Jyotirmoy Shishu

Jyotirmoy Shishu

Mainak Pal

প্রেম এসেছিল নিঃশব্দ চরণে

        নিসর্গে রাখা আছে জমদগ্নির হাড়। মানে, নিসর্গ বলতে যদি ওই জাহ্ণব্যোবলকোনা প্রাবৃটপ্রেয়স ছাদটিকেই বোঝায়। এহেন হ্যালোজেনময় আরবান ছাদে বসে বৈনতেয়র মাথায় এই পংক্তিটিই কেটে বসলো।
       আচ্ছা, মা যে বলে ছাদের সুরকির নীচে সত্যিই জমদগ্নির হাড় আছে। হতেও পারে। নাহলে অতটা উঠোন জুড়ে অ্যাপার্টমেন্টের তেরশো স্কোয়ার ফুট কেউ ছেড়ে দেয়, স্রেফ একশো কম দিয়েছে বলে; হেসেছিল অর্জুন মেরহোত্রা, সে জানতো এরা লড়বে না। বৈনতেয়র তখন ক্লাস ইলেভেন। বাবা লাইব্রেরি ঘরে ঢুকে গেল। না, সে তখনো জমদগ্নির হাড় খুঁজে পায় নি।
       আলসের পাড়ে ডেকচেয়ারে বসে বেমালুম হেসে উঠলো বিনু। গ্র্যাজুয়েশনের পরপরেই বোধের সাথে সাথে তার আর একটা অনূভুতি জন্মেছে – সারভ্যাইকাল স্পন্ডাইলোসিস। সেটাকে মাঝে মাঝে ডানা ওঠার ব্যথা বলে মনে হয় তার। আক্কেল দাঁত উঠলে চোয়ালে ব্যথা করে না - সেরকম।
       কিন্তু ব্যথা সেরে যাবার আগে জমদগ্নির হাড় খুঁজে পাওয়া চাই। মা বলে না। খালি বলে - মাঝছাদের বেদীতে উঠবি না গোরু, তোর তো ঘুড়ি ওড়ানোর সময় পা মনে থাকে না। বলার সময় মায়ের মুখটা কেমন বেগুনী হয়ে যায়। রান্নাশেষে মুখে দিয়ে হলুদ বেশি লাগলে যতটা বেগুনী হয়, তার চেয়েও বেগুনী। বৈনতেয় তখন ঠিক মা কে বুঝতে পারে না। মা যেন তার কাছ থেকে গুটিয়ে কুঁকড়ে ছাদের অন্যপারে চলে যায়। ওই সময়টা বিনুর বড় ইচ্ছে হয় মাকে জড়িয়ে ধরতে, গলায় যেন সেই হাড়টা আটকে যায়।

‘বিনু, বিনু’ বলে ডেকে ওঠে বাবা, নীচে থেকে, চমকে ওঠে বিনু। নিশ্চই দাদা আবার বিছানায় হেগে ফেলেছে; মা নেই, যোগব্যায়ামে। আর ওই ভদ্রলোক অসৈরণ সহ্য করতে পারেন না। না, নিজের আত্মজেরও নয়। সাড়া দিল না বিনু। মিনিট দশেক পরেই নামবে। ততক্ষণ থাক দাদা গু মেখে শুয়ে। বেচারার নিম্নাঙ্গ জন্ম থেকেই স্থাবর। স্রেফ জানলা দিয়ে রোদ খেয়ে খেয়ে এদ্দিন সে বেঁচে আছে। মা ছাড়া কেউ তাকে ভালবাসে না, বিনু না, শতদীপা না, বাবা তো নয়ই। বাঁচার জন্য বোধহয় ভালবাসা লাগে না। 
       ক্রমশ তার স্মৃতিতে পত্রক মামা ভিড় করে আসে। পত্রকমামার অঞ্জলিপুটে বাবার থুথু, নাকি বই থেকে মুখ তুলে কর্তব্যের লালা; দূরে মায়ের ঘৃণাকষায়িত নয়ন। পত্রকমামা প্রবলবেগে আর্চ করছে, ব্যায়াম করিয়েই যাচ্ছে, কপোল জুড়ে স্বেদ, অনঙ্গমামা বিড়ি দিতে এসে দরজায় স্থাণু দাঁড়িয়ে, - তাও হল আধপ্রহর; মা এবং পত্রকমামা ক্রমাগত বৈঠক দিতে দিতে দূরে; স্বেদবিন্দু বড় লালচে দেখায় অঘ্রাণের দুপুরে।
       হঠাৎ চক্রবাক শীৎকারে দেয়ালা ভাঙ্গে বিনুর। অভ্যাসবসে বারমুডার সামনেটা আঁকড়ে ধরে। দ্রুত এগিয়ে যায় সিঁড়ির দিকে। দুধাপ নামতেই পিতা কণাদের ডাকের চেয়েও বেশি জানান দেয় ভার্গব - কাল ম্যাচে ভার্গব সজোরে লাথি মেরেছিল শিনবোনে। মুখ বিকৃত করে সিঁড়িতে বসে পড়তে পড়তে বিনুর চোখের সামনে ভার্গব ভেসে ওঠে। অল্পহরিৎ দাড়িতে তার চৌকো চোয়ালটা যেন রণকুঠারের মত জ্বলজ্বল করে। ভার্গব একটা ফেনমেনা। সে আবৃত্তি করলে মায়ের হাতের আটা শুকিয়ে যায়, কণাদ ইকনমিক হিস্ট্রি ভাঁজ করে তার ডুয়ার্স বেড়ানোর গল্প শোনে, এমনকি দাদা অরুণও জানলা ছেড়ে খাটের রেলিং-এর ধারে এসে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। ভার্গব অবশ্য বড় কমই তাদের বাড়িতে আসে, আসলেও বিনুকে বিশেষ পাত্তা দেয় না। তবু ওর ছোঁওয়া শিনবোনে পেলে বিনুর স্পন্ডাইলোসিস বেড়ে যায়। 
       বিনু হঠাৎ সবিস্ময়ে লক্ষ্য করে তার কাঁধের দুপাশের ডেল্টয়েড ফুলে উঠছে, ছোট ছোট আঁশ - পালকের মত - ফেটে বেরোচ্ছে - ডানারা যোনিপথ থেকে মাথা বাড়াচ্ছে - সামনে ভার্গব - পুরুষাঙ্গ ক্রমশ দৃঢ় - নীচে ছোট থেকে ছোট হয়ে আসছে কণাদ, মা, অরুণ, ছাদ, সিঁড়ি, জমদগ্নির হাড়...








   মৈনাক পাল

Mainak Pal