতে নিয়ে মহাকাব্যিক সমুদ্রের উদ্দেশে ভেসে যেতে ইচ্ছে হয়। আরও একবার। ভেসে যেতে চাই শুধু। ভাসার আনন্দে। বহুদূর। আরও দূর। যতদূর গেলে ফেরার সব পথ বন্ধ হয়ে আসে। খুঁটি উপড়ে ফেলি। বাঁধন-কাছি ছিঁড়ে খুলে ফেলি। কম্বলাম্বরপাদের পরামর্শ নিয়ে অনাবিল ঘাট পার হই। দিগচক্রবালের দিকে আনত হয়ে চেয়ে চেয়ে দেখি। কেড়ুয়ালের সঙ্গযাপন শিখি। নৌকা বয়ে বেড়ায় চেনা ক্যানভাসে। নদীপথের মাঝ বরাবর নৌকা ভাসে। মহাসুখের সঙ্গে মিলনমত্ত প্রত্যাশা রাখি। কম্বলাম্বরপাদ আলতো হাতে শিখিয়ে নেয় নির্বিকল্প প্রবাহাভ্যাস চর্যার পাঠ। এক নৌবাহনের উৎপ্রেক্ষা।



নবম চর্যাগীতিকোষবৃত্তি
রূপ-অরূপের কড়া এসে স্পর্শ করে বল্কল বাস। একটা একটা করে প্রত্যেক আকাঙ্ক্ষিত বন্ধন শুকনো পাতার মতো খসে আসে। কাহ্নপাদের পা টলমল করে। মদের মতো এক নেশাক্ত প্রতিবেশ সেজে ওঠে সময়। নলিনীবন সমস্বরে ডাক পাঠায়। কাহ্নপাদ কাহিনি বলেন হাতিনীর বিগলিত মদমত্ত টোপ দিয়ে প্রকান্ত হাতি বাঁধার। আদিম পদ্মবনের ভিতর। তথতামদ ঝড়ে পড়তে থাকে ক্যানভাসের আঁচলের আনাচে কানাচে। চিত্ত শুদ্ধ করি। ষড়্ গতি শুদ্ধ হয়ে আসে। ভাব অভাব শুদ্ধ হয়ে আসে। আভূমিনভোমন্ডল দশদিক থেকে রোধ হয়ে আসে আমার অবিদ্যার পাঠমালা। শুধু কাহ্নপাদ একা একা হাসে...


দশম চর্যাগীতিকোষবৃত্তি
রূপনগরের বাইরে আদিম ডোম্বী বেঁধে বসে ঘর। ব্রাহ্মণ ছোঁয়াচ বাঁচিয়ে উঁকি দিয়ে দেখে। চোখ দিয়ে স্পর্শ করতে চায়। অননুমোদিত ভাবনারা জাগে। কাহ্নপাদ নগ্নজিতা যোগি হয়ে ওঠেন। অভিসঙ্গ চায়। চৌষট্টি পাপড়ির পদ্মে ডোম্বী শেখায় গান্ধার্বী কলার নৃত্যমাধুরী। সমস্ত আবরণধর্ম খসে পড়ে। হারিয়ে যায়। অজানা নৌকায় আসা-যাওয়ার জমে ওঠে ধীরে ধীরে একটা ধূমল রঙের সংশয়। তন্ত্রী চাঙ্গাড়ির পসরা সাজিয়ে বসে। যন্ত্রণা বাষ্প হয়ে ওঠে। কাহ্নপাদ একা সরে আসেন। নাটুকে বিমোহন ভুলে হাতে তুলে নেয় অস্থিমালার বিশ্রাম। ডোম্বীর প্রেমে একটা জিঘাংসা ফুটে ওঠে উদাস চোখে। কাহ্নপাদ নৈরাত্মধর্মাধিগমের পাঠ নিতে বসেন..



একাদশ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

শরীরজ নাড়ীশক্তিকে আরও দৃঢ় করি। ভীমনাদে বেজে ওঠে অনাহত ডমরু। উচ্চ নাদ শোনা যায়। কৃষ্ণাচার্য সেজে ওঠে কাহ্নপাদ। যোগাচারের মঞ্জরী সাজায়। শরীর মন প্রাণের রসায়ন দেখে খিল খিল হাসে। যথাচারের আবহ মাখিয়ে রাখে অনবদ্য মমতায়। অসীম সসীম দেহনগরী বিহার। সাধন পদ্ধতির আলি-কালি দিয়ে বাঁধে নূপুর। মুহূর্ত বুঝে নক্ষত্রমন্ডল থেকে কর্ণাভরণ ঋদ্ধ করে সূর্য-চাঁদ একসাথে। রিপুদোষ মুছে আসে শরীরময়। ছাইবৎ উড়ে যায় ইতিউঁতি। অদূরবর্তী বোধিচিত্ত হাতছানি দিয়ে ডাকে। পুনশ্চ দৃঢ় হয়ে আসে নাড়ী। নিরংশু-সপ্রপঞ্চ চর্যার গান শোনা যায়....





দ্বাদশ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

গুরুমুখী পন্থায় ভববল জয় করতে করতে করুণাভা মাখানো ছকে ফেলে ঠিক ঠাক শিখে নিতে থাকি দাবাখেলা। ভাবনারা বাড়তে থাকে। একটা জিতে যাওয়ার প্রচেষ্টা। জিনপুরের পথ পুনশ্চ ক্রমশ পুরাধুনিক ভাবে সুরম্য সুগম্য হয়ে ওঠে কাহ্নপাদের সামনে। অহৈতুকী দু'দান সরাতেই কিস্তিমাৎ হওয়ার কথা ছিল। বিবর্তিত হয়ে ওঠে ভাবনারা। প্রাথমিকী পদাতিক হত্যায় করি জয়সূচনা। গজগমনে আমূল জখম করি পাঁচ বিদ্রোহীকে। হি হি করে হাসি। হি হি হি হি। মন্ত্রণাদাতাকে আগুয়ান করি। স্বয়ং এ খেলায় এবার রাজাধিরাজ অবশ হয়ে আসছেন। সুতো ঘুরে চলে। গুটিয়ে আসে। কাহ্নপাদের জয় নিশ্চয়তা মাপতে বসে। চৌষটি ঘরে একা জয়স্তম্ভ গুনে নিতে থাকে..


ত্রয়োদশ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

ত্রিশরণী নৌকা সাজাই। আট কুঠুরি নয় দরজা এঁটে বসি। সাধনপন্থী শূন্যতা আর করুণাকে সহবৎ করে তুলি কাহ্নপাদের দেখানো পন্থায়। শরীরের দিকে তাকিয়ে দেখি। স্তব্ধ হই। নিস্পৃহ হই। মহাসুখকায় হাতে নিয়ে পার হয়ে আসি অগাধ জলধি। একটা স্বপ্নের ঘোর লেগে থাকে। মাঝগাঙে চিরচেনা নদীর ঊর্মিমালার রকমফের ওঠা নামা। পঞ্চ তথাগত কেড়ুয়াল সাজে। বয়ে বেড়ায় নৌবাহনের দাঁড়। গন্ধ স্পর্শ রসের মতো নিদ্রাহীন এক স্বপ্নময় বিতান। শূন্যপথে অবধূতিমার্গে মন ধরে হাল। দৃঢ় হয়ে ওঠে। যোগাসনে বসে কাহ্ন চায় মহাসুখের নাগাল। মায়াজালবিমোক্ষ চর্যার আবহ গড়ে ওঠে ধীরে ধীরে...



চতুর্দশ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

গঙ্গা-যমুনার মাঝ বরাবর বয়ে যায় এক নদীর স্রোত। বুড়িলী মাতঙ্গী করে পার। যোগি পুনশ্চ শরণার্থীর ঋতুমালা সাজায়। ডোম্বী খেয়া বায়। অবলীলায় সারাবেলা কাটে। গুরুর সন্ধানে ফিরি জিনপুরে। ডোম্বীপাদের সাথে নিরুদ্দেশ যাত্রারম্ভ সূচিত হয়। প্রসাদানন্দ ধ্বনিত হতে থাকে। পাঁচ দাঁড় দ্রুত ওঠে পড়ে। তালে তালে ছন্দে। কাছি বাঁধা চলে দৃঢ়তায়। গগনের দু'খোল শুষে ফেলে জল। চাঁদ-সূর্য চাকার মতো ঘুরে যায়। মাস্তুলে শক্ত করে সৃষ্টি-সংহার বাঁধি। মাঝপথে চোখ রাখি। ডোম্বীর হাত ধরে পার হয়ে আসি নদীপথ। পারাণীর কড়ি চলে না। হাসি খেলায় পার হয়ে আসি। অজানা কোনো এক বাহনহীন কূলে ঘুরে মরে...


পঞ্চদশ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

আত্মস্বরূপ বিচার করতে বসি। স্বসংবেদন অলক্ষ্য হয়ে ওঠে। লক্ষণ খুঁজে ফিরি। ঋজুপথে হেঁটে গেছে পূর্বজরা। ফেরেনি কেউ। মোক্ষমার্গ উন্মোচিত হয়েছে ছন্দে ছন্দে। এখনও আমি কুলে কুলে ফিরি। ভ্রান্ত হই। সরল সোজা বাঁকহীন সুখসরণি অনাবৃত হয়ে আসে। কনকধারাময় রাজপথ দৃশ্যমান হয়ে আসছে। মোহমায়ায় মিশে মহাসমুদ্র অনন্তের বার্তা আনে আমার সামনে। পারি দেওয়ার জলযান খুঁজে না পেলে উন্মুখ হয়ে বসি গুরুর পদপ্রান্তে। ভূধর প্রান্তরের সীমা পাই না। জানি সোজা এ পথে গেলেই অষ্ট বুদ্ধৈশ্বর্য নিশ্চিত প্রকাশ হবে। চোখ বুজে মধ্যপথে শান্তিপাদের হাত ধরি। সমস্ত পার্থিব প্রতিবন্ধকদের চকিতে পার হয়ে যাই।


ষোড়শ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

গন্ধগজকে আবদ্ধ করে তুলি তিন পাটে। জয়ঢাক বেজে ওঠে অনাহত নাদে। মত্ত গর্জন শোনা যায়। বিষয়মণ্ডল ভেঙে পড়ে প্রহারের তাপে। ধেয়ে আসে মদমত্ত গজেন্দ্র মহারাজ। তুঁষ ঘোলায় আদিগন্ত। পাপ-পুণ্যের বেণী ছিঁড়ে ফেলে, ভেঙে ফেলে আলানস্তম্ভের শিকল। মনে আমার নির্বাণ নেমে আসে। গোটা ত্রিভুবন উপেক্ষা করে মহারসপানে হয়ে উঠি মাতাল। পঞ্চানুভূতির ছদ্মবেশী নায়ক মহাগজেন্দ্রকে চিনে ফেলি। আমার আজন্ম বিপক্ষরা ম্লান হয়ে আসে। খরতাপে নেমে আসি মন্দাকিনীর জলে। দূরে মহীধরপাদ জ্ঞানের আলো মেলে বসে থাকে। আমি অগ্রসর হতে শিখি। মহাসুখাভিসারের আলো ফুটে ওঠে..


সপ্তদশ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

অন্য অভিধায় লাউতে মিশিয়ে বাঁধি সূর্য, তন্ত্রীতে বাঁধি চাঁদ। উভয়ে মিশিয়ে বাঁধি অনাহতকে দৃঢ়তায়। হেরুক বীণা বাজে। ধ্বনি শোনা যায়। সখীসম্মুখে বাজাই নমনীয় ধ্বনি। শূন্যতা নাদে বিলাসিনী হয়ে ওঠে করুণার সূক্ষ্ম অনুরণন। সুরের উঠা পড়া চলে স্বর-ব্যঞ্জনে। আমাদের মননভূমি শান্ত হয়ে আসে। দোষসন্ধির বিচার মেলে বসি। বীণাপাদ হেরুকযোগের গূঢ়ার্থ ব্যাখ্যায় বসেন। বত্রিশ তাঁরের অনুরণনে বীণাধ্বনি অনাহত সেই মহাকাব্যিক শূন্যতা আকাশ বাতাস ব্যাপ্ত করে তোলে। শ্রীবজ্রধর নেচে ওঠেন। দেবী গান গীত। বুদ্ধ বিষয়ক নাটক পুনশ্চ শান্তিময় হয়ে ওঠে...


অষ্টাদশ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

হেলায় হেলায় পার হয়ে এসেছি ত্রিভুবনের খেয়াঘাট। এখন আনন্দে মহাসুখে হয়ে আছি সুপ্ত। কুটিলস্বভাবাপন্ন ডোম্বীকে দেখে হাসি। বাইরে কুলীন আর ভেতরে কাপালিক সাজি। একটু অকথিত দ্বিচারী হতে চাই। ডোম্বীর ছোঁয়ায় টলে ওঠে আমার স্নায়ুর বোধিচন্দ্র। ডোম্বী, দ্বিচারিনী ছিনালী তুই জানি, তবু পারঙ্গমা স্বভাবে তুই এখনও কণ্ঠে জড়িয়ে বসে আছিস অসীম কৌশলে। নড়বড়ে হয়ে পড়ছি। আমায় কামচণ্ডালীর পদ শোনায় কাহ্নপাদ। জ্ঞানাগ্নির আনন্দে সংবৃত্তি আর পরমার্থ সত্যের পাঠ নিতে বসি। পুনশ্চ ঋদ্ধ হই...


ঊনবিংশতি চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

ভব নির্বাণে বেজে ওঠে ঢোল পাখোয়াজ। মন-পবন বাজায় বেণু-ঝাঁপান। ধূমল ক্যানভাসে একটা জয়সূচক উলুধ্বনি ওঠে। বেজে ওঠে আনন্দ দুন্দুভির শব্দ। নতুন ছবি আঁকি। কাহ্নপাদের সঙ্গে ডোম্বীর পরিণয় গাঁথি। সমাজবিধিকে হেলায় করি দীর্ণ। যৌতুকে রাখি পরমপদ। এতদিন যা আমারও পরম প্রত্যাশিত ছিল। দিন কাটে নিয়মমাফিক। রাতের পর রাত সরে যায় সুরতক্রিয়ায়। যোগিনী সঙ্গে কেটে যায় আনত হয়ে থাকা এক একটি জ্যোৎস্না মাখানো মহাকাব্যিক রাত। সহজে মাতে ডোম্বীর রঙ্গের দিন। আলিঙ্গন দৃঢ় হয়ে আসে শরীরময়। আরও একটা নতুন চর্যার গান প্রকাশ করে কাহ্নপাদ। অবলীলায় তাঁকে অদ্বয় হতে দেখি চোখের সামনে...


বিংশতি চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

আদিতমা আকাঙ্ক্ষাহীনার দিকে চেয়ে দেখি। কান্ত আমি ক্ষণপক এক। স্থলন পতনে অভ্যস্থ হই। হ্রাস-বৃদ্ধিহীন আমাদের প্রেম নতুন করে অকথনীয় হয়ে ওঠে। আত্মঘরে তাকিয়ে দেখি। ভ্রান্ত প্রত্যাশার দল বাতাসে লীন হয়ে ওঠে। গর্ভ থেকে জন্ম নেয় বাসনার দল। অপত্য বলে চিহ্নিত করতে শিখি। নাড়ী ছিন্নের সূত্রে একটা অজানা শূন্যতার বোধ হঠাৎ জেগে ওঠে উদাস ঢঙে। গোঙাতে থাকে একটা নিটোল ভালোবাসা মাখানো যৌবন। ষোলকলা পূর্ণ হয়ে আসে। পূর্বপুরুষের স্মৃতি ম্লান হয়ে আসছে এবার। বীর বোদ্ধার জটিল সংসারযাপনের পাঠ নতুন করে আঁকতে শেখাচ্ছে কুক্কুরীপাদ। প্রজ্ঞাপারমিতার অর্থামৃত পানে পরিতুষ্ট হয়ে উঠতে থাকি...


একবিংশতি চর্যাগীতিকোষবৃত্তি


নেমে আসছে অজানা এক গাঢ় অন্ধকার ঘোর। মূষিকের চলাফেরা ঘরের ভিতর ইতিউঁতি।  অমৃত ভক্ষণে মাতে। আমার আক্রোশ জমে বর্ণহীন ক্যানভাসে। একটা নির্মম হত্যার আকাঙ্ক্ষা ফুঁড়ে দেয় আমার আত্মসংযমের বাঁধা ঘর। চাপল্য শেষ করতে চায় অঙ্কুরে। ঘনবর্ণ মূষিক এক। শুধু ঘুরে বেড়ায়। বর্ণবিহনে ঘুরে বেড়ায় সর্বত্র। যেন সহচর। কখনও স্বমতে কখনও দ্বিমতে ঘুরে বেড়ায়। গুরুপথের চিহ্ন দেখায় ভুসুকুপাদ। চিত্তবিশোধনের পাঠ নিতে বসি একসাথে। নিথর হয়ে আসে সময়। সবকটা কালো বাঁধন যায় ছিঁড়ে… 



দ্বাবিংশতি চর্যাগীতিকোষবৃত্তি
নিজেই নিজের সমস্ত ভব-নির্বাণ সাজিয়ে চলেছি। পূর্ণাবয়ব জ্ঞাতসারে। অনাত্মীয় কেউ ভ্রান্ত হতে হতে পুনশ্চ এক শাখাসারির প্রেমে আবদ্ধ হয়। আদিম অচিন্ত্য যোগিকে অগ্রাহ্য করি। উৎপাদ স্থিতি আর ভঙ্গের পুরাধুনিক বিন্যাস অনধীগত রয়ে যায়। আমি তো আমার জন্মকে জানি না, মৃত্যুকেও না। জন্ম-মৃত্যুর আপাত প্রভেদগুলো মিলে মিশে দলা পাকিয়ে আসে রোজ। বাঁচার মধ্যে মরা, মরার মধ্যে দিয়ে বাঁচার হেঁয়ালি সাজিয়ে বসে সময়। মৃত্যুকে এখন শুধু মৃত্যু বলতেই শিখে নিয়েছি। বুঝেছি চরাচরাত্মক ত্রিদশবিলাসীরা কোনদিনই অজর-অমর ছিল না। সরহপাদ আবার একটি ধাঁধা মেলে ধরেন। জন্মহেতু কর্ম, না কর্মহেতু জন্ম – অজানা উত্তরের জন্য এখনও অদূরে দাঁড়িয়ে আছি। অচিন্ত্যতত্ত্ব খোলস ছাড়ছে...



ত্রয়োবিংশতি চর্যাগীতিকোষবৃত্তি
ব্যাধের সহযাত্রায় ভুসুকুপাদ শিকারে যায়। হত্যা করে আনতে চায় পাঁচ ইন্দ্রিয়ের এতদিন যত টানাপোড়েন মজুত করা ছিল। কুবলয় নলিনী বনে ঢুকে হয়ে ওঠে অনন্যমনা। একটা হেঁয়ালি জমতে শুরু করে। জীবন্তকে হত্যা করতে জমে অজানা ভয়। হেতু ভয়ে মৃতও হয়ে ওঠে অস্পর্শিত অগম্য। এক তাল মাংসের প্রতি জমে ভুসুকুর স্বেদ। অভেদ্য এক মায়া যেন ক্রমশ প্রসারিত হতে থাকে ক্যানভাসে। প্রজ্ঞারূপিনী মায়াহরিণী আবদ্ধ হয়ে আসে হঠাৎ। ক্ষোভ জমে। পরাপরগুরুর উপদেশ মেলে বসে জীর্ণ ভুসুকুপাদ। জ্ঞানমুদ্রার কাহিনিমালা সংকেতের পুরাধুনিক বিন্যাসে প্রকাশ্য হয়ে ওঠে এক অর্ধপ্রাপ্ত পদাবলী থেকে...



চতুর্বিংশতি চর্যাগীতিকোষবৃত্তি
সময়ের অভিমান নিয়ে হাঁটি। সময়বৈরী হয়ে আসে। হঠাৎ একটি দিনের পর হারিয়ে দেয় কাহ্নপাদের একটা পদ। খেদ জমে। খেদোক্তি জমে ওঠে আরও একটু। সিদ্ধাসনে বসে কাহ্নপাদের একটা অজানা কোনো বিষাদ জাগে চোখে। ধূমল পাণ্ডুর রঙ। বিতর্কিত ভাবনা সীমাবদ্ধ থাকে। ঐশীত্বের সম্ভাষণ শোনা যায়। হারিয়ে যাওয়া কবিতার স্মৃতি যন্ত্রণা সাজায়। বহু যাপনের দাগগুলো কালো হয়ে আসে। পুরা নির্ধারিত নিদির্ষ্ট সময়ের পর ম্লান হয়ে আসে ধীরে ধীরে ধীরে ধীরে। চেনা দুঃখ চেনা সুখগুলো স্তব্ধ হয়ে দাঁড়াতে শুরু করে পাশাপাশি...



পঞ্চবিংশতি চর্যাগীতিকোষবৃত্তি
একটার পর একটা প্রতিবন্ধকদের পার হয়ে আসি। পাঁচমেশালি জীবন যাপনের পর হঠাৎ হারিয়ে যায় কবি তান্ত্রীপাদের একটা পদ। মাতাল হাতির মতো টলমল করে সময়ের পা। মূল পাঠ হারিয়ে যায় কবির কবিতার। ব্যাখ্যা, ব্যাখ্যামহ, প্রব্যাখ্যামহের সূত্র ধরে চিনে নিতে চেষ্টা করি মূল পাঠের কথা। কালো রঙের একটা বিষাদ জাগে গোপনে। সরে আসে অঙ্গজার স্বপ্ন। একটা সভ্যতার ইতিহাস পাশাপাশি চিহ্নিত করে শোষণের ইতিবৃত্ত। চোখ বন্ধ করে চেয়ে থাকি। তান্ত্রীপাদের মতো কষ্ট হচ্ছে বুকে। আমার সৃষ্টিও হয়তো আগামীর হাতে তুলে দিতে পারব না কিছু নঞর্থক কথা বলেছি বলে...


ষড়্ বিংশতি চর্যাগীতিকোষবৃত্তি
তুলো ধুনতে ধুনতে পার্থিব আঁশ জমে। আঁশ ধুনে বার করি নিরাকার ব্রহ্ম। আদিতর হেতুরূপের আবহমান সন্ধানে ফিরি। খুঁজে পাই না। হন্যে হয়ে খুঁজি। শান্তিপাদ দু'হাতে অভয় মেলে ধরেন। হেঁয়ালি বাঁধেন যত্ন করে। সময় মাপতে মাপতে হাতের মুঠোয় ভরে দেন সংকেতগুচ্ছ। তুলো ধুনে ভরি শূন্যতার আকর। নিজেকে ভাঙতে থাকি। বিস্তৃত একটা পথ এসে দাঁড়ায় সামনে। টলমল পায়ে এগিয়ে যাই অহেতুক টানে। চোখ হঠাৎ প্রান্ত খুঁজে ফেরে। কার্য নেই, কারণ নেই কোনো। যুক্তি পরম্পরাগুলো জট পাকিয়ে আসে আমার যাপনে। শান্তিপাদ আত্মবোদ্ধার হাসি হাসেন পিতামহের মতো স্নেহে। স্বসংবেদনের পাঠ পড়াতে শুরু করেন একা। অদ্বয়ের পথে একা একা শিখি...



সপ্তবিংশতি চর্যাগীতিকোষবৃত্তি
ভরভরন্ত রাতে ফুটে উঠল বহুকাঙ্ক্ষিত মহাপদ্মের রঙ। একে একে বত্রিশ যোগিনীর অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে জাগছে আকাশব্যাপ্ত পুলক। একা চাঁদ এগিয়ে চলে অবধূতির পথে। প্রতিটি পদক্ষেপ ধীর। অনন্তর নিরন্তর রতিসুখে প্রকাশিত হচ্ছে প্রতিটি সাধনে একটি সহজ পথ। পৌরাণিক সমুদ্রকুমার ষোলকলা নিয়ে এগিয়ে আসে নির্বাণের পথে। পদ্মমধু সুগন্ধী মাখিয়ে মৃণালের পথে চলে। উচ্চারণের আর যাপন ইতিহাসের দোষগুলোর পথ পার হয়ে অবশেষে জাগে অদ্বয় বিরামানন্দ। আদি বুদ্ধের মহাবাণী শোনা যায়। কবি ভুসুকু কামোদ রাগে গান গাইতে শুরু করে। সমাহিত হয় আত্মিক ভাবনায়। আদিতর জ্ঞানমুদ্রার সাথে মিলে মিশে মহাবোধির আকাঙ্ক্ষিত মহাসুখের সন্ধান পায় হাতের মুঠোয়...



অষ্টাবিংশতি চর্যাগীতিকোষবৃত্তি
উঁচু পাহাড়ের গায়ে ঘর বাঁধে শবরীবালা। সাজে ময়ূরপঙ্খে, গলায় বাঁধে গুঞ্জার মালা। শবর স্বামী গোল পাকায়। দোহাই শবর ব্যস্ত করো না আর। সহজসুন্দরী ঘরণী তোমার। মুকুল ফুটে ওঠে ডালে। আকাশ ছুঁয়ে নেয় ইচ্ছাসূত্রে। বন্য গহনে শবরী খেলে কানে বজ্রকুণ্ডল বেঁধে। শয্যাসুখে ত্রিধাতুর খাট পেতে নেয় শবর। আহূত অনাহূত তৃপ্তি সাজায়। রতিরস বিলাস সময়ে মোহিনী রাত্রি হয়ে ওঠে উদাসী ইতিহাস। রতিসঙ্গমের পর তাম্বুলের চিহ্ন লেগে থাকে ঠোঁটে। নৈরামণিকে কণ্ঠে জড়ায় মহামার্গী সুখে। স্বপ্নবৎ রাত কেটে আসে মুগ্ধবোধের পাঠ পর্যালোচনায়। দুর্বার মন শাসিত হয় নির্ণয় ও শরে। কাঙ্ক্ষিত নির্বাণের চিহ্ন দেখা যায়। খোঁজ মেলে না আর। তীব্র সন্ধান চলে পাহাড় চূড়ার আড়ালতলে...



ঊনত্রিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি
জ্ঞানানন্দসুন্দর লুইপাদের কথা শুনি। তিনি সুচারু অমৃতনাদী ইঙ্গিত বাঁধেন। আমার ভাব বাঁধে না, অভাবও না। সংবোধের ভিতর প্রত্যয় খুঁজি। বিশেষ জ্ঞানপথ আরও দুর্লক্ষ্য রয়ে যায়। ত্রিধাতুতে মজে ওঠে যাপনচিত্র। প্রতিটি পদক্ষেপ স্থূল। আমার বর্ণ-চিহ্ন-রূপ অজ্ঞাত এখনও, বেদাগমের কাছে ব্যাখ্যাতীত রয়ে যাই। আবহমান চেনা পরিচিত প্রশ্নগুলো জট পাকায়। আত্মঘরে তাকাই। উদকচাঁদ কতটা সত্যি আর কতটা মিথ্যে তা নিয়ে শুধু ধাঁধা জমে আসে। উত্তর প্রত্যাশা করি সিদ্ধাসনে বসে। আমার জটিল ভাবনাদের মুছে দেন লুইপাদ। আমার আত্মবিষয়ক বোঝাপড়ার পাঠ হারিয়ে যেতে থাকে। আলোর নিশান দেখতে পাই...



ত্রিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি
মল্লারী রাগ শুনি। ভুসুকুপাদ গান শুরু করেন। পরিচিত ক্যানভাসে একরাশ করুণার মেঘ ফোটে অবিরত। যাপনের সমস্ত ভাব ও অভাবের দ্বন্দ্ব পুরাধুনিক নিয়মে ম্লান হয়ে আসে। আকাশপটে সেজে ওঠে সহজ পদ্মের স্বরূপ। বিস্তারিত বিস্ময় জাগে। একটা অকথিত উল্লাসিয়া মনের অন্তঃপুরবাসী আনন্দে বাহ্যিক ইন্দ্রজালের বলয় ছিঁড়ে যেতে শুরু করে ধুলো জমা সম্পর্কের মতো। আমার মনোজ আনন্দমার্গে শুদ্ধ বিষয়বোধ জন্ম নেয়। ভরা চাঁদ পুনশ্চ আলোযাপন শেখায়। জ্যোৎস্নান্ধকারে বসে থাকি। ত্রৈলোক্যের সার সন্ধান দেয় ভুসুকুপাদ। সরে যায় আমার আত্মজ তীব্রতর অন্ধকারের বলয়রেখা..



একত্রিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

কবি আর্যদেবের কাছে চিত্তবিকরণ চর্যার পাঠ নিতে বসি। মন ইন্দ্রিয়ে বাতাসের দোলা লাগে। আত্মা জানি না কোথায় ঠাঁই নিতে যায়। সিদ্ধাসনে চর্যা শিখি। আমার করুণাচিত্ত ঊর্দ্ধহাতে অনাহত ডমরু বাজায়। আর্যদেব মুচকি হাসেন। স্নিগ্ধ এক হাসি। নিরালম্বে স্থবিরতা সাজান। চাঁদের সূত্রে জ্যোৎস্না স্পর্শ করতে থাকে আমার আজানুলম্বিত শরীর। চিত্তবিষয়ক অচিত্ততায় টলে ওঠে মন। ছেড়ে আসি সমাজ পাঠের লোকাচার ঘৃণা ভয় বিদ্বেষ। আসনে বসে থাকি স্থির। চক্ষু মেলেই শূন্যতা দেখি। সহৃদয় আর্যদেব নতুন পথ দেখান। একে একে ঘৃণা ভয়াদির সংস্কার কেটে যায়। বৌদ্ধিক আবহ মাখিয়ে রাখি আমার ক্যানভাসে...



দ্বাত্রিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

অবধূতি মার্গানুশংসা চর্যার নবপাঠ নিতে বসি। স্থিত হই আমার সিদ্ধাসনে। বহুমাত্রিক আমার সহজ চিত্তে কোনো ধ্বনিবিন্দু নেই। কোনো চাঁদ নেই। সূর্য নেই। অপার শূন্যতা জাগে। মনপথ মুক্ত হয়ে আসছে গুরুমুখী পন্থায়। বাঁকহীন ঋজুপথে পা বাড়াই। প্রতি পদক্ষেপ শান্ত সমাহিত ধীর। নিকটবর্তী উজ্জ্বল আদি বোধিচিত্তের আলো দেখা যায়। হাতে কাঁকন চেয়ে দেখি। দর্পণের চেয়েও স্পষ্টগম্য আমার চোখ। আত্মসন্ধানের আসন সাজাই। বুঝে নিতে থাকি মনের গড়ন। আমার আত্মবিষয়ক পাঠবিশ্ব। দুর্জনের সহযাত্রায় যে পথ আমার এতকাল ভ্রষ্ট হয়েছিল, ক্রমশ তা ম্লান হয়ে আসে। কবি সরহপাদ পথ নির্দেশ করেন। প্রদর্শিত পথে হাঁটতে শুরু করি সহজযানে। দ্বিপার্শ্বিক প্রতিবন্ধকদের পার হয়ে আসি প্রদর্শিত ঋজু পথে। অসীমের দিকে তাকিয়ে আছি...



ত্রয়স্ত্রিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

টিলায় বাঁধি ঘর পড়শিহীন। ভাঁড়ার শূন্য বন্ধু আসে দিন দিন। অনতিক্রান্ত সংসারের উপর বিরক্তি জমে ওঠে। টেণ্টনপাদের শরণাগত হই। তিনি ব্যাসকূট সাজান। অর্থ উদ্ধারের শর্ত রাখেন। আবহমান চেনা আবহ বদলে যায় পলকে। দোয়া দুধ ফিরে চলে বাঁটের মায়ায়। বলদ প্রসব করে, গরু সব বাঁজা। ত্রিসন্ধ্যা বলদদোহনে দোনা ভরে ওঠে। চেনাদৃশ্য বদলে যায়। বুদ্ধিজীবির দলকে হঠাৎ নির্বোধ স্বার্থগামী একমুখী মনে হয়। বিপরীত অর্থ বদলে যায় সাধু ও চোরের। এতদিন যে সংজ্ঞায় শব্দ চিনতাম, সব ঘেঁটে যাচ্ছে নবযাপনে। দৃশ্যপটে শেয়াল সিংহসম যোঝে। সব ভাবনা তালগোল পাকাচ্ছে আমার। উন্মাদিয়া আশঙ্কা জমতে থাকে। টেণ্টনপাদ মিটি মিটি হাসেন। হাত বাড়িয়ে কোলে নেন। ভয়ংকর হেঁয়ালির ভয় কেটে যায়। পটমঞ্জরী রাগ ভেসে আসে..


চতুস্ত্রিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

দারিকপাদের কথা শুনি। শূন্যকরুণার কথা মেনে নিতে থাকি কায়মনবাক্যে। তিনি আকাশের গায়ে কথা সাজিয়ে চলেন।সহযাত্রায় পথ চলি। কাঙ্ক্ষিত মহাসুখের প্রত্যাশা করি দ্বৈতগমনে। মহাসুখে মগ্নজা মন ক্রমশ অলক্ষ্য লক্ষণহীন হয়ে যাচ্ছে। বাহ্যিক মন্ত্র তন্ত্র ধ্যান ব্যাখ্যানের থেকে সরে আসি। মায়াজাল কেটে যাচ্ছে ধীরে। সহজাত নির্বাণের আলো দেখা যাচ্ছে অপার স্নিগ্ধতায়। দ্রুততর ইন্দ্রিয়ের অনুভব বদলাতে থাকে। সমাহিত নিস্পৃহ হতে শিখি। চেনা গুরুপথের অনুগমন নিয়ম মেনে। একটি নিশ্চিত বিশ্বাস। লুইপাদের পথ স্পর্শ করে দারিকের সঙ্গে নরেন্দ্র হয়ে উঠি। কান পেতে শুনি অন্য কবিতার পাঠ..


পঞ্চত্রিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

আমার স্বমোহের আস্তরণ কেটে গেলে এসে দাঁড়াই পরমগুরুর সামনে। চিত্তবিষয়ক স্বরূপ বুঝতে শিখি। নষ্ট চিত্তরাজ্য চেনা যায়। দিগন্তরেখায় সমুদ্রের বুকে স্নান করে আকাশ। একটির পর একটি দিক চিরস্থায়ী শূন্যতার ভরে ওঠে। দশদিক শূন্যগামী হলে বুঝতে শিখি, মনের বাইরে পাপ আর পূণ্য নিতান্তই শব্দ মাত্র। যাপনের দাগে ওসব নিয়ে না ভাবলেই চলে। গুরুপথের অনুগমনে চিনতে শিখি আমার লক্ষ্যদের। দৃষ্টি হয়ে আসছে স্থির। প্রকৃতির আজানুলম্বিত প্রভাস্বরে গিলে ফেলি মন। মননের হাত ধরে হাঁটি। ভাদেপাদ ভণে অন্য কথা। আমি অনুভবগম্য অখণ্ডাকার আত্মিক পদাবলী সাজাই পদাঙ্কে। আমার নড়বড়ে চিত্তরাজ গিলে নেয় ভাদে পারঙ্গম পদ সংস্থানে...


ষট্ ত্রিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

পুনঃ সহজানন্দসুন্দর কৃষ্ণাচার্যের পটমঞ্জরী রাগ শোনা যাচ্ছে। প্রদর্শিত পথে চিরচেনা শূন্যতার ঘরে সন্ত্রাসের মতো এসে চড়াও হচ্ছে খড়্গহস্তা তথতাজ্ঞান। মোহভাণ্ডার গিলে খাই। তীব্রতর নিদ্রামুখী দিব্যভাবনা জাগে। সাম্যবাদী হতে চেষ্টা করি আরও একবার। আত্মপরের ভেদরেখা মুছে আসে। সহজাত নাগ্নিক বেশে হেঁটে চলেন কাহ্ন। চোখে তার দ্বান্দ্বিক আলোচনার রেখা। আমার একরৈখিক চেতনা নেই। বেদনা নেই। গভীরতর নিদ্রার আবহ বদলে আসছে এবার। সুখশয্যার সাথে মিশিয়ে রাখি আমার যাপন। স্বপ্ন বদল হয় ক্যানভাসে। চলে শূন্য পৃথিবীর বুকে বিরামহীন চংক্রমণ। আমার ইতিকথার সাক্ষ্য দেয় জালন্ধরিপাদ। আমি নির্দিষ্ট হয়ে থাকা আকাদেমিক অধ্যাপকের স্মৃতির প্রতি সন্দিহান হয়ে উঠি। দিব্য হাসির রেখা ফুটে ওঠে...


সপ্তত্রিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

নিজের থেকে নিজে দূরে সরে যাই। দীর্ঘতর ভয়হীন একাযাপনে শুদ্ধ হই। আজানুলম্বিত আকাঙ্ক্ষা ভেঙে যাচ্ছে মহামুদ্রার স্পর্শে। যোগানুগা সহজানুভব মূর্ত হয়ে আসছে এবার। আমিও এবার চতুষ্কোটিবৎ বাঁচার মতো বাঁচতে চাই। হে আত্মলগ্না প্রথমা, তুমি আগের মতোই রয়ে গেছ অপরিবর্তনীয়। চিরন্তনী সেই স্বতঃ নান্দনিক। হারায়নি আমাদের সহজপথের সেই সব ফেলে আসা চলা ফেরা। চেনা পথে জমে আছে আমাদের দ্বৈতযাপনের পাথেয়দের কুচি। জানি প্রতি সম্পর্কেই বাক্যমনাতীত কিছু থাকে। এখনও নিজেকে পুরো বুঝতে পারিনি। আত্মজ্ঞান বাসনা করি। তাড়কপাদ কামোদ রাগে গান শুরু করেন। জ্ঞানামৃত পানে প্রমুদিত বোদ্ধার গলার কাছে বেষ্টন বাঁধতে শুরু করে...

অষ্টাত্রিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

শরীর নৌকা বয়ে বেড়ায় নিস্পৃহ এক মন কেড়ুয়াল। গুরুর নির্দেশ মেনে হাল ধরে বসে থাকি। স্থির হই ভূধরের সহসাধনে। স্থিতধী পরম্পরার পাঠ শিখি। মন বাঁধি। পাড়ি জমাই অন্য পারে। নিয়মমাফিক গুণ টানি। গুণমাফিক নিয়ম সাজাই। অভ্রান্ত লক্ষ্য রাখি স্থির। প্রত্যয় জমে। প্রতিবন্ধকগুলো হোঁচট্ খেয়ে পড়ে পূর্বগামীর পায়ে। জলবিপদে ভয় জমে। ভয় কেটে আসে। পরিশুদ্ধা অবধূতীকে নিয়ে উজানের পথে চলি। ভোরের ভৈরবী রাগ ভেসে আসে। আনন্দময় মানুষটির মতো সরহপাদ খেয়া আঁকে আকাশের নীল গাঙে। দূরে দাঁড়িয়ে দেখি...


ঊনচত্বারিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

সরহপাদের সান্নিধ্যে বসি। যোগানুসঙ্গ দেখি। অজানা কোনো আত্মবোধ জাগে। মনের সাথে কথা বলি। ডুবে থাকি বহুমাত্রিক স্বপ্নের ঘোরে। অবিদ্যার মায়াজাল জমে। নবায়মান রমণ শিখি। কলুবাসী বলদের মতো ঘুরি একা। আর্বতনমূলক ঘূর্ণন। বিভ্রান্ত হই। পরমগুরু মার্গ দেখান। অবিদ্যার জটিল দোষ কেটে আসে। দৃশ্যমান দেখি আত্মপরের ভেদরেখা। শূন্যমার্গে পথ চলি। সৎ সহযাত্রায়। পার্থিব ছায়াচিত্র ফুটে ওঠে। বিষভক্ষণে অমৃতময় হই। কণ্ঠী আমার নীল হয়ে আসছে এবার। প্রবাদের কথা মনে আসে। একটি জীবনভিত্তিক দুষ্ট গরু ও শূন্য গোয়াল বিষয়ক পাঠ। ভব পরমার্থ জ্ঞান উন্মোচিত হয়। ত্রিভুবন মিশে যায় সময়ের পদক্ষেপে। সরহপাদ স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখেন...




চত্বারিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

যাপনচর্যার নিখাদ পরমজ্ঞানের প্রতিটি মার্গ আদিতর মনোগোচর। তবু মায়ার খেলায় আগম পুথি জপমালায় বুঁদ হয়ে আছি। সহজ শব্দটা ঠিক কতটা সহজ ও কতটা জটিল কাহ্নপাদের সাথে বসে শিখি। সহগামী হই। গুরুপন্থায় আলংকারিক স্থায়ীভাব জাগে। গুরুমুখী ভাব অনাগত রয়ে যায়। এক হয়ে আসে আমার দেহ বাক্ মন। এতদিন ধরে চলে আসা শিক্ষাপ্রণালীতে চেয়ে দেখি অধিকাংশ গুরু বোবা আর শিষ্য কালা। সংযোগ নেই কোনো।বাচালতা জমে ওঠে বাক্যিক বাহ্য অনুসঙ্গে। জিনরত্নের অনন্ত রতিবিলাস খুঁজে ফিরি। ব্রহ্মাণ্ড জুড়ে কালার দল বোবার দ্বারা সংবোধিত হয়ে ওঠে। কাহ্নপাদের ব্যাসকূট ভেঙে যাচ্ছে সহজানুভবের স্পর্শে। আমি স্থিতধী হয়ে যাচ্ছি অনন্তের আবহ মেখে...


একচত্বারিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

ভ্রান্তিতে মগ্ন হয়ে আছি। অনুৎপন্ন জগৎ এখনও ভ্রমের আবহ মেখে আছে। এখনও আমি রজ্জুর মধ্যে মাঝে মাঝে সাপের সেলুলয়েড দেখি। ভয় হয় বোড়া দংশনের। যোগিমন অস্থির হয়ে আসে। আত্মিক অনুভবগম্যতায় বাসনার ক্ষয় হয়ে আসে ধীর। বারংবার মরুমরীচিকা দেখি, স্বপ্ন দেখি গন্ধর্বনগরীর। দর্পণে জেগে ওঠে একটা প্রতিবিম্ব। একটা আমির ছবি। আকাশে বাতাসে জমে ওঠে তীব্রতর ঘূর্ণীর আবহ। বন্ধ্যাপুত্র দেখায় ভোজবাজির খেলা। বিবিধ জটিল ভোজবাজি। রাউতু ভুসুকু জাগতিক মোহাঞ্জন মুছিয়ে দেন উপমাযোগে। যাপনের অজ্ঞতা দূর হয়ে আসে। পরাপরম গুরুর কাছে নির্ভয়ে আমার মূঢ়তা মেলে ধরি। আমার সাধনপথ নির্দেশিত হয়। কহ্নুমঞ্জরীর রাগ ভেসে আসে...


দ্বিচত্বারিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

সহজচিত্ত ক্রমশ শূন্যতায় ভরে রাখি। কানুহীনতায় বিষণ্ন হতে হতে সতর্ক হই। ত্রিভুবন ব্যাপ্ত হয়ে পরম কানু মিশে থাকে। অনুদিন স্ফুরণ চলে সেই ধারাবাহিক আবহমান পাঠের। মূঢ়তায় আমার বস্তুদৃশ্য নষ্ট হয়ে গেছে বহুকাল।  ভাঙা তরী বেয়ে অতলান্ত সাগর শোষণে অগ্রগামী হই। বিপরীত আবহে বস্তুবিশ্ব অধরা মাধুকরী সাজায়। পৌরাণিক দুগ্ধের ভিতর লুকিয়ে থাকা ননীবৎ আত্মজ্ঞানের সন্ধানে ফিরি। আমার একাযাপনে জাগতিক কারও লাভ ক্ষতির হিসেব মাপা নেই আর। আকাদেমিক জীবনের ভাষ্য বদলে যাচ্ছে আমার। সঙ্গমমুখী ভাবনা জাগছে। কাহ্নপাদ নিরন্তর আত্মবিলাসে মিতহাস্যে পদাবলীর গানের আলো প্রকাশ করেন। স্থিতধী হই...


ত্রিচত্বারিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি



ত্রিলোক জুড়ে শব্দ সাজাই। শব্দবীজে জন্মে ওঠে একটা নতুন গাছ। সহজাত সহজ যাপনে মেলে ধরে অঙ্গবিন্যাস। আকাশের অসীমটুকু স্পর্শ করতে চায়। স্বভাবের দৃঢ় জ্যামুক্ত করি। এক তীব্রতর বাণের উড়ান বাতাস কাটে। জলের ভেতর জল গঙ্গা যমুনা খেলার ছক সাজায়। প্রভেদহীন খেলার গন্ধ ভেসে আসে। সমরসে বুঁদ হয়ে ওঠে আমার মনোরত্ন। আকাশের দিকে তাকিয়ে হাসে। আমিত্ব মুছে যায়। মিশে যায় আত্মিকতার সব নিক্তি মাপা হিসাবপত্র। পৃথিবী যদি চর্যার পথে সত্যিই অনুৎপন্ন হবে, তবে আমার জন্ম মৃত্যুর স্থিতি কতটা হতে পারে, সে বিষয়ে ত্রিকোণমিতির গণিত সাজাই। ভুসুকুপাদ সহজস্ফুরণ চর্যার স্বভাবের পাঠ পড়ান। সাধারণীকরণ বুঝে নিতে শিখি। নিশ্চল ভাবাভাবের জ্ঞানে সমৃদ্ধ হই। সংশয় প্রহেলিকা কেটে আসে...



চতুশ্চত্বারিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

কঙ্কণপাদের কাছে বসে ধর্মতত্ত্বের কথা শুনি। অপার্থিব জ্ঞানালোকে সমস্ত শূন্যে শূন্য মিশে যায়। একে একে জেগে ওঠে সর্ব ধর্মমত। একটি সমন্বয়বাদী চিন্তাচেতনার আবহ জমে ওঠে। এক হয়ে ওঠে মতভেদের দল। চতুঃক্ষণ বুঝে স্থিতধী হই। বহু সাধনায় মধ্যমায় জাগে বোধিজ্ঞান। হৃদয় সংবেদী হয়ে আসে নান্দনিক বিন্দুনাদ। শুদ্ধ আত্মজ্ঞান উন্মোচিত হতে থাকে। আমার দৈনিক যাপনের প্রভেদমূলক প্রহেলিকা নষ্ট হয়ে আসে। সন্ধান করে ফিরে আমার মর্ত আগমনের পুরাধুনিক পূর্বসূত্র। সব শেষ হলে ক্ষয় ধরে সংবৃত চিত্তে। কঙ্কণপাদের ঘন ঘন ঝংকারে ভ্রান্তবিষয়ক কোলাহল চূর্ণ হয়ে আসে। আলোর গন্ধে ভরে ওঠে সমস্ত ক্যানভাস..



পঞ্চচত্বারিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

দেহতত্ত্বের ইতিবৃত্ত শুনি। কাহ্নপাদ মল্লারী রাগ শোনান। আমার শরীরের পঞ্চেন্দ্রিয় দিয়ে জন্মে ওঠে গাছের শাখা। মনতরু ঢেকে যায় অজস্র পাতায়। ফলে। গন্ধে। ভীত হই। পুনরপি ভয় জাগে। একের পর এক কুঠারের আঘাত বসাই। ক্ষতের দাগ জমে ওঠে ধীরোদাত্ত ঢঙে। শুভাশুভ জলসেচে পুনঃ জন্ম সাজাই। মৃত্যু সাজাই। পুনশ্চ আঘাত করি। নিগূঢ় ছেদনজ্ঞান অধরা রয়ে যায়। মূঢ় সংসারের যাপনের বুঁদ হয়ে ওঠে আমার আজানুলম্বিত তাপদের কথকতা। শিকড় উপড়ে ফেলি। মুছে ফেলি পার্থিব শিকড়ের টান। আকাশ ছুঁয়ে বাঁচতে চাই। শূন্যবাদের সহজিয়া শব্দমঞ্জরী ধ্বনিত হতে থাকে...




ষট্ চত্বারিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

বহুজন্মের সম্পর্কবাহিত কথার মতো ভেসে আসে শবরী রাগ। আমার ক্যানভাস থমথম করে। স্বপ্নের আয়নায় প্রকাশিত হচ্ছে আমার প্রতিচ্ছবি। যেন বহুমাত্রিক মোহে সবকটা ধ্বনি অঙ্গাঙ্গী জড়িয়ে আছে। অন্তরালবর্তী। পার হতে চাই আমাদের যাপনচিত্রের সমস্ত মোহাঞ্জন। জয়নন্দীপাদের হাত শক্ত করে ধরি। তিনি সহবৎ শেখান। থেমে যায় পার্থিব গমনাগমন। অদাহ্য অসিক্ত অবিদ্ধ রয়ে যায় সেই সব সংশয় মাখানো মহাকাব্যিক ভাবনারা। তবু ভ্রান্তি সাজায় মন। বাঁধে মোহিনীপাশে। ছায়া মায়া কায়ার সমমাত্রিক পাঠ শিখি। জ্ঞান কাঁটায় অজ্ঞান উপড়ে ফেলি। জমে ওঠে বাক্যিক বাহ্য উপাচারহীন বিজ্ঞান। অন্ধকার কেটে আসে। জয়নন্দীপাদের প্রতিটি শব্দার্থ আলোয় অব্যক্ত আনন্দ হয়ে ফোটে...



সপ্তচত্বারিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

কমল কুলিশে মিশে আসে। বজ্রপদ্মের বহুযাপিত আদরে জ্বলে উঠছে চণ্ডালীর শরীর। ডোম্বীর সাজিয়ে বসা সংসারে আগুন লাগে। চাঁদের অলোক টানে জল সিঞ্চন চলে ক্যানভাসে। শান্ত শব্দহীন দহন। নিয়মমাফিক আবর্তন। সমস্ত দাহের কখনই প্রদাহ হয় না। ধূমমালাও জমে না ইতিউঁতি। উজ্জ্বল আলো জমে ওঠে। মেরু শিখর বয়ে যাপনকলা আকাশে মিশে যায়। পুড়ে যায় আমার শরীরজ ত্রয়ী নাড়ী। পুড়ে যায় ললনারসনা। নববায়ু। ইন্দ্রিয় বিলাসের বিষয়। কবি ধামপাদ পরম করুণা ও মৈত্রীতে একমনা হয়ে ওঠেন। সমাহিত। নির্দেশ করেন আত্মজ্ঞান লাভের। পর্ব পরম্পরায় সহজচিত্ত পাপড়ি মেলে। কমলগন্ধী আনন্দ জাগে। ধ্যানবিন্দু স্থির হয়ে আসে। সিদ্ধাসনে স্থিতধী সংবৃত্ত মন পদ্মের নলিকথা শুনতে শুনতে মহাসুখের কথামালা সাজায়...



অষ্টচত্বারিংশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

বিরোধ জমে আসে সমস্ত অন্যায়ের বিপরীতে। যুদ্ধের সরঞ্জাম সাজাই। দলীয় ছত্রাকের ক্ষমতায়ন দেখে রুদ্র রূপে সেজে ওঠেন কুক্কুরীপাদ। পায়ের কাছে তার কয়েকটি জীব ঘুরে বেড়ায়। সংগ্রামের কোন শেষ নেই। আবহমান সংগ্রামে কোনো আপোষ থাকতে পারে না। রুদালিসংগ্রামের কোনো জায়গা নেই আধুনিক প্রাগাধুনিক সভ্যতায়। ভেরী বেজে ওঠে। রণদামামা বেজে ওঠে। প্রস্তুত হই। যুদ্ধে মাতি। আপতিক মেরুদন্ডী মানুষগুলোর বুকের উপর পা রেখে গলায় অস্ত্র ছোঁয়াই। ধর্মবোধকে আত্মবোধ দিয়ে ছিন্ন করি। পরিপূরক পরিপ্রশ্নে কেটে নিয়ে আসি মিথ্যাচারীর মাথা। বৌদ্ধিক বিনয়গাথা ভেসে আসে। অশোকগাথার পাঠ শুনি...



ঊনপঞ্চাশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

স্নেহের বজ্রনৌকা ভাসে পদ্মার জলে। ক্রূর দস্যুর দল কেড়ে নেয় সব স্থাবর সরঞ্জাম। আজ ভুসুকু কবি বাঙালি হল, সঙ্গ নিল চণ্ডালিকার। শব্দ স্পর্শ রূপ রস গন্ধ ম্লান হয়ে আসছে। ইন্দ্রিয় পুড়ে যাচ্ছে যোগির সহযাত্রায়। অশেষ মায়ায় ঘুমিয়ে যাচ্ছে মন। কোথাও কিছু নেই আমাদের। সোনা রূপার কণামাত্রও না। মহাসুখে বুঁদ হতে শিখছি। সংসার বিষয়ক পাঠ শিখছি। এক সাধনপথের বৌদ্ধিক পাঠ। আমাদের চতুষ্কোটি ভাণ্ডার সর্বাঙ্গিন শূন্যতায় ভরে এসেছে এবার। জীবন ও মৃত্যু বিষয়ক ফারাক লোপ পেয়ে আসছে দিন দিন। ভুসুকুর ক্যানভাস আলোয় মিশে যাচ্ছে ক্রমশ। আরও সুন্দরতর যোগচর্চায়..



পঞ্চাশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

আকাশের গায়ে আঁকি তৃতীয় পরিসর। আদিম ঘর। নিহিত কুঠার হাতে কণ্ঠে নৈরামণি জেগে ওঠে। মোহ মায়ার দ্বন্দ্ব ছেড়ে আসি। শূন্যগামী শবরপাদ রতিসঙ্গমে মাতে। গগনব্যাপী তৃতীয় ঘরের পাশে ফুটে ওঠে স্নিগ্ধ কাপাসের ফুল। চারপাশে প্রকৃতি সাজায় জ্যোৎস্না-স্নান। অন্ধকার কেটে আসে। আকাশে এঁকে দেয় নিটোল পুষ্পচিহ্ন। পাকা কঙ্গুচিনার গন্ধে শবর শবরী গায় নবান্নের গান। নিরন্তর মহাসুখে চুর হয়ে আসে চর্যার ক্যানভাস। অগস্ত্যযাত্রায় বাহক কাঁধে চলে শবরের শব। অযাচিত ক্রন্দনের রোল ওঠে শেয়াল শকুনের কলতানে। পার্থিব মোহ মুছে যায়। সর্বমহামহী শূন্যতার মার্গে শবরপাদ বিভোর হয়ে ওঠে...



একপঞ্চাশৎ চর্যাগীতিকোষবৃত্তি

সূনেত্যাদি শব্দের উপর টানি একরৈখিক মসীর দাগ। একটি নিটোল পদ চিরকালের জন্য মুছে যায়। পদলিপিহীন টীকাহীন একটা চর্যার পদ সাধনপথের আবর্তে ঘুরে বেড়ায় অগোচরে। একা। সিদ্ধাচার্যের দল স্মিত হাসি আঁকেন। গূহ্য সাধনার আলো জমে। কবিতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করছে বৌদ্ধ মন্ত্রের সুর। সহজিয়ার সহজসাধনের আলো ফোটে আদরের মতো। মহাবোধির মহানাদ ধ্বনিত হয়। স্নিগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখে বঙ্গদেশ। আমি আঁচলের খুঁটে রত্নমালা বেঁধে নিজের আবহমান ইতিহাস খুঁজে মরি পাশ্চাত্য নির্দেশিত কথামালায়। ভ্রান্তি কেটে আসে। চর্যায় স্থিত হই। পাঠ নিতে বসি। চর্যাগীতিকোষবৃত্তি শেষ হয়ে আসে। বহুমাত্রিক দূর থেকে নব চর্যাপদের পদধ্বনি শোনা যায়...


চর্যাগীতিকোষবৃত্তি সমাপ্ত হল।।






     অভিজিৎ পাল

Avijit Pal

Popular Posts