Anindita Gupta Roy

নাথিং এল্‌স ম্যাটার্‌স্‌

ছোট্ট, নিটোল গোল আর সাদা। একদম ধব্‌ধবে বরফের মত সাদা, যাকে বলে স্নো-হোয়াইট। কিন্তু বরফের শীতলতা যে নেই সেটা দৃশ্যমান। পাশাপাশি আরো আরো সাদা খণ্ডগুলো--- কিছু ঝিনুকের মত উজ্বল আলো ঠিকরোনো। কিছু ঘন দুধের মত অফ্‌ হোয়াইট---মসৃণ। কোনোটা অ্যান্টিক সফেদ প্রাচীনত্বে মশগুল। কেউ ডিমের খোলার ভঙ্গুরতায় ফ্যাটফেটে, কেউ ভ্যানিলার লালিত্যে টইটই হালকা হলদেটে। অথচ সাদার ওপর সাদার বিছিয়ে থাকায় সবাই আলাদা করে স্পষ্ট, ঋজু। নুড়িরা যেরকম হয়। অবতল, উত্তল, আড়াআড়ি, লম্বালম্বি, কোনাচে, উবু, হামাগুড়ি, টানটান, চ্যাপ্টা, চৌকো, নিটোল, থ্যাবড়ানো, আয়ত----অবস্থান ও গঠনে মানুষের মুখচ্ছবির মতই বিবিধ ও ইন্টারেস্টিং। তাই থমকে গেল পায়ের পাতা। শূন্য থেকে হাওয়ার চশমায় সে দেখতে লাগল এই বিস্তারিত সাদা। দেখতে লাগল এই সাদা আসলে শুধু সাদা নয়, এর আনাচে কানাচে অজস্র বাদামিরা। মরচেরঙা, সিপিয়া মিশেল দেওয়া, তামাকপাতার উগ্রতায়, তামার টুকরোর গোলাপি আভা মেশানোয়, শালিকের ডানার ছটফটে উড়ানের ইঙ্গিত মাখানো হরেক বাদামি। গড়িয়ে যাওয়া, গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে আসা, আলুলায়িত, হেলান দেওয়া, আধভাঙ্গা, নুয়ে পড়া, ওলটানো, কোঁকড়া----এইসব নানান বাদামিরা আসলে উড়ে আসা অবিশ্রান্ত পত্‌ঝর, এই বসন্তের। সালোকসংশ্লেষ ফুরোনো, বাতিল, বিষণ্ণ এই ছড়ানো অক্ষরমালার শরীর ফুঁড়ে অগনন পোকা ও পতঙ্গ চলাচল। অথচ পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি উচ্চতা থেকে হঠাৎ তাকানোর দৃষ্টি বিভ্রমে শুধুই সাদা। সমস্ত শরীরে সাদা মাখতে মাখতে, রেণু রেণু---যেভাবে গন্ধরাজের দলমন্ডল মাড়িয়ে পতঙ্গ প্রবেশ করে গর্ভকেশরে, ওই পথ ঘুরে ঘুরে বেঁকেচুরে প্রজাপতি উদ্যানকে ডানপাশে রেখে চা বাগান পেরিয়ে শেষ হলো এক অদ্ভুত ঢালু জমিতে। ছোট ছোট কুঁড়েঘরের মত নির্মাণ, মাঝে মাঝে শিবলিঙ্গাকৃতি পাথরের টুকরো। স্তব্ধ দাঁড়িয়ে থাকা খান্‌খান করে দূর থেকে গলার আওয়াজ ভেসে আসে----উও  কবরখানা বিবিজি, মৎ যাও। কারা শুয়ে আছো এখানে? ---আমাকে বাড়ি নিয়ে চল্‌---এই বলে সন্তানের হাত আঁকড়ে ধরা অসহায় পিতা কি আছো, যাকে আমারই মত কোন অপদার্থ কথা দিয়ে আর ফিরিয়ে আনতে পারেনি হাসপাতালের সাদা বিছানা থেকে? দ্রুত পায়ে পালাতে পালাতে এইবার নুড়ি ঢালা সাদা পথের এবড়োখেবড়ো হঠাৎ এক অন্তহীন সাদা বরফের চাদর! এক্ষুনি বেলচা গাঁইতি হাতে গ্রেভ্‌ডিগারের দল ছুটে আসবে হা রে রে রে।  খুঁড়ে তুলবে শুকিয়ে আসা রক্তের দাগ, মাথার খুলি আর হাস্যমুখ নরমুণ্ড। পাথরচাপা ঝরনার জলের শব্দ। যার তীরে চাঁদ ধোওয়া আলোয় একদিন তুমি দেখেছিল নিজের তৃষ্ণার্ত অবয়ব কোন বসন্তোৎসবের রাতে গেয়ে উঠেছিলে---ও মেরি চন্দ্রমা---তেরি চাঁদ্‌নি অঙ্গ জ্বালায়ে!! ওই নুড়ি- শরীর পার হতে শুকনো পাতার যে ঝর্‌ঝর শব্দ তা কি ওই জলেরই? অনেক  বছরের জমাট কান্নার শব্দ নয়ত? যে কান্নাগুলো জমতে জমতে এই নুড়িপাথরের মতই আকৃতি নেয়---আর যাকে পায়ে মাড়িয়ে অনায়াস চলে  যাওয়া গন্তব্যে—বা নিরুদ্দেশে! চা-বাগানের উত্তল সবুজ ছুঁয়ে ছুঁয়ে দৌড়। আড়ালে আড়ালে চিতাবাঘের শাবক অথবা ময়ালের ডিম শুয়ে আছে অগোচরে, হয়ত বা। বুনো একটা গন্ধ সোজা মাথা অবধি ধাক্কা মারছে। কয়েকটা ক্ষুদে পতংগ কেবল চোখের পাতায় এসে বসতে চায়। কালো কালো বিন্দুবৎ। এদের বিষে নাকি অন্ধকার নেমে আসে দুচোখের উঠোনে। মৃত্যুফাঁদ, অন্ধকার আর আলো পেরিয়ে এই ছুটে চলা বুঝি ফুরোবার নয়। আর হঠাৎ কুড়িয়ে পাওয়া ছিন্ন মন্দার, একআধটা রুদ্রপলাশ বা কৃষ্ণচূড়া পাপড়ি। লাল, আতপ্ত, উষ্ণ---- বুকের মাঝখানে জমে জমে অবিশ্রান্ত ঘামে আর প্রেমে মাখামাখি করতে থাকে---গলে গলে যেতে থাকে। মুখোমুখি  গাছদেহ, কাঙাল, নীলাভ---আকাশের দিকে মুখ তুলে মেলে রেখেছে হাতের পাতা। প্রার্থনার ভঙ্গীমায় নিরাবরণ, নিস্পত্র। কোথাও হাহাকারের শব্দ হচ্ছে---লিখে রাখছে তাকে কেউ, টুকে নিচ্ছে। না-লেখা চিঠির অনুষঙ্গে খুঁজে পাচ্ছে অনাবশ্যক স্পর্শলিপি। কৈফিয়তহীন পুড়ে যাওয়া ঘনিয়ে উঠেছে কেমন ঘোর লেগে যাওয়া সবুজ ইঙ্গিতে। স্তব্ধ চুম্বনের পাশ থেকে ফিরে আসা হাওয়া অপেক্ষা ফিরিয়ে নিয়ে চলে গেল ওই। ময়ূরের লাস্য কেন এমন ললিতে ফোটে সল্টপিটের বন্য পৌরুষে কে জানে! বাঁশির ভেতর উপুড় করে দেওয়া নিঃশ্বাস গাঢ় হয়ে শব্দভেদী। লক্ষ্য খুঁজে ছুটে যাচ্ছে জ্যা-মুক্ত সরগম। মাইগ্রেন বেজে উঠছে খুলিগুহায়...আর ধূসরের কাছাকাছি  একেকটা চুপ হয়ে থাকা। গাছেদের—-----এমন দীর্ঘতার, ঋজু, দৃঢ় পুরুষ প্রকৃতির কতটা বসন্ত আর কতটা মাধবী---মেপে নিতে প্রবেশাধিকার এই শালবনে। পতঙ্গের উরু বেয়ে মধুমাস---ভাটফুলে সাদার গভীরে একবিন্দু লালের আভাসে মাংসল হয়ে আছে। নদী পিছু ছাড়েনা কিছুতে। সেমিকোলনের মাথায় একফোঁটা শান্ত অপেক্ষার মত থেমে থাকি। নদীতে নামছি না আমি লবণপুতুল কেবল ছেঁকে তুলছি, আলাদা করছি---সাদা আর বাদামি, বাদামি আর সাদা। ধূসরে দাঁড়িয়ে আছি। না-লেখা গল্পগুলো শুরু করা যাক্‌-











   অনিন্দিতা গুপ্ত রায়

Anindita Gupta Roy