Skip to main content



Adway Chowdhuri

নিষেধাজ্ঞা

“আজ রাত দশটা থেকে রাজপথে পায়ে হেঁটে যাতায়াত নিষিদ্ধ।”
       সেদিন সন্ধে থেকে গোটা এলাকা পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছিল, টিভি-রেডিও সর্বত্র ঘোষণা হচ্ছিল লাগাতার। সকলেই জেনে যায় এই নিষেধাজ্ঞা। যারা অনেক রাত করে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরে তারা সেদিন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসেছিল।

       যারা রাজপথে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করেনা, যাদের গাড়ি আছে, তারা বেজায় খুশি হয়েছিল এই নিষেধাজ্ঞায়। রাস্তায় ভিড় কমবে, ট্রাফিক জ্যাম কমবে। গাড়ির দোকানদাররাও খুশি হয়েছিল। এবার গাড়ির বিক্রি বাড়বে। উপরমহলের তরফে বলা হয় পায়ে হেঁটে যাতায়াত করলেও যাদের বাড়িতে গাড়ি লুকিয়ে রাখা আছে, বা অন্যত্র তাদের গাড়ি বেনামে খাটছে, সেইসব লোকের লুকানো গাড়ি ধরার উদ্দেশ্যেই এই নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু ব্যাপারটা যে তা নয় তা গাড়িওয়ালা এবং গাড়ির দোকানদাররা জানত। এই সিদ্ধান্ত মূলত এলাকার সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থেই— সকলেই যাতে ‘গাড়িওয়ালা’ শ্রেণিতে উন্নীত হয়। যাদের গাড়ি নেই, অথবা গাড়ি কেনার কোনোভাবেই সামর্থ্য নেই, তারা এলাকা ছেড়ে চলে যাবে, অথবা না খেতে পেয়ে মারা যাবে।

       পরের দিন রাস্তা একেবারে শুনশান। হাতে গোনা কয়েকটা গাড়ি প্রচণ্ড গতিতে যাতায়াত করছে। ফুটপাথে কোনো লোক নেই। দু-একটা বড় দোকান আর সমস্ত গাড়ির দোকান ছাড়া আর কোনো দোকান খোলেনি। কোনো নতুন গাড়িও কিন্তু রাস্তায় দেখা যায় না। না লুকিয়ে রাখা গাড়ি, না নতুন কেনা গাড়ি। আগে যেগুলো চলত সেগুলোই শুধু দেখা যায়।


       তিন দিনের মাথায় দু-একজন লোক জোর করেই হেঁটে যাতায়াত করার চেষ্টা করে। পুলিশ তাদের বেধড়ক পেটায়, তারপর গ্রেপ্তার করে। কিছু লোককে বন্দুক উঁচিয়ে তাড়া করে। এইসব দেখে বাকিরা যারা নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে বেরোবে ভাবছিল তারা আবার বাড়িতে ঢুকে পড়ে।

       এদিকে যাদের গাড়ি নেই তাদের প্রত্যেকেরই এবার খাবার সংকট দেখা দিয়েছে। জমানো খাবারে এতদিন চলেছে। এবার ভাঁড়ারে টান ধরেছে। কোনো কোনো বাড়িতে ইতিমধ্যেই আধপেটা খাওয়া শুরু হয়ে গেছে, বাকিদের শুরু হবার মুখে। এবার বাড়ি থেকে বেরোতেই হবে খাবার জোগাড়ের জন্যে।

       পঞ্চম দিনে ঘটল সেই ঘটনা। এলাকার চ্যাম্পিয়ন সাঁতারু বাড়ি থেকে বেরোয়, কিন্তু পায়ে হেঁটে নয়। সে কংক্রিটের ফুটপাথের উপরে সাঁতার কেটে কেটে এগোতে থাকে। ফুটপাথের উপর উপুড় হয়ে শুয়ে ডান হাত-ডান পা বাড়িয়ে ঘষটে ঘষটে একটু খানি এগোয় প্রথমে, তারপর বাঁ হাত-বাঁ পা বাড়িয়ে একইভাবে ঘষটে ঘষটে আবার সামান্য এগোয়। এইভাবে শামুকের গতিতে সামনে এগোতে থাকে ওই সাঁতারু। হাতে-পায়ে ছাল উঠে যায়, কষ্ট হয় খুব। তবু এগোয়।

       সমস্ত পুলিশ ওই সাঁতারুকে দেখতে থাকে। প্রথমে মনে হয়েছিল কেউ বোধহয় রাস্তায় পরে ছটফট করছে। এক্ষুনি মারা যাবে। ব্যাপারটা বেশ সুখবর রূপেই আসত, কারণ এখনো পর্যন্ত কোনো মৃত্যু সংবাদ আসেনি পুলিশের কানে। এটাই প্রথম হত। কিন্তু তারপরে খেয়াল করে দেখে ঘটনাটা বুঝতে পারে। ওরা নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে। কিন্তু কোনো অ্যাকশন নিতে পারে না। এখানে তো কোনো বেআইনি কাজ হচ্ছে বলা যাবে না!

       সেদিন রাতে বাড়ির ছাদে উঠে ওই সাঁতারু আশপাশের বাড়ির লোকজনকে এই নতুন সাঁতার কাটার পদ্ধতি সম্বন্ধে ট্রেনিং দেয়। হ্যাঁ, ব্যাপারটা অবশ্যই প্রচণ্ড কষ্টসাধ্য। প্রথমেই হচ্ছে তোমার মানসিক প্রস্তুতি। তোমাকে মনে মনে ধরে নিতে হবে ওই শক্ত ঢালাই ফুটপাথটা আসলে জল। এইটা যখন মনের মধ্যে পুরোপুরি গেঁথে ফেলতে পারবে তখন প্রথমে ডান হাতটা সামনে বাড়াতে হবে, তারপর ডান পা ভাঁজ করে বাড়াতে হবে। তারপর ডান হাতের চেটো আর ডান হাঁটুর উপর জোর দিয়ে ঘষটে এগোতে হবে। এরপর একই পদ্ধতিতে বাঁ হাত ও বাঁ হাঁটু তোমায় আবার সামনে এগোতে সাহায্য করবে। এইভাবে এগোতে প্রচুর সময় নষ্ট হবে অবশ্যই, তবু তুমি তোমার গন্তব্যে ঠিকই পৌঁছে যাবে এক সময়। তাছাড়া, উপরমহল তোমার এই কাজটাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করতে পারবে না, কারণ তুমি রাজপথে হাঁটছ না! এইটা বিরাট সুযোগ। এর আরও একটা সুফল আছে। যারা সাঁতার জানো না তারাও এই পদ্ধতিতে সাঁতার কাটতে পারবে। কারণ, এখানে ডুবে যাবার কোনো ভয় নেই। তুমি অলরেডি জলের একদম তলায় গিয়েই ঠেকেছ!

       পরের দিন দেখা যায় প্রায় শ’ খানেক মানুষ ওইভাবে সাঁতার কেটে এগোচ্ছে ফুটপাথ ধরে। আস্তে আস্তে দোকানপাট খুলতে শুরু করে। যেহেতু যাতায়াতে অনেকটা সময় লেগে যাচ্ছে তাই বেশি সময়ের জন্যে খুলতে পারে না। তবু, ওই অল্প সময়েই তাদের খাবার জোগাড় করার মতো আয় হতে শুরু করে।

       তারপরের দিন আরও আরও লোক বেরিয়ে পরে সাঁতার কেটে। ফুটপাথ ছাড়িয়ে রাস্তায় নেমে আসে সাঁতারুর ঢল। হাতে গোনা গাড়িগুলোর যাতায়াতের জায়গা কমে যায়। ফের ট্রাফিক জ্যাম দেখা দেয় রাস্তায়। গাড়িওয়ালারা আবার বিরক্ত হয়ে ওঠে। তারা উপরমহলে নালিশ ঠোকে। সেখানে মিটিং হয়। কিন্তু এই সমস্যার কোনো সুরাহা বেরোয় না। কংক্রিটের রাস্তায় সাঁতার কাটা ব্যাপারটা এমনিতেই অ্যাবসার্ড! একটা অ্যাবসার্ড ব্যাপারকে কীভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হবে?

       পরের দিন এলাকার সমস্ত লোক বেরিয়ে পরে ওইভাবে সাঁতার কাটতে কাটতে, সমস্ত দোকান খুলে যায়, বাজার আগের মতো সচল হয়ে ওঠে, অফিস খুলে যায়। সমস্ত কাজকর্ম আগের মতোই হতে থাকে। এবং প্রায় পুরো সময় ধরেই হতে থাকে। লোকজন ইতিমধ্যে অনেকটাই অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে কংক্রিটে সাঁতার কাটায়। এখন আর তাদের বেশি সময় লাগে না, বেশি কষ্টও হয় না। ওদের মনে হয় ওদের নীচে যেন শক্ত ঢালাই নয়, জল চলে আসছে ক্রমশ। এখন গাড়িওয়ালাদের ভীষণ সমস্যা শুরু হয়েছে। কারণ, পুরো রাস্তা জুড়েই এই অদ্ভুত সাঁতারুরা চলে, গাড়ি চলার কোনো জায়গাই থাকে না।

       সেদিন সন্ধে বেলা উপরমহলের মিটিং বসে। এভাবে তো চলতে দেওয়া যায় না! এতে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। একটাও নতুন গাড়ি বিক্রি হয়নি, একটাও লুকানো গাড়ি বেরিয়ে আসেনি। বরং যেসব গাড়ি আগে চলত তাদের চলার পথ বন্ধ হয়ে যেতে বসেছে। ওই হাতে গোনা গাড়িওয়ালাদের তো আগে দেখতে হবে আমাদের! ওই মিটিঙে সিদ্ধান্ত হয় আগামীকাল সকাল থেকে রাজপথে আবার পায়ে হেঁটে যাতায়াত করা যাবে। টিভি-রেডিওতে আবার ঘোষণা হয় এই সিদ্ধান্ত। আবার পোস্টারে ছেয়ে যায় এলাকা।

       সেদিন অনেক রাতে ওই চ্যাম্পিয়ন সাঁতারু সাঁতার কেটে বাড়ি ফিরছিল। অন্যদিনের তুলনায় সেদিন তার গতি ছিল আরও বেশি। ক্রমশ ভীষণ সহজ হয়ে উঠছে কংক্রিটে সাঁতার কাটা। হঠাত একবার তার ডান হাতটা সামনে বাড়িয়ে দিতে কংক্রিটের মধ্যে ডুবে যায়। ঢালাইয়ের মধ্যে সে এদিক-ওদিক হাত ঘোরাতে থাকে। হাতটা ভিজে ওঠে জলে। তারপর হাতের মুঠোর মধ্যে একটা ছোট্ট মাছ ঢুকে পড়ে। ও যখন উপরে তুলে এনে হাতের মাছটা দেখছিল তখন পাশ দিয়ে একটা গাড়ি প্রচণ্ড জোরে যেতে যেতে হঠাত আটকে যায় রাস্তায়। তারপর মুখ থুবরে ঢুকে যায় রাস্তার ভেতর।

       পরের দিন সকালে দেখা যায় সমগ্র রাজপথ একটা নদী হয়ে গেছে। রাস্তার মাঝখানে কাল রাতের আটকে যাওয়া গাড়িটা ভাসছে। আর তার চারপাশ দিয়ে কাতারে কাতারে মানুষ নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের পোস্টারগুলো পড়তে পড়তে সাঁতার কেটে এগিয়ে চলেছে নিজেদের গন্তব্যে।


অনুপ্রেরণা: ভার্জিলিও পিনেরা




কাশ্মীর হামারে হ্যায়

কাঠের এই বাড়িটা আমাদের খুব পছন্দ। তার অনেক কারণ আছে। আমাদের দু’জনের পক্ষে বেশ বড় আকারের হওয়ার পাশাপাশি বাড়িটা বহু পুরনো হওয়ায় বাপঠাকুরদাদের স্মৃতি বহন করে। আমাদের ছেলেবেলার সমস্ত স্মৃতিও জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে। বোন আর আমি এই বাড়িটায় একা একাই থাকি। বাবা, মা, কাকা, ঠাকুরদা, ঠাকুরমা আর নেই। ওরা এসে নিয়ে গেছে ওদের। আমাদের নেয়নি ওরা, কারণ আমরা তখন ছোটো ছিলাম। সেই সমস্ত স্মৃতি এই বাড়িটা ঘিরেই রয়েছে। ওদের আসা, বাবা-মা-কাকাদের চলে যাওয়া, আমাদের থেকে যাওয়া— সব।
আমরা বেশ সকাল সকাল উঠে পড়ি ঘুম থেকে। তারপর ন’টার মধ্যে অল্প খেয়ে আমি বাজারে যাই বোনের বোনা শীতের পোষাক পুঁটলি বেঁধে। সারাদিন সেখানে রাস্তার ধারে পসরা সাজিয়ে সেগুলো বিক্রি করি। দুটো ম্যানিক্যিনকে— একটা ছেলে আর একটা মেয়ে— বিভিন্ন সোয়েটার বা জ্যাকেট পরিয়ে সাজিয়ে রাখি রাস্তার ধারে। লোকের চোখ পড়ে বেশি। যদিও বিক্রি খুব কমই হয় তারপরেও। আমার মতো হাজার হাজার বিক্রেতা রয়েছে ওখানে। তারপর অন্ধকার ও শীত জাঁকিয়ে পড়লে পোষাকের পুঁটলি আর দুটো ম্যানিক্যিনকে ভ্যানে চাপিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। বাড়িটা ঝারপোঁছ করে পরিষ্কার রাখা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। বোন সারাদিন বাড়ি থাকে, কিন্তু ওর পক্ষেও সম্ভব না।
বোন কখনো কাউকে বিরক্ত করে না। ও ওর মতো থাকে, কাজ করে। সকালের কাজকর্ম শেষ হয়ে গেলে ও বাকি দিনটা নিজের শোয়ার ঘরে বা নীচের বসার ঘরে উল বুনে কাটিয়ে দেয়। বোন সেই ছোটোবেলাতেই, যখন মা-ঠাকুরমা ছিল, উল বোনা শিখেছিল। তারপর থেকে ও সব সময় দরকারি জিনিসপত্রই বোনে— শীতের সোয়েটার, মোজা, টুপি, মাফলার, শাল, জ্যাকেট এইসব। ও একটু খামখেয়ালি গোছের মেয়ে। কখনো হয়তো ও একটা জ্যাকেট বুনলো, কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেটা খুলে ফেলে কারণ সেটার কিছু একটা ওকে খুশি করতে পারেনি। এইসব দেখতে বেশ মজাই লাগে আমার। একগাদা উলের গোছ ওর সেলাইয়ের বাক্সে একটা হেরে যাওয়া যুদ্ধ লড়ে চলেছে স্রেফ কয়েক ঘণ্টার জন্য নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখার প্রবল ইচ্ছায়।


শনিবারে আমি শহরে যাই উল কিনতে। আমার পছন্দের প্রতি বোনের ভরসা প্রচুর। আমার পছন্দের রং নিয়ে সে খুশিই হয় এবং কোনো গোছই কোনোদিন ফেরত দিতে হয়নি। এই শহরে যাওয়ার সুযোগে নিয়ে আমি এলাকার খবর জোগাড় করে আনি। আমাদের বাড়িতে টিভি নেই, ট্রানজিস্টার থাকলেও শোনা হয় না। ইন্টারনেটের তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এখানে এমনিই প্রচুর বিধিনিষেধ। অনেক কিছুই নিষিদ্ধ। তাই শহর থেকেই খবর সংগ্রহ করতে হয়। আবার কোনো নতুন গণ্ডগোল হচ্ছে কি না আমাদের এখানে, আবার নতুন করে কেউ খুন গুম হল কি না, কেউ খুন হল কি না— এই সব খবর সংগ্রহ করি। খবরে অবশ্য কোনো পরিবর্তন ঘটে না। গণ্ডগোল লেগেই থাকে এখানে।
তবে আমি গণ্ডগোল নিয়ে কথা বলতে চাই না। আমার ভয় করে। আমি শুধু বাড়িটা সম্বন্ধে কথা বলতে চাই— বাড়ি আর বোন সম্বন্ধে। আমি ভাবি একদিন বোনের বিয়ে দিতে হবে। ওর তো একটা ভবিষ্যৎ আছে। উল বোনা ছাড়া বোন আর কিছু করে কি? একদিন হঠাৎ আবিষ্কার করলাম ঘরের আলমারিটা বিভিন্ন রঙের উলের পোষাকে ঠাসা রয়েছে। প্রচণ্ড সোঁদা গন্ধের মধ্যে স্তুপ করা রয়েছে ওগুলো, স্যাঁতসেঁতে অবস্থায়। এতো পোষাক বুনেছে এর মধ্যে বোন? এটা ঠিক যে আমাদের জীবনধারণের জন্য উপার্জন করতে হয়, এবং উপার্জনের জন্যে উল বুনতে হয় বোনকে। কিন্তু এতো পরিশ্রম করলে ওর চেহারায় তার ছাপ পড়বে, ওর বিয়ে দেওয়া মুশকিল হয়ে উঠবে। আমার ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায় বোনকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে আর ওকে দেখতে দেখতে। ওর হাতদুটো রুপালী মৎস্যকন্যার মতো, উলের কাঁটাগুলো ঝকঝক করে, আর একটা কি দুটো সেলাইঝুড়ি মেঝেতে রাখা থাকে, সুতোর গুলিগুলো লাফিয়ে বেড়ায় এদিক ওদিক। দারুণ দেখতে লাগে।
আমাদের বাড়িটা— যদিও পুরনো, ক্ষতবিক্ষত— কিন্তু পপলার গাছের জঙ্গলের মধ্যে হওয়ায় দূর থেকে দেখতে বেশ ভালই লাগে। সবুজ জঙ্গলের মধ্যে সাদা রঙের কাঠের বাড়ি, মাথার বর্ডারটা লাল রং। যদিও রং উঠে গেছে, সাদা রঙে কালো কালো ছোপ ধরেছে, তবে সৌন্দর্যের ছাপ এখনো স্পষ্ট ধরা পড়ে চেহারায়। আমাদের বাড়িটা দো’তলা। একতলায় সামনের দিকে ছোট্টো বসার ঘর, যার জানলাগুলো অবশ্য ভেঙে ভেঙে গেছে। বিভিন্ন আসবাব চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে জানলাগুলোকে। তবে দরজাটা আস্ত আছে, এবং শক্তও আছে। দেওয়ালে অনেক গর্ত। বুলেট লেগে ফুটো হয়ে গেলে যেমন হয় সেরকম। বসার ঘরের পিছন দিকে রান্নাঘর আর কলঘর। কলঘরের পিছন দিকে একটা দরজা আছে বাইরে যাওয়ার— বাড়ির বাইরে যাওয়ার। এই দরজাটা পুরোপুরি ভেঙে গেছে। কোনোরকমে কাঠের পাল্লাগুলো ঠেকনা দিয়ে রাখা আছে। তাও ফাঁক গলে ভিতরে ঢুকে আসা যায়। নেহাত এটা বাড়ির পিছন দিক, এবং এর ঠিক পরেই পপলার গাছের ঘন জঙ্গল শুরু হয়ে গেছে বলে এদিকে লোকেরা আসে না। কিন্তু কেউ এলেই দেখতে পাবে ভাঙা দরজাটা। তারা ভিতরে ঢুকে এলে আমাদের কিচ্ছু করার নেই। তবে বসার ঘর থেকে কলঘরে যাওয়ার মাঝে একটা দরজা আছে। সেটা দুর্বল হলেও আস্ত আছে।
বসার ঘরের মধ্যে দিয়েই উপরে ওঠার সিঁড়ি। ফায়ার প্লেসের পাশ দিয়ে। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই ডান দিকে, নীচের কলঘরের ঠিক মাথায়, স্নানঘর। এই স্নানঘরের পিছনে একটা দরজা আছে যেটা থেকে একটা মই লাগানো আছে নীচ পর্যন্ত। ওই মই দিয়ে নামলেই পপলার গাছের ঘন জঙ্গল। এই মইটা আজ অবধি ব্যবহার হতে দেখিনি আমি। সিঁড়ি দিয়ে উঠে সামনেই পাশাপাশি দুটো ঘর। আমরা দুজনে থাকি তাতে। আমাদের ঘরগুলো ছোটো, কিন্তু ভালো। সবথেকে ভালো হল ছাদের কয়েকটা ফুটো। বসার ঘরের দেওয়ালের বুলেটের গর্তের মতোই। এই ফুটোগুলো দিয়ে দিনের বেলা রোদ পড়ে মেঝেতে। মনে হয় স্পটলাইট ফেলছে ওরা আমাদের খুঁজতে। আর রাতের বেলা তারা দেখা যায়। মনে হয় অন্ধকারে ওরা যেন ওই ফুটোগুলোতে চোখ রেখে আমাদের দেখছে।
সেদিন রাতের কথা স্পষ্ট মনে আছে আমার। সেদিন খুব ঠাণ্ডা পড়েছিল। রাতে বরফ পড়বে নিশ্চিৎ। ডিনার হয়ে গেছে। বসার ঘরে বোন বসে বসে একটা মাফলার বুনছে। কালো-গোলাপি চেক-চেক। আমি অনেক দিন বাদে ট্রানজিস্টার শোনার চেষ্টা করছিলাম। প্রায় এক যুগ বাদে। এর আগে কবে শুনেছি মনেই পড়ে না। হয়তো কোনোদিন শুনিইনি। হাতে ট্রানজিস্টারটা নিয়ে চ্যানেল ধরার চেষ্টা করছিলাম। এখানে শুধু একটা চ্যানেলই আসে, বাকি সব বন্ধ। কিন্তু কিছুতেই ধরতে পারছিলাম না। খুব শীত করছিল আমার। শোয়ার আগে আর একবার নুন চা খাবো ভেবে ট্রানজিস্টারটা নিয়েই রান্নাঘরে যাচ্ছি। বসার ঘর আর রান্নাঘরের মাঝের দরজাটার কাছে যেতেই অনেকগুলো ভারী বুটের শব্দ ভেসে এল। সঙ্গে কিছু কথা, তবে অস্পষ্ট, হিসহিসে। বোনও শুনতে পেয়েছে শব্দগুলো। ও লাফ দিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়ায়।
—     দাদা, শুনতে পাচ্ছিস?
—     হ্যাঁ।
—     কলঘরের দরজাটা দিয়ে ঢুকেছে?
—     তাই হবে হয়তো।
—     ওরা তাহলে এসেই গেল?
—     হ্যাঁ।
—     এবার কি হবে আমাদের?
বোনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই ওই অদৃশ্য স্বরগুলো আরও খানিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মনে হয় আরও কাছে চলে এসেছে। আমি বোনকে খানিক ধাক্কা মেরে সরিয়ে রান্নাঘর আর বসার ঘরের মাঝের দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিই এপাশ থেকে। আমার এই বেমক্কা নড়াচড়ায় হাত থেকে ট্রানজিস্টারটা পড়ে গিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। আমার ধাক্কায় বোনের হাত থেকে উলের গোলাদুটোও পড়ে গিয়ে গড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে যায় এবং সেই অবস্থাতেই দরজাটা বন্ধ করে দিই আমি। ওই গোলাদুটো আর কোনোদিন পাওয়া যাবে না। ওগুলোও চলে গেল। আমাদের রান্নাঘর আর কলঘর ওরা দখল করে নিল।
রান্নাঘর আর কলঘরে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল আমাদের। উপরে একটা কলঘর আছে, অসুবিধে নেই। কিন্তু রান্নাঘরটা ওদের দখলে চলে গিয়ে খুব মুশকিল হয়ে গেছে। উপরেই ঘরের মধ্যে একটা ছোটো স্টোভ জ্বেলে কোনোরকমে খানিক রান্না করা হয়। কিন্তু তাতে তো আর লাভাসা বা শীরমাল বানানো যায় না! কিন্তু কিছুই করার নেই আমাদের। ওদিকে ট্রানজিস্টারটা সেদিন পড়ে গিয়ে খারাপ হয়ে গেছে। আর চলছে না। রান্নাঘরের ওদিক থেকে আর কোনো শব্দও অবশ্য কানে আসেনি এর মধ্যে। ওরা আমাদের বাড়ির পিছনের দিকটা দখল করেই মনে হয় ক্ষান্ত দিলো। অবশ্য বলা যায় না। কবে আবার অন্য কি করে বসে! সেই ভয়ে রাতে আমি আর ঘুমাতে পারি না। ইদানীং শোয়ার ঘরের ছাদের ফুঁটোগুলো দিয়ে তারা দেখা গেলে আমি শিউরে উঠি। ঘরের মধ্যে থাকতে পারি না। সিঁড়ির সামনেটায় পায়চারি করি। পাশের ঘরে বোন ঘুমায়। ঘুমালে ওর নাকে এক অদ্ভুত শোঁ শোঁ শব্দ হয়। ছোটোবেলা থেকেই ওর সর্দির ধাত। আমার অসহ্য লাগে ওই শব্দ। কোনো নিষ্প্রাণ বস্তু থেকে ভেসে আসা কোনো শব্দই আমি সহ্য করতে পারি না। সে বন্দুক হোক বা ট্রানজিস্টার। এমনকি ঘুমন্ত মানুষের নাক ডাকাও। ঘুমন্ত মানুষও তো প্রাণহীনই বটে! আমিও এই শব্দ শুনতেই পেতাম না যদি আমি ঘুমোতাম এখন। জেগে আছি, বেঁচে আছি, তাই শুনতে পাচ্ছি। বেশিক্ষণ কোনো নিষ্প্রাণ বস্তু থেকে বেরনো শব্দ শুনলে মনে হয় আমিও প্রাণহীন হয়ে পড়ছি। ঠিক যেন ম্যানিক্যিন— অবিকল মানুষের মতো দেখতে, অথচ প্রাণহীন।
সেদিনও রাতে একইভাবে আমি পায়চারি করছিলাম সিঁড়ির সামনেটায়। বোনের ঘর থেকে অদ্ভুত শোঁ শোঁ শব্দ বেরোচ্ছিল। কি মনে হল ট্রানজিস্টারটা চালু করলাম। সেদিনই ওটা সারিয়ে এনেছি বাজার থেকে। সবে সেই একমাত্র যে চ্যানেলটা আসে সেটা ধরতে যাব, এর মধ্যেই সেই ভারী বুটের শব্দ শোনা যায় আবার। সেইদিনের মতো। অনেকগুলো বুট। এবং হিসহিস করে বলতে থাকা অস্পষ্ট কিছু কথা। এবারে কিন্তু রান্নাঘর থেকে আসছে না সেই শব্দ। নীচের বসার ঘর থেকে আসছে। তার মানে ওরা আমাদের বাড়ির সামনের দিকটাও দখল করে নিয়েছে! এবার যেকোনো মুহূর্তে উপরে উঠে আসবে সিঁড়ি দিয়ে! আমাদের কাছে চলে আসবে! হাতে এক মুহূর্তও সময় নেই। এক ঝটকায় ট্রানজিস্টারটা ফেলে দিই। ওটা গড়িয়ে গিয়ে পড়ে সিঁড়িতে। সেই অবস্থাতেই চলতে থাকে। আমি এক ধাক্কায় বোনের ঘরের দরজা খুলে ঘুমন্ত ম্যানিক্যিনের মতো নিষ্প্রাণ বোনকে কাঁধে তুলে নিয়ে উপরের কলঘরের পিছনের দরজাটা খুলে মই বেয়ে নামতে থাকি নীচে, পিছনের পপলার জঙ্গলের দিকটায়। দূরে, সিঁড়ি থেকে তখনও অস্পষ্ট কথা ভেসে আসছে, আর ভেসে আসছে বুটের শব্দ। ওরা উঠে আসছে উপরে আমাদের এলাকা দখল করবে বলে। গোটা বাড়িটাই দখল করবে বলে। আমি যখন থামি ওরা তখন আমাদের বাড়ির মধ্যে, আর আমরা আমাদের বাড়ির বাইরে— জঙ্গলে। এই জঙ্গলের মধ্যে সাধারণত কেউ আসে না। কেউ আমাদের খুঁজে পাবে না। কিন্তু তখনও নিস্তব্ধ রাতে দূর থেকে শব্দ ভেসে আসে— ভারী বুটের আর হিসহিসে কথার। বন্দুকের শব্দও কি ভেসে আসে দূর থেকে? আমাদের দখল হয়ে যাওয়া বাড়ি থেকে? বুঝে উঠতে পারি না আর। ওই সমস্ত শব্দে আমার মনে হতে থাকে আমি যেন সাড় হারিয়ে ফেলছি। ক্রমশ প্রাণহীন হয়ে পড়ছি। পপলার গাছের পাতায় ঢাকা পড়ে যাওয়ায় এখানে আর আকাশ দেখা যায় না। কেউ আর এখানে আমাদের উপর নজর রাখতে পারে না। কেউ দেখতে পায় না।
কেউ যদি কোনোদিন ওই পুরনো, দখল হারিয়ে ফেলা বাড়িটার পিছনের ঘন পপলার জঙ্গলে যায়, দেখতে পাবে দুটো ম্যানিক্যিন উপুড় হয়ে পড়ে আছে মাটিতে— একটা ছেলের আর একটা মেয়ের— আর তাদের পায়ে নয়, একেবারে পিঠের বাঁ দিকে দুটো ফুঁটো যা থেকে কালো শক্ত হয়ে বসে যাওয়া কিছু একটা তরল পদার্থ গড়িয়ে পড়েছিল কোনো এক কালে।

[‘কাশ্মীর হামারে হ্যায়’ গল্পটির মাধ্যমে হুলিও কোর্তাসার-এর ‘হাউস টেকেন ওভার’ গল্পটিকে ‘দখল’ করা হয়েছে। গল্পটির কাঠামো, অনুপ্রেরণা সবকিছুই হল কোর্তাসার-এর। মূল গল্পটির বিনির্মাণের পরে বাকি যদি কিছু পরে থাকে তা আমার। – লেখক]




মিলিয়ন ডলার নাইটমেয়ার

—     চোখ মেলতেই ঝলসানো আলো। চোখ ধাঁধানো। সামনে একটা ভেজানো দরজা। সামান্য এক চিলতে ফাঁক আছে। সেই ফাঁক গলে বেরিয়ে আসছে ওই ঝলসানো আলো। উজ্জ্বল হলুদ। মাঝেমাঝে গেরুয়া ছোপ। দরজার ওপারে একটা বড় ঘর। তার চারিদিকে গনগনে আগুন। তবে তা স্পর্শ করে না আমায়। কিন্তু গরম আঁচ ছুঁয়ে যায়। ঘাম ঝরে। জ্বালা করে— শরীর, চোখ। চোখ দিয়ে জল ঝরে। উপরে, ঘরের ছাদ থেকে, ঝুলছে অসংখ্য মৃতদেহ। মানুষের। মাথা নীচের দিকে, পা উপরে। গোটা শরীরটাই দলা পাকিয়ে ছোট হয়ে গেছে আগুনে পুড়ে। বডিগুলো সবকটাই আগুনে ঝলসানো। বিভৎস চেহারা। কালচে লাল রং। সাদা রঙের এক ডাইনিং টেবিল, নীচে, ঘরের ঠিক মাঝখানে। ঘরের সেই আগুনে-আলো উধাও হয়ে যায়, হঠাৎ। বদলে, সাদা ঝকঝকে আলো ভরিয়ে দেয় ঘর। ভাসিয়ে দেয়। ঘরের উত্তাপও উধাও। বরফ-ঠাণ্ডা স্রোত নেমে যায় শিরদাঁড়া বেয়ে। আমি বসে আছি সেই টেবিলটার এক মাথায়। আমার সামনে একপ্লেট ঝলসানো মাংস। তন্দুরি। আমি ওই কালচে লাল মাংসপিণ্ড খেতে লাগি, ধিরে ধিরে। সেই লম্বা টেবিলের উলটো প্রান্তে একটি অবয়ব ফুটে ওঠে হঠাৎ। আবছা। তারপর ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এক যুবক। স্যুট-টাই পড়া। চোখে চশমা। নিখুঁতভাবে দাড়ি কামানো। স্মার্ট চেহারা। ছেলেটি মাথা নাড়ে আস্তে আস্তে। মনে হয় আমার এই তন্দুরি খাওয়া, তার স্বাদ উপভোগ করা— সবই ও দেখেছে। ঠিক বোঝা যায় না। তখনই সে কথা বলে ওঠে।
—     সো, মিস্টার সিংহানিয়া, এই পার্টিকুলার নাইটমেয়ারটি রেকার করে আপনার ঘুমের মধ্যে? বারবার? প্রতি উইকে তিনবার থেকে ছ’ বার?

সিংহানিয়া বয়স্ক মানুষ। ষাট পেরিয়েছে। ভারী চেহারা। হাত-পা ছেড়ে, চেয়ারে গা এলিয়ে বসে আছে। বরফখণ্ডের মতো ফ্যাকাসে, শুষ্ক, কঠিন মুখচোখ। খানিক ক্লান্তির ছাপ আছে তাতে। টেবিলে রাখা ড্রিঙ্কস-এর গ্লাসের গায়ে ঘরের চিলড্ টেম্পারেচারের ছোঁয়া লেগে রয়েছে। সাদা ভাপ ধরেছে। সামনে বসে থাকা ধোপদুরস্ত ছেলেটা তার থেকে অনেক ছোটো। সিংহানিয়া ভালো করে মাপতে থাকে ছেলেটাকে। তার ছোটো ছোটো কুতকুতে চোখে। এবং তার কথার উত্তর দিতে থাকে। বরফের মতোই ঠাণ্ডা গলায়।
—     ইয়েস, দিস ইজ ইট।
ছেলেটি তার দু হাতের থাবার মধ্যে একটা মোটা ফোল্ডার ধরে রেখেছে। টেবিলের উপরে। সেই ফোল্ডারটা খোলে। ভালো করে দেখে খানিকক্ষণ; উলটে পালটে। ফোল্ডারটা খোলাই থাকে।
—     ডক্টর মুখার্জী রিপোর্ট পাঠিয়েছেন আমাদের অফিসে। আপনি লাস্ট থার্টি থ্রি ইয়ার মোর অর লেস এই স্বপ্নটি— আই মিন, এই দুঃস্বপ্নটি দেখছেন। ফার্স্ট টাইম দেখেন ইন দ্য ইয়ার এইটি ফোর। তারপর আবার বছর দুয়েক বাদে। নাইনটি এইট থেকে আরও একটু ফ্রিক্যোয়েন্ট। বছরে একবার-দুবার। লাস্ট সেভেন অ্যান্ড হাফ ইয়ার রেকারিং পিরিয়ডটা অ্যালার্মিংলি রাইজ করেছে।
চোখদুটো আরও কুঁচকে ছোটো হয়ে যায় সিংহানিয়ার। একটু নড়ে বসে সে। সবকিছু মনে করার চেষ্টা করে বোধহয়। খানিক পরে ঘাড় নেড়ে সায় দেয়।
—     ইয়েস, টু থাউজ্যান্ড নাইন থেকে আই অ্যাম আন্ডার মেডিকেশন। আন্ডার ডক্টর মুখার্জী। তাতে কিছুটা ফল পেয়েছি। সাময়িক। কিন্তু, কিয়োরড হইনি। আসলে, আমার বিজনেস আর এই নাইটমেয়ারটি এক সঙ্গেই বেড়ে উঠেছে।


ছেলেটা আবার ঐ খোলা হোঁৎকা ফোল্ডারটায় চোখ রাখে। কি দেখে বোঝা যায় না। তারপর পরিষ্কার গলাটাকে আরও একটু পরিষ্কার করে নিয়ে ঢুকে পড়ে আসল কথায়।
—     সাধারণত নাইটমেয়ার দেখার যে প্রবণতা, বা রোগ, তা ওষুধের মাধ্যমে সেরে যায়। কিন্তু আপনার কেসটা একদম অন্যরকম। অ্যাকর্ডিং টু ডক্টর মুখার্জী, আপনার সাবকন্সাস মাইন্ডের কোথাও এই আগুনে পুড়ে মৃত্যুর ঘটনাটা এমন দৃঢ়ভাবে ঢুকে আছে যে ইট ক্যান নট বি ওয়াইপড্ আউট কমপ্লিটলি। অথচ, অ্যাজ পার দ্য ইনফরমেশন প্রোভাইডেড বাই ইউ, আপনার কোনো ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাই নেই বার্নট কেস নিয়ে!

কথাগুলো বলে ছেলেটা এক মুহূর্তের জন্য তাকায় তার সম্ভাব্য কাস্টমারের মুখের দিকে। ভাবলেশহীন মুখ। সিংহানিয়াও তাকিয়ে আছে তারই দিকে। সে হয়তো কিছু ভাবছে মনে মনে। ছেলেটার বয়স কত হবে? বছর তিরিশেক। গত তিরিশ বছর ধরে কলকাতায় এবং তার আশেপাশের এলাকায় অন্তত গোটা পঞ্চাশেক বস্তি অথবা গুদাম বা কারখানা আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে। অনেক ক্যাজুয়ালটিজ হয়েছে। বেশিরভাগই আনঅফিশিয়াল ডেথ। হিসেবের বাইরে। ইনডিরেক্ট ডেথও হয়েছে। আফটার-এফেক্ট হিসাবে। সেই সব আগুন কে বা কারা লাগিয়েছে, বা লাগিয়ে চলেছে, বা আদৌ তা লাগানো আগুন কি না, তা জানাই যায় না। কিন্তু সেইসব পুড়ে যাওয়া বস্তি বা গুদাম বা কারখানাগুলো কিছুদিন পরেই নতুন ঝাঁ-চকচকে মাল্টিস্টোরিড অ্যাপার্টমেন্ট অথবা শপিং মল বা মাল্টিপ্লেক্স রূপে ফিরে এসেছে। ফিনিক্স পাখির মতো। এটা জানা তথ্য। আর একটা নোন ফ্যাক্ট হল, এই গোটা পঞ্চাশেক রিয়েল এস্টেট প্রোজেক্ট-এর অন্তত সত্তর শতাংশ, খাতা-পেনসিলে গুণতে বসলে যা ছত্রিশটায় গিয়ে ঠেকবে, তা এই সিংহানিয়া, কলকাতা তথা গোটা ইন্ডিয়ার রিয়েল এস্টেট বিজনেসের বেতাজ বাদশার হাত ধরেই গড়ে উঠেছে। এবং, এইসব ঘটনাগুলো ঘটেছিল বলেই আজ এই বিখ্যাত আমেরিকান কোম্পানির এই চোস্ত রিপ্রেজেন্টেটিভের মুখোমুখি বসার ক্ষমতা অর্জন করেছে সিংহানিয়া।
—     ইয়েস, আই নো। ডক্টর মুখার্জী আমাকে সবই বলেছেন। দিস ইজ ইনকিয়োরেবল। তারপরেই উনি আমায় তোমাদের কোম্পানির নাম সাজেস্ট করেন। তোমরা এইসব নাইটমেয়ার, ব্যাড ড্রিমস এটসেট্রার বদলে গুড ড্রিমস অ্যারেঞ্জ করছ নাকি? লেটেস্ট টেকনোলজির মাধ্যমে? ইট সিমস কোয়াইট অ্যাবসার্ড টু মি! হাও...
সিংহানিয়ার কথাটা শেষ করতে দেয় না ছেলেটা। তার আগেই বলতে শুরু করে।
—     ইয়েস স্যর। আমরা সে কাজটাই করে থাকি। আপনাকে ডিটেল-এ বলি। আমাদের কোম্পানি মূলত রোবটিক্স নিয়ে কাজ করে। যত সায়েন্স ডেভেলপ করছে তত মানুষ আর মেশিনের মধ্যে ব্যবধান কমে যাচ্ছে। আমাদের মূল লক্ষ্য মেশিনের সাহায্যে মানুষকে যতটা সম্ভব সুখ প্রোভাইড করা। অবশ্যই যেসব মানুষের সেই হাইয়েস্ট লেভেল অফ প্লেজার উপভোগ করার ক্ষমতা আছে, অথবা, টু বি মোর প্রিসাইজ, যাদের অধিকার আছে, তাদের জন্যই এই ব্যবস্থা।
ছেলেটা এক মুহূর্ত থামে। তারপরে তার সম্ভাব্য কাস্টমারের চোখে চোখ রেখে প্রশ্ন করে,
—     আমি কি ঠিক বোঝাতে পারলাম, স্যর?
চেয়ারে আরাম করে গা ছেড়ে দিয়ে বসে থাকা অবস্থাতেই সিংহানিয়া হাত বাড়িয়ে ঠাণ্ডা ভুড়ভুড়ি ওঠা গ্লাসটাকে টেনে ঠোঁটের কাছে আনতে আনতে মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়। তাদের কথা চলতে থাকে—
—     ড্রিমস-এর ক্ষেত্রে তোমরা ঠিক কিভাবে কাজ করো?
—     লেটেস্ট রিসার্চ জানায় যে স্বপ্ন জেনারেটেড হয় ভিজুয়াল কর্টেক্স-এর মধ্যে লোকেটেড রাইট ইনফিরিয়র লিঙ্গুয়াল জাইরাস থেকে। আর বিভিন্ন ভিভিড, বিজার এবং ইমোশনালি ইনটেন্স স্বপ্নগুলো, যেমন আপনার এই দুঃস্বপ্নটি, আমিগডলা এবং হিপোক্যামপাস-এর সঙ্গে যুক্ত। ইমোশনাল রিঅ্যাকশন্স প্রসেস করা এবং তা মনে রাখার ক্ষেত্রে প্রাইমারি রোল প্লে করে আমিগডলা। এছাড়া হিপোক্যামপাস বিভিন্ন ইনফরমেশনকে শর্ট টার্ম থেকে লং টার্ম মেমারিতে কনসলিডেট করে। আমাদের নিজস্ব গবেষকরা নতুন একটি মাইক্রোচিপ আবিষ্কার করেছে যা আপনার ব্রেনে একটি ছোট্টো অপারেশনের মাধ্যমে ইন্সটল করে দেওয়া হবে, এবং ব্রেন-এর এই তিনটে পার্ট-এর সঙ্গে কানেক্ট করে দেওয়া হবে। আগে থেকে প্রোগ্রামড্ মাইক্রোচিপটি ব্রেনের ঐ তিনটে পার্টকে পুরোপুরি কন্ট্রোল করবে। এবং, আমরা আপনার ঘুমের মধ্যে দেখা স্বপ্নগুলোকেও নিজেদের ইচ্ছা মতো রেগুলেট করতে পারব।
গ্লাসের মধ্যে ভাসমান আইসকিউব দুটো সিংহানিয়ার ঠোঁটে ধাক্কা মারে। নামিয়ে রাখার পরে আবার খানিক ভুড়ভুড়ি ওঠে গ্লাসে। তারপর, চেয়ার থেকে খানিকটা এগিয়ে এসে টেবিলের উপরে ঝুঁকে পড়া সিংহানিয়ার অবাক হয়ে যাওয়া গলা শোনা যায়,
—     ইট সিমস লাইক সায়েন্স ফিকশন!
—     কিছুটা সেইরকমই লাগে। বাট ইটস্ অল অ্যাবাউট সায়েন্স। নো ফিকশন! লেট মি এক্সপ্লেন। আপনি যখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকেন, বিশেষত যে ফেজটাকে ‘আর.ই.এম’ বলা হয়, সেই সময় আপনার ড্রিমিং স্লিপ শুরু হয়। তখন ব্রেনের ঐ তিনটে পার্ট লাইট আপ উইথ অ্যাক্টিভিটিজ। আমাদের আবিষ্কৃত ঐ মাইক্রোচিপের প্রথম কাজ হল আমিগডলা দ্বারা জেনারেটেড ইমোশনগুলোকে একেবারে ব্লক করে দেওয়া। কমপ্লিট রেজিস্ট্যান্স। এবং, লিঙ্গুয়াল জাইরাসকে টেম্পোরারিলি ডিঅ্যাক্টিভেট করে দেওয়া। যার ফলে, মাইক্রোচিপ লাগালে আপনি আর কোনো স্বপ্নই দেখতে পারবেন না। একদম ড্রিমলেস স্লিপ!

—     কোনো স্বপ্নই দেখতে পারবো না? স্ট্রেঞ্জ!

—     ইয়েস, স্ট্রেঞ্জ অবশ্যই। বাট দ্যাট ড্রিমলেসনেস ইজ নট আ গুড থিং ফর ইয়োর মেন্টাল হেলথ। তাছাড়া, আপনি স্বপ্ন দেখবেন না কেন? খারাপ স্বপ্ন দেখাটা বন্ধ যখন করতে পারছি, হোয়াই ডোন্ট উই ট্রাই টু প্রোভাইড ইউ আ ড্রিম হুইচ মেকস ইউ হ্যাপি? আমাদের আসল উদ্দেশ্যই তো টু অ্যারেঞ্জ ফর আ হ্যাপি অ্যান্ড লাগজুরিয়াস লাইফ ফর ইউ। ঠিক এই জায়গা থেকে আমরা প্রথম যেটা করি তা হল, একটা ডেটাবেস তৈরি করি। যে সমস্ত জিনিসের অনুভূতি আপনার মনে সুখ ও আনন্দ জাগায়, তার একটা লিস্ট। এবং, সেই লিস্টেড আপ জিনিসগুলো যে ইমোশন্স আপনার মধ্যে জেনারেট করে তা সিমুলেটেড অবস্থায় মাইক্রোচিপে আগে থেকে প্রোগ্রামড করে দেওয়া হয়। এবার হচ্ছে ঐ মাইক্রোচিপের দ্বিতীয় ফাংশন। সমস্ত স্বপ্নকে ব্লক করে দেওয়ার পর ঐ মাইক্রোচিপ আপনার বাছাই করে দেওয়া সেই সব সিমুলেটেড স্যাটিসফ্যাক্টরি ইমোশনগুলোকে এবং ভিশনগুলোকে আমিগডলায়, এবং লিঙ্গুয়াল জাইরাসে ইনপুট হিসেবে প্রোভাইড করে। তারপর সেই সব বাছাই করা বিষয়গুলো স্বপ্নের আকারে প্রেজেন্টেড হতে থাকে। ফলে, মাইক্রোচিপ ইন্সটলড হয়ে যাওয়ার পর আপনি যখন ঘুমাবেন, তখন কোনো আনওয়ান্টেড স্বপ্ন আর দেখবেনই না, বরং শুধুমাত্র প্রোগ্রামড ইমোশন্স দ্বারা জেনারেটেড সুখস্বপ্ন দেখবেন। ওনলি-হ্যাপি-ড্রিমস।

‘ওনলি হ্যাপি ড্রিমস’ কথাটা কেটে কেটে উচ্চারণ করে থামে ছেলেটা। খানিক রেস্ট নেওয়ার জন্য। এবং, সেই ফাঁকে প্রোবাবল কাস্টমারের মুখের অভিব্যক্তিও লক্ষ্য করে। সিংহানিয়া ঘাড় নাড়ে। তার ভারী শরীরটা উঠে গিয়ে পাশের টি-টেবিলের উপরে রাখা এ.সি রিমোটটা হাতে নিয়ে ঘরের টেম্পারেচারটাকে আরও একটু নামিয়ে দেয়। ছেলেটা অপেক্ষা করে তার কাস্টমারের রেসপন্সের জন্য। সিংহানিয়া ফিরে আসার পরে সেই কাঙ্ক্ষিত রেসপন্স আসে।
—     সায়েন্স হ্যাজ ডেভেলপড আ লট, ইনডিড। রিয়েলি স্ট্রেঞ্জ!
ছেলেটা সিংহানিয়ার বলা শেষ কথাগুলোর রেশ ধরে এগোতে থাকে আবার।
—     ইয়েস স্যর, সায়েন্স অবশ্যই অনেক, অনেক ডেভেলপ করেছে। নিজেদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ বৃদ্ধি আর কষ্ট লাঘব মানুষের আদিম আকাঙ্ক্ষা। তার সঙ্গে সবকিছু কন্ট্রোল করার ইচ্ছা। বিজ্ঞানের সাহায্যে তা এখন অনেকটাই সম্ভব হয়েছে। সত্যি কথা বলতে কি, আমার ধারনা আপনার জীবনে এই একটাই মাত্র ড্রব্যাক ছিল। দ্যাট ব্লাডি নাইটমেয়ার। এই যে দুঃস্বপ্ন দেখা, তার যে আফটার-এফেক্ট, তা আপনার মতো হাইয়েস্ট স্টেচারের একজন মানুষ কেন সহ্য করবেন? কেন মেনে নেবেন? বাধ্য হয়ে, তাই তো? তাহলে আপনার সঙ্গে আর পাঁচটা ছাপোষা সাধারণ মানুষের ডিফারেন্স কোথায় রইল? সেই কারণেই আমরা সেই স্বপ্নকেও বন্দী করে ধরে এনে দিচ্ছি অ্যাট ইয়োর সার্ভিস!
সিংহানিয়ার মুখের ঠাণ্ডা মানচিত্রে কিছুটা বদল আসে। মাংসপেশি শিথিল হয় ধিরে ধিরে। সে আবার গ্লাস তুলে নেয় হাতে। আইসকিউব দুটো ছোটো হয়ে গেছে। তবু একবার গ্লাসে ধাক্কা খায়। একটা মৃদু, মোলায়েম শব্দ হয়।
—     হুম। ঠিকই বলেছ। গুড থট। অ্যান্ড গুড ইনভেনশন! থ্যাংকস টু ইয়োর কোম্পানি! অ্যান্ড, থ্যাংকস টু আমেরিকা, অফকোর্স! বাই দ্য ওয়ে, তোমরা কি যেন নাম দিয়েছ এই সার্ভিসটার?
—     ‘রেনবো ড্রিমিং: আ থেরাপিউটিক সার্ভিস’।
—     ইয়েস ইয়েস। ডক্টর মুখার্জী বলেছিলেন। নামটা বেশ অ্যাট্রাক্টিভ। রেনবো! ফুল অফ কালার্স! গুড! আচ্ছা, থেরাপিউটিক কেন? দুঃস্বপ্ন সারাও বলে?
—     কিছুটা সেই কারণেই। তা ছাড়াও, থেরাপিউটিক টার্মটা রাখা হয়েছে কিছু লিগ্যাল হ্যাজার্ডস অ্যাভয়েড করতে। বিশেষ করে ইন্ডিয়ার মতো দেশে। আপনি নিশ্চয়ই বুঝবেন। দিস ইজ আ স্টেপ এগেইন্সট সো-কলড ন্যাচারাল সিস্টেম! ট্যাক্স এগজেম্পশনটাও একটা ইস্যু!
—     হা হা! আ ক্লেভার মেজার!
নিজের অজান্তেই সিংহানিয়ার মুখে এক মুহূর্তের জন্য হাসি ফুটে ওঠে।
—     আচ্ছা, তোমাদের কস্ট-এর ব্যাপারটা তো জানাই হল না। কত টোটাল খরচ?
—     স্যর, সব মিলিয়ে, ইনক্লুডিং পোস্ট-অপারেশন সার্ভিসেস, ওয়ান মিলিয়ন ডলার।
—     আ মিলিয়ন ডলার ওনলি! ইটস্ কোয়াইট আ রিজনেবল প্রাইস! এস্পেশালি ফর দ্য কাইন্ড অফ সার্ভিস ইউ পিপল্ আর গোয়িং টু প্রোভাইড, আ মিলিয়ন ডলার ইজ নাথিং।
—     দ্যাটস্ ট্রু, স্যর।
ছেলেটা আবার থামে। অপেক্ষা করে। বেশ লম্বা অপেক্ষা। তার সম্ভাব্য কাস্টমারকে অবজার্ভ করে। কিছু ভাবছে মনে হয়। বোঝা যায় না। ছেলেটা আবার কথা বলে ওঠে। তার স্বভাবসিদ্ধ ব্যবসায়ীক ভঙ্গীতে।
—     তাহলে সার নেক্সট কবে আসব? অপারেশনের আগে আমাদের বেশ কিছু ফর্মালিটিজ আছে। বিশেষ করে ঐ যে ডেটাবেসটা আমরা রেডি করি, যাতে আপনার নিজস্ব পছন্দের সমস্ত রকম জিনিসের লিস্ট থাকবে, সেটার জন্য একটু কষ্ট করে আপনাকে একটা বেশ বড় ফর্ম ফিল আপ করতে হবে। এই ডেটাবেস ফর্মটাই মোস্ট ভাইটাল। ওটার উপরেই সুখস্বপ্নগুলো নির্ভর করছে কিন্তু।

সিংহানিয়া গ্লাসটাকে আবার তুলে নেয়। লাস্ট সিপ। বরফখণ্ড দুটো ছোট্ট মার্বেল গুলির মতো হয়ে গেছে। গ্লাসের নীচে পড়ে থাকে। একা। একেবারে গলে যাওয়া পর্যন্ত ঐভাবেই পড়ে থাকবে। তার মুখটা আবার আগের মতো কঠিন হয়ে ওঠে। জমাট।
—     না, অন্য দিন নয়। আমি আজকেই করে দেব। আই ডোন্ট ওয়ান্ট টু লুজ এনি টাইম ইন এনজয়িং দ্য গুড ড্রিমস!
ছেলেটা অবাক হয় প্রথমে। তারপর মুচকি হাসে। তবে তা ধরা পড়ে না তার মুখে। সিংহানিয়া উঠে যায় পিছনের সেলারের দিকে। দুটো পেগ বানায়। ফিরে আসে। একটা গ্লাস ছেলেটার দিকে এগিয়ে দিয়ে ইশারা করে নেওয়ার জন্যে। ছেলেটা মাথা নেড়ে থ্যাংকস জানিয়ে কথা শুরু করে,
—     ওকে স্যর। আজকেই ডেটাবেস ফর্ম ফিল আপ অ্যান্ড আদার কন্ট্রাক্ট পেপারস-এ সিগনেচারগুলো হয়ে যাক তাহলে। খুব ভালো কথা।
তার সাইড ব্যাগ খুলে একতাড়া ফর্ম বার করে ছেলেটা। তার মধ্যে থেকে একটা বেশ মোটা বাঞ্চ সিংহানিয়ার দিকে এগিয়ে দেয়।
—     স্যর, এইটা হচ্ছে সেই ডেটাবেস ফর্ম। আপনি ধিরেসুস্থে ভেবেচিন্তে ইনফরমেশন গুলো দিন। রিমেমবার, দিস ইজ দ্য মোস্ট ইম্পরট্যান্ট থিং ইন দ্য হোল প্রসেস।
সিংহানিয়া গ্লাসে একটা চুমুক দেয়। খানিকক্ষণ চুপ করে ভাবে। তারপর, সোজা ছেলেটার চোখে চোখ রেখে বলে ওঠে,
—     প্লিজ রিঅ্যাসিয়োর মি ওয়ান থিং। দিস ডেটাবেস উইল রিমেন হাইলি কনফিডেনসিয়াল, ওন’ট ইট?
ছেলেটা বেশ অবাক হয়ে যায়। তারপর নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে সিংহানিয়াকে পুরোপুরি আস্বস্ত করে। তারপর, দু জনেই তাদের গ্লাসগুলো নিজেদের ঠোঁটের কাছে টেনে নেয়। নতুন, বড় বড়, ঝকঝকে আইসকিউব গুলো তাদের ঠোঁটে ধাক্কা খেয়ে ঘুরতে থাকে গ্লাসের মধ্যে।


প্রায় ঘণ্টা খানেক পরে ছেলেটা বেরিয়ে আসে। কোম্পানির গাড়িতে উঠে সব পেপারস গুলো চেক করতে থাকে। কনট্র্যাক্ট পেপারস। সিংহানিয়ার দেওয়া প্রথম কিস্তির চেক। তারপর, ডেটাবেসটা খোলে। পঞ্চেন্দ্রিয়ের মাধ্যমে উপভোগ্য সবরকম জিনিসের জন্যেই এক-একটা কলাম আছে। এছাড়াও আছে মেন্টাল স্যাটিসফ্যাকশনের বিভিন্ন সেকশন গুলো। ছেলেটা চোখ বোলায়। ড্রিঙ্কস- জনি ওয়াকার ব্লু লেবেল। সেক্স- উইথ সামওয়ান লাইক ক্যাটরিনা কাইফ। ছেলেটা দেখতে থাকে, একে একে। আস্তে আস্তে। হঠাৎ ছেলেটার চোখ আটকে যায় একেবারে শেষ পাতায়, ‘এনি স্পেশ্যাল ডিজায়ার’ কলামে গিয়ে। চমকে ওঠে সে। সেখানে লেখা আছে: ‘তন্দুরি মেড অফ হিউম্যান ফ্লেশ’। ঠিক তার নীচে, কালচে লাল কালিতে, জ্বলজ্বল করছে মিস্টার সিংহানিয়ার সিগনেচার।





















অদ্বয় চৌধুরী
Adway Chowdhuri
Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS