Jyotirmoy Shishu

Jyotirmoy Shishu
Showing posts with label অনুবাদ. Show all posts
Showing posts with label অনুবাদ. Show all posts

Sunday, May 14, 2017

কাশ্মীর হামারে হ্যায় : অদ্বয় চৌধুরী

কাশ্মীর হামারে হ্যায়

কাঠের এই বাড়িটা আমাদের খুব পছন্দ। তার অনেক কারণ আছে। আমাদের দু’জনের পক্ষে বেশ বড় আকারের হওয়ার পাশাপাশি বাড়িটা বহু পুরনো হওয়ায় বাপঠাকুরদাদের স্মৃতি বহন করে। আমাদের ছেলেবেলার সমস্ত স্মৃতিও জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে। বোন আর আমি এই বাড়িটায় একা একাই থাকি। বাবা, মা, কাকা, ঠাকুরদা, ঠাকুরমা আর নেই। ওরা এসে নিয়ে গেছে ওদের। আমাদের নেয়নি ওরা, কারণ আমরা তখন ছোটো ছিলাম। সেই সমস্ত স্মৃতি এই বাড়িটা ঘিরেই রয়েছে। ওদের আসা, বাবা-মা-কাকাদের চলে যাওয়া, আমাদের থেকে যাওয়া— সব।
আমরা বেশ সকাল সকাল উঠে পড়ি ঘুম থেকে। তারপর ন’টার মধ্যে অল্প খেয়ে আমি বাজারে যাই বোনের বোনা শীতের পোষাক পুঁটলি বেঁধে। সারাদিন সেখানে রাস্তার ধারে পসরা সাজিয়ে সেগুলো বিক্রি করি। দুটো ম্যানিক্যিনকে— একটা ছেলে আর একটা মেয়ে— বিভিন্ন সোয়েটার বা জ্যাকেট পরিয়ে সাজিয়ে রাখি রাস্তার ধারে। লোকের চোখ পড়ে বেশি। যদিও বিক্রি খুব কমই হয় তারপরেও। আমার মতো হাজার হাজার বিক্রেতা রয়েছে ওখানে। তারপর অন্ধকার ও শীত জাঁকিয়ে পড়লে পোষাকের পুঁটলি আর দুটো ম্যানিক্যিনকে ভ্যানে চাপিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। বাড়িটা ঝারপোঁছ করে পরিষ্কার রাখা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। বোন সারাদিন বাড়ি থাকে, কিন্তু ওর পক্ষেও সম্ভব না।
বোন কখনো কাউকে বিরক্ত করে না। ও ওর মতো থাকে, কাজ করে। সকালের কাজকর্ম শেষ হয়ে গেলে ও বাকি দিনটা নিজের শোয়ার ঘরে বা নীচের বসার ঘরে উল বুনে কাটিয়ে দেয়। বোন সেই ছোটোবেলাতেই, যখন মা-ঠাকুরমা ছিল, উল বোনা শিখেছিল। তারপর থেকে ও সব সময় দরকারি জিনিসপত্রই বোনে— শীতের সোয়েটার, মোজা, টুপি, মাফলার, শাল, জ্যাকেট এইসব। ও একটু খামখেয়ালি গোছের মেয়ে। কখনো হয়তো ও একটা জ্যাকেট বুনলো, কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেটা খুলে ফেলে কারণ সেটার কিছু একটা ওকে খুশি করতে পারেনি। এইসব দেখতে বেশ মজাই লাগে আমার। একগাদা উলের গোছ ওর সেলাইয়ের বাক্সে একটা হেরে যাওয়া যুদ্ধ লড়ে চলেছে স্রেফ কয়েক ঘণ্টার জন্য নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখার প্রবল ইচ্ছায়।
শনিবারে আমি শহরে যাই উল কিনতে। আমার পছন্দের প্রতি বোনের ভরসা প্রচুর। আমার পছন্দের রং নিয়ে সে খুশিই হয় এবং কোনো গোছই কোনোদিন ফেরত দিতে হয়নি। এই শহরে যাওয়ার সুযোগে নিয়ে আমি এলাকার খবর জোগাড় করে আনি। আমাদের বাড়িতে টিভি নেই, ট্রানজিস্টার থাকলেও শোনা হয় না। ইন্টারনেটের তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এখানে এমনিই প্রচুর বিধিনিষেধ। অনেক কিছুই নিষিদ্ধ। তাই শহর থেকেই খবর সংগ্রহ করতে হয়। আবার কোনো নতুন গণ্ডগোল হচ্ছে কি না আমাদের এখানে, আবার নতুন করে কেউ খুন গুম হল কি না, কেউ খুন হল কি না— এই সব খবর সংগ্রহ করি। খবরে অবশ্য কোনো পরিবর্তন ঘটে না। গণ্ডগোল লেগেই থাকে এখানে।
তবে আমি গণ্ডগোল নিয়ে কথা বলতে চাই না। আমার ভয় করে। আমি শুধু বাড়িটা সম্বন্ধে কথা বলতে চাই— বাড়ি আর বোন সম্বন্ধে। আমি ভাবি একদিন বোনের বিয়ে দিতে হবে। ওর তো একটা ভবিষ্যৎ আছে। উল বোনা ছাড়া বোন আর কিছু করে কি? একদিন হঠাৎ আবিষ্কার করলাম ঘরের আলমারিটা বিভিন্ন রঙের উলের পোষাকে ঠাসা রয়েছে। প্রচণ্ড সোঁদা গন্ধের মধ্যে স্তুপ করা রয়েছে ওগুলো, স্যাঁতসেঁতে অবস্থায়। এতো পোষাক বুনেছে এর মধ্যে বোন? এটা ঠিক যে আমাদের জীবনধারণের জন্য উপার্জন করতে হয়, এবং উপার্জনের জন্যে উল বুনতে হয় বোনকে। কিন্তু এতো পরিশ্রম করলে ওর চেহারায় তার ছাপ পড়বে, ওর বিয়ে দেওয়া মুশকিল হয়ে উঠবে। আমার ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায় বোনকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে আর ওকে দেখতে দেখতে। ওর হাতদুটো রুপালী মৎস্যকন্যার মতো, উলের কাঁটাগুলো ঝকঝক করে, আর একটা কি দুটো সেলাইঝুড়ি মেঝেতে রাখা থাকে, সুতোর গুলিগুলো লাফিয়ে বেড়ায় এদিক ওদিক। দারুণ দেখতে লাগে।
আমাদের বাড়িটা— যদিও পুরনো, ক্ষতবিক্ষত— কিন্তু পপলার গাছের জঙ্গলের মধ্যে হওয়ায় দূর থেকে দেখতে বেশ ভালই লাগে। সবুজ জঙ্গলের মধ্যে সাদা রঙের কাঠের বাড়ি, মাথার বর্ডারটা লাল রং। যদিও রং উঠে গেছে, সাদা রঙে কালো কালো ছোপ ধরেছে, তবে সৌন্দর্যের ছাপ এখনো স্পষ্ট ধরা পড়ে চেহারায়। আমাদের বাড়িটা দো’তলা। একতলায় সামনের দিকে ছোট্টো বসার ঘর, যার জানলাগুলো অবশ্য ভেঙে ভেঙে গেছে। বিভিন্ন আসবাব চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে জানলাগুলোকে। তবে দরজাটা আস্ত আছে, এবং শক্তও আছে। দেওয়ালে অনেক গর্ত। বুলেট লেগে ফুটো হয়ে গেলে যেমন হয় সেরকম। বসার ঘরের পিছন দিকে রান্নাঘর আর কলঘর। কলঘরের পিছন দিকে একটা দরজা আছে বাইরে যাওয়ার— বাড়ির বাইরে যাওয়ার। এই দরজাটা পুরোপুরি ভেঙে গেছে। কোনোরকমে কাঠের পাল্লাগুলো ঠেকনা দিয়ে রাখা আছে। তাও ফাঁক গলে ভিতরে ঢুকে আসা যায়। নেহাত এটা বাড়ির পিছন দিক, এবং এর ঠিক পরেই পপলার গাছের ঘন জঙ্গল শুরু হয়ে গেছে বলে এদিকে লোকেরা আসে না। কিন্তু কেউ এলেই দেখতে পাবে ভাঙা দরজাটা। তারা ভিতরে ঢুকে এলে আমাদের কিচ্ছু করার নেই। তবে বসার ঘর থেকে কলঘরে যাওয়ার মাঝে একটা দরজা আছে। সেটা দুর্বল হলেও আস্ত আছে।
বসার ঘরের মধ্যে দিয়েই উপরে ওঠার সিঁড়ি। ফায়ার প্লেসের পাশ দিয়ে। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই ডান দিকে, নীচের কলঘরের ঠিক মাথায়, স্নানঘর। এই স্নানঘরের পিছনে একটা দরজা আছে যেটা থেকে একটা মই লাগানো আছে নীচ পর্যন্ত। ওই মই দিয়ে নামলেই পপলার গাছের ঘন জঙ্গল। এই মইটা আজ অবধি ব্যবহার হতে দেখিনি আমি। সিঁড়ি দিয়ে উঠে সামনেই পাশাপাশি দুটো ঘর। আমরা দুজনে থাকি তাতে। আমাদের ঘরগুলো ছোটো, কিন্তু ভালো। সবথেকে ভালো হল ছাদের কয়েকটা ফুটো। বসার ঘরের দেওয়ালের বুলেটের গর্তের মতোই। এই ফুটোগুলো দিয়ে দিনের বেলা রোদ পড়ে মেঝেতে। মনে হয় স্পটলাইট ফেলছে ওরা আমাদের খুঁজতে। আর রাতের বেলা তারা দেখা যায়। মনে হয় অন্ধকারে ওরা যেন ওই ফুটোগুলোতে চোখ রেখে আমাদের দেখছে।
সেদিন রাতের কথা স্পষ্ট মনে আছে আমার। সেদিন খুব ঠাণ্ডা পড়েছিল। রাতে বরফ পড়বে নিশ্চিৎ। ডিনার হয়ে গেছে। বসার ঘরে বোন বসে বসে একটা মাফলার বুনছে। কালো-গোলাপি চেক-চেক। আমি অনেক দিন বাদে ট্রানজিস্টার শোনার চেষ্টা করছিলাম। প্রায় এক যুগ বাদে। এর আগে কবে শুনেছি মনেই পড়ে না। হয়তো কোনোদিন শুনিইনি। হাতে ট্রানজিস্টারটা নিয়ে চ্যানেল ধরার চেষ্টা করছিলাম। এখানে শুধু একটা চ্যানেলই আসে, বাকি সব বন্ধ। কিন্তু কিছুতেই ধরতে পারছিলাম না। খুব শীত করছিল আমার। শোয়ার আগে আর একবার নুন চা খাবো ভেবে ট্রানজিস্টারটা নিয়েই রান্নাঘরে যাচ্ছি। বসার ঘর আর রান্নাঘরের মাঝের দরজাটার কাছে যেতেই অনেকগুলো ভারী বুটের শব্দ ভেসে এল। সঙ্গে কিছু কথা, তবে অস্পষ্ট, হিসহিসে। বোনও শুনতে পেয়েছে শব্দগুলো। ও লাফ দিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়ায়।
—     দাদা, শুনতে পাচ্ছিস?
—     হ্যাঁ।
—     কলঘরের দরজাটা দিয়ে ঢুকেছে?
—     তাই হবে হয়তো।
—     ওরা তাহলে এসেই গেল?
—     হ্যাঁ।
—     এবার কি হবে আমাদের?
বোনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই ওই অদৃশ্য স্বরগুলো আরও খানিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মনে হয় আরও কাছে চলে এসেছে। আমি বোনকে খানিক ধাক্কা মেরে সরিয়ে রান্নাঘর আর বসার ঘরের মাঝের দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিই এপাশ থেকে। আমার এই বেমক্কা নড়াচড়ায় হাত থেকে ট্রানজিস্টারটা পড়ে গিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। আমার ধাক্কায় বোনের হাত থেকে উলের গোলাদুটোও পড়ে গিয়ে গড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে যায় এবং সেই অবস্থাতেই দরজাটা বন্ধ করে দিই আমি। ওই গোলাদুটো আর কোনোদিন পাওয়া যাবে না। ওগুলোও চলে গেল। আমাদের রান্নাঘর আর কলঘর ওরা দখল করে নিল।
রান্নাঘর আর কলঘরে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল আমাদের। উপরে একটা কলঘর আছে, অসুবিধে নেই। কিন্তু রান্নাঘরটা ওদের দখলে চলে গিয়ে খুব মুশকিল হয়ে গেছে। উপরেই ঘরের মধ্যে একটা ছোটো স্টোভ জ্বেলে কোনোরকমে খানিক রান্না করা হয়। কিন্তু তাতে তো আর লাভাসা বা শীরমাল বানানো যায় না! কিন্তু কিছুই করার নেই আমাদের। ওদিকে ট্রানজিস্টারটা সেদিন পড়ে গিয়ে খারাপ হয়ে গেছে। আর চলছে না। রান্নাঘরের ওদিক থেকে আর কোনো শব্দও অবশ্য কানে আসেনি এর মধ্যে। ওরা আমাদের বাড়ির পিছনের দিকটা দখল করেই মনে হয় ক্ষান্ত দিলো। অবশ্য বলা যায় না। কবে আবার অন্য কি করে বসে! সেই ভয়ে রাতে আমি আর ঘুমাতে পারি না। ইদানীং শোয়ার ঘরের ছাদের ফুঁটোগুলো দিয়ে তারা দেখা গেলে আমি শিউরে উঠি। ঘরের মধ্যে থাকতে পারি না। সিঁড়ির সামনেটায় পায়চারি করি। পাশের ঘরে বোন ঘুমায়। ঘুমালে ওর নাকে এক অদ্ভুত শোঁ শোঁ শব্দ হয়। ছোটোবেলা থেকেই ওর সর্দির ধাত। আমার অসহ্য লাগে ওই শব্দ। কোনো নিষ্প্রাণ বস্তু থেকে ভেসে আসা কোনো শব্দই আমি সহ্য করতে পারি না। সে বন্দুক হোক বা ট্রানজিস্টার। এমনকি ঘুমন্ত মানুষের নাক ডাকাও। ঘুমন্ত মানুষও তো প্রাণহীনই বটে! আমিও এই শব্দ শুনতেই পেতাম না যদি আমি ঘুমোতাম এখন। জেগে আছি, বেঁচে আছি, তাই শুনতে পাচ্ছি। বেশিক্ষণ কোনো নিষ্প্রাণ বস্তু থেকে বেরনো শব্দ শুনলে মনে হয় আমিও প্রাণহীন হয়ে পড়ছি। ঠিক যেন ম্যানিক্যিন— অবিকল মানুষের মতো দেখতে, অথচ প্রাণহীন।
সেদিনও রাতে একইভাবে আমি পায়চারি করছিলাম সিঁড়ির সামনেটায়। বোনের ঘর থেকে অদ্ভুত শোঁ শোঁ শব্দ বেরোচ্ছিল। কি মনে হল ট্রানজিস্টারটা চালু করলাম। সেদিনই ওটা সারিয়ে এনেছি বাজার থেকে। সবে সেই একমাত্র যে চ্যানেলটা আসে সেটা ধরতে যাব, এর মধ্যেই সেই ভারী বুটের শব্দ শোনা যায় আবার। সেইদিনের মতো। অনেকগুলো বুট। এবং হিসহিস করে বলতে থাকা অস্পষ্ট কিছু কথা। এবারে কিন্তু রান্নাঘর থেকে আসছে না সেই শব্দ। নীচের বসার ঘর থেকে আসছে। তার মানে ওরা আমাদের বাড়ির সামনের দিকটাও দখল করে নিয়েছে! এবার যেকোনো মুহূর্তে উপরে উঠে আসবে সিঁড়ি দিয়ে! আমাদের কাছে চলে আসবে! হাতে এক মুহূর্তও সময় নেই। এক ঝটকায় ট্রানজিস্টারটা ফেলে দিই। ওটা গড়িয়ে গিয়ে পড়ে সিঁড়িতে। সেই অবস্থাতেই চলতে থাকে। আমি এক ধাক্কায় বোনের ঘরের দরজা খুলে ঘুমন্ত ম্যানিক্যিনের মতো নিষ্প্রাণ বোনকে কাঁধে তুলে নিয়ে উপরের কলঘরের পিছনের দরজাটা খুলে মই বেয়ে নামতে থাকি নীচে, পিছনের পপলার জঙ্গলের দিকটায়। দূরে, সিঁড়ি থেকে তখনও অস্পষ্ট কথা ভেসে আসছে, আর ভেসে আসছে বুটের শব্দ। ওরা উঠে আসছে উপরে আমাদের এলাকা দখল করবে বলে। গোটা বাড়িটাই দখল করবে বলে। আমি যখন থামি ওরা তখন আমাদের বাড়ির মধ্যে, আর আমরা আমাদের বাড়ির বাইরে— জঙ্গলে। এই জঙ্গলের মধ্যে সাধারণত কেউ আসে না। কেউ আমাদের খুঁজে পাবে না। কিন্তু তখনও নিস্তব্ধ রাতে দূর থেকে শব্দ ভেসে আসে— ভারী বুটের আর হিসহিসে কথার। বন্দুকের শব্দও কি ভেসে আসে দূর থেকে? আমাদের দখল হয়ে যাওয়া বাড়ি থেকে? বুঝে উঠতে পারি না আর। ওই সমস্ত শব্দে আমার মনে হতে থাকে আমি যেন সাড় হারিয়ে ফেলছি। ক্রমশ প্রাণহীন হয়ে পড়ছি। পপলার গাছের পাতায় ঢাকা পড়ে যাওয়ায় এখানে আর আকাশ দেখা যায় না। কেউ আর এখানে আমাদের উপর নজর রাখতে পারে না। কেউ দেখতে পায় না।
কেউ যদি কোনোদিন ওই পুরনো, দখল হারিয়ে ফেলা বাড়িটার পিছনের ঘন পপলার জঙ্গলে যায়, দেখতে পাবে দুটো ম্যানিক্যিন উপুড় হয়ে পড়ে আছে মাটিতে— একটা ছেলের আর একটা মেয়ের— আর তাদের পায়ে নয়, একেবারে পিঠের বাঁ দিকে দুটো ফুঁটো যা থেকে কালো শক্ত হয়ে বসে যাওয়া কিছু একটা তরল পদার্থ গড়িয়ে পড়েছিল কোনো এক কালে।

[‘কাশ্মীর হামারে হ্যায়’ গল্পটির মাধ্যমে হুলিও কোর্তাসার-এর ‘হাউস টেকেন ওভার’ গল্পটিকে ‘দখল’ করা হয়েছে। গল্পটির কাঠামো, অনুপ্রেরণা সবকিছুই হল কোর্তাসার-এর। মূল গল্পটির বিনির্মাণের পরে বাকি যদি কিছু পরে থাকে তা আমার। – লেখক]


অদ্বয় চৌধুরী

Adway Chowdhury

Saturday, November 26, 2016

নিষেধাজ্ঞা : অদ্বয় চৌধুরী

নিষেধাজ্ঞা

“আজ রাত দশটা থেকে রাজপথে পায়ে হেঁটে যাতায়াত নিষিদ্ধ।”
       সেদিন সন্ধে থেকে গোটা এলাকা পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছিল, টিভি-রেডিও সর্বত্র ঘোষণা হচ্ছিল লাগাতার। সকলেই জেনে যায় এই নিষেধাজ্ঞা। যারা অনেক রাত করে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরে তারা সেদিন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসেছিল।

       যারা রাজপথে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করেনা, যাদের গাড়ি আছে, তারা বেজায় খুশি হয়েছিল এই নিষেধাজ্ঞায়। রাস্তায় ভিড় কমবে, ট্রাফিক জ্যাম কমবে। গাড়ির দোকানদাররাও খুশি হয়েছিল। এবার গাড়ির বিক্রি বাড়বে। উপরমহলের তরফে বলা হয় পায়ে হেঁটে যাতায়াত করলেও যাদের বাড়িতে গাড়ি লুকিয়ে রাখা আছে, বা অন্যত্র তাদের গাড়ি বেনামে খাটছে, সেইসব লোকের লুকানো গাড়ি ধরার উদ্দেশ্যেই এই নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু ব্যাপারটা যে তা নয় তা গাড়িওয়ালা এবং গাড়ির দোকানদাররা জানত। এই সিদ্ধান্ত মূলত এলাকার সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থেই— সকলেই যাতে ‘গাড়িওয়ালা’ শ্রেণিতে উন্নীত হয়। যাদের গাড়ি নেই, অথবা গাড়ি কেনার কোনোভাবেই সামর্থ্য নেই, তারা এলাকা ছেড়ে চলে যাবে, অথবা না খেতে পেয়ে মারা যাবে।

       পরের দিন রাস্তা একেবারে শুনশান। হাতে গোনা কয়েকটা গাড়ি প্রচণ্ড গতিতে যাতায়াত করছে। ফুটপাথে কোনো লোক নেই। দু-একটা বড় দোকান আর সমস্ত গাড়ির দোকান ছাড়া আর কোনো দোকান খোলেনি। কোনো নতুন গাড়িও কিন্তু রাস্তায় দেখা যায় না। না লুকিয়ে রাখা গাড়ি, না নতুন কেনা গাড়ি। আগে যেগুলো চলত সেগুলোই শুধু দেখা যায়।

Sunday, November 13, 2016

অনুবাদ: চারটি কবিতা - সম্বুদ্ধ ঘোষ


নস্ট্যালজিয়া
আর্সেনিয় তারকোভস্কি
Arsenii Tarkovsky : ‘Nostalgia’

ছেলেবেলায় একবার ভুগেছি
ক্ষিদেয় আর ভয়ে। শক্ত আঁশ ছাড়িয়ে
জিভ বুলিয়েছি ঠোঁটে। মনে পড়ে
শীতল নোনাস্বাদ সেইসব, তবু
আবার বসেছি সদরের সিঁড়িতে ওম পেতে,
জ্বরের বিকারে আমি ঘুরেছি
নদীমুখে বাঁশিওয়ালার সুরে;
ওম পেতে সদরের সিঁড়িতে বসে আমি--

দাঁড়িয়ে রয়েছে মা, ডাকছে আমায়
সাতটা ধাপ দূরে;
এগিয়ে গিয়েছি, তবু সাতটা ধাপ দূরে
ওই দাঁড়িয়ে রয়েছে মা, ডাকছে আমায়
ওই দূর থেকে।

জ্বর নেমে এল,
কলারের বোতাম খুলে শুয়ে পড়ি,
আর শিঙার ভোঁ শুরু হল,
আলোর চাবুক লাগল চোখের পাতায়,
আর ঘোড়াদের নাদ ভেসে এল--
পাথুরে জমির 'পরে ওই
উড়ে যাচ্ছে মা,
ওই মিলিয়ে গেল...

এখন দেখি আপেলবীথিকার ফাঁকে
শাদা ওয়ার্ড এক, আমার গলা পর্যন্ত
টানা শাদা বেডশীট, শাদা ডাক্তার
ঝুঁকে পড়ে, আর শাদা নার্স ডানা গোটাচ্ছে
পায়ের কাছে এসে। ওরা সব র'য়ে গেল,

শুধু মা এসে ডাকল আমায়
ওই দূর থেকে,
আর বাতাসে মিলিয়ে গেল...




Saturday, November 5, 2016

মারি স্লেইট-এর দ্য আন্তিগোনে পোয়েমস - অনুবাদ: অর্ক চট্টোপাধ্যায়

দ্য আন্তিগোনে পোয়েমস
মারি স্লেইট

(১)
আমার করোটির ভেতর (সব)
ওই ক্ষুধার্ত বায়স-ধ্বনি
আগুন
অত্যাচারের ডাকে ডাকে

আমার হৃদয়ের ভেতর (শুধু)
ওই শেষ কম্পন
ফিসফিসে গানের মধ্যে
যন্ত্রণা

Wednesday, June 1, 2016

আপোষ (Making Do) : ইতালো কালভিনো / অনুবাদ: অর্ক চট্টোপাধ্যায়

 আপোষ (Making Do) : ইতালো কালভিনো

এক যে ছিল রাজ্য যেখানে সবই ছিল বারণ।
যেহেতু শুধু ডাঙ্গুলি খেলা বারণ ছিল না, রাজ্যের লোকজন মাঠেঘাটে একজোট হয়ে ডাঙ্গুলি খেলে সময় কাটাত।
  
যেহেতু নিষেধের নিয়মগুলো এক এক করে এবং বেশ জোরালো কারণসহ লাগু করা হয়েছিল সেগুলো নিয়ে কারুর মনে কোন দ্বন্দ্ব বা অভিযোগ ছিল না। সবাই সহজেই সেসব আইনে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছিল।
এভাবেই অনেকগুলো বছর কাটলো। একদিন কনস্টেবলরা দেখল সব জিনিস নিষেধ করার আর কোন কারণ নেই। তাই তারা সংবাদ-প্রেরকদের হাতে খবর পাঠালো যে প্রজারা এখন যা ইচ্ছে তাই করতে পারেন।
দূতেরা মাঠেঘাটে যেখানে লোকেরা একজোট হত সেখানে পৌছলো।
"শোনো সবাই শোনো", তারা ঘোষণা করলো, "আজ থেকে আর কোনকিছুই বারণ নয়।"
লোকজন ডাঙ্গুলি খেলেই চললো।
"কি বুঝলে?" তারা বলতে লাগলো, "যা ইচ্ছে তাই করতে পারো সবাই।"
প্রজারা উত্তর দিলো, "বেশ তো, আমরা ডাঙ্গুলি খেলছি।"
সংবাদ-প্রেরকেরা অতীতের বহুবিচিত্র এবং বর্ণময় কর্মযজ্ঞের কথা তাদের মনে করালো; আবার তাদের জানালো যে চাইলে এখন তারা পুনরায় সেইসব করতে পারে। কিন্তু প্রজারা কর্ণপাত না করে নিজেদের মত ডাঙ্গুলি খেলে যেতে লাগলো। রুদ্ধশ্বাসে স্ট্রোকের পর স্ট্রোক নিয়ে চললো।
তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা অরণ্যে রোদনের সামিল দেখে হতাশ দূতের দল কনস্টেবলদের কাছে ফেরত গিয়ে গোটা ব্যপারটা জানালো।
তারা বললো, "এই ব্যপার? বেশ তো, এক কাজ করো না, ঘোষণা করে দাও যে ডাঙ্গুলি খেলা নিষেধ।"
এই নতুন নিষেধাজ্ঞা শোনামাত্র প্রজারা রক্তাক্ত সংগ্রামের মধ্য দিয়ে দূতেদের হত্যা করলো।

তারপর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে তারা আবার ডাঙ্গুলি খেলতে লাগলো।



অনুবাদ: অর্ক চট্টোপাধ্যায়
Translation: Arka Chattopadhyay