Like us on Facebook
Follow us on Twitter
Recommend us on Google Plus
Subscribe me on RSS

Suprakash Pramanik

হে নিসর্গ
বুকের ভেতর জাগছে অাবার অবাধ্য এক বালক
হে নিসর্গ, অার কিছুক্ষণ অাগলে রাখো অালো
             হোক নিষাদের সে ঘোর ঘুমের
             শোক বিষাদের এ মরশুমে
জানি তোমার শরীর জুড়ে বিষের রঙিন পালক
হে নিসর্গ, তবুও খানিক অাগলে রাখো অালো।

লৌকিক
অনায়াসে ভেবে নিতে পারি
পৃথিবী নামের সবুজ জানালা।
নিমেষে প্রবাহ পেতে পারে
সরল তুলিতে অাঁকা তরল ছায়ার নদী।
শীতলাক্ষে উঁকি দিতে পারে 'ময়নামতি' চর।
অামার শরীর জুড়ে ধান গন্ধ,
তুমিও তরুণী চাঁদ হলে
প্রেমগাথা নিয়ে উড়ে যেতে পারে 'মাটির ময়না'...
অথচ তুমিও জানো
অামাদের ঠোঁটে এ ভোরাই সুর
কতকাল বন্দী চিত্রকল্প হয়ে।










আমি ও স্বরূপ

এক
আমার জানালায় যে সুপারিগাছটার ছায়া এসে পড়ে সেটা স্বরূপের। সোজা তাকালে বন্ধ জানালায় ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসে চোখ। মাঝেমাঝে জানালার ফাঁক গলে আলো অন্ধকার কাটাকুটি খেলে। সাবধানী চোখ রেখে দেখি স্বরূপের পায়চারি।
একদিন কী একটা লিখছে দেখে জানালাটা খুলতেই আমাকে অবাক করে বলল, "বেরোব তো, তাই ঠিকানাটা লিখে রাখছি। বলা তো যায়না, কখন কী হয়ে যায়!"
ছেলেটা আমারই মতো বেঁটেখাটো, আর ইদানীং খুব চুপচাপ হয়ে গেছে।


দুই
এমনিতে স্বরূপ বেশ মিশুকে ছেলে। দুইজনে জানালা খুলে দেদার আড্ডা চলে, তুমুল টানাটানি করে কত ভোর এনেছি। অভিমানী শিশিরের সাথে সব ফিরে গেছে।
আজকাল স্বরূপের থেকে দূরে দূরে থাকি, আঁকিবুকি কেটে কোনোমতে পার করি দিন। ও!  সে এক রাত ছিল, হালকা হাওয়ায় কাঁপছিল মোমবাতি। দেয়ালের পোয়াতি ছায়ায় পাশ ফিরে দেখি, চেয়ে আছে জ্বলজ্বলে  চোখ — “কী  কবি, কি লেখ? জানো কী! আমিও গোপনে লিখছি তোমাকে।"    


তিন
জানালায় ক্রমশ বেড়ে চলে বোলতার বাসা, পাশাপাশি ভেসে যায় অঞ্জলির ফুল, ঘাম শুষে ভারী হয় বাজারের থলে। বিপরীতে আরাম খুঁজি পেরেক মারা পুরনো চেয়ারে, খুঁজি তোশকের নরম ওম। ধীরে ধীরে ঘর জুড়ে শীত নামে ঘোর।
কুয়াশা সরিয়ে শিষ দিতে দিয়ে কড়া নাড়ে মানস আর মানসী, ঈশ্বরীর নিজস্ব নির্মাণ, নিরুপম কারুকাজ, তুলতুলে রোদ যেন, শরীরের মোহিনী সুবাস খেলা করে ঘরময়। হঠাৎ আমার শরীর ফুঁড়ে অজস্র ডানা বের হয়, উদাস বাতাস এসে করে কানাকানি।
বেশ বুঝি সেই উসকানি। ভালো করে জানি, সব স্বরূপের কারসাজি।


চার
গায়ে পড়ে আলাপ জমাতে স্বরূপের জুড়ি নেই। আড্ডার সেসব দিনে গোল বাধিয়ে মজা দেখে। স্বরূপের কাছে গোহারা হেরে স্থির হই। মন্দিরে ধূপের ধোঁয়ার মতো মানসী জেগে থাকে বকুল গন্ধে। জানি, বাসের ভিড়ে দমকা ভেসে আসা সুগন্ধি সে, সর্বনাশের ওড়না।
সেসব পাশ কাটিয়ে জ্বালি ধূপকাঠি, কলারের ময়লায় ব্রাশ ঘষি, ছাড়িয়ে দিই রশুনের খোসা। দৃশ্যহীন চোখে একমনে হেঁটে চলি সোজাসুজি, শুধু শুধু, প্রশ্নহীন, প্রশ্নচিহ্ন হয়ে।
আলো নিভিয়ে নোনতা শরীরে শুরু করি ঘুম ঘুম খেলা। ক্রমাগত চর্চায় ঘুম শিখি, ঘুম...


পাঁচ
অদ্ভুত এক হাসিতে আচমকা ঘুম ভাঙে। কপালের ঘাম মুছে দুরুদুরু বুকে জানালায় চোখ রাখি। দেখি, স্বরূপেরা সকলে আলাপে মশগুল। স্বরূপের দ্বিতীয় জানালাটিও খোলা, মুখ রেখে হাসছে এক থুথ্থুরে বুড়ো, শরীর কঙ্কালসার — কোটরাগত দু'চোখে অমিত প্রত্যয়, অলৌকিক আলো — যেন প্রথম আগুন জ্বালানো গুহামানব। হাসিতে স্বপ্নের হাতছানি। লোভ হয় শিখে নিই বীজমন্ত্র। হঠাৎ হাওয়ার ঝাপটা আছড়ে পড়ে জানালায়, আলো নিভে যায়।
অন্ধকারে জেগে থাকে ক্রমশ ক্ষীণ মায়াবী শিষ আর আদিম বন্য সুবাস।


ছয়
প্রবাহের অপেক্ষায় দুই জানালার মাঝে থমকে থাকে হাওয়া। ফাঁকা দাওয়ায় বসে বসে দেখি আগাছার অবাধ জনন, মেঝে জুড়ে কেন্নোর পায়চারি। রোজরোজ বিছানায় মুতে যায় ধাড়ি কচি ভাম। নাক কপাল কুঁচকে পড়ে থাকি পাশ ফিরে...
এরই মাঝে শুনি স্বরূপের মানসীর হাসি। সর্বনাশী হাওয়া ছড়ায় সিলিং ফ্যান। কাগজ গুঁজে দিই ফাঁকফোকরে । মানস আজকাল চুপচাপ থাকে, ডাকেনা বিশেষ। শেষরাতে টিনের চালে শোক ঝরে টুপটাপ। সেই সুর থেমে গেলে এক শিস বেজে ওঠে, অজানা পাখির মনে হয়। বলে, "জাগো... জেগে থাকো..." বালিশ ভেদ করে কানে আসে চেনা পদতাল। বুড়ো হাসে, থেমে যায়। ঘুলঘুলি বেয়ে স্বরূপের আলো নামে আমার দেয়ালঘড়িতে...
আলোয় অন্ধকারে জেগে জেগে শুনি নাড়ী আর ঘড়ির আলাপন...

      
সাত
রুদালিশিস চিরে জানালায় হামলে পড়ে রাস্তা কোলাজ, শরীরে বেনামি পোস্টার। হাত মোছে সোহাগি স্যান্ডেল, নাইলনব্যাগ। আহ্লাদে চেপে বসে বাইকের সিটে। ব্যাগ ভরে বেছে বেছে  কিনে আনি সুখ।
বাইকের হর্ণে মুখ ফেরায় মানসী আর তার বোন, আপাতত তার নাম মনামী। ওরা হাসে, পরস্পর বিপরীত ভাবে। কিছুদিন পর ওদেরও জায়গা বদল হবে, মনামীর বোন মনামীর পাশে। স্বরূপের অকাতরে ঘুম তখন, মানসও চুপচাপ যথারীতি।
বুড়োটার শিস তবু দূরে একা একা জাগে। স্বরলিপি শেখে কোনো এক আগুনপাখি।
আমিও চোখ রাখি রাস্তায়। বারবার বকুলের শোক গায়ে মাখি সিজিনাল সুখ।
        
            
আট
শোক আর সুখ শুষে কালচে শরীর, জানলার পর্দার সাথে। একা শুয়ে থাকে কানাগলি, নিজের নিজের। অথচ গলিটা পথ হত কোনোদিন। হাওয়া হয়ে খেলে যেত মানস আর মানসী। আরও একটা সরু পথ ছিল স্বরূপের বাগানের পথ ঘেঁষে। এই দুই পথ এক হয়ে তবে রাজপথ। পরাগ মেখে পাখিরা উড়ে যেত দূরে, ফিরে এসে শোনাত মায়াবী শিস।
এ তল্লাটে ইতস্তত ফুটোফাটা টব — গাছ নেই, ফুল নেই, নেই পাখিদের শিস। গুমোট হাওয়া হয়ে আছে অভিমান, উসখুস দিন। দিন বললে যতটা আলো বোঝায় তাও নেই, নেই রাতের আদিম অনাবিল মায়া...
নদীর সদ্যোজাত চরের মতো শুধু চেয়ে থাকা আছে, চিরদিন থাকে।


নয়
এখন আমার এ ভাড়াবাড়িতে দু'টো ঘর। একটাকে সুখসুখ মনে হয়, অন্যটি নিশ্চিত অভিমান। সুখের একটি দেয়াল নীল, বাকি তিনটে হালকা হলুদ। নীলের মাঝখানে টিভি ওপরে গণেশের মিউরাল। হলুদের অনেকটা জুড়ে ওয়ারড্রব, ড্রেসিংআয়না, ঘুম। অভিমান অনুজ্জ্বল হালকা একটা রঙে ঘেরা। বুক-সেল্ফের উপরের তাকে কাচের বাসন, নীচের দু'টোতে পুরনো বই, রাত জাগা গন্ধ।
বারান্দায় রঙ করা টবে নাম না জানা পাহাড়ি গাছ, সন্ধ্যার ঝুরঝুরে চাঁদ। সেইখানে মাঝেমাঝে দুইজনে জোছনা কুড়াই, বৃষ্টির গন্ধ মাখি। আরেকজনের পরিচয় প্রথা ভেঙে খুঁজছি এখনো। মাঝেমাঝে ভেসে আসে পুরাতন শোক, চেনা চেনা মনে হয়। এখনো রাখিনি নাম, ঠিক জানিনা তো! সেকি মানসী, নাকি তার বোন, নাকি...
এসময় মনে পড়ে — পুরনো সে ঘর, স্বরূপের আলো, বুড়োর মায়াবী শিসের বিবাগী সুর।

      
দশ
সুখের হাওয়া গুমোট হয়ে এলে জানালাটা খুলে দিই। চেনা অচেনা দৃশ্য বয়ে যায় চমকহীন। মৃদু পায়ে আসে অন্ধকার, পিছুপিছু পড়ন্ত যৌবন নিয়ে কামুক সময়। জানালার কাচ ছুঁয়ে সরে যায় আবছায়া, প্রায় ভুলে যাওয়া আলো আলো বুনো ঘ্রাণ। ক্রমে ঘিরে ধরে অসুস্থ বাতাস।
অভিমানে ফিরে আপ্রাণ আরোগ্য খুঁজি স্বরূপের স্মৃতির ফসিলে। বৃদ্ধ শিসের দেহাতি সুরে খুঁজি উপশম, মেলেনা। হৃপিণ্ড ক্রমশ মুখর হয়ে বলে, "ভুলে গেলে বীজমন্ত্র! সবুজে প্রশস্ত কর জানালার পথ।"
মনে পড়ে স্বরূপেরা বরাবর যাযাবর — ঘর নেই, ঘর খোঁজে চিরদিন।








সুপ্রকাশ প্রামাণিক
Suprakash Pramanik

Popular Posts