Debadrita Bose

না পৃথিবীর দূরত্ব

একটা ড্রিমের ভেতরবসে আছি লুকিয়ে। এরপর সকাল হবে। সময়কনার চলাচলকে কেন্দ্র ক’রে ক্যাপ্টেন হুকের জাহাজ সামান্য দুলতেই শোনা যাচ্ছে ব্যাপারীদের বিভিন্ন আওয়াজের দুর্যোগ কাঠের পাটাতনটা ফুরোলেই বাজার একটা। কাঠের দরজার তলায় যতটুকু ফাঁক, তার আন্দাজে শরীরটা বড়। ওই ফাঁকটুকুই আপাতত সম্বল - গন্তব্য, পরিত্রাণ এবং কোলাহলমুখর। কোথাও একটা নিষিদ্ধ ঘড়ি টিক টিক করছে আর আমি ভাবছি কি ক’রে লুকিয়ে থাকা যায় আরও কিছুক্ষণ। কেউ যেন দেখতে না পায় আমাকে। অথচ এরকমভাবে ভোর হতো এক একটা স্বপ্নের খোঁজে। মূলত শীতকাল - লেপের তলাটা সুবিধা মত সাজিয়ে নিতাম। এমনভাবে একটা সিমুলেশান, যেন বাইরের পৃথিবীর সাথে যোগসূত্রগুলো বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। রান্নাঘর থেকে আসা বাসন ও জলের বিনিময়ে যে আওয়াজ - মনে হতো পাইরেটদের হর্ন আর হর্নবিলের ডানার ঝটপট। অনেকটা এপার জুড়ে এই ল্যান্ডমাস। প্যানের সাম্রাজ্যে কেউ বড় হয় না কখনো, একমাত্র টিঙ্কার বেল ছাড়া। এত রঙ আর এত গন্ধ, পথ হারানোর ম্যাজিকটাই কবিতা হয়ে ওঠে। ওই যে বেসামাল একটা বৃহৎ ডিনার টেবিল, ভরে উঠছে কাল্পনিক খাবারে আর তার পাশেই একটা পৃথিবী, যার সমস্ত হ্রদ এবার আয়না হবে। পৃথিবীর প্রথম আয়নগুলোর জন্ম এখানে। ঘড়ির কাঁটাগুলো ঘুরতেই থাকে, টান পড়ে ঋতুচক্রে, শুধু বয়স বাড়ে না। অন্ধকার হলে টিঙ্কার বেল ডাকে, “lost boys, lost boys, dinner is served”
প্রকাণ্ড ওই সিমুলেশানের ভেতর থাকতে অভ্যস্ত হয়ে তখন মনে হত এক দস্তানার কথা। ক্রমশ বড় হয়ে উঠছে তার গহ্বর এবং বাড়ছে সংসারের সদস্য। আমি ভাবতাম যদি ওদের মত ওদের সাথে থাকা যায়। আর আমার শীতের লেপ, কম্বল, বালিশ মিশে যেত ওই প্ররোচনায়। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পরলেই টর্চ জ্বেলে দেখতাম কেউ কোথাও আছে কিনা। বরং টর্চটা নিভিয়ে দিলেই দেখা যেত ওদের বেড়ে ওঠা, সংসার, ওদের ড্রামা - কমেডি, ট্র্যাজেডি। ব্ল্যাক হোলের ইভেন্ট হরাইজনের মত সহজ ও অদৃশ্য। তখন ভাবতাম সকাল হবে। অহেতুক আর যেতে হবে না স্কুলে। ঘুম চোখে লেপটা সরালেই দেখা যাবে ওই বাগান, অতিকায় জলাশয় আর ছোট ছোট র‍্যাবিট হোল। একটা এমন জায়গার কথা লেখা হবে যেখানে প্রতিদিন শহর এসে মিশে যেতে থাকে সমুদ্রের ধারে লুকিয়ে রাখা ঝর্ণার জলে। মানুষ তো এভাবেই অমরত্বের কথা শিখেছে, তার ধান, গম, আস্তাবল, হাতি, ঘোড়া, ফসল ফেলে রেখে বারবার ফিরে গেছে অরন্যে ।
জরায়ুর ভেতর নড়াচড়া করছে শব্দরা। বিটস এবং পিসেস সমেত পৃথিবীর সমস্ত শব্দ,  কোল মাইন, পরিত্যক্ত জাহাজ ঘাট, নোনা হাওয়ার গন্ধ, ঈষৎ আর্দ্র অনর্গল বেড়িয়ে পড়ছে ফ্যালোপিয়ান টিউব বেয়ে। এদের ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকাগুলো নিয়ে সভ্যতা হবে। শুধু নির্মাণ নয়, সারি দিয়ে অগুনতি পিরামিড হয়ে উঠবে এলিয়েন স্পেসশিপের ল্যান্ডিং প্যাড। কখন সময়কে ফাঁকি দিয়ে লেখা হবে ইতিহাস। এইভাবেই সময়কে ফাঁকি দেওয়ার নিয়মে ফিরে যাওয়াগুলো থেকে যায়। রিডিং ল্যাম্প থেকে মাথা তুললেই দেখা যেত অসংখ্য ভাষার কাটাকুটি খেলা। জানলার বাইরে আরও একটা রেইনি ডে বদলে দিচ্ছে লিখে রাখা ইতিহাস আর ইতিমধ্যে সমস্ত ঘড়ি কখন যেন সব আমার হয়ে গেছে।


চাঁদের হাফ
পড়ে থাকছে আর ফোঁটা ফোঁটা ঘুম নামে জড়িয়ে
উম্বের পিছলে থেমে প্রাচ্যের নৌযান

রেইনি ডের জন্ম থেকে তুলে আনো
যতি চিহ্ন
আর দোলনাটা দুলতেই থাকুক একটা ঘুমের উদ্যোগে।


হঠাৎ ঠাণ্ডা হাওয়ায় বোঝা যাচ্ছে কোথাও ঝড় উঠেছে খুব। বরফ উড়ছে গুঁড়ো গুঁড়ো। জোনাস! জোনাস, তুমি তো জানতে এই ঝড়ের পূর্বাভাস। এর মধ্যেই উষ্ণ গন্ধ পাওয়া যায়, কিঞ্চিৎ আলো। প্রায় শ্বাসরোধী তার সৌন্দর্য। গোটারাত দাঁড় টেনে  ক্লান্ত জোনাস দেখতে পায় একটা ক্যাসেল। গথিক ক্রুসিফরম। তারপর মাঠ। ছোটবেলায় ওই মাঠকেই অন্তহীন মনে হত আমাদের। সুরকির দেওয়াল থেকে আর একটু পেছনে মাথা হেলিয়ে কড়িকাঠ। দরজায় ওপর সারাদিন অবিরাম ডেকে যাচ্ছে পায়রাগুলো। এক একটা করিডোর দিয়ে হেঁটে যেতে গিয়ে প্রত্যেকটা বাঁকেই চমক এবং গোপনতা। দেওয়ালের গা দিয়ে একটা স্পাইরাল সিঁড়ি, প্রত্যেকটা বাঁক শেষ ক’রে নিচে তাকালে পৃথিবীটা আরও কিছুটা অন্যরকম লাগত। সিঁড়িটার শেষে একটা লাইব্রেরী - যেমন সিনেমায় দেখা যায় - মিডিয়েভ্যাল, কোনও চার্চ বা নর্থ ইংল্যান্ডের এক টুকরো জীবনযাত্রা। এই ঘরেই প্রথম আলাপ ওদের সাথে। পুরনো হার্ড বাউন্ড বই, স্পাইনে হাত দিলে ঘাড়ের কাছে কেমন যৌন অনুভূতি হতে থাকে আর গন্ধ, এতই তীব্র, ন্যাপথালিনের গন্ধকেই বহুবছর বইয়ের গন্ধ ভেবে ভুল করতাম। তারপর এমিলিয়া জেন, থাম্বেলিনা, বেয়ার স্কিন, পিনোকিও। স্কুল ফেরত, বহু বহু চোখ এড়িয়ে একদিন ম্যাডক্স স্কোয়ারের মাঠে একটা চৌকোনা স্ট্রাকচার ছিল। খরগোশের মত মুখ লুকিয়ে জীবনে প্রথম চুমু খেতে গিয়ে মনে হচ্ছিল এই তো, প্রিন্স চার্মিং 
দেওয়ালের গায়ে অসংখ্য হাতের ছাপ। একটা মোড় ঘুরতেই বিশাল দরজার সামনে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে জোনাস। কোমরবন্ধ থেকে খুলে নেই চাবির গোছা। দরজাটা খুলে গেলে জোনাস দেখতে পাবে একটা পরিত্যক্ত বনাঞ্চল। হাতে ধরা বিশাল ভারী এবং বড় লোহার চাবিটা মাটিতে নামিয়ে রাখবে। এভাবেই দৃশ্য থেকে দৃশ্যান্তর। অনেক পরে বই পড়ে জানতে পারি condensation এবং displacement এর কথা। (Interpretation of Dreams, Sigmund Freud)। ওই ঘরটা এতটাই বড় অনায়াসে একটা ফুটবল ম্যাচ হতে পারে ওখানে। রাত হলে একে একে সবাই নেমে আসতে থাকে ওই তাক - আলমারি বেয়ে। ডুয়েলের আওয়াজ ছড়িয়ে পড়ে মাঠের ওপার পর্যন্ত, তারপরেই একটা ঘুমন্ত শহর চিরে চলে যাবে হলুদ কালো ট্যাক্সি, ২২১ বা ২৩৪ বাস। ছোট্ট একটা ফায়ার প্লেসের ধারে বসে অপেক্ষা করছে রাম্পেলস্তিলস্কিন। সকাল হওয়ার অপেক্ষা, কিন্তু সকাল হলেই গোটা ঘর ভোরে যাবে । ঘর ভরা শিশুদের কোলাহলে রাম্পেল খুঁজে বেড়াচ্ছে রানীর ছেলেকে এবং হতাশ হচ্ছে। চিৎকার করছে
'To-day I bake, to-morrow brew,
the next I'll have the young queen's child.
Ha, glad am I that no one knew
That Rumpelstiltskin I am styled.'
এই তো! এমন কঠিন এক নাম, কেউ আন্দাজ করতে পারেনা। আমাদের পরিচিত শব্দের নিয়ম থেকে বেড়িয়ে গিয়ে একা একা বেঁচে থাকে রাম্পেলস্টিলস্কিন। কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছে না, কেউ তার কথা শুনতে পাচ্ছে না। অনন্ত ফিসফিসের মধ্যে রাত হোলে সে আবার অপেক্ষা করবে আরও একটা সকালের। ওর মত আমিও অপেক্ষা ক’রে থাকতাম। চুল কাটা নিয়ে প্রতিবছর একই মনোমালিন্য। চার্চ টাওয়ারের একদম ওপরে একটা ঘর ছিল, আমার রাপুঞ্জেলের সাজঘর। চুলটা আর একটু বড় ক’রে ঝুলিয়ে দিলেই হল। নিমেষে সাদা ঘোড়া, ড্রাগনের মিথ সব সত্যি। সত্যিই তো। শুধু চাবিটা প্রয়োজন। ঘুমের মধ্যে ওপাশ অপাশ ক’রে তখন রোজ আদর করছি, আবদার করছি স্নো হোয়াইট, সিন্ডারেলাদের। আর ঘুম ভাঙলেই টের পাচ্ছি একে একে জেগে উঠছে শহর, বাটার দোকানে কাঁচের জুতোগুলো সব বিক্রি হয়ে গেছে, বলরুমে চূড়ান্ত ঘণ্টাটা বাজল ব’লে, এদিকে উচ্চতা বাড়ছে না ব’লে কিছুতেই হাত পাচ্ছিনা চাবির বাক্সটায়।

ঘুমন্ত ফিতের থেকে
খোলা রাজকন্যার শরীরমাংসের গায়ে সেই শীত

বাড়ি ভরে পুরনো পাতা
রেকর্ড ভেঙে যে টুইংকেল
তাদের স্টার নিয়ে অপেরা হাউস রোলকল
করছে সমস্ত তারকাদের ডাকনাম

গুঁড়ো মাংসের ওই রুপকথা
পর্দা ওড়ায় অদিম টিকিট চেকার।

উচ্চতা বাড়েনি। তাই পথ দেখানো হয়নি জোনাসকে। এমনকি রাপুনজেলের ব্লন্ড বা সিন্ডারেলার ব্রুনেট নিয়ে আমার এত আদর গোছাতে গোছাতে টের পাচ্ছি রাম্পেলের একাকীত্ব। শরীর থেকে এত আওয়াজ উঠে এলো, মাংসের বিনিময়ে, যেন সমস্ত নিয়মকে মকারি করতে করতে দেখতে পাচ্ছি টিকিট কাটা হয়নি বলে ট্রেন চলে যাচ্ছে আমাকে ছাড়া। Accretion disc এর মত চলমান অন্ধকার আমাদের ।
৩।
Wolfgang Amadeus Mozart কে নিয়ে Milos Forman এর সেই সিনেমাটা মনে পড়ছে কেন? ছবিটার একদম শেষ দৃশ্য অ্যাসাইলামে । সারাজীবন ঈশ্বর এবং মোজার্টের প্রতিদন্ধিতার শেষে আন্তনিও সালিয়েরির ডায়ালগ, “Mediocrity, I absolve you.”.

“রেললাইন থেকে উঠে আসা মানুষ
ছুঁলেই ট্রেন হয়ে ওঠা যায়।

দস্তানার
সংসারে একটা অসুখ হোল

সেলাই মেশিনের অন্যদিকে যে দুঃখ
তাতে বৃষ্টি পড়ছে”

Freudian displacement এর মজাটাই তো ওইখানে। তোমার চেনা, তোমার পরিধির সবকিছুই যখন তখন বদলে যেতে পারে, থাকে। প্রতিদিনের ওই স্কুল যাওয়ার বদলে একদিন চোখের সামনে একটা বীচ। লোকালরা ফুটবল খেলে এখানে। শীতল পাথরের চার্চগুলোর নিস্তব্ধতার বদলে চিৎকার। “গোওওওওওওওওওওওওল”। এ দেশে ধর্মের নাম ইগ্লেসিয়া মারাদোনিয়ানা। এত রঙ আর গন্ধের condensation। এই যে বীচ ধরে হেঁটে যাচ্ছি, হেঁটেই যাচ্ছি এত কবিতা মধ্যে। একটা জঙ্গল ছিল, লম্বা, মোটা মোটা গাছের ঝুড়িতে দোল খেত পাখীরা, আর শিষ দিত। আবার কত রঙ - পাতার, পালকের। আর এই যে সেই ছোটবেলার হাঁটা এখনো থামেনি এর মধ্যেকার সব গন্ধের মধ্যে তীব্র হয়ে উঠেছে রেইন ফরেস্টে প্রবল বৃষ্টির গন্ধরা। জঙ্গলের মধ্যেই কোথাও সূর্য ডুবছে। একটা কালো সাদা বল এসে ড্রপ খেয়ে স্থির হলো ক্লিয়ারিঙয়ে। বলটা হাতে নিয়ে মাথা তুলতেই দেখা যাবে একটা মেলা বসেছে। রঙিন মোরগের লড়াইতে হাজার হাজার পেসো উড়ছে আকাশে। গভীর নীল আলো থেকে উঠে আসা ইউজিন । ওর চোখে সভ্যতার আয়নায় লেগে থাকা স্লেজ গাড়ি। আরও অন্ধকার ভিড় করে এলে সাইক্লোন শহরের গায়ে ঘুম নেমে আসবে ক্রমশ।

সৈনিককে সমুদ্রে ভাসাতে গিয়ে থেমে গেলো যুদ্ধ
জাহাজের চাঁদ লটারি
খেলতে গেছে ভাঙ্গা মানচিত্রে।
ওদের এখন একটাই ভাষা
যেখানে আকাশ মানে ছুটির দিন
আর ছুটির কথা ভাবতেই থেমে যায় গোটা মহাদেশের ঘড়ির কাঁটা।

একটা ফুটবলের জীবন। প্রতিটা মুহূর্ত চূর্ণ হওয়ার আগেই পয়েন্টচ্যুত হওয়ার ভয়। যদি displacement গুলো একমুখী হতো তাহলে এই লেখাটা হয়ত লেখা হতো না কখনো। নেশা হোক বা ইন্সম্নিয়া, একটা আধা চেনা ঘরের জানলা দিয়ে খুব ভোর হচ্ছে। ওই পয়েন্টটাই রিয়েল, একমুখী ব’লে ভ্রম হয় সাময়িক। শব্দগুলো তো choice, অথবা ধরা যাক syntax,  ওই ভ্রমের মধ্যে শরীর বড় হয়ে ওঠে, ছুটির দিন লেগে থাকে গায়ে আর অনায়াস জাগ্লিং হয়, একইসাথে condensation এবং displacement এমন একটা জার্নি যেখানে শুরু আর শেষের বিন্দু মিলতে পারেনা ফুটবলের ওই অসামান্য পাসগুলোকাটিয়ে কাটিয়ে তুমি জোনাসনিয়ে যাচ্ছ গোলপোস্টের দিকে প্রতিমুহূর্তে বদলে যাচ্ছে বল ও গোলের মাঝের দূরত্ব দুটো পাসের মধ্যবর্তী যে অঞ্চল ওখানে তোমার টিঙ্কার বেল ঘুমিয়ে আছে অজস্র স্বপ্ন ও বাস্তবের দ্বন্দ্বে



দেবাদৃতা বসু

Debadrita Bose