Barin Ghoshal


মৃত্যু-ইকোলজি

শীর্ষক এই শব্দস্থাপন আমার খুব প্রিয়। অনায়াসে হাজির হয় আমার কবিতায়। ‘লু’ – আমার এই বইয়ে এই শব্দের বহুল উপস্থিতি। একবার ভেবেওছিলাম, আমারই লেখা ‘কবিতার ফ্যালাসি’ গদ্যে বলা – “কবি একটা বিশেষ শব্দ-উদ্ভাবন বারে বারে ব্যবহার ক’রে প্রমাণ রাখতে চায় যে, সেটির পেটেন্ট হয়ে গেল, আর কেউ মেরে দেবে না”– আমি সেরকমই কোন চক্করে পড়ে যাইনি তো ?
    মৃত্যু-ইকোলজিঃ --- কয়েকটা ব্যবহার ছিল এরকম ----
 ১)    ফোলা মোমের শিল্যুট আর ডেটলের রেমিংটন গন্ধে
       মৃত্যু-ইকোলজি আমি ভুলব না
       রাকস্যাকে আমরা যৌনজড়িত খাসপক্ষ... ... ...                   (ফোলা মোমের গন্ধ)
  ২)   গলতে গলতে একজোট হচ্ছে সুলতা
       ইকোলজির সংসার ছেড়ে বেরিয়ে আসছে ... ... ...                (        ,,        )
   ৩)   কয়লা থেকে ফিরে আসা
        পেট্রল থেকে ফিরে আসা ফসিলের টুটা ফাটা শব্দ
        শোনা ইকোলজিতে ঘোরানো হিসির অক্ষর ... ... ...              (দলমার ব্লু প্রিন্ট) 
   ৪)   মৃত্যুকালীন আচরণের মধ্যে তাকে আমরা ফুটে উঠতে দেখি
        দেখি প্রজাপতিও
        আল্পনার ব্লোআপে তিনসারেগা বটানিকা রঙ
        চলল জানলা
        আমরাও চলি সমান্তরাল কবরচাষীর সাদা বিছানাগুলো... ... ...    (হাসপাতাল সিরিজ -- ৭)
   ৫)   বর্ষাকালে যখন বৃষ্টি পড়ছে না তখন এক শীতমেশিনের শব্দ ওঠে
       এক মৃত্যু-ইকোলজি
       এক সবুজশান্তি নামে স্নাবিক স্নাবিক ক্যাম্প খুলিয়ের চলনে ... ...  (শব্দের প্ল্যান – ১১)   
   ৬)   শারীরিক চিঠিগুলোর ডাক কিন্তু ডাকে না কাউকে
        মৃত্যু-ইকোলজির মধ্যে অথচ একটাই ফিটিং প্রিয়
        নিশ্‌ গন্ধ... ... ...                                              (শব্দের প্ল্যান – ১৪)
    কবির কল্পনা আর কল্পনাশক্তি। এই দুনিয়াটাই এক কল্পনা। কল্পনাচ্যুত হয়ে বা, কল্পনার অভাবে পতন আঘাত সম্ভাবিত হয়ে ওঠে বিরূপে। সারফেস টেনশন বা তলটান দুনিয়ার ছয়টি বলের অন্যতম একটি। তলটান বলে – সমবস্তুর অংশরা, বিশেষ – তরলে দ্রষ্টব্য, কাছাকাছি হলে দ্রুত একত্র হয়ে যায়। মেঝেয় পড়া জলটুকরো গড়ানোয়, পারদের, দুধের সমগোত্রিয় আচরণ তুমি দেখেছো। আবার আরো দেখেছো উত্তর-দক্ষিণ চুম্বক কেন্দ্রের ব্যবহার, নারী-পুরুষের ব্যবহার, ইলেকট্রন-প্রোটন সমৃদ্ধ বস্তু-অবস্থার ব্যবহার, জীবন-মৃত্যু দাঁড়িপারের আচরণ। এরা অংক জানতো না, কিন্তু তাদের ভেতরে অংক আছে। আছে কোলের হাহামমতা। কল্পনার জন্যও খানিক শিক্ষা প্রয়োজন।
     যখন তুমি টেবিলে বসে শব্দের প্ল্যানগুলি হারিয়ে ফেলো, মৃতশব্দ-সজ্জা সম্ভব হচ্ছে না বুঝতে পারো, অন্য কবিদের কবিতা থেকে শব্দরান্নার তেল ফুরিয়েছে মনে করো, তখন তোমাকে বাইরে চেয়ে দেখতে হবে। তোমার অভিজ্ঞতার ফিল্মগুলো চালাতে হবে। তোমার অপর-সত্ত্বাকে বাইরে গিয়ে বেড়াতে দিতে হবে নিখিলে চরাচরে মানুষের ভিড়ে স্পার্কের খোঁজে। মানো কিনা, তোমার প্রাণবন্ত শরীরকে সঙ্গত নিয়ন্ত্রণে রাখে শারীরিক চিঠির মতো শরীরের অভ্যন্তরে চলমান একটি ইলেকট্রন প্রকল্পনা যার বৈদ্যুতিক এবং চৌম্বক ফিল্ড আছে তোমাকে ঘিরে, যা কখনও উত্তেজিত হলে ইনফ্রা-ইলেকট্রনিক ক্যামেরায় তার ছবি ধরা পড়তে পারে এও জানো কিনা যে যদি আমার ফিল্ডে দশটি, say, ইলেকট্রন বল থাকে আর তোমার থাকে এগারোটি – তাহলে আপেক্ষিকভাবে আমি পজিটিভ আর তুমি নেগেটিভ – আমাদের ফিল্ডগুলি এবং আমরাও পরস্পর আকর্ষণ অনুভব করব। পৃথিবীতে সেভাবেই বিভিন্ন দৃশ্য, শ্রবণ, ঘটনা, মানুষ, কথা কবিতা হয়ে ধরা দেবে তোমার কাছে, এবং ঘটবে স্পার্ক। তোমার কাল্পনিক অভিজ্ঞতা থেকে গলগল ক’রে বেরিয়ে আসতে চাইবে শব্দরা।
    ‘অতিচেতনার কথা’ বইটাতে দেখো দ্বিতীয় জীবনের কথা বলা আছে। কবির দ্বিতীয় জীবনে এই অপর সত্ত্বার বাস, যা কেউ জানে না। এ কী কাউকে বলার মতো ? হয়ত অনেকেরই সেই বোধ আছে এবং ব্যবহার করে থাকে কিন্তু পরিষ্কারভাবে টের পায় না বা, বলে সন্দেহভাজন হতে চায় না। কবি কয়েকরকমেরই হয়। অবোধ কবি, ভিখারী কবি, সেয়ানা কবি, পাগল কবি – এই শেষের জন ছাড়া বাকি সবাই চেষ্টা করে জার্সি লুকিয়ে অস্বচ্ছ হবার। কেবল পাগলের হুঁশ নেই। সে তার হিবিস্কাসি অস্তিত্বের কথা বলে ফেলতে দ্বিধা করে না। মৃত্যুকালীন আচরণের মধ্যে তাকে আমরা ফুটে উঠতে দেখি। ফসিল ভাবলে মিথ ভেঙে ফেলি। শারীরিক চিঠির ডাক এজন্যই ডাকে না সবাইকে। তারা কবিতা লিখবে কী ক’রে যারা টেরই পেল না উৎস কবিতা ? তা হলে যা সব হচ্ছে বা বলা হচ্ছে চারপাশে সে সব কী ? সে অন্য গল্প, অন্য কোনসময়ে।
    ধরো আমার অপর সত্ত্বা বেরিয়েছে কবিতার সন্ধানে। আরো অনেক কবিদের মধ্যে তুমিও বেরিয়েছো, মানে অনেক কবির অপর সত্ত্বারা। তুমি আমাকে চিনতে পারবে ? উৎস কবিতাকে তুমি বা তোমরা কি একই রকম দেখছো ? না। তা হতে পারে না। এই সত্ত্বা অলৌকিক কিছু নয়, রাতেই বেরোয়, তা-ও না – আমি কোন ভুতুড়ে ব্যাপারে যাচ্ছি না। পরিবেশেই খুঁজি পরিবেশ নষ্ট না ক’রে। এটাই মৃত্যু ইকোলজি। তোমার কল্পনাশক্তিকে বাড়াও না। সেটাও অভ্যাসের ব্যাপার। এভাবেই কাল্পনিক অভিজ্ঞতা বাড়ে, অর্থাৎ বাস্তবিক অভিজ্ঞতার অনেকটাই কাল্পনিক অভিজ্ঞতায় পর্যযবসিত হয়। একইভাবে তা শিবিস্কাসি আচরণেও খাটে।
    যদি সবাই বলে – আরে, এতো আমাদের সবারই হয়, সবাই জানি – এ আর নতুন কথা কি হল ? তাহলে বলি, নিউটনই কি প্রথম আপেল পড়তে দেখেছিলেন ? ওপরের উদাহরণগুলো আমার এই সব উদ্ভট কল্পনার ফসল যা এই নিবন্ধে র‍্যাশনালাইজ করার চেষ্টা করেছি। এসব শুধু কবির, পাঠকের নয়। পাঠক কবিতালিপিটি হাতে পেয়ে কোন হিবিস্কাসের কথা না ভাবলেই ভাল। কবিরাই ভাবে না – পাঠক কোন দুঃখে ভাবতে যাবে ? তাদের কল্পনাশক্তিও তো সীমিত। তাতে দুটো টুং টাং বেজে ওঠাই যথেষ্ট।



বর্ফানি বাবা

বরফের মনে বরফ পড়ছে
তখন সাদা কালোর যুগ
পোড়া মন
এসব কথার কথায় খুব রোমাঞ্চ হবে যা ক্যামেরা পারেনি
    ং
         ং
কত কাল ধরে নির্জন মানুষের কানে উদ্বাস্তু গুঞ্জন
তাদের গুম্ফা
তাদের বর্ফানি বাবা
#
যেদিন তোমাতে আমাতে আলোতমা আলতামাশা আলতামিরা আলকায়দা খেলা চলছিল
আর তোমাকে বলছিলাম বনসবুজের তৃণ নয়
মধুকুপি ঘাস আমাকে দেখিও সোনা
#
কাচ ভেঙ্গে যাবার পরেও গেলাসের জলে নামছিল একটা দানারং-এর সবুজ
#
পরিচ্ছদে কলম গোঁজা আর কোটরে চোখ
বন্যা আর অবন্যার দেশে এরকম দখল নিচ্ছো ওগো ধোঁয়াময়




বাড়ি ফেরা

রাতের দূরে তিছোট্ট এক পা
                 চটিত চটুল শব্দ বারে বারে
সকালে সকাল আঁকা খেলনাগাড়ির ভোর
এখন বৃষ্টিতে ভিজছে
দূর বীন থেকে বাতাস হেলেছে এবার
বাড়ি ফিরে চলো বাড়িকে ফেরাও কোথায় বাড়িতে চলো
#
নুনছালের ওপর বাঁকাকাশের ছায়াভলক গাড়ি ফুঁ দিচ্ছে না
ল্যান্ডমাইনের মাইমে বসা আবহবার্তায় নয়েজ ইলেকটনি চলবে এখন
#
নয়েজে নয়েজের তার
তারে তারে শিশুহাসির ধারণা
ধারণাগুলোর মধ্যে ফুটে উঠেছে নয়নময় হাসপাতালের অ্যানিমেশন
উইন্ডো গবাক্ষে জানালাকার আয়তছবিগুলো যার পর
মগডাল
      পাখিবন্দর
               লগবুক র‍্যাডারে অধরের স্কুটার চিহ্ন
জন মানুষ নাই
#
বোতল ওপেনার
চলা ফিরিয়া বাড়ি খালি বোতলের মধ্যে
জ্বলন্ত দেশলাই ফেলা দপ্‌ করেছে ভুক
দেশলাই কারখানার মাথায় উড়ছে স্বাধীনতার তর্জমা
#
বারান্দাটা আমার ভেতর দিয়ে গেল
রেখে গেল স্যাভলনের গন্ধ কুঠার
বিজলিবাতি আবিষ্কারের গল্প পিছিয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন
শ্রমিকদের রাকস্যাকে ঠাঁই হল না
                    লোটা কম্বল অচেনা ঘুঘুর
বাড়ি ফিরে চলো পায়রা পারারা
পারাদের মধ্যে হাওয়ারা
হাওয়ার মধ্যে মনরা মনের অপেক্ষা করছে তুবড়ি ফুলঝুরি
বাতানুকুল মনটার কার্টুন দেখে যাও



ডেরিভেটিভ

পাহাড়ে কাহার মন      রমণ
হিমে       হুঙ্কারে      নাজুকানায়
বরফে ব’সে মদ খেয়েছে মনে         রমতা যোগী
এসব দেখে প্রবন্ধে কে বন্ধ
#
দীর্ঘ বালিকাবেলা         বাল মেঘ        বিউটি পার্লার
প্ল্যানমেলানো ড্রইং শিট 
            এলিভেশন  
শব্দগুলোর শব্দ        তারই ডেরিভেটিভ
মাই ফুটে উঠছে
চারপাশে চোখ
#
ফুল ফোটার শব্দ ফুলেরা শোনে না
অংক বয়ে যায় নৌভারে



ফেরারি ইয়ার

ঘাসের গান
      জলের গান
            কলগানরা সবাই কোথায় গেল
কান নিয়ে কোন পাখি
জলসারোল-এর রায়বেঁশে পদ্যখানি শো দিয়েছে খেলায়
কবিতাটির কোন নকল জিনোম ছিল না তো
কোন মেঘ অন্য মেঘে
           অন্য বিবিদের বাদশায়
পদ্যখানি চাল-বিরহীর আর বাড়ে না
মেঘের কাটিং কেটে ঘুড়ি
              ঘুড়ি পেরিয়ে তারা
তারা তিমিরের আপসিন ওই সুতো
                                      খিঁচ পাগ্‌লে
#
অনেক ফুটো
            ছাদটা ছপ্পর হয়েছে অ্যাদ্দিনে
জল পড়ে          তারা ওঠে
দিন রাত্তির দূরত্ব কেটে যায় ফেরারিয়ারে
তার ক্যামেরা প্যান করেছে চোখে
চোখ কী সব দেখছে        আলোফুল
এত ভাল তারকার চুলো নাকারো
ডাকবন্দী হয়ে বসা মন রে মুন
                        কার্নিশে কার নিশ
#
সহকথা না থেকে যায় না এই প্রেমে যে
বন্যার দিনে বন্যা
                  অন্যায়ে অন্যায় আসবেই
ছায়া ছলছল করবে
আড়িও পাতবে সঙ্গমে
আজ ঘাস গাইছে    গাই ঘাসছে    আমাদের স্ত্রীমায়ানো বাড়িতে

ঝরণা ঝরে রে-তে মরনা মরে রে হোক তাহলে

বারীন ঘোষাল
Barin Ghoshal