Showing posts with label Art. Show all posts
Showing posts with label Art. Show all posts

Sunday, July 30, 2017

কাগজের নৌকা : The Story behind an Independent Film.

~কাগজের নৌকা~
The Story behind an Independent Film.

কাগজের নৌকো-র ভাবনা আসে একদিন রকের আড্ডা থেকে, আমি তখন সদ্য দিল্লীর চাকরি ছেড়ে কলকাতায়, আর শুভ্র এমবিএ পাশ করে, ব্যাঙ্গালোর থেকে ফিরে জয়েনিং ডেটের অপেক্ষায়। দুজনেরি হাত খালি, তাই পুরোনো রকের আড্ডা বেশ জমে উঠেছিল।
আমি যে সিনেমা করব, বা এটাই করতে চাই, তারও পাঁচবছর আগে, সেটা আমার আর ওর প্রায় একি সঙ্গে মাথায় ঢোকে।কয়েকটা বিদেশি ভালো শর্ট ফিল্ম দেখে, এবং দেশিয় কিছু জঘন্য কাজ দেখে। প্রথম ছবির গল্প অপেক্ষা নিয়ে, শুভ্রর ভাবনা, গল্পটা আমাকে, বলার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই স্ক্রিপ্টটা লিখে ফেলি। কয়েকদিন ধরে, কিভাবে কি দেখানো হবে, এই নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে, আমার আর শুভায়নের মধ্যে, প্রায় গনতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আমাকে নির্দেশক মনোনীত করা হয়। এদিক ওদিক ফিল্মের বই জোগার করে পড়া, টেকনিক গুলো শেখা, দু রাতে এডিটিং সফটওয়্যার শিখে নেওয়া ওই সময়টাতেই। নায়িকা যোগার করে, দু মাসে পড়াশোনা ইত্যাদি ভুলে শুটিং হল প্রথম ছবির, “তুমি আসবে বলে”। তা সে ছবি আর এল না, ভিডিও কাটের সময় খুব ভরসা ছিল পরে ডাব করে নেওয়া যাবে, কিন্তু সেইটা আর হয়ে উঠল না। পাতি এক্সপিরিয়ন্স এবং স্কিলের অভাবে ছবিটা শেষ হল না। তার পরে ও উৎসাহের কমতি নেই, পরের স্ক্রিপ্ট রেডি করল শুভ্র। এবার যদিও প্রথম ভাবনাটা আমার মাথায় আসে, এক সুন্দরী মহিলার সঙ্গে তার কিছু দিন আগেই, শুভ্র সাকুল্যে কুড়ি ফিট মতন হেঁটেছিল, আর বাকি পুরোটাই খাপছাড়া আলাপ চারিতা। সেই ভাবনা নিয়েই “টোয়েন্টি ফিট অফ টুগেদার নেস”, ও গল্প লিখল, স্ক্রিন প্লে তৈরি হল। আগেরবার আমি বিস্তর ছড়িয়েছি, এবার ওই নির্দেশক।


এর মধ্যে বলে রাখা ভালো, প্রথম বার আমি সিনেমাটোগ্রাফি করিনি, ভয়, পারবনা বলে। কিন্তু সিনেমাটোগ্রাফার নায়িকার মাথা কেটে দেওয়ার কারণে (অদ্ভুত ভাবে সেই ব্যাক্তি রাজশ্রীর একটি ছবি সেই সময় তুলেছিল, সেই ছবিটাতেও মাথাকাটা), শেষ কয়েকটা দৃশ্য আমি আর দিপু ডুয়াল ক্যামেরায় তুলেছিলাম। এবার তাই আমিই করব সিনেমাটোগ্রাফি। বিনা পয়সায় সিনেমা বানানো, কিন্তু আয়োজনের কমতি নেই। বৃষ্টির দরকারে রেনমেসিন বানানো হয়েছে, অরিজিৎ, অর্ঘ্য, শুভায়ন, শোভন, ত্রিজিত এবং দীপু প্রায় সবকিছু জোগাড় করে দিত। বাল্ব দিয়ে থ্রিপয়েন্ট লাইট সেট-আপ, ঘর পরিস্কার, সেট সাজানো, থারমোকল ধরা, লাইট ধরা, সব! আজ এদের কারুর সঙ্গেই সিনেমার সম্পর্ক নেই, তবে আজ কাল যাদের কাজ করতে দেখি, এই উৎসাহ এবং ডেডিকেসন কোনটাই বিশেষ দেখিনা। আমি বা শুভ্র বারবার ধ্যারাবার সত্বেও, প্রত্যেকবার একি উৎসাহে কাজ করে গেছে। দিপুর সঙ্গে প্রচুর সময় কেটেছে ফ্রেম শেখায় একসঙ্গে, রেফেরেন্স ফ্রেম দেখা, ভোরে উঠে নিখাদ ঘন্টার পর ঘন্টা ক্যামেরা নিয়ে প্রাকটিস। মনে পরে অরিজিত একবার বিনাপয়সায় গাড়ি পর্যন্ত জোগাড় করে দিয়েছিল।

এরপরে এই সিনেমা তৈরি মুলপদ্ধতি এবং ভাবনা নিয়েই, আমার আর শুভ্রর প্রায় অনেকদিন বাক্যালাপ এবং মুখ দেখাদেখি দুই বন্ধ ছিল। এর মধ্যে দুজনেই আলাদা আলাদা কাজ রিলিজ করেছি, তা সে ঝামেলা মেটার কিছুদিনের মধ্যেই ও ব্যাঙ্গালোর আর আমি দিল্লি। তাই দুবছর আগের ওই রকের আড্ডার সময়টাতেই দাবী উঠে আসা বাধ্য যে একসঙ্গে অন্তত একটা কাজ শেষ করতেই হবে। এতদিনে আমি বেশ কিছু ডকুমেন্টারি আর অ্যাড ফিল্মএর কাজ করে ফেলেছি, আর শুভ্র সিনেমা বানানো থেকে স্বেচ্ছা নির্বাসন নিয়েছে। হুট করে একদিন প্রশ্ন করল কম্যুনিকেসন কি কি ভাবে হতে পারে, বিস্তারিত আলোচনার পর বাড়ি ফিরতেই, আমার মাথায় কাগজের নৌকোর ভাবনাটা এল। খুব তাড়াতাড়ি তথাগতর চিঠিগুলো লিখে ফেলা হয়, এবং তারপরেই নন্দিনীর। তথাগতর শুট খুব তাড়াতাড়ি চারদিনের কাজেই শেষ, রোজদিনই বৃষ্টি, কোমর জলে নদীতে নেমে শুট। তারপর কিছুদিন চলল নন্দিনীর খোঁজ। কাউকেই আমার পছন্দ হয়না, আসলে সে এমন হবে, যাকে দেখে আমি প্রথমেই থমকে যাব, আর যারা ছবিতে দেখবে, অন্তত একটু প্রেম থাকলে মনে ভাববে “মে ফারস পে সাজদা কারতা হু কুছ হোশমে কুছ বেহোশি মে”। এমন দাবি দিলে, কঠিন হয়ে, অতএব পাওয়া গেলনা নন্দিনী।
আমি শুধু ঠিক করলাম, এটা না শেষ করে, আর নিজের অন্য ফিল্মের একসেকন্ডও শুট করবনা।

(ক্রমশ)















অনির্বান সরকার

Anirban Sarkar

Monday, July 3, 2017

পোঁদ ও প্রজাপতি হে : দুটি লেখা - শুভঙ্কর দাশ

পোঁদ
পোঁদ শব্দটিকে নিতম্ব বলে
খাটো না করাই ভালো।
শুনেই দেখছি ভুরু কুঁচকে গেল আপনার।
আপনারা তো আবার উচ্চ ঘর
কংস রাজার বংশধর।
আপনাদের বংশে কেউ কোনদিন
পোঁদকে পোঁদ বলেনি।
বলেছে পেছন, পাছা, নিতম্ব, বাম
আরো অনেক কিছুই।

অথচ অজন্তা ইলোরার যাবতীয়
নয়নাভিরাম নারী মূর্তির ভারী পোঁদ দেখে
আপনারা আপনাদের ইস্থেটিক্স বাড়িয়েছেন।

আজও ক্যাট ওয়াকে ভারী পোঁদ দুলিয়ে না হাঁটলে
পয়সা পাবে না ওই বেচারা মেয়েগুলো।

আমায় যে ছেলেটা মাসাজ করতো
সে বলেছিলো শরীরের যাবতীয় নার্ভ সেন্টার পোঁদে।
অতএব পোঁদের মাসাজ জরুরি খুব।
এ কথার সঠিক বেঠিক আমার জানা নেই।
জানা নেই ছেলেটা আসলে
হোমোসেক্সুয়াল ছিল কিনা।

শুধু জানি মেদিনীপুরে
কিছু মানুষের জাত
চন্দ্রবিন্দু হারানো সেই পোঁদ।
এবং তারা অনেকেই সুশিক্ষিত
প্রফেসর, কবি ইত্যাদি।

তাদের নিশ্চয়ই আপনি
নিতম্ব জাত বলে
অপমান করবেন না।




প্রজাপতি হে
কথা দিয়ে যারা কথা রাখে না
তাদের আমার প্রজাপতির মতো
মনে হয়।
তোমার মুখের চারদিকে নেচে বেড়াচ্ছে
সব রঙ
যা এমন আলগা যে হাত দিলেই
হাতে উঠে আসে।
না বলবে না একটুও।
অথচ তারপর কোথায় হারিয়ে যাবে
সেইসব রঙ ফেলে রেখে
যেমন এসেছিল না জানিয়ে
এমনি এমনি।

এখন যেমন একজন ঘুরে বেড়াচ্ছে
এই ডাউন টাউন ঘরে।
ভাবছি অতিথি কে কী দেব?
মনে পড়ল আমার এক বন্ধু বলেছিল
দিলে ওরা চিনি গোলা জলও খায়।

ছুটে রান্না ঘরে গিয়ে দেখি
চিনি বাড়ন্ত।
আহা নেই এ কথা বলতে নেই
এ শিক্ষা তো কবেই দিয়েছিল মা আমায়।

জীবনে তো সবই বাড়ন্ত তাহলে
বেড়েই চলেছে ক্রমাগত।

ফিরে এসে দেখি চলে গেছে
রঙের উৎসব
আরো একটা নতুন নেই
যোগ করে দিয়ে।


শুভঙ্কর দাশ

Subhankar Das

Saturday, July 1, 2017

এক অন্ধকার বিষণ্ণতার বোধ: একটি দেশদ্রোহী গদ্য - অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

এক অন্ধকার বিষণ্ণতার বোধ: একটি দেশদ্রোহী গদ্য

এইসব উপজাতি [?] শুধু যে অটল সংকল্প নিয়ে নিজেদের রক্ষা করে তাই নয়, তারা শত্রুদেরও অত্যন্ত বেপরোয়া সাহসিকতা নিয়ে আক্রমণ করে। তাদের মনের এমন একটা শক্তি আছে যা বিপদের আশঙ্কা কিংবা মৃত্যুভয়ের থেকে জোরালো।
নাগা জাতি সম্বন্ধে একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তার মন্তব্য, আনুমানিক ১৮৪০ খ্রীষ্টাব্দ 

রিশাং জেগে আছে—শীত, ১৯৫২ 
রিশাং সাখরি’র বয়স হইয়াছে। নয়-নয় করিয়াও নব্বুই তো হইবে। রিশাং যদিও বলিতে পারে না তাঁহার বয়স কত। কানে শোনে না। চোখে দেখে না। জলের নীচে তাকাইয়া দেখা জগতের মতো ঝাপসা আর ঘোলাটে তাহার জগৎ। কখনও পেচ্ছাপ-পায়খানা বিছানাতেই করিয়া ফ্যালে। শরীর ও জীবনের অসহায়ত্বের নিকট সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করিয়া মল ও মূত্রের কর্দমাক্ত মাখামাখির ভিতর চুপচাপ শুইয়া থাকে। ভাষাহীন চোখে ফ্যালফ্যাল করিয়া চায়। নষ্ট মার্বেলের মতো রিশাং-এর চোখের মণি তখন যেন এই জগতের নয়, অন্য কোনও জগৎ হইতে তাহা আসিয়াছে। তবু নাতনির বকবক শুনিবার ভয়ে কখনও দেয়াল ধরিয়া ধরিয়াও যায়। একাই যায়। কাহাকেও ডাকে না। কিন্তু শৌচাগার অবধি পৌঁছাইবার পূর্বেই যাহা হইবার হইয়া যায়। তখন আর পথ চিনিয়া বিছানায় ফিরিতেও পারে না। অকুস্থলেই বসিয়া পড়ে। ঘরের ঢালু দিক দিয়া হলুদাভ প্রস্রাব বহিয়া যায়। ভয়ে ডাকিতেও পারে না। কথা বলিলে কাঁপা-কাঁপা লম্বা একটা চিকন সুর বাহির হয় গলা দিয়া। বসিলে একটা পুঁটুলির মতো গোল দলা হইয়া থাকে। মনে হয়, এখুনি গড়াইয়া পড়িয়া যাইবে। শুধু কানে যখন রেডিও গুঁজিয়া শুইয়া থাকে, অসম্ভব জ্বলজ্বল করে বৃদ্ধের চোখ। দাঁতহীন মুখের দুই মাড়ি পরস্পর চাপিয়া ধরে। ব্রিটিশের বেয়নেটে চোয়াল দুইটা ভাঙিয়া ভিতরের দিকে ঢুকিয়া গিয়াছে। গালের দুই পাশে গ্রীষ্মকালীন খরাসর্বস্ব দুইটা পুকুর যেন। তাহাদের তলদেশ বুঝি মুখের ভিতর একে-অপরের প্রান্তভূমি চুম্বন করিয়াছে। কানে কিছুই শোনে না। তবু রেডিওটা তাঁহার চাই। ফিজোর নামটা যদি একবার শুনা যায়। ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দে এই রিশাং-এর প্রতিরোধ বাহিনীর কাছেই অস্ত্র নামাইয়া আত্মসমর্পণ করিয়াছিল এক রেজিমেন্ট ব্রিটিশ বাহিনী।  

ইতিহাস—বর্তমান—ভবিষ্যৎ
অদ্য যাহা ইতিহাস, একদিন তাহাই ভবিষ্যৎ ছিল। কেম্ব্রিজের ইতিহাসের এক অধ্যাপক এমনটাই বলিয়া থাকেন তাঁহার ছাত্রদের। আমরা যাহারা ‘ষত্ব ণত্ব বিধিতে সিদ্ধ’ শিক্ষিত শহুরে মানুষ তাহারা ইতিহাস ও ভবিষ্যতকে প্রস্রাবরত পুরুষের ডান ও বাম পদ সদৃশ দুই পার্শ্বে ছড়াইয়া মধ্যিখানে যথায় মূত্রত্যাগ করিতেছি, তাহার নাম দেওয়া হইয়াছে বর্তমান।

তবে একটা ইন্টারভিউ হয়ে যাক—ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২
’৫২ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি, দিল্লিতে প্রচণ্ড শীতে সাংবাদিক বৈঠক করিতেছেন ঊনচল্লিশ বৎসরের ছোটোখাটো চেহারার, ফর্সা, রোগাপাতলা এক কবি ও আগুনখেকো নেতা আংগামি জাপু ফিজো। যাঁহার মুখের ডানপার্শ্ব পক্ষাঘাতজনিত কারণে বেশ খানিকটা বাঁকা। তামাম ভারতের সাংবাদিক হতবাক হইয়া শুনিতেছে তাঁহার কথা। ফিজো বলিতেছেন,
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম আমরা চালিয়ে যাব। এবং একটি স্বতন্ত্র নেশনের প্রতিনিধিরূপে নেহরুর সঙ্গে আবার একদিন দেখা হবে বন্ধুত্বপূর্ণ বন্দোবস্তের জন্য।
ঝাড়খণ্ড নেতা জয়পাল সিংহ ফিজোর সম্মানে এক দ্বিপ্রাহরিক ভোজের আয়োজন করিয়াছেন। রাষ্ট্রীয় ভবনের ডাইনিং প্লেসে বিরাট ও সুদৃশ্য খাবার টেবিলে কাচের বাটি হইতে চিকেন রেজালা তুলিয়া দাঁতে কাটিতে-কাটিতে জয়পাল ফিজোকে বলিলেন,
দেখুন, ভারতকে আরও টুকরো টুকরো ক’রে নতুন পাকিস্তান বানানোয় আমাদের সম্মতি নেই। আপনি বরং স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের দাবি না ক’রে উত্তর-পূর্বে একটা উপজাতীয় রাজ্য গঠনের জন্য সংগ্রাম করুন। যেমন আমি করছি ঝাড়খণ্ড নিয়ে।
উত্তরে কবি তাঁহাকে জানাইলেন, 
আপনারা ইতিহাস আর ভূগোলে বড্ড কাঁচা। আপনাদের অবস্থান থেকে আমরা আপনাদের নর্থ-ইস্ট। আমি এখানে একটু সংশোধন ক’রে দিচ্ছি, আমরা আপনাদের ভারত রাষ্ট্রের নর্থ-ইস্টে অবস্থিত ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দুই, আমরা কোনও উপজাতি নই। একটা স্বতন্ত্র জাতি। আমাদের ভাষা কোনও উপভাষা নয়। আমাদের সংস্কৃতি কোনও উপ-সংস্কৃতি নয়। আপনি বোধহয় জানেন না যে, আমরাই, নাগারাই সবচেয়ে বেশি স্বশাসিত। আপনার এইসব না-জানাগুলো দোষের নয়। আপনারা নিজেদের দেশে জাতীয় আন্দোলন করেছেন। ইংরেজদের সাথে চিঠিপত্র লেখায় আপনারা অনেকদিন ছিলেন ব্যস্ত। জানার সময় পাননি। আমাদের দেশে সত্যাগ্রহ করতে তো যাননি আপনারা। কোনও আইন অমান্য করতেও যাননি। কোনও গান্ধী টুপি পরা কংগ্রেস নেতা কখনও এইসব পাহাড়ে আসেননি। আজকে আপনারা নিজেদের দেশে ক্ষমতায় এসেছেন এবং আমাদেরকে ভারতের সাথে জুড়ে দিতে চাইছেন। বেশ তো, তবে একটা ইন্টারভিউ হয়ে যাক। আপনাকে একটা প্রশ্ন করি, বলুন তো, এই যে আমাদের এখানে আমরা নাগা, মিজো, খাসি, জয়ন্তীয়ারা একসাথে থাকি, আমাদের নামে এই নাগা-মিজো-খাসি-জয়ন্তী পাহাড়গুলোর নাম হয়েছে নাকি এই পাহাড়গুলোর নামেই আমাদের নাম? আপনি ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়েছেন মিস্টার ইন্ডিয়া। বলুন? কী যোগ্যতা আছে আপনার যে আমরা আমাদের নেশন আপনাদের হাতে তুলে দেব? আমাদের মধ্যে জাতিভেদ নেই, আপনাদের আছে। আমাদের মধ্যে লিঙ্গবৈষম্য খুবই কম, আপনারা প্রগতিশীলেরা এখনও এর থেকে বেরুতে পারেননি। ভারতের মানচিত্রের সাথে আমাদের কোনও টান নেই। আপনাদের টানটা কী বলুন তো? ভারতের অন্যান্য জায়গার লোকেদের থেকে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক আমরা। আপনাদের সভ্য মানুষদের মতো শেয়ার মার্কেটে ব’সে চেঁচামেচি করি না। 
ভোজসভা শেষে ফিজো যখন বাহির হইয়া আসিতেছেন তখন দোর্দণ্ড্যপ্রতাপ পরাক্রমশীল রাজার কোনও দূত যেরূপে তুচ্ছ বিদ্রোহীর সম্মুখীন হয় সেইরূপে জয়পাল ফিজোর সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইলেন। এই শীতেও জয়পালের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ফিজো জয়পালের সেই ঘামগুলির দিকে তাকাইয়া বলিলেন,
আপনি হয়ত জানেন সাতচল্লিশ সালে আমি এসেছিলাম এখানে গান্ধীর সাথে দেখা করতে। উনি ঠিক কী বলেছিলেন আমায়, আপনার জানা উচিত। উনি বলেছিলেন, আমরা চাইলেই স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারি। কেউ আমাদের ভারতে যোগ দিতে বাধ্য করতে পারে না। দিল্লি যদি সৈন্য পাঠায় তাহলে তিনি নিজে নাগা পাহাড়ে এসে আমাদের সঙ্গে লড়বেন। গান্ধী এও বলেছিলেন, উনি দিল্লিকে বলবেন, একজন নাগাকেও গুলি করবার আগে তারা যেন গান্ধীকে গুলি করে।      
গাড়িতে উঠিয়া আবার নামিয়া আসিলেন ফিজো। পাদানিতে ডান পা রাখিয়া জয়পালকে হাতের ইশারায় ডাকিলেন। জয়পাল নিকটে আসিলে ফিজো বলিলেন,
আমি ফিরে গিয়ে আপনাকে ইন্টারভিউয়ের রেজাল্ট পাঠিয়ে দেব।

শুধু হাড় আর হাড়—অক্টোবর, ’৫২
ফিজো অরণ্যাবৃত পর্বতে ফিরিয়া গেলেন। নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিল খোনোমা গ্রামের আংগামি নাগাদের লইয়া গ্রামে গ্রামে গড়িয়া তুলিল গৃহরক্ষী দল। ঊনিশ শতকের শেষার্ধে এই গ্রামের লোকেরাই রহস্যময় কুয়াশার ভিতর জাগিয়া উঠা পাহাড়ের চুড়ায় শ্বেত সমুদ্রের দ্বীপে আর অরণ্যাবৃত পর্বতমালায় আংগামি রিশাং সাখরির নেতৃত্বে রুখিয়াছিল হানাদার ব্রিটিশ সৈন্যকে। এইবারে আরও একটা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইল এই গ্রাম। ঊনিশ শতকের সেই বিপ্লবীদের সন্তান-সন্ততিরাই রাত্রি জাগিয়া পোস্টার লিখিল। ‘স্বাধীনতা চাই এখন, স্বাধীনতা চাই অনন্তকাল’। ‘এটাই আমাদের প্রাণের কথা, এটাই হবে আমাদের মরণকালেরও কথা’। অসমের রাজ্যপাল আকবর হায়দারির সচিব নাগা নেশন পত্রিকায় আন্দোলনকে ব্যঙ্গ করিয়া লিখিলেন এক কুকুরের গল্প। যাহার মুখে ছিল এক টুকরা হাড়। ফিজো বলিলেন, শুধু হাড় আর হাড়। ওর কি ধারণা আমরা কুকুর? অক্টোবরে দিল্লিকে ফিজো পাঠাইলেন তাঁহার চরমপত্র। তাহাতে লিখিলেন,
এমন একটা জিনিসও নেই যাতে ভারতীয় আর নাগাদের মধ্যে মিল আছে। ভারতীয়দের দেখা মাত্র আমাদের মনে এক অন্ধকার বিষণ্ণতার বোধ জেগে ওঠে।  

পাপা, ওরা চলে যাচ্ছে—এপ্রিল, ’৫৩
       কোহিমায় নেহরুর সভা। সঙ্গে বর্মার প্রধানমন্ত্রী উ নু। নেহরু পরিয়া আছেন তাঁহার বিখ্যাত জহর কোট। কন্যা ইন্দিরাও তাঁহার পাশে। মঞ্চে নেহরু প্রবেশমাত্র নাগা শ্রোতারা সভা ত্যাগ করিয়া উঠিয়া গেলেন। যাইবার সময় স্বীয় অন্তর্বাস নামাইয়া পশ্চাদ্দেশ অনাবৃত করিয়া দেখাইতে ভুলিলেন না। মঞ্চে তখন মাইক্রোফোন বসিয়া গিয়াছে। তাহাতে কানেকশানও আনিয়া দিয়াছেন সাউন্ড মেকানিক। ইন্দিরা তাঁহার পিতাকে বলিলেন, পাপা, ওরা চলে যাচ্ছে। পরিষ্কার শুনা গেল সেই কথা।  

জ্বলছে প্রাণে অনেক জ্বালার চকমকি আজ
       অসম রাইফেলসের এক বিরাট ডিভিসন তো ছিলই, এইবার আরও এক রেজিমেন্ট গোলন্দাজ, সতেরো ব্যাটেলিয়ন ইনফ্যান্ট্রি আর অসম রাইফেলসের পঞ্চাশটি প্ল্যাটুন হড়হড় করিয়া ঢুকিয়া পড়িল নেফায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত বিপুল অস্ত্র লইয়া ফিজোও সাজাইলেন তাঁহার প্রতিরোধ বাহিনী। তাহার সেনাধ্যক্ষ হইলেন জেনারেল কাইটো। তাঁহার অধীনে চারিজন সেনাপতি। যাঁহাদের সৈন্যদলে রহিল ব্যাটেলিয়ন আর কোম্পানি। জাপানি আর ব্রিটিশ রাইফেল, স্টেন গান, মেশিন গান, হাতে নির্মিত গাদা-বন্দুক আর প্রত্যক্ষ সংগ্রামের জন্য দাও লইয়া প্রায় পনেরো হাজার গেরিলা সৈন্য তুয়েনসাং-এর জঙ্গলে দাঁড়াইয়া রহিল ভারতীয় সৈন্যকে মোকাবিলার জন্য। ইহা এমন এক দেশ যেস্থলে ভালোমতো ঘাঁটি গাড়িয়া থাকা একটা ছোট প্ল্যাটুন একটা ডিভিসনকে, একটা কোম্পানি একটা আস্ত আর্মি কোরকে রুখিতে পারে। একবার তাহাদের বাপ-ঠাকুর্দা এই জঙ্গলেই ব্রিটিশকে রুখিয়াছে। এইবার তাহাদের পালা। পায়ের নীচে যে পিষ্ট হয়, সরকারি বুটের চাপকে তাহার অধিক কে চিনিতে পারে? ব্রিটিশ চলিয়া গিয়াছে। তাহার বুট পরিয়াছে ভারত। রাজা যায় রাজা আসে। রং বদলায় বুট বদলায় না। বুটের নীচে প্রকৃত পেরেক হইয়া জন্ম নিল কয়েক সহস্র তরুণ আংগামি। ওদিকে মহান ভারতীয় সেনাবাহিনী তাহাদের নৃশংসতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইল। নিরস্ত্র নাগাদের মারিয়া তাহাদের উলঙ্গ মৃতদেহ টাঙানো হইল গাছে। ফিজো তাঁহার সেনাবাহিনীর সহিত এইবার গড়িলেন অনিয়মিত সেনাদল। গ্রামে গ্রামে প্রস্তুত হইল ছোট ছোট স্বেচ্ছাসেবী দল, বার্তাবহ দল, নারী স্বেচ্ছাসঙ্ঘ। গঠিত হইল নাগাল্যান্ডের ফেডেরাল সরকার। অঙ্কিত হইল স্বাধীন নাগাল্যান্ডের জাতীয় পতাকা। তবে, আরও একটি কাজ বাকি ছিল ফিজোর। ভারতকে তাহার ইন্টারভিউয়ের ফলাফল জানানো। নয়া দিল্লি ইহার সাত দিন পর একটি খাম পাইল। খাম খুলিয়া দ্যাখে তাহাতে একটি শাদা কাগজ। কাগজে লিখা, ‘ডিসকোয়ালিফায়েড’। নিম্নে আংগামি জাপু ফিজোর সহি।
চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়
বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন শান্তির সহায়ক শক্তি। শ্বেত কপোত উড়িতেছে তাহার দু’ডানা মেলিয়া। বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন নির্জোট শক্তির পক্ষে। বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন বাঁকে করিয়া গান্ধীর শান্তির ললিত বাণী লইয়া যায়। বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বশান্তির পক্ষে। বহির্দুনিয়ায় ভারতের তখন বহুত্ববাদের কথা। বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন সোশ্যালিস্টিক প্যাটার্ন অব ভিউ।
বহিরাগত এবং সাংবাদিক প্রবেশ রুদ্ধ করিয়া এহেন বহির্দুনিয়ার সম্পূর্ণ অগোচরেই ভারতীয় সেনাবাহিনী তখন তাহার বন্দুকের নল হইতে উৎসারিত ক্ষমতা লইয়া নেফায় ঢুকিয়াছে এবং তাহার ‘ক্লিন অ্যান্ড সাকসেস্‌ফুল’ অপারেশন সম্পন্ন করিতেছে।
ইহারও কয়েক যুগ পর সারা দেশ মাতাইয়া দিবে একটি গান। সঙ্গে তাহার পাগল করা বাজনা আর মদালসা কন্ঠ। চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায় চোলি কে পিছে। প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা।

ফিজো কোথায় গেলেন!
       ’৫৬ হইতেই ফিজো নিখোঁজ। যুদ্ধ চলিতেছে। ফিজোর নেতৃত্বেই চলিতেছে। কিন্তু ফিজো নাই। ওই কুয়াশা আর জঙ্গল ছাকনি দিয়া ছাকিয়াও ফিজো নাই। গ্রাম জ্বলিতেছে। গির্জা জ্বলিতেছে। আসল লোকটার দেখা নাই। ’৫৬-তেই ফিজো বর্ডার পার হইয়া বর্মায়। সেখান হইতে পূর্ব পাকিস্তান। সেখান হইতেই আন্দোলন পরিচালনা। কিন্তু এইবারে সময় হইয়াছে ‘ভারত’ নামের এই তথাকথিত শান্তির দূতের ঘুঙ্ঘট উত্তোলনের। জলের তলায় ডুবিয়া থাকা প্রাণী যেভাবে হঠাৎ ভুস্‌ করিয়া উঠিয়া আসে, ’৫৯ সালে ফিজো আচমকাই উঠিয়া আসিলেন লন্ডনে। পুরাটাই ডুবসাঁতারে আসা। পূর্ব পাকিস্তান হইতে এল-সালভাদোরের একটি জাল পাসপোর্ট জোগাড় করিলেন। সোজা সুইটজারল্যান্ড। যোগাযোগ হইল দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য আন্দোলনের কর্মী মাইকেল স্কটের সহিত। তাঁহারই সাহায্যে ইংলন্ডে আসিলেন ফিজো। একের-পর-এক সাংবাদিক সম্মেলনে গণপ্রজাতান্ত্রিক ভারত রাষ্ট্রের সামূহিক ঘোমটা উন্মোচিত হইল। বিলাতের সংবাদপত্র ভরিয়া গেল ভারত সরকার ও সেনাবাহিনীর ধর্মে ও কর্মে মহান এই দুর্ধর্ষ কীর্তিতে। দিকে দিকে রব উঠিল ‘এন্‌কোর এন্‌কোর’।
       দিকে দিকে ভারতও অন করিল তাহার মিডিয়া মেশিন। আচমকা মৎস বাহির হইয়া আসিলে কিছু ত্রাহিমধুসূদন শাক তো দরকার হইবেই। দিবালোকে অকস্মাৎ উন্মুক্ত লজ্জাস্থান আচ্ছাদনে তৎপর হইয়া অতঃপর তাই ভারতীয় সরকারি মিডিয়া অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনে জানাইলেন যে, ফিজো ম্যাট্রিক ফেল। তিনি প্রথম জীবনে মোটর-পার্টসের ব্যবসায় ব্যর্থ হইয়াছেন। অতঃপর বীমা কোম্পানির দালালি করিতে গিয়াও সফল হন নাই। পক্ষাঘাতে তাঁহার মুখও বিকৃত হইয়াছে। অতএব ইত্যাদি এবং এমতসব ব্যর্থতা ও বিফলতার ভগ্নমনোরথের ভগ্ন চক্র দ্বারা তাঁহার মানসিক গঠন নির্ধারিত হইয়াছে।

শীত, ’৫৯
এই শীতেই বোধহয় মরিয়া যাইবে রিশাং। জ্বরে আর হাঁপানিতে কাহিল। চোখে দেখে না। কানে শোনে না। তবু রেডিওটা কানে গুঁজিয়া আছে। বয়স ৯৯। আর কিছুই মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে, সেই যেন কত শ’ বছর আগে, যেন এই জন্মেরও আগে, তুয়েনসাং-এর ঘন জঙ্গলে অস্ত্র মাটিতে রাখিয়া তাঁহার সামনে হাত তুলিয়া দাঁড়াইয়া আছে ব্রিটিশ রেজিমেন্ট। প্রস্রাবে মাখামাখি হইয়া, প্রস্রাবের এই ঝাঁঝাল ও উগ্র গন্ধকেও তাঁহার মনে হয় জঙ্গলের পাতা আর কুয়াশার গন্ধ। হাতের রেডিওটিকে মনে হয় গ্রেনেড। বয়স ৯৯। চোখে দেখে না। কানে শোনে না। আর কিছুই মনে পড়ে না।    

পুরু ও আলেকজান্ডার
       এ গল্প ইতিহাসের গল্প নয়। গল্পেরও একটা ইতিহাস থাকে, যদি সেই ইতিহাসের দিকে তাকাই তবে হয়ত দেখিব, আজ যাহা ইতিহাস একদিন তাহা অভীষ্ট ও কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ ছিল না। যেহেতু ইহা গল্প, তাই কল্পনায় কিছু গোরুও থাকিবে। উহাদিগের মধ্যে কিছু গোরু যেমন গোমাতা হইবেন, কিছু গোমাতা বৃক্ষারোহণও করিবেন। কিছু গোরু দুর্ভিক্ষে খরায় মাঠে-ঘাটে জলহীন ডোবায় মরিয়া পড়িয়া থাকিবে। সেই গোরুগুলা অবশ্য গোমাতা হইবে না। আমরা বরং গাছে উঠা গোরুটার সহিত একটু কথা বলি। দেখি সে কী বলিতেছে। 
      
আমিঃ ও গোরু, তুমি গাছে উঠিয়াছ কেন!
গল্পের গোরুঃ আমাকে তো তুমিই তুলিয়াছ গাছে। এখন নামিব কী প্রকারে বলো
আমিঃ নামিবে পরে। এইবেলা নামিলে আবার ঘাস চিবাইতে শুরু করিবা। আমার কথা শুনিবা না
গ.গোঃ কী শুনিতে চাও বলো
আমিঃ যাহা জানো তাহাই বলো
গ.গোঃ আমি অনেক কিছুই জানি। তুমি কোনটা শুনিতে চাও সেইটা বলো
আমিঃ এই গল্পের শেষে কী হইল? 
গ.গোঃ কী আবার হইবে। তুমি মনে করো একটা বাটী পাইলে। বাটীতে দশটা ঘর। দশটা ঘরে দশ জনা লোক। তাহার মধ্যে একটা ঘরে তুমি কোনও কালেও যাও নাই। সেই ঘরের লোকটাকেও তুমি চেনো না। একদিন যখন তুমি গোটা বাটী নিজের নামে করিতে গেলে, তখন সেই একটা ঘরের লোক বলিল আমি তো তোমাকে চিনি না। তুমিও আমাকে চেনো না। তুমি কখনও আমার সহিত আসিয়া গল্প করো নাই। তুমি খালি বাকি ন’জনের ঘরেই গিয়াছ, চা পান করিয়াছ, পান খাইয়াছ। পান খাইয়া ঠোঁট আরক্ত করিয়া ফস্‌ করিয়া দিয়াশলাই দিয়া সিগ্রেট জ্বালাইয়াছ। সিগ্রেট জ্বালাইয়া ঊর্ধ্বপানে ধুম্র ত্যাগ করিয়াছ। এখন আমার ঘর আমাকে আলাদা করিয়া দাও। আমি তোমার বাটী হইয়া থাকিব না। এই তো গল্প।
আমিঃ তুমি ফিজোর কথা বলো
গ.গোঃ ফিজো একটা চিঠি লিখিয়াছিল, তাহা জানো?
আমিঃ চিঠি? কাহাকে লিখিয়াছিল?
গ.গোঃ কাহাকেও না
আমিঃ কাহাকেও না মানে?
গ.গোঃ আরে, ফিজো একজনকে চিঠি লিখিয়াছিল, তাহার নাম কাহাকেও না
আমিঃ কী লিখিয়াছিল তাহাতে?
গ.গোঃ সে জানিতো আলাদা বাটী তাহার হইবে না
আমিঃ  হইবে না কী প্রকারে? 
গ.গোঃ কী করিয়া হইবে বলো, তাহার ঘরের একদিকে চীন, একদিকে বর্মা, আরেকদিকে পূর্ব পাকিস্তান। এই প্রকার স্থানে আলাদা বাটী হয়? হইলেও কে দিবে?
আমিঃ তাহা হইলে এত হাঙ্গাম সে করিল কেন?
গ.গোঃ দ্যাখো, আমি তো গোরু। যদি দেশের সব ঘাস ফুরাইয়াও যায়, আমাকে যদি মানিয়া লইতেই হয় যে আমাকে এখন হইতে পোকামাকড় আর হাঁস-মুরগি ধরিয়া খাইতে হইবে, তথাপি কি আমি ঘাস খাইবার কথা ভুলিতে পারিব, বলো? যুদ্ধে পরাজয় বরণ করা যাইতে পারে, কিন্তু জীবনে কি পরাজয় বরণ করা যায়?  

’৬৩-র পয়লা ডিসেম্বর নাগাল্যান্ড রাজ্য গঠিত হইল। ’৬৪ সালে নাগাল্যান্ডের ব্যাপটিস্ট চার্চ গঠন করিল পীস মিশন। সেপ্টেম্বরে নাগাল্যান্ডের রাজ্যসরকার আর ফেডারাল রিপাবলিক অব নাগাল্যান্ডের মধ্যে যুদ্ধবিরতির চুক্তি হইল। ওই মাসেই নাগা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সহিত আলোচনায় বসিল ভারত সরকার। এই আলোচনায় মুখামুখি হইলেন নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিলের নেতা আইজ্যাক স্যু এবং ভারতের বিদেশ সচিব ওয়াই. ডি. গুণ্ডেভিয়া। আলোচনার শুরুতেই আইজ্যাক বলিলেন,
আজ আমরা এখানে দুই নেশন হিসেবে পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছি—নাগারা আর ভারতীয়রা।   

…………………………………………………......
[‘নাগা ক্রনিকল্‌’; ‘নাগাল্যান্ড : দ্য নাইট অব দ্য গেরিলাজ’; ফিজোর লেখা ‘এ ফেট অব দ্য নাগা পিওপল্‌ : অ্যান অ্যাপীল টু দ্য ওয়ার্ল্ড’ প্রভৃতি বই এবং বিশেষ ক’রে ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ’র ‘ইন্ডিয়া আফটার গান্ধী : দ্য হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ডস্‌ লার্জেস্ট ডেমোক্র্যাসি’—এই বইগুলো থেকে দু’হাত ভ’রে তথ্য, নথি, রেফারেন্স ব্যবহার করেছি। ব্যবহার করেছি সুমনের দু’টি গানের লাইন। একটি বহুল প্রচারিত হিন্দি গানের কলিও। এ লেখাকে ফিকশন না ব’লে ফিল্মের ভাষায় ডকুমেন্টারি বলা যায়।—লেখক]

২৩ জুন, ২০১৬



অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

Arjun Bandyopadhyay

Sunday, June 25, 2017

দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন এবং “ভালো থেকো” [শেষ পর্ব] - বহ্নিশিখা সরকার

দাঁড়ি, কমা, সেমিকোলন এবং “ভালো থেকো”
সাগর আর ঝিনুকের মধ্যে ভালোবাসা নেই। মন্দবাসাও নেই। সাগরের ঝিনুককে ভুলে যাবার দায় নেই, আর ঝিনুকের সাগরকে মনে রাখবার অধিকার নেই। ওরা কেবল জড়িয়ে আছে। বন্ধন নেই আবার মুক্তিও নেই। সাগর ছেলেটি বড্ড কেজো, আমি জানি না যদিও কিন্তু সে এমনটা দাবি করে। ঝিনুক মেয়েটা পাগল, আমি জানি না, সে এমনটা দাবি করে। সাগর কোনও এক কর্পোরেট জঙ্গলে বন্দী আর ঝিনুকের ঠিকানা নেই কোনও।


সাগর আর ঝিনুকের কবে দেখা হয়েছিল জানি না, এই টেকনোলজির যুগেও হুজুগে ওরা চিঠি লেখে। চিঠিতে কেবল কবিতা লেখে, যেগুলো  আমার হাতে পরেছে এসে কোনও ভাবে। তাই দিয়ে দিলাম...

ঘাট ছুঁয়ে জলের গান
সাগর,
খেয়া বেয়ে যায় মেঘ-মল্লার
সারা দেয় কেউ,
কেউ দেয় না

এঁটো হাত ধুয়ে মুছতে পারা যায়
যার শাড়িতে,
তাকে ভালবেসো

অনভ্যাসে বিদ্যা হ্রাস,
শেয়ার বাজারে প্রেমের দাম কমলে
গড়িয়ে নিয়ো প্রেম,
শরীরে মেঘ ঘনিয়ে এলে
উত্তাল যৌনতায় মেতো খানিক-
ঝড়িয়ে নিয়ো বৃষ্টি
ভালোবাসা বাতিল কিউরও

আমি একে শীতকাতুরে তাতে আহাম্মক,
তাই চিঠি লিখি,
যেদিন অমল বাইরে বেরোনোর ছাড়পত্র পাবে
ঠিক সেদিন থেকে আর লিখব না।

ইতি, ঝিনুক
২৪ শে সেপ্টেম্বর, ২০১৫, কলকাতা




কাঁদতে পারিনা নেহাত
সাগর,
সুযোগ দেইনি কাউকে
আমাকে কাঁদানো সহজ না।
ভান করতে করতে এমন আস্তরনে ঢেকেছি নিজেকে
এখন আরশি নগরের পড়শিকে আর
খুঁজে পাওয়া যাবে না।

কিন্তু, এবার জানি দরজা খুলে দেবার সময় হল-
জোয়ারের জলকে ঘরে ঢুকতে দেবার সময় হল।
আমার ঘরে বন্যা হলে
        পূর্ণিমার চাঁদ পরিষ্কার হয় আকাশে,
চাঁদের টানে জল বাড়ে, ঢেউ বাড়ে

নিজে ভেঙে যাবনা বলে অন্য কাউকে ভাঙলাম,
ছড়ালাম, কতকটা উড়িয়ে দিলাম।
সেই বীজ থেকে মহীরুহ,
সেখান থেকে আবার মেঘ-রোদ-জল-বৃষ্টি
একঘেয়ে সালোকসংশ্লেষ।

ইতি, ঝিনুক
২৮শে অক্টোবর, ২০১৫, কলকাতা




আরাধ্যা
ঝিনুক,
নিজেকে ভেঙেছি, গড়েছি, অনেক পালিয়েছি
তবু লতানে গাছের মতন উপচে পরেছি
নারীর বুকে এসে।
নারী বিশল্যকরণী হয়ে উপশম করে
আমার পরিবর্তনীয় রোগ

নারী শরীর তার সমস্তটুকু নিয়ে
মোমের আলোর মত আমার অপরিষ্কারটুকু
মার্জনা করে নেয়,

সে কোনও এক 'কার' দয়ায় এখনও পাগল হয়ে যাইনি,
সেই কোনও এক 'কেউ' মোজেসের মত মাঝ বরাবর
কেটেছে আমার আত্মহত্যার ইচ্ছে।

তোর কবিতায় নারী শরীরের গন্ধ আছে।

ইতি, সাগর
১লা নভেম্বর, ২০১৫, মুম্বাই




কিছু কথা না হয়
ঝিনুক,
আমি জানি কবিতাগুলো বিশেষ যত্ন করে
আমাকে কেবল ‘ঐটুকু’ কথা জানাবার জন্যে লিখিস।
কিন্তু সম্পর্কের গণ্ডীটুকু ভোলবার নয়-
এভাবে চলবার নয়, চলতে পারে না।

বড্ড ন্যাকা ন্যাকা কবিতা লিখিস-
ইচ্ছে করে তোর দুটো হাত বেঁধে দেই,
ইচ্ছে করে তোকে খুব করে অপমান করি।
তোর সামর্থ্য নেই আমাকে ভালবাসবার
আমি দাম্ভিক ভাবে তোর মুখে ছুঁড়ে মারতে পারি
সুইসাইড নোট।

এই ইট-কাঠে থাকা অভ্যাস হয়ে গেছে আমার,
রোবট হয়ে থাকতে দে।
প্রেমিকার সাথে উদ্দাম যৌনতায়
ভুলে যাচ্ছি অতীত-বর্তমান
ভুলতে দে!
তোর কবিতা থেকে ধান খেতের গন্ধ আসে,
পাখির ডানা ঝাপটানোর গন্ধ আসে,
নদীর ঢেউয়ের গন্ধ আসে...

চাই না এসব, দূরে থাক।

ইতি, সাগর
৫ই জানুয়ারি, ২০১৬, ব্যাঙ্গালোর




অবেলায় যদি
সাগর,
আমার কাছ থেকে ভালোবাসা আর কান্না ধার নিয়েছে কতজন
তোমায় দিলাম ভালো থাকার গল্প,
ভাবলে সুখে আছি?
ভাবলে হিংসে করছি?
ভাবলে পাণিপ্রার্থী?

ফ্রিজে রাখা ভালোবাসা টুকরো টুকরো করে
তুলে এনে অ্যালকোহলের সঙ্গত করি,
সুন্দর গুছিয়ে রাখা পেলব মুখশ্রীর মতন প্রেম নয়,
প্রেম এবড়ো খেবড়ো মেঠো পথ-
চলতে কষ্ট এবং শেষও নেই।

তোমাকে চাই না,
আর চিঠিও লিখবো না,
লিখতে ইচ্ছে করলে ছাতাহীন হয়ে বৃষ্টিতে ভিজব-
আর তোমার কথা মনে পড়লে
সিগারেট খেয়ে নেব।

ইতি, ঝিনুক
১২ই ফেব্রুয়ারি, ২০১৬, নয়া দিল্লী















বহ্নিশিখা সরকার
Banhisekha Sarkar

Thursday, June 8, 2017

পানশালার মনোলগ : অর্ক চট্টোপাধ্যায়

পানশালার মনোলগ

দুপুরের পানশালা। চড়া রোদ বাইরে। মদের থেকেও বেশি রোদের জন্য ভেতরে ঢুকলো হিমাংশু। উইকএন্ডের দুপুর।পানশালায় ভাঁটা। ফাউন্টেন থেকে একটা বিয়ার নিয়ে কোণের ফাঁকা সিঙ্গল টেবিলে গিয়ে বসলো। নীথর শহরতলীর দুপুরে ভেতর-বাইরে এক হয়ে রয়েছে। একদিকের দেওয়াল-টিভিতে ক্রিকেট—অ্যাশেজ সিরিজ, আর অন্যদিকে হর্স রেস ঘিরে কয়েকজন বৃদ্ধের জটলা। অদূরের টেবিলে দুটি মেয়ে কথা বলতে বলতে বিয়ারে চুমুক দিচ্ছে। হিমাংশুর দিকে পিঠ করে যে মেয়েটি বসে আছে তার মুখ দেখতে না পেলেও বাঁ পায়ের হাঁটু অব্দি উঠে আসা কালো চকচকে লং-বুট হাতের সাথে তাল ঠুকে ওঠানামা করছে, কখনো হাঁটুর ঠিক নিচে, কখনো আবার গোড়ালির কাছাকাছি ভাঁজ হয়ে যাচ্ছে। হিমাংশু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে, কিম্বা দেখতে। মেয়েটির সব কথা তার লং-বুটের সরব ভাঁজগুলোর ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। কথাগুলো বুজে আসছে ভাঁজ-শব্দে। হিমাংশু বিয়ারে চুমুক দিতে দিতে টেবিলে রাখা সিডনী মর্নিং হেরাল্ডে চোখ দিলো। সংবাদ-শব্দ সরব হয়ে উঠতে লাগলো। মগজে তার দৃশ্যের মৌচাক।
গোটা কাগজ জুড়ে ইউরোপের রিফিউজি ক্রাইসিস নিয়ে রিপোর্ট। সিরিয়া এবং মধ্য প্রাচ্যের নানা দেশ থেকে কাতারে কাতারে লোক জার্মানীতে ঢুকছে। তাদের হাসি-কান্নায় ভাঙা মুখ, কোলে বাচ্চা, খুলে রাখা জুমড চটি জোড়ার ছবি। টার্কির ৩ বছরের আয়্লানের বালিতে গুঁজে থাকা নীথর মুখ। এই ছবিটা শেষ দু-তিনদিন ধরে অনবরত সোশাল মিডিয়ায় ট্রল করছে, দেখেছে হিমাংশু। না, সে শেয়ার করেনি, কোথাও বেঁধেছে, কোথায়, কি, তা ঠিক করে বলা মুশকিল। ফেসবুক টুইটারের এই অবাধ মৃত্যু-মৃত্যু খেলায় এবং জ্ঞান আর নৈতিকতার লড়াইয়ে সচরাচর ঢুকতে ইচ্ছে করে না ওর। পছন্দগুলো ‘লাইক’ হয়ে গেছে, সারাদিন আকাশ থেকে খসে খসে পড়ছে। টার্কির ৩ বছরের শিশু মৃত্যুর বোট থেকে ফটোগ্রাফের আগ্রাসী দৃষ্টির বোটে উঠে সোশাল মিডিয়ার দেওয়ালে দেওয়ালে অনুকম্পা আর বাণীবাণ হয়ে উঠেছে। আয়্লান কি ভাবছে এই সব ট্রলিং নিয়ে? সমুদ্রে কি ট্রলার চলছে এখনো? তার বাবা কি এখনো মরে যাবার কথা বলছেন ইন্টারভিউয়ে? হিমাংশু পাতা উল্টে এগিয়ে চলে। শেষ ক'দিন ধরে অস্ট্রেলিয়ান মিডিয়া তোলপাড় রিফিউজি ইনটেক নিয়ে। 
বর্তমান সরকার লিবারালদের। বছরখানেক ধরেই টনি অ্যাবটের তথাকথিত 'বোট পলিসি' নিয়ে বিতর্ক তুঙ্গে।

Tuesday, June 6, 2017

রোহিণীর সাথে, এই ত্রিশ বত্রিশ বছরে... : দীপ শেখর

রোহিণীর সাথে, এই ত্রিশ বত্রিশ বছরে... 





কাল রাতে লম্পট বৃষ্টিটা পড়লে বুঝলাম
প্রেমের দালালটা আবার ধরবে ধরবে করছে, টাকা চাইবে
চাঁদের জ্বর প্রায় একশো এক, জ্যোৎস্নার ঘরে বাবু নেই
আমি কাল রাতের ঐ নীল শাড়ি পড়া মেয়েটির কাছে আশ্রয় চাইবো, ডাকবো রোহিণী, বেঁচে যাবো।


ভালোবাসা নয়, ভালোবাসার আত্মারাই সবথেকে সহজে ভালোবাসে
এসব বুঝে আমি প্রেমিকের আত্মাটা নিয়ে খানিক নাড়াচাড়া করেছি কাল দুপুরে
আমার পুরনো জীবনকে এখন ট্রাঙ্ক থেকে বার করে নিয়ে আসতে হবে
হৃদয়কে বৃষ্টি ভেজানোর কোনও উপায় জানা আছে কি এ দেশের আইন-ব্যবস্থার?

Saturday, April 15, 2017

দ্রিম দ্রিম ৪ | ম্যাগনোলিয়া, রেড ওয়াইন অ্যান্ড চীজ : দোয়েলপাখি দাশগুপ্ত

দ্রিম দ্রিম ৪ ম্যাগনোলিয়া, রেড ওয়াইন অ্যান্ড চীজ
আস্তাবলের দিকটা না। ম্যাগনোলিয়া ছিল এদিকটায়। গ্লেনারিজ, কেভেন্টারস ছাড়িয়ে আরও একটু এগিয়ে বাঁ দিকে। জামাকাপড়... ডেনিম জ্যাকেট, জেগিংস-এর দোকান... সেগুলো পেরিয়ে কুংগা যাওয়ার রাস্তাটায়। সাদা সবুজ লাল মেশানো কাঠের বাড়ি। ছবির বইয়ের মতো জানালা। আইভিলতাও ঝোলে বোধ হয়। আমি আইভি দেখিনি যদিও কখনও। নীচে ডানদিকে বাজারে নেমে যাওয়ার সিঁড়ি। হিল কার্ট রোডের দিকে। আমি ঠেলেঠুলে একটা সরু গলির মধ্যে দিয়ে উঠতে থাকি। ম্যাগনোলিয়া একবার দেখে আসা দরকার। সরু গলি। কিন্তু অন্ধকার নয়। ওপর দিকের বাড়িগুলোর টিনের চাল আর কার্নিসের ফাঁকফোকর দিয়ে আলো আসছে অনেক। দুপাশে লোক দাঁড়িয়ে। কেউ বিরক্ত করছে না। যে যার মতো ব্যস্ত। সিগারেট খাচ্ছে। গল্প করছে। ওয়াই ওয়াই খাচ্ছে। পাশ দিয়ে সরিয়ে সরিয়ে এগোতে হচ্ছে। ম্যাগনোলিয়ার সামনে এসে পড়লাম।
এটা তো বেশ বড় একটা হামাম! হোটেল ভেবে এদিকে বুক করে ফেলল মৈত্রেয়। ওই তো... জাপানি বাড়ির মতো, চাল দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে অল্প। ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’-র বাড়িটার মতো। আমি ভেতরে ঢুকি। ঘন বোতল সবুজ অন্ধকার। তার মাঝখান থেকে চাপা রক্তের মতো লাল রঙের দেওয়াল দেখা যাচ্ছে। বাষ্পে আধো-অদেখা হয়ে আছে গোটাটা। কাচের দরজা খুলে ঢুকতে ঢুকতে টের পাই আমার হাইট কমে গেছে।আমি একটা উঁচু-হিল জুতো পরে। আমার গায়ে একটাসাদা শার্ট আর গ্রে রঙের পেন্সিল স্কার্ট

Monday, April 10, 2017

আবার দুই মেঘপারা মেয়ে : মনোজ দে

মেঘপারা মেয়ে ৯

যে সমস্ত শব্দ
উচ্চারিত হল না তোমার পাশে

ইমেজের ভেতর অথচ       সাবলীল
ঘর হয়। মেঘ হয়। ঋতু হয়

ও মেঘপারা মেয়ে
টেলিফোন বলতে বলতে
যারা জন্ম ন্যায়
সমস্তটাই ব্রথেল?



Thursday, April 6, 2017

কাঞ্চনজঙ্ঘার ছায়া : শোভন ভট্টাচার্য

কাঞ্চনজঙ্ঘার ছায়া

তুষার বাহিত হাওয়া
এখন শাসন করছে রাত্তিরের ম্যাল।
সমস্ত টুরিস্ট প্রায় ফিরে গেছে হোটেলের ঘরে।
লামা সাধুদের মতো জেগে আছে সারিবদ্ধ পাইন।
কাছে দূরে উঁচুনিচু সমস্ত পাহাড়
প্রাণের প্রদীপ যত জ্বেলেছিল মোহিনী সন্ধ্যায়
একে একে নিভে আসছে সব।
দার্জিলিং ম্যালও তার বাণিজ্যিক বাহু
গুটিয়ে নির্বাণ মন্ত্রে ধ্যানস্থ এখন।

#
ব্রিটিশের ভূত আছে এই দার্জিলিং-এ;
‘কাঞ্চনজঙ্ঘা’-র ছবি বিশ্বাসসুলভ বাঙালিরা
এখনও সপরিবার ছেলেমেয়েজামাইশ্যালক
সমেত প্রতিবছর এখানে আসেন।
থাকেন ব্রিটিশ-ধাঁচে বানানো বাংলোয়।
খাদের রেলিং-ঘেরা সবুজ লবিতে টি-টেবিল
তাদের মহৎ-জন্ম-যাপনের সেরা অবকাশ।

#
আর আসেন নিতান্তই মধ্যবিত্ত শ্রেণি।
সারাদিন এই ম্যাল তাদের কেনাকাটায়, ক্যাচোরম্যাচোরে
চেনা যায়না পাহাড়ের কোনও শীর্ষ ব’লে।

#
আমি নিজে এর আগে দু’বার
দার্জিলিং জেলার সবচেয়ে
উঁচু যে পাহাড়ে থাকে মানুষ, সেখানে
পাঁচদিনের পায়ে হাঁটা পথ ঘুরে ফেরার সময়
শহরে নেমেছিলাম।
কেভেন্টার্সে কফি, গ্লেনারিজে ব্রেকফাস্ট
খেয়েও আমার মন ভরেনি ততটা।
মায়ের চাদর আর বাবার জাম্পার
কিনে ফিরে গেছি অসহায়।
কিন্তু আমি সতত নিশ্চিত
এবারে যে সৌভাগ্যের অধিকার নিয়ে আমি এখানে এসেছি
কাঞ্চনজঙ্ঘার মুখ না দেখতে পাওয়ার গ্লানি তুচ্ছ তার চেয়ে।
কেননা এবার বউ-মেয়ে
ছাড়াও সফর-সঙ্গী বাবা-মা আমার;
যে বাবা-মা ইতিপূর্বে হিমালয় পাহাড় দেখেনি কোনও দিন;
আজ আমি তাদের এক কৃতার্থ সন্তান।
কাজেই এ শুধু একটা ভ্রমণকাহিনিমাত্র নয়;
এ এক প্রেমিক, পিতা, পুত্রজন্ম সিদ্ধির বিষয়।

Tuesday, April 4, 2017

সোনালি আপেল ও প্রিয়তম : কৃতি ঘোষ

সোনালি আপেল ও প্রিয়তম

মানুষ চিরকাল অন্ধকূপের মধ্যে কাটাতে ভালোবাসে। এদিকে যাব না, ওদিকে যাব না - আমি বসে থাকবো শুধু। এমনটা বললে কোও ছায়াছবির মত পথ আগলে রাখা যায় ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত প্রকৃতিতে বাঁচা যায় না। বাঁচার কোনও অর্থ নেই মানে অর্থের বেঁচে থাকার প্রয়োজন ফুরিয়েছে। না, আমি গুলিয়ে দিচ্ছি না, প্রস্তর ভেঙে কারুর মূর্তিও তৈরি করছিনা আপাতত। এই যে সাময়িক প্রয়াস – তার অর্থ আমার প্রত্যয় ঘটেছেআমি উচ্চস্থানে বাস করছি আপাততএখানে কবিতার প্রয়োজন নেই, মৃত্যুর প্রয়োজন নেই। এখানে সমুদ্রের ফেনা আরেকটা অ্যাফ্রোদিতির জন্ম দিতে পারবেনা। সূর্যের দেবতা এখন অকর্মণ্য হয়ে শিস দিচ্ছে খানিক।

নদীতটে বসে কার কথা মনে পড়ে? কার ভ্রু উঁচিয়ে তাকানোয় বাষ্পীভূত হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে বেশি? কে সেই দীন-দরিদ্র ও কবির মাধ্যমে অমর হওয়া প্রেমিক? এসো প্রেমিক, জল ভেঙে জরায়ুতে এসো। তোমাকে জন্ম দিই একবার। এখানে তরল অনুভূতিরা গাছে গাছে হেলান দিয়ে বসে থাকে। সোনালি আপেলের মত লোভ আছে বিস্তর। তবে দেখানোর শখ নেই। বালি বালি রোদ আছে। বিনে পয়সার চাবুক আছে। চাবুক কথা বললেই ছোটে। পিঠ বেয়ে সাপের মত হিসহিস করে চাবুক। দেখোনি?

Thursday, March 30, 2017

Menstruation Cycle - কলিকাতার প্রমিতসার্কেল হইতে আমি অতনু কইতাছি




কলিকাতার প্রমিতসার্কেল হইতে আমি অতনু কইতাছি

সুশীলপর্ব, ১
মাঝে মধ্যে আমিও সুশীল হইতে চাই! আর তাই কিছু হিসেব পাশ কাটাইয়া যাওনের লগে আরাম পাই, ভাবিতে থাকি এই বুঝি ছুছিল হইলাম গো... চ লিখি না ছ লিখি... চ'-এ চো*:P ছ-এ ছমাছম ছম্মা ছমাছম ছম্মা, চু অথবা ছু, চিল অথবা ছিল, চু-চিল, ছু-ছিল! দীর্ঘ কোনো ই-কারের প্রয়োজন নাই, চুচিল বা ছুছিলেই হইবেক ম্যান।তারপর চুচিলের পত্রপত্রিকা ছুছিলের 'আজ রাতে তমুক চ্যানলে মাড়াইবো লাইভ' ইত্যাদি, তারপর অমুক আকাদেমির তমুক তামাক... বাবুরাম সাপুড়ে চুচিল তুই কোথা যাস বাপুরে, আয় বাওয়া দেখে যা, দুইখান তাস রেখে যা... ট্রাম্পকেও চোখে ধাঁধা লাগায়ে চুচিলগণ ওভার ট্রামের কার্ড খেলেন গো... তো আমিও মাঝে মধ্যে সুশীল হইতে চাহি...

পূর্ণসাধু প্রমিতের সুশীল হইতে চাই... কিন্তু আমার তো ব্যকরণবিধি ঠিক নাই, না-প্রমিত না-আঞ্চলিক, না-ঘটি না-বাঙাল, না-মোহনা না-পার্বত্য, না-জংলা না-মালভূম – কিছুই ঠিক নাই... গুরুচণ্ডালীর বাপেরে মা ইত্যাদি কেস হয়... তারপর ম্যানুফ্যাকচারড কনসেন্ট চুদায়ে মানে নিউজটিউজ লিখে কখনো রামপ্রসাদ কখনো দুদ্দু শাহ গাহিতে গাহিতে বাসের জানালার ধারে সুশীল নগর দেখতে দেইখতে বাস থিকান নামি, তারপর টোটো ধরি, বাসায় ফিরি... মুখে চাট্টকিছু দিয়া ফেইসবুকে বসি, দেখি  সুশীল মামা দ্যায় হামা... এরপর সুশীল নয় বরং খ্যাপাচোদা, এমন পদকর্তা, পদাবলীকার, কথকঠাকুর, ফিলোজফার, কবিএমন সকল পাখীমানুষদের মাথাখারাপ লেখা নিয়ে বসে থাকি, মাঝে মধ্যে প্রেমিকা বা প্রেয়সী-সুন্দরীদের লগে কথা হয়, প্রেমিকাও মাঝে মধ্যে কোথায় যে যায়েন, তা ভাইবা ডুব ডুব সাগরে আমার মন, প্রেমেরমানুষ কোথায় হারায় নাকি রয়েই যায়... বাসাতেও আমারে পুঁছে না কেউ...

তাই বাস থিকা নেমে একখান টিকিট কেটে লই এক্সপ্রেসের জেনারেল কামরায়, মুখ কালো ক'রে রবিন্দরের আশ্রমে যাই... রবিন্দর কইতাছি, কেননা সেদিন দেখি হিন্দিভাষীদের আর হিন্দুত্বের ধ্বজা উড়িতেছে আশ্রম থিকা অনতি দূরে...তারও আগে দিদির তোরণ, দিদির তোরণের পর ত্রিকোণ লাল পতাকা, যাহার বর্ডার সোনালী জরিতে, মাঝে হনুমান জ্বিউ…