Jyotirmoy Shishu

Jyotirmoy Shishu

Jyotirmoy Biswas


পিপলিকে চিঠি লিখতে গিয়ে

১|
আজকাল মন ভালো রাখার তরিকা পেয়েছি।
গাছ লাগাই, জল দি, রোজ দুবেলা নজর রাখি। আগে যে জায়গায় রুদ্রাক্ষ গাছটি ছিলো, এখন যেখানে বেলা কিছু বাড়তেই এই বর্ষা তার হেমলা আলো বিছিয়ে দেয়, সেখানে রিনাদির বাড়ি থেকে এনে গোলাপের ডাল পুঁতেছি। পিপলি, রুদ্রাক্ষ আর গোলাপের অনেক ফারাক বলো। তা হোক, মানুষে মানুষে ফারাক যা বেড়ে চলছে তাতে পাতা লতা ফুল এমনকি কাঁটার পার্থক্যও তেমন কিছু নয়।




২|
তোমাকে চিঠি লিখতে গিয়ে
পৃষ্ঠার কাছে দুবার পরাস্ত হয়েছি আজ। সে না জানি কেন, শূন্য থাকতে চাইলো।
আজ সকাল থেকে বৃষ্টি...

যাক। বৃষ্টিবাদলের ভিতর শব্দেরা এমনিতেও চুপসেই যেত।




৩|
আমার জানলার পাশে নিরীহ অন্ধকার থাকে। নিরীহ। বয়স বেড়ে গেছে, আগের সে শার্প, মারমুখি চেহারাটা নেই। আজ থেকে বছর দশেক আগেও যখন পাটকাঠির মশাল জ্বেলে যোগেন্দ্র মাস্টার বাড়ি ফিরতেন, বড়ঘরের বেড়ার সেই খুদে ফাঁকটা দিয়ে দেখতাম  অন্ধকার জোনাকির আলোয় কেমন মিঠিয়ে উঠেছে 

বেলগাছের তলায়, হলুদ ক্ষেতের ঝোপে, গন্ধরাজ লেবুগাছটায়...

সন্ধ্যার পর খোলা উঠোনে পাতা চাটাইতে বসে কবে দেখেছি সেসব।

এখন চূড়ামণি সরকারের দীঘির পারে পা ছড়িয়ে বসে ঘুমচোখে তাকিয়ে থাকে আর দূরান্তে কতো বিরূপ অন্ধকারে মানুষ খুন হয়ে যায়, পিপলি।




৪|
জীবনে একবার ভয়ানক বন্যা দেখেছি। তিনদিন টানা বৃষ্টি। আমাদের ডোবা, সেই সরকারদের পুকুর সব ডুবলো। ভাবলাম থামবে, থামলোনা। গিলাণ্ডি নদী ভরলো, তারপর ডুডুয়াও। ফসল গেল, নিচু জমির বাড়ি গেল, মানুষ ভেসে ভেসে গেল।

কতো ছোট ছোট ক্ষত এলো,
বড় ক্ষত আসছে। ধীরে ধীরে গোলাঘরে ক্ষয় জন্ম নেবে, নরম অনিভবগুলি যাবে পিপলি, তুচ্ছ ভেসে চলে যাবো...




৫|
একটা কৃষ্ণচূড়া গাছও লাগিয়েছি। সাহা নার্সারি থেকে। বাবা বললো ভালো চারা বাছিনি। হয়তো বাঁচবেনা।
অতএব পাতা মেলছে আর
আমি হিসেব রাখছি,
রোজ সকালে একটা শিশু গাছ দেখলে সারাদিন ভালো যাবে এমন একটা বিশ্বাস জন্মেছে। দেখতে পাচ্ছি লাল ফুল তোমার প্রিয় পতাকার মতো উড়ছে, পাপড়িতে পাপড়িতে খোদাই হয়ে যাচ্ছে আমাদের প্রেম...

পিপলি, রিনাদির বাড়ি কিংবা সাহা নার্সারি থেকে আজ অবদি যে'কজন গাছ নিয়েছে সবারটা কি শেষ পর্যন্ত বেঁচে আছে?



একে একে যা যা হারিয়ে...

সেলাই এর দাগ
একটা রেললাইন ভাবো। ভাবো দীর্ঘ, ভাবো সমস্ত, ভাবো সন্ধ্যাগুলো নেই, ভাবো জড়িয়ে ধরা ভাবো সুখ ভাবো প্রস্তাব ভাবো সত্যি ভাবো মিথ্যে ভাবো ভুল জল জ্যোতির্ময়...
এবার শোনো,কেন রেললাইন টা ভেবেছিলে-

যে মহাপ্রেম আমরা করেছি এতকাল
যে নিরুপম মহাক্ষত বুকে বুকে করেছি সৃজন
পৃথিবীর সমস্ত রেললাইন যেন আমাদের সেই
মহাছিন্ন প্রেমের ওপর সেলাইএর দাগের মতন।



আনন্দের মানুষ

[যে আনিল প্রেমধন করুনা প্রচুর
হেন প্রভূ কোথা গেলা আচার্য্য ঠাকুর]

কি যে অনর্থ নিয়ে আছি আজকাল
খালপাড়া ফুটব্রিজ পার করে গেছি হুশ নেই
মাথায় আসে দূর থেকে গান ভেসে
দু’ধারে সতেজ কচুর বন, ময়লা ডোবায়
জাঁক দেয়া পাটের গন্ধ আসে
এদিক থেকে
ওদিক থেকে
আর কিছু কিছু দিক ফাঁকা পড়ে থাকে
কিছু আসেনা।

আমি একজন আনন্দের মানুষ হারিয়ে ফেলেছি।
আমি একলাজন, আনন্দের মানুষ হারিয়ে ফেলেছি।



কিছুনা। কষ্ট না।

কিছু কিছু ব্যাথা আছে, হয়না। কেবল
আমার মতো প্রেমিকের নীল জামায় আলতো হয়ে লেগে থাকে ধুলোর মতো।
আছড়ে কেঁচে দিলে কলতলায় কান্না হয়ে
ঝরে, তারপর ঢালু হয়ে চিকন ফাঁক দিয়ে
চলে যায়…

আমি কিছু রাখতে পারিনা, কিছুটি না।কষ্টও না।



হৃদয়শিল্প

আধসামুদ্রিক হাসির কিছু অংশ বাঁচিয়ে রেখো
আর তার পাশে
পুরাতন প্রেমের প্রতি মুগ্ধ ঘৃণায় সযত্নে লালিত একটামাত্র তিল, এই পৃথিবীতে যা কেবল ডান গালে মানায়…



প্রেম

মাঝে মাঝে মনে হয়, শুধু গাছেদের সাথে
সম্পর্ক করতে পারলে বেশ হ’তো
যে কোনো অভিমানে তারা কেবল ঝরিয়ে
দেবে পাতা
যেকোনো বর্ষার রাতে
যুদ্ধবাজ কোনো বৃষ্টির ফোঁটায় বিদ্ধ ফুলের সমান তাদের ব্যাথা হয়ে উঠবে আমারই চোখের কোণে জল...


অথচ তারা নীরব, সকল হাওয়ায় সচল।










জ্যোতির্ময় বিশ্বাস

Jyotirmoy Biswas