Niladri Bagchi


কি করা যায়???


মৃতের শ্লেষ্মার মতো এইসব অন্ধকারে পশ্চিমের সূর্য দেখা যায়...

বারান্দায় চেয়ার পেতে বসি। ভাবি আর কতবার এই বসা ক্রিয়াপদের ওপর নির্ভর করে পরবর্তী চিন্তায় যেতে হবে। এই যে অবলম্বন যা কিনা জুতসই একটি ভূমিকা, যেন গল্প শুরু হবে, আবহাওয়া নির্মাণ হবে- এর কোনও প্রয়োজন আছে কি?

দিন তো আসলে বৃক্ষরোপণ উৎসব নয় যে একটি গাছ ঘিরে অনেক ক্যামেরা ও হাস্যজ্জ্বল মুখেরা আর সদা গম্ভীর ও পরিবেশ অনুযায়ী ঈষৎ মোলায়েম ও কোনও কোনও সময় সামান্য বিনীতও, একজন বৃক্ষদরদী সেই গাছের গোড়ার মাটি খুরপি দিয়ে সাবধানে সমান করে দেবেন।

দিনের তো পরিবেশ লাগে না। নিষিদ্ধ পল্লীর বিছানা, হোটেলের চৌকি, প্ল্যাটফর্মের বাড়তি কি ফুটপাতের কোণা সর্বত্রই দিন একইভাবে শুরু হয়। ও হ্যাঁ, বহুতলেও।

দিন শুরু হয় মিউনিসিপালিটি কলের জলের শব্দে, পেচ্ছাপের শব্দে, ধর্মস্থানের প্রহর ঘোষণায়, প্ল্যাটফর্ম হকারের ডাকে। দিন শুরু হয় চোখ খুলে, নিজের অবস্থানকে খুঁজে- খোঁজার তাগিদে দিন শুরু হয়। তখন সূর্য উঠে আসছে ঠেলে বা হয়তো কুয়াশা, হয়তো প্রবল বৃষ্টি। তবু শুরু হয়।

একবার দিন শুরু হল বেলায়, মাছভাজার গন্ধে। সরু সিঁড়ির এক পুরনো বাড়ির চিলেকোঠা চৌকি। অবিন্যস্ত শয্যা। শব্দের কর্কশ বিন্যাস চতুর্দিকে। একটাই জানালা। তার নীচে স্টোভে মাছভাজা হচ্ছে। ফারাক কেবল এটুকুই যে দিন শুরু হল গন্ধে, সাথে নিশ্চয় মাছভাজার ছ্যাঁকছ্যাঁক শব্দও ছিল। তবে তা খেয়ালে আসে নি। ফলে গন্ধ। তারপর সব এক। নিজের অবস্থানকে খোঁজা ও খোঁজার তাগিদ।

চিন্তা একটি মনুষ্য অগম্য স্থান। চিন্তার অনুবাদে কোনোভাবেই প্রকৃত চিন্তা ধরা পড়ে না। 

শৈশব পারে জীবনকে প্রশ্ন করতে, ‘কি করব?’ গুরুজন বিরক্ত হন। ধরেই নেন খানিক আগে এটা বা ওটা করিস না বলার ফলশ্রুতি এই প্রশ্ন। যদিও তলিয়ে ভাবলে ওইটাই সবচে’ সনাতন প্রশ্ন, কি করব?

দিন তো শুরু হল। কিন্তু তারপরই এই যে নিজের অবস্থানকে খোঁজা বা খোঁজার তাগিদ। তখনই অনিবার্য প্রশ্ন, কি করব? বেশ, বাথরুমে যাব, দাঁত মাজব, সকালের চা জলখাবার, অফিসের প্রস্তুতি ও বেড়িয়ে পড়া- ঠিক আছে। কিন্তু কি করব?

আমার তো আজ সকালে ভূ প্রদক্ষিণ করার কোনও কথা ছিল না। কোনও অনিবার্যের মুখোমুখি হবার দায়ও নেই। তবু কি করব?

তবে এখানে একটা কথা খোলসা করা উচিত। কি করব তার সমস্যা যে জীবনে সম্পৃক্ত নয়। জীবন যার কানায় কানায় সে চিন্তা করে কখন করব?  কি করব তার বিষয় যে জীবনে নেই। জীবন থেকে খানিক বাইরে দাঁড়িয়ে যে জীবনকে দেখছে। স্টেশনে দাঁড়িয়ে থ্রু ট্রেন দেখছে যেন। অন্যমনস্ক এইসব মানুষেরা, অকারণ। যদিও মনস্কতারই কারন হয়। অন্যমনস্কতার থাকে বড়জোর এক দুটো দারুণ অজুহাত।

সাধারণতঃ রেলস্টেশন সংলগ্ন অঞ্চলে একটি বাজার থাকে। মুদিখানা, সবজি, মাছ ব্যবসায়ী, ফলওয়ালা। কাটা মাংসের দোকান। দু একটা জামা কাপড়ের গুমটি। এ অবশ্য মফস্বলে। নাগরিক বাজারের বিন্যাস এত অল্প শব্দে হয় না। তবে আমার এই শুরু হওয়া দিনের সাথে মফস্বলই মানানসই। নাগরিক বাজার এসব দিনের সাথে থাকে না। তাই তার কথা মনেও হয় না।

খানিক যেন খেই হারিয়েছি। কি করবর ভাবনায় এসে বাজার উঁকি দিয়ে গেল। বোধহয় স্টেশনে দাঁড়িয়ে থ্রু ট্রেন দেখার চিন্তাই এই কাণ্ড করে দিল। কি করব লোকেদের এও এক সমস্যা। কি ভাবব সে বিষয়েও তাদের কোনও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। যেহেতু ভাবনার কোনও সরাসরি অনুবাদ হয় না। তাই ভাষা নির্ভর এই যে পুনর্গঠন সেখানে মুল ভাবনা হয়তো বেশ দূরে রেললাইনের ধারে কোনও পানা পুকুরে হাবুডুবু। আমি স্রেফ রেললাইনের আশপাশের বাজারই দেখতে পেলাম। চিন্তাটিকে নয়।

খানিক শৃঙ্খলায় আসি।

আসলে ঠিক এইরকম সকালের জন্য বয়ামে সাজান ছিল মার্বেল গুলি। পরিষ্কার আকাশ, পেঁজা মেঘ আর ঝরঝরে গ্রীষ্ম বাতাস। রিক্সার ডানদিকের চাকা যেই না একটা সাবেক গর্তে পড়ল অমনি তেতালা বারান্দায় ছড়িয়ে গেল মার্বেল। সত্যিই দিন শুরু হল।

বাইরের ফাটক থেকে থেকে ভেতরের ফাটক অবধি রাস্তায় গতকাল পাতা ঝরিয়েছিল সৌন্দ্যর্যায়ন প্রকল্পের সব গাছ। আজও কিছু পাতা থাকতে পারে, এইটেই প্রত্যাশা। বস্তুতঃ গতরাতের বৃষ্টিপাত ভুলে গেলে এইটেই মনে হওয়া স্বাভাবিক যে গত আর একই।  

নিজেকে দিয়েই বোঝা যায়। দৃষ্টিশক্তি, দৃষ্টির স্বচ্ছতা প্রতিদিন কমে যাচ্ছে। ‘খোলা মনে মেনে নেওয়া’ গোছের শব্দের খুব কাছে থাকে ‘নতুন কিছু শেখার তাগিদ’ গোছের শব্দরা। এরা আর সঙ্গ দিচ্ছে না। প্রিয় শব্দ হয়ে দাঁড়াচ্ছে- কিন্তু, তবুও, অথচ...

শব্দই ঠিক করে তুমি ঠিক কোনখানে আছ।

সন ২০১৫ যেদিন শুরু হয় সেই দিনটায় শীতের গল্পের মধ্যে কুড়িয়ে তোলা হয়েছিল এসব মার্বেল। মনে হয়েছিল, গুলি খেলার বয়স পেরিয়েছি। অথচ এখন তেতালা বারান্দা জুড়ে কেবল মার্বেল।

শিল্পের উদ্দেশ্য হল মনোরঞ্জন।

ব্যক্তিগত হতাশা কি সহানুভূতি কি প্রেমকে ব্যবহার করে ওপর মানুষের মানসিক সংবেদনে পৌঁছতে হবে। মানুষটি নড়ে উঠবে। আহা, সেই নড়ে ওঠা মানুষের সমস্ত আশীর্বাদ, সমস্ত শুভকামনাদের যেন চোখে দেখতে পাচ্ছি। হয়তো এরাই উদ্দেশ্যকে সরিয়ে নিচ্ছে ‘কি করব’ দিনের সামনে থেকে...

কিছু না করেও যা করা যায় তার জন্য অপেক্ষায় যাব, মনস্থ করলাম...



নীলাদ্রি বাগচী


Niladri Bagchi