Skip to main content



Purandar Bhat (Satadru Das)

জোকারের বালের যুগ্যি নয় ওরা

বাঁকুড়া মিমস পেজটা বোধয় ফেসবুক বন্ধ করে দেবে। এই পেজটি বহুবার বিতর্কে জড়িয়েছে। পিডোফিলিয়া নিয়ে একবার বিতর্কে পড়েছিল, বর্ণবিদ্বেষী, নারীবিদ্বেষী পোস্ট করে বিতর্কে জড়িয়েছে, এবার ক্যান্সার পেশেন্টদের কেমোথেরাপির ফলে টাক পড়ে যাওয়া নিয়ে রসিকতা করে বিতর্কে জড়িয়েছে। বহু লোকে রিপোর্ট করেছেন পেজ। সিগনেচার ক্যাম্পেন হয়েছে পেজটাকে সরাবার জন্যে। অনেকেই এমন বলছেন যে যাঁরা ওই পেজটাকে লাইক করেছে তারা যদি আনলাইক না করে তাহলে আনফ্রেন্ড করে দেবে। অর্থাৎ এই রামনবমী আর ভোঁতা তলোয়ার নিয়ে লম্ফ ঝম্পর বাজারেও খানিকটা ফুটেজ খেয়েছে পেজটা। এবার আসা যাক বিতর্কর প্রসঙ্গে।

প্রথমেই যেটা পরিষ্কার করে দেওয়া দরকার যে "ইয়ার্কি মারবার একটা লিমিট আছে, ক্যান্সার পেশেন্ট নিয়ে ইয়ার্কি বা মেয়েদের মাসিক হওয়া নিয়ে ইয়ার্কি মারা প্রচন্ড ইনসেন্সিটিভ" - এই যুক্তির একটা অংশ সঠিক কিন্তু অন্য অংশটা গরুর গোবর। সঠিক হলো "ইনসেন্সিটিভি" আর গোবর হলো "লিমিট আছে।" লিমিট যদি টানেন সেটা কোথায় টানবেন? কেউ ক্যান্সার পেশেন্ট নিয়ে ইয়ার্কি মারাকে লিমিট অতিক্রম করা বলবেন আর কেউ বলবেন গরুকে নিয়ে ইয়ার্কি মারা হলো লিমিট। একটা লিমিট টানাকে সমর্থন করলেই অন্য লিমিটের বিরোধিতা করবেন কী ভাবে? তাই এই লিমিট টানার ব্যাপারটা হলো গোবরের মতো। বিশ্বের সব কিছু নিয়ে ইয়ার্কি মারতেই পারে কেউ, আমি তার প্রতিবাদ করবো, কিন্তু তার জন্য তাকে জেলে পুরে দেবো বা তার বলার বা লেখার অধিকার কেড়ে নেবো না। লিমিট টানতে থাকলে পেহেলাজ নিহালনিকে বরং একবার রোজ সকালে প্রণাম করে নেওয়া দরকার। একটা লিমিট ভালো আর অন্যটা ভালো নয় এটা আপনি কোনো ভাবেই স্বাধীনতার যুক্তি মেনে প্রমাণ করতে পারবেন না। আমি বলছি না যে সব লিমিট সমান, আমি বলছি না যে গায়ের রঙের জন্য কাউকে নিয়ে ইয়ার্কি মারা আর ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে ইয়ার্কি মারা এক, আমি বলছি না যে একটায় লিমিট টানলে আরেকটাতেও টানতে হবে। কিন্তু একটা করা যাবে আর অন্যটা করা যাবে না এই তর্ক করতে গেলে আপনাকে বাইরে থেকে কিছু যুক্তি আমদানি করতে হবে, স্বাধীনতার পক্ষে উদারবাদ যে যুক্তিগুলো দেয় সেগুলো দিয়ে প্রমাণ করতে পারবেন না। বাইরে থেকে মানে শুধু বাকস্বাধীনতার উদারবাদী ব্যাখ্যায়  আটকে না থেকে, ইতিহাস, অর্থনীতি ইত্যাদির প্রেক্ষাপট টেনে এনে তবে যুক্তি সাজাতে হবে। গডেলস ইনকমপ্লিটনেস থিওরেমের মতো বিষয়টা।  সেই কাজটা কিন্তু বেশ কঠিন, এবং সেটা করতে গেলেই অনেক "ক্যান্সার নিয়ে ইয়ার্কি মারা উচিত না" অবস্থানের সমর্থককে কিন্তু হারাতে হতে পারে কারণ নতুন যুক্তিমালার অনেক কিছু তাদের আবার পছন্দ হবে না। কিন্তু তার আগে একটা মৌলিক বিষয় নিয়ে ভাবা দরকার। সেটা হলো ইয়ার্কি বা মজা বা জোক ব্যাপারটা কি?

    
এই প্রশ্নটা গুরুত্বপূর্ণ। বাঁকুড়া মিমসের যে "জোক" বা ইয়ার্কি নিয়ে লোকে ব্যথিত সেগুলো এক ধরণের বুলিয়িং। বুলিয়িং-এর অর্থ হলো কারুর কোনো দুর্বল জায়গায় খোঁচা দিয়ে মজা নেওয়া। সেই দুর্বল জায়গা কারুর ক্ষেত্রে ধর্ম হতে পারে, কারুর ক্ষেত্রে দেশপ্রেম হতে পারে, কারুর ক্ষেত্রে গৌমাতা হতে পারে, কারুর ক্ষেত্রে অভিনেতা দেব হতে পারেন, কারুর ক্ষেত্রে জাত হতে পারে, কারুর ক্ষেত্রে শারীরিক প্রতিবন্ধকতা হতে পারে, অধিকাংশ সুস্থ বুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের ক্ষেত্রে ক্যানসার আক্রান্তের প্রতি সহমর্মিতা অথবা ধর্ষিতার প্রতি সহমর্মিতা হতে পারে। এই দুর্বল জায়গায় খোঁচা মেরে কাউকে ব্যথিত করে মজা নেওয়া, অর্থাৎ এই  বুলিয়িং ব্যাপারটা কি ঠিক? ঠিক বা ভুল কি না জানি না কিন্তু আমরা প্রত্যেকেই এটা করি। হিন্দুত্ববাদীদের যখন চাড্ডি, গোমাতার সন্তান বলি সেগুলো তাদের রাজনৈতিক বিশ্বাসে আঘাত দিয়ে মজা নেওয়া, চাড্ডিরাও তেমনই চীনের দালাল, চুমু বিপ্লবী ইত্যাদি বলে বামপন্থীদের রাজনৈতিক বিশ্বাস অথবা উদারবাদীদের  চেতনায় আঘাত দেওয়ার চেষ্টা করে। তাই কাউকে "অফেন্ড" করাকে জোক হিসেবে  গণ্য করা যায় কী না তার উত্তর এখানেই রয়েছে, সকলেই যখন সেটাকে মজা নেওয়ার জন্য করে থাকি  তখন উত্তরকে "হ্যাঁ" বলে ধরে নেওয়া উচিত,  অন্যের দিকে আঙ্গুল তুলে লাভ নেই। অর্থাৎ বুলিয়িং কে যদি জোক বলে মেনে নিই আর আমরা যদি এই বিষয়ে একমত হই যে আমরা কেউ পেহেলাজ নিহালনী অথবা বাংলাদেশের নাস্তিক কোপানো মোল্লা নই তাহলে যেটা দাঁড়াচ্ছে সেটা হলো যে কোনো কিছু নিয়ে বুলিয়িং করে মজা নেওয়া যেতেই পারে। তার সমালোচনা করবো কিন্তু তার বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেব না।

এবার আসা যাক বাঁকুড়া মিমস এর উদ্দেশ্য এবং মানসিকতার প্রসঙ্গে। ওরা এসব বিতর্ক তৈরী করে তার একটা কারণ প্রচার পাওয়া কিন্তু সেটাই সব নয়। ওদের উদ্দেশ্য মানুষের বাকস্বাধীনতার প্রতি সহ্যশক্তি পরীক্ষা করা। ওরা প্রমাণ করতে চায় যে ব্যক্তিস্বাধীনতার পক্ষে সওয়াল করা প্রগতিশীল মানুষও কোথাও একটা গিয়ে মৌলবাদীদের মতো আচরণ করবে। তারা হয়তো ধর্ম নিয়ে নোংরা কথায় আঘাত পায় না কিন্তু অন্য বিষয়ে পায় আর সেই সব স্থানে আঘাত দিতে পারলে তাদেরকে দিয়েও মৌলবাদীদের মতো আচরণ করানো যায়। ওরা ব্যাটম্যানের জোকারের ভূমিকা নিতে চায়, জোকারের বিখ্যাত ডায়ালগ মনে করুন - "See, their morals, their code... it's a bad joke. Dropped at the first sign of trouble. They're only as good as the world allows them to be. I'll show you, when the chips are down, these... these civilized people? They'll eat each other." দুঃখের বিষয় যে অনেকেই  তাদের সঠিক প্রমাণ করে দিচ্ছেন। আর এতেই  তথাকথিত উদারবাদীদের  হার। কারণ উদারবাদও কিছু নৈতিকতার ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, ব্যক্তিস্বাধীনতা  সেই নৈতিক মূল্যবোধগুলোর  মধ্যে প্রধান  কিন্তু সেটাই সব নয়, বাকি নৈতিক দিকগুলোর সাথে যখন ব্যক্তিস্বাধীনতার সংঘাত হয় তখন এনারা সংকটে পড়েন, কী  করবেন বুঝে উঠতে পারেন না।

আর এখানেই আমরা বামপন্থীরা উদারবাদীদের থেকে আলাদা। আমাদের  কাছে বাকস্বাধীনতা প্রচন্ড গুরুত্বপূর্ণ  কোনো বিষয় নয়। আমি বুলিয়িং  করে মজা নিই কিন্তু আমি মনে করি বুলিয়িং করা যায় শুধু শক্তিশালীকেই, ক্ষমতাশালীকেই। যেহেতু তাদের  দুর্বলতার জায়গা নিয়ে  তাদের অন্যদের দমিয়ে রাখতে অসুবিধে হয় না তাই তা নিয়ে খোঁচা মেরে তাদের একটু তিক্ত করে দেব, ক্ষনিকের জন্যে তাদেরকে ক্ষমতার জায়গা থেকে নামিয়ে হাস্যস্পদ করে দেব। ধর্ষণ নিয়ে ইয়ার্কি মারবো কিন্তু সেটা ধর্ষককে ছোট করতে, ধর্ষিত কে নয়। বর্ণবাদ নিয়ে ইয়ার্কি মারবো কিন্তু সেটা শ্বেতাঙ্গদের নিয়ে, কৃষ্ণাঙ্গদের নিয়ে নয়, অথবা তাদের নিয়ে মারলেও খোঁচা মারার তীব্রতা কম হবে। বাঁকুড়া মিমস-এর এরকম কোনো মূল্যবোধ নেই, কিন্তু সবাইকে "অফেন্ড" করে এমন দাবি অন্তত তাদের করা উচিত  না। ধর্ম নিয়ে তাদের খোঁচাগুলো রীতিমতো জোলো, হিন্দু দেব দেবতা নিয়ে তাও কিছু নিরীহ ইয়ার্কি মেরেছে মোহাম্মদ বা আল্লাহকে নিয়ে তাও দেখিনি। মুসলিমদের নিয়ে কিছু মিম আছে কিন্তু মোহাম্মদ নিয়ে নয়। অবশ্য ভগবান, মোহাম্মদ এসব নিয়ে ইয়ার্কি মারলে জান মাল খোয়াবার ভয় আছে, জেলে  যাওয়ার ভয় আছে। সকলেরই অধিকার আছে খুন অথবা গ্রেফতার হওয়া থেকে নিজেকে বাঁচানোর। কিন্তু আরো অন্য কিছু নিয়েও বানানো যেত তো? যেমন শহীদ হওয়া সেনা অথবা স্বাধীনতা আন্দোলনের শহীদদের নিয়ে? সেসব করলে গালাগাল জুটবে, কিন্তু খুন বা এফআইআর বোধয় হবে না। কিন্তু তারা সেসবও করেনি। তাদের টার্গেট মূলত উদারবাদীরা, তাদেরকেই  বুলি করতে চায় ওরা। এর কারণ উদারবাদীরা যাকে বলে "সফ্ট টার্গেট।" কিন্তু এসব করে নিজেদের অন্তত ব্যাটম্যানের জোকার বলে নিজেদের পিঠ চাপড়ানোটা হাস্যকর। জোকার কিন্তু বুলি করতো ক্ষমতাকে।

দুর্বলকে খোঁচা মেরে মজা নেয়  যারা আমি নিশ্চিত যে বিপ্লব হলে তারা ক্ষমতাশালী শ্রেণীর পক্ষে দাঁড়াবে। তাই এরা আমার কাছে শ্রেণী শত্রুই, অনেক উদারবাদীর মতোই। 



নারী বিদ্বেষ আর তার ভাষা

সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় নারী বিদ্বেষ নিয়ে একটি ফেসবুক বিতর্কে অংশ নিই এবং সেই বিতর্কে যা যা কথা আর বলা হয়ে ওঠেনি সেগুলো এক জায়গায় করে বলে রাখতে পারলে ভালো হয় - এই মনে করে এই লেখার অবতারণা।

প্রথমেই বলি যে আমি নারীবাদী নই কারণ নারীবাদের পক্ষে বা বিপক্ষে মতামত রাখার মতো যথেষ্ট লেখাপড়া আমার নেই। অনেকেরই ভুলভাল ধারণা আছে যে মহিলা এবং পুরুষকে সমান অধিকারের দাবিদার মনে করা মানেই তা নারীবাদ। এটা একেবারেই নয়, সেরকম হলে তাকে মানবতাবাদ বললেই হয় কারণ মানবতাবাদ সকল মানুষকে সমান অধিকার দেওয়ার কথা বলে, লিঙ্গ নির্বিশেষে। নারীবাদ সমাজে মহিলাদের সমান অধিকার দেওয়ার কথাই বলে তবে তাদের মতবাদ অনুযায়ী সমস্ত অধিকারের লড়াইয়ের কেন্দ্রবিন্দুতে নারী অধিকারের প্রশ্ন থাকা উচিত কারণ নারীর বঞ্চনা মানবসভ্যতার সবচেয়ে আদিম বঞ্চনা। হরেক রকমের নারীবাদ আছে, এমন কি রক্ষণশীল নারীবাদ, ক্রিশ্চান নারীবাদ, ইসলামী নারীবাদ প্রভৃতিও আছে। এসবের কোনটা ঢপ আর কোনটা ঠিকঠাক তাই নিয়ে যথেষ্ট পড়াশুনো না থাকার দরুন কোনো কথা বলা সমীচীন হবে না। তবে সুবিধের বিষয় হলো যে নারী বিদ্বেষ নিয়ে মতামত রাখতে গেলে নারীবাদী হওয়া বা নারীবাদ নিয়ে পড়াশুনো থাকার খুব একটা প্রয়োজন নেই, তা ছাড়াই বক্তব্য রাখা যায়।

মূল বিষয়ে আসা যাক। প্রথমত বলে নেওয়া প্রয়োজন যে নারী বিদ্বেষ বলতে এইখানে কী বলা হচ্ছে। যেহেতু গোটা বিষয়টাই ফেসবুকের কিছু পোস্ট বা কমেন্টকে কেন্দ্র করে তাই নারী বিদ্বেষ বলতে এই ক্ষেত্রে কিছু খিস্তি এবং যৌন হেনস্থা মূলক কিছু উক্তিকে উদ্দেশ্য করে বলা হবে। এটা অস্বীকার করার জায়গা নেই আমাদের ব্যবহৃত অধিকাংশ খিস্তিই সবসময় একজন নারীকে যৌন আক্রমণ করে, একজন পুরুষকে খিস্তি করার সময়ও আক্রমণের লক্ষ্য হয় নারীরাই। সেই পুরুষের মা, বোন, কন্যা প্রভৃতির সাথে যৌন সম্পর্ক কল্পনা করে গালাগাল রচনা করা হয়। এতে ভিকটিম শুধুই সেই পুরুষটি নয় তাঁর সম্পর্কিত নারীরাও হন কারণ তাঁদের অনিচ্ছাকৃত একটা যৌন সম্পর্কে তাদের লিপ্ত করা হচ্ছে। এ ছাড়াও একজন নারীকে আক্রমণ করার সময় তাকে যৌনকর্মী কল্পনা করা, তার শারীরিক কাঠামো, যোনি, স্তন, কোনো পুরুষের সাথে বা নারীর সাথে তার যৌন সম্পর্ক প্রভৃতিকে আক্রমণের লক্ষ্য করা হয়। লক্ষ্য করুন যে এই সব গালাগাল, আক্রমণের মূল প্রতিপাদ্য হলো একজন নারীকে "ডিহিউমানাইজ" করে, তাকে শুধুমাত্র যৌন বস্তুতে সংক্ষিপ্ত করা হয়।  যৌনতা মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি, তাতে লজ্জাজনক কিছু নেই কিন্তু একজন নারীকে আক্রমণ করার সময় তাকে যৌন বস্তুতে সংক্ষিপ্ত করা পুরুষতান্ত্রিক মানসিকতার প্রকাশ, কারণ দুটি। প্রথমত, সেটা করলে সেই নারীর বাকি মতামতকে অগ্রাহ্য করে যায় কারণ সে আর মানুষ নয়, সে বস্তুতে সংক্ষিপ্ত। আর দ্বিতীয়ত, একবার যৌন বস্তুতে সংক্ষিপ্ত করতে পারলে তার ওপর পুরুষের অধিকারকে স্থাপন করা যায়, যেহেতু এই সমাজ পুরুষতান্ত্রিক তাই যৌন বস্তুর ওপর পুরুষের অধিকার সমাজে অকথিত ভাবে স্বীকৃত। অর্থাৎ যে কোনো রকম মৌখিক বা লেখিত আক্রমণ যা একজন নারীর যৌনতাকে টেনে আনে তা সবসময়ই পুরুষতান্ত্রিক, সেই আক্রমণ একজন নারী বা পুরুষ যেই করুক না কেন।

এবার আসা যাক বিতর্কের প্রশ্নে। বিতর্কের মূল প্রতিপাদ্য ছিল এটাই যে ক্রমাগত যৌন হেনস্থা মূলক আক্রমণের বিরোধিতা করতে গেলে সেই বিরোধিতার শব্দ চয়ন সচেতন ভাবে করা উচিত কী না। আমার বক্তব্য ছিল যে ফেসবুকে নারীদের যৌন হেনস্থার বিরোধিতা যখন লক্ষ্য তখন যাঁরা বিরোধিতা করছেন তাঁদের শব্দ চয়ন সম্পর্কে সচেতন হওয়া উচিত। শব্দ বা ভাষা উপরি কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং উপরিকাঠামোকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। সমাজ যখন পুরুষতান্ত্রিক তখন স্বাভাবিক ভাবেই সেই সমাজের ভাষার মধ্যে পুরুষতান্ত্রিকতা থাকবে। যদি পুরুষতান্ত্রিকতার বিরুদ্ধে লড়তে হয় তাহলে সেই লড়াইয়ের ভাষাও ভিন্ন হতে হবে, তাতে পুরুষতান্ত্রিক ভাষাকে যথা সম্ভব এড়াতে হবে।

এখন এই বক্তব্যের বিরুদ্ধে কেউ বলতেই পারেন যে পুরুষতন্ত্রকে ধ্বংস করার কোনো মহান লক্ষ্য আমাদের নেই, যৌন হেনস্থা মূলক উক্তির বিরুদ্ধে পাল্টা এমন ভাষাই প্রয়োগ করবো যা হেনস্থকারী অপমানসূচক বলে মনে করে, আক্রমণাত্মক বলে মনে করে। হেনস্থকারীকে মানসিক ভাবে বিপর্যস্ত করাই আশু লক্ষ্য যাতে সে হেনস্থা করা বন্ধ করে। অর্থাৎ কোনো পুরুষ যদি একজন নারীকে যৌন হেনস্থা করে তাহলে তার পাল্টা, সেই পুরুষকেও পুরুষতান্ত্রিক ভাষা থেকে ধার করা গালাগাল করে তার সাথে সম্পর্কিত নারীদের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু বানানো হবে।


আমার মতে এইখানে প্রশ্নটা এসে দাঁড়ায় প্রতিশোধ এবং ন্যায় বিচারে। বিচার শুধুই প্রতিশোধ নয়, প্রতিশোধ বিচারের একটা অংশ হতে পারে মাত্র। যেহেতু ফেসবুকে যৌন হেনস্থার বিরোধিতা করাটা লক্ষ্য তাই শুধুই প্রতিশোধে আটকে থাকলে লড়াইকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যায় না কারণ এই ক্ষেত্রে প্রসঙ্গটার সঙ্গে সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন জড়িত। জাতিবাদের বিরোধিতা পাল্টা জাতিবিদ্বেষী মূলক  গালাগাল দিয়ে করা সম্ভব না, তেমনই নারীবিদ্বেষের বিরোধিতা পাল্টা নারীবিদ্বেষ দিয়ে করা সম্ভব নয়। তাতে প্রতিশোধস্পৃহা চরিতার্থ হতে পারে বড় জোর কিন্তু লড়াই কি শুধু সেটুকুই?













পুরন্দর ভাট
(শতদ্রু দাশ)

Purandar Bhat (Satadru Das)

Comments

Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS