Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS

Sarbajit Ghosh

হরকরাকে লেখা চিঠি

রাস্তা পেরোতে গিয়ে শ্যামলালের হঠাৎ মনে হল, তাকে নিয়ে কেউ কোনোদিন কবিতা লিখবে না। অথচ ছোট্টো সবুজ বিন্দুজীব যে মানুষটি দপদপ করে বলতে থাকে আর কতক্ষণ, সে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছিলো লালে। শ্যামলালের মনে হল সে তাকে বলছে, ওহে শ্যামলাল, এই যে কুড়ি লক্ষ ত্রিশ হাজার পাঁচশো সাতাশিতম বার তুমি সফলভাবে রাস্তা পেরোলে, এবং প্রত্যেক মৌলিক সংখ্যকবারে পেরোতে গিয়ে যে তুমি গাড়ি চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে যাও, (আহা সে বাঁচা তুমি জানবে না; অঙ্কে কাঁচা)... শ্যামলাল শুনতে পেলোনা বাকিটা। হয়তো সে বলতো শ্যামলাল জানে না রাস্তা পেরিয়ে আসলে সে কোথায় যাচ্ছে, বা রাস্তা সে আদৌ পেরোতে পেরেছে কিনা, যেভাবে শ্যামলাল জানে না এখন সে কোথা থেকে ফিরছে। শ্যামলালের মনে হয়েছিল সে বেরচ্ছে তার ইউনিভার্সিটি থেকে, শেষ ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সে খুঁজতে গিয়েছিল এক জলে ভেজা দাঁড়কাক, যে আসলে ভেজার ভান করে পালক ঝাড়ছিল। কিন্তু, এও তো সমানভাবে সত্যি, শ্যামলাল যে রাস্তা পেরোচ্ছিল তার এপারে ছিল প্রাচীন লাল এক সরকারি অফিস, যার লিফটের দড়ি দিয়ে খুব ভালো ফাঁসি হয়, শ্যামলাল ভেবেছিল। যেমন শ্যামলাল এও জেনেছিল, নীলদর্পণ নাটকে এক কুখ্যাত চাবুকের নাম শ্যামলাল এবং তার নিজের কোমরে ছিল প্রাগৈতিহাসিক এক দাদ, যে দাদ তার মনের সব কথা বুঝতো বিনা ভাষায়।

রাস্তায় অন্ধকার হয়ে আসছিল, ভেজা ছিল রাস্তা, অথবা তীব্র দুপুরের মরীচিকায় রাস্তা হয়ে উঠেছিল সবুজ কোনো শস্যক্ষেত। শ্যামলাল বিড়ি ধরিয়েছিল একটি, এবং তার মনে পড়েছিল কবিতার কথা। শ্যামলাল তো জানতো, মহাপ্রলয়ের সময়ে নৌকায় যে পাঁচটি কবিতা নিয়ে উঠতে পারবে শ্যামলী, তার মধ্যে শেষতম কবিতাটি স্বয়ং শ্যামলালের। যদিও সেই কবিতাটি শ্যামলাল এখনো লিখে উঠতে পারেনি, কারণ শ্যামলীকে এখনো সে চেনে না, চিনলেই জিজ্ঞেস করে নেবে সে কেমন কবিতা শ্যামলীর পছন্দ, কিংবা কবিতার বদলে শ্যামলী চায় কিনা একফালি ছায়া ও রোদ্দুরঘাস জমি। অথচ, শ্যামলাল ভাবে, কেউ তাকে নিয়ে কবিতা লিখবে না কোনোদিন। আজকের এই ট্রাফিক সিগনালে শ্যামলালের তো দাঁড়ানোর কথা ছিল না; যেভাবে হিজড়েরা শাড়ি তুলে অন্ধকার দেখানোর ভয় দেখিয়ে টাকা নেয়, শ্যামলাল যেন দাঁড়াচ্ছে গিয়ে প্রতিটি সিগনালে, এভাবেই চেয়ে যাচ্ছে একটা আস্ত কবিতা। শ্যামলালের মনে হয়েছিল আজ পর্যন্ত সে যা যা লিখেছে সব একেকটি গর্ভস্রাব, কারণ শ্যামলাল জানত মহাপ্রলয়ের সময় কোনো নৌকা পাওয়া যাবে না শেষ পর্যন্ত। শ্যামলীকে সে একবারই দেখেছিল, বর্ধমান থেকে ফেরার পথে কর্ড লাইনে, ট্রেনের দরজায় বারমুখো হয়ে দাঁড়িয়ে, একহাতে হাতল ধরা, চুলগুলো খোলা ছিল এবং হাওয়ায় একে একে উড়ে যাচ্ছিলো, শ্যামলী ক্রমশ ন্যাড়া হয়ে যাচ্ছিল আর রোদ্দুর আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। অথচ, আজ এখনো শ্যামলালের বাস এলো না, কবিতার মতো সে যদি স্থির বুঝতে পারতো বাস আর আসবে না, বাস কোনো ছন্দকাটা তালকাটা শব্দ, এবং অপেক্ষা বিষয়টা আসলে মাথাব্যথার মতো আদুরে... শ্যামলাল মন দিয়ে বাসস্ট্যান্ডে সাঁটানো 'গোপনে মদ ছাড়ান' বিজ্ঞাপন পড়ছিল এবং ভাবছিল, সে কি কোনোদিন মাতাল হয়নি, সে কি চায়নি ঝাল ঝাল লংকাকুচি মাখা ছোলাসেদ্ধ এবং খোঁয়ারি-ভাঙানো লেবুর জল, তাহলে কেন তাকে নিয়ে একটা, অন্তত একটা বিজ্ঞাপনও লেখা হল না এতদিনে!


এবং শ্যামলাল যথারীতি জানতে পারেনি বাসে সে কখন উঠেছিল, যেভাবে সে জানতো না কীভাবে এই গল্পের সে চরিত্র হয়ে উঠেছে। বাসে উঠে একটি জায়গা পেল শ্যামলাল, বাঁদিকের শেষ জানলায়, হয়তো সেই জানলাটি অতিরিক্ত এবং শ্যামলাল ছাড়া কেউ বসতে পারত না সেই জানলায়। শ্যামলাল বসে বসে সময় কাটানোর জন্য ভাবতে শুরু করেছিল, আর কী কী সে জানে না। যদিও জগতের প্রায় নব্বই শতাংশ ছিল শ্যামলালের করতলগত, কারণ বাড়িতে তার দুটি পোষা ভূত ছিল, কিন্তু কিছুটা তো অজানা রেখে দিতেই হয়, নয়ত বসিয়ে খাওয়াতে হয় ভূতেদের। এই যেমন দশ মিনিট আগেও শ্যামলাল জানত না সে এই গল্পের চরিত্র হবে, এবং এক মিনিট আগেও সে জানতো না তার দুটি পোষা ভূত থাকবে। যেমন শ্যামলালের ইচ্ছে একদিন খেয়াল শিখবে, একদিন তার গলায় হবে ভারী দানা আর সপাট তানের আসা যাওয়া, আর তার আঙুলে নেচে নেচে উঠবে সরোদ। ঝালার তারে আঙুল বোলাবে সে, যে দক্ষতায় রুমালি রুটি বানায় কারিগর, এক এক মুহূর্তে দুশো কবিতা গিলবে আবার ওগরাবে। অথচ শ্যামলাল জানে, সে গলায় লাভা নিয়ে কুলকুচি করলেও সুর আসে না, এই যে বাসে করে সে ক্রমশ সুরের থেকে আলাদা হয়ে গেল, দূরে চলে গেল, প্রতি মুহূর্তে তার মনে হয় নেমে পড়ি, নেমে পড়লেই হয়, আর দূরের মোড়ে দ্যাখে শ্যামলী গালে হাত দিয়ে বসে গান শুনছে কোনো শুয়োরের বাচ্চার গলায়। অথচ বাস চলতে থাকে, আর শ্যামলাল ক্রমশ শুনতে পায় সেই গান, আহা, শ্যামলাল বুঝি কাঁদে, শ্যামলাল বুঝি এক্ষুণি পূর্ণিমা আকাশতলে আছাড়িপিছাড়ি করে সুরের ঘোরে। আর বাস তাকে দূরে আরো দূরে দূঊঊঊঊরে কোনো এক বিষণ্ণ অস্তগামী রক্তাক্ত সূর্যের কাছে বলাকা করে পাঠায়, শ্যামলাল, সেই যে কবিগর্বী সুরগর্বী শ্যামলাল রোজ সুরের কাছে সহস্র তৃণজন্ম চায়, আহা সুর, পথ দেখায়, হাত ধরে নিয়ে যায় ঝুরো মাটি পাহাড় পেরিয়ে পূরবী আর ইমনের ছায়াবৃত্তে...

অথচ শ্যামলাল কদিন আগেও দেখেছিল একটি মেয়েকে, যার হৃদয় ছিল বিষাদকীট। কিন্তু শ্যামলাল তাকে প্রজাপতি বানানোর মন্ত্র জানতো না, এই না জানা ছিল তার দশ শতাংশের মধ্যে সিকিভাগ। যেভাবে শ্যামলাল কোনোদিন জানতে পারেনি, তার জন্মের সময়ে আসলে সে কী দেখেছিল। আসলে শ্যামলাল দেখেছিল দুটি রাস্তা, একদিকে ছিল একদল ভুখা মানুষের মিছিল, যাদের হাত ছিল মশালের মত কংকালসার কিন্তু সমিধময়, আর যে রাস্তায় একে একে কামান গর্জে উঠছিল পলে পলে। আরেকটা রাস্তা ছিল সবুজ, খানিকটা রক্তাভ, যেখানে একটা সাইকেল দাঁড়িয়ে শিশিরে ভিজেছিল একরাত আর একটা পুরনো ভাঙা গাড়ির হলুদ হয়ে গিয়েছিল রাধাচূড়ার তলে। জন্মমুহূর্তে শ্যামলাল দেখেছিল দুটি রাস্তা কেমন সাপের শঙ্খ লাগার মতো জড়াচ্ছে নিজেদের, আর একদিকে এক কানা খোঁড়া বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছেন খানিক ঈশ্বরপ্রতীম স্তব্ধতায়। সে ছিল বড়ই আঁধার, মাতৃজঠরে সে দেখেছিল আরেক প্রবেশপথ, যে পথে প্রবেশ করলেন সেই বৃদ্ধ, আর শ্যামলালের ভ্রূণের কাছে অল্প জল চাইলেন। শ্যামলাল দিয়েছিল তার সঞ্চিত খানিক অমৃত বারি, যা তাকে সঙ্গে দিয়ে পাঠানো হয়েছিল জন্মমুহূর্তে কাজে লাগবে বলে। শ্যামলালের ক্রমশ ঘুম পেয়েছিল, আর সে শেষ পর্যন্ত চেষ্টা করেও জানতে পারেনি কোন রাস্তায় তার জন্য সরাইখানা আর জলসত্র রয়েছে, কোন রাস্তায় তাকে নিজেই খুঁজে নিতে হবে পথ। তেমনই সেই মেয়েটি, যাকে শ্যামলাল ভেবেছিল ভালবাসে কিংবা পাখির ছানার মতো আদুরে ন্যাকামো আর বীজধান, যখন আঙুল তুলে শ্যামলালকে বলেছিল এগিয়ে এসো, শ্যামলাল বোঝেনি।

অর্থাৎ, শ্যামলাল ছিল প্রকৃতই এক ব্যর্থ পুরুষ। যে বাস প্রতিমুহূর্তে তাকে নিশ্বাস নেওয়ার সুযোগ দিয়েছিল, তার বশংবদ হয়ে শ্যামলাল নিজেকে জাড্যে সমর্পণ করেছিল। শ্যামলাল দেখেছিল এক উন্মাদ দাঁড়িয়ে শহরের ব্যস্ততম মোড়ে, নিজের ক্ষুদ্র ও মলিন লিঙ্গটি সে তাক করেছে ধাবমান আর্যের দিকে, ছ্যার ছ্যার করে সে পেচ্ছাপ করছে মাঝরাস্তায়। শ্যামলালের মনে হয়েছিল সে ক্রমশ ক্ষুদ্র-বক্রলিঙ্গের দুরারোগ্য ব্যধিতে আক্রান্ত হচ্ছে, তার বুকে ক্রমশ কফ উঠছে সবুজ, যেভাবে তার বাবা একদিন উগরে ফেলেছিল তার মায়ের মৃতদেহ, যা মাছের কাঁটার মতো দীর্ঘকাল বিঁধেছিল গলায়, আর শ্যামলাল দেখেছিল কইমাছের মতো ডাঙায় পাখনা ভর দিয়ে চলছে মা, আর বাবা বলে উঠলো রেণ্ডি! শ্যামলালের বাবা ধূপকাঠি বেচতো আর শ্যামলাল বাবার থেকে চন্দনধূপ কিনে জ্বালিয়ে দিয়েছিল সমস্ত মাছের বাজারে...

বাস এগিয়ে যাচ্ছিল আরো আরো রাতের দিকে, শ্যামলাল নিজেকে আরো আরো বৃদ্ধ ও ব্যর্থ মনে করছিল। আসলে শ্যামলাল তো চেয়েছিল একটা গল্প বলে যেতে, নিটোল, সরল গল্প, দুনিয়ার সব মানুষ আর দানব আর মাছেরা যেখানে আসবে, আর পাখিরা ঝড়ের আকাশে ডানা মেলে ভেসে যাবে, টাল খাবে না একটুও... শ্যামলাল তো চেয়েছিল কিছু মানুষ, যারা অনেকটাই জানে না, আর যারা খুব কেরাণীমতোন, আর যারা কোনোদিন জানতে পারেনি কোন পথে পথ, শ্যামলাল তো চায়নি দিনের শেষে কোমরের সেই প্রাচীন দাদ আর দুটো পোষা ভূতের কাছে শিখতে মানুষের ইতিহাস, শ্যামলাল তো সারাজীবন ধরে একটা চিঠি লিখতে চেয়েছে, যার ঘর ভেঙে গেছে গত আশ্বিনের ঝড়ে, আর যে লেখক খানিক মিশিয়ে দিল নিজেকে তার ভিতর তাকে,আর সেই সে বালিকাকে যার খেলনাবাটি হারিয়ে গিয়েছিল কাল, আর সেই ডাকবাবুকে যার ছানিপড়া চোখে ছায়া ছায়া ঠিকানাপত্তর, আর সেইসব মানুষকে যারা নিজেদের বলত নারী, আর কোনো এক কানা খোঁড়া বৃদ্ধকে যাঁর ছিল ঈশ্বরপ্রতীম স্তব্ধতা... আর শ্যামলাল, কাঁপাকাঁপা হাতে, বাস বড় এঁকেবেঁকে চলে, লেখার চেষ্টা করছে তার সেই একটা শেষ চিঠি, শ্যামলীকে, না না, শ্যামলীকে নয়, শ্যামলী কেবল হরকরা, পৌঁছে দেবে খবর, যা বলার ছিল শ্যামলালের, যা শুনে যেতে পারেনি তার মা, আর শ্যামলাল লিখছে, লিখছে, লিখছে... কারণ, বাস থেমে গেলেই আর কেউ তাকে নিয়ে কবিতা লিখবে না।















সর্বজিৎ ঘোষ

Sarbajit Ghosh

Popular Posts