Skip to main content



Sarbajit Ghosh

হরকরাকে লেখা চিঠি

রাস্তা পেরোতে গিয়ে শ্যামলালের হঠাৎ মনে হল, তাকে নিয়ে কেউ কোনোদিন কবিতা লিখবে না। অথচ ছোট্টো সবুজ বিন্দুজীব যে মানুষটি দপদপ করে বলতে থাকে আর কতক্ষণ, সে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছিলো লালে। শ্যামলালের মনে হল সে তাকে বলছে, ওহে শ্যামলাল, এই যে কুড়ি লক্ষ ত্রিশ হাজার পাঁচশো সাতাশিতম বার তুমি সফলভাবে রাস্তা পেরোলে, এবং প্রত্যেক মৌলিক সংখ্যকবারে পেরোতে গিয়ে যে তুমি গাড়ি চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে যাও, (আহা সে বাঁচা তুমি জানবে না; অঙ্কে কাঁচা)... শ্যামলাল শুনতে পেলোনা বাকিটা। হয়তো সে বলতো শ্যামলাল জানে না রাস্তা পেরিয়ে আসলে সে কোথায় যাচ্ছে, বা রাস্তা সে আদৌ পেরোতে পেরেছে কিনা, যেভাবে শ্যামলাল জানে না এখন সে কোথা থেকে ফিরছে। শ্যামলালের মনে হয়েছিল সে বেরচ্ছে তার ইউনিভার্সিটি থেকে, শেষ ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সে খুঁজতে গিয়েছিল এক জলে ভেজা দাঁড়কাক, যে আসলে ভেজার ভান করে পালক ঝাড়ছিল। কিন্তু, এও তো সমানভাবে সত্যি, শ্যামলাল যে রাস্তা পেরোচ্ছিল তার এপারে ছিল প্রাচীন লাল এক সরকারি অফিস, যার লিফটের দড়ি দিয়ে খুব ভালো ফাঁসি হয়, শ্যামলাল ভেবেছিল। যেমন শ্যামলাল এও জেনেছিল, নীলদর্পণ নাটকে এক কুখ্যাত চাবুকের নাম শ্যামলাল এবং তার নিজের কোমরে ছিল প্রাগৈতিহাসিক এক দাদ, যে দাদ তার মনের সব কথা বুঝতো বিনা ভাষায়।

রাস্তায় অন্ধকার হয়ে আসছিল, ভেজা ছিল রাস্তা, অথবা তীব্র দুপুরের মরীচিকায় রাস্তা হয়ে উঠেছিল সবুজ কোনো শস্যক্ষেত। শ্যামলাল বিড়ি ধরিয়েছিল একটি, এবং তার মনে পড়েছিল কবিতার কথা। শ্যামলাল তো জানতো, মহাপ্রলয়ের সময়ে নৌকায় যে পাঁচটি কবিতা নিয়ে উঠতে পারবে শ্যামলী, তার মধ্যে শেষতম কবিতাটি স্বয়ং শ্যামলালের। যদিও সেই কবিতাটি শ্যামলাল এখনো লিখে উঠতে পারেনি, কারণ শ্যামলীকে এখনো সে চেনে না, চিনলেই জিজ্ঞেস করে নেবে সে কেমন কবিতা শ্যামলীর পছন্দ, কিংবা কবিতার বদলে শ্যামলী চায় কিনা একফালি ছায়া ও রোদ্দুরঘাস জমি। অথচ, শ্যামলাল ভাবে, কেউ তাকে নিয়ে কবিতা লিখবে না কোনোদিন। আজকের এই ট্রাফিক সিগনালে শ্যামলালের তো দাঁড়ানোর কথা ছিল না; যেভাবে হিজড়েরা শাড়ি তুলে অন্ধকার দেখানোর ভয় দেখিয়ে টাকা নেয়, শ্যামলাল যেন দাঁড়াচ্ছে গিয়ে প্রতিটি সিগনালে, এভাবেই চেয়ে যাচ্ছে একটা আস্ত কবিতা। শ্যামলালের মনে হয়েছিল আজ পর্যন্ত সে যা যা লিখেছে সব একেকটি গর্ভস্রাব, কারণ শ্যামলাল জানত মহাপ্রলয়ের সময় কোনো নৌকা পাওয়া যাবে না শেষ পর্যন্ত। শ্যামলীকে সে একবারই দেখেছিল, বর্ধমান থেকে ফেরার পথে কর্ড লাইনে, ট্রেনের দরজায় বারমুখো হয়ে দাঁড়িয়ে, একহাতে হাতল ধরা, চুলগুলো খোলা ছিল এবং হাওয়ায় একে একে উড়ে যাচ্ছিলো, শ্যামলী ক্রমশ ন্যাড়া হয়ে যাচ্ছিল আর রোদ্দুর আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। অথচ, আজ এখনো শ্যামলালের বাস এলো না, কবিতার মতো সে যদি স্থির বুঝতে পারতো বাস আর আসবে না, বাস কোনো ছন্দকাটা তালকাটা শব্দ, এবং অপেক্ষা বিষয়টা আসলে মাথাব্যথার মতো আদুরে... শ্যামলাল মন দিয়ে বাসস্ট্যান্ডে সাঁটানো 'গোপনে মদ ছাড়ান' বিজ্ঞাপন পড়ছিল এবং ভাবছিল, সে কি কোনোদিন মাতাল হয়নি, সে কি চায়নি ঝাল ঝাল লংকাকুচি মাখা ছোলাসেদ্ধ এবং খোঁয়ারি-ভাঙানো লেবুর জল, তাহলে কেন তাকে নিয়ে একটা, অন্তত একটা বিজ্ঞাপনও লেখা হল না এতদিনে!

এবং শ্যামলাল যথারীতি জানতে পারেনি বাসে সে কখন উঠেছিল, যেভাবে সে জানতো না কীভাবে এই গল্পের সে চরিত্র হয়ে উঠেছে। বাসে উঠে একটি জায়গা পেল শ্যামলাল, বাঁদিকের শেষ জানলায়, হয়তো সেই জানলাটি অতিরিক্ত এবং শ্যামলাল ছাড়া কেউ বসতে পারত না সেই জানলায়। শ্যামলাল বসে বসে সময় কাটানোর জন্য ভাবতে শুরু করেছিল, আর কী কী সে জানে না। যদিও জগতের প্রায় নব্বই শতাংশ ছিল শ্যামলালের করতলগত, কারণ বাড়িতে তার দুটি পোষা ভূত ছিল, কিন্তু কিছুটা তো অজানা রেখে দিতেই হয়, নয়ত বসিয়ে খাওয়াতে হয় ভূতেদের। এই যেমন দশ মিনিট আগেও শ্যামলাল জানত না সে এই গল্পের চরিত্র হবে, এবং এক মিনিট আগেও সে জানতো না তার দুটি পোষা ভূত থাকবে। যেমন শ্যামলালের ইচ্ছে একদিন খেয়াল শিখবে, একদিন তার গলায় হবে ভারী দানা আর সপাট তানের আসা যাওয়া, আর তার আঙুলে নেচে নেচে উঠবে সরোদ। ঝালার তারে আঙুল বোলাবে সে, যে দক্ষতায় রুমালি রুটি বানায় কারিগর, এক এক মুহূর্তে দুশো কবিতা গিলবে আবার ওগরাবে। অথচ শ্যামলাল জানে, সে গলায় লাভা নিয়ে কুলকুচি করলেও সুর আসে না, এই যে বাসে করে সে ক্রমশ সুরের থেকে আলাদা হয়ে গেল, দূরে চলে গেল, প্রতি মুহূর্তে তার মনে হয় নেমে পড়ি, নেমে পড়লেই হয়, আর দূরের মোড়ে দ্যাখে শ্যামলী গালে হাত দিয়ে বসে গান শুনছে কোনো শুয়োরের বাচ্চার গলায়। অথচ বাস চলতে থাকে, আর শ্যামলাল ক্রমশ শুনতে পায় সেই গান, আহা, শ্যামলাল বুঝি কাঁদে, শ্যামলাল বুঝি এক্ষুণি পূর্ণিমা আকাশতলে আছাড়িপিছাড়ি করে সুরের ঘোরে। আর বাস তাকে দূরে আরো দূরে দূঊঊঊঊরে কোনো এক বিষণ্ণ অস্তগামী রক্তাক্ত সূর্যের কাছে বলাকা করে পাঠায়, শ্যামলাল, সেই যে কবিগর্বী সুরগর্বী শ্যামলাল রোজ সুরের কাছে সহস্র তৃণজন্ম চায়, আহা সুর, পথ দেখায়, হাত ধরে নিয়ে যায় ঝুরো মাটি পাহাড় পেরিয়ে পূরবী আর ইমনের ছায়াবৃত্তে...

অথচ শ্যামলাল কদিন আগেও দেখেছিল একটি মেয়েকে, যার হৃদয় ছিল বিষাদকীট। কিন্তু শ্যামলাল তাকে প্রজাপতি বানানোর মন্ত্র জানতো না, এই না জানা ছিল তার দশ শতাংশের মধ্যে সিকিভাগ। যেভাবে শ্যামলাল কোনোদিন জানতে পারেনি, তার জন্মের সময়ে আসলে সে কী দেখেছিল। আসলে শ্যামলাল দেখেছিল দুটি রাস্তা, একদিকে ছিল একদল ভুখা মানুষের মিছিল, যাদের হাত ছিল মশালের মত কংকালসার কিন্তু সমিধময়, আর যে রাস্তায় একে একে কামান গর্জে উঠছিল পলে পলে। আরেকটা রাস্তা ছিল সবুজ, খানিকটা রক্তাভ, যেখানে একটা সাইকেল দাঁড়িয়ে শিশিরে ভিজেছিল একরাত আর একটা পুরনো ভাঙা গাড়ির হলুদ হয়ে গিয়েছিল রাধাচূড়ার তলে। জন্মমুহূর্তে শ্যামলাল দেখেছিল দুটি রাস্তা কেমন সাপের শঙ্খ লাগার মতো জড়াচ্ছে নিজেদের, আর একদিকে এক কানা খোঁড়া বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন খানিক ঈশ্বরপ্রতীম স্তব্ধতায়। সে ছিল বড়ই আঁধার, মাতৃজঠরে সে দেখেছিল আরেক প্রবেশপথ, যে পথে প্রবেশ করলেন সেই বৃদ্ধ, আর শ্যামলালের ভ্রূণের কাছে অল্প জল চাইলেন। শ্যামলাল দিয়েছিল তার সঞ্চিত খানিক অমৃত বারি, যা তাকে সঙ্গে দিয়ে পাঠানো হয়েছিল জন্মমুহূর্তে কাজে লাগবে বলে। শ্যামলালের ক্রমশ ঘুম পেয়েছিল, আর সে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেও জানতে পারেনি কোন রাস্তায় তার জন্য সরাইখানা আর জলসত্র রয়েছে, কোন রাস্তায় তাকে নিজেই খুঁজে নিতে হবে পথ। তেমনই সেই মেয়েটি, যাকে শ্যামলাল ভেবেছিল ভালবাসে কিংবা পাখির ছানার মতো আদুরে ন্যাকামো আর বীজধান, যখন আঙুল তুলে শ্যামলালকে বলেছিল এগিয়ে এসো, শ্যামলাল বোঝেনি।

অর্থাৎ, শ্যামলাল ছিল প্রকৃতই এক ব্যর্থ পুরুষ। যে বাস প্রতিমুহূর্তে তাকে নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিল, তার বশংবদ হয়ে শ্যামলাল নিজেকে জাড্যে সমর্পণ করেছিল। শ্যামলাল দেখেছিল এক উন্মাদ দাঁড়িয়ে শহরের ব্যস্ততম মোড়ে, নিজের ক্ষুদ্র ও মলিন লিঙ্গটি সে তাক করেছে ধাবমান আর্যের দিকে, ছ্যার ছ্যার করে সে পেচ্ছাপ করছে মাঝরাস্তায়। শ্যামলালের মনে হয়েছিল সে ক্রমশ ক্ষুদ্র-বক্রলিঙ্গের দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হচ্ছে, তার বুকে ক্রমশ কফ উঠছে সবুজ, যেভাবে তার বাবা একদিন উগরে ফেলেছিল তার মায়ের মৃতদেহ, যা মাছের কাঁটার মতো দীর্ঘকাল বিঁধেছিল গলায়, আর শ্যামলাল দেখেছিল কইমাছের মতো ডাঙায় পাখনা ভর দিয়ে চলছে মা, আর বাবা বলে উঠলো রেণ্ডি! শ্যামলালের বাবা ধূপকাঠি বেচতো আর শ্যামলাল বাবার থেকে চন্দনধূপ কিনে জ্বালিয়ে দিয়েছিল সমস্ত মাছের বাজারে...

বাস এগিয়ে যাচ্ছিল আরো আরো রাতের দিকে, শ্যামলাল নিজেকে আরো আরো বৃদ্ধ ও ব্যর্থ মনে করছিল। আসলে শ্যামলাল তো চেয়েছিল একটা গল্প বলে যেতে, নিটোল, সরল গল্প, দুনিয়ার সব মানুষ আর দানব আর মাছেরা যেখানে আসবে, আর পাখিরা ঝড়ের আকাশে ডানা মেলে ভেসে যাবে, টাল খাবে না একটুও... শ্যামলাল তো চেয়েছিল কিছু মানুষ, যারা অনেকটাই জানে না, আর যারা খুব কেরাণীমতোন, আর যারা কোনোদিন জানতে পারেনি কোন পথে পথ, শ্যামলাল তো চায়নি দিনের শেষে কোমরের সেই প্রাচীন দাদ আর দুটো পোষা ভূতের কাছে শিখতে মানুষের ইতিহাস, শ্যামলাল তো সারাজীবন ধরে একটা চিঠি লিখতে চেয়েছে, যার ঘর ভেঙে গেছে গত আশ্বিনের ঝড়ে, আর যে লেখক খানিক মিশিয়ে দিল নিজেকে তার ভিতর তাকে,আর সেই সে বালিকাকে যার খেলনাবাটি হারিয়ে গিয়েছিল কাল, আর সেই ডাকবাবুকে যার ছানিপড়া চোখে ছায়া ছায়া ঠিকানাপত্তর, আর সেইসব মানুষকে যারা নিজেদের বলত নারী, আর কোনো এক কানা খোঁড়া বৃদ্ধকে যাঁর ছিল ঈশ্বরপ্রতীম স্তব্ধতা... আর শ্যামলাল, কাঁপাকাঁপা হাতে, বাস বড় এঁকেবেঁকে চলে, লেখার চেষ্টা করছে তার সেই একটা শেষ চিঠি, শ্যামলীকে, না না, শ্যামলীকে নয়, শ্যামলী কেবল হরকরা, পৌঁছে দেবে খবর, যা বলার ছিল শ্যামলালের, যা শুনে যেতে পারেনি তার মা, আর শ্যামলাল লিখছে, লিখছে, লিখছে... কারণ, বাস থেমে গেলেই আর কেউ তাকে নিয়ে কবিতা লিখবে না।



একটি শিকারকাহিনি

মলয় নামের সাদা বেড়ালটিকে যখন বসে থাকতে প্রথম দ্যাখে অনিমেষতখন সে ছিল একটা অটোতে।

এখানে এসে প্রথমবারের মতো গল্পটা একটা লাল ঘরে ঢুকে যায়। লাল ঘরের আলো ছিল নরম লালআসলে লাল ঘরটা ছিল গোলাপের দুই পাঁপড়ির ভিতর গভীরে কোন এক বিন্দুতে আলম্বিত। সেই লাল ঘরের মেঝেও হওয়া উচিৎ লালকিন্তু অনিমেষ লাল মেঝের ঘর শেষ দেখেছিল তার মামাবাড়িতেদোতলার পুব দিকের ঘরটায়। সেই লাল ঘরেই মামা মামির ফুলশয্যে হয়অনিমেষ তখন বছর বারোর। মামির ছেলে মেয়ে হয়নিমামি ছিল ভীষণ মোটামামি দুপুরবেলা একা একা ভুল বকতে বকতে কখনো পড়ে যেত সেই লাল ঘরের মেঝে ফুঁড়েগোলাপের দুই পাঁপড়ির মাঝের ঘরটায় এসে পড়তোতার পর আরো আরো গভীরেঠান্ডা বেরঙ অন্ধকারে ভেসে পড়তোযেন নীচ থেকে লক্ষ লক্ষ হাত মামিকে ম্যাজিক করে হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখছেম্যাজিশিয়ানদের হাত অল্প অল্প নড়ছেভীষণ লাল একটা কিছু ঢেউয়ের মতো লকলক করছে চারদিকে ঘিরে। মামা রাতে অফিস থেকে ফিরে মামিকে খুঁজে পেত নাচিলছাদে গিয়ে খিদে পেটে ঘুমিয়ে পড়তো। মামির পোষা দুটো বেড়াল ছিলযাদের একটা ছিল সাদার মধ্যে বাদামী ছোপছোপ। সেটা ছিল খুব রোগামানুষ হলে নিমাই বলে আওয়াজ খেতো এমন রোগাসেটা একগাদা বাচ্চা দিয়েছিল একবার। সেসব বেড়ালদের মধ্যে কারো নাম মলয় ছিল না বলেই অনিমেষের ধারণা।


এখানে এটুকু বলে নেওয়া প্রয়োজনমলয়ই যে বেড়ালটির একমাত্র নামগাড়ির নীচে ওভাবে অন্ধকারে বসে থাকা সাদা বেড়ালটির যে এক এবং একমাত্র মলয় নামেই অস্তিত্বএটা অনিমেষ জেনেছিল আপনাআপনি। যে মুহূর্তে বেড়ালটিকে সে দেখেছিলচারপাশে অনেক ধুলো আর খানিক শীতলতার মধ্যেথেমে থাকা একটা গাড়ির নীচে বর্ণহীন অন্ধকারে বসেছেকিংবা বেড়ালের সেই ভঙ্গিকে বসা নাম দিয়ে হেসেছিল অনিমেষতখনই তার ভিতরে অম্বলের মতো টকস্বাদ জন্মেছিল। অনিমেষ বোঝেনিসমস্ত স্বয়ং জানার স্বাদই অমন টক হয়। তারপর যে কয়েক পল হৃদয়ে টকস্বাদ নিয়ে অটোয় বসেছিল অনিমেষতার মনে হচ্ছিল মলয় নামের সাদা বেড়ালটির অমন যে বসার ভঙ্গিসামনের দুটি পা মাটির সাথে সাড়ে সাতাশি ডিগ্রি কোণ করে রাখাসে ভঙ্গিতে খানিক আক্রমণ আছে। এরপরেই অনিমেষের মাথায় ধাঁধা লেগে যায়সে বুঝতে পারেনা আক্রমণ কিংবা উদাসীনতাকোনটা আসলে বেশি আতঙ্কের।

রাস্তার ধারে সন্ধ্যেবেলা অমন এক সাদা বেড়ালের বসে থাকায় কীই বা আশ্চর্য থাকতে পারেকিংবা কী কারণে অনিমেষ রাস্তায় দেখেছিল আরো দুটো কুচকুচে কালো কুকুরযারাও খানিক একই ভঙ্গিতে অনিমেষের দিকে চেয়েছিলএকথা অনিমেষ ভেবে পায়নি। মলয় নামের সাদা বেড়ালটির সঙ্গে তার চোখাচোখি হয়েছিল কিনা একথাও সে জানে নাকিন্তু সে এও জানে নামলয়ের চোখ ছিল বর্ণহীন অন্ধকারের মতো। এমত অন্ধকারে আজকাল অনিমেষ উৎফুল্ল হয়আজকাল সূর্যের আলো চোখে পড়লে তার হাঁচি হয়এবং অনিমেষ জানে না মলয় নামের সাদা বেড়ালটি তাকে আজকেই প্রথম দ্যাখেনি।

এপ্রসঙ্গে বলে রাখা ভালআমরা অনিমেষকে মাঝেমাঝে হারু বলে ডাকব। হারু এবং অনিমেষ একই ব্যক্তিকিংবা তাদের মধ্যে এক অর্ধভেদ্য পর্দা রয়েছে। পর্দা নিয়ে কিছু কথা বলার আগে অনিমেষের বাড়ি ফেরার কথা আরো একটু জানাতে হয়। অনিমেষ জানে না সে কোত্থেকে ফিরছে। এটি একটি মিথ্যে কথা হতে পারতোকিন্তু মলয় নামের সাদা বেড়ালটিকে দ্যাখার পর অনিমেষ ভুলে গিয়েছে তার যাত্রাপথগন্তব্যভুলে গিয়েছে তার যাবতীয় উৎস এবং শুঁড়িখানা। পৃথিবীর যাবতীয় বেড়ালের প্রতিই খানিক উদাসীনতা নিয়ে এতদিন তাকিয়েছে অনিমেষ। অথচমলয় নামের সাদা বেড়ালটি বহুদিন তার সঙ্গে ছিলখেয়াল করেনি সে। অনিমেষের মনে পড়েযতবার ট্রেনে চেপে কোথাও যায় সেভীষণ ভিড়ে তার যেন হঠাৎ মনে হয় নিমেষে সমস্ত ট্রেন ফাঁকা হয়ে যাক। ফাঁকা ট্রেনের ছবি কল্পনা করতে গিয়ে অনিমেষ বারবার দেখেছে মলয়কেঠিক তার উল্টোদিকের সিটে বসে আছেকিন্তু এখন সেই দ্যাখা মনে করতে পারছে না অনিমেষ। অনিমেষ জানেতার কোনো বক্তব্য নেইসে জানে না চাষবাস এবং ভেলা নিয়ে একা ভেসে পড়ার সাহস তার নেইতার পকেটে তেত্রিশ টাকা রয়েছে আর রাত তিনটের সময়ে তার ইচ্ছে হয়েছে কখনো কখনো ঘর থেকে বেরিয়ে হেঁটে যেতে। অথচসেই যে অর্ধভেদ্য পর্দাঅনিমেষ কখনোই সে পর্দা ঠেলে হারুর কাছে যেতে পারে না। অনিমেষের তাই কেবল ভুলে যাওয়া আছেআছে কেবল মলয় নামক সাদা বেড়ালটিকে দেখবার সেই মুহূর্তটুকুযখন তার প্রথমবারের মতো নিজেকে খানিক সাকার মনে হয়।

অনিমেষের আপাতত কোনো সমস্যা নেই জীবনে। অনিমেষ জানে জল কীভাবে বৃষ্টিচক্রের মধ্য দিয়ে আবর্তিত হয়এবং অনিমেষ এও জানে দিনের বেলা মশা কামড়ালে ডেঙ্গু হয়। এসব কোনোদিন অনিমেষ তলিয়ে দেখতে যায়নি। সে চিরকাল থেকেছে খুব শান্তকেবল ভেবেছে কীভাবে রাতে বাড়ি ফিরে ঘুমোবে। অনিমেষ কেবল উদ্বিগ্ন হয়েছে বিছানায় ছারপোকা হলেকিন্তু সেটুকু কেবল উদ্বেগই। সহাবস্থান শিখে নিয়েছে অনিমেষযেভাবে সে দেখেছে মলয় নামের সাদা বেড়ালটি তার সাথেই ফিরেছে ঘরেদরজা ঠেলে ঢুকেছে আর গুটিসুটি মেরে শুয়েছে অনিমেষের চৌকিতেযে পরিচিতির ভরসায় মৃতদেহ শ্মশানে ঢোকেঅনিমেষ ভেবেছে রাতের দিকে হয়তো মলয় ঘুমন্ত অনিমেষের টুঁটি কামড়ে ধরবেকিন্তু অনিমেষের কোনো উদ্বেগ হয়নিসে শুয়ে পড়েছে। তার মনে এসেছে সেই গলির কথাযেটা দিয়ে রোজ সকালে তার পথ তৈরি হয়সে গলিতে চ্যাটার্জী'স লেখা বাগানওয়ালা গাড়িওয়ালা প্রচুর রোদ্দুরসমৃদ্ধ বাড়িটার কথা ভেবেছে সে শুয়ে। এখানেই আমরা ভুল করে ভেবে নিতে পারিঅনিমেষ অমন বাড়িতে থাকতে চায়। কিন্তু আসলে অনিমেষ তার ছোট্ট ঘরের বাইরে আর কোথাও থাকার কথা ভাবতে পারে নাএমনকি ঘরের বাইরে বাকি বাড়িটাও তার কাছে খানিক মাত্রাহীন বিন্দুর মতোএক মুহূর্তে সেটুকু অতিক্রম করে অনিমেষ কেবল ফিরে আসে ঘরেমলয় নামের সাদা বেড়ালটিকে খানিক আদর করা উচিৎ কিনা ভাবেযেভাবে সে মামিকে দেখেছে বেড়ালদের আদর করতে। অবশ্য আদর শব্দে অনিমেষের আপত্তি আছেআজ অবধি অনিমেষ কাউকে আদর করেনিকাউকে আদররত অবস্থায় নিজেকে কল্পনা করতে পারে না সে। মাছ খায় না অনিমেষঅতএব মলয় নামক বেড়ালটির সাথে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা কিংবা সখ্যে যাওয়ার কথা ভাবতে ইচ্ছে করেনি তার।

সুতরাংএও স্পষ্টখাওয়া ব্যতীত অন্য কোনো প্রশ্নে কারো সাথে সখ্য কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বিতার কথা ভাবেও না অনিমেষ। তবুওসবটা কি আর এড়ানো যায়! যে গলি দিয়ে রোজ সকালে তাকে যেতে হয়তাতে দুটো বাম্পার আছে পরপর। এই যে রোজ দ্বিতীয় বাম্পারে পৌঁছে সে সিগারেটে পঞ্চম টানটি দেয়এতে কি সেই দ্বিতীয় বাম্পারের সঙ্গে তার কোনো সখ্য স্থাপিত হয়নি! এটুকু ছুটকোছাটকা যোগাযোগ বাদ দিলেমলয় নামক সাদা বেড়ালটি ছাড়া অনিমেষ আর কিছু নিয়ে এতক্ষণ ভাবেনি। এমনকি নিজেকেও অনিমেষ কোনো চালাকজাতীয় পদার্থ হিসেবে ভাবেনিকিংবা করুণা করে বলেনি আজ তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়ো। খাওয়া এবং ঘুম নিয়ে অনিমেষের কোনোদিন কোনো সমস্যা ছিল না। দোকানে গিয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে কেবল খানিক বিরক্ত হয়েছে অনিমেষতার মনে হয়েছে দুনিয়াটা খানিক ফাঁকা হলে আরো ভাল হত। অবশ্যফাঁকা দুনিয়া নিয়ে সে কী করবেএ প্রশ্ন করলে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকবে অনিমেষ।

পশুপাখি নিয়ে অনিমেষ যেভাবে ভেবেছেসেভাবে আর কোনোকিছু নিয়ে নয়। যে লাল ঘরে অনিমেষ এযাবৎ বাসা করে আছেসেখানে এককালে বৃষ্টি হলেই দুটি ভিজে কুকুর আস্তানা চাইতো এবং অনিমেষ একদিন দেখেছিল একটি সাপ ভেসে বেড়াচ্ছে তার খাটের নীচে থইথই জলে। সাপটিকে মেরে ফেলার কথা ভেবেছে অনিমেষকিন্তু তার মামি সাপ পছন্দ করতো বলেই অনিমেষের বিশ্বাস। সুতরাংমামির কথা ভেবেই সাপ মারেনি অনিমেষভেবেছে মামির ঘরে এত জায়গায় কোথায় হারিয়ে যাবে সেই সাপ! অথচমলয় নামের সাদা বেড়ালটি ঘরে এসেই জাগিয়ে তুলেছে সাপটিকেশীতঘুম পার করা প্রবল ক্ষিধে নিয়ে সাপটি ধীরে ধীরে উঠে আসবে অনিমেষের বিছানায়। অনিমেষ হারুকে ডাকেহারু খুব ভাল সাপ ধরতে পারে। হারু যখন চানের পরে চুল আঁচড়ায়চিরুনির মোটা দিকটা দিয়ে জট পড়া ভিজে চুল উলটে দেয়সাপের বাঁশির মতো শব্দ হয়। অনিমেষ চেষ্টা করেছে সেই শব্দ না শোনারকারণ সেই অর্ধভেদ্য পর্দা পেরিয়ে শব্দ যাতায়াত করবার কথা ছিল না। অথচহারামজাদা শব্দ ঠিক ঢুকে পড়ে লাল ঘরেযেখানে মামি এসে থুতনি নামিয়ে বসেছিলমামি চোখ তুলে শোনে শব্দসাপের মতো অল্প অল্প দোলে বলেই অনিমেষের মনে হয়। অনিমেষের কখনও কখনও সন্দেহ হয়সমস্ত শব্দ এবং সুর আস্তে আস্তে মানুষকে সাপ বানিয়ে ফেলছে। এ বিশ্বাস নিয়েই সে ঘুমিয়ে পড়েছিলকারণ সে জানতো কিছুদিন যাবৎ তার জিভ চিরে আসছেসাপ হয়ে না গেলেও অন্তত বিষদাঁতে সে পৌঁছে যাবেইএবং তখন যতই সাপ মাঝরাতে তার চাদরের নীচে ঢুকে আসুকতার ঘুম ভাঙবে না অস্বস্তি কিংবা আতঙ্কে। মলয় নামক সাদা বিড়ালটি যেহেতু কোনো বেজি নয়কিংবা বেজির রূপ ধরতে পারে এমত কল্পনা অনিমেষ করেনিতাই সে ঘুমিয়েছিল সেই রাত্রে।

অনিমেষের মনে পড়েআজ পর্যন্ত তেইশ লক্ষ তিপান্ন হাজার সাতশো বিয়াল্লিশটি মশা সে মারবার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। অবশ্যপ্রথমবারের চেষ্টায় ব্যর্থ হওয়ার পর আবার চেষ্টা করে করে সে যেসব মশাদের মেরেছেতাদের কথা এই হিসেবে ধরবে কিনা একথা অনিমেষ ভেবে পায় না। খেয়াল করলে দেখা যায়মশাদের সাথেও গুনগুনানির সম্পর্ক রয়েছে। কেবল মলয় নামের সাদা বেড়ালটি কখনও সুরের কথা ইঙ্গিত করেছিল কিনাএতক্ষণে অনিমেষ আর তা মনে করতে পারেনি। যে মশারা তার উদ্যত চাপড় এড়িয়ে গেছেতারা যে কোনোদিন তার উপর প্রতিশোধ নেবেএকথা অনিমেষ ভাবতে পারেনা। এরকম কেবল গল্পেই হয়যাবতীয় হত্যা এসে টুঁটি চেপে ধরেসেকথা অনিমেষ জানে। অথচএতদূর কৈফিয়ত নিজেকে দেওয়ার কী প্রয়োজনমলয় নামের সাদা বেড়ালটির কাছেই তা জিগ্যেস করে ফেলেছিল অনিমেষ। বেড়ালটি তখন হাই তুলেছিল এবং ডান পা তুলে কান চুলকেছিলঅনিমেষ আর কিছু দেখেনি।

মাঝরাতে ঘুমের মধ্যে অনিমেষের যখন মাথা ধরেসে কি আদৌ বুঝতে পারে সে আসলে ঘুমোয়নিকেবল চোখ খুলে অপেক্ষা করেছে কখন মলয় নামের সাদা বেড়ালটি তার চোখে তাকাবে! অথচ বেড়ালটি স্মিতমুখে তাকিয়ে আছে তার দিকেইঅন্ধকারে অনিমেষ আন্দাজ করে তার সাদা রঙের গাঢ়তা পাল্টাচ্ছে। বেড়ালটির চোখ জ্বলার কথা অন্ধকারে। অনিমেষ ভাবেতাহলে কি যথেষ্ট অন্ধকার সে সৃজন করতে পারেনি তার ঘরেঅনিমেষ এবং হারু চিরকাল গর্ব করেছেঅন্ধকারে তাদের লাল ঘর বেশি উজ্জ্বল হয়। অথচসকাল হল যখনঅনিমেষ দেখলবাইরের আলো ক্রমশ উজ্জ্বল হচ্ছেলাল রঙ ক্রমশ তীব্র হচ্ছে তাদের ঘরেআর সাদা মলয়ের লোম ক্রমশ হলুদ আর আলোবিচ্ছুরণকারী হয়ে উঠছে। অনিমেষ সিদ্ধান্ত নেয়এত রোদে বাইরে বেরোনো যাবে না।

সুতরাংযে গতিতে সকাল হলোঅনিমেষ খানিক হাঁপিয়ে গিয়েছে সে গতির সাথে তাল রাখতে। অবশ্যতাল রাখতেই হবে এমন মাথার দিব্যি কেউ দেয়নি। কিন্তুতাল রাখার চেষ্টা করার অভ্যাস অনিমেষের মজ্জাগতযেমন এই হাঁপিয়ে যাওয়া এবং ক্রমশ পিছিয়ে পড়তে পড়তে দ্যাখারেসের প্রথম লোকটা শেষতম প্রতিযোগী অনিমেষকে বারবার পেরিয়ে চলে যাচ্ছেএই লালঘরে সেসব কিছু তো নেই। লালঘরে অনিমেষ যদি থাকতে পারতো সবসময়যদি তার সেঘরে ঢোকা-বেরোনো নির্ধারিত হতো কেবল তারই ইচ্ছেয়তাহলে অনিমেষ নিঃসন্দেহে মামিকে থাকতে দিতো তার এই লাল ঘরে। মামির সাথে তার কোনো সখ্যই গড়ে ওঠেনিযেভাবে গড়ে ওঠেনি হারুর সাথেএই দুই গড়ে না ওঠাকে অনিমেষ এক শ্রেণিতে ফেলতে চায়। মলয় নামের সাদা বেড়ালটিকে যে হত্যা করতেই হবেনয়তো ঘরে অন্ধকার আসবে না তেমনএকথা অনিমেষ হঠাৎ বুঝতে পারে এবং আহ্লাদিত হয়যেন এই সমাধানই সে চেয়েছে এতক্ষণ।

অতঃপর অনিমেষ জেগে জেগেই একটি স্বপ্ন দেখছিল। সে দেখছিল, (স্বপ্ন প্রসঙ্গে 'দ্যাখাশব্দের প্রয়োগে অনিমেষ নিজেকে দীন ভাবে) কোনো এক কুয়াশাঘেরা সকালে শহরের পথে পথে কোনো গাড়ি নেইকেবল মানুষ আর তাদের নিজস্ব মলয় নামের সাদা বেড়ালরা হাঁটছেকিংবা হাঁটছে কেবল মানুষেরা আর বেড়ালরা বসে আছেযাবতীয় চলমানতাকে কাঁচকলা দেখিয়ে অনিমেষ দেখেছিল একটি শহর কেমন ক্রমশ চলবার ভ্রমে আক্রান্ত হচ্ছেআর এক এক করে মানুষ উবে যাচ্ছে। মলয় নামের সাদা বেড়ালরা তখনো নিশ্চলযেন কোনো মন্ত্র পড়ে কিংবা তুকতাক করে মানুষদের ফিরিয়ে আনতে তারা সক্ষমঅথচ সেসবে তাদের প্রবৃত্তি নেই। অনিমেষ তখন ছুরি খুঁজতে যায়হারু যে দীর্ঘদিন ছুরি চালানো প্র্যাক্টিস করেছেআর ক্রমশ রক্তাক্ত হতে হতে অনিমেষ ভেবেছে বিছানায় ছারপোকার বাড় বেড়েছেএতসব ইতিহাস মুহূর্তে অভিনীত হয়। ছুরি নিয়ে মলয় নামক সাদা বেড়ালটির রগে বসিয়ে দেয় অনিমেষবেড়ালটি ক্রমশ লাল হতে থাকে আর ঘরের সমস্ত লাল রঙ শুষে নিতে থাকেএতকিছুর মধ্যেও অনিমেষ ভাবে ছেলেবেলায় পড়া শিকারকাহিনি আর পায় না কেন বাজারে। ঘর ক্রমশ অন্ধকার হলে অনিমেষ ঘুমিয়ে পড়েমলয় তখন লাল ও উজ্জ্বল দেহ নিয়ে ক্রমশ আবছা হয়ে আসেঅনিমেষের বিছানার চাদরে ছাপা একরৈখিক বেড়ালের ছবি দেখে মুচকি হাসে মলয়।

অনিমেষ যখন জেগে উঠলোতার ভীষণ রাগ হয় চারপাশের উপরকারণ চারপাশ ছিল বর্ণহীন। অনিমেষ তখন হত্যার সাধনায় বসেকারণ কেবল হত্যাই রঙ ফিরিয়ে দিতে পারে সহজে। কিন্তুমলয় নামক বেড়ালটি মৃত্যুমুহূর্তে কিছু অভিশাপ দিয়ে গিয়েছিল অনিমেষকে। অনিমেষ ক্রমশ জানতে পারেসে চাওয়ামাত্র যে কাউকে হত্যা করতে পারবেকেবল ইচ্ছেটুকুর জোরে। নিজের ভিতরে টক স্বাদ অনুভব করে অনিমেষ।  



কল্কিকথা
প্রথম প্রথম সারাদিন একটা ঘরে নিজেকে আটকে রেখেছে অনিমেষ। আশ্চর্য হয়ে সে অনুভব করেছে, ক্রমশ খিদের ভাব চলে যাচ্ছে তার, চলে যাচ্ছে ঘুম। এমনকি আগুনে তার হাত পুড়ছে না, খোলা তারে হাত দিলে ঝটকা খাচ্ছে না। তার কুঁচকিতে যে প্রচুর চুলকানির দাগড়া দাগড়া ছোপ ছিল, রক্ত গড়াতো আর ইস্কুলে সাদা প্যান্টে সেই দাগ দেখে হেসেছিল আর চাঁটি মেরেছিল ক্লাস ফাইভের কিছু নিষ্পাপ শিশু, সেসব চুলকে আর তার আরাম হয় না। ঘড়ি ধরে একবার দম আটকে রেখেছিল, তিনশো ছাপান্ন ঘন্টা বাহান্ন মিনিট উনতিরিশ সেকেন্ড পর একঘেয়ে লাগায় বিরক্ত হয়ে দম নিতে শুরু করে আবার। এসবের মধ্যে কাজের কথা একটাই, ঘুম না হলেও ঘুম তার পাচ্ছিলই, পেয়েই চলেছিল। যাবতীয় সময় তার কেবল ঘুম পেতে থেকেছে, কিংবা এই গোটাটা, এই যাবতীয় ঘর-ঘুম-আগুন-নিঃশ্বাস সবই এক ঘুমের মধ্যে ভাবতে থাকা যে এবারেরটা অন্তত স্বপ্ন নয়, এইতো যা হচ্ছে সত্যিই হচ্ছে, এরকমই তো হয়...
কেবল এই ঘুম পাওয়ার বিরক্তিতেই বাইরে এসেছিল অনিমেষ। সময়ের হিসেব ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে, তার কেবল মনে পড়ে নিজেকে সে শুয়ে থাকতে দেখেছে, প্রবল ঘুমে চোখ বুজে আসতে দেখেছে, অথচ ঘুমোতে দেখেনি। এখানেই মনে পড়ে, সে যেন কীভাবে নিজেকে দেখে চলেছে, যেন একটু দূরে দাঁড়িয়ে, ছোলাভাজা চিবোতে চিবোতে তার মনে হচ্ছে নিজেকে দেখে গাড়ল ও প্রতিভাবান, নিজেকে শুয়োরের বাচ্চা বলে সে গাল দিচ্ছে এবং ভাবছে এই শটটা খানিক অল্প চিপ করে মারতে হতো, কিংবা গাল দেওয়াও আসলে তার ভান, তার আদতে কিছুই যায় আসে না। সুতরাং প্রবল ঘুমের তাড়নায় অনিমেষ মনে করতে পারেনি, সে কীভাবে ভাসতে শিখেছিল বাতাসে, মনে করবার কথাই মনে পড়েনি তার। কেবল বাইরে এসে অনিমেষের মনে হয়েছিল, খানিক সর্ষের তেল পেলে চোখে ডলে দেখতে পারে সে, যদি ঘুম পাওয়া থেমে যায়।
সুতরাং সেসময়ে সারা পৃথিবীর কাজ চলেছিল একেবারেই নিজের নিজের তালে, যা যা চলা থামিয়েছিল সেও কেবল তখন তাদের থামার কথা ছিল বলেই। এককথায়, সবই পূর্বনির্ধারিত বলে অনিমেষ ভেবেছিল, এবং তার ভাবনা দিয়েই এরপর থেকে সব প্যাঁচ খেলা হবে। অনিমেষ ঘুমচোখে চলে গিয়েছিল বাসস্ট্যান্ডে, আর বাসে উঠে খেয়াল করেছিল এখানে সর্ষের তেল পাওয়া যায় না এবং এখানে বড় ভিড়। 'ঘুম পাচ্ছে', একঘেয়ে গলায় সে বলেছিল। কেউ তার কথা শোনেনি, বরং পাশের মেয়েটি তার দিকে কড়া চোখে তাকিয়েছিল, ঢুলন্ত অনিমেষ তার গায়ে ঢলে পড়েছিল বলে। ঠিক সেইমুহূর্তে অনিমেষ প্রথম রাগতে দ্যাখে নিজেকে। এমনিতেই তার মনে হতো এতদিন ধরে, রাস্তায় যে কোনো পাঁচজন মানুষকে চড় মারলে ষষ্ঠজন তোমায় যেচে এসে পাঁচটাকা দিয়ে যাবে, এভাবে কত রাত সে কেবল ব্যথার হাতে বোরোলিন লাগিয়ে কাটিয়েছে, আর সেসব রাগ তার মাথায় চড়ে গেল মেয়েটিকে কড়া চোখে তাকাতে দেখে। অনিমেষ ভীষণ জোরে চকাস শব্দে মেয়েটির ঠোঁটে চুমু খায়, দুহাতে মেয়েটির মাথা চেপে ধরে, এবং আরেকটি চুমু খাওয়ার আগে যখন মেয়েটি মোচড়ামুচড়ি করছে আর বাসের লোকেরা চকিত হয়ে মজা দেখছে, অনিমেষ বলে, এক্ষুণি চাইলে দুচোখে আঙুল ঢুকিয়ে দিতাম, কিংবা ন্যাংটো করলে তো দেখব সেই এক বিচ্ছিরি দলা দলা মাংস, অতএব জামা পরিয়েই যে চুমু খাচ্ছি এতে খুশি হও মেয়ে। এখন, এতসব কথা অনিমেষ মুখে উচ্চারণ করেনি, বাসের মানুষ তাকে প্রচণ্ড হইহট্টগোলে ঢেকে ফেলছিল বলে তার বিরক্ত লাগতে শুরু করে, সে লহমায় দেখতে পায় ইঞ্জিনের উপর মলয় নামের সাদা বেড়ালটি, এবং অনিমেষ উচ্চারণ করে


এই বাসের সব লোক মরে যাক
এই যে এত ভিড়, এসবই তার কাছে অপ্রয়োজনীয় মনে হয়, এবং তার উচ্চারণমাত্রেই বাস থেকে সমস্ত লোক উবে গিয়ে আশ্চর্য শান্ত হয়ে আসে বাস। অনিমেষ সেই ফাঁকা বাসের পেছনের সিটে গিয়ে শুয়ে পড়ে, এবং এই এতদিনের দীর্ঘপ্রার্থিত ঘুম আসে তার।
অথচ, অনিমেষের মনে পড়বে ঘুম ভাঙলে, সে এরকম ছিল না। অবশ্য এরকম হয়ে যে তার কোনো আফসোস আছে তা নয়, তাও, যেমন কিছু জানা এড়ানো যায় না, তেমনই অনিমেষ এটাও জানবে। ছোটবেলায় তার বাড়ির দরজার পাশে কিছু বাঁশ আর লাঠি জমিয়ে রাখতে দেখেছে সে, দেখেছে কেমন পুরনো ঝুল তাদের গায়ে আর তাদের আড়াল থেকে কোনো কিম্ভূত পোকা বেরিয়ে আসবে, এমনই ভেবেছে সে ছোটবেলায়। তাকে জানতে হয়, এসব বাঁশ আর লাঠি এখানে এনে রেখেছিল তার বাবা, ১৯৯২ সালে, যখন তাদের পাড়ায় শোনা গিয়েছিল কলাবাগানের দিকে মোল্লারা অসময়ে আজান দিচ্ছে, আর কে যেন এসে বলেছিল, ওরা আসছে, তৈরি হও, মা বোনেদের ইজ্জত বাঁচাতে হলে ভাইসব... সেই থেকে অনিমেষ ভেবেছে, ওই লাঠি আর বাঁশেদের পেছনে, কোনোদিন যেখানে ঝাঁট পড়ে না, পোকাদের আস্ত একটা কলোনি আছে, অন্ধকার। ছোট থেকেই আরশোলার ডিম খুঁজে পেলে সেটা ফাটিয়ে মজা পেয়েছে অনিমেষ, আর তার পাতলা বাদামী খোলাটাকে প্রবল ঘেন্নায় গুঁড়ো করেছে। অথচ, এতসব সত্ত্বেও হত্যার পর মৃতদেহ সরাবার পদ্ধতি তার জানা ছিল না। যত খুন ধরা পড়ে, তা ধরা পড়ে আসলে মৃতদেহ লুকোবার অক্ষমতায়, হুমায়ুন আহমেদের কোন একটা গল্পে সে এরকম পড়েছিল --- মনে পড়বে তার। সুতরাং, তার বকেয়া আছে এখনো অব্ধি তেইশ লক্ষ তিপান্ন হাজার সাতশো বিয়াল্লিশটি হত্যা, কারণ ঠিক এতজনকেই তার কখনও না কখনও খুন করবার প্রবল ইচ্ছে হয়েছে, পারেনি কেবল মৃতদেহ লুকোতে শেখেনি বলে। নয়তো, কেবল নাকে ঘুষি মেরেই সে কিছু লোককে মেরে ফেলতো, আর প্রচুর লোকের আঙুল কামড়ে ছিঁড়ে নিতে পারতো।
অথচ, এক বাস মানুষের হত্যার বিনিময়ে পাওয়া যে ঘুম, যে ঘুমে অনিমেষ বারবার দেখেছিল মলয় নামের সাদা বেড়ালটি তার মাথার কাছে বসে আছে, থাবা চাটছে জিভ দিয়ে, সেই ঘুম তার টিকলো না। ঘুম ভেঙে যাওয়া মাত্র অনিমেষ দ্যাখে কোনো এক স্যাঁতস্যাঁতে অন্ধকার জায়গায় বাসটা ভাসছে, এবং সে আন্দাজে বোঝে ব্যাপারটা ঘটছে জলের তলায়। এখন, জলে থাকার জন্যই তার ঘুম ভাঙল কিনা, কিংবা বাসটির ড্রাইভারসুদ্ধু মরে যাওয়ায় ব্রীজ ভেঙে জলে পড়েছে কিনা বাস, এতসব অনিমেষ ভাবেইনি। সে কেবল ভেবেছে তার ঘুম ভাঙার কারণ কী হতে পারে, এবং ভেবে ভেবে যা আবিষ্কার করেছে তা এইরূপ:
যে ঘুম আমার সবসময়ে পায় তা আমাতে নিয়ে আসবার একমাত্র পথ হত্যা, কারণ হত্যাই আমায় ঘুমছাড়া করেছে এবং হত্যাই আমায় ঘুমগ্রস্ত করে রেখেছে সর্বক্ষণ, অতএব আমায় হত্যার বিনিময়ে ঘুমে পৌঁছতে হবে, আর লাশ সরাবার কিংবা গুলি খাওয়ার কিংবা ফাঁসি যাওয়ার ভয় নেই যখন, তখন খানিক ঘুমের জন্য কিছু হত্যা করে ফেলা এমন কিছু খারাপ নয়, বিশেষত প্রাণসৃষ্টির আদিমতম উপাদানগুলির মধ্যে হত্যা স্বয়ং আছে, আর হত্যার মাধ্যমেই সমস্ত তর্কের অবসান ঘটানো সম্ভব, সমস্ত দ্বন্দ্বের শেষে হত্যা, সুন্দর অসুন্দর লাল সাদা কালো মোটা সবই মিলিয়ে যায় হত্যায়, বিশেষত কোনো লাশ যখন আমার হত্যায় পড়ে থাকে না, আমি লাশসুদ্ধ অদৃশ্য করে দিই হত্যার সাথেই, অতএব যা পড়ে থাকে তা এক অপরিসীম শূন্যতার দিকে নির্দেশ করে, যে শূন্যতায় পৌঁছতে পারলে এক অনন্ত ঘুমে আমি অধিকার পাবো, অতএব এ জগতকে শূন্য করে, কীট পশু পাখি গাছ নারী পুরুষ শিশু বুড়ো বুড়ি সবসুদ্ধ হত্যা আর অদৃশ্য করে আমি খানিক ঘুম পেতে চাই, যে ঘুম ভেঙে উঠে আসবার কোনো কারণ আর থাকবে না

মলয় নামের সাদা বেড়ালটি যা যা জানিয়ে দিয়েছিল অনিমেষকে:

হত্যা করতে হবে কোনো রাগ থেকে, বিরক্তি থেকে, ভয় থেকে, যদিও ভয় অনিমেষের পাওয়ার মতো আর বাকি নেই।

অনিমেষ একমাত্র মলয় নামের সাদা বেড়ালটিকে ভয় পায়, কারণ ওকে অদৃশ্য করে দেওয়া চলে না, একবার মৃত ও অদৃশ্য যখন আবার ফিরে আসে, তাকে পুনরায় হত্যা করতে অনিমেষের বিবেকে বাঁধে। এপ্রসঙ্গে অনিমেষ জানে না, তাকে খুঁজছে তাবড় রাষ্ট্রনেতারা , কারণ তারা সবাই তাকে হত্যা করতে চায়, কারণ তারা জানে অনিমেষ চাইলে যাবতীয় যুদ্ধ শেষ করে দিতে পারে লহমায়। এদিকে মলয় নামের সাদা বেড়ালরা যখনই আসে, তারা যে মৃত্যুর পরেরই অবস্থা, এমনকি প্রথম দেখা হওয়ার সময়েও মলয় নামের সাদা বেড়ালটি মৃত্যু থেকে ফিরে এসেছিল --- একথা জেনে অনিমেষ বিশেষভাবে ভয় পায়। আর রাষ্ট্রনেতারা অনিমেষের উপর হামলা করতে থাকে, আর অনিমেষের গায়ে গুলি লাগে না বোম লাগে না ছুরি ঢোকে না বিষ হজমিত হয় তার ভিতরে
অগত্যা ঘুম পাওয়া চোখে অনিমেষ খুঁজতে শুরু করে তার রাগের কারণসমূহ। প্রাইমারি ইসকুলের স্যার বিকাশবাবু একদিন তাকে উদমা ক্যাল দ্যান, কারণ দেওয়ালে আচড় কেটে আঁকাবাঁকা অক্ষরে লেখা "আন্টির ছেলে বোকাচোদা" সে জোরে জোরে পড়েছিল ক্লাসে। গতকাল বিকাশবাবুর বাড়ি গিয়ে অনিমেষ বলে এক গ্লাস জল খাবো, তারপর বিনা ভূমিকার জানায়, দেওয়ালে আসলে অতিরিক্ত বাঁকাচোরা অক্ষরে ও ভুল বানানে খানকির ছেলে লেখা ছিল, (খিস্তির বানান ভুল ধরতে কাউকে দেখিনি আমি) সে তার ক্লাস ওয়ানের অর্জিত বিদ্যায় যা বুঝতে পারেনি। তারপর বিকাশবাবুর নাম  করে সে মুঠি পাকায়

মৃত্যু হোক শালা, ক্যালাবি আমায়!
যেমন এর মধ্যে একদিন অনিমেষ গিয়েছিল পাহাড়ে, ওর আজকাল সূর্যাস্তে বেশ ভাল লাগে, রাগটা যেন খানিক বেশি হয়, সেই রাগের হত্যায় বড় আরাম। অথচ, সূর্যাস্তের সঙ্গে হত্যার কী সম্পর্ক তা নিয়ে অনিমেষ ভাবেনি, সে কেবল সন্ধ্যে নেমে আসাকে পছন্দ করতো না, তার মনে হতো সন্ধ্যে নেমে আসা মানা ঘুমের সময় হয়েছে এটা জানিয়ে দিচ্ছে কেউ, যে জানে অনিমেষের কেবল ঘুম পায়, আর ঘুমোতে গেলে তাকে হত্যা করতে হয়। পাহাড়ে সে কিছু মানুষকে খাদে ফেলেছিল, নিজেও ঝাঁপ দিয়েছিল তাদের সাথে, ক্রমাগত পাথরে ঠোক্কর খেতে খেতে মানুষগুলি যখন মাংসপিণ্ড হয়ে যেত কিংবা ময়দার লেচি, তখন অনিমেষ পাহাড় বেয়ে পড়তো যেন পার্কের স্লিপ চড়ছে, আর বাচ্চাবেলায় বিকেলের খেলার পর বাড়ি ফিরলে যেমন দেখতো মা ময়দা মাখছে তেমন হয়েছে মানুষদের চেহারা, অনিমেষ পাহাড়ের নীচে ঘুমিয়ে নিত টানা কয়েক সন্ধ্যে, আর মনে ভাবতো ছোটবেলায় সিনেমায় দ্যাখা একটা গান :
ময়দা এখন যদি হতে জলখাবারে লুচি পেতাম
পাহাড়ের ঢালে, ভীষণ শীতে আর কুয়াশায়, যে শীতলতা তার কাছে আরাম, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে লুচির স্বপ্ন দ্যাখা তারপর তার অভ্যাস হয়ে যায়
অনিমেষের রাগ হয় অতঃপর চারপাশের কিছু জীবজন্তুর ওপর। প্রথমেই সে তার বাড়ির সামনের ঝাঁকড়া অশ্বত্থাগাছটা হাপিস করে দেয়। এমনিতে মানুষ মারার চাইতে গাছ মারায় ঝক্কি বেশি, কিন্তু অনিমেষের দীর্ঘ রাগ ছিল গাছটির প্রতি, যে সময়ে সে রোজ অফিস থেকে ফিরতো আর গাহচের তলাটা পাখির হাগায় সাদা হয়ে আছে দেখতে পেত, আর দেখত তার কার্নিশে অশ্বত্থচারা গজাচ্ছে, তার বাড়ির পাঁচিল বাকিয়ে করতে হয়েছে বাড়ি তৈরির সময়ে, আর অনিমেষ যেহেতু গাছ কিংবা পাখিকে নিয়ে কাব্য কিংবা শোক দেখায়নি কখনও, কাজেই সেসব তামাদি হওয়া রাগ থেকে সে গাছটিকে উধাও করে দেয়, আর গাছ নিঃশব্দে উধাও হলেও তার হাজার হাজার পাখি আর কাঠবিড়ালি চেঁচাতে থাকে আর ঝটপট করতে থাকে উড়তে থাকে। সশব্দ হত্যায় ঘুমের ব্যাঘাত হতে পারে ভেবে অনিমেষ পাখি আর কাঠবিড়ালীদের উধাও করে দেয়, আর গভীর ঘুমে থাকাকালীন পাড়ার কত মানুষ তাকে অভিনন্দন জানাতে এসেছিল হতচ্ছাড়া গাছটা উধাও করা গেছে বলে, পাড়ার যাবতীয় বেদী গাছটা ফাটিয়ে দিয়েছে বলে, অনিমেষ সেসব অভিনন্দন গ্রহণ করতে পারেনি ঘুমের ভেতর।
অথচ চারপাশের মানুষ অনিমেষকে নিয়ে ভয় পায়নি, কারণ হত্যার বীভৎসতা অনিমেষের ধাতে নেই। মরা কী সহজ আর উৎফুল্লতায় স্বাদু, সেকথা আমাদের বুঝতে বড় দেরি হয়ে গেছে। অনিমেষের কাছে তেমন তেমন শনি মঙ্গলবারে, পনেরোই আগস্ট কিংবা বাইশে শ্রাবণে মরার লাইন পড়তো কতো! কতো দূর দূর থেকে মানুষ এসেছে, যারা সীমান্তে যুদ্ধে যেতে পারে না, সিয়াচেনে যাওয়ার পথে যারা বারবার ফিরে এসেছে মন কেমন করেছে বলে, তার লজ্জায় অনিমেষের কাছে মরতে আসে, আর চারপাশে সমাজে সংসারে বলে আসে দেশের জন্য প্রাণ দিতে চললাম। এমনিতে অনিমেষ দেশকে ভালবাসে, কিন্তু কানের কাছে দেশ দেশ বলে চ্যাঁচালে তার একদিন ঘুম ভেঙে গিয়েছিল আর সে বেরিয়ে এসে একসাথে যাবতীয় মুমূর্ষুকে মৃত্যু দিয়েছিল। আর একবার অনিমেষের মনে হয়েছিল সিনেমা হল আর রাস্তাঘাট আরো ফাঁকা হওয়া উচিৎ, এবং যারা সব ব্যাঙ্কের সামনে লাইন দিয়ে ঘামছিল আর যারা সিনেমা হলে উঠে দাঁড়িয়েছিল জাতীয় সংগীতকে শ্রদ্ধা জানাতে, অনিমেষ তাদের গায়ে দীর্ঘদিনের টক ঘেমো গন্ধ পেতে থাকে, এবং যাবতীয় ব্যাঙ্ক আর সিনেমা হল জনশূন্য করে সে একটি আঁতেল সিনেমা চালাতে আদেশ দেয় হলমালিককে, আর পেছনের সিটে ঘুমিয়ে পড়ে, আর এটা বলতে ভুলে গেছি যে ঘুমোলে ছোটবেলা থেকেই অনিমেষের নাল গড়ায়
ক্রমশ চালাক হতে থাকে অনিমেষ। একবার এতই রাগ হয়েছিল তার, পাড়ার একটি ল্যাম্পপোস্ট দেখে মনে হয়েছিল খানিক বাঁকানো, অথচ ল্যাম্পপোস্ট তো বাঁকানো থাকার কথা নয়, দুম দুম করে অনিমেষ প্রবল ঘুষি মারতে থাকে ল্যাম্পপোস্টের গায়ে, আর চিৎকার করে জানতে চায় কালোবাজারিদের ফাঁসির হিসেব। কালোবাজারিদের উপর রাগ ছিল না তার, এরকমই অনিমেষ জানে, কারণ কালোবাজারিদের কথা সে ভুলে গিয়েছিল, তাদের এসব ভুলে যাওয়া দেখেই মলয় নামের সাদা বেড়ালটি মিষ্টি হেসেছে। অনিমেষের হাতে ব্যথা হয় না, অতএব অনন্তকাল নীরব থাকার পর ল্যাম্পপোস্টটি পড়ে যায় ভেঙে, অনিমেষ তাকে অদৃশ্য করবার মন্ত্র আওড়ায়, অথচ অদৃশ্য হয় না সে। অনিমেষ মৃতকে হত্যা করবার মন্ত্র জানে না, জীবিত ছাড়া আর কিছুই সে হাপিস করতে পারে না। ফলে একটি ভাঙা ল্যাম্পপোস্ট রাস্তায় পড়ে থাকে, রোজ একটু একটু করে দৈর্ঘ্যে বাড়তে থাকে আর জড়িয়ে ফেলতে থাকে যাবতীয় বিচারালয় এবং চিড়িয়াখানা, ইস্কুল এবং আস্তাবল, থানা এবং ভাগাড়। সেই বেষ্টনীর চাপে প্রচুর মানুষ মারা যায়, অনিমেষ তাদের ততদিন অব্ধি সরায় না যতদিন না দুর্গন্ধে এসে জড়ো হয় যাবতীয় চিল শকুন। আসে প্রাগৈতিহাসিক হাড়গিলে পাখি, অনিমেষ তাদের সাথে একমাত্র আত্মীয়তা অনুভব করে। কাজেই সেসব হাড়গিলেদের হত্যা করবার পর মহালয়ায় পিতৃতর্পণে অনিমেষ হাড়গিলের নাম করেছিল।
অথচ এসব রাগের আর ভাঙচুরের মধ্যে থেকে ঘুম সেভাবে আসে না, যেভাবে এককালে এসেছে। অনিমেষ জানে না, তার সাথে ছায়ার মতো দ্যাখা যায় মলয় নামের সাদা বেড়ালটিকে, রাস্তা পেরোবার সময়েও যে কালোবর্ণ ধারণ করে না। অনিমেষ ক্রমশ নিজেকে দ্যাখে এক ঘরের ভিতরে, আসলে সে জানে না কীভাবে ঘরটা তার চারপাশে তৈরি হয়েছে, কারণ হঠাৎ একদিন ঘুম ভেঙে সে খেয়াল করেছিল গোলাপের দুই পাঁপড়ির মধ্যেকার সেই লাল আলোর ঘর তাকে ঘিরে আছে। যদিও অনিমেষ জানে হত্যা তার নেশা নয়, চাইলেই সে হত্যা বন্ধ করতে পারে এবং ঘুমঘোরের চোখ নিয়ে হেঁটে চলতে পারে রেললাইন দিয়ে, কোনো ট্রেনের ধাক্কায় সে মরবে না, অথচ এও মনে হয় পৃথিবীর যাবতীয় ব্যস্ত স্টেশন সে ধুধু প্রান্তর করে দিয়েছে, কেবল ছেড়ে রেখেছে টিকিট কাটার লোকদের আর ট্রেন চালকদের, যারা ফাঁকা স্টেশন আর ট্রেনে বসে থাকে, শূন্যতার মধ্যে উদ্দেশ্যহীন ছুটোছুটি করে। অনিমেষ জানতে পারে, যাবতীয় বেলাভূমি আর রেস্তোরা, মিউসিয়াম আর পাহাড়ে ওঠার বেসক্যাম্পে যত মানুষ ছিল, সব সে শেষ করে এনেছে। অগত্যা এরপর রাগ করবার উপযুক্ত আধার কী পাবে সে, আর রাগ না এলে ঘুমের ভিতর কীভাবে সে পৌঁছবে, এসবই সে ভাবতে থাকে আধা ঘুমে।

মলয় নামের সাদা বেড়ালটি যা অনিমেষকে জানায়নি:

ইচ্ছামাত্র হত্যা করে যত ঘুম অনিমেষ জমিয়েছিল, সেসব ক্রমশ ফুরিয়ে আসছে। বিরক্তি আর রাগজাত যা কিছু অনিমেষের অতিরিক্ত আয়েস, পল-অনুপলের জন্য গভীরতর ঘুম, যা অনির্দিষ্ট অনন্তের আভাসমাত্র দেয় কেবল, সেসবও ক্রমশ ফুরিয়ে এসেছে। হত্যা করবার মতো যথেষ্ট মানুষ আর গাছ আর কুকুর আর মৌমাছি সে বাঁচিয়ে রাখতে পারেনি, এমনকি এই বিপুল অনাসক্তি দিয়ে সে আসলে আরো জড়িয়ে পড়ছে জীবনে। খাদ্য-পানীয়-শ্বাসবায়ু-ভালবাসা ছাড়াই যেভাবে সে স্বচ্ছন্দ এই জীবনে, তা আসলে সেই অনন্তের থেকে ক্রমশ দূরে নিয়ে চলে যাচ্ছে তাকে।

শেষ যে হত্যাটি অনিমেষ করেছিল তা এইরূপ:
হারু ছিল এযাবৎ তার শাগরেদ। হারু পাখির মাংস খুব ভালবাসে। পৃথিবীর শেষ কয়েকজন বাসিন্দার মধ্যে যে মেয়েটি ছিল শিশু, হারু তাকে দু হাত দু পায়ে টানটান করে দড়ি বেঁধে ঝুলিয়ে রেখেছিল, কারণ হারুর ধারণা ছিল এভাবেই মেয়েরা বড় হয়। আর হারু মেয়েটার নীচে একটা বিশাল কয়লার উনুন এনে বসিয়ে দিয়েছিল, কারণ হারু জানে উনুনের তাপে যেমন চ্যাপ্টা রুটি স্যাঁকা হয়ে ফুলে যায়, মেয়েদেরও সেভাবে সেঁকে ফোলাবার নিয়ম। বড় হলে মেয়েটি কোনো কাজে লাগবে কিয়ান অনিমেষ জানে না, অথচ শবের গন্ধে হাড়গিলে এলে ঘুমিয়ে থাকা চলে না অনিমেষের; অগত্যা ভাঙা ঘুমের কারণ খুজতে গিয়ে সব রাগ তার হারুর উপর পড়ে

সৃষ্টির যাবতীয় প্রাণ মরে যাক
অনিমেষ স্থির হয়ে থাকে, মেপে নেয় যাবতীয় নৈঃশব্দ, যা সে সৃজন করেছে, আর তারপর চলে যেতে থাকে হিমালয়ের দিকে, প্রচণ্ড শীতে কিংবা বর্ষায় তখন ন্যাড়া পাহাড় আর বাড়িঘর ভিজছে, আর অগ্নিকুণ্ডের ধারে কেউ নেই আগুন পোয়াবার মতো। নিজেকে সে প্রাণী ভাবতে পারে না আর, অথচ তার কাঙ্ক্ষিত ঘুম তখনো আসেনি। অনিমেষ ক্রমশ দেখতে পায়, তার পেছনে আবছা হয়ে ফুটে উঠছে মলয় নামক সাদা বেড়ালটির অবয়ব, তুষারের মধ্যে আরো উদাস আর লালচে দ্যাখাচ্ছে যাকে, আর অর্ধেক রাস্তা গিয়েই অনিমেষের সাহসে আর কুলোয় না, সে একটি নরম-লাল আলো বিকিরণকারী সাদা বেড়ালের চিরপরিচিত নাম 'মলয়' ক্রমশ ভুলে যায়। অনিমেষ ফিরতে চাইবে না লোকালয়ে, বরং তাকে বসতে দ্যাখা যায় তার শেষতম হত্যাটির আয়োজনে। স্মিতমুখে সে বসে দ্যাখে সূর্যাস্ত, দেখে ক্রমশ একটি লাল ঘরের ভিতর সে প্রবেশ করছে, আর শিয়রপাশে একটি সাদা বেড়াল, অথচ ঘুমের দিকে যাওয়ার আগে শেষবার অনিমেষ ভেবেছিল একবার ভেনিসে গণ্ডোলায় চাপবে।

ঘুমিয়ে পড়বার পর ক্রমশ অদৃশ্য হয় অনিমেষ, কেবল তার শেষ ইচ্ছেটুকু একের পর এক গন্ডোলা বানিয়ে স্তূপ করতে থাকে পৃথিবী জুড়ে।


কাঠ চেরার শব্দ আর ঘুণে ক্রমশ ব্যাপ্ত হয় সৃষ্টি।




দ্বারকা

দেখলাম বিশাল এক ফ্ল্যাটবাড়ির নীচে হা হা করছে শূন্য।

বার্তা আসিল, জল বাড়ছে। সমুদ্র এগিয়ে আসবে এবার। আগাইতে গেলে অনেকটা পিছাইতে হয়। বার্তা আসিল, অজীর্ণ বালিয়াড়ি জেগে উঠেছে দিগন্তবিস্তৃত। মানুষ ছুটে ছুটে যাচ্ছে ঝিনুক কোড়াবে বলে। ঝিনুক কোড়াতে কোড়াতে অঘোরীপনা করে উঠল একদল খলখলে প্রেমিক। মৃতমাংসে ভোজ দেবে, ঝিনুকের খোলে ধার থাকে বড়জোর দেড়জনের গলার নলি কাটার মতো। অথচ ততক্ষণে মৃতদের প্রাণ পুনস্থাপিত হইবারে আসে ঝিনুকগর্ভে। গজাইতে চায় মাংসল পদ, কিছু মৃতদেহ বালিয়াড়িতে পড়ে থাকে ফিরতি সমুদ্রের আশায়। লোনাজলে মৃতদেহ দীর্ঘকাল সতেজ থাকে। লোনাজল ঢুঁড়িয়া সতেজ দ্বারকানগরী আবিষ্কারে মত্ত যাদবকুল। অখিল ভারত নলখাগড়া কোম্পানী উহাদের স্পনসর করিয়াছে।
যাদবকুলের অজস্র শাখা আছে। তথাপি দোকানের গায়ে বড় বড় করে লেখা, 'আমাদের কোনো শাখা নেই।' এমত মিথ্যাচারে অবশ্য পরমায়ু বাড়ে, যেমন বাড়ে ঝিনুকের সুরুয়া খেলে। কচি কচি ঘাস কিছু এতদিন নেতিয়ে ছিল লোনাজলে, হাওয়া পেয়ে তারা বাড়িতেছে, ফনফন করিতেছে, অথচ ঘাড়ের কাছে মৃত্যু আসিয়া পড়িল যে --- ঘাসেদের সতর্ক করিয়া দিবার মতো কেহ নাই ত্রিভুবনে। যাবৎ পশুপাখি জারোয়া সেন্টিনেলিজ অবশ্য আপন আপন সামগ্রী সমিধ উত্তরাধিকার অসমাপ্ত কন্ডূয়ন অতৃপ্ত চোদন লইয়া ভাগলবা হইল উচ্চভূমিতে। সভ্যতা এমত সংকটকালে তাহার ভৃত্যীভূত পূর্বপুরুষদের পদাঙ্ক অনুসরণে লজ্জাবোধ করে না --- বরং কথা দেয়, দুর্যোগ কমে গেলে তাদের উৎসর্গ করে 'বাবা কেন চাকর' চলচ্চিত্র নির্মাণ করবে।

ফ্ল্যাটবাড়িতে উৎসব চলছে। রাত বাড়ল, সমুদ্রের খবর আনতে আনতে ক্লান্ত দ্বারবান নৌকো গড়তে গেল। সিন্ধবাদ হবে। দেখলাম ফ্ল্যাটবাড়ির ফাঁকা গ্যারেজে একা দাঁড়িয়ে আছি। চারিদিকে থাম, ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে দিয়েছে গাড়ি --- খলবল হাসি শোনা যায় মহাশিশুর, বাক্সে যেন ঠাসাঠাসি হল খেলনাগাড়ি। দেখলাম চারিদিকে শূন্য লিফট ওঠানামা করছে, কেবল লিফট ওঠবার নামবার ঘটাং ঘটাং শব্দ, আর সুরেলা কন্ঠে কেউ বলছে দরজা বন্ধ করতে, দরজা বন্ধ করতে, দরজা বন্ধ করতে, প্রিলিউডে দেড় সেকেন্ডের জলতরঙ্গ এখন সভ্যতার একমাত্র সুর। লিফটের ওঠানাম দেখিয়া মত্ত দাদুরি গিলোটিন ভাবিল, আর আপন মস্তক স্থাপন করিয়া দিল লিফটতলে। এতদিনে কুয়োর ব্যাঙ বদনাম বুঝি ঘুচিল।

একেকটা লিফট নেমে আসছে আর বেরিয়ে পড়ছে রাতের কেচ্ছা, ময়লা জামাকাপড়, ঘর উপচে নোংরা জল ঘড়িয়ে এল লিফট বেয়ে, কারা সব মুখোশগুলো শুকোতে দিয়েছিল বারান্দায়, হতচ্ছাড়া ভুলোমনের দল ক্লিপ লাগাতে ভুলে গেছে, আহা সব চিত্ররূপময় মুখোশ উড়ে উড়ে পড়ছে নীচে। এসব মুখোশ নৌকোর দেওয়ালে টাঙিয়ে রাখবে, দ্বারবান ভাবল। একের পর এক শিশুদের তাদের মায়েরা ধরে এনেছে এই নিঃঝুম গ্যারেজে। গ্যারেজ এখন তাদের কলকাকলিতে ঝলমলে। কোলাপসিব্‌ল গেটের ফাঁকে বাচ্চাদের হাত গুঁজে দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন মায়েরা, ঘাড় ধরে রেখেছেন তাদের, দুই হাত লিফটগহ্বরে গুঁজে অপেক্ষা করছে বাচ্চারা, কখন নেমে আসবে লিফট, দড়ি বেয়ে ভার উঠে গেল আস্তে আস্তে, আর কিছু সুহাসিত নুলো বাচ্চা তাদের মায়েদের সঙ্গে বেরিয়ে আসছে। মায়েরা কোলে শিশু নিয়ে চোখ বড় বড় ছল ছল করে তাকিয়ে থাকতেন একদা, তখন তাঁদের বলা হত গণেশজননী। যদিও আমরা সরস্বতীর শিশুকালের ছবি দেখি না, চ্যাপ্টাবুক সরস্বতীকে কুচযুগশোভিত মুক্তাহারে বলা যাবে না, হা মন্ত্র হো মন্ত্র করে পিঠে চাবুক আর ছুরি আর শেকল মারবে যত মনভাঙা ব্রাহ্মণপণ্ডিত। সেই গণেশজননী, হা হতোস্মি, আজকাল আস্তে লেডিস কোলে বাচ্চা নামে খ্যাত হলেন। এত দুঃখের মধ্যে, ভগবন, বাচ্চাদের হাত থেকে আর কী হবে! লেখাপড়া তো কোনোকালেই শিখিল না, উজবুকের দল শিখিল না নখাবলোকনে দেখে নেওয়া সভ্যতার মেয়াদ চুরি করছে কোন ব্যাটা ছিঁচকে চোর, আর উহাদের হাত থাকিয়া কী হবে ভগবন, হাত থাকিলেই ব্যাটারা ফিদা হুসেন হয়ে ন্যাংটো সরস্বতী আঁকিবে, আরেকহাতে হ্যান্ডেল মারিতে শিখিবে অল্পবয়সে।

দ্বারবান লিফটের শূন্যগহ্বর থেকে ছিপ দিয়ে তোলে একের পর এক কচি সুকোমল হাত। নৌকোর দাঁড় হবে। অথচ, নৌকো নিয়ে ভাবনাচিন্তা কতদূর এগিয়ে গেল, এদিকে সমুদ্রের দ্যাখা নাই। সমুদ্র ভীষণ ল্যাদখোর হইয়া পড়িয়াছে। তাহার সে ঢেউও নাই, সে গর্জনও নাই, কাব্যপ্রতিভায় সুড়সুড়ি প্রদানের যাবতীয় পাপ বহন করিতে করিতে সে ক্লান্ত। তাহার ঢেউ গুনিয়া শব্দ শুনিয়া কত কবি তরে গেল, অথচ তাহার কেবল কোথাও যাওয়া হইল না, বিষম অজাচারে সে কেবল খাবলে চলিল তীরস্থ বেলাভূমি। নদী, দুদিনের ছোকরা ছুকরি সব, যাত্রার নাম ধরিয়া কতকিছু দেখিল, এইখানে ওইখানে কতখানে গেল, আর সমুদ্র কেবল মধ্যবিত্তের পুরি দীঘা! আজকাল চিল শকুনের ন্যায় কোমরে দড়ি বাঁধিয়া ওড়ে কত মানুষ, এসব নষ্টামি করবার সুযোগ পায় কেবল সমুদ্রতীরেই। দুঃচ্ছাই করিয়া এসব কেত্তন ডুবাইবে বলে সমুদ্র সরিয়া গেল, অথচ ল্যাদের কারণে তার আর ফিরিতে ইচ্ছে করে না। মানুষগুলা সব দখল করিতে আসিতেছে তাহার ছেড়ে যাওয়া জমি, আর জ্ঞানপাপী মানুষেরা উচ্চৈস্বরে ভয় করিতেছে সমুদ্র ফিরিয়া আসিবে ডুবাইয়া দিবে, আর লোভী এবং জ্ঞানপাপী মানুষেরা সমুদ্রের পরিত্যক্ত ভূমিতে নুড়ি কুড়াইতেছে। দূর থেকে এই ভয় এবং লোভের সহাবস্থান দেখিতে বেশ লাগে সমুদ্রের।

যেভাবে দূর থেকে দেখেছি, এক পশ্চিমা মুসলমানকে বাসের উপর থেকে টেনে নামানো হল। তার বুলিতে সে আদো আদো উচ্চারণ করল বাংলা, আর বিশুদ্ধ শিষ্ট বাঙালীরা শুনেও দেখল না তার পূর্ব পাকিস্তানী বউবাচ্চার কথা, পূর্ব পাকিস্তানী বাসার কথা, সেই বাসার দেওয়ালে বাচ্চার জন্যে সে গড়ে দিয়েছিল কিনা কোনো বইয়ের তাক, প্রাণের ভিতর থেকে বিপ্লবী বাংলা জয় এবং মৃত্যু, মৃত্য এবং জয়, জয়ীর মৃত্যু, মৃতের জয় ঘোষণা করল আর তার পাগড়ি সমেত মাথা ছেঁচড়ানো হল পাথর দিয়ে, আর এসব ডুবিয়ে ভাসিয়ে দিয়ে পথে নামতেও তো ল্যাদই লাগে, মানব তো সমুদ্রজাতক, সভ্যতা সমুদ্রজাতক, ঝড় সমুদ্রজাতক, লবণ সমুদ্রজাতক, প্রশান্তি সমুদ্রজাতক, টাইটানিক সমুদ্রজাতক, গোয়ালন্দের ডুবে যাওয়া স্টিমার সমুদ্রজাতক, সেই স্টিমারে কেবল মুরগির ঝোল আর ভাত রান্না হয়েছিল, সেই স্টিমারে কেবল ছোটকাকা আর মোমিন আলি যাচ্ছিল, সারেঙের নাম ঈশ্বরী পাটনী আর স্টুয়ার্টের নাম চাঁদ সদাগর, আর এক পাগলিনীকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল পাগলাগারদে যে চেঁচিয়ে  চেঁচিয়ে বলত সেঁউতি তো সোনা হচ্ছে না! অথচ তাদের ছিল না কোনো জ্যাক কিংবা রোজ, জ্যাক কিংবা রোজ টাইটানিকেরই জোটে। সেই সপ্তডিঙা টাইটানিক গিলেও খিদে মেটেনি সমুদ্রের, হতচ্ছাড়া বুড়ি, আর কী গিলতে চাস?

জলস্তম্ভ দ্যাখ যাচ্ছে দিগন্তে। এগিয়ে আসছে সমুদ্র। জোড় হাতে বসো, নুলো এবং রাতকানারা, বলো:
এখানে তো নেই কোনো খাণ্ডববন, সেসব তো আগেই উড়িয়ে পুড়িয়ে খেয়ে নিয়েছি, ক্ষুধামান্দ্যের ওই এক চমৎকার ওষুধ, আর এখানে নেই কৃষ্ণার্জুন, আর নেই অজস্র মাংসল প্রাণী। কতকাল সন্তান বিসর্জিলুম সাগরে, তীর্থ মেনে ছুঁড়ে দিয়েছি রুগ্ন ডাব, আলো ফোটার আগে শৌচকর্ম সেরে পেছন ধুয়ে নিয়েছি ঢেউতে। ক্ষুধামান্দ্য হলে অতএব পুনরায় ফিরে যাবে সমুদ্র, জ্যাক খাবে রোজ খাবে ব্যবসা চুমু অস্কার খাবে, জলস্তম্ভ গুটিয়ে যাবে ধরা পড়া পরকীয়া প্রেমিকের নুনুর মতো, আর কিছুকাল নুলো ঠুঁটো হয়ে ভাবব নুড়ি কোড়াচ্ছি উত্তরাধিকারে

আমায় অব্ধি খাওয়ার আগেই সমুদ্রের ক্ষুধামান্দ্য হোক।   















সর্বজিৎ ঘোষ

Sarbajit Ghosh
Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS