Adheesha Sarkar

পুরুষ-নারী কেলেঙ্কারি
এক

** লেখা শুরু করার আগেই একটা বিষয় পরিষ্কার বলে দেওয়া ভালো। আমি গণমাধ্যমে অ্যাক্টিভ নই আর। এটা যেখানেই বেরোক, আমি জানি কিছু মানুষ নেহাৎ স্বভাবদোষেই প্রচুর বক্তব্য রাখবেন। ‘নারীবাদ’ শব্দটার জন্য, আমার লেখনশৈলীর কারণে একেবারেই নয়। রাখুন, আমি চাই রাখুন। কিন্তু আমার পক্ষে কোনো ফোরামেই তর্কে জড়িয়ে পড়া সম্ভব না। আমার মানসিক শান্তি আমার কাছে অমূল্য। আমি স্বার্থপর মানুষ। তাই, পাঠক অবশ্যই নির্দ্বিধায় মতপ্রকাশ করতে পারেন। কিন্তু প্রশ্ন করলে কোনো তাৎক্ষনিক উত্তর পাবেন না। আমি দেখব অবশ্যই। এবং আপনার প্রশ্ন যদি আমার যৌক্তিক মনে হয়, পরের লেখায় উত্তর দেওয়া থাকবে। ধন্যবাদ। **


ভ্রান্তিবিলাস ও অন্যান্য

‘নারীবাদ’ শব্দটা একটা আজব ট্যাবু হয়ে দাঁড়িয়েছে আজকাল। হয়তো অনেককালই। জানতাম না। এসব ‘স্পর্শকাতর’ বিষয়ে খোলাখুলি এবং মুখোমুখি বুলি ফোটানোর মত সাহস অথবা ক্ল্যারিটি খুব কম লোকেরই থাকে। তার ওপর একজন ‘নারী’র সামনে। পাগল নাকি? কামড়ে দেয় যদি? তর্কপ্রিয় ভারতীয়র তর্কের পরিধি বড়ই লিমিটেড। মোট কথা, বিল্লিকে নিয়ে তার মুখের ওপর খিল্লি, থুড়ি... তার গলায় ঘন্টাটা কেউই বাঁধতে যেতে চায় না। 

এখন ফেসবুক থাকায় একটা সুবিধে হল, আড়াল থেকে বাক্যি ঝেড়ে কেটে পড়া যায়। ওই, অনেকটা মেঘনাদবধের মত আর কি। প্লাস, কারো পোস্ট পড়ে যদি ব্যঙ্গে আপনার ঠোঁট ৪০ ডিগ্রি বেঁকে যায়, তাহলে সেই ব্যাঁকা ঠোঁটের সেলফি তুলে পোস্ট করে তাকে ট্যাগ না করা পর্য্যন্ত পোস্টকর্তা (কর্ত্রী হয়তো) সেটা দেখতে পাবেন না। ফলে যা হয় আর কি। যা এমনিতে হয়তো মাটির নীচে অনেকদিনই ছিল তার শিকড় থেকে ফলসমেত গাছ মাটির ওপরেই দৃষ্টিগোচর হয়।
ইদানিং ‘মেন’স রাইটস’ বলে একটা উঠতি ট্রেন্ড দেখা দিয়েছে। কিছু আদ্যন্ত শহুরে, পুঁথিপত্তর সম্বলিত (অবশ্য অধিকাংশ সময়ই গূঢ় রিসার্চের মাধ্যমে হয়তো জানা যাবে যে তাঁদের পুঁথিপত্তর মূলত তাকের শোভা বাড়িয়ে থাকে) মানুষ বলতে শুরু করেছেন, ‘নারীবাদ’-এর হাইহিলের তলায় পুরুষের আইডেন্টিটি, তার স্বাধীনতা মথিত হচ্ছে, নারীবাদী মানেই সেই ঝান্ডা হাতে কন্ট্রোল ফ্রিক যে কিনা নারীবাদের দোহাই দিয়ে হিটলার-তন্ত্র চালায়, পুরুষরা বিপন্ন এর ফলে, অত্যাচারিত, নারীর সমানাধিকার নিয়ে কথা বলতে হলে ‘নারীবাদ’ শব্দের কি দরকার, ‘মানবতাবাদ’ বললেই তো চলে, ইত্যাদি। এবং, সবচেয়ে মজার কথা হল, এই বক্তব্যের ঘনঘটায় কিছু নারীরও অ্যাক্টিভ অবদান রয়েছে; শুধু যে পুরুষরাই একথা বলছেন তা নয়। এই চটজলদি মতামতের দুনিয়ায় চিন্তাভাবনা যে ঘেঁটে ঘ হবে সে তো জানা কথা। ইন্টারনেট সবাইকে বলতে দিয়েছে। এর ভালো দিক যেমন একটা বেশ বড়সড় মাস ওপিনিয়নের গঠন, খারাপ দিকটা হল ওপিনিয়ন গড়ে দু’মিনিটে গড়ে ওঠা। যাই হোক, এই দু’মিনিটের ওপিনিয়নের নিয়ন ঔজ্জ্বল্যে যা ঢাকা পড়ে যাচ্ছে তা হল ‘নারীবাদ’ শব্দটার ইতিহাস, তার গড়ে ওঠা, তার বাস্তবায়ন এবং তার মেটামরফোসিস।
পুরুষতন্ত্র সভ্যতার আদি থেকে চলে আসছে, সে তো জানা কথা। কিন্তু এই ‘পুরুষতন্ত্র’ শব্দের মানে কি? শব্দের মানের ওপর যেমন তার ব্যবহার নির্ভর করে, তেমনই, বৃহত্তর ক্ষেত্রে, শব্দের মানেই স্থির করে দেয় সভ্যতা কোন দিকে যাবে। অনেকসময়ে, শব্দের মানে গুলিয়ে গেলে সভ্যতার চলার পথ ভুল হয়েও যেতে পারে। ভাষাবিদরা হয়তো উদাহরণ সহ এমন অনেক পথ-ভোলার সন্ধান দিতে পারবেন। আমি দেখছি শুধুই ‘পুরুষতন্ত্র’ শব্দটাকে।
এক আদিম সময়ে মানুষের আইডেন্টিটি নির্ধারিত হত তার গায়ের জোরের মাধ্যমে। মস্তিষ্কের ক্ষমতা তখনো আবিষ্কার করেনি মানুষ। পশু থেকে সবে ‘মানুষে’ উন্নীত হয়েছে তারা, আর সে কথা তখনো তাদের জানিয়ে দেয়নি কোনো ইতিহাসের বই। সেই সময়ে, একদল মানুষ যারা বাহুবলে আর একদল মানুষের চেয়ে উন্নত তারা দুর্বল প্রজাতির ওপর আধিপত্য স্থাপন করতে শুরু করে। জেন্ডার নির্বিশেষেই আর কি। আর, সার্বিকভাবে, ‘নারী’ নামে যে বাহুবলে দুর্বল প্রজাতি, তাদের ওপর ‘পুরুষ’ নামে বাহুবলে উন্নত প্রজাতি স্থাপন করে আধিপত্য। যে যত শক্তিশালী সে ততগুলো গোরু-ছাগল নিজের অধিকারে রাখে, আর ততগুলোই নারী। পশুসমাজে এ নিয়ম এখনো স্বীকৃত বটে। কিন্তু প্রগতি যে মানুষকে ছেড়ে কথা বলেনি। সে উন্নতির পথ ধরে এগোতে গিয়ে আবিস্কার করে, চাকা, আগুন এবং ভাস্কর্য্য ছাড়াও, অস্ত্র। এবং সেইসঙ্গেই সে এও আবিস্কার করে যে তার খুলির মধ্যে ভরে দেওয়া আছে অসীম ক্ষমতা, যার ওজন মাত্র আড়াইশো গ্রাম। বাহুবলের চেয়ে অনেক বেশীকার্য্যকরী জিনিস এটা, সেও আবিষ্কার হল।
এই আবিষ্কারের ফলে কিন্তু সমাজের প্রকৃত চেতনা জাগ্রত হয়ে ওঠেনি। তখনও না, আজও নয়। ক্ষমতা, তা সে যে ধরণের ক্ষমতাই হোক না কেন, ইতিহাসের গোড়া থেকে মানুষ সাধারণত অপব্যবহার করেই এসেছে। ফলে, মানুষ মস্তিষ্ক খাটিয়ে অস্ত্র বানিয়েছে, বোমা বানিয়েছে, হিরোসিমা বানিয়েছে, কাশ্মীর বানিয়েছে। এবং ক্ষমতার অপপ্রয়োগের সেই একই লজিকে (লজিক হলঃ লাঠি যার মোষ তার) ‘নারী’ নামক মানুষদের তাদের আইডেন্টিটির কারাগারে বন্দী করে রেখেছে। খুলির ভেতরে যে আড়াইশো গ্রাম, তার বিকাশ ঘটলে ক্ষমতার এই অসম বন্টন নাও থাকতে পারে, পুরুষের আধিপত্য সম্বলিত যে সমাজব্যবস্থা তা টলে যেতে পারে, এই ভয়, একটু দেরীতে হলেও, মানুষের মগজে সেঁধিয়েছে। সে যথাসম্ভব চেষ্টা করে এসেছে, বহু বহু বছর ধরে, নারীর মানসিক ও শারীরিক অগ্রগতি রুখে রাখার। তাকে ঘরের বাইরে বেরতে না দেওয়ার, তার পুস্তক অধ্যয়ন নিষিদ্ধ করার, তাকে ‘আদেশ’ পালনে অভ্যস্ত এক জীবে পরিণত করার। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, তাকে সন্তান প্রজননের একটি ‘মেশিন’ বানিয়ে তোলার।
এ চর্চা আজকের নয়। খনার জিহ্বাখন্ডন হয়েছিল কেন, ভেবে দেখলে বোঝা যাবে যে নারীর বেশী কথা বলা সেই পৌরাণিক আমল থেকেই বিপজ্জনক ভাবা হত। দ্রৌপদীকে পাঁচ মরদের মধ্যে বিলিয়ে দেওয়ার রিচুয়াল দ্বারা প্রমাণিত হয়, নারীকে সামগ্রী বই তেমন কিছু হিসেবে দেখা হত না। এখানে একটা মজার ব্যাপার আছে। এই বিলিয়ে দেওয়ার রিচুয়ালে অংশগ্রহণ করেন আর এক নারী, কুন্তি। পুরুষতন্ত্র যে শুধু পুরুষের হাত ধরে এগিয়ে যায়নি তাও প্রামাণ্য। এ বিষয়ে বিষদে লিখব পরে। তার পর সেই মহাভারতেই, দ্রৌপদীকে বাজি ধরা হয় পাশাখেলায়। বাজি ধরেন তাঁর স্বামী, যুধিষ্ঠির। দ্রৌপদী জিজ্ঞেস করেন, যিনি নিজেই নিজেকে হেরে বসে আছেন, তিনি বৌকে বাজি রাখেন কোন অধিকারে? তারপর কেষ্টঠাকুর এসে শাড়ি জড়িয়ে দ্রৌপদীর ‘মান’ বাঁচায়। এই গোটা রিচুয়ালে এমনকি কেষ্টঠাকুরও পুরুষতন্ত্রের ধারক ও বাহক। বাঁচাতে চেয়ে থাকলে... তিনি ‘ভগবান’, অসীম ক্ষমতাশালী পুরুষ, পাশাখেলা বন্ধ করাতেও পারতেন। শাড়ির মিলের ঠিকাদার হওয়ার অর্থ, প্রশ্নোত্তরে যাওয়ার প্রয়োজন নেই তোমার দ্রৌপদী, অবকাশও নেই, আপাতত শাড়ি জড়িয়ে নিজের দেহটাকে ঢেকে পুরুষতন্ত্রের মান বাঁচাও। আমি হলে শাড়িটা রিফিউজ করতাম। এমনিতেও তো একজনের সামনে কাপড় খোলে না সেই নারী, পাঁচজনের সামনে খোলে, লিটারালি। আরো পনেরো-কুড়িজন একটি অসামান্য সুন্দর নারীদেহ দেখতে পেলে এমন কি মহাভারত অশুদ্ধ হত? হত। মহাভারত ‘অশুদ্ধ’ হত। মহাভারতের অশুদ্ধি যদিও প্রয়োজন ছিল। বহু শতাব্দী পর সাবিত্রী হেইনসমের অভিনীত দোপদী মেহজেন সেই অশুদ্ধি সম্পন্ন করে দেখালেন।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে ‘নারীবাদ’ সংক্রান্ত অ্যাক্টিভিজম, আলোচনা, শুরু হয়েছে অনেক দেরী করে, অনেক, অনেক দেরী করে।নারীরা সেই অর্থে সহ্য করেছেন অনেকদূর। কিন্তু যখনউনিশ শতকের আমেরিকা ও ইউরোপ সদ্যজাত ‘ডেমোক্রেসি’র ধুয়ো প্রথমে মানুষকে বোঝালো সব মানুষের বক্তব্যের অধিকার আছে, চয়নের অধিকার আছে, কিন্তু নারীর কোনো ভোটাধিকার নেই, অর্থাৎ বক্তব্য বা চয়ন কোনোটারই অধিকার নেই, তখন এত বেশীরকমভাবে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখানো হল যে ‘নারী ঠিক মানুষ হিসেবে গণ্য নয়’ যে নারীরাও অবশেষে দেখতে পেলেন। বড় দেরী করে দেখতে পেলেন। তখনো ‘ফেমিনিজম’ শব্দের উৎপত্তি তেমনভাবে ঘটেনি। এমেলিন এবং ক্রিস্টাবেল প্যাঙ্কহার্স্ট মেয়েদের ভোটাধিকারের দাবী নিয়ে ব্রিটেনে শুরু করলেন ‘উইমেন্স সোশ্যাল অ্যান্ড পলিটিকাল উইনিয়ন’।এ ধরণের আরো সংগঠন গড়ে উঠল বিভিন্নপশ্চিমী দেশে। এই আন্দোলনকারীদের ‘সাফ্রাগেট’ বলা হত, এবং আন্দোলনটিকে বলা হত ‘সাফ্রেজ মুভমেন্ট’ অথবা ‘সাফ্রাগেট মুভমেন্ট’। তাঁরা সফল হয়েছিলেন তো বটেই, কিন্তু কিভাবে, তা নিয়ে খুব কম লোককেই কথা বলতে দেখা যায় নারীবাদ সংক্রান্ত আলোচনায়। আমার আশেপাশের বৃহত্তর জনসাধারণকে দেখি বাসে-ট্রেনে লেডিজ সিট-এর বিরোধিতা করে নারীবাদকে চ্যালেঞ্জ জানাতে। লেডিজ সিট বা মহিলাদের কোটা সিস্টেম যে পুরুষতন্ত্রের অবদান, নারীবাদের নয়, সেটা বোঝার মত হয় তাঁদের ঘিলু নেই, বা আগ্রহের অভাব। যাই হোক, ‘নারীবাদ’-এর উৎপত্তি হয়েছিল প্রথম বিশ্বে। বাকি বিশ্বগুলিতে, আমি মনে করি, নারীবাদী আন্দোলন আদৌ সেভাবে হয়নি। এর পর এক দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ১৯৬৮ সালে সিমোন ডে ব্যুভিওরের লেখা ‘সেকেন্ড সেক্স’ বইটি নারীবাদী আন্দোলনকে একটা বৃহত্তর ক্ষেত্র এবং একটা তাত্বিক কাঠামো দিয়েছিল। এ নিয়ে আরো লিখব পরে।
এই এখন যা বললাম, তার মধ্যে অনেক কিছুর টুকরো টাকরা গুঁজে দেওয়া হল। এটা খানিক টিজারের মত ব্যাপার। পরের লেখাগুলোতে এই প্রত্যেকটা টুকরো নিয়েই বিষদ আলোচনা করব। নারীবাদ সংক্রান্ত এক দীর্ঘ আলোচনার জন্য এই অবধি লিখে খানিক গৌরচন্দ্রিকা করা গেল। যদিও, এই আলোচনা শুধুমাত্র আমার নিজের নারীবাদ নিয়ে যা ধারণা, সেটাই। নারীবাদী রাজনীতি নিয়ে অনেক, অনেক কিছু লেখা হয়েছে। তার মধ্যে বেশ কিছু লেখা অত্যন্ত যৌক্তিক এবং সুখপাঠ্য। এতৎসত্বেও নারীবাদকে আক্রমণ করার লোকের অভাব পড়ে না। আমি ফেসবুকে অনেকটা সময় কাটাই। আজকাল কম লিখতে লিখতে পুরোপুরি বন্ধ করেছি। এখন শুধু পড়ি। এই আজকেই কার এক স্টেটাসে চোখে পড়ল, নারীবাদ নাকি ‘লিঙ্গবৈষম্য’কে তোল্লাই দিচ্ছে। স্টেটাসটি যাঁর দেওয়ালে পাওয়া গেল, তিনি আপাতভাবে শিক্ষিত একজন মানুষ। শিল্পের সঙ্গে যুক্ত। অন্যান্য বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর মতামত এতটা অযৌক্তিক হয়ে উঠতে দেখা যায় না। তবে ‘নারীবাদ’ শব্দটা নিয়েই তিনি এমন অবোধ হয়ে উঠলেন কেন? নারীবাদ, বাই ডেফিনিশন, লিঙ্গ বৈষম্য দূর করার জন্যই সৃষ্ট, এটা বুঝতে কি এখনো অসুবিধে হয়?
এটা দেখেই মনে হল, আরো লেখা দরকার। ততক্ষণ লিখে যাওয়া দরকার যতক্ষণ ‘নারীবাদ’ শব্দটির মানে মানুষের কাছে পরিষ্কার না হয়। সমর্থন বা বিরোধিতার কোনো অর্থ দাঁড়াবে তারপর, তার আগে নয়।


প্রয়োজন আছে?

একটা সময় ছিল যখন আমি নিজেই বলতাম, “নাঃ... আমি ফেমিনিস্ট নই”। এতে সঙ্গিসাথী ছেলেপুলের দল (কারণ আমার মেয়ে বন্ধু অনেক বড় বয়েস পর্য্যন্তুই খুব কম) অতি উল্লাসে ধুয়ো ধরত, “ঠিক ঠিক! ফেমিনিজম আবার কি? হিউম্যানিজম, বল?” কেন এই কথাটা আমরা বলতাম? কেন আমি বলতাম? কেন বলতাম যে আমি ফেমিনিস্ট নই? আজকের সমাজে একজন সচেতন নারীর ফেমিনিস্ট না হওয়ার ঠিক কি যুক্তিসঙ্গত কারণ থাকতে পারে? তার কি সত্যিই আর কোনো উপায় আছে ফেমিনিজমকে উপেক্ষা করার? না। তাহলে কেন বলতাম? মানেটা খুব সহজ। তখন আমি ‘ফেমিনিজম’ শব্দটা কথাবার্তায়, আড্ডায়-তর্কে খুব সাবলীলভাবে ব্যবহার করলেও শব্দটা নিয়ে আমি তত ভাবিনি। একটা ধোঁয়াটে আইডিয়া ছিল। তেমন জানতামও না। অতএব, ভাবিনি।
যখন বেশ কিছু জিনিস চোখে লেগে চোখ কটকট করে, তখন ভাবতে বাধ্য হই। এই যেমন, ঐতিহাসিক ভাবে নারীবাদী আন্দোলনের ফার্স্ট, সেকেন্ড, এবং থার্ড ওয়েভ যে অসাম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিল, সেগুলোর কিছু কিছু এখনো পৃথিবীর বেশ কিছু সমাজে বর্তমান। এখনো এমন দেশ আছে, যেখানে একটি মেয়ে ধর্ষিত হলে তাকেই চাবুক খেতে হয়, তারই প্রাণদন্ড হয়। আর আমাদের এই নিজের দেশেই ‘ধর্ষক’ শব্দটার মানে ও সেই মানে-সংক্রান্ত রাজনীতি এতই জটিল, যে মূল সমস্যাই গেছে ঢাকা পড়ে। কখনো সখনো শহরের রাস্তায়ঘাটে ধর্ষণ হলে তার খবর ছড়িয়ে পড়ে। এটা খেয়াল থাকে না, যে বহু বহু বছর ধরে শহরতলি বা গ্রামাঞ্চলে ধর্ষণ একটা দৈনন্দিন ঘটনা। এতই দৈনন্দিন, যে বেশ কিছু ক্ষেত্রে মেয়েরা সেটাকে জীবনের একটা অপরিবর্তনশীল নিয়ম বলেই মেনে নিয়েছে। এই মেনে নেওয়া, এই চুপ করে যাওয়া, একটা সাঙ্ঘাতিক অসম সমাজ তৈরী করছে যেখানে একদিকে ‘প্রগতিশীল’ শহুরে সমাজের সাবলীল চিন্তাধারা ‘নারীবাদ’ শব্দটা এখন আর আদৌ একটি প্রযোজ্য শব্দ কিনা, এগুলো আসলে কাঁদুনি গেয়ে সুবিধে হাতানোর ছুতো কিনা, এমনিতে তো সাম্যবাদই সঠিক দৃষ্টিভঙ্গি, একটা ‘জেন্ডারড’ অ্যাঙ্গল থেকে পুরো ব্যাপারটা দেখা উচিৎ কিনা, এইসব নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করেছে। করেছে, কারণ তাদের চোখে অসাম্যের প্রকাশ তত স্পষ্ট এবং দগদগে নয়। অন্যদিকে, এই শহরের এক-দু মাইলের রেডিয়াসের মধ্যেই, ফিরতে একটু সন্ধ্যে হলেই অন্ধকার রাস্তার ঝোপঝাড় থেকে আচমকা কিছু হাত বেরিয়ে এসে একা মেয়েকে টেনে নিয়ে যায় জোর করে ভোগ করবে বলে। অনেক ক্ষেত্রেই, তার মুখ খোলার চিন্তাটাও অবাস্তব। ভয়, ইন্সিকিওরিটি, সামাজিকভাবে একঘরে হয়ে যাওয়ার পরিণাম, ইত্যাদি কারণে। চাবুক নয়, মৃত্যুদন্ড নয়, কিন্তু তার চেয়ে খুব ভালো কিছুও নয়। এর সঙ্গে আবার উত্তর ভারতীয় অঞ্চলগুলোতে খাপ পঞ্চায়েতের চোখ রাঙ্গানির বিধানসভা রয়েছে। ধর্ষণের অভিযোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বুমেরাং হয়ে ফিরে অভিযোগকারীর দিকে। কি করবে এই মেয়েগুলো? সাম্যবাদে বিশ্বাস রাখবে, যখন খুব স্পষ্টভাবে এক্ষেত্রে আক্রান্ত মানুষগুলোর খুব স্পেসিফিক একটা জেন্ডার রয়েছে? না, এরাও নারীবাদ নিয়ে ভাবে না অবশ্য। যাদের ভাবার অবকাশ আছে তারাই ভাবে না, আর এরা। এদের তো নিজেদের জীবিত ও অক্ষত রাখতে পারার লড়াইটাই প্রতিদিনের।

এদের নিয়ে আমরা ভাবতে পারতাম। ভাবতে পারতাম, কেন দুনিয়াসুদ্ধ এতগুলো মানুষ এতদিন ধরে বলে আসছে যে এই লড়াইয়ের একটা জেন্ডার আছে। ভেবে দেখতে পারতাম, পারি, খুব ভালো করে না জেনেই এক হঠাৎ-জোশের বিরোধিতা না করে।

ফিরে যাওয়া যাক নারীবাদের ইতিহাসের দিকে। কিভাবে শুরু হয়েছিল, কিভাবে এগিয়েছে, কিভাবে ও কোথায় দাঁড়িয়ে আছে। উনিশ শতক দিয়ে নারীবাদী আন্দোলনকে চিহ্ণিত করা গেলেও, নারীবাদী লেখালিখি তার অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে, যদিও হয়তো সচেতনভাবে নয়। ১৫শো, ১৬শো, ও ১৭শো খৃষ্টাব্দেও নারীবাদী লেখালিখি করেছে অল্প কিছু মানুষ। সিমোন ডি ব্যুভিওর তাঁর লেখায় এঁদের কথা বলেন। ১৯১৮ সালে সাফ্রাজিস্টরা দীর্ঘ আন্দোলনের পর ভোটিং রাইটস আদায় করতে পারার পর নারীবাদী আন্দোলন ঐতিহাসিকভাবে এক স্বীকৃত জায়গা দাবী করতে পারে। তখনো কোনো সুগঠিত ধাঁচা ছিল না এই আন্দোলনের। সিমোন ডি বুভ্যিওর নিজে উঠে আসেন আরো পরে, সেকেন্ড ওয়েভের সময়ে। তাঁর লেখার মাধ্যমেই গোটা জিনিসটা একটা স্ট্রাকচার পায়। ফার্স্ট ওয়েভ যাকে বলা হয় তা প্রধানত ছিল ভোটাধিকার দাবী করার অন্দোলনটুকু। সেকেন্ড ওয়েভের নারীবাদীরা অবশ্য আরো গভীরভাবে নারীর অবস্থান ও তার অধিকার নিয়ে ভাবতে শুরু করেন। উঠে আশে আইনি অসাম্যগুলোর কথা।নারী-পুরুষের সামাজিক অসাম্যগুলোকে তারা আরো প্রকটভাবে চিহ্ণিত করতে থাকেন। শুধু ভোটধিকার নয়, সামাজিক, সাংস্কৃতিক, এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে নারীর অবস্থান এবং অধিকারের গন্ডীগুলোকে প্রশ্ন করতে শুরু করেন তাঁরা।

আরো দু’পা এগিয়ে গিয়ে সিমোন ডি ব্যুভিওর লেখেন, “one is not born a woman, but becomes one”. নারীবাদী existentialism নিয়ে লিখতে গিয়ে এই আবিষ্কার একটা অন্য চিন্তার দিগন্ত খুলে দেয়। ‘সেক্স’ অবশ্যই বায়োলজিক্যাল। কিন্তু ‘জেন্ডার’? সেটাও কি বায়োলজিক্যালি ডিফাইন্ড? একজন নারী কি নারী হয়েই জন্মায়? না সে নারী হয়ে ওঠে?


হয়ে ওঠার কথা

একজন নারী নারী হয়ে জন্মায় না, সে নারী হয়ে ওঠে। মানে কি এই কথাটার? মানে হল, এই ধরুন চার-পাঁচ বছর বয়েস পর্য্যন্ত যে কোনো বাচ্চা বাচ্চাই। তার যৌনাঙ্গ যে প্রকৃতিরই হোক না কেন। ‘স্বাভাবিক’ বা ‘সাধারণ’ নিয়মে, এটাই। কিন্তু তারপর সেই বাচ্চাটিকে সমাজ মনে করিয়ে দিতে থাকে যে তার জেন্ডার কি। সে নারী, না পুরুষ। এক্ষেত্রে একটা কথা যোগ করা ভালো। একজন পুরুষও কিন্তু পুরুষ হয়ে জন্মায় না। সেও হয়ে ওঠে। সিমোন ডি ব্যুভিওর থেকে শুরু করে যে আনুক্রমিক দেখা, তাতে আমরা নারীর ‘other’ হয়ে ওঠার প্রসেসটার দিকেই তাকাই বেশী। সেটা গুরুত্বপূর্ণ বলেই। কিন্তু পুরুষের ‘central’ হয়ে ওঠাও একটা সামাজিক স্ট্রাকচারের অন্তর্গত প্রসেস। পুরুষতান্ত্রিকতার শিকড় বুঝতে গেলে এবং নারীবাদের কন্টেক্সট বুঝতে গেলে সেদিকে তাকানোটাও প্রয়োজন। 
একটা বয়সের পর থেকে, প্রথমত, বাচ্চাদের খেলনা ও খেলার সাথী আলাদা হয়ে যায়। যে কোনো সমাজে এটা একটা খুব স্ট্যান্ডার্ড প্র্যাকটিস। মেয়েরা পুতুল নিয়ে খেলবে, তাদের খেলনা হবে রান্নার সরঞ্জাম। ছেলেরা ব্যাট-বল খেলবে, বন্দুক নিয়ে খেলবে, ইত্যাদি। ছেলেরা ছেলেদের সঙ্গে খেলবে, মেয়েরা মেয়েদের সঙ্গে। একান্তই মিলমিশ হতে গেলে তারও গন্ডি থাকবে, থাকবে সুপারভিশন। মেয়েদের খুব বেশী দৌড়ঝাঁপ করতে বারণ করা হয় আর একটু বড় হলেই। আর রজস্বলা হলে তো কথাই নেই। তার ‘পেলবতা’ তাকে নিয়মের মত করে পালন করতে বলা হয়ে থাকে। এখন কিছু কিছু শহুরে প্রগতিশীল পরিবারে হয়তো ব্যাপারটা বদলেছে, কিন্তু সেগুলো এক্সেপশন। একেবারেই এক্সেপশন। এবং প্রায় সারা পৃথিবীতেই, কিছু কিছু ছোট ছোট মার্জিনালাইজড জনগোষ্ঠী বাদ দিলে। অন্যদিকে, পুরুষের ‘পৌরুষ’ও গড়ে তোলা হয় একই নিয়মে। ‘মনসুন ওয়েডিং’ সিনেমার ওই বাচ্চা ছেলেটাকে যেমন রান্না করতে ভালোবাসে বলে বকুনি খেতে হয়, দেওয়া হয় হস্টেলে পাঠিয়ে দেওয়ার হুমকি
একটা সমাজের যে গঠনকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে দুনিয়ার যে কোনো (বা প্রত্যেকটি) রাজনৈতিক মতবাদ, সেই সমাজ তৈরীই হয়েছে এই ‘নিয়ম’গুলোকে ভিত হিসেবে রেখে। সমাজগঠনের আদিমতম স্ট্রাকচারের অন্তর্গত পুরুষ ও নারীর আইডেন্টিটির গঠিত বিভাজন।
এগুলোকে ‘স্বাভাবিক’ হিসেবেই ধরা হয়। কারণ বছরের পর বছর, যুগের পর যুগ, শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এরকমই মনে করে আসা হয়েছে। এভাবেই পুরুষ পুরুষ হয়ে উঠেছে, নারী নারী। এই দুই জেন্ডারের যাবতীয় স্বভাব-চরিত্র, চলন-বলন, গঠন-আচরণ, এমনকি শারীরিক শক্তির যে অসাম্য, সেটা যতটা না প্রাকৃতিক নিয়মে তার চেয়ে অনেক বেশী দীর্ঘকালীন ধরে স্থাবর হয়ে ওঠা এক জগদ্দল সামাজিক মানসিকতার কারণে। 
একজন পুরুষ বাড়ির বাইরে বেরবে, সে অর্থ উপার্জন করবে, এটা ‘স্বাভাবিক’। একজন মেয়ে ঘরের ভেতরে জীবন কাটাবে, সে ঘরের দেখভাল করবে, দেখভাল করবে সন্তানের, এটা ‘স্বাভাবিক’। পুরুষ যুদ্ধে যাবে, নারী বিনোদনের ও রিপুতুষ্টির ভার নেবে। পুরুষ সমাজ ও রাজনীতিত হাল ধরবে, নারী হাল ধরবে অন্দরমহলের। এখন যে লোকে বলে ব্যাপারটা বদলে গেছে, সেটাও ওই ‘স্বাভাবিক’ নিয়মের বাত্যয়কে রাজনৈতিক স্বীকৃতি দিয়েই। আর কথা হল, আপনা-আপনি কিছুই বদলায়নি। দীর্ঘকালীন বিরোধ, প্রশ্ন-তোলা, ও বিভিন্ন ধরণের লড়াইয়ের মাধ্যমেই ঘটেছে এটা। যেগুলোর প্রকাশের সমন্বয়কে এক কথায় নারীবাদ বলা যেতে পারে। কিন্তু এই যে বদলেছে, এই বদল কি সমাজের প্রত্যেক স্তরে সমানভাবে ঘটেছে? অথবা, সমাজের প্রত্যেক স্তরে কি আদৌ ঘটেছে? আদৌ কি ঘটেছে পৃথিবীর সমস্ত অংশে? সেকথা তো বলা যায় না। নারীবাদী মতাদর্শ বা রাজনীতির প্রয়োজনীয়তার এটা একটা বড় নির্ধারক।
এই গঠিত ‘স্বাভাবিকতা’ এখন দুটি আলাদা জেন্ডার হিসেবে মন-শরীর-মনস্তত্বে এত গভীরভাবে প্রথিত হয়ে গেছে, যে শুধুই সচেতনতা দিয়ে একে ‘কারেক্ট’ করা খুব মুশকিল। শুধু তো ব্যক্তির মন, শরীর, ও মনস্তত্বও ব্যক্তিত্বের ওপর এর প্রভাব নয়, এর প্রভাব সামাজিক আচার-রিচুয়ালের মধ্যেও বটে, সাংস্কৃতিক প্রকাশভঙ্গিমার মধ্যেও বটে। এর প্রভাব আরো বেশী করে ধরা পড়ে ভাষায়, শব্দের ও তার অর্থের যে রাজনীতি, তার মধ্যে। ‘নারী’ শব্দের প্রতিশব্দ ‘ঘরণী’ (যে ঘর করে), ‘রমণী’ (যে রমণ করে), ও ‘জননী’ (যে জনন করে)। প্রতিশব্দগুলো ব্যবহারিক কার্য্যকারিতার প্রেক্ষিতে নির্বাচিত হয়েছে। পুরুষের কাছে নারীর ব্যবহারিক কার্য্যকারিতা। সমাজের কাছে নারীর ব্যবহারিক কার্য্যকারিতা।
এই যে সংস্কৃতির গঠন, ভাষার গঠন, আচার-রিচুয়ালের গঠন, এও গঠন করে ব্যক্তির মনস্ততত্বকে। তারপর এরই লজিক্যাল প্রোগ্রেশন হল সমাজের নারীর প্রতি ব্যবহার, তার প্রতি অবজ্ঞা, তার প্রতি অত্যাচার, ভায়োলেন্স। এবং, অন্যদিকে, সমাজের পুরুষের প্রতি ব্যবহার, তাকে অহঙ্কারী করে তোলার প্রক্রিয়া, তাকে অত্যাচারীর ভূমিকায় শেষ পর্য্যন্ত দাঁড় করানোর প্রক্রিয়া। ব্যাপারটা এক ঝটকায় একবারে হুট করে লুফে নেওয়ার মত বা ঝেড়ে ফেলার মত সহজ নয় কোনোভাবেই।
আমাকে এসব বোঝাতে বোঝাতেই নিজে বুঝতে হবে। বুঝতে বুঝতেই বোঝাতে হবে। এই লেখাটা একটা জার্নি। তবে, নারীর এই ‘হয়ে ওঠা’-র প্রক্রিয়ার সহজ স্বাভাবিক সম্মুখ-বিরোধিতা নতুন কিছু নয়। নারীবাদী আন্দোলন তো সেই নিয়েই। কিন্তু এই আন্দোলনের চলনেও আমি কিছু কিছু ভ্রান্তি দেখতে পাই। এবং হয়তো, আর একটা অন্য পথও থাকতে পারে? থাকতে পারে কি? এই জার্নিটার মধ্যেই সেই প্রশ্নটার উত্তর খুঁজব আমি। 
(ক্রমশ) 

অধীশা সরকার
Adheesha Sarkar