Sambuddha Ghosh


সামার ল্যাসি (সনেটগুচ্ছ)

২০

কখনও হয়েছে বাতাস পেলব মুহূর্তের গিরিখাতে। একমুখী
বাতাস বইছিল। পশ্চিম থেকে লাইটহাউস দেখে মৃদু বিনিদ্রা;
বেশ চলে যায় আমাদের রাত্রির হাতঘড়ি। চৈত্রের গাঢ় হরিদ্রা,
শালবনে কুয়াশা ঝরে, কেমন সব ছবি যেন। যেন দ্বারমুখী
হলেই সন্ধ্যা হবে। চাদরের মতো আবছায়া নামবে ফাল্গুণের
রাতে। আমারা তখন গহীন ঘুমে, ব্রততীফুলের মতো মুথাঘাসে
লেগে থাকব, সময়ের সাথে; অথবা যখন জেনো তুমিও জুনের
বর্ষায়, তাপ হয়ে—হরিতনগরে তখন নেমেছে হলুদ পপির মাসে,

আমাদের কানা রিচমন্ড স্ট্রীটখানা চাঙড়ের মতো চোরাস্রোতে
বালির, মিনিটের—পীতফুল, পাতা নিয়ে বিকেলের পোর্টিকোতে
দাঁড়িয়ে; দাঁড়িয়ে ছিলে সিগারেট হাতে। আসছে বালিকা, অনাহত,
ছিপছিপে যুবকের সাথে। ঐ মৃত আলোমেখে চোখ তাদের আনত,
ডাগর, কলোনির ছাপ মাখা। ছাই ঝেড়ে আড়চোখে ফের দেখো
চশমার ফাঁক দিয়ে। ফাল্গুন বুড়িয়েছে , কিছু পুরনো গান রেখো।



২৩

জীয়নের বোধিসত্ত্ব হয়ে এভাবেই ভেবে গ্যাছো তাই;
বাতাস যেমন করে ভাসায় সাদাকালো ফিঙেদের ঠ্যাং
চৈত্রের বনে, অনুকূল বুলেভার্ড জুড়ে বেলুনওলার গ্যাং
বিকেল জুড়িয়ে গেলে বসে। মাঞ্জার নীলসুতো লাটাই
থেকে, ঘুড়িগুলো যায় দূর-দূর--একেক গাঢ় চায়ের
মতন দিনে, মাদেলিন ফোন করে বলে বহুদিন পর,
কখন সময় হবে? এপ্রিল মাস তবুও খুব অজাগর
কাঁকড়ার সুডোল চোখে। বালিতে, রোদে, পায়ের

ছাপ ওঠে। দূর থেকে ডেকে গ্যালো মিলের সাইরেন,
বাষ্পের হলুদ বনে কত সৈন্যদল ওলাওলা চলে গেল
কাস্তের গান নিয়ে। তুমি লিপির কথার সাথে অহিফেন,
মজুরের করাতে ঋতুর আঠার মত শালবনে; খেলো
কাগজের ভিড়ে চেয়ে দ্যাখো গ্রন্থ হয়ে গেছ নির্জ্ঞানে;
বোধিসত্ত্ব হয়ে জেনেছ লাটিম, পাখির ডানার মানে।



২৬

ক্ষণিকের প্রজননকাল এইসব; চোখ তত দূরে গেলে
দেখতে পেতে বিস্তৃত খাদ থেকে, তাহাদের আবছায়া
গোলঘরে জেগে। ঘাস গজিয়ে ওঠে গম-বার্লির মিলে,
একজন ঘাস কাটে শুধু, যেই ঘাসে কিশোরের মায়া--

নিয়ত শতাব্দী জুড়ে উজ্জ্বল কাপের রঙ, আলেয়ার,
মেহগনি দেরাজ খুলে মশলার কৌটোতে গতবার জুন
বাতাস ভরিয়ে তোলে। বস্তুত পশম, ঘড়ি, বিমল মিথুন
উড়ন্ত প্যারাসোল আকাশে, জংধরা মোটরের গিয়ার,

এসবই আমাদের শিখিয়েছে বাতায়ন থেকে দূরে গ্যালে
কাদের নাদ পাহাড়ের গায়ে। ছায়ারা ঘনিয়েছে রাবেয়ার
চুলে। বাতাস, বাতাস কপিকল জুড়ে--সামার বাই সামার
মেদুর আলমান্যাকে দাগ পড়ে, ফিল্ডগ্লাস মুছে ফ্যালে

বিহান শিশির। প্রমেয় যা কিছু ছিল, মুহূর্তে ধূসর ক্ষণে;
ঘোড়াদের নাল ধরে হেঁটে আসে প্রেম, পাইনের বনে।




নস্ট্যালজিয়া
আর্সেনিয় তারকোভস্কি
Arsenii Tarkovsky : ‘Nostalgia’

ছেলেবেলায় একবার ভুগেছি
ক্ষিদেয় আর ভয়ে। শক্ত আঁশ ছাড়িয়ে
জিভ বুলিয়েছি ঠোঁটে। মনে পড়ে
শীতল নোনাস্বাদ সেইসব, তবু
আবার বসেছি সদরের সিঁড়িতে ওম পেতে,
জ্বরের বিকারে আমি ঘুরেছি
নদীমুখে বাঁশিওয়ালার সুরে;
ওম পেতে সদরের সিঁড়িতে বসে আমি--

দাঁড়িয়ে রয়েছে মা, ডাকছে আমায়
সাতটা ধাপ দূরে;
এগিয়ে গিয়েছি, তবু সাতটা ধাপ দূরে
ওই দাঁড়িয়ে রয়েছে মা, ডাকছে আমায়
ওই দূর থেকে।

জ্বর নেমে এল,
কলারের বোতাম খুলে শুয়ে পড়ি,
আর শিঙার ভোঁ শুরু হল,
আলোর চাবুক লাগল চোখের পাতায়,
আর ঘোড়াদের নাদ ভেসে এল--
পাথুরে জমির 'পরে ওই
উড়ে যাচ্ছে মা,
ওই মিলিয়ে গেল...

এখন দেখি আপেলবীথিকার ফাঁকে
শাদা ওয়ার্ড এক, আমার গলা পর্যন্ত
টানা শাদা বেডশীট, শাদা ডাক্তার
ঝুঁকে পড়ে, আর শাদা নার্স ডানা গোটাচ্ছে
পায়ের কাছে এসে। ওরা সব র'য়ে গেল,

শুধু মা এসে ডাকল আমায়
ওই দূর থেকে,
আর বাতাসে মিলিয়ে গেল...





জীবন, জীবন
আর্সেনিয় তারকোভস্কি
Arsenii Tarkovsky : ‘Life, Life’

কখনো পূর্বাভাসে বিশ্বাস করিনি আমি,
অথবা ভয়ে, কুলক্ষণে। পালাইনি কুসার বিষে।
মৃত্যু বলে আসলে যে নেই কিছু,
সকলেই অমর, সবকিছু।
সতেরোয় মৃত্যুভয় অর্থহীন, সত্তরেও,
কারণ রয়েছে শুধুই এখন, এখানে, আর
আছে আলো
মৃত্যু অথবা অন্ধকার নেই কোনো 
আমরা সকলে কেবল দাঁড়িয়ে সমুদ্রতটে,
আমিও তাদেরই একজন, যারা ফেলেছিল জাল,
অমরত্বের এক ঝাঁক ভেসে এলে।

কোনো বাড়িতে একবার থাকলে পরেই
আর ভেঙে পড়বে না বাড়িখানি;
যেকোনো শতাব্দীকে আহবান করে
আমি তাতেই বানাব বাড়ি এক।
তোমাদের স্ত্রী-সন্ততিরা তাই
আমার সাথে এক টেবিলেতে বসে,
প্রপৌত্র-পূর্বপুরুষ সকলেই এক টেবিলে
এভাবে সময় ভবিষ্য হয়ে ওঠে।
আমার করপুট কিঞ্চিৎ তুললেই,
তোমাদের সাথে যাবে পঞ্চরশ্মির আলো,
প্রতিদিন গলবন্ধ হাড়ে,
আমি অতীত বন্দী করেছি তক্তায়,
ভূবিদ্যার শিকলে সময় মেপেছি,
আর হেঁটে গেছি বরাবর, যেন সময়ের উরাল।

যুগকে আমি করে নিয়েছি নিজের মত,
আমরা পদশব্দে ধুলো তুলে
হাটছিলাম দক্ষিণদিকে,
উঁচু উঁচু ঘাস থেকে উঠছিল ধোঁওয়া,
সন্তের মত শুঁড় তুলে ফড়িঙের নাচে
আমার ধ্বংসের বীজ ছিল।
ঘোড়াদের পিঠে পিঠে
আমার অদৃষ্টকে জিন পরিয়েছি,
আগামীর দিকে চেয়ে আমি বালকের মত,
দাঁড়িয়ে রয়েছি রেকাবে 
সমাহিত হয়ে আছি মৃত্যুহীনতায়।
যুগ থেকে যুগে আমার শোণিতের স্রোত বয়ে গেলে
তবুও নিবিষ্ট কোণে উত্তাপের তরে
আমার সমস্ত জীবন পারি দিতে,
তাহার উড্ডীন সূচে হয়ে থেকে সুতো
পৃথিবীর পথে পথে।





বাতাস
জেমস্‌ ফেন্‌টন্‌
James Fenton, ‘The Wind’

এখানে বাতাস বয়, বাতাস ভূট্টার ক্ষেতে--
বৃহৎ বিপর্যয় থেকে নিরন্তর পাহাড়ের পথে
অনাহত মানুষের ঢল নামে হরিত জংগলে,
বাঁকে; বাতাসের অগণন ধ্বংসের কালে।

পরিজন, গোষ্ঠী, নাগরিক এবং তাদের খচ্চরের দল
শুনেছে কিছু, দেখেছে।
মাতসন্যায়ে, প্রাকৃত না-বোঝার ভার বয়ে নিয়ে
শিখরের কাছে, শস্যের মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে,
আগুনের, তরবারির কথা--

দু'টি অনুপলে সহস্র বছর ব'য়ে গেল দেখি,
স্বত্ত্ব বদলে গেল বসবাসে। ভাষারা ভেঙেগড়ে বিবর্ণ হল,
সার্থবাহ অমুক হজরত প্রাচ্যে পেলেন নিকষ আশ্রয়।
তাদের ভায়ের মত তমুক প্রভুরা
চিনে নিল আফ্রিকা, নধর
জামের বাটি।

মিনিটখানেকে শতাব্দী বয়ে গেলে 'পর,
জিগ্যেস করে ওঠে কেউ, কীভাবে খঞ্জরের বাঁট
এতদূর চলে এলো নির্জন কামারশাল থেকে;


আর বহুদূর থেকে, তাহাদের গান ভেসে আসে:
"খসে পড়া তুষের মতন, আমরাও ভেসে গেছি বাতাসে,
বাতাসে"; বইছে বাতাস ওই, বাতাস ভুট্টার ক্ষেতে।





উত্তর-নির্মাণ
ক্যে রায়ান
Kay Ryan, 'Post-Construction'

স্রস্টার চেয়ে আর
কে ভালো জানে,
কাঠামোর সবিশেষ জাড্য থেকে,
অমোঘ নিরাপত্তাকে করতে
অবিশ্বাস;

কিভাবে ছাদের ভার
দুর্বহ হয়,
অত্যধিক
গুটিকয় খিলানের 'পরে--

তবুও অনিশ্চয় থেকে
কারুর প্রমেয় সত্য
ভেঙে পড়ে,

উলম্ব কাঠামো দাঁড়িয়ে থাকে
প্রেতের পাঁজর-হাড়,
কড়িবরগায়


জনহীন প্রান্তর জুড়ে

Translation: Sambuddha Ghosh

                                                    



সম্বুদ্ধ ঘোষ
Sambuddha Ghosh