Showing posts with label Artist. Show all posts
Showing posts with label Artist. Show all posts

Monday, July 3, 2017

পোঁদ ও প্রজাপতি হে : দুটি লেখা - শুভঙ্কর দাশ

পোঁদ
পোঁদ শব্দটিকে নিতম্ব বলে
খাটো না করাই ভালো।
শুনেই দেখছি ভুরু কুঁচকে গেল আপনার।
আপনারা তো আবার উচ্চ ঘর
কংস রাজার বংশধর।
আপনাদের বংশে কেউ কোনদিন
পোঁদকে পোঁদ বলেনি।
বলেছে পেছন, পাছা, নিতম্ব, বাম
আরো অনেক কিছুই।

অথচ অজন্তা ইলোরার যাবতীয়
নয়নাভিরাম নারী মূর্তির ভারী পোঁদ দেখে
আপনারা আপনাদের ইস্থেটিক্স বাড়িয়েছেন।

আজও ক্যাট ওয়াকে ভারী পোঁদ দুলিয়ে না হাঁটলে
পয়সা পাবে না ওই বেচারা মেয়েগুলো।

আমায় যে ছেলেটা মাসাজ করতো
সে বলেছিলো শরীরের যাবতীয় নার্ভ সেন্টার পোঁদে।
অতএব পোঁদের মাসাজ জরুরি খুব।
এ কথার সঠিক বেঠিক আমার জানা নেই।
জানা নেই ছেলেটা আসলে
হোমোসেক্সুয়াল ছিল কিনা।

শুধু জানি মেদিনীপুরে
কিছু মানুষের জাত
চন্দ্রবিন্দু হারানো সেই পোঁদ।
এবং তারা অনেকেই সুশিক্ষিত
প্রফেসর, কবি ইত্যাদি।

তাদের নিশ্চয়ই আপনি
নিতম্ব জাত বলে
অপমান করবেন না।




প্রজাপতি হে
কথা দিয়ে যারা কথা রাখে না
তাদের আমার প্রজাপতির মতো
মনে হয়।
তোমার মুখের চারদিকে নেচে বেড়াচ্ছে
সব রঙ
যা এমন আলগা যে হাত দিলেই
হাতে উঠে আসে।
না বলবে না একটুও।
অথচ তারপর কোথায় হারিয়ে যাবে
সেইসব রঙ ফেলে রেখে
যেমন এসেছিল না জানিয়ে
এমনি এমনি।

এখন যেমন একজন ঘুরে বেড়াচ্ছে
এই ডাউন টাউন ঘরে।
ভাবছি অতিথি কে কী দেব?
মনে পড়ল আমার এক বন্ধু বলেছিল
দিলে ওরা চিনি গোলা জলও খায়।

ছুটে রান্না ঘরে গিয়ে দেখি
চিনি বাড়ন্ত।
আহা নেই এ কথা বলতে নেই
এ শিক্ষা তো কবেই দিয়েছিল মা আমায়।

জীবনে তো সবই বাড়ন্ত তাহলে
বেড়েই চলেছে ক্রমাগত।

ফিরে এসে দেখি চলে গেছে
রঙের উৎসব
আরো একটা নতুন নেই
যোগ করে দিয়ে।


শুভঙ্কর দাশ

Subhankar Das

Saturday, July 1, 2017

এক অন্ধকার বিষণ্ণতার বোধ: একটি দেশদ্রোহী গদ্য - অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

এক অন্ধকার বিষণ্ণতার বোধ: একটি দেশদ্রোহী গদ্য

এইসব উপজাতি [?] শুধু যে অটল সংকল্প নিয়ে নিজেদের রক্ষা করে তাই নয়, তারা শত্রুদেরও অত্যন্ত বেপরোয়া সাহসিকতা নিয়ে আক্রমণ করে। তাদের মনের এমন একটা শক্তি আছে যা বিপদের আশঙ্কা কিংবা মৃত্যুভয়ের থেকে জোরালো।
নাগা জাতি সম্বন্ধে একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তার মন্তব্য, আনুমানিক ১৮৪০ খ্রীষ্টাব্দ 

রিশাং জেগে আছে—শীত, ১৯৫২ 
রিশাং সাখরি’র বয়স হইয়াছে। নয়-নয় করিয়াও নব্বুই তো হইবে। রিশাং যদিও বলিতে পারে না তাঁহার বয়স কত। কানে শোনে না। চোখে দেখে না। জলের নীচে তাকাইয়া দেখা জগতের মতো ঝাপসা আর ঘোলাটে তাহার জগৎ। কখনও পেচ্ছাপ-পায়খানা বিছানাতেই করিয়া ফ্যালে। শরীর ও জীবনের অসহায়ত্বের নিকট সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করিয়া মল ও মূত্রের কর্দমাক্ত মাখামাখির ভিতর চুপচাপ শুইয়া থাকে। ভাষাহীন চোখে ফ্যালফ্যাল করিয়া চায়। নষ্ট মার্বেলের মতো রিশাং-এর চোখের মণি তখন যেন এই জগতের নয়, অন্য কোনও জগৎ হইতে তাহা আসিয়াছে। তবু নাতনির বকবক শুনিবার ভয়ে কখনও দেয়াল ধরিয়া ধরিয়াও যায়। একাই যায়। কাহাকেও ডাকে না। কিন্তু শৌচাগার অবধি পৌঁছাইবার পূর্বেই যাহা হইবার হইয়া যায়। তখন আর পথ চিনিয়া বিছানায় ফিরিতেও পারে না। অকুস্থলেই বসিয়া পড়ে। ঘরের ঢালু দিক দিয়া হলুদাভ প্রস্রাব বহিয়া যায়। ভয়ে ডাকিতেও পারে না। কথা বলিলে কাঁপা-কাঁপা লম্বা একটা চিকন সুর বাহির হয় গলা দিয়া। বসিলে একটা পুঁটুলির মতো গোল দলা হইয়া থাকে। মনে হয়, এখুনি গড়াইয়া পড়িয়া যাইবে। শুধু কানে যখন রেডিও গুঁজিয়া শুইয়া থাকে, অসম্ভব জ্বলজ্বল করে বৃদ্ধের চোখ। দাঁতহীন মুখের দুই মাড়ি পরস্পর চাপিয়া ধরে। ব্রিটিশের বেয়নেটে চোয়াল দুইটা ভাঙিয়া ভিতরের দিকে ঢুকিয়া গিয়াছে। গালের দুই পাশে গ্রীষ্মকালীন খরাসর্বস্ব দুইটা পুকুর যেন। তাহাদের তলদেশ বুঝি মুখের ভিতর একে-অপরের প্রান্তভূমি চুম্বন করিয়াছে। কানে কিছুই শোনে না। তবু রেডিওটা তাঁহার চাই। ফিজোর নামটা যদি একবার শুনা যায়। ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দে এই রিশাং-এর প্রতিরোধ বাহিনীর কাছেই অস্ত্র নামাইয়া আত্মসমর্পণ করিয়াছিল এক রেজিমেন্ট ব্রিটিশ বাহিনী।  

ইতিহাস—বর্তমান—ভবিষ্যৎ
অদ্য যাহা ইতিহাস, একদিন তাহাই ভবিষ্যৎ ছিল। কেম্ব্রিজের ইতিহাসের এক অধ্যাপক এমনটাই বলিয়া থাকেন তাঁহার ছাত্রদের। আমরা যাহারা ‘ষত্ব ণত্ব বিধিতে সিদ্ধ’ শিক্ষিত শহুরে মানুষ তাহারা ইতিহাস ও ভবিষ্যতকে প্রস্রাবরত পুরুষের ডান ও বাম পদ সদৃশ দুই পার্শ্বে ছড়াইয়া মধ্যিখানে যথায় মূত্রত্যাগ করিতেছি, তাহার নাম দেওয়া হইয়াছে বর্তমান।

তবে একটা ইন্টারভিউ হয়ে যাক—ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২
’৫২ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি, দিল্লিতে প্রচণ্ড শীতে সাংবাদিক বৈঠক করিতেছেন ঊনচল্লিশ বৎসরের ছোটোখাটো চেহারার, ফর্সা, রোগাপাতলা এক কবি ও আগুনখেকো নেতা আংগামি জাপু ফিজো। যাঁহার মুখের ডানপার্শ্ব পক্ষাঘাতজনিত কারণে বেশ খানিকটা বাঁকা। তামাম ভারতের সাংবাদিক হতবাক হইয়া শুনিতেছে তাঁহার কথা। ফিজো বলিতেছেন,
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম আমরা চালিয়ে যাব। এবং একটি স্বতন্ত্র নেশনের প্রতিনিধিরূপে নেহরুর সঙ্গে আবার একদিন দেখা হবে বন্ধুত্বপূর্ণ বন্দোবস্তের জন্য।
ঝাড়খণ্ড নেতা জয়পাল সিংহ ফিজোর সম্মানে এক দ্বিপ্রাহরিক ভোজের আয়োজন করিয়াছেন। রাষ্ট্রীয় ভবনের ডাইনিং প্লেসে বিরাট ও সুদৃশ্য খাবার টেবিলে কাচের বাটি হইতে চিকেন রেজালা তুলিয়া দাঁতে কাটিতে-কাটিতে জয়পাল ফিজোকে বলিলেন,
দেখুন, ভারতকে আরও টুকরো টুকরো ক’রে নতুন পাকিস্তান বানানোয় আমাদের সম্মতি নেই। আপনি বরং স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের দাবি না ক’রে উত্তর-পূর্বে একটা উপজাতীয় রাজ্য গঠনের জন্য সংগ্রাম করুন। যেমন আমি করছি ঝাড়খণ্ড নিয়ে।
উত্তরে কবি তাঁহাকে জানাইলেন, 
আপনারা ইতিহাস আর ভূগোলে বড্ড কাঁচা। আপনাদের অবস্থান থেকে আমরা আপনাদের নর্থ-ইস্ট। আমি এখানে একটু সংশোধন ক’রে দিচ্ছি, আমরা আপনাদের ভারত রাষ্ট্রের নর্থ-ইস্টে অবস্থিত ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দুই, আমরা কোনও উপজাতি নই। একটা স্বতন্ত্র জাতি। আমাদের ভাষা কোনও উপভাষা নয়। আমাদের সংস্কৃতি কোনও উপ-সংস্কৃতি নয়। আপনি বোধহয় জানেন না যে, আমরাই, নাগারাই সবচেয়ে বেশি স্বশাসিত। আপনার এইসব না-জানাগুলো দোষের নয়। আপনারা নিজেদের দেশে জাতীয় আন্দোলন করেছেন। ইংরেজদের সাথে চিঠিপত্র লেখায় আপনারা অনেকদিন ছিলেন ব্যস্ত। জানার সময় পাননি। আমাদের দেশে সত্যাগ্রহ করতে তো যাননি আপনারা। কোনও আইন অমান্য করতেও যাননি। কোনও গান্ধী টুপি পরা কংগ্রেস নেতা কখনও এইসব পাহাড়ে আসেননি। আজকে আপনারা নিজেদের দেশে ক্ষমতায় এসেছেন এবং আমাদেরকে ভারতের সাথে জুড়ে দিতে চাইছেন। বেশ তো, তবে একটা ইন্টারভিউ হয়ে যাক। আপনাকে একটা প্রশ্ন করি, বলুন তো, এই যে আমাদের এখানে আমরা নাগা, মিজো, খাসি, জয়ন্তীয়ারা একসাথে থাকি, আমাদের নামে এই নাগা-মিজো-খাসি-জয়ন্তী পাহাড়গুলোর নাম হয়েছে নাকি এই পাহাড়গুলোর নামেই আমাদের নাম? আপনি ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়েছেন মিস্টার ইন্ডিয়া। বলুন? কী যোগ্যতা আছে আপনার যে আমরা আমাদের নেশন আপনাদের হাতে তুলে দেব? আমাদের মধ্যে জাতিভেদ নেই, আপনাদের আছে। আমাদের মধ্যে লিঙ্গবৈষম্য খুবই কম, আপনারা প্রগতিশীলেরা এখনও এর থেকে বেরুতে পারেননি। ভারতের মানচিত্রের সাথে আমাদের কোনও টান নেই। আপনাদের টানটা কী বলুন তো? ভারতের অন্যান্য জায়গার লোকেদের থেকে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক আমরা। আপনাদের সভ্য মানুষদের মতো শেয়ার মার্কেটে ব’সে চেঁচামেচি করি না। 
ভোজসভা শেষে ফিজো যখন বাহির হইয়া আসিতেছেন তখন দোর্দণ্ড্যপ্রতাপ পরাক্রমশীল রাজার কোনও দূত যেরূপে তুচ্ছ বিদ্রোহীর সম্মুখীন হয় সেইরূপে জয়পাল ফিজোর সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইলেন। এই শীতেও জয়পালের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ফিজো জয়পালের সেই ঘামগুলির দিকে তাকাইয়া বলিলেন,
আপনি হয়ত জানেন সাতচল্লিশ সালে আমি এসেছিলাম এখানে গান্ধীর সাথে দেখা করতে। উনি ঠিক কী বলেছিলেন আমায়, আপনার জানা উচিত। উনি বলেছিলেন, আমরা চাইলেই স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারি। কেউ আমাদের ভারতে যোগ দিতে বাধ্য করতে পারে না। দিল্লি যদি সৈন্য পাঠায় তাহলে তিনি নিজে নাগা পাহাড়ে এসে আমাদের সঙ্গে লড়বেন। গান্ধী এও বলেছিলেন, উনি দিল্লিকে বলবেন, একজন নাগাকেও গুলি করবার আগে তারা যেন গান্ধীকে গুলি করে।      
গাড়িতে উঠিয়া আবার নামিয়া আসিলেন ফিজো। পাদানিতে ডান পা রাখিয়া জয়পালকে হাতের ইশারায় ডাকিলেন। জয়পাল নিকটে আসিলে ফিজো বলিলেন,
আমি ফিরে গিয়ে আপনাকে ইন্টারভিউয়ের রেজাল্ট পাঠিয়ে দেব।

শুধু হাড় আর হাড়—অক্টোবর, ’৫২
ফিজো অরণ্যাবৃত পর্বতে ফিরিয়া গেলেন। নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিল খোনোমা গ্রামের আংগামি নাগাদের লইয়া গ্রামে গ্রামে গড়িয়া তুলিল গৃহরক্ষী দল। ঊনিশ শতকের শেষার্ধে এই গ্রামের লোকেরাই রহস্যময় কুয়াশার ভিতর জাগিয়া উঠা পাহাড়ের চুড়ায় শ্বেত সমুদ্রের দ্বীপে আর অরণ্যাবৃত পর্বতমালায় আংগামি রিশাং সাখরির নেতৃত্বে রুখিয়াছিল হানাদার ব্রিটিশ সৈন্যকে। এইবারে আরও একটা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইল এই গ্রাম। ঊনিশ শতকের সেই বিপ্লবীদের সন্তান-সন্ততিরাই রাত্রি জাগিয়া পোস্টার লিখিল। ‘স্বাধীনতা চাই এখন, স্বাধীনতা চাই অনন্তকাল’। ‘এটাই আমাদের প্রাণের কথা, এটাই হবে আমাদের মরণকালেরও কথা’। অসমের রাজ্যপাল আকবর হায়দারির সচিব নাগা নেশন পত্রিকায় আন্দোলনকে ব্যঙ্গ করিয়া লিখিলেন এক কুকুরের গল্প। যাহার মুখে ছিল এক টুকরা হাড়। ফিজো বলিলেন, শুধু হাড় আর হাড়। ওর কি ধারণা আমরা কুকুর? অক্টোবরে দিল্লিকে ফিজো পাঠাইলেন তাঁহার চরমপত্র। তাহাতে লিখিলেন,
এমন একটা জিনিসও নেই যাতে ভারতীয় আর নাগাদের মধ্যে মিল আছে। ভারতীয়দের দেখা মাত্র আমাদের মনে এক অন্ধকার বিষণ্ণতার বোধ জেগে ওঠে।  

পাপা, ওরা চলে যাচ্ছে—এপ্রিল, ’৫৩
       কোহিমায় নেহরুর সভা। সঙ্গে বর্মার প্রধানমন্ত্রী উ নু। নেহরু পরিয়া আছেন তাঁহার বিখ্যাত জহর কোট। কন্যা ইন্দিরাও তাঁহার পাশে। মঞ্চে নেহরু প্রবেশমাত্র নাগা শ্রোতারা সভা ত্যাগ করিয়া উঠিয়া গেলেন। যাইবার সময় স্বীয় অন্তর্বাস নামাইয়া পশ্চাদ্দেশ অনাবৃত করিয়া দেখাইতে ভুলিলেন না। মঞ্চে তখন মাইক্রোফোন বসিয়া গিয়াছে। তাহাতে কানেকশানও আনিয়া দিয়াছেন সাউন্ড মেকানিক। ইন্দিরা তাঁহার পিতাকে বলিলেন, পাপা, ওরা চলে যাচ্ছে। পরিষ্কার শুনা গেল সেই কথা।  

জ্বলছে প্রাণে অনেক জ্বালার চকমকি আজ
       অসম রাইফেলসের এক বিরাট ডিভিসন তো ছিলই, এইবার আরও এক রেজিমেন্ট গোলন্দাজ, সতেরো ব্যাটেলিয়ন ইনফ্যান্ট্রি আর অসম রাইফেলসের পঞ্চাশটি প্ল্যাটুন হড়হড় করিয়া ঢুকিয়া পড়িল নেফায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত বিপুল অস্ত্র লইয়া ফিজোও সাজাইলেন তাঁহার প্রতিরোধ বাহিনী। তাহার সেনাধ্যক্ষ হইলেন জেনারেল কাইটো। তাঁহার অধীনে চারিজন সেনাপতি। যাঁহাদের সৈন্যদলে রহিল ব্যাটেলিয়ন আর কোম্পানি। জাপানি আর ব্রিটিশ রাইফেল, স্টেন গান, মেশিন গান, হাতে নির্মিত গাদা-বন্দুক আর প্রত্যক্ষ সংগ্রামের জন্য দাও লইয়া প্রায় পনেরো হাজার গেরিলা সৈন্য তুয়েনসাং-এর জঙ্গলে দাঁড়াইয়া রহিল ভারতীয় সৈন্যকে মোকাবিলার জন্য। ইহা এমন এক দেশ যেস্থলে ভালোমতো ঘাঁটি গাড়িয়া থাকা একটা ছোট প্ল্যাটুন একটা ডিভিসনকে, একটা কোম্পানি একটা আস্ত আর্মি কোরকে রুখিতে পারে। একবার তাহাদের বাপ-ঠাকুর্দা এই জঙ্গলেই ব্রিটিশকে রুখিয়াছে। এইবার তাহাদের পালা। পায়ের নীচে যে পিষ্ট হয়, সরকারি বুটের চাপকে তাহার অধিক কে চিনিতে পারে? ব্রিটিশ চলিয়া গিয়াছে। তাহার বুট পরিয়াছে ভারত। রাজা যায় রাজা আসে। রং বদলায় বুট বদলায় না। বুটের নীচে প্রকৃত পেরেক হইয়া জন্ম নিল কয়েক সহস্র তরুণ আংগামি। ওদিকে মহান ভারতীয় সেনাবাহিনী তাহাদের নৃশংসতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইল। নিরস্ত্র নাগাদের মারিয়া তাহাদের উলঙ্গ মৃতদেহ টাঙানো হইল গাছে। ফিজো তাঁহার সেনাবাহিনীর সহিত এইবার গড়িলেন অনিয়মিত সেনাদল। গ্রামে গ্রামে প্রস্তুত হইল ছোট ছোট স্বেচ্ছাসেবী দল, বার্তাবহ দল, নারী স্বেচ্ছাসঙ্ঘ। গঠিত হইল নাগাল্যান্ডের ফেডেরাল সরকার। অঙ্কিত হইল স্বাধীন নাগাল্যান্ডের জাতীয় পতাকা। তবে, আরও একটি কাজ বাকি ছিল ফিজোর। ভারতকে তাহার ইন্টারভিউয়ের ফলাফল জানানো। নয়া দিল্লি ইহার সাত দিন পর একটি খাম পাইল। খাম খুলিয়া দ্যাখে তাহাতে একটি শাদা কাগজ। কাগজে লিখা, ‘ডিসকোয়ালিফায়েড’। নিম্নে আংগামি জাপু ফিজোর সহি।
চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়
বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন শান্তির সহায়ক শক্তি। শ্বেত কপোত উড়িতেছে তাহার দু’ডানা মেলিয়া। বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন নির্জোট শক্তির পক্ষে। বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন বাঁকে করিয়া গান্ধীর শান্তির ললিত বাণী লইয়া যায়। বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বশান্তির পক্ষে। বহির্দুনিয়ায় ভারতের তখন বহুত্ববাদের কথা। বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন সোশ্যালিস্টিক প্যাটার্ন অব ভিউ।
বহিরাগত এবং সাংবাদিক প্রবেশ রুদ্ধ করিয়া এহেন বহির্দুনিয়ার সম্পূর্ণ অগোচরেই ভারতীয় সেনাবাহিনী তখন তাহার বন্দুকের নল হইতে উৎসারিত ক্ষমতা লইয়া নেফায় ঢুকিয়াছে এবং তাহার ‘ক্লিন অ্যান্ড সাকসেস্‌ফুল’ অপারেশন সম্পন্ন করিতেছে।
ইহারও কয়েক যুগ পর সারা দেশ মাতাইয়া দিবে একটি গান। সঙ্গে তাহার পাগল করা বাজনা আর মদালসা কন্ঠ। চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায় চোলি কে পিছে। প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা।

ফিজো কোথায় গেলেন!
       ’৫৬ হইতেই ফিজো নিখোঁজ। যুদ্ধ চলিতেছে। ফিজোর নেতৃত্বেই চলিতেছে। কিন্তু ফিজো নাই। ওই কুয়াশা আর জঙ্গল ছাকনি দিয়া ছাকিয়াও ফিজো নাই। গ্রাম জ্বলিতেছে। গির্জা জ্বলিতেছে। আসল লোকটার দেখা নাই। ’৫৬-তেই ফিজো বর্ডার পার হইয়া বর্মায়। সেখান হইতে পূর্ব পাকিস্তান। সেখান হইতেই আন্দোলন পরিচালনা। কিন্তু এইবারে সময় হইয়াছে ‘ভারত’ নামের এই তথাকথিত শান্তির দূতের ঘুঙ্ঘট উত্তোলনের। জলের তলায় ডুবিয়া থাকা প্রাণী যেভাবে হঠাৎ ভুস্‌ করিয়া উঠিয়া আসে, ’৫৯ সালে ফিজো আচমকাই উঠিয়া আসিলেন লন্ডনে। পুরাটাই ডুবসাঁতারে আসা। পূর্ব পাকিস্তান হইতে এল-সালভাদোরের একটি জাল পাসপোর্ট জোগাড় করিলেন। সোজা সুইটজারল্যান্ড। যোগাযোগ হইল দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য আন্দোলনের কর্মী মাইকেল স্কটের সহিত। তাঁহারই সাহায্যে ইংলন্ডে আসিলেন ফিজো। একের-পর-এক সাংবাদিক সম্মেলনে গণপ্রজাতান্ত্রিক ভারত রাষ্ট্রের সামূহিক ঘোমটা উন্মোচিত হইল। বিলাতের সংবাদপত্র ভরিয়া গেল ভারত সরকার ও সেনাবাহিনীর ধর্মে ও কর্মে মহান এই দুর্ধর্ষ কীর্তিতে। দিকে দিকে রব উঠিল ‘এন্‌কোর এন্‌কোর’।
       দিকে দিকে ভারতও অন করিল তাহার মিডিয়া মেশিন। আচমকা মৎস বাহির হইয়া আসিলে কিছু ত্রাহিমধুসূদন শাক তো দরকার হইবেই। দিবালোকে অকস্মাৎ উন্মুক্ত লজ্জাস্থান আচ্ছাদনে তৎপর হইয়া অতঃপর তাই ভারতীয় সরকারি মিডিয়া অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনে জানাইলেন যে, ফিজো ম্যাট্রিক ফেল। তিনি প্রথম জীবনে মোটর-পার্টসের ব্যবসায় ব্যর্থ হইয়াছেন। অতঃপর বীমা কোম্পানির দালালি করিতে গিয়াও সফল হন নাই। পক্ষাঘাতে তাঁহার মুখও বিকৃত হইয়াছে। অতএব ইত্যাদি এবং এমতসব ব্যর্থতা ও বিফলতার ভগ্নমনোরথের ভগ্ন চক্র দ্বারা তাঁহার মানসিক গঠন নির্ধারিত হইয়াছে।

শীত, ’৫৯
এই শীতেই বোধহয় মরিয়া যাইবে রিশাং। জ্বরে আর হাঁপানিতে কাহিল। চোখে দেখে না। কানে শোনে না। তবু রেডিওটা কানে গুঁজিয়া আছে। বয়স ৯৯। আর কিছুই মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে, সেই যেন কত শ’ বছর আগে, যেন এই জন্মেরও আগে, তুয়েনসাং-এর ঘন জঙ্গলে অস্ত্র মাটিতে রাখিয়া তাঁহার সামনে হাত তুলিয়া দাঁড়াইয়া আছে ব্রিটিশ রেজিমেন্ট। প্রস্রাবে মাখামাখি হইয়া, প্রস্রাবের এই ঝাঁঝাল ও উগ্র গন্ধকেও তাঁহার মনে হয় জঙ্গলের পাতা আর কুয়াশার গন্ধ। হাতের রেডিওটিকে মনে হয় গ্রেনেড। বয়স ৯৯। চোখে দেখে না। কানে শোনে না। আর কিছুই মনে পড়ে না।    

পুরু ও আলেকজান্ডার
       এ গল্প ইতিহাসের গল্প নয়। গল্পেরও একটা ইতিহাস থাকে, যদি সেই ইতিহাসের দিকে তাকাই তবে হয়ত দেখিব, আজ যাহা ইতিহাস একদিন তাহা অভীষ্ট ও কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ ছিল না। যেহেতু ইহা গল্প, তাই কল্পনায় কিছু গোরুও থাকিবে। উহাদিগের মধ্যে কিছু গোরু যেমন গোমাতা হইবেন, কিছু গোমাতা বৃক্ষারোহণও করিবেন। কিছু গোরু দুর্ভিক্ষে খরায় মাঠে-ঘাটে জলহীন ডোবায় মরিয়া পড়িয়া থাকিবে। সেই গোরুগুলা অবশ্য গোমাতা হইবে না। আমরা বরং গাছে উঠা গোরুটার সহিত একটু কথা বলি। দেখি সে কী বলিতেছে। 
      
আমিঃ ও গোরু, তুমি গাছে উঠিয়াছ কেন!
গল্পের গোরুঃ আমাকে তো তুমিই তুলিয়াছ গাছে। এখন নামিব কী প্রকারে বলো
আমিঃ নামিবে পরে। এইবেলা নামিলে আবার ঘাস চিবাইতে শুরু করিবা। আমার কথা শুনিবা না
গ.গোঃ কী শুনিতে চাও বলো
আমিঃ যাহা জানো তাহাই বলো
গ.গোঃ আমি অনেক কিছুই জানি। তুমি কোনটা শুনিতে চাও সেইটা বলো
আমিঃ এই গল্পের শেষে কী হইল? 
গ.গোঃ কী আবার হইবে। তুমি মনে করো একটা বাটী পাইলে। বাটীতে দশটা ঘর। দশটা ঘরে দশ জনা লোক। তাহার মধ্যে একটা ঘরে তুমি কোনও কালেও যাও নাই। সেই ঘরের লোকটাকেও তুমি চেনো না। একদিন যখন তুমি গোটা বাটী নিজের নামে করিতে গেলে, তখন সেই একটা ঘরের লোক বলিল আমি তো তোমাকে চিনি না। তুমিও আমাকে চেনো না। তুমি কখনও আমার সহিত আসিয়া গল্প করো নাই। তুমি খালি বাকি ন’জনের ঘরেই গিয়াছ, চা পান করিয়াছ, পান খাইয়াছ। পান খাইয়া ঠোঁট আরক্ত করিয়া ফস্‌ করিয়া দিয়াশলাই দিয়া সিগ্রেট জ্বালাইয়াছ। সিগ্রেট জ্বালাইয়া ঊর্ধ্বপানে ধুম্র ত্যাগ করিয়াছ। এখন আমার ঘর আমাকে আলাদা করিয়া দাও। আমি তোমার বাটী হইয়া থাকিব না। এই তো গল্প।
আমিঃ তুমি ফিজোর কথা বলো
গ.গোঃ ফিজো একটা চিঠি লিখিয়াছিল, তাহা জানো?
আমিঃ চিঠি? কাহাকে লিখিয়াছিল?
গ.গোঃ কাহাকেও না
আমিঃ কাহাকেও না মানে?
গ.গোঃ আরে, ফিজো একজনকে চিঠি লিখিয়াছিল, তাহার নাম কাহাকেও না
আমিঃ কী লিখিয়াছিল তাহাতে?
গ.গোঃ সে জানিতো আলাদা বাটী তাহার হইবে না
আমিঃ  হইবে না কী প্রকারে? 
গ.গোঃ কী করিয়া হইবে বলো, তাহার ঘরের একদিকে চীন, একদিকে বর্মা, আরেকদিকে পূর্ব পাকিস্তান। এই প্রকার স্থানে আলাদা বাটী হয়? হইলেও কে দিবে?
আমিঃ তাহা হইলে এত হাঙ্গাম সে করিল কেন?
গ.গোঃ দ্যাখো, আমি তো গোরু। যদি দেশের সব ঘাস ফুরাইয়াও যায়, আমাকে যদি মানিয়া লইতেই হয় যে আমাকে এখন হইতে পোকামাকড় আর হাঁস-মুরগি ধরিয়া খাইতে হইবে, তথাপি কি আমি ঘাস খাইবার কথা ভুলিতে পারিব, বলো? যুদ্ধে পরাজয় বরণ করা যাইতে পারে, কিন্তু জীবনে কি পরাজয় বরণ করা যায়?  

’৬৩-র পয়লা ডিসেম্বর নাগাল্যান্ড রাজ্য গঠিত হইল। ’৬৪ সালে নাগাল্যান্ডের ব্যাপটিস্ট চার্চ গঠন করিল পীস মিশন। সেপ্টেম্বরে নাগাল্যান্ডের রাজ্যসরকার আর ফেডারাল রিপাবলিক অব নাগাল্যান্ডের মধ্যে যুদ্ধবিরতির চুক্তি হইল। ওই মাসেই নাগা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সহিত আলোচনায় বসিল ভারত সরকার। এই আলোচনায় মুখামুখি হইলেন নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিলের নেতা আইজ্যাক স্যু এবং ভারতের বিদেশ সচিব ওয়াই. ডি. গুণ্ডেভিয়া। আলোচনার শুরুতেই আইজ্যাক বলিলেন,
আজ আমরা এখানে দুই নেশন হিসেবে পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছি—নাগারা আর ভারতীয়রা।   

…………………………………………………......
[‘নাগা ক্রনিকল্‌’; ‘নাগাল্যান্ড : দ্য নাইট অব দ্য গেরিলাজ’; ফিজোর লেখা ‘এ ফেট অব দ্য নাগা পিওপল্‌ : অ্যান অ্যাপীল টু দ্য ওয়ার্ল্ড’ প্রভৃতি বই এবং বিশেষ ক’রে ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ’র ‘ইন্ডিয়া আফটার গান্ধী : দ্য হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ডস্‌ লার্জেস্ট ডেমোক্র্যাসি’—এই বইগুলো থেকে দু’হাত ভ’রে তথ্য, নথি, রেফারেন্স ব্যবহার করেছি। ব্যবহার করেছি সুমনের দু’টি গানের লাইন। একটি বহুল প্রচারিত হিন্দি গানের কলিও। এ লেখাকে ফিকশন না ব’লে ফিল্মের ভাষায় ডকুমেন্টারি বলা যায়।—লেখক]

২৩ জুন, ২০১৬



অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

Arjun Bandyopadhyay

Tuesday, June 6, 2017

রোহিণীর সাথে, এই ত্রিশ বত্রিশ বছরে... : দীপ শেখর

রোহিণীর সাথে, এই ত্রিশ বত্রিশ বছরে... 





কাল রাতে লম্পট বৃষ্টিটা পড়লে বুঝলাম
প্রেমের দালালটা আবার ধরবে ধরবে করছে, টাকা চাইবে
চাঁদের জ্বর প্রায় একশো এক, জ্যোৎস্নার ঘরে বাবু নেই
আমি কাল রাতের ঐ নীল শাড়ি পড়া মেয়েটির কাছে আশ্রয় চাইবো, ডাকবো রোহিণী, বেঁচে যাবো।


ভালোবাসা নয়, ভালোবাসার আত্মারাই সবথেকে সহজে ভালোবাসে
এসব বুঝে আমি প্রেমিকের আত্মাটা নিয়ে খানিক নাড়াচাড়া করেছি কাল দুপুরে
আমার পুরনো জীবনকে এখন ট্রাঙ্ক থেকে বার করে নিয়ে আসতে হবে
হৃদয়কে বৃষ্টি ভেজানোর কোনও উপায় জানা আছে কি এ দেশের আইন-ব্যবস্থার?

Saturday, April 15, 2017

দ্রিম দ্রিম ৪ | ম্যাগনোলিয়া, রেড ওয়াইন অ্যান্ড চীজ : দোয়েলপাখি দাশগুপ্ত

দ্রিম দ্রিম ৪ ম্যাগনোলিয়া, রেড ওয়াইন অ্যান্ড চীজ
আস্তাবলের দিকটা না। ম্যাগনোলিয়া ছিল এদিকটায়। গ্লেনারিজ, কেভেন্টারস ছাড়িয়ে আরও একটু এগিয়ে বাঁ দিকে। জামাকাপড়... ডেনিম জ্যাকেট, জেগিংস-এর দোকান... সেগুলো পেরিয়ে কুংগা যাওয়ার রাস্তাটায়। সাদা সবুজ লাল মেশানো কাঠের বাড়ি। ছবির বইয়ের মতো জানালা। আইভিলতাও ঝোলে বোধ হয়। আমি আইভি দেখিনি যদিও কখনও। নীচে ডানদিকে বাজারে নেমে যাওয়ার সিঁড়ি। হিল কার্ট রোডের দিকে। আমি ঠেলেঠুলে একটা সরু গলির মধ্যে দিয়ে উঠতে থাকি। ম্যাগনোলিয়া একবার দেখে আসা দরকার। সরু গলি। কিন্তু অন্ধকার নয়। ওপর দিকের বাড়িগুলোর টিনের চাল আর কার্নিসের ফাঁকফোকর দিয়ে আলো আসছে অনেক। দুপাশে লোক দাঁড়িয়ে। কেউ বিরক্ত করছে না। যে যার মতো ব্যস্ত। সিগারেট খাচ্ছে। গল্প করছে। ওয়াই ওয়াই খাচ্ছে। পাশ দিয়ে সরিয়ে সরিয়ে এগোতে হচ্ছে। ম্যাগনোলিয়ার সামনে এসে পড়লাম।
এটা তো বেশ বড় একটা হামাম! হোটেল ভেবে এদিকে বুক করে ফেলল মৈত্রেয়। ওই তো... জাপানি বাড়ির মতো, চাল দিয়ে ধোঁয়া বেরোচ্ছে অল্প। ‘স্পিরিটেড অ্যাওয়ে’-র বাড়িটার মতো। আমি ভেতরে ঢুকি। ঘন বোতল সবুজ অন্ধকার। তার মাঝখান থেকে চাপা রক্তের মতো লাল রঙের দেওয়াল দেখা যাচ্ছে। বাষ্পে আধো-অদেখা হয়ে আছে গোটাটা। কাচের দরজা খুলে ঢুকতে ঢুকতে টের পাই আমার হাইট কমে গেছে।আমি একটা উঁচু-হিল জুতো পরে। আমার গায়ে একটাসাদা শার্ট আর গ্রে রঙের পেন্সিল স্কার্ট

Friday, March 24, 2017

চারটি লেখা নিয়ে এলেন : সীমিতা মুখোপাধ্যায়

আমার প্রথম কবিতার বই

আমার প্রথম কবিতার বইটি হয়ত এখনও
তোমার ঘরে

চুপচাপ লক্ষ্য রাখছে তোমার পালতোলা যাপনচিত্রে,
মিলিয়ে নিচ্ছে সরলের বেজন্মা নিয়ম-কানুন,
তোমার সময়নদী বয়ে যাচ্ছে অন্যখাতে...

তুমি খেয়াল করছো না

আমার বইটি, একদিন দেখো, ধুলো ঝেড়ে উঠে পড়বে ঠিক;
ভোরবেলা তোমায় ঘুম থেকে তুলে বলবে - চলি!

আমি ওর কাছ থেকে শুনে নেবো তোমার 
গুহাজীবনের আদিম রহস্য,
তারপর ইতিহাসের পাতা থেকে ছিঁড়ে নেবো
পৌরাণিক কিছু প্রতিশোধ -

কিছু খুদকুঁড়ো ভালোবাসার লোভ,
আদরের মতো মিষ্টি কিছু শব্দবন্ধ...

বন্ধু, ভালো থেকো!



একটি অস্থির বিড়াল

ওইযে বেড়াল,
সারাদিন এবাড়ি, ওবাড়ি, সেবাড়ি;
তোমরা দেখছো -
মাছের কাঁটা, খাম - খেয়াল, নি:শব্দ চলাফেরা...

আসলে বিড়ালটির তিনদিকে তিনটি ভূখন্ড
আরসে থাকে মধ্যবর্তী কোনও এক না-মানুষের রাজ্যে,
যে কোনও সীমান্তে তার প্রবেশ অবাধ!

অথচ, একটা রিফিউজি বেড়াল ষোলো আনা জানে,
'
বিতাড়িত' শব্দের আসল মানে...



Thursday, March 9, 2017

ঈশ্বরের জননতন্ত্রী, বিদেশি শব্দ এবং একটা রক্তখেকো ন্যাপলা : ডাকনামে সমুদ্র

ঈশ্বরের জননতন্ত্রী, বিদেশি শব্দ এবং একটা রক্তখেকো ন্যাপলা

১।
এই বিশ্বাস হয় -
ঈশ্বর আছেন কণায় কণায়
আমাদের ক্লাস সিক্সের ব্যাকরণ বই
সমস্ত সিগারেট কাউন্টার
ভুখা পেট
অফ্রিকা
জলবায়ু
নিভন্ত উনুন
তীব্র বর্ণবিদ্বেষ
অমৃতা গগণের টোলে
ভেনিসের জল। ইরাকের যুদ্ধ। সংবিধান। ছাপাখানা। জিরো জিরো সেভেন। ভ্লাদিমি পুতিন। হীনস্কন্ধ সময়।
এমনকি টুম্পা চাকির প্রথম খাওয়া ধর্ষণেও



২।
“shouting ‘oh god!' at bed isn't equivalent to a prayer"

ক. হরেকৃষ্ণ বলতো একটি উত্তর কোলকাতার টিঁয়া

খ. তিনি ছেলের নাম রেখেছিলেন শ্যাম। শ্যাম চোদ্দবছর বয়সে বাথরুমের ফুটো দিয়ে ভিজে মাকে দেখে হাত মেরেছিলো।

গ. প্রত্যুষা ঋতুমতী হয়েও ঠাকুর ছুঁয়ে ফেলেছে

ঈশ্বর আমার বিশ্বাস পুড়ছে
ওদিকে দৃশ্য তখনও কালো। পর্দা ওঠে নি। আমরা হাত চালান করে দিয়েছি পবিত্র বুকে বুকে। ঘেঁটেছি।


Thursday, February 16, 2017

ঋপন ফিও একটা গল্প ভেবেছে

ঋপন ফিও একটা গল্প ভেবেছে

তো এক দেশের মানুষ ভাত খেতে ভালবাসত আকাল পড়ার আগে। আকাল পড়ায় অগত্যা বাধ্য হয়ে মকাই। প্রথম প্রথম গলা দিয়ে নামতে না চাইলেও আস্তে আস্তে সয়ে গেল। তারপর এল সেই মোক্ষম দিন। খেতে বসা সন্তানের করুণ মুখের দিকে চেয়ে থাকা এক জর্জরে মা আনমনে বলে উঠল~ বালের ভাত, মকাই ঢের ভাল... আর কি, একজন একজন করে এবার সবাই গুণ গাইতে শুরু করল মকাই এর। ধীরে ধীরে দেশের মানুষ ভুলেই গেল ভাতের স্বাদ। শুধু একজন পারল না কিছুতেই। ডাইনী সন্দেহে তাকে পিটিয়ে মারার আগে অব্দি পাতে মকাই নিয়ে বসে সে শুধু ভাতের কথা ভাবত।
















ঋপন ফিও
Reepan Fio

Sunday, January 15, 2017

একটি জ্বরের সিরিজ : অনন্যা বন্দ্যোপাধ্যায়

জ্বর ১

ভীষণ জ্বরের ভেতর তোমার কথা ভাবতে ভালো লাগে
গায়ে চাকা চাকা দাগ পড়ে আছে
পড়ে আছে উত্তপ্ত নাভি
কমলা ফুলের মত তুমি শুয়ে আছো পাঁজরের তীরে
আমার সমস্ত দেহে জেগে ওঠে এক অলীক আওয়াজ
প্রতিটা পরমাণু প্রাচীন থেকে প্রাচীনতায় মেলে
তারপর যা কিছু স্নেহ, হিসেবের ব্যবধান, তুমি ধার করে নিলে
দিগন্তে পৌঁছে যায় অলীক পাখা
যে ক্ষণিকের পর অবশ হয়ে যায় দেহ
রাত পার করে নাবিকেরা
আমাকে তাদের কথা বলো
এই ফাঁকে আমি আরো তোমায় ভেবেনিই
ভেবেনিই আমাদের আবছায়া কথোপকথন



Wednesday, January 11, 2017

দীপঙ্কর ভাই আমার - শুভঙ্কর দাশ

দীপঙ্কর ভাই আমার

আমি সেলুনে একা একা গোঁফ রং করছি
আর তুই চলে গেলি।
ভাবছি কী করব ওই চুলের সফেদ
উঁকিগুলো নিয়ে?
বোকামিগুলো ঢেকে ফেলে
আরেকবার বইমেলায় বসে থাকব কি?

আর শালা তুই চলে গেলি একা একা?
মানে এবার আর দেখা হবেনা বলছিস?
চুপি চুপি ভদকা মেশানো মিনারেল ওয়াটারের বোতল
আর বেরোবেনা ব্যাগ থেকে?
লিটল ম্যাগাজিনের টেবিলে বসে
গলায় ঢালা যাবেনা খানিকটা আগুন?
আর আমি এখানে লড়ে যাচ্ছি এই বিচ্ছিরি রোগটার সাথে
একা একা রোজ রোজ।

তাই বুঝি খুব ভোরে আজ বার বার
জপের মালা স্লিপ করছিল হাতে,
কান্না পাচ্ছিল হুহু এমনি এমনি।
খুব অস্বস্তিতে কাটছিল সকালটা।
তারপর সেলুনে বসে যখন ভুলে গেছি সব
তখনি ফোনটা এল,
যেভাবে এরকম ফোনগুলো আসে
আপাত নিরীহ বেচারা টাইপের।
আর আমি সেলুনের লোকটাকে
মাঝ পথে থামিয়ে ফুটপাতে নেমে এলাম।

বাইরে চা দোকানে রোজকার মতো আড্ডা মারছে লোকজন
আর একটা পাগল ফাঁকা বোতল কুড়োচ্ছে রাস্তায়।















শুভঙ্কর দাশ

Subhankar Das

Sunday, December 4, 2016

বাংলা কবিতার প্রসঙ্গে, দলীয় আদর্শ আর একটি বিনীত প্রশ্ন : চান্দ্রেয়ী দে

বাংলা কবিতার প্রসঙ্গে, দলীয় আদর্শ আর একটি বিনীত প্রশ্ন

আজ। অর্থাৎ কাল বা পরশু নয়। একমাস আগের বা একমাস পরের কোনো দিন নয়। এই আজ সময়টা আজকের সময়েই একমাত্র অস্তিত্ববান। কিন্তু, আজ-এর মধ্যে আছে গতকালের ছায়া-র শীতলতা, গতকালের রোদের তাপ, আর আছে আগামীকালের আলোছায়া কে অনুভবের রসদ। আজ এর মধ্যেই আছে গতকাল নেওয়া শপথ, আছে আগামীকালের রুটম্যাপ - পথ চলার দিশা, পাথেয়। তাই আজ, বস্তুত কাল বা পরশু থেকে আমূল বিচ্ছিন্ন, আপাদমাথা যোগাযোগহীন নয়।

দল। ‘দ’ আর ‘ল’-এর একটিমাত্র বিশেষ বিন্যাসেই ‘দল’ শব্দটি তৈরি হয়। একটিমাত্র বিশেষ বিন্যাসেই তৈরি হয় এর ভাবটিও। সময় ও পরিপার্শ্ব অনুযায়ী তার ভাবনা ও তার প্রকাশ বদলে যেতে পারে। কিন্তু শপথ আর পাথেয় আমূল পরিবর্তনশীল হতে পারেনা। পারে, যদি সেই দল, দলের ব্যক্তিবর্গ, সময়ের দাবী মেনে নিয়ে, প্রয়োজনীয়ের অভাব বোধ ক’রে অন্য কোনো বিন্যাসে বিন্যস্ত হয়ে ওঠে, হয়ে ওঠে অন্য কোনো দল। দল যদি আধার হয়, তার আধেয় এক বা একাধিক ব্যক্তি। এখন, স্থান, কাল অনুযায়ী পাত্র তার অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে, এমনকি আমূল পরিবর্তনও এক্ষেত্রে সম্ভব। কিন্তু, কোনো দলের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যক্তির ব্যক্তিগত অবস্থানের চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ তাদের পারস্পরিক অবস্থান। কোনো দলের সদস্য-ব্যক্তিবর্গের পারস্পরিক অবস্থান সম্পূর্ণ পরিবর্তিত হয়ে গেলে, সেই দলেরও সম্পূর্ণ পরিবর্তন অর্থাৎ অন্য কোনো দল হয়ে ওঠা স্বসিদ্ধ।

নাম। একটি বিশেষ স্থানিক-কালিক-সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে কোনো নাম, যেকোনো নাম কোনো বস্তুর সনাক্তকরণে ব্যবহৃত হয়, যদিও নামের গঠনের সঙ্গে বস্তুর অস্তিত্বের যোগাযোগ সম্পূর্ণ কাল্পনিক। সনাক্তকরণের, পারস্পরিক সংযোগের (কমিউনিকেশনের) প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করে নিলে, কোনো একটি নামের মাধ্যমে কোনো বিশেষ বস্তু তথা কোনো বিশেষ ধর্ম এবং বৈশিষ্ট্য প্রকাশিত হয়। এখন, ‘দল’ এর প্রসঙ্গে, কোনো দল এর নামের সঙ্গেই যুক্ত হয়ে যায় দলটির অস্তিত্ব অর্থাৎ তার দলীয় আদর্শ এবং সেই অনুযায়ী সম্ভাব্য কর্মপদ্ধতি। সেই কারণেই দলীয় অবস্থানের পরিবর্তনের সঙ্গে যেমন জড়িয়ে থাকে দলের পরিবর্তন, তেমনই তার সঙ্গে সঙ্গে নামেরও পরিবর্তন। দলভাবনা এমনকি দলভাবনার সার্বিক যৌথতা পরিবর্তিত হয়ে গেলে স্বতঃসিদ্ধভাবেই তার সনাক্তকরণ বৈশিষ্ট্য যায় বদলে, আর তা স্বীকৃতি পায় নাম-এর বদলের মধ্য দিয়ে। কেউ কেউ মনে করতে পারেন পরিবর্তনশীলতাই যেহেতু প্রকৃতি-র নিয়ম, তাই পরিবর্তনশীলতা স্বয়ং কোনো দলের দলীয় আদর্শ হতে পারে। অমোঘ পরিবর্তনশীলতার সামনে বদলে যেতে পারে স্থান-কাল, বদলে যেতে পারে ব্যক্তিক পরিস্থিতি, এমনকি বদলাতে পারে যৌথ অবস্থান। কিন্তু এই সার্বিক পরিবর্তনের জলপ্রপাত নাম-কেও ধুয়ে নিয়ে যাবে না কি? যদি পরিবর্তনশীলতাই ধারণ করতে হয়, নামবাচক ক্ষেত্রটিই বা ব্রাত্য থেকে যাবে কেন? তা কি কোনো ‘লিগ্যাসি’-র তাগিদে? কোনো ‘নস্টালজিয়া’র তাগিদে? অথবা কোনো ‘ব্রান্ডিং’ এর তাগিদে? কেননা সনাক্তকরণ বৈশিষ্ট্য যদি বদলে যায়, সনাক্তকরণের উপচার ‘নাম’ অপরিবর্তিত থাকবে কি করে? যে অতীত বর্তমানে ‘অতীত’, শুধু নামে তাকে বহন করব কেন? কাল আমি কি ছিলাম তা আজ বহন করবে কে, যদি সার্বিক পরিবর্তনে বদলে যায় এই ‘আমি’টাই? অন্তত অংশত। আমার অংশের বদলও আমাকে আর আমি রাখে না। গঙ্গায় যে তিনডুব দিল, সে তিন জন, একজন নয়। যে গঙ্গায় সে ডুব দিলো, তাও তিনটি গঙ্গা। একটি নয়।

ছড়িয়ে থাকা পরিচ্ছেদগুলোর মালা গাঁথতে গাঁথতে বলি, বাংলা কবিতার প্রথম দশকে দেখছি এক সর্বব্যাপী তাড়াহুড়া- কে কোথায় ছিল, কে কোথায় আছে, কেউ শূণ্য কেউ নব্বই কেউ বা অন্য কোন দশক থেকে – সময়ের পথে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়া আমরা, আমরা যারা যৌথতা নিয়ে রূপকথা বেঁচেছি, যৌথতা নিয়ে স্বপ্ন দেখেছি, জীবন কেটেছি ছিঁড়েছি যৌথতার অভিমানে, তারা, আমরা টুকরো হয়ে যাওয়া সেই যৌথতার দোহাই দিয়ে, সেই যৌথতার কাল্পনিক দায় নিয়ে, সেই যৌথতার নাম ভাঁড়িয়ে প্রকাশ করতে চাইছি ‘অন্য’ এক যৌথতাকে, ‘অন্য’ এক ব্যক্তিক অস্তিত্ব-কে। মরা যৌথতা কে ‘আ’মরা করতে চাইছি। কেন??

বাংলা কবিতার পাঠক, লেখক, বিপ্লবী, আর বাংলা কবিতার আমরা-র পায়ে এই আমার বিনীত প্রশ্ন, এই আমার জিজ্ঞাসু আকুতি...


চান্দ্রেয়ী দে
Chandrayee Dey

Thursday, December 1, 2016

A few moments. Captured. : Rik Rudra Mandal

A few moments. Captured. 

ছবি সাজিয়ে সাজিয়ে গল্প বানাবো, এমন কোনো ভাবনা আমার মাথায় কখনো আসেনা। প্রতি ছবির মধ্যে থেকেই গল্পের খোঁজ করি। প্রত্যেক ছবি একটি অনাবিল গল্পের সন্ধান দেয়। সময়ের ভাবনার উপর দিয়ে যা বয়ে যায়, তাই ছবির আধার হয় ও আকার ধারণ করে। ছবিগুলো বাছাই করার সময়’, গল্পের রৈখিকতা বজায় রেখেছি।
মানব-মানবী সম্পর্কটা, ধ্রুবপদ বেঁধে দেওয়ার মতন। চরিত্রগুলো পাল্টে যায়ে। হয়তো বদলে বদলে যায় ডাকনামগুলো। অথচ উড্ডীন কোনো ড্রোন থেকে দেখলে চরিত্রের ছায়াগুলি চেনা এক বহুভুজ রচনা করে যায়। এই আজানুলম্বিত প্রজেকশনের অপরিবর্তনীয়তা অথবা আমৃত্যু কোনো অবাধ্য তরঙ্গের টানাপোড়েনের ইতিহাস । দেওয়ালের আঁকা, ত্রিপল এ আঁকা, মেঝেতে আঁকা, ছায়া-প্রছায়া, জড়-জীব,সর্বোপরি মানব-মানবী মিলে এই ছবিগুলির শুরু থেকে শেষ রেখেছি। কোনো মিলনান্তক ছায়াবাজি অথবা বিয়োগান্তক সাপসিঁড়ির ভেতর দিয়ে বইতে থাকা একটি আবহমান প্রলম্বিত চেতনার কথা বলতে চেয়েছি।





Tuesday, November 22, 2016

উত্তম থেকে মধ্যম পুরুষ: সুমনের গানে রাজনীতি আর ভালবাসার কামনাপাঠ - অর্ক চট্টোপাধ্যায়

উত্তম থেকে মধ্যম পুরুষ: সুমনের গানে রাজনীতি আর ভালবাসার কামনাপাঠ

সুমন চট্টোপাধ্যায় থেকে কবীর সুমন – সময়ের অনুক্রমে দুদশক পর ওঁকে নিয়ে লিখতে বসে প্রত্যেকবারের মত এবারও বাধ সাধছে দূরত্বহীনতা, বাধ সাধছে আমার বেড়ে ওঠার লতায় পাতায় ওঁর গানের সরব এবং অরব উপস্থিতি। আর যা বাধ সাধছে তা হলো আমার সাঙ্গীতিক প্রশিক্ষণের অভাব। আমি সাহিত্য এবং দর্শনের ছাত্র; তাই এই লেখার শুরুতেই আমার সাঙ্গীতিক অপারগতা স্বীকার করে নিয়ে সুমনের গানের এক বিষয়ভিত্তিক এবং সাহিত্য ও দর্শন লালিত আলোচানা করার চেষ্টা করব। চেষ্টা করব কারণ লিখতে তো হবেই। লেখার যে দায় আছে আমাদের। আমাদের সময়ের অন্ধকারে সুমনের যদি অহর্নিশ গান বানানোর দায় থাকে তবে আমার তথা আমাদের দায় হলো সেই সময়ের শরিক হয়ে সুমনের গানকে প্রতি-প্রতর্কের আলোয় তুলে ধরা। সুমনের গানের অভিসন্ধি এমন এক প্রতর্ক যা তার প্রত্যুত্তরে আরো প্রতর্ক, আরো অভিসন্ধি দাবি করে। এভাবেই তাঁর গান রাজনৈতিক সংলাপ তৈরী করে। সুমন নিজেই লিখেছেন 'দেখাতে পারিনি আমি কোনো উপমায়/ যে আমিকে তুমি তার সময়ে দেখোনি'। সুমনের উত্তরকালে আমরা কি সুমনের সমসময়ের এই আমি'কে তুলে ধরতে পারবো? উত্তরকালের কাছে সমকাল নিজেই অতীত! সে কি বুঝে নিতে পারে আমির জটিল চলন, তার বর্তমান থেকে তার অতীতে যা নির্মাণ করে তার ভবিষ্যৎ। হয়ত তখন আর সমকাল সেখানে এসে একা চ্যাপলিন হয়ে বসবে না, হয়ত তখন আমরা এক অন্য সুমনকে পাবো, এই সুমনকে নয়। সেই কারণেও বর্তমানের এই ঘটমানতার কাছে আমার বা আমাদের দায় থেকে যায়: সুমনকে নিয়ে প্রতর্ক নির্মাণের দায়।

Saturday, November 19, 2016

প্রাণের ইস্কুলে : স্বদেশ মিশ্র

প্রাণের ইস্কুলে

আমার যে স্থিতিসত্ত্বা, ঘন হয়ে আসে
দূরের পরিধি এসে ঘিরে ধরে আমার আমিকে
আমাকে আচ্ছন্ন করে, ধীরে ধীরে সবই স্থিত হয়,
সমস্ত তরঙ্গের আকার এসে নিরাকারে জড়োসড়ো হয়
মাটিতে আকাশ ধরে, খেলা, জল, ঘর, ধুলো বালি
কেমন গোধূম আসে, সহজতা প্রাণের ইস্কুলে, অন্ধকার
ঠিক নেমে আসে, অনেকটা আলোর পরকালে
যাকে বলো কিছু নয়, তাই থাকে সকল আমি তে
হাঁটে চলে ঘোরে ফেরে, হাটে ও বাজারে গিয়ে, কথা বলে

চুপ করে থাকে যারা ডুব দিয়ে থাকে, আমিরও গভীরে গিয়ে
আমি মারে, টুকরো টুকরো করে লাশ টেনে আনে, টেনে এনে
শ্মশানে পোড়ায়,

তোমার ইস্কুলে তুমি চুল কেটে জুতো মোজা পড়ে,
বিচিত্র পোশাক পড়ে গায়ে, যেইভাবে শিখেছিলে তোমার তুমিটা
শিখেছিলে 'সুশীলতা' তন্‌খা কামাতে গেলে লাগে...
তুমি কি বুঝবে এত? আলো জল হাওয়া ধুলো বালি ?


স্বদেশ মিশ্র

Swadesh Misra