Doyelpakhi Dasgupta


দ্রিম দ্রিম

একসাথে কলেজে পড়ি আমরা। ­কী পড়ি জানি না। বয়স এক রকমই আছে। কমেনি। একটা ক্লাসে সবাইকে ফাইল করে দাঁড়াতে বলা হয়েছে। রোজ এরমই বলা হয়। পরপর দাঁড়িয়ে সবাই। আমি ভীষণ হাসি-ঠাট্টা করছি, ডালিয়া আর অমৃতার সঙ্গে। হাসতে হাসতে খেয়াল থাকছে না স্যার দেখছেন কিনা। স্যার বয়স্ক মানুষ। ধুতি আর শার্ট পরে ক্লান্ত চেহারায় বসে আছেন চেয়ারে। নানা গুঞ্জন চলছে। ওঁর শরীর হয়তো ভাল নেই। হার্টের সমস্যা থাকতে পারে কিছু। চারতলার ওপরে ক্লাস। এতোটা সিঁড়ি ভেঙে টিচার্স রুম থেকে আসতে নিশ্চই কষ্ট হয়েছে। আমাকে ডাকলেন। বললেন,‘এখানে কান ধরে দাঁড়াও’। আমি একটা আঙুল তুলে ‘একটুসখানি’ জাতীয় একটা মুদ্রা করে কাঁচুমাচু মুখে বললাম, ‘স্যার একটা সুযোগ পাওয়া যাবে?’ বললাম, যথাসম্ভব নিচু আওয়াজ করে, যাতে ক্যালরম্যালর পেরিয়ে কেউ শুনতে না পায়। উনি বললেন, ‘সুযোগ কী  পাওয়া যায়?’ আমি বললাম, ‘দশ বছর পর আমার বন্ধু অমৃতা এসছে! একসাথে ক্লাস করছি আমরা। তাই একটু ক্যারেড অ্যাওয়ে হয়ে গেছিলাম’। শুনে বললেন, ‘কী শিখলে তাহলে?’ বুঝলাম একটু আগে যে সিনেমার ক্লিপটা দেখানো হয়েছিল, সেটার কথা বলছেন। আমি ভাবলাম, ওটায় তো দেখছিলাম, গোটা সিনেমার শেষে ভিক্টর ব্যানার্জী বন্ধুদের থেকে মন সরিয়ে বলে, ‘আসলে ওই ওখানে... ওই সেখানে... উঁচু উঁচু মেঘেরা...’ অর্থাৎ মনকে রাখতে হবে তুচ্ছ মানুষিক জগতের উর্ধ্বে! আমি ভাবলাম, এটা কী আত্মপ্রকাশ? তারপর মনে পড়ল, ও না না। এটাই তো “সীমাবদ্ধ”! এবং ভাবলাম সিনেমার নামটা তাহলে এই কারণেই রাখা হয়েছে? “কোং লিমিটেড” আসলে মানসিক সীমার দৈন্য? এবং দেখলাম স্যার আমায় ছেড়েও দিলেন... বা র‍্যাদার আমার দিকে আর মন থাকল না ওঁর। ততোক্ষণে ক্লাস শেষ হয়ে গেছে। আমার মন খারাপ হয়ে গেল। আমি ওয়াশরুমে গেলাম। বাকি ক্লাস ততোক্ষণে বেরিয়ে অন্য বিল্ডিঙে চলে গেছে। বসে আছ ফাঁকা ক্লাসে শুধু তুমি। ছাইরঙা টিশার্ট আর না কামানো দাড়ি নিয়ে। একলা। আমি ফ্রেশ হতে গেছি, কারণ জামাটাও পাল্টাতে হবে। বাড়ির জামা পরেই চলে এসেছি ক্লাসে বুঝিইনি সেকথা! একটা আধ-ভাঙ্গা মতো বাথরুম। অনেকগুলো পার্টিশন। একটার সামনে একটা কুমীরের ফসিল জাতীয় কী পড়ে আছে! সেটা কাঠের কোনও ভাস্কর্য নাকি সত্যিই ফসিল বুঝতে পারছি না। একটা টয়লেটে ঢুকে পড়ে তারের ওপর একে একে জামাগুলো মেলতে থাকি। এক এক করে পরতে থাকি। এবং এটা খুব মন দিয়ে করি। কারণ বুঝেছি যে এই কাজগুলো করতে বেশ বেগ পেতে হচ্ছে। কোনও বোতাম আটকাতে পারছি না। জামা পরে বাইরে এসে দেখি একটা আধো অন্ধকার মতো ভাঙাচোরা ঘরে, পর্দা টানা, খাট পাতা। সেখানে খাটের ওপর আমার ব্যাগ রাখা। মোবাইলও। আমার মন ভার হয়ে আছে। আমি জড়ো করে নিচ্ছি নিজেকে একে একে। উঁকি দিয়ে বাইরে দেখছি, আর একটা ছোট ঘড়িয়ালের মতো কুমীর। কখন চুপিসাড়ে এসছে। বুঝতে পারছি, কোনও একটা ওপেনিং দিয়ে গঙ্গার সঙ্গে কানেক্টেড এই কলেজ বিল্ডিংটা। যেখান থেকে বুঝতে না পেরে এরা এভাবে চলে আসে। আর তারপর এই পরিত্যক্ত, স্যাঁতসেতে, অন্ধকার, শ্যাওলা ধরা বাথরুমের কাছে পড়ে থেকে থেকে, খাবার না পেয়ে, গরমের বা পুজোর ছুটির ভ্যাকেশনে আন-নোটিস্‌ড থেকে এক সময়ে মরে ফসিল হয়ে যায়।
বাইরে থেকে একটা আওয়াজ আসছে। একটা মৃদু চাপড়। অরুণাভ ডাকছে আমাকে। ও-ও ক্লাসে যায়নি তার মানে এতোক্ষণ। আমি দেখছি আমার মোবাইলেও ওর মিস্‌ড কল। ছবি সমেত জেগে আছে। মোবাইলটা নিশ্চুপ ছিল। আমি বাইরে বেরোই। ও বলে, এই ক্লাসটা আর করবে না। রেস্ট-রুমে যাচ্ছে। আমি বেরিয়ে এসে দেখি তুমি তখনও বসে। আমি জানি তুমি আমার জন্যেই বসে আছ এতোক্ষণ। কিন্তু বুঝতে পারি, তোমাকে ডাকা যাবে না। তোমার ওই দেহভঙ্গিমাটিই বলে দিচ্ছে সে-কথা। পরের ক্লাসটা এন্টোমলজির। আমি বারান্দা পেরিয়ে যেতে যেতে দেখি, গোটা ক্লাস উপচে পড়েছে। তুমি ক্লাসে ঢুকে গেছ। কাউকেই চেন না প্রায়। কিন্তু আজ একদম মরিয়া। ক্লাস করবেই। কোথাও বসবে না কারওর সাথে। তাকাবে না কারওর দিকে। বারান্দাতেও চেয়ার পেতে চার্ট হাতে বসে আছে ছেলেমেয়েরা। আমি পাশ দিয়ে যেতে যেতে দেখি, একটি মেয়ে পেনসিল দিয়ে দাগ দিচ্ছে একটা পোকার থোরাসিক একটা লোবে। সেটাকে নাকি অ্যামানাটা বলে। স্যার এগিয়ে আসছেন তার সাথে কথা বলবেন বলে। সে সম্ভবত এই অ্যামানাটা নিয়ে শরদিন্দুর কোনও একটা গল্পের রেফারেন্স দিয়েছিল, যেটা স্যার বুঝতে পারেননি। এবং সেটাই তিনি ঈষৎ লজ্জার সাথে বলছেন, যে, তাঁর তো সাহিত্য তেমন পড়া নেই। আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে নিই তোমাকে একবার চকিতে। দেখি তুমি আমারই দিকে ফিরে আমার চোখের দিকে না তাকিয়ে কী একটা স্লাইড দেখছ... সম্ভবত অ্যামানাটার কোনও একটা হিস্টলজিকাল স্লাইড। আমি বুঝি, তোমার সঙ্গে চোখাচোখি হওয়ার নয়। দ্রুত করিডোর পেরিয়ে যাই।





কচুরিপানা আর সবুজ জেলি

কচুরিপানা

দমদম পার্কের দিক থেকে যশোর রোড যাচ্ছি। ভি আই পি রোড ধরে। বাসে করে। বাসে কয়েকটা অল্পবয়েসি মেয়ে ঝগড়াঝাঁটি করছে। আমি একটা পাবলিক ফোন বুথ থেকে বেরিয়ে আবিষ্কার করেছি যে পার্স ফেলে এসেছি। কিছু খুচরো টাকাপয়সা ছিল, তাই নিয়ে বাসে উঠেছি।

বাসটা বেশিরভাগটাই ফাঁকা। কাচের। খুব আলো-আলো হয়ে আছে ভেতরটা। অথচ সাধারণ পাবলিক বাস, যেটাকে আমি এমনিতে হতচ্ছেদা করে টিনের বাস বলি। রাস্তার দুপাশটা কী সবুজ! আর হলদে-সবুজ ঘাস। রোদে শুকিয়ে যাচ্ছে। আমি কেষ্টপুরে নেমে গেছি। নেমে মনে পড়ে গেল কার বাড়ি খুঁজছি বুঝতে পেরে মেয়েগুলো ঠোঁটের কোণে কীরম ফাজিল হাসি ঝুলিয়ে রেখেছিল। আমারও কেমন একটু লজ্জা লজ্জা ভাব। কান লাল। টের পাচ্ছি।

স্টপ থেকে নেমে একটা রিক্সা নিলাম। রিক্সাটা অদ্ভুত। বসার পর মনে হল একটা টাঙ্গার মতো, পেছনেও আর একটা সিট। কেউ একজন বসে আছে। হঠাৎ রিক্সাওয়ালা প্যাডেল ঘোরাতেই আমার সিটটা সরসর করে উঁচু হতে লাগল। উঁচু হয় তো হয়ই। হতে হতে চারতলা বাড়ির ছাদ অবধি উঁচু হয়ে গেল। নীচে তাকিয়ে বেশ ইনসিকিওরড লাগছে। সবশুদ্ধ পড়ে না যাই। দেখলাম পেছনের সিটটা নিচুই আছে। একজন লোক সেখানে উবু হয়ে বসে। চানাচুর আর উনুনের ডিবা নিয়ে। ঘটিগরম। রিক্সাটা ভীষণ জোরে চলছে। পাশের বাড়িগুলো শনশন করে চলে যাচ্ছে। তার মধ্যে দিয়েই দেখতে পাচ্ছিকেউ ছাদে আচার শুকাতে দিচ্ছে। একটা কাক একটা বড়ি মুখে নিয়ে পালাল।

বাড়িগুলোর ফাঁকফোকর দিয়ে বাসটা দেখা যাচ্ছে। ওই যে মেয়েগুলো। জানালার ধারে বসে। এমন সময় প্যাডেল থেমে গেল। সামনে একটা ডোবা। তাতে লাল রঙের কচুরিপানা। সেটা পেরিয়ে একসারি বাড়ি। তারপর আরও একটা ডোবা। তাতে গাঢ় বেগুনি কচুরিপানা। তারপর আরও একসারি বাড়ি। বুঝতে পারছি আরও একটা ডোবা আসবে। কি রঙের কচুরিপানা তাতে?

আচ্ছা আমার কি ভার্টিগো আছে?


সবুজ জেলি

এটা হোটেল না কোয়ার্টার বোঝা দায়! লম্বা লম্বা করিডোর, আধো-অন্ধকার। আমার কাজিন বিন্তিদের ফ্ল্যাটটা ওদিকটায়।একই ফ্লোরে খানিকটা এপাশে ওর বয়ফ্রেন্ড জয়ের বাড়ি। জয়ের কথা শুনে যেমন মনে হয়েছিল, ছেলেটা তেমন নয়। ভেবেছিলাম লম্বা চওড়া, মাজা গায়ের রঙ, ঈষৎ কোঁচকানো চুল, চৌকো মুখ। তার বদলে দেখলাম পাতলা চেহারা, বেশি লম্বা না- এই পাঁচ আট হবে... টুপি পরে একটা ছেলে। ঝুঁকে পড়ে মন দিয়ে কি একটা করছে। জিজ্ঞেস করলাম, “কি কর?” বলল, “অ্যারাবিক লিটারেচার নিয়ে অনার্স করছি”। বুঝলাম বিন্তিটা মিথ্যে করে বলেছিল ইঞ্জিনিয়ারিং। বড় একটা জানালা দিয়ে আমি বাইরে গেলাম। জানালাটায় কোনও গ্রিল ছিল না। দুটো বিল্ডিং-এর মাঝে একটা সিমেন্টের বিম। তার ওপর দিয়ে হেঁটে যে ফ্ল্যাটে এলাম, সেখানে আমি প্রায়ই আসি। বাসিন্দা মেয়েটি চাইনিজ। নাকি কোরিয়ান! আমার অনুবাদের কাজটা ওকে জমা দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ওকে কেউ আটকে রেখেছে। সারারাত কেঁদেছে মেয়েটা।

আমি জানালা দিয়ে নিচে নেমে গেলাম। বাড়ির দেওয়াল বেয়ে। দোতলার ছাদে কীসব চাষ হয়েছে। সবুজ জেলির মতো ছাদ জুড়ে। তার ওপর গোড়ালি ডোবা জল জমে আছে। লাফিয়ে তার ওপর নামতেই পায়ের নিচ থেকে সবুজ জেলিগুলো থলথল করে সরে গিয়ে ইট বেরিয়ে গেল। কমলা-সবুজ ইট। খুব রোদ। নিচে রাস্তা থেকে লোকে অবাক হয়ে দেখছে আমি দেওয়ালে আটকে আছি।

দোয়েলপাখি দাশগুপ্ত
Doyelpakhi Dasgupta