Sreemoyee Bhattacharya



আমি এবং রবীন্দ্রনাথ - ১


আমি যখন জন্মেছিলাম, আমার রং ছিল ভয়ানক কালো। বাবা নাকি সিস্টারদের বলেওছিল, এ আমার মেয়ে নয়। পাল্টাপাল্টি হয়েছে। কিন্তু কেউ শোনেনি। বাবার নিজের রং নিয়ে গর্ব ছিল বোধহয়। সাদা চামড়ার লোকরা শুনলে কী হাসবে ভাবুন!
আমার দিদির ডাকনাম ছিল দোয়েল। তার সাথে মিলিয়ে আদর করে দিদি আমার নাম রাখে কোয়েল। বরাবরের অপছন্দের নাম আমার। কিন্তু আমি বোঝার বয়সে পৌঁছে বুঝলাম আমার গোটা পৃথিবী আমায় ওই নামেই ডাকে, অগত্যা..
তো এহেন দোয়েল-কোয়েলপাখি খেলতে যেত শ্যামলীমাসির বাড়ি।
শ্যামলীমাসি আর সত্যবানমামা। এঁরা এক দম্পতি। মাসি এবং মামা, কারণ দুজনের সাথেই আমাদের পরিচয় মায়ের সূত্রে। এঁরা দুজন আলাদা মানুষ। বিবাহিত হওয়াটা এঁদের একমাত্র পরিচয় নয়। ওঁদের বাড়িতে একটা বড় খেলার মাঠ ছিল। আর,ওঁরা দুজনেই ছিলেন টেগোর ইন্সটিটিউটের প্রাক্তন ছাত্রছাত্রী।
আমি তখন ছোট। সবে নার্সারি টু। আমার ওই বাড়িতে যাতায়াত মূলত খেলাধুলোর জন্য। ছোটবেলায় আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিস্ময় ছিল, আমার বাবা বা মা সকাল থেকে উঠে দৈনন্দিন কাজ নিয়ে কথা বলে, বা বলে না। বাবা অফিস যায় আর সন্ধেবেলা আড্ডা মারতে বেরোয়। মা রান্নাবান্না করে আর সন্ধেবেলা দিদির বন্ধুদের পড়ায়। অথচ, কেউ একবারের জন্যেও খেলতে যেতে চায় না! কী ভীষণ বোরিং! আমি তখন ভগবান-টগবানে বিশ্বাস করি। আমি রোজ তাকে বলি, ঠাকুর, আমি যেন কখনো বাবামায়ের মত না হয়ে যাই। যেন রোজ খেলতে যাওয়ার অদম্য ইচ্ছেটা আমার মন থেকে মুছে না যায়।
হা ঈশ্বর!
শ্যামলীমাসির কাছে দিদি কবিতা, নাটকও শিখত। দিদি ক্লাস থ্রি। দিদিরা সেবার ‘ছাত্রের পরীক্ষা’ শ্রুতিনাটকের আকারে করছে। রোজ রিহারস্যাল। আমারও খুবই সুখের দিন। মা দিদির সাথেই বসে থাকে, রিহারস্যাল শোনে, আর আমি সন্ধে পেরিয়ে রাত অবধি খেলি।  অনুষ্ঠানের দিন একদম কাছে। পুরোদমে মুখস্ত চলছে পার্ট। হঠাত, ঠিক দুদিন আগে দিদির ধূম জ্বর। কী হবে এবার? সবার নজর পড়ল আমার উপর। আমার বয়স তখন চার। পড়তেও শিখিনি একবর্ণ। শ্যামলীমাসি তাও একবার বলল, একটা লাইন বলার চেষ্টা করতে। আর ওমা, আমি গড়গড় করে বলে ফেললাম নাটকটা! কখন যে শুনতে শুনতে আমার মুখস্ত হয়ে গেছে সব ডায়ালগ, আমি নিজেই জানিনা! অনুষ্ঠানের পর মায়ের কাছে শুনেছি, সব দর্শকের কোলে অন্তত একবার করে ঘুরেছিলাম আমি।
সেই প্রথম রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে আমার আলাপ, আর ওঁর হাত ধরে আমার হিরো হওয়া।
তারপর একবছর পেরিয়ে গেছে। নিলভনার সাথে বন্ধুত্ব হয়েছে। ক্লাসের যেকোনো কাঁদুনে বাচ্চার স্কুলতুত মা আমি। আর ওদিকে দিদি ক্লাস ফোর। যাদবপুর বিদ্যাপীঠ, যেই স্কুলেই আমার গোটা ছোটবেলা কেটেছে, তার সব ভালো, শুধু, আমাদের সময়ে একটাআডমিশন টেস্ট হত ক্লাস ফোর থেকে ফাইভে ওঠার, যা ছিল যমের চেয়েও ভয়ঙ্কর! আমরা ছিলাম ঘোর কট্টরপন্থী বাঙালি পরিবার। ফলে বাংলা মিডিয়াম ছাড়া কোথাও পড়ানোর কথা আমার বাবামা কখনো ভাবতই না। আর কাছাকাছি তেমন ভালো মেয়েদের বাংলা মিডিয়াম স্কুল নেই বলে ওদের ধারণা ছিল। ফলে এখানেই ফাইভে চান্স পেতেই হবে।
আর তখন আবার ছেলেদের মায়েরা ভীষণ গর্বিত হয়ে নরেন্দ্রপুর রামকৃষ্ণ মিশনে পাঠাতে চাইছেন ছেলেদের। বুকে পাথর রেখে ছেলেকে হস্টেলে রাখবেন, তবু পড়াশুনো এবং মানুষ হওয়া শিখবে ছেলেরা। আমার মায়ের দুঃখেচোখ ফেটে জল। কেন যে রামকৃষ্ণ মিশনে মেয়েরা পড়তে পারে না! আমার মেয়ে দুটো মানুষ হবে তো?
যাই হোক, তো আমার চতুর্দিকে সবাই তখন উন্মাদের মত পড়াশুনো করে চলেছে। আর বাবামায়েরা ফর্ম তুলতে ছুটছে, নয়তো ফর্ম ভরছে।
এমনই এক সকালে, আমি কলম ধরলাম।
‘নরেন্দ্রপুর খুব শান্ত।
সবাই হয়েছে ক্লান্ত।
এ’প্রান্ত, ও’প্রান্ত...
সকলেই উদ্ভ্রান্ত।’
না। উদ্ভ্রান্ত শব্দটা আমি জানতাম না অবশ্যই। কারুর মুখে শুনেছিলাম, বানানটাও ধার করে লেখা।
বয়স তখন ৫। নার্সারি থ্রি। মা যখন আনন্দে ডগমগ, রোয়াব নিয়ে মা’কে জিজ্ঞেস করেছিলাম, ‘তোমাদের রবীন্দ্রনাথ যেন প্রথম কবিতা কবে লেখে?’ মা খুব গম্ভীর হওয়ার চেষ্টা করে বলেছিল, ‘৮ বছর বয়সে।’ মা কোনমতেঠোঁট কামড়েহাসি আটকাচ্ছিল তখন, কিন্তু আমার চোখে ছিল যক্ষের ধন জয় করারঅহংকার -‘আমি একটু আগেই লিখলাম।’
তারপর নাকি একটু ভেবে বলেছিলাম, ‘হুহ! তাহলে কে বড়? আমি, না রবীন্দ্রনাথ?’



আমি এবং রবীন্দ্রনাথ – ২

আমাদের বাড়ি ছিল গানের বাড়ি। আমার মাসি ছিল রবীন্দ্রভারতীর স্বর্ণপদকধারী। যদিও তারপর কিছুই করেনি, সংসারে আজেবাজে কাজ করা ছাড়া। আমার বাবা গান শেখেনি কখনো, কিন্তু গাইত ভালোই। আমার ঠাকুমার কিরকম একটা যেন জামাইবাবু হতেন সঙ্গীত বিসারদ তারাপদ চক্রবর্তী আর তা নিয়ে ঠাকুমা বেশ গর্বিত থাকতেন। বাবার ভুত্তান মামা, যাঁর শুধু নামই শুনেছি আমি, তারাপদদাদুর প্রিয় ছাত্র ছিলেন। তাই থেকেই নাকি বাবার এই গানের গলা। তদুপরি বাবার কেন যেন ধারণা ছিল, বাবার গলাটা অবিকল হেমন্তের মত। সেখানেই শেষ নয়, বাবাকে নাকি রাস্তাঘাটে লোক দেখলেই বলত, ঠিক যেন উত্তমকুমার। (জানিনা, বাবা-মা প্রেম করার সময়, বসন্ত বিলাপের মত কোন ঘটনা ঘটেছিল কিনা) আমি যদিও দু’ক্ষেত্রেই কোন মিল কখনো খুঁজে পাইনি, কিন্তু এরকম ভাবতে কার না ভালো লাগে, বলুন? মেনে নিতেই বা ক্ষতি কি?

আমার মা আবার ছিল ক্লাসিক্যালের নাড়াবাঁধা ছাত্রী। মা গান শিখত পণ্ডিত অমরেশ চৌধুরীর কাছে। প্রতি রোববার আমাকে আর দিদিকেও বগলদাবা করে নিয়ে যেত মা। ছোটবেলা থেকে, টাচউড, আমার ভাগ্য বড়ই সুপ্রসন্ন এসমস্ত বিষয়ে। বয়স তখন ৬। প্রথমদিন গেছি। ক্লাসে গান হচ্ছে। মায়েরা সবাই বেশ উচ্চস্বরে কখনো সরগম, কখনো আআ করে গান গাইছে। আমি মাথামুণ্ডু কিচ্ছু বুঝছি না। হঠাত কোন শব্দ ছাড়া এতজন পুর্ণবয়স্ক ভদ্রলোক-ভদ্রমহিলা অকারণে চিৎকার করছেন কেন? (খড়গহস্ত মানুষজনের কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি এই বাক্যের জন্য। বয়স।) ভাগ্যক্রমে পাশেই রাখা ছিল একটা ছোট্ট বিছানা, কি জানি কার জন্য। আমি পাশ কাটিয়ে টুক করে গিয়ে ওই বিছানাটায় সটান ঘুম দিলাম। আর ভাগ্য ভাবুন, মা যখন আমাকে এই মারে তো সেই মারে, মাস্টারমশাই বললেন, ‘আরে ওকে বকিস না, ওর মধ্যে সুর আছে, তাই ওর সুরের ছোঁওয়ায় ঘুম এসে যায়।’ আর পায় কে?

এদিকে বয়স বাড়ছে, টক্করও বাড়ছে আমার রবীন্দ্রনাথের সাথে। কিন্তু গান লেখাটা পেরে উঠছি না কিছুতেই। এমনিতেই আমার বাড়িতে সকাল থেকে রাত, ওই তখনকার দিনের রেকর্ড প্লেয়ারে দেবব্রত বিশ্বাস গেয়ে চলতেন। এমনকি শনিবার রাতে যখন কিনা পাশের পাশের বাড়ি থেকে ভেসে আসছে ‘সুপারহিট মুকাবলা’র গান, আর আমার কান দুটো কুকুরের মত খাড়া হয়ে উঠছে, তখনও। দুর্বিষহ দিন ছিল সেসব। কারণ আমার বাবা-মায়ের মতে হেমন্ত, কিশোর কুমার এবং গীতা দত্ত ছাড়া যেকোনো হিন্দি গান শোনাই মহাপাপ।  গজল তাও চলতে পারে। মাঝেমধ্যে।
না। কিন্তু প্রতিবাদের ভাষা তো খুঁজে বের করতে হবে আমায়। অনেক ভেবে বুঝলাম, ভাষা খুঁজে লাভ নেই। আমার ভেতর তো সুর আছে, তার সদ্ব্যবহার করি!

আমিও এবার তারস্বরে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাইতে শুরু করলাম বাড়িতে। সবার প্রায় কান ঝালাপালা হবার দশা। মা তড়িঘড়ি ছুটে এসে বলল, ‘এসব কী গাইছিস তুই? এটা কী সুর?’ আমি ভ্রূকুঞ্চন করে তাকালাম মায়ের দিকে। (গান কিন্তু থামাইনি।) এ’সূত্রে বলে রাখি, আমার ভ্রূ দুটো অবিকল চন্দ্রকান্তা’র ক্রূর সিং-এর মত। এখন তো কেটেকুটে তাও ভদ্র করেছি। কিন্তু তখন ভ্রূ উপরে তুললে আমার কপালে এভারেস্টের চুড়া অবধি দেখা যেত।


মা আবার ধাক্কিয়ে বলল, ‘কিরে?’ আমি আমার অহঙ্কারের সুরে বললাম, ‘কথাগুলো রবীন্দ্রনাথের, সুরটা আমার। এখন থেকে এভাবেই গাইব আমি।’

শ্রীময়ী ভট্টাচার্য্য
Sreemoyee Bhattacharya