Jyotirmoy Shishu

Jyotirmoy Shishu
Showing posts with label গদ্য. Show all posts
Showing posts with label গদ্য. Show all posts

Sunday, May 14, 2017

কাশ্মীর হামারে হ্যায় : অদ্বয় চৌধুরী

কাশ্মীর হামারে হ্যায়

কাঠের এই বাড়িটা আমাদের খুব পছন্দ। তার অনেক কারণ আছে। আমাদের দু’জনের পক্ষে বেশ বড় আকারের হওয়ার পাশাপাশি বাড়িটা বহু পুরনো হওয়ায় বাপঠাকুরদাদের স্মৃতি বহন করে। আমাদের ছেলেবেলার সমস্ত স্মৃতিও জড়িয়ে আছে এর সঙ্গে। বোন আর আমি এই বাড়িটায় একা একাই থাকি। বাবা, মা, কাকা, ঠাকুরদা, ঠাকুরমা আর নেই। ওরা এসে নিয়ে গেছে ওদের। আমাদের নেয়নি ওরা, কারণ আমরা তখন ছোটো ছিলাম। সেই সমস্ত স্মৃতি এই বাড়িটা ঘিরেই রয়েছে। ওদের আসা, বাবা-মা-কাকাদের চলে যাওয়া, আমাদের থেকে যাওয়া— সব।
আমরা বেশ সকাল সকাল উঠে পড়ি ঘুম থেকে। তারপর ন’টার মধ্যে অল্প খেয়ে আমি বাজারে যাই বোনের বোনা শীতের পোষাক পুঁটলি বেঁধে। সারাদিন সেখানে রাস্তার ধারে পসরা সাজিয়ে সেগুলো বিক্রি করি। দুটো ম্যানিক্যিনকে— একটা ছেলে আর একটা মেয়ে— বিভিন্ন সোয়েটার বা জ্যাকেট পরিয়ে সাজিয়ে রাখি রাস্তার ধারে। লোকের চোখ পড়ে বেশি। যদিও বিক্রি খুব কমই হয় তারপরেও। আমার মতো হাজার হাজার বিক্রেতা রয়েছে ওখানে। তারপর অন্ধকার ও শীত জাঁকিয়ে পড়লে পোষাকের পুঁটলি আর দুটো ম্যানিক্যিনকে ভ্যানে চাপিয়ে বাড়ি ফিরে আসি। বাড়িটা ঝারপোঁছ করে পরিষ্কার রাখা আমার পক্ষে সম্ভব হয় না। বোন সারাদিন বাড়ি থাকে, কিন্তু ওর পক্ষেও সম্ভব না।
বোন কখনো কাউকে বিরক্ত করে না। ও ওর মতো থাকে, কাজ করে। সকালের কাজকর্ম শেষ হয়ে গেলে ও বাকি দিনটা নিজের শোয়ার ঘরে বা নীচের বসার ঘরে উল বুনে কাটিয়ে দেয়। বোন সেই ছোটোবেলাতেই, যখন মা-ঠাকুরমা ছিল, উল বোনা শিখেছিল। তারপর থেকে ও সব সময় দরকারি জিনিসপত্রই বোনে— শীতের সোয়েটার, মোজা, টুপি, মাফলার, শাল, জ্যাকেট এইসব। ও একটু খামখেয়ালি গোছের মেয়ে। কখনো হয়তো ও একটা জ্যাকেট বুনলো, কিন্তু পরের মুহূর্তেই সেটা খুলে ফেলে কারণ সেটার কিছু একটা ওকে খুশি করতে পারেনি। এইসব দেখতে বেশ মজাই লাগে আমার। একগাদা উলের গোছ ওর সেলাইয়ের বাক্সে একটা হেরে যাওয়া যুদ্ধ লড়ে চলেছে স্রেফ কয়েক ঘণ্টার জন্য নিজেদের অস্তিত্ব বজায় রাখার প্রবল ইচ্ছায়।
শনিবারে আমি শহরে যাই উল কিনতে। আমার পছন্দের প্রতি বোনের ভরসা প্রচুর। আমার পছন্দের রং নিয়ে সে খুশিই হয় এবং কোনো গোছই কোনোদিন ফেরত দিতে হয়নি। এই শহরে যাওয়ার সুযোগে নিয়ে আমি এলাকার খবর জোগাড় করে আনি। আমাদের বাড়িতে টিভি নেই, ট্রানজিস্টার থাকলেও শোনা হয় না। ইন্টারনেটের তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। এখানে এমনিই প্রচুর বিধিনিষেধ। অনেক কিছুই নিষিদ্ধ। তাই শহর থেকেই খবর সংগ্রহ করতে হয়। আবার কোনো নতুন গণ্ডগোল হচ্ছে কি না আমাদের এখানে, আবার নতুন করে কেউ খুন গুম হল কি না, কেউ খুন হল কি না— এই সব খবর সংগ্রহ করি। খবরে অবশ্য কোনো পরিবর্তন ঘটে না। গণ্ডগোল লেগেই থাকে এখানে।
তবে আমি গণ্ডগোল নিয়ে কথা বলতে চাই না। আমার ভয় করে। আমি শুধু বাড়িটা সম্বন্ধে কথা বলতে চাই— বাড়ি আর বোন সম্বন্ধে। আমি ভাবি একদিন বোনের বিয়ে দিতে হবে। ওর তো একটা ভবিষ্যৎ আছে। উল বোনা ছাড়া বোন আর কিছু করে কি? একদিন হঠাৎ আবিষ্কার করলাম ঘরের আলমারিটা বিভিন্ন রঙের উলের পোষাকে ঠাসা রয়েছে। প্রচণ্ড সোঁদা গন্ধের মধ্যে স্তুপ করা রয়েছে ওগুলো, স্যাঁতসেঁতে অবস্থায়। এতো পোষাক বুনেছে এর মধ্যে বোন? এটা ঠিক যে আমাদের জীবনধারণের জন্য উপার্জন করতে হয়, এবং উপার্জনের জন্যে উল বুনতে হয় বোনকে। কিন্তু এতো পরিশ্রম করলে ওর চেহারায় তার ছাপ পড়বে, ওর বিয়ে দেওয়া মুশকিল হয়ে উঠবে। আমার ঘণ্টার পর ঘণ্টা কেটে যায় বোনকে নিয়ে ভাবতে ভাবতে আর ওকে দেখতে দেখতে। ওর হাতদুটো রুপালী মৎস্যকন্যার মতো, উলের কাঁটাগুলো ঝকঝক করে, আর একটা কি দুটো সেলাইঝুড়ি মেঝেতে রাখা থাকে, সুতোর গুলিগুলো লাফিয়ে বেড়ায় এদিক ওদিক। দারুণ দেখতে লাগে।
আমাদের বাড়িটা— যদিও পুরনো, ক্ষতবিক্ষত— কিন্তু পপলার গাছের জঙ্গলের মধ্যে হওয়ায় দূর থেকে দেখতে বেশ ভালই লাগে। সবুজ জঙ্গলের মধ্যে সাদা রঙের কাঠের বাড়ি, মাথার বর্ডারটা লাল রং। যদিও রং উঠে গেছে, সাদা রঙে কালো কালো ছোপ ধরেছে, তবে সৌন্দর্যের ছাপ এখনো স্পষ্ট ধরা পড়ে চেহারায়। আমাদের বাড়িটা দো’তলা। একতলায় সামনের দিকে ছোট্টো বসার ঘর, যার জানলাগুলো অবশ্য ভেঙে ভেঙে গেছে। বিভিন্ন আসবাব চাপা দিয়ে রাখা হয়েছে জানলাগুলোকে। তবে দরজাটা আস্ত আছে, এবং শক্তও আছে। দেওয়ালে অনেক গর্ত। বুলেট লেগে ফুটো হয়ে গেলে যেমন হয় সেরকম। বসার ঘরের পিছন দিকে রান্নাঘর আর কলঘর। কলঘরের পিছন দিকে একটা দরজা আছে বাইরে যাওয়ার— বাড়ির বাইরে যাওয়ার। এই দরজাটা পুরোপুরি ভেঙে গেছে। কোনোরকমে কাঠের পাল্লাগুলো ঠেকনা দিয়ে রাখা আছে। তাও ফাঁক গলে ভিতরে ঢুকে আসা যায়। নেহাত এটা বাড়ির পিছন দিক, এবং এর ঠিক পরেই পপলার গাছের ঘন জঙ্গল শুরু হয়ে গেছে বলে এদিকে লোকেরা আসে না। কিন্তু কেউ এলেই দেখতে পাবে ভাঙা দরজাটা। তারা ভিতরে ঢুকে এলে আমাদের কিচ্ছু করার নেই। তবে বসার ঘর থেকে কলঘরে যাওয়ার মাঝে একটা দরজা আছে। সেটা দুর্বল হলেও আস্ত আছে।
বসার ঘরের মধ্যে দিয়েই উপরে ওঠার সিঁড়ি। ফায়ার প্লেসের পাশ দিয়ে। সিঁড়ি দিয়ে উঠেই ডান দিকে, নীচের কলঘরের ঠিক মাথায়, স্নানঘর। এই স্নানঘরের পিছনে একটা দরজা আছে যেটা থেকে একটা মই লাগানো আছে নীচ পর্যন্ত। ওই মই দিয়ে নামলেই পপলার গাছের ঘন জঙ্গল। এই মইটা আজ অবধি ব্যবহার হতে দেখিনি আমি। সিঁড়ি দিয়ে উঠে সামনেই পাশাপাশি দুটো ঘর। আমরা দুজনে থাকি তাতে। আমাদের ঘরগুলো ছোটো, কিন্তু ভালো। সবথেকে ভালো হল ছাদের কয়েকটা ফুটো। বসার ঘরের দেওয়ালের বুলেটের গর্তের মতোই। এই ফুটোগুলো দিয়ে দিনের বেলা রোদ পড়ে মেঝেতে। মনে হয় স্পটলাইট ফেলছে ওরা আমাদের খুঁজতে। আর রাতের বেলা তারা দেখা যায়। মনে হয় অন্ধকারে ওরা যেন ওই ফুটোগুলোতে চোখ রেখে আমাদের দেখছে।
সেদিন রাতের কথা স্পষ্ট মনে আছে আমার। সেদিন খুব ঠাণ্ডা পড়েছিল। রাতে বরফ পড়বে নিশ্চিৎ। ডিনার হয়ে গেছে। বসার ঘরে বোন বসে বসে একটা মাফলার বুনছে। কালো-গোলাপি চেক-চেক। আমি অনেক দিন বাদে ট্রানজিস্টার শোনার চেষ্টা করছিলাম। প্রায় এক যুগ বাদে। এর আগে কবে শুনেছি মনেই পড়ে না। হয়তো কোনোদিন শুনিইনি। হাতে ট্রানজিস্টারটা নিয়ে চ্যানেল ধরার চেষ্টা করছিলাম। এখানে শুধু একটা চ্যানেলই আসে, বাকি সব বন্ধ। কিন্তু কিছুতেই ধরতে পারছিলাম না। খুব শীত করছিল আমার। শোয়ার আগে আর একবার নুন চা খাবো ভেবে ট্রানজিস্টারটা নিয়েই রান্নাঘরে যাচ্ছি। বসার ঘর আর রান্নাঘরের মাঝের দরজাটার কাছে যেতেই অনেকগুলো ভারী বুটের শব্দ ভেসে এল। সঙ্গে কিছু কথা, তবে অস্পষ্ট, হিসহিসে। বোনও শুনতে পেয়েছে শব্দগুলো। ও লাফ দিয়ে আমার পাশে এসে দাঁড়ায়।
—     দাদা, শুনতে পাচ্ছিস?
—     হ্যাঁ।
—     কলঘরের দরজাটা দিয়ে ঢুকেছে?
—     তাই হবে হয়তো।
—     ওরা তাহলে এসেই গেল?
—     হ্যাঁ।
—     এবার কি হবে আমাদের?
বোনের প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার আগেই ওই অদৃশ্য স্বরগুলো আরও খানিক স্পষ্ট হয়ে ওঠে। মনে হয় আরও কাছে চলে এসেছে। আমি বোনকে খানিক ধাক্কা মেরে সরিয়ে রান্নাঘর আর বসার ঘরের মাঝের দরজাটা সজোরে বন্ধ করে দিই এপাশ থেকে। আমার এই বেমক্কা নড়াচড়ায় হাত থেকে ট্রানজিস্টারটা পড়ে গিয়ে বন্ধ হয়ে যায়। আমার ধাক্কায় বোনের হাত থেকে উলের গোলাদুটোও পড়ে গিয়ে গড়িয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে যায় এবং সেই অবস্থাতেই দরজাটা বন্ধ করে দিই আমি। ওই গোলাদুটো আর কোনোদিন পাওয়া যাবে না। ওগুলোও চলে গেল। আমাদের রান্নাঘর আর কলঘর ওরা দখল করে নিল।
রান্নাঘর আর কলঘরে যাওয়া বন্ধ হয়ে গেল আমাদের। উপরে একটা কলঘর আছে, অসুবিধে নেই। কিন্তু রান্নাঘরটা ওদের দখলে চলে গিয়ে খুব মুশকিল হয়ে গেছে। উপরেই ঘরের মধ্যে একটা ছোটো স্টোভ জ্বেলে কোনোরকমে খানিক রান্না করা হয়। কিন্তু তাতে তো আর লাভাসা বা শীরমাল বানানো যায় না! কিন্তু কিছুই করার নেই আমাদের। ওদিকে ট্রানজিস্টারটা সেদিন পড়ে গিয়ে খারাপ হয়ে গেছে। আর চলছে না। রান্নাঘরের ওদিক থেকে আর কোনো শব্দও অবশ্য কানে আসেনি এর মধ্যে। ওরা আমাদের বাড়ির পিছনের দিকটা দখল করেই মনে হয় ক্ষান্ত দিলো। অবশ্য বলা যায় না। কবে আবার অন্য কি করে বসে! সেই ভয়ে রাতে আমি আর ঘুমাতে পারি না। ইদানীং শোয়ার ঘরের ছাদের ফুঁটোগুলো দিয়ে তারা দেখা গেলে আমি শিউরে উঠি। ঘরের মধ্যে থাকতে পারি না। সিঁড়ির সামনেটায় পায়চারি করি। পাশের ঘরে বোন ঘুমায়। ঘুমালে ওর নাকে এক অদ্ভুত শোঁ শোঁ শব্দ হয়। ছোটোবেলা থেকেই ওর সর্দির ধাত। আমার অসহ্য লাগে ওই শব্দ। কোনো নিষ্প্রাণ বস্তু থেকে ভেসে আসা কোনো শব্দই আমি সহ্য করতে পারি না। সে বন্দুক হোক বা ট্রানজিস্টার। এমনকি ঘুমন্ত মানুষের নাক ডাকাও। ঘুমন্ত মানুষও তো প্রাণহীনই বটে! আমিও এই শব্দ শুনতেই পেতাম না যদি আমি ঘুমোতাম এখন। জেগে আছি, বেঁচে আছি, তাই শুনতে পাচ্ছি। বেশিক্ষণ কোনো নিষ্প্রাণ বস্তু থেকে বেরনো শব্দ শুনলে মনে হয় আমিও প্রাণহীন হয়ে পড়ছি। ঠিক যেন ম্যানিক্যিন— অবিকল মানুষের মতো দেখতে, অথচ প্রাণহীন।
সেদিনও রাতে একইভাবে আমি পায়চারি করছিলাম সিঁড়ির সামনেটায়। বোনের ঘর থেকে অদ্ভুত শোঁ শোঁ শব্দ বেরোচ্ছিল। কি মনে হল ট্রানজিস্টারটা চালু করলাম। সেদিনই ওটা সারিয়ে এনেছি বাজার থেকে। সবে সেই একমাত্র যে চ্যানেলটা আসে সেটা ধরতে যাব, এর মধ্যেই সেই ভারী বুটের শব্দ শোনা যায় আবার। সেইদিনের মতো। অনেকগুলো বুট। এবং হিসহিস করে বলতে থাকা অস্পষ্ট কিছু কথা। এবারে কিন্তু রান্নাঘর থেকে আসছে না সেই শব্দ। নীচের বসার ঘর থেকে আসছে। তার মানে ওরা আমাদের বাড়ির সামনের দিকটাও দখল করে নিয়েছে! এবার যেকোনো মুহূর্তে উপরে উঠে আসবে সিঁড়ি দিয়ে! আমাদের কাছে চলে আসবে! হাতে এক মুহূর্তও সময় নেই। এক ঝটকায় ট্রানজিস্টারটা ফেলে দিই। ওটা গড়িয়ে গিয়ে পড়ে সিঁড়িতে। সেই অবস্থাতেই চলতে থাকে। আমি এক ধাক্কায় বোনের ঘরের দরজা খুলে ঘুমন্ত ম্যানিক্যিনের মতো নিষ্প্রাণ বোনকে কাঁধে তুলে নিয়ে উপরের কলঘরের পিছনের দরজাটা খুলে মই বেয়ে নামতে থাকি নীচে, পিছনের পপলার জঙ্গলের দিকটায়। দূরে, সিঁড়ি থেকে তখনও অস্পষ্ট কথা ভেসে আসছে, আর ভেসে আসছে বুটের শব্দ। ওরা উঠে আসছে উপরে আমাদের এলাকা দখল করবে বলে। গোটা বাড়িটাই দখল করবে বলে। আমি যখন থামি ওরা তখন আমাদের বাড়ির মধ্যে, আর আমরা আমাদের বাড়ির বাইরে— জঙ্গলে। এই জঙ্গলের মধ্যে সাধারণত কেউ আসে না। কেউ আমাদের খুঁজে পাবে না। কিন্তু তখনও নিস্তব্ধ রাতে দূর থেকে শব্দ ভেসে আসে— ভারী বুটের আর হিসহিসে কথার। বন্দুকের শব্দও কি ভেসে আসে দূর থেকে? আমাদের দখল হয়ে যাওয়া বাড়ি থেকে? বুঝে উঠতে পারি না আর। ওই সমস্ত শব্দে আমার মনে হতে থাকে আমি যেন সাড় হারিয়ে ফেলছি। ক্রমশ প্রাণহীন হয়ে পড়ছি। পপলার গাছের পাতায় ঢাকা পড়ে যাওয়ায় এখানে আর আকাশ দেখা যায় না। কেউ আর এখানে আমাদের উপর নজর রাখতে পারে না। কেউ দেখতে পায় না।
কেউ যদি কোনোদিন ওই পুরনো, দখল হারিয়ে ফেলা বাড়িটার পিছনের ঘন পপলার জঙ্গলে যায়, দেখতে পাবে দুটো ম্যানিক্যিন উপুড় হয়ে পড়ে আছে মাটিতে— একটা ছেলের আর একটা মেয়ের— আর তাদের পায়ে নয়, একেবারে পিঠের বাঁ দিকে দুটো ফুঁটো যা থেকে কালো শক্ত হয়ে বসে যাওয়া কিছু একটা তরল পদার্থ গড়িয়ে পড়েছিল কোনো এক কালে।

[‘কাশ্মীর হামারে হ্যায়’ গল্পটির মাধ্যমে হুলিও কোর্তাসার-এর ‘হাউস টেকেন ওভার’ গল্পটিকে ‘দখল’ করা হয়েছে। গল্পটির কাঠামো, অনুপ্রেরণা সবকিছুই হল কোর্তাসার-এর। মূল গল্পটির বিনির্মাণের পরে বাকি যদি কিছু পরে থাকে তা আমার। – লেখক]


অদ্বয় চৌধুরী

Adway Chowdhury

Saturday, April 15, 2017

দ্রিম দ্রিম ৪ | ম্যাগনোলিয়া, রেড ওয়াইন অ্যান্ড চীজ : দোয়েলপাখি দাশগুপ্ত

দ্রিম দ্রিম ৪ ম্যাগনোলিয়া, রেড ওয়াইন অ্যান্ড চীজ
আস্তাবলের দিকটা না। ম্যাগনোলিয়া ছিল এদিকটায়। গ্লেনারিজ, কেভেন্টারস ছাড়িয়ে আরও একটু এগিয়ে বাঁ দিকে। জামাকাপড়... ডেনিম জ্যাকেট, জেগিংস-এর দোকান... সেগুলো পেরিয়ে কুংগা যাওয়ার রাস্তাটায়। সাদা সবুজ লাল মেশানো কাঠের বাড়ি। ছবির বইয়ের মতো জানালা। আইভিলতাও ঝোলে বোধ হয়। আমি আইভি দেখিনি যদিও কখনও। নীচে ডানদিকে বাজারে নেমে যাওয়ার সিঁড়ি। হিল কার্ট রোডের দিকে। আমি ঠেলেঠুলে একটা সরু গলির মধ্যে দিয়ে উঠতে থাকি। ম্যাগনোলিয়া একবার দেখে আসা দরকার। সরু গলি। কিন্তু অন্ধকার নয়। ওপর দিকের বাড়িগুলোর টিনের চাল আর কার্নিসের ফাঁকফোকর দিয়ে আলো আসছে অনেক। দুপাশে লোক দাঁড়িয়ে। কেউ বিরক্ত করছে না। যে যার মতো ব্যস্ত। সিগারেট খাচ্ছে। গল্প করছে। ওয়াই ওয়াই খাচ্ছে। পাশ দিয়ে সরিয়ে সরিয়ে এগোতে হচ্ছে। ম্যাগনোলিয়ার সামনে এসে পড়লাম।
এটা তো বেশ বড় একটা হামাম! হোটেল ভেবে এদিকে বুক করে ফেলল মৈত্রেয়। ওই তো... জাপানি বাড়ির মতো, চাল দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে অল্প। ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’-র বাড়িটার মতো। আমি ভেতরে ঢুকি। ঘন বোতল সবুজ অন্ধকার। তার মাঝখান থেকে চাপা রক্তের মতো লাল রঙের দেওয়াল দেখা যাচ্ছে। বাষ্পে আধো-অদেখা হয়ে আছে গোটাটা। কাচের দরজা খুলে ঢুকতে ঢুকতে টের পাই আমার হাইট কমে গেছে।আমি একটা উঁচু-হিল জুতো পরে। আমার গায়ে একটাসাদা শার্ট আর গ্রে রঙের পেন্সিল স্কার্ট

Saturday, April 8, 2017

জোকারের বালের যুগ্যি নয় ওরা : পুরন্দর ভাট

জোকারের বালের যুগ্যি নয় ওরা

বাঁকুড়া মিমস পেজটা বোধয় ফেসবুক বন্ধ করে দেবে। এই পেজটি বহুবার বিতর্কে জড়িয়েছে। পিডোফিলিয়া নিয়ে একবার বিতর্কে পড়েছিল, বর্ণবিদ্বেষী, নারীবিদ্বেষী পোস্ট করে বিতর্কে জড়িয়েছে, এবার ক্যান্সার পেশেন্টদের কেমোথেরাপির ফলে টাক পড়ে যাওয়া নিয়ে রসিকতা করে বিতর্কে জড়িয়েছে। বহু লোকে রিপোর্ট করেছেন পেজ। সিগনেচার ক্যাম্পেন হয়েছে পেজটাকে সরাবার জন্যে। অনেকেই এমন বলছেন যে যাঁরা ওই পেজটাকে লাইক করেছে তারা যদি আনলাইক না করে তাহলে আনফ্রেন্ড করে দেবে। অর্থাৎ এই রামনবমী আর ভোঁতা তলোয়ার নিয়ে লম্ফ ঝম্পর বাজারেও খানিকটা ফুটেজ খেয়েছে পেজটা। এবার আসা যাক বিতর্কর প্রসঙ্গে।

প্রথমেই যেটা পরিষ্কার করে দেওয়া দরকার যে "ইয়ার্কি মারবার একটা লিমিট আছে, ক্যান্সার পেশেন্ট নিয়ে ইয়ার্কি বা মেয়েদের মাসিক হওয়া নিয়ে ইয়ার্কি মারা প্রচন্ড ইনসেন্সিটিভ" - এই যুক্তির একটা অংশ সঠিক কিন্তু অন্য অংশটা গরুর গোবর। সঠিক হলো "ইনসেন্সিটিভি" আর গোবর হলো "লিমিট আছে।" লিমিট যদি টানেন সেটা কোথায় টানবেন? কেউ ক্যান্সার পেশেন্ট নিয়ে ইয়ার্কি মারাকে লিমিট অতিক্রম করা বলবেন আর কেউ বলবেন গরুকে নিয়ে ইয়ার্কি মারা হলো লিমিট। একটা লিমিট টানাকে সমর্থন করলেই অন্য লিমিটের বিরোধিতা করবেন কী ভাবে? তাই এই লিমিট টানার ব্যাপারটা হলো গোবরের মতো। বিশ্বের সব কিছু নিয়ে ইয়ার্কি মারতেই পারে কেউ, আমি তার প্রতিবাদ করবো, কিন্তু তার জন্য তাকে জেলে পুরে দেবো বা তার বলার বা লেখার অধিকার কেড়ে নেবো না। লিমিট টানতে থাকলে পেহেলাজ নিহালনিকে বরং একবার রোজ সকালে প্রণাম করে নেওয়া দরকার। একটা লিমিট ভালো আর অন্যটা ভালো নয় এটা আপনি কোনো ভাবেই স্বাধীনতার যুক্তি মেনে প্রমাণ করতে পারবেন না। আমি বলছি না যে সব লিমিট সমান, আমি বলছি না যে গায়ের রঙের জন্য কাউকে নিয়ে ইয়ার্কি মারা আর ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নিয়ে ইয়ার্কি মারা এক, আমি বলছি না যে একটায় লিমিট টানলে আরেকটাতেও টানতে হবে। কিন্তু একটা করা যাবে আর অন্যটা করা যাবে না এই তর্ক করতে গেলে আপনাকে বাইরে থেকে কিছু যুক্তি আমদানি করতে হবে, স্বাধীনতার পক্ষে উদারবাদ যে যুক্তিগুলো দেয় সেগুলো দিয়ে প্রমাণ করতে পারবেন না। বাইরে থেকে মানে শুধু বাকস্বাধীনতার উদারবাদী ব্যাখ্যায়  আটকে না থেকে, ইতিহাস, অর্থনীতি ইত্যাদির প্রেক্ষাপট টেনে এনে তবে যুক্তি সাজাতে হবে। গডেলস ইনকমপ্লিটনেস থিওরেমের মতো বিষয়টা।  সেই কাজটা কিন্তু বেশ কঠিন, এবং সেটা করতে গেলেই অনেক "ক্যান্সার নিয়ে ইয়ার্কি মারা উচিত না" অবস্থানের সমর্থককে কিন্তু হারাতে হতে পারে কারণ নতুন যুক্তিমালার অনেক কিছু তাদের আবার পছন্দ হবে না। কিন্তু তার আগে একটা মৌলিক বিষয় নিয়ে ভাবা দরকার। সেটা হলো ইয়ার্কি বা মজা বা জোক ব্যাপারটা কি?

Tuesday, April 4, 2017

সোনালি আপেল ও প্রিয়তম : কৃতি ঘোষ

সোনালি আপেল ও প্রিয়তম

মানুষ চিরকাল অন্ধকূপের মধ্যে কাটাতে ভালোবাসে। এদিকে যাব না, ওদিকে যাব না - আমি বসে থাকবো শুধু। এমনটা বললে কোও ছায়াছবির মত পথ আগলে রাখা যায় ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত প্রকৃতিতে বাঁচা যায় না। বাঁচার কোনও অর্থ নেই মানে অর্থের বেঁচে থাকার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। না, আমি গুলিয়ে দিচ্ছি না, প্রস্তর ভেঙে কারুর মূর্তিও তৈরি করছিনা আপাতত। এই যে সাময়িক প্রয়াস – তার অর্থ আমার প্রত্যয় ঘটেছেআমি উচ্চস্থানে বাস করছি আপাততএখানে কবিতার প্রয়োজন নেই, মৃত্যুর প্রয়োজন নেই। এখানে সমুদ্রের ফেনা আরেকটা অ্যাফ্রোদিতির জন্ম দিতে পারবেনা। সূর্যের দেবতা এখন অকর্মণ্য হয়ে শিস দিচ্ছে খানিক।

নদীতটে বসে কার কথা মনে পড়ে? কার ভ্রু উঁচিয়ে তাকানোয় বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে বেশি? কে সেই দীন-দরিদ্র ও কবির মাধ্যমে অমর হওয়া প্রেমিক? এসো প্রেমিক, জল ভেঙে জরায়ুতে এসো। তোমাকে জন্ম দিই একবার। এখানে তরল অনুভূতিরা গাছে গাছে হেলান দিয়ে বসে থাকে। সোনালি আপেলের মত লোভ আছে বিস্তর। তবে দেখানোর শখ নেই। বালি বালি রোদ আছে। বিনে পয়সার চাবুক আছে। চাবুক কথা বললেই ছোটে। পিঠ বেয়ে সাপের মত হিসহিস করে চাবুক। দেখোনি?

Thursday, March 30, 2017

Menstruation Cycle - কলিকাতার প্রমিতসার্কেল হইতে আমি অতনু কইতাছি




কলিকাতার প্রমিতসার্কেল হইতে আমি অতনু কইতাছি

সুশীলপর্ব, ১
মাঝে মধ্যে আমিও সুশীল হইতে চাই! আর তাই কিছু হিসেব পাশ কাটাইয়া যাওনের লগে আরাম পাই, ভাবিতে থাকি এই বুঝি ছুছিল হইলাম গো... চ লিখি না ছ লিখি... চ'-এ চো*:P ছ-এ ছমাছম ছম্মা ছমাছম ছম্মা, চু অথবা ছু, চিল অথবা ছিল, চু-চিল, ছু-ছিল! দীর্ঘ কোনো ই-কারের প্রয়োজন নাই, চুচিল বা ছুছিলেই হইবেক ম্যান।তারপর চুচিলের পত্রপত্রিকা ছুছিলের 'আজ রাতে তমুক চ্যানলে মাড়াইবো লাইভ' ইত্যাদি, তারপর অমুক আকাদেমির তমুক তামাক... বাবুরাম সাপুড়ে চুচিল তুই কোথা যাস বাপুরে, আয় বাওয়া দেখে যা, দুইখান তাস রেখে যা... ট্রাম্পকেও চোখে ধাঁধা লাগায়ে চুচিলগণ ওভার ট্রামের কার্ড খেলেন গো... তো আমিও মাঝে মধ্যে সুশীল হইতে চাহি...

পূর্ণসাধু প্রমিতের সুশীল হইতে চাই... কিন্তু আমার তো ব্যকরণবিধি ঠিক নাই, না-প্রমিত না-আঞ্চলিক, না-ঘটি না-বাঙাল, না-মোহনা না-পার্বত্য, না-জংলা না-মালভূম – কিছুই ঠিক নাই... গুরুচণ্ডালীর বাপেরে মা ইত্যাদি কেস হয়... তারপর ম্যানুফ্যাকচারড কনসেন্ট চুদায়ে মানে নিউজটিউজ লিখে কখনো রামপ্রসাদ কখনো দুদ্দু শাহ গাহিতে গাহিতে বাসের জানালার ধারে সুশীল নগর দেখতে দেইখতে বাস থিকান নামি, তারপর টোটো ধরি, বাসায় ফিরি... মুখে চাট্টকিছু দিয়া ফেইসবুকে বসি, দেখি  সুশীল মামা দ্যায় হামা... এরপর সুশীল নয় বরং খ্যাপাচোদা, এমন পদকর্তা, পদাবলীকার, কথকঠাকুর, ফিলোজফার, কবিএমন সকল পাখীমানুষদের মাথাখারাপ লেখা নিয়ে বসে থাকি, মাঝে মধ্যে প্রেমিকা বা প্রেয়সী-সুন্দরীদের লগে কথা হয়, প্রেমিকাও মাঝে মধ্যে কোথায় যে যায়েন, তা ভাইবা ডুব ডুব সাগরে আমার মন, প্রেমেরমানুষ কোথায় হারায় নাকি রয়েই যায়... বাসাতেও আমারে পুঁছে না কেউ...

তাই বাস থিকা নেমে একখান টিকিট কেটে লই এক্সপ্রেসের জেনারেল কামরায়, মুখ কালো ক'রে রবিন্দরের আশ্রমে যাই... রবিন্দর কইতাছি, কেননা সেদিন দেখি হিন্দিভাষীদের আর হিন্দুত্বের ধ্বজা উড়িতেছে আশ্রম থিকা অনতি দূরে...তারও আগে দিদির তোরণ, দিদির তোরণের পর ত্রিকোণ লাল পতাকা, যাহার বর্ডার সোনালী জরিতে, মাঝে হনুমান জ্বিউ…

Tuesday, March 28, 2017

পৃথা রায় চৌধুরী-র : শরীরী-অ

শরীরী-অ

সকাল হতে না হতেই গায়ে পড়া শুরু। সারাদিন বিরমহীন ফস্টিনস্টি চলবে। চলবেই, সূর্যের তেজের সাথে ছায়া ছায়া গাছেদের ঢলানিগিরি শুরু। বাছবিচার নেই, রাস্তা, ছেঁড়াফাটা বুড়ি, কালুয়া কুত্তা, অলকাদির পুকুরঘাটে খোলা পায়ের গোছ। এসব সবাই দেখে না।

দত্তবাড়ির খড়খড়ির ফাঁক কাকের চোখে মিশে থাকে। সামনের নতুন ফ্ল্যাটে নতুন চারা। সন্ধানী চোখ ধারে খুঁজে নেয় ধারবাকি খাতার মাসকাবারি। মাসেরা হাত ধরাধরি করে খাতায় বসে পেট চালাবার ইজারা দেয়।

সরকারী ইস্কুলে মেয়েরা শাড়ী, মেয়েরা ক্লাস এইট, মেয়েরা শাড়ির সাথে জুতো মোজা হনহন। মেয়েগুলো রোগারোগা পালক। পালক কুড়োবার নেশায় চিত্তরঞ্জন বয়েজের সেকেলে গেঁয়ো গেঁয়ো নামের মিছিল।

কলার তোলা, শার্টের গোঁজ খোলা সাইকেলদের কাছে চাইনিজ ঝলকানি রিংটোন। রবার্ট ব্রুসেরা গলি গলি, তস্য গলি।

সেতুর নাম বিকেল চারটে। টিউশান পড়ার নাম, আমি রানি তুই রাজা, আব তো আজা। ফুচকা নয় চুড়মুড়। এবার চারটে নম্বরের জন্য ফেল করেছি... তাতে কি, সময়ের নাম পরের বার।

সন্ধে নামতে ছায়াগাছেদের ঢলাঢলি শেষ। শহুরে ফ্ল্যাটে শাঁখ বাজে না। পাড়ায় পাড়ায় বাবা লক্ষ্মীদের ফেরা।

বিলিতির দোকান আশকারায় ভরা। আগামীকাল কি ড্রাই ডে? তেড়ে বৃষ্টি এলো, আর সিনেমা সিনেমা খুপরিগুলোয় পাঁকাল মাছেদের ভিড় জমে গেল। এখানের রাস্তায় হাম্বারা হাঁটে না। পয়সা খোলাম হয়ে উড়ে আসছে। পাঁকের গন্ধে মাতোয়ারা নিশিগন্ধা।

Tuesday, March 14, 2017

একটি শিকারকাহিনি-র শেষ পর্ব : সর্বজিৎ ঘোষ

একটি শিকারকাহিনি-শেষ পর্ব

কল্কিকথা
প্রথম প্রথম সারাদিন একটা ঘরে নিজেকে আটকে রেখেছে অনিমেষ। আশ্চর্য হয়ে সে অনুভব করেছে, ক্রমশ খিদের ভাব চলে যাচ্ছে তার, চলে যাচ্ছে ঘুম। এমনকি আগুনে তার হাত পুড়ছে না, খোলা তারে হাত দিলে ঝটকা খাচ্ছে না। তার কুঁচকিতে যে প্রচুর চুলকানির দাগড়া দাগড়া ছোপ ছিল, রক্ত গড়াতো আর ইস্কুলে সাদা প্যান্টে সেই দাগ দেখে হেসেছিল আর চাঁটি মেরেছিল ক্লাস ফাইভের কিছু নিষ্পাপ শিশু, সেসব চুলকে আর তার আরাম হয় না। ঘড়ি ধরে একবার দম আটকে রেখেছিল, তিনশো ছাপান্ন ঘন্টা বাহান্ন মিনিট উনতিরিশ সেকেন্ড পর একঘেয়ে লাগায় বিরক্ত হয়ে দম নিতে শুরু করে আবার। এসবের মধ্যে কাজের কথা একটাই, ঘুম না হলেও ঘুম তার পাচ্ছিলই, পেয়েই চলেছিল। যাবতীয় সময় তার কেবল ঘুম পেতে থেকেছে, কিংবা এই গোটাটা, এই যাবতীয় ঘর-ঘুম-আগুন-নিঃশ্বাস সবই এক ঘুমের মধ্যে ভাবতে থাকা যে এবারেরটা অন্তত স্বপ্ন নয়, এইতো যা হচ্ছে সত্যিই হচ্ছে, এরকমই তো হয়...
কেবল এই ঘুম পাওয়ার বিরক্তিতেই বাইরে এসেছিল অনিমেষ। সময়ের হিসেব ছেড়ে দেওয়ার পর থেকে, তার কেবল মনে পড়ে নিজেকে সে শুয়ে থাকতে দেখেছে, প্রবল ঘুমে চোখ বুজে আসতে দেখেছে, অথচ ঘুমোতে দেখেনি। এখানেই মনে পড়ে, সে যেন কীভাবে নিজেকে দেখে চলেছে, যেন একটু দূরে দাঁড়িয়ে, ছোলাভাজা চিবোতে চিবোতে তার মনে হচ্ছে নিজেকে দেখে গাড়ল ও প্রতিভাবান, নিজেকে শুয়োরের বাচ্চা বলে সে গাল দিচ্ছে এবং ভাবছে এই শটটা খানিক অল্প চিপ করে মারতে হতো, কিংবা গাল দেওয়াও আসলে তার ভান, তার আদতে কিছুই যায় আসে না। সুতরাং প্রবল ঘুমের তাড়নায় অনিমেষ মনে করতে পারেনি, সে কীভাবে ভাসতে শিখেছিল বাতাসে, মনে করবার কথাই মনে পড়েনি তার। কেবল বাইরে এসে অনিমেষের মনে হয়েছিল, খানিক সর্ষের তেল পেলে চোখে ডলে দেখতে পারে সে, যদি ঘুম পাওয়া থেমে যায়।
সুতরাং সেসময়ে সারা পৃথিবীর কাজ চলেছিল একেবারেই নিজের নিজের তালে, যা যা চলা থামিয়েছিল সেও কেবল তখন তাদের থামার কথা ছিল বলেই। এককথায়, সবই পূর্বনির্ধারিত বলে অনিমেষ ভেবেছিল, এবং তার ভাবনা দিয়েই এরপর থেকে সব প্যাঁচ খেলা হবে। অনিমেষ ঘুমচোখে চলে গিয়েছিল বাসস্ট্যান্ডে, আর বাসে উঠে খেয়াল করেছিল এখানে সর্ষের তেল পাওয়া যায় না এবং এখানে বড় ভিড়। 'ঘুম পাচ্ছে', একঘেয়ে গলায় সে বলেছিল। কেউ তার কথা শোনেনি, বরং পাশের মেয়েটি তার দিকে কড়া চোখে তাকিয়েছিল, ঢুলন্ত অনিমেষ তার গায়ে ঢলে পড়েছিল বলে। ঠিক সেইমুহূর্তে অনিমেষ প্রথম রাগতে দ্যাখে নিজেকে। এমনিতেই তার মনে হতো এতদিন ধরে, রাস্তায় যে কোনো পাঁচজন মানুষকে চড় মারলে ষষ্ঠজন তোমায় যেচে এসে পাঁচটাকা দিয়ে যাবে, এভাবে কত রাত সে কেবল ব্যথার হাতে বোরোলিন লাগিয়ে কাটিয়েছে, আর সেসব রাগ তার মাথায় চড়ে গেল মেয়েটিকে কড়া চোখে তাকাতে দেখে। অনিমেষ ভীষণ জোরে চকাস শব্দে মেয়েটির ঠোঁটে চুমু খায়, দুহাতে মেয়েটির মাথা চেপে ধরে, এবং আরেকটি চুমু খাওয়ার আগে যখন মেয়েটি মোচড়ামুচড়ি করছে আর বাসের লোকেরা চকিত হয়ে মজা দেখছে, অনিমেষ বলে, এক্ষুণি চাইলে দুচোখে আঙুল ঢুকিয়ে দিতাম, কিংবা ন্যাংটো করলে তো দেখব সেই এক বিচ্ছিরি দলা দলা মাংস, অতএব জামা পরিয়েই যে চুমু খাচ্ছি এতে খুশি হও মেয়ে। এখন, এতসব কথা অনিমেষ মুখে উচ্চারণ করেনি, বাসের মানুষ তাকে প্রচণ্ড হইহট্টগোলে ঢেকে ফেলছিল বলে তার বিরক্ত লাগতে শুরু করে, সে লহমায় দেখতে পায় ইঞ্জিনের উপর মলয় নামের সাদা বেড়ালটি, এবং অনিমেষ উচ্চারণ করে

Thursday, March 9, 2017

ঈশ্বরের জননতন্ত্রী, বিদেশি শব্দ এবং একটা রক্তখেকো ন্যাপলা : ডাকনামে সমুদ্র

ঈশ্বরের জননতন্ত্রী, বিদেশি শব্দ এবং একটা রক্তখেকো ন্যাপলা

১।
এই বিশ্বাস হয় -
ঈশ্বর আছেন কণায় কণায়
আমাদের ক্লাস সিক্সের ব্যাকরণ বই
সমস্ত সিগারেট কাউন্টার
ভুখা পেট
অফ্রিকা
জলবায়ু
নিভন্ত উনুন
তীব্র বর্ণবিদ্বেষ
অমৃতা গগণের টোলে
ভেনিসের জল। ইরাকের যুদ্ধ। সংবিধান। ছাপাখানা। জিরো জিরো সেভেন। ভ্লাদিমি পুতিন। হীনস্কন্ধ সময়।
এমনকি টুম্পা চাকির প্রথম খাওয়া ধর্ষণেও



২।
“shouting ‘oh god!' at bed isn't equivalent to a prayer"

ক. হরেকৃষ্ণ বলতো একটি উত্তর কোলকাতার টিঁয়া

খ. তিনি ছেলের নাম রেখেছিলেন শ্যাম। শ্যাম চোদ্দবছর বয়সে বাথরুমের ফুটো দিয়ে ভিজে মাকে দেখে হাত মেরেছিলো।

গ. প্রত্যুষা ঋতুমতী হয়েও ঠাকুর ছুঁয়ে ফেলেছে

ঈশ্বর আমার বিশ্বাস পুড়ছে
ওদিকে দৃশ্য তখনও কালো। পর্দা ওঠে নি। আমরা হাত চালান করে দিয়েছি পবিত্র বুকে বুকে। ঘেঁটেছি।


Saturday, March 4, 2017

মনোলগ : ০৬/০১/২০১৭ - রঙ্গন রায়

মনোলগ : ০৬/০১/২০১৭

"এবং আরো কিছু ভুল করবার জন্য আমাকে আরো কিছুকাল থেকে যেতে হবে!"
-      রতন দাশ

আমি নিজের মত এঁকে নিতে পারবো। ভুল হলে হবে। তবুও তো নিজের মতো। অদ্রিজার আঁকা পোর্ট্রটে আমি শুধু পার্টিকুলার কোন এক জনের মুখের সমস্ত রেখা লক্ষ্য করতে পারবো, কিন্তু নিজের মত নয়। যেভাবে অদ্রিজা দেখাবে ওভাবেই দেখতে বাধ্য। আমি নিজের মত দেখতে চাইছি, হয়তো আমার ইচ্ছা হলো পুজার দীর্ঘ চুল বাঁধার ছবিটাতে চুলগুলো এলোমেলো হোক - ঘাড় ও গলার পাশ দিয়ে নেমে আসুক বা ভেজা চুল পাতলা পিঠে ভারী ভাবে লেপ্টে আছে - চোখের পাতায় তিরতির করছে বৃষ্টির জলনাহ্! এসব আমাকেই আঁকতে হবে। কেউ আমায় সন্তুষ্ট করতে পারলোনা, সম্ভব নয়। ইজেল, ক্যানভাস ভেঙেচুরে এইসব আঁকিবুকি অনিবার্য ভাবে আমারই জন্য

এই সেদিনও আমি 'কালাশনিকভ'এর মানে জানতামনা। যখন জানলাম তখন থেকেই মাথার ভিতর শুধু একটাই ধুন "কালাশনিকভ - কালাশনিকভ"... কি যে এক অদ্ভুত ধূন জানিনা। এরকম হয়। অনেকেরই হয়তো হয়। আমারও আগে হয়েছে। অথচ দ্যাখো AK 47 আমি বাঁটুল দি গ্রেট থেকেই শুনে আসছি। কালাশনিকভ কে আমি আমার মত করে কিছু একটা ভেবে নিয়েছিলাম। সেটাও এখন মনে পড়ছেনা।

Thursday, March 2, 2017

Hello Darkness, My Old Friend : বহ্নিশিখা সরকার

Hello Darkness, My Old Friend

খুব গুরুত্বপূর্ণ কথা নয় যদিও, অথচ মাঝে মাঝে অকেজো কথাগুলি মাথার ভিতরে ঘুরে বেড়ায় নোঙর করবে বলে। আমি জায়গা দিলাম তাদের। রাস্তা এগিয়ে যায় সামনে আর আমি ভিড় বাসে জানলার ধারে বসার সিট পেয়ে ভাবি জীবনে বুঝি হামেশাই এমন মিরাকেল হয়। মানব সভ্যতার অপ্রাসঙ্গিক কথোপকথনের হাত থেকে বাঁচবো বলে কানে তুলে নেই গান। গান বাজে, চুলে আসে দমকা হাওয়া। গড়িয়া থেকে গড়িয়াহাট যাওয়ার মাঝখানেই কোথাও আছে পৌনে দশ নাম্বার প্ল্যাটফর্ম। যে জগতে এইবার আমি পৌঁছাই সেখানে বয়স বাড়েনা, সময় নড়ে না। একটা পাগল খরগোশ দেখতে পাই। চোখ জুড়িয়ে ঘুম আসে। স্বপ্নে আবার স্বপ্ন আসে তবু চোখ থাকে খোলা। এমন মাহেন্দ্রক্ষণে গানের কথার অর্থ বুঝে যাই, আগে সুরের কারচুপি আমায় সিন্দুকে রাখা কথাগুলোকে বুঝতে দেয় নি।
রাস্তায় দেখি আমার কানে শোনা গান ইজেলে আঁকা হচ্ছে। গান বেজে চলে, সায়মন অ্যান্ড গারফাঙ্কেল—

Hello darkness, my old friend,
I've come to talk with you again,
Because a vision softly creeping,
Left its seeds while I was sleeping,
And the vision that was planted in my brain
Still remains
Within the sound of silence

Tuesday, February 28, 2017

“Everything I told you before is a lie” - একটি দেবীপক্ষের Travelogue : রাজর্ষি মজুমদার

“Everything I told you before is a lie” - একটি দেবীপক্ষের Travelogue


যে মেয়েটি কাফকা অন দ্য শোর পড়ছিল সে ধানবাদে নেমে গেছে আমাদের কামরার প্রত্যেকের ব্যক্তিগত চাউনিগুলো আমি ঢুকিয়ে রাখছি একটা বাক্সে চিন্তা হচ্ছে জামাকাপড়ের জন্যআশ্বিন শেষের ভরা একটা রোদ এখন রেলের জানালায়। এই আলো, এই জানালা, নীল রঙ মাখানো হাত সব রেলের। একটা একটা করে দৃশ্যকল্প, একটা একটা করে কথা সরে যাচ্ছে , সরে যাচ্ছে আমার Dissertation শুখা মাঠ, ছিরিছাঁদহীন বাড়ি ঘর দোর পেরোতে পেরোতে প্রশ্ন জাগছেএরা কি সমকামকে স্বীকৃতি দেবে?

একটু পরে সূর্যাস্ত দেখব – কোডারমার ধাপে ধাপে নেমে আসা জঙ্গল, ধূসর পাথুরে খাদের ওপর জেগে থাকা বৌদ্ধ বিহারের ছবি তুলে রাখতেই হবে আমায়। এসব ছবি কাজে লাগবে লেখার সময়, দিন এগারো পরে এ বিকেল পড়ে আসার ঘটনা নিয়ে লিখতে বসে।
মাঝে মাঝে স্বপ্ন আর সিনেমা ছাড়া লেখাতেও আমরা সময়কে সম্প্রসারিত করতে পারি বোধ হয়? এই পারাটা আসলে পাঠকনির্ভর। স্বপ্ন আমরাই তৈরী করি , আমরা সিনেমাও তৈরী করতে পারি। কিন্তু পাঠক ছাড়া বোধহয় লেখা তৈরী হয়না।  
এই যেমন এ লেখা লিখতে লিখে আমার কাছে সময় অনেকগুলি অস্তিত্ব হয়ে ঘোরাফেরা করছে। হয়ত পাঠক বেছে নেবেন তার মধ্যে একটা – লেখাটার একটা নতুন সময় তৈরী করবেন তিনি। এসব ভাবতে লিখতে একটা ফ্লেক ধরাচ্ছি আমি, ধোঁওয়াটুকু ছাড়ছি দশদিন আগের সময়ে  – যেখানে আমি আদিত্য আর শ্রীরাগ টিনের টেবিলটার ওপর পা তুলে দিয়ে সিগারেট টানছি চেয়ারগুলো পেছনের দিকে ঝুঁকে গেছে, বাইরে একটা পাতাও নড়ছেনা এমন গরম। আদিত্য ওর Dissertation এর কাজটা নিয়ে বলছিল – cinema তে  time and space এর ব্যবহার স্বভাবতই আমার কথায় তারকোভস্কি চলে এলেন ... তার ওই হালকা নীল টোনের আকাশে মিশে যাওয়া জনারের ক্ষেত , বেড়ার ওপর সিগারেট ফুঁকতে থাকা মারিয়াকে নিয়েজঙ্গলের সেই গাছগুলোর জ্যামিতি বা বরফের ওপর ডাঁই করে রাখা কাঠের ভিস্যুয়াল থেকে একটা পাপিয়ার ডাক ছুটে চলে এল নদীতীরে। সেখানে নগ্ন প্যাগান মেয়েটি চোখ দিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছে – “ What sin? Tonight is for lovemaking; is love a sin? ”  
তাকে নিয়ে আমার আজ নদীতে যাবার কথা  

সিগারেটটা ঘুরছিল টেবিলের চারদিকে – হাতে হাতে। ঠিক এইসময়ই আমার মুখের কথা কেড়ে নিয়ে শ্রীরাগ বলে ওঠে – “ He was a magician. By his works he just said all the Soviet montage movement filmmakers that – “You guys just … just fuck of! Film is not all about theories, technicality, cutting. It’s about playing with time and space.”

Thursday, February 16, 2017

ঋপন ফিও একটা গল্প ভেবেছে

ঋপন ফিও একটা গল্প ভেবেছে

তো এক দেশের মানুষ ভাত খেতে ভালবাসত আকাল পড়ার আগে। আকাল পড়ায় অগত্যা বাধ্য হয়ে মকাই। প্রথম প্রথম গলা দিয়ে নামতে না চাইলেও আস্তে আস্তে সয়ে গেল। তারপর এল সেই মোক্ষম দিন। খেতে বসা সন্তানের করুণ মুখের দিকে চেয়ে থাকা এক জর্জরে মা আনমনে বলে উঠল~ বালের ভাত, মকাই ঢের ভাল... আর কি, একজন একজন করে এবার সবাই গুণ গাইতে শুরু করল মকাই এর। ধীরে ধীরে দেশের মানুষ ভুলেই গেল ভাতের স্বাদ। শুধু একজন পারল না কিছুতেই। ডাইনী সন্দেহে তাকে পিটিয়ে মারার আগে অব্দি পাতে মকাই নিয়ে বসে সে শুধু ভাতের কথা ভাবত।
















ঋপন ফিও
Reepan Fio

Tuesday, February 14, 2017

কয়েকটি কুকুরের চিৎকার : সুমন মজুমদার

কয়েকটি কুকুরের চিৎকার

তীর্থ ট্রেনে বাড়ি ফিরছিল। সকালে বেরিয়েছে দুই-তিনটে জায়গা ঘুরে, বেশ অনেকগুলো তামাক খেয়ে বেশ হাবুডুবু হয়েই ট্রেনে উঠেছিল শিয়ালদা থেকে। দশটা তিরিশের বনগাঁ লোকাল, এই নামে একটা সিনেমাও হয়ে গেছে বোধহয়। এসময় ভীড় থাকার কথা নয়, বসার সিট অন্তত পাওয়া যায়, যুদ্ধ না করেই। তীর্থ সিনেমা দেখতে ভালোবাসে, তবে আজকাল বিশেষত ডিসকভারি এবং ট্রেভেল চ্যানেল-ই সে দেখে। কি সুন্দর দেখায় চায়না অথবা ইস্টার্ন এশিয়া। সবুজ ল্যান্ডস্কেপের মধ্যে সুন্দর হাসিমুখের মানুষ তাদের রঙ বেরং এর খাবার, জামাকাপড়। তীর্থ ঠিক করে রেখেছে যে সে এশিয়ার এই দেশগুলোয় একবার অন্তত যাবেই। আজকাল এমনকিছু কঠিন খরচপাতি-ও পড়েনা। দুবার কাসৌল যাবার পয়সা জমাতে পারলেই যাওয়া যায়।

তীর্থর তামাক খেয়ে নেশা হয়ে গেলে চশমাটা ভারি লাগতে থাকে, এসময় তার সন্দেহ হয় চোখের পাওয়ার কমে গেছে কিনা, অথবা তীর্থ মনে মনে ঠিক করে আগামী চশমাটা ফাইবার-এর বানাবে। কাঁচের ওজন ভারি। তীর্থর মনে হয় যেন চশমা পরে থাকার ফলে সে আশেপাশে কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছেনা, এ সময় মাথা ভারি লাগে, চোখ অন্ধকার হয়ে আসে। তীর্থ নিজেকে সামলে ফেলে এই সময়গুলোতে। চশমা খুলে ফেলে, গভীর শ্বাস নেয়। বেশি বাড়াবাড়ি হলে চোখে জল ছেটায়। অনেকদিন আগে ডাক্তার লো-প্রেশারের কথা বলেছিল, সেটাও একবার মনে পড়ে যায়।

Monday, February 6, 2017

একটি শিকারকাহিনি : সর্বজিৎ ঘোষ

একটি শিকারকাহিনি

মলয় নামের সাদা বেড়ালটিকে যখন বসে থাকতে প্রথম দ্যাখে অনিমেষতখন সে ছিল একটা অটোতে।

এখানে এসে প্রথমবারের মতো গল্পটা একটা লাল ঘরে ঢুকে যায়। লাল ঘরের আলো ছিল নরম লালআসলে লাল ঘরটা ছিল গোলাপের দুই পাঁপড়ির ভিতর গভীরে কোন এক বিন্দুতে আলম্বিত। সেই লাল ঘরের মেঝেও হওয়া উচিৎ লালকিন্তু অনিমেষ লাল মেঝের ঘর শেষ দেখেছিল তার মামাবাড়িতেদোতলার পুব দিকের ঘরটায়। সেই লাল ঘরেই মামা মামির ফুলশয্যে হয়অনিমেষ তখন বছর বারোর। মামির ছেলে মেয়ে হয়নিমামি ছিল ভীষণ মোটামামি দুপুরবেলা একা একা ভুল বকতে বকতে কখনো পড়ে যেত সেই লাল ঘরের মেঝে ফুঁড়েগোলাপের দুই পাঁপড়ির মাঝের ঘরটায় এসে পড়তোতার পর আরো আরো গভীরেঠান্ডা বেরঙ অন্ধকারে ভেসে পড়তোযেন নীচ থেকে লক্ষ লক্ষ হাত মামিকে ম্যাজিক করে হাওয়ায় ভাসিয়ে রাখছেম্যাজিশিয়ানদের হাত অল্প অল্প নড়ছেভীষণ লাল একটা কিছু ঢেউয়ের মতো লকলক করছে চারদিকে ঘিরে। মামা রাতে অফিস থেকে ফিরে মামিকে খুঁজে পেত নাচিলছাদে গিয়ে খিদে পেটে ঘুমিয়ে পড়তো। মামির পোষা দুটো বেড়াল ছিলযাদের একটা ছিল সাদার মধ্যে বাদামী ছোপছোপ। সেটা ছিল খুব রোগামানুষ হলে নিমাই বলে আওয়াজ খেতো এমন রোগাসেটা একগাদা বাচ্চা দিয়েছিল একবার। সেসব বেড়ালদের মধ্যে কারো নাম মলয় ছিল না বলেই অনিমেষের ধারণা।

Tuesday, January 31, 2017

দ্রিম দ্রিম-৩ | মোমরঙ : দোয়েলপাখি দাশগুপ্ত

দ্রিম দ্রিম-৩ | মোমরঙ

একটা নিরিবিলি ঘরে দাঁড়িয়ে আছি আমি। পাশের হলঘর থেকে কোলাহল আসছে। লোকজনে গমগম করছে ঘরটা। হাসির হররা... ওয়াইন গ্লাসের টুংটাং... মোমের আলো। খাবারদাবার, সুগন্ধি... দামী পোশাকের, ভেলভেটের, সুয়েডের খসখস... আমি ঘরটার দিকে মুখ করে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছি। খুব কম সময়ের জন্য পাচ্ছি বাবাকে। এর মধ্যে যতটা দ্রুত গুছিয়ে নিয়ে দেখাতে হবে আমার কাজ। আমার কাছে ছাপানো কিছু কি আছে? আমি কোনও পোর্টফোলিও করেছি? আমার ক্যামেরা ভর্তি ছবি। প্রচুর ছবি। ডেভেলপ করিনি। ডার্ক রুমে ঢোকা হয়নি বহুদিন। কিন্তু আমি করছি বাবা। অনেক কাজ করছি। তুমি ব্যস্ত তাই... বাবা একবার এঘরে এলেন। উনি আমার সঙ্গে বেশি কথা বলেন না। কারওর সঙ্গেই না। বাবাকে ঘিরে আছেন প্রচুর মানুষ। আর্ট গ্যালারি, ক্রিটিক, ছাত্র অনেকে। এঁদের মাঝে আমার যাওয়ার কথা নয়।

Sunday, December 4, 2016

বাংলা কবিতার প্রসঙ্গে, দলীয় আদর্শ আর একটি বিনীত প্রশ্ন : চান্দ্রেয়ী দে

বাংলা কবিতার প্রসঙ্গে, দলীয় আদর্শ আর একটি বিনীত প্রশ্ন

আজ। অর্থাৎ কাল বা পরশু নয়। একমাস আগের বা একমাস পরের কোনো দিন নয়। এই আজ সময়টা আজকের সময়েই একমাত্র অস্তিত্ববান। কিন্তু, আজ-এর মধ্যে আছে গতকালের ছায়া-র শীতলতা, গতকালের রোদের তাপ, আর আছে আগামীকালের আলোছায়া কে অনুভবের রসদ। আজ এর মধ্যেই আছে গতকাল নেওয়া শপথ, আছে আগামীকালের রুটম্যাপ - পথ চলার দিশা, পাথেয়। তাই আজ, বস্তুত কাল বা পরশু থেকে আমূল বিচ্ছিন্ন, আপাদমাথা যোগাযোগহীন নয়।

দল। ‘দ’ আর ‘ল’-এর একটিমাত্র বিশেষ বিন্যাসেই ‘দল’ শব্দটি তৈরি হয়। একটিমাত্র বিশেষ বিন্যাসেই তৈরি হয় এর ভাবটিও। সময় ও পরিপার্শ্ব অনুযায়ী তার ভাবনা ও তার প্রকাশ বদলে যেতে পারে। কিন্তু শপথ আর পাথেয় আমূল পরিবর্তনশীল হতে পারেনা। পারে, যদি সেই দল, দলের ব্যক্তিবর্গ, সময়ের দাবী মেনে নিয়ে, প্রয়োজনীয়ের অভাব বোধ ক’রে অন্য কোনো বিন্যাসে বিন্যস্ত হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে অন্য কোনো দল। দল যদি আধার হয়, তার আধেয় এক বা একাধিক ব্যক্তি। এখন, স্থান, কাল অনুযায়ী পাত্র তার অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে, এমনকি আমূল পরিবর্তনও এক্ষেত্রে সম্ভব। কিন্তু, কোনো দলের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তির ব্যক্তিগত অবস্থানের চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ তাদের পারস্পরিক অবস্থান। কোনো দলের সদস্য-ব্যক্তিবর্গের পারস্পরিক অবস্থান সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে গেলে, সেই দলেরও সম্পূর্ণ পরিবর্তন অর্থাৎ অন্য কোনো দল হয়ে ওঠা স্বসিদ্ধ।

নাম। একটি বিশেষ স্থানিক-কালিক-সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে কোনো নাম, যেকোনো নাম কোনো বস্তুর সনাক্তকরণে ব্যবহৃত হয়, যদিও নামের গঠনের সঙ্গে বস্তুর অস্তিত্বের যোগাযোগ সম্পূর্ণ কাল্পনিক। সনাক্তকরণের, পারস্পরিক সংযোগের (কমিউনিকেশনের) প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিলে, কোনো একটি নামের মাধ্যমে কোনো বিশেষ বস্তু তথা কোনো বিশেষ ধর্ম এবং বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়। এখন, ‘দল’ এর প্রসঙ্গে, কোনো দল এর নামের সঙ্গেই যুক্ত হয়ে যায় দলটির অস্তিত্ব অর্থাৎ তার দলীয় আদর্শ এবং সেই অনুযায়ী সম্ভাব্য কর্মপদ্ধতি। সেই কারণেই দলীয় অবস্থানের পরিবর্তনের সঙ্গে যেমন জড়িয়ে থাকে দলের পরিবর্তন, তেমনই তার সঙ্গে সঙ্গে নামেরও পরিবর্তন। দলভাবনা এমনকি দলভাবনার সার্বিক যৌথতা পরিবর্তিত হয়ে গেলে স্বতঃসিদ্ধভাবেই তার সনাক্তকরণ বৈশিষ্ট্য যায় বদলে, আর তা স্বীকৃতি পায় নাম-এর বদলের মধ্য দিয়ে। কেউ কেউ মনে করতে পারেন পরিবর্তনশীলতাই যেহেতু প্রকৃতি-র নিয়ম, তাই পরিবর্তনশীলতা স্বয়ং কোনো দলের দলীয় আদর্শ হতে পারে। অমোঘ পরিবর্তনশীলতার সামনে বদলে যেতে পারে স্থান-কাল, বদলে যেতে পারে ব্যক্তিক পরিস্থিতি, এমনকি বদলাতে পারে যৌথ অবস্থান। কিন্তু এই সার্বিক পরিবর্তনের জলপ্রপাত নাম-কেও ধুয়ে নিয়ে যাবে না কি? যদি পরিবর্তনশীলতাই ধারণ করতে হয়, নামবাচক ক্ষেত্রটিই বা ব্রাত্য থেকে যাবে কেন? তা কি কোনো ‘লিগ্যাসি’-র তাগিদে? কোনো ‘নস্টালজিয়া’র তাগিদে? অথবা কোনো ‘ব্রান্ডিং’ এর তাগিদে? কেননা সনাক্তকরণ বৈশিষ্ট্য যদি বদলে যায়, সনাক্তকরণের উপচার ‘নাম’ অপরিবর্তিত থাকবে কি করে? যে অতীত বর্তমানে ‘অতীত’, শুধু নামে তাকে বহন করব কেন? কাল আমি কি ছিলাম তা আজ বহন করবে কে, যদি সার্বিক পরিবর্তনে বদলে যায় এই ‘আমি’টাই? অন্তত অংশত। আমার অংশের বদলও আমাকে আর আমি রাখে না। গঙ্গায় যে তিনডুব দিল, সে তিন জন, একজন নয়। যে গঙ্গায় সে ডুব দিলো, তাও তিনটি গঙ্গা। একটি নয়।

ছড়িয়ে থাকা পরিচ্ছেদগুলোর মালা গাঁথতে গাঁথতে বলি, বাংলা কবিতার প্রথম দশকে দেখছি এক সর্বব্যাপী তাড়াহুড়া- কে কোথায় ছিল, কে কোথায় আছে, কেউ শূণ্য কেউ নব্বই কেউ বা অন্য কোন দশক থেকে – সময়ের পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া আমরা, আমরা যারা যৌথতা নিয়ে রূপকথা বেঁচেছি, যৌথতা নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি, জীবন কেটেছি ছিঁড়েছি যৌথতার অভিমানে, তারা, আমরা টুকরো হয়ে যাওয়া সেই যৌথতার দোহাই দিয়ে, সেই যৌথতার কাল্পনিক দায় নিয়ে, সেই যৌথতার নাম ভাঁড়িয়ে প্রকাশ করতে চাইছি ‘অন্য’ এক যৌথতাকে, ‘অন্য’ এক ব্যক্তিক অস্তিত্ব-কে। মরা যৌথতা কে ‘আ’মরা করতে চাইছি। কেন??

বাংলা কবিতার পাঠক, লেখক, বিপ্লবী, আর বাংলা কবিতার আমরা-র পায়ে এই আমার বিনীত প্রশ্ন, এই আমার জিজ্ঞাসু আকুতি...


চান্দ্রেয়ী দে
Chandrayee Dey

Wednesday, November 30, 2016

হরকরাকে লেখা চিঠি : সর্বজিৎ ঘোষ

হরকরাকে লেখা চিঠি

রাস্তা পেরোতে গিয়ে শ্যামলালের হঠাৎ মনে হল, তাকে নিয়ে কেউ কোনোদিন কবিতা লিখবে না। অথচ ছোট্টো সবুজ বিন্দুজীব যে মানুষটি দপদপ করে বলতে থাকে আর কতক্ষণ, সে ক্রমশ এগিয়ে যাচ্ছিলো লালে। শ্যামলালের মনে হল সে তাকে বলছে, ওহে শ্যামলাল, এই যে কুড়ি লক্ষ ত্রিশ হাজার পাঁচশো সাতাশিতম বার তুমি সফলভাবে রাস্তা পেরোলে, এবং প্রত্যেক মৌলিক সংখ্যকবারে পেরোতে গিয়ে যে তুমি গাড়ি চাপা পড়তে পড়তে বেঁচে যাও, (আহা সে বাঁচা তুমি জানবে না; অঙ্কে কাঁচা)... শ্যামলাল শুনতে পেলোনা বাকিটা। হয়তো সে বলতো শ্যামলাল জানে না রাস্তা পেরিয়ে আসলে সে কোথায় যাচ্ছে, বা রাস্তা সে আদৌ পেরোতে পেরেছে কিনা, যেভাবে শ্যামলাল জানে না এখন সে কোথা থেকে ফিরছে। শ্যামলালের মনে হয়েছিল সে বেরচ্ছে তার ইউনিভার্সিটি থেকে, শেষ ক্লাস ফাঁকি দিয়ে সে খুঁজতে গিয়েছিল এক জলে ভেজা দাঁড়কাক, যে আসলে ভেজার ভান করে পালক ঝাড়ছিল। কিন্তু, এও তো সমানভাবে সত্যি, শ্যামলাল যে রাস্তা পেরোচ্ছিল তার এপারে ছিল প্রাচীন লাল এক সরকারি অফিস, যার লিফটের দড়ি দিয়ে খুব ভালো ফাঁসি হয়, শ্যামলাল ভেবেছিল। যেমন শ্যামলাল এও জেনেছিল, নীলদর্পণ নাটকে এক কুখ্যাত চাবুকের নাম শ্যামলাল এবং তার নিজের কোমরে ছিল প্রাগৈতিহাসিক এক দাদ, যে দাদ তার মনের সব কথা বুঝতো বিনা ভাষায়।

রাস্তায় অন্ধকার হয়ে আসছিল, ভেজা ছিল রাস্তা, অথবা তীব্র দুপুরের মরীচিকায় রাস্তা হয়ে উঠেছিল সবুজ কোনো শস্যক্ষেত। শ্যামলাল বিড়ি ধরিয়েছিল একটি, এবং তার মনে পড়েছিল কবিতার কথা। শ্যামলাল তো জানতো, মহাপ্রলয়ের সময়ে নৌকায় যে পাঁচটি কবিতা নিয়ে উঠতে পারবে শ্যামলী, তার মধ্যে শেষতম কবিতাটি স্বয়ং শ্যামলালের। যদিও সেই কবিতাটি শ্যামলাল এখনো লিখে উঠতে পারেনি, কারণ শ্যামলীকে এখনো সে চেনে না, চিনলেই জিজ্ঞেস করে নেবে সে কেমন কবিতা শ্যামলীর পছন্দ, কিংবা কবিতার বদলে শ্যামলী চায় কিনা একফালি ছায়া ও রোদ্দুরঘাস জমি। অথচ, শ্যামলাল ভাবে, কেউ তাকে নিয়ে কবিতা লিখবে না কোনোদিন। আজকের এই ট্রাফিক সিগনালে শ্যামলালের তো দাঁড়ানোর কথা ছিল না; যেভাবে হিজড়েরা শাড়ি তুলে অন্ধকার দেখানোর ভয় দেখিয়ে টাকা নেয়, শ্যামলাল যেন দাঁড়াচ্ছে গিয়ে প্রতিটি সিগনালে, এভাবেই চেয়ে যাচ্ছে একটা আস্ত কবিতা। শ্যামলালের মনে হয়েছিল আজ পর্যন্ত সে যা যা লিখেছে সব একেকটি গর্ভস্রাব, কারণ শ্যামলাল জানত মহাপ্রলয়ের সময় কোনো নৌকা পাওয়া যাবে না শেষ পর্যন্ত। শ্যামলীকে সে একবারই দেখেছিল, বর্ধমান থেকে ফেরার পথে কর্ড লাইনে, ট্রেনের দরজায় বারমুখো হয়ে দাঁড়িয়ে, একহাতে হাতল ধরা, চুলগুলো খোলা ছিল এবং হাওয়ায় একে একে উড়ে যাচ্ছিলো, শ্যামলী ক্রমশ ন্যাড়া হয়ে যাচ্ছিল আর রোদ্দুর আরো উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। অথচ, আজ এখনো শ্যামলালের বাস এলো না, কবিতার মতো সে যদি স্থির বুঝতে পারতো বাস আর আসবে না, বাস কোনো ছন্দকাটা তালকাটা শব্দ, এবং অপেক্ষা বিষয়টা আসলে মাথাব্যথার মতো আদুরে... শ্যামলাল মন দিয়ে বাসস্ট্যান্ডে সাঁটানো 'গোপনে মদ ছাড়ান' বিজ্ঞাপন পড়ছিল এবং ভাবছিল, সে কি কোনোদিন মাতাল হয়নি, সে কি চায়নি ঝাল ঝাল লংকাকুচি মাখা ছোলাসেদ্ধ এবং খোঁয়ারি-ভাঙানো লেবুর জল, তাহলে কেন তাকে নিয়ে একটা, অন্তত একটা বিজ্ঞাপনও লেখা হল না এতদিনে!


Tuesday, November 29, 2016

কয়েকটি সময়কে ধরলেন : শাহেদ আনোয়ার

১৯ডিসেম্বর ১৫। ১১:৫৪টা রাত।

দুয়েকদিন ধরে মনে হচ্ছে আমি প্রেমে পড়ছি, ইদানিং কলেজ থেকে আশার সময় একটা মেয়ের সাথে ক্রস হচ্ছে। ব্যাপারটা প্রথম প্রথম আমলে না নিলেও এখন নিচ্ছি। বুঝতে পারছি না কেন এমন হচ্ছে। আমি কি আবার সর্বনাশের দিকে পা বাড়াচ্ছি? মেয়েটিকে দেখার জন্য সন্ধ্যায় নিয়মিত বের হই, আমার বাসার রাস্তা দিয়ে যায়। সাথে বান্ধবি থাকে। প্রতিদিন দেখতে পাই না বলে প্রচন্ড রাগ হয়।

আমি এখনো জানিনা মেয়েটি আমার জুনিয়র নাকি সিনিয়র। ধ্যাএএত, এটা মোটেই ঠিক হচ্ছে না। ঠিক একই ভাবে আমি ক্লাস এইটে পড়ার সময় টেনের এক আপুর প্রেমে পড়ছিলাম। তার মাশুল এখনো দিতে হচ্ছে। আমি কি আবার নতুন মাশুলের কর গুনছি? মনে হআমার উচিৎ শিক্ষা হয়নি, আরও কঠিন একটা শিক্ষা হওয়া দরকার।

কাল রাতে বেশিক্ষণ পড়তে হয়েছে। ঘুমালাম দেরি করে। অসহ্য মাথাব্যথা নিয়ে ঘুমাতে হল। বেশিক্ষণ হয়নি, ঘুমের মধ্যে কে যেন ডাকছিল, সকাল হয়েছে বোধহয়। নাহ, আরেকটু ঘুমাতে হবে। কম্বল দিয়ে মাথা জড়িয়ে নিলাম, কোন শব্দ যেন না শুনি।

কিছুক্ষণ পর আবার কে যেন ডাকছে নিম্নস্বরে। 'এই, এই আরেকটু সরে ঘুমাও না, আমি ঘুমাতে পারছিনা তো, এদিকে আমি খাট থেকে পরে যাচ্ছি, আর তুমি পুরো খাট দখল করে আছ।' আমি একটু সরে শুলাম, যেন এটাই স্বাভাবিক। 'এই, আর কতোক্ষণ ঘুমাবে, আজ না তোমার পরীক্ষা?
  - উফ্‌…!!!
  - মাথাব্যাথা করছে কি, চুল টেনে দেব?

ও হাত বাড়িয়ে চুল টেনে দিচ্ছে। আমি অতল ঘুমে তলিয়ে গেলাম।

ব্যপারটা বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে কিন্তু, বিশ্রীরকমের। নিজেকে বোঝাতে পারছিনা। আমি তাকাব না তাকাব না করেও তাকাই। বেশিক্ষণ তাকাতে পারি না লজ্জায়। ভয়ও হয় - যদি ব্যাপারটা বুঝে ফেলে, নইলে চোখের ভাষা পড়তে কষ্ট হত না। আমার এতদিনের যুক্তিবাদী মনটা কোন যুক্তিই মানছে না। ভেতর থেকে সুনীল বলে ওঠে, ভালবাসার পাশেই একটা অসুখ শুয়ে আছে। আমি বলি, না সুনীল,  ওটা অসুখ নয়, ওটা প্রেম ওটা ভালোবাসা, নীরাকে তুমি যেটা বলো



Saturday, November 26, 2016

নিষেধাজ্ঞা : অদ্বয় চৌধুরী

নিষেধাজ্ঞা

“আজ রাত দশটা থেকে রাজপথে পায়ে হেঁটে যাতায়াত নিষিদ্ধ।”
       সেদিন সন্ধে থেকে গোটা এলাকা পোস্টারে পোস্টারে ছেয়ে গেছিল, টিভি-রেডিও সর্বত্র ঘোষণা হচ্ছিল লাগাতার। সকলেই জেনে যায় এই নিষেধাজ্ঞা। যারা অনেক রাত করে পায়ে হেঁটে বাড়ি ফেরে তারা সেদিন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে এসেছিল।

       যারা রাজপথে পায়ে হেঁটে যাতায়াত করেনা, যাদের গাড়ি আছে, তারা বেজায় খুশি হয়েছিল এই নিষেধাজ্ঞায়। রাস্তায় ভিড় কমবে, ট্রাফিক জ্যাম কমবে। গাড়ির দোকানদাররাও খুশি হয়েছিল। এবার গাড়ির বিক্রি বাড়বে। উপরমহলের তরফে বলা হয় পায়ে হেঁটে যাতায়াত করলেও যাদের বাড়িতে গাড়ি লুকিয়ে রাখা আছে, বা অন্যত্র তাদের গাড়ি বেনামে খাটছে, সেইসব লোকের লুকানো গাড়ি ধরার উদ্দেশ্যেই এই নিষেধাজ্ঞা। কিন্তু ব্যাপারটা যে তা নয় তা গাড়িওয়ালা এবং গাড়ির দোকানদাররা জানত। এই সিদ্ধান্ত মূলত এলাকার সার্বিক উন্নয়নের স্বার্থেই— সকলেই যাতে ‘গাড়িওয়ালা’ শ্রেণিতে উন্নীত হয়। যাদের গাড়ি নেই, অথবা গাড়ি কেনার কোনোভাবেই সামর্থ্য নেই, তারা এলাকা ছেড়ে চলে যাবে, অথবা না খেতে পেয়ে মারা যাবে।

       পরের দিন রাস্তা একেবারে শুনশান। হাতে গোনা কয়েকটা গাড়ি প্রচণ্ড গতিতে যাতায়াত করছে। ফুটপাথে কোনো লোক নেই। দু-একটা বড় দোকান আর সমস্ত গাড়ির দোকান ছাড়া আর কোনো দোকান খোলেনি। কোনো নতুন গাড়িও কিন্তু রাস্তায় দেখা যায় না। না লুকিয়ে রাখা গাড়ি, না নতুন কেনা গাড়ি। আগে যেগুলো চলত সেগুলোই শুধু দেখা যায়।

Tuesday, November 22, 2016

উত্তম থেকে মধ্যম পুরুষ: সুমনের গানে রাজনীতি আর ভালবাসার কামনাপাঠ - অর্ক চট্টোপাধ্যায়

উত্তম থেকে মধ্যম পুরুষ: সুমনের গানে রাজনীতি আর ভালবাসার কামনাপাঠ

সুমন চট্টোপাধ্যায় থেকে কবীর সুমন – সময়ের অনুক্রমে দুদশক পর ওঁকে নিয়ে লিখতে বসে প্রত্যেকবারের মত এবারও বাধ সাধছে দূরত্বহীনতা, বাধ সাধছে আমার বেড়ে ওঠার লতায় পাতায় ওঁর গানের সরব এবং অরব উপস্থিতি। আর যা বাধ সাধছে তা হলো আমার সাঙ্গীতিক প্রশিক্ষণের অভাব। আমি সাহিত্য এবং দর্শনের ছাত্র; তাই এই লেখার শুরুতেই আমার সাঙ্গীতিক অপারগতা স্বীকার করে নিয়ে সুমনের গানের এক বিষয়ভিত্তিক এবং সাহিত্য ও দর্শন লালিত আলোচানা করার চেষ্টা করব। চেষ্টা করব কারণ লিখতে তো হবেই। লেখার যে দায় আছে আমাদের। আমাদের সময়ের অন্ধকারে সুমনের যদি অহর্নিশ গান বানানোর দায় থাকে তবে আমার তথা আমাদের দায় হলো সেই সময়ের শরিক হয়ে সুমনের গানকে প্রতি-প্রতর্কের আলোয় তুলে ধরা। সুমনের গানের অভিসন্ধি এমন এক প্রতর্ক যা তার প্রত্যুত্তরে আরো প্রতর্ক, আরো অভিসন্ধি দাবি করে। এভাবেই তাঁর গান রাজনৈতিক সংলাপ তৈরী করে। সুমন নিজেই লিখেছেন 'দেখাতে পারিনি আমি কোনো উপমায়/ যে আমিকে তুমি তার সময়ে দেখোনি'। সুমনের উত্তরকালে আমরা কি সুমনের সমসময়ের এই আমি'কে তুলে ধরতে পারবো? উত্তরকালের কাছে সমকাল নিজেই অতীত! সে কি বুঝে নিতে পারে আমির জটিল চলন, তার বর্তমান থেকে তার অতীতে যা নির্মাণ করে তার ভবিষ্যৎ। হয়ত তখন আর সমকাল সেখানে এসে একা চ্যাপলিন হয়ে বসবে না, হয়ত তখন আমরা এক অন্য সুমনকে পাবো, এই সুমনকে নয়। সেই কারণেও বর্তমানের এই ঘটমানতার কাছে আমার বা আমাদের দায় থেকে যায়: সুমনকে নিয়ে প্রতর্ক নির্মাণের দায়।