Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS

Adway Chowdhuri

নিষেধাজ্ঞা

“আজ রাত দশটা থেকে রাজপথে পায়ে হেঁটে যাতায়াত নিষিদ্ধ।”
       সেদিন সন্ধে থেকে গোটা এলাকা পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছিল, টিভি-রেডিও সর্বত্র ঘোষণা হচ্ছিল লাগাতার। সকলেই জেনে যায় এই নিষেধাজ্ঞা। যারা অনেক রাত করে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরে তারা সেদিন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসেছিল।

       যারা রাজপথে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করেনা, যাদের গাড়ি আছে, তারা বেজায় খুশি হয়েছিল এই নিষেধাজ্ঞায়। রাস্তায় ভিড় কমবে, ট্রাফিক জ্যাম কমবে। গাড়ির দোকানদাররাও খুশি হয়েছিল। এবার গাড়ির বিক্রি বাড়বে। উপরমহলের তরফে বলা হয় পায়ে হেঁটে যাতায়াত করলেও যাদের বাড়িতে গাড়ি লুকিয়ে রাখা আছে, বা অন্যত্র তাদের গাড়ি বেনামে খাটছে, সেইসব লোকের লুকানো গাড়ি ধরার উদ্দেশ্যেই এই নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু ব্যাপারটা যে তা নয় তা গাড়িওয়ালা এবং গাড়ির দোকানদাররা জানত। এই সিদ্ধান্ত মূলত এলাকার সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থেই— সকলেই যাতে ‘গাড়িওয়ালা’ শ্রেণিতে উন্নীত হয়। যাদের গাড়ি নেই, অথবা গাড়ি কেনার কোনোভাবেই সামর্থ্য নেই, তারা এলাকা ছেড়ে চলে যাবে, অথবা না খেতে পেয়ে মারা যাবে।

       পরের দিন রাস্তা একেবারে শুনশান। হাতে গোনা কয়েকটা গাড়ি প্রচণ্ড গতিতে যাতায়াত করছে। ফুটপাথে কোনো লোক নেই। দু-একটা বড় দোকান আর সমস্ত গাড়ির দোকান ছাড়া আর কোনো দোকান খোলেনি। কোনো নতুন গাড়িও কিন্তু রাস্তায় দেখা যায় না। না লুকিয়ে রাখা গাড়ি, না নতুন কেনা গাড়ি। আগে যেগুলো চলত সেগুলোই শুধু দেখা যায়।


       তিন দিনের মাথায় দু-একজন লোক জোর করেই হেঁটে যাতায়াত করার চেষ্টা করে। পুলিশ তাদের বেধড়ক পেটায়, তারপর গ্রেপ্তার করে। কিছু লোককে বন্দুক উঁচিয়ে তাড়া করে। এইসব দেখে বাকিরা যারা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বেরোবে ভাবছিল তারা আবার বাড়িতে ঢুকে পড়ে।

       এদিকে যাদের গাড়ি নেই তাদের প্রত্যেকেরই এবার খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। জমানো খাবারে এতদিন চলেছে। এবার ভাঁড়ারে টান ধরেছে। কোনো কোনো বাড়িতে ইতিমধ্যেই আধপেটা খাওয়া শুরু হয়ে গেছে, বাকিদের শুরু হবার মুখে। এবার বাড়ি থেকে বেরোতেই হবে খাবার জোগাড়ের জন্যে।

       পঞ্চম দিনে ঘটল সেই ঘটনা। এলাকার চ্যাম্পিয়ন সাঁতারু বাড়ি থেকে বেরোয়, কিন্তু পায়ে হেঁটে নয়। সে কংক্রিটের ফুটপাথের উপরে সাঁতার কেটে কেটে এগোতে থাকে। ফুটপাথের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে ডান হাত-ডান পা বাড়িয়ে ঘষটে ঘষটে একটু খানি এগোয় প্রথমে, তারপর বাঁ হাত-বাঁ পা বাড়িয়ে একইভাবে ঘষটে ঘষটে আবার সামান্য এগোয়। এইভাবে শামুকের গতিতে সামনে এগোতে থাকে ওই সাঁতারু। হাতে-পায়ে ছাল উঠে যায়, কষ্ট হয় খুব। তবু এগোয়।

       সমস্ত পুলিশ ওই সাঁতারুকে দেখতে থাকে। প্রথমে মনে হয়েছিল কেউ বোধহয় রাস্তায় পরে ছটফট করছে। এক্ষুনি মারা যাবে। ব্যাপারটা বেশ সুখবর রূপেই আসত, কারণ এখনো পর্যন্ত কোনো মৃত্যু সংবাদ আসেনি পুলিশের কানে। এটাই প্রথম হত। কিন্তু তারপরে খেয়াল করে দেখে ঘটনাটা বুঝতে পারে। ওরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে। কিন্তু কোনো অ্যাকশন নিতে পারে না। এখানে তো কোনো বেআইনি কাজ হচ্ছে বলা যাবে না!

       সেদিন রাতে বাড়ির ছাদে উঠে ওই সাঁতারু আশপাশের বাড়ির লোকজনকে এই নতুন সাঁতার কাটার পদ্ধতি সম্বন্ধে ট্রেনিং দেয়। হ্যাঁ, ব্যাপারটা অবশ্যই প্রচণ্ড কষ্টসাধ্য। প্রথমেই হচ্ছে তোমার মানসিক প্রস্তুতি। তোমাকে মনে মনে ধরে নিতে হবে ওই শক্ত ঢালাই ফুটপাথটা আসলে জল। এইটা যখন মনের মধ্যে পুরোপুরি গেঁথে ফেলতে পারবে তখন প্রথমে ডান হাতটা সামনে বাড়াতে হবে, তারপর ডান পা ভাঁজ করে বাড়াতে হবে। তারপর ডান হাতের চেটো আর ডান হাঁটুর উপর জোর দিয়ে ঘষটে এগোতে হবে। এরপর একই পদ্ধতিতে বাঁ হাত ও বাঁ হাঁটু তোমায় আবার সামনে এগোতে সাহায্য করবে। এইভাবে এগোতে প্রচুর সময় নষ্ট হবে অবশ্যই, তবু তুমি তোমার গন্তব্যে ঠিকই পৌঁছে যাবে এক সময়। তাছাড়া, উপরমহল তোমার এই কাজটাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে পারবে না, কারণ তুমি রাজপথে হাঁটছ না! এইটা বিরাট সুযোগ। এর আরও একটা সুফল আছে। যারা সাঁতার জানো না তারাও এই পদ্ধতিতে সাঁতার কাটতে পারবে। কারণ, এখানে ডুবে যাবার কোনো ভয় নেই। তুমি অলরেডি জলের একদম তলায় গিয়েই ঠেকেছ!

       পরের দিন দেখা যায় প্রায় শ’ খানেক মানুষ ওইভাবে সাঁতার কেটে এগোচ্ছে ফুটপাথ ধরে। আস্তে আস্তে দোকানপাট খুলতে শুরু করে। যেহেতু যাতায়াতে অনেকটা সময় লেগে যাচ্ছে তাই বেশি সময়ের জন্যে খুলতে পারে না। তবু, ওই অল্প সময়েই তাদের খাবার জোগাড় করার মতো আয় হতে শুরু করে।

       তারপরের দিন আরও আরও লোক বেরিয়ে পরে সাঁতার কেটে। ফুটপাথ ছাড়িয়ে রাস্তায় নেমে আসে সাঁতারুর ঢল। হাতে গোনা গাড়িগুলোর যাতায়াতের জায়গা কমে যায়। ফের ট্রাফিক জ্যাম দেখা দেয় রাস্তায়। গাড়িওয়ালারা আবার বিরক্ত হয়ে ওঠে। তারা উপরমহলে নালিশ ঠোকে। সেখানে মিটিং হয়। কিন্তু এই সমস্যার কোনো সুরাহা বেরোয় না। কংক্রিটের রাস্তায় সাঁতার কাটা ব্যাপারটা এমনিতেই অ্যাবসার্ড! একটা অ্যাবসার্ড ব্যাপারকে কীভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে?

       পরের দিন এলাকার সমস্ত লোক বেরিয়ে পরে ওইভাবে সাঁতার কাটতে কাটতে, সমস্ত দোকান খুলে যায়, বাজার আগের মতো সচল হয়ে ওঠে, অফিস খুলে যায়। সমস্ত কাজকর্ম আগের মতোই হতে থাকে। এবং প্রায় পুরো সময় ধরেই হতে থাকে। লোকজন ইতিমধ্যে অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে কংক্রিটে সাঁতার কাটায়। এখন আর তাদের বেশি সময় লাগে না, বেশি কষ্টও হয় না। ওদের মনে হয় ওদের নীচে যেন শক্ত ঢালাই নয়, জল চলে আসছে ক্রমশ। এখন গাড়িওয়ালাদের ভীষণ সমস্যা শুরু হয়েছে। কারণ, পুরো রাস্তা জুড়েই এই অদ্ভুত সাঁতারুরা চলে, গাড়ি চলার কোনো জায়গাই থাকে না।

       সেদিন সন্ধে বেলা উপরমহলের মিটিং বসে। এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না! এতে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। একটাও নতুন গাড়ি বিক্রি হয়নি, একটাও লুকানো গাড়ি বেরিয়ে আসেনি। বরং যেসব গাড়ি আগে চলত তাদের চলার পথ বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে। ওই হাতে গোনা গাড়িওয়ালাদের তো আগে দেখতে হবে আমাদের! ওই মিটিঙে সিদ্ধান্ত হয় আগামীকাল সকাল থেকে রাজপথে আবার পায়ে হেঁটে যাতায়াত করা যাবে। টিভি-রেডিওতে আবার ঘোষণা হয় এই সিদ্ধান্ত। আবার পোস্টারে ছেয়ে যায় এলাকা।

       সেদিন অনেক রাতে ওই চ্যাম্পিয়ন সাঁতারু সাঁতার কেটে বাড়ি ফিরছিল। অন্যদিনের তুলনায় সেদিন তার গতি ছিল আরও বেশি। ক্রমশ ভীষণ সহজ হয়ে উঠছে কংক্রিটে সাঁতার কাটা। হঠাত একবার তার ডান হাতটা সামনে বাড়িয়ে দিতে কংক্রিটের মধ্যে ডুবে যায়। ঢালাইয়ের মধ্যে সে এদিক-ওদিক হাত ঘোরাতে থাকে। হাতটা ভিজে ওঠে জলে। তারপর হাতের মুঠোর মধ্যে একটা ছোট্ট মাছ ঢুকে পড়ে। ও যখন উপরে তুলে এনে হাতের মাছটা দেখছিল তখন পাশ দিয়ে একটা গাড়ি প্রচণ্ড জোরে যেতে যেতে হঠাত আটকে যায় রাস্তায়। তারপর মুখ থুবরে ঢুকে যায় রাস্তার ভেতর।

       পরের দিন সকালে দেখা যায় সমগ্র রাজপথ একটা নদী হয়ে গেছে। রাস্তার মাঝখানে কাল রাতের আটকে যাওয়া গাড়িটা ভাসছে। আর তার চারপাশ দিয়ে কাতারে কাতারে মানুষ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পোস্টারগুলো পড়তে পড়তে সাঁতার কেটে এগিয়ে চলেছে নিজেদের গন্তব্যে।


অনুপ্রেরণা: ভার্জিলিও পিনেরা






















অদ্বয় চৌধুরী
Adway Chowdhuri

Popular Posts