Showing posts with label New Age Writer. Show all posts
Showing posts with label New Age Writer. Show all posts

Monday, July 24, 2017

সখী : গুলশনারা খাতুন

সখী

দোতলার ল্যান্ডিং পেরিয়ে আড়াই তলার মুখে ফ্ল্যাটটা। এখানে  বিল্ডিংগুলোর কনস্ট্রাকশন এরকমই। এক চিলতে জমি পেলেই তা দিয়ে জিকজ্যাক করে ফ্ল্যাট তুলে আখাম্বা বাড়ি তুলেছে মালিকরা। ল্যান্ডিং-এর আলোটা মাস পেরলে সারাবে বোধহয়। ব্যাগ হাতড়ে চাবি দিয়ে ফ্ল্যাটটা খুলতেই এক নিশ্বাস অন্ধকার। মোবাইল টর্চে এখন এলইডি আলো। বছর ঘুরলেও এ ঘরের দেওয়ালগুলো চেনা লাগে না দিতির। সেবার বোন এসে ঘরে একগাদা কায়দার আলো রেখে গেছে। সুইচ টিপলে দিত নিলচে দেওয়াল ঘরে লাল-নীল-সবজে আলোর রামধনু এফেক্ট। অবশ্য এই একবুক অন্ধকারটা আজকাল গা সওয়া হয়ে গেছে দিতির। বেশি আলোতে কেমন চোখ ধাধিয়ে যায়। ব্যাগটা মেঝে ফেলে সিগারেট জ্বালতেই সামনের দেওয়াল থেকে মা যেন নাক সিটিয়ে উঠল। সেই বাড়িতে প্রথমবার সিগারেট ধরা পড়তে মায়ের মুখটা যেমন হয়েছিল, আজও সেই এক্সপ্রেশন ইনট্যাক্ট। ভাল আছ তো মা?’ দিতি মনে মনে জিজ্ঞেস করে। মা-ও যেন ছবি থেকেই মুখ ঘুরিয়ে নেয়। গেল বার বোন এসেছিল যখন, তখন বোনের মোবাইলে মায়ের হাসি-হাসি ছবি দেখে দিতির কান্না-কান্না পাচ্ছিল। দিতি আবার দেওয়ালটার দিকে তাকায়। কিরকম ঘর জোড়া সুখে স্মৃতি। দেওয়লা আলমারিটা পাশে একটা বইয়ের তাক। উল্টো দিকে দিতির খাটের পাশে একটা ল্যাপটপ আর টি-টেবল। আর নীলচে দেওয়ালে সুখের ছয়লাপ। বাবা-মায়ের কোলে ছোট্ট দিতি। ঠাম্মু পাশে দিতি আর বোন। দার্জিলিং-এ মায়ের কোলে দিতি। মা আর বাবা আগ্রায়। কেমন যেন সব পাওয়ার জগৎ। দিতি হাসে। মনে মনে ভাবে,

সে তুমি যতই মুখ ঘুরিয়ে নাও মা। এই দেখো কেমন আমি তোমাদের চোখের সামনে।
নাহ। ডাক্তার এবার দেখাতেই হবে। আজকাল বড্ড চোখে জল আসে। দিতি বিশ্বাস করে এটা চোখের সমস্যা।


দিল্লিতে এই এক কারবার। অফিস চার পিস লোক কাজ করলেও দেখানেপনা প্রচুর। এই যেমন কুড়িয়ে জনা ২০ লোক দিতির অফিসে। কিন্তু তাতে দুখানা কেবিন, কিউবিকল, ক্যাণ্টিন, ডিজিটাল লাইব্রেরি মিলে এলাহি ব্যাপারে কমতি নেই। দেবারুনদা আর জয়াদি মিলে একেবারে আগলে রেখেছে। প্রায় তিন পুরুষের দিল্লিবাসি দেবারুণদা নিজের দায়িত্বে বাড়ির দুটো ঘর নিয়ে এই অ্যাড এজেন্সিটা শুরু করেছিল। এখন ক্রিয়েশন’-এর বয়স ৮। শহর ছেড়ে রাজধানী নির্বাসনে এটাই আপাতত দিতির ওয়ান্ডার ল্যান্ড। মালিক আর মালকিনকে বেশ পছন্দ দিতির। স্নেহ-ভালবাসার কমতি নেই। মাইনের দিন এদিক-ওদিক হয় না। দিতির যেবার জ্বর হল, দেবারুণদার বাড়ি থেকে খাবার আসত একা মেয়েটার কথা ভেবে। তবু জয়াদি বা দেবারুণদা বাঙালি গ্যাদ্গেদে আবেগ একেবারেই দেখায়নি। দিতির বাড়ি, একলা থাকার ইতিহাস ঘাটেনি কেউই। তাই উড়ু দিতিও কেমন টিকে গেল। দিতি সিগারেট জ্বালালে সিনিয়র কপি এডিটর পরমিত ম্যাম নাক সিটিয়ে তাকায়। অনেকটা মায়ের মতো। দিতির টিকে যাওয়ার আর একটা কারণ।



নিউজপেপার বা চ্যানেল নিয়ে আপডেট থাকা নিয়ে ছুঁৎমার্গ থাকে না অনেকের। সুপ্রিম কোর্টের সামনে দিয়ে বাড়ি ফেরার সময় কিলবিলে কালো কোর্ট আর কালো মাথা দেখলে দিতি মনে মনে তারিখ পে তারিখআউড়ে নিজে নিজেই হাসে।

এই আর এক হয়েছে ৩৯৯ যেন পচনধরা মর্গের পাশ দিয়ে যাচ্ছে এমন ভাবে নাকে রুমাল চাপা দেয় চিত্রদীপ। অফিস ফিরতি চিত্রর গাড়িতে ড্রপ পেলে ফেরার ভাড়াটা বাঁচে দিতির। যন্তর-মন্তর পেরোতেই দেখে গেল মানুষগুলোকে।

- রং মেখে বেরিয়েছে দেখো। বিশ্বের ছক্কা আর লেবুর দল।

- তোর মুখে রং দিয়েছে?

- হিজড়েগুলোকে দেখলেই গা জ্বলে। ট্রেনে-বাসে ধরে ধরে হ্যারাস করে। আর ভাই লেবু আমি নিতে পারলাম না। সুন্দরী মেয়েগুলো মেয়েদের লাগাচ্ছে ইয়ে মানে ইন্টিমেট হচ্ছে ভাবলেই কেমন বঞ্চিত লাগে।

- চুতিয়া।

- কি?

- বাড়ি এসে গেল। নামব।

- ওহ।

বাড়ি ফিরে স্নান করে দিতি। গায়ে থুতু ছিটিয়ে দিলে কেমন গা ঘিনঘিন করে যেন। এই ছেলে নাকি জেএনইউ সোশিওলজি টপ।

সেবার সিমলিপাল থেকে একটা ডেক্সটপ ক্যালেণ্ডার কিনেছিল। বটপাতায় অ্যাক্রলিক দিয়ে সার দিয়ে মাস, দিন, বছর। দিনটায় চোখ পড়তে দিতি টের পায় চোখের সমস্যাটা। কেমন আছে কে জানে? বার্থ ডে মান্থ করে এখনও? চিলেকোঠায় ইতিহাস বই পড়ে থাকে?


- ছাড় প্লিজ। কাকিমা চলে আসবে।

- উফ চুপ কর প্লিজ। তোর ঘাড়টা এত সুন্দর।

- প্রিয়াআর না প্লিজ।

- আই উইল ইট ইউ আপ।

- আই লাভ টু বি ইন ইউ।

প্রিয়া হেসে ফেলত। দিতির নাকে নাক ঘষে দিত। কে জানে কেন, কপালের চুমুটুকুর জন্য দিতির এত আকুলতা। বাড়ি ফিরে সারারাত এপাশ-ওপাশ করত। ডায়েরি লিখত আপনমনে। প্রিয়াকে নিয়ে মা অবশ্য কিছু বলেনি। মেয়ের বন্ধু বাড়ি আসে, থাকে তাতে সমাজের জাত যায় না।

ভুলটা ধরিয়েছিল রণই। কত যুগ যেন পেরল। সুদীপদার কোচিং-এর শেষ দিন। পার্ট টু ছুটি পড়বে। রণ পিছু পিছু গড়িয়া মোড় অবধি এসেছিল। রাত নটার বৃষ্টির কলকাতা প্রায় নিশ্চুপ, নিরালা।  প্রিয়াকে পিছন থেকে জাপটে ধরে টি-শার্টে হাত ঢুকিয়ে দিয়েছিল।

- what the hell রণ?

- কী মনে হয়? আমি বুঝিনি? বুকের সাইজ তো পাতিলেবুর মতো। টিপলে দু আঙুলে আসে। খানকি, লেবু শালা। আমি বুঝি না প্রিয়ার সঙ্গে তোর গা ঘেষাঘেঁষি? আমায় দিয়ে টেপাবি? আর ওকে দিয়ে রড ঢোকাবি?

এসব কি ভাষা। ছাড় তুই আমায়।

- ভাষা? ইউ চিট। আমায় চুমু খেতে তোর লজ্জা করে? প্রিয়ার বাড়ি যাতায়াত দিনরাত। মাগি।

- মাইণ্ড ইয়োর টাংগ। প্রিয়া আমার বন্ধু। আমরা গ্রুপ স্টাডি করি।

গ্রুপ চুদি। মেরে পুঁতে দেব শালা। সবাই জানে প্রিয়া লেবু মাল। ছিঃ শালা। আমার কপালেও লেবু জুটল।

হতভম্ব দিতি দাঁড়িয়ে ছিল বৃষ্টিতে। প্রেম হতে হয় তাই রণ ছিল। কিন্তু এই ছেলেটাই কি রণ ছিল?

তারপর বসন্ত এসেছে। রণ চলে যেতে মনখারাপটা বেশ কিছুদিন ছিল যদিও। রাতটুকু আর ঘুম ভাঙলে দিতির একা একা লাগত। নতুন ক্লাস আর নতুন ক্যাম্পাস। দিতির বসন্তে প্রিয়া।

- আমার খুব খারাপ লাগে রে। রণ খুব ভালবাসত আমায়।

- চুপ কর। ভালবাসলে লোকে ওইভাবে অ্যাবিউজ করে?

- জানি না। আমি কি ঠকালাম রণকে

প্রিয়া কথা বলতে দিত না। চুমুতে ঠোঁট বুঝে আসে। চিলেকোঠার ঘরে একটা দোলায় দিতি প্রিয়া কোলে ঘুমিয়ে পড়ত।

ঠাম্মু মারা যাবার পর দিতির চলে যাবার ভয়টা খুব পেত। বোনকে জড়িয়ে ধরে কাঁদত। কেমন একটা চলে যায় সবাই। ছেড়ে। একা করে।

- আমি তোকে কখনও ছেড়ে যাব না।

- প্রমিস?

- চিলেকোঠার দিব্যি।

দিতি কেন যে এত লজ্জা পায়। একান্নবর্তী পরিবারে এক মেয়ে প্রিয়া। দিতিদের বাড়িতে জন্মদিনের চল বলতে ওই একটু পায়েস। মাটন কষা আর পোলাও। মায়ের রান্নার হাত একেবারে ফাইভ স্টার যাকে বলে। শুধু যেবার দিতিকে লুকিয়ে সিগারেট খেতে দেখে ফেলেছিল, তারপর থেকে নাক সিটকে মা আর পায়েস রাঁধাই বন্ধ করে দিল। প্রিয়ার জন্মদিনে চকোলেট কেকের সাইজ দেখে দিতির চোখ কপালে। এ মেয়ের বার্থ ডে মান্থ হয়।

- আমায় কী দিবি জন্মদিনে?

- কী চাস?

- পরে বলব।

অনলাইন শপিং দিতি তখনও শেখেনি। ডিল্ডোটা দেখে আঁতকে উঠেছিল।

- এটা পেলি কোথায়?

- একটা সাইট আছে।

- কেউ জানতে পারলে?

- আমার বার্থডে গিফট।

তারপর এক, দুই, তিন, কতদিন। চিলেকোঠা নামের স্বর্গপুরীটাকে সাজাবে প্ল্যান করেছিল তো দুজনে বিয়ের পর। দিতি শুধু শুনত। ভাবত মা কে ঠিক ম্যানেজ করে নেবে। আর বাবা? হ্যাঁ, বাবাকেও।

দিনযাপনের অবসাদে কিছু ক্লান্তি আসে। শহরের পালটে যাওয়া দিতি দেখেছে কতবার। হাত ধরে বৃষ্টি ভিজেছে দুজনে। তবু সপসপে শরীরে ক্লান্তি আাসেনি। সেদিন লোডশেডিং হল। চিলেকোঠায় নাকি মোমবাতি রাখা থাকে। ঠিক শীৎকার শেষে আর একটা চিৎকার। প্রিয়ার মা অবশ্য এহেন নোংরামিবাড়িতে জানান দিতে কসুর করেননি। চুলের মুঠি ধরে মারতে মারতে বাড়ি নিয়ে গিয়েছিল মা। দিনরাত একঘেয়ে লাগত মায়ের কান্না। বোনকে এক সপ্তাহে হস্টেলে পাঠিয়ে বাবাই বলেছিল, ‘তাড়াতাড়ি নিজের ব্যবস্থা নিজে করে নাও। সমাজে থাকি। আমরা এসবে নেই।মা শুধু নাক সিটকে ছিল। মোবাইলটাকে নিস্ক্রিয় পাথর মনে হত। ক্যাম্পাসের কানাঘুষোয় প্রিয়ার বিয়ের খবরের থেকেও বেশি চমক ছিল সহপাঠীদের আচরনে। এক ঝটকায় প্রিয় বুদ্ধিবাদী, স্বাধীনমনস্ক সবাই কেমন যেন দিতিকে নাক সিটকে দেখে।

মা কে খুব ভালবাসি রে। আমি অবাধ্য হলে মা মরে যাবে। জানিস তো হার্টের প্রবলেম। খুব ভাল সময় কাটিয়েছি দিতি আমরা। ভুল বুঝিস না। পারলে তুইও বিয়ে করে নে।

প্রিয়া। সেদিন কতদিন পর যেন দিতি মেইল চেক করেছিল কি কারণে।


নাহ দোতলার ল্যাণ্ডিং-এ আজও আলো নেই। দিতি এক নিশ্বাস অন্ধকার ঘরে লাল-নীল আলো জ্বলছে। আর ২১ এপ্রিল। বার্থ ডে মান্থ শেষ হলে মেয়েটা ভারি দুঃখ পেত। সিগারেট শেষ হলে ধুপকাঠি জ্বালিয়ে দেয় দিতি। ঘাড়ে বিন্দু-বিন্ধু ঘামগুলো কত যে স্বপ্নের কথা বলে। কাল অফিসে নতুন প্রজেক্টের রিপোর্ট জমা দিতে হবে। হিন্দিটা বেশ ভালই রপ্ত হয়েছে। জেএনইউ ফেরত চিত্রদীপ মাঝরাতে টেক্সট করে। দিতি ভাবে খিস্তি দেবে। থাক, নাক সিটকালে মাকেই সবচেয়ে সুন্দর দেখায়।

ল্যাপটপের আলোয় নীলচে দেওয়ালে মানবীর অশরীরি ছায়া কেমন। সিগারেটের ধোঁয়া উড়ছে আর পুড়ছে। দিতি মনে মনে হাসে। নতুন প্রজেক্ট ক্লায়েন্ট অ্যাকসেপ্ট করলে দিতির মাইনে বাড়ল বলে। তখন নাহয় একবার কুফরি ঘুরে আসা যাবে। নাহ, মায়ের একটা জামদানি। নাহয়, তোলাই থাকল আলমারিতে। প্রজেক্ট এর ফাইল খোলে দিতি। এলজিবিটি বিয়ে নিয়ে একটা ইউটিউব অ্যাড বানাতে চাইছেন ক্লায়েন্ট, প্রিয়া, প্রিয়ম্বদা সিং। বছর ৫০-এর এই অ্যাক্টিভিস্ট ক্রিয়েশন’-এর পুরনো ক্লায়েন্ট। নতুন ওয়ার্ড ফাইল খুলে লেখা শুরু করে দিতি। নাম দিল সখী












গুলশনারা খাতুন
Gulshanara Khatun


Saturday, July 1, 2017

এক অন্ধকার বিষণ্ণতার বোধ: একটি দেশদ্রোহী গদ্য - অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

এক অন্ধকার বিষণ্ণতার বোধ: একটি দেশদ্রোহী গদ্য

এইসব উপজাতি [?] শুধু যে অটল সংকল্প নিয়ে নিজেদের রক্ষা করে তাই নয়, তারা শত্রুদেরও অত্যন্ত বেপরোয়া সাহসিকতা নিয়ে আক্রমণ করে। তাদের মনের এমন একটা শক্তি আছে যা বিপদের আশঙ্কা কিংবা মৃত্যুভয়ের থেকে জোরালো।
নাগা জাতি সম্বন্ধে একজন ব্রিটিশ কর্মকর্তার মন্তব্য, আনুমানিক ১৮৪০ খ্রীষ্টাব্দ 

রিশাং জেগে আছে—শীত, ১৯৫২ 
রিশাং সাখরি’র বয়স হইয়াছে। নয়-নয় করিয়াও নব্বুই তো হইবে। রিশাং যদিও বলিতে পারে না তাঁহার বয়স কত। কানে শোনে না। চোখে দেখে না। জলের নীচে তাকাইয়া দেখা জগতের মতো ঝাপসা আর ঘোলাটে তাহার জগৎ। কখনও পেচ্ছাপ-পায়খানা বিছানাতেই করিয়া ফ্যালে। শরীর ও জীবনের অসহায়ত্বের নিকট সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করিয়া মল ও মূত্রের কর্দমাক্ত মাখামাখির ভিতর চুপচাপ শুইয়া থাকে। ভাষাহীন চোখে ফ্যালফ্যাল করিয়া চায়। নষ্ট মার্বেলের মতো রিশাং-এর চোখের মণি তখন যেন এই জগতের নয়, অন্য কোনও জগৎ হইতে তাহা আসিয়াছে। তবু নাতনির বকবক শুনিবার ভয়ে কখনও দেয়াল ধরিয়া ধরিয়াও যায়। একাই যায়। কাহাকেও ডাকে না। কিন্তু শৌচাগার অবধি পৌঁছাইবার পূর্বেই যাহা হইবার হইয়া যায়। তখন আর পথ চিনিয়া বিছানায় ফিরিতেও পারে না। অকুস্থলেই বসিয়া পড়ে। ঘরের ঢালু দিক দিয়া হলুদাভ প্রস্রাব বহিয়া যায়। ভয়ে ডাকিতেও পারে না। কথা বলিলে কাঁপা-কাঁপা লম্বা একটা চিকন সুর বাহির হয় গলা দিয়া। বসিলে একটা পুঁটুলির মতো গোল দলা হইয়া থাকে। মনে হয়, এখুনি গড়াইয়া পড়িয়া যাইবে। শুধু কানে যখন রেডিও গুঁজিয়া শুইয়া থাকে, অসম্ভব জ্বলজ্বল করে বৃদ্ধের চোখ। দাঁতহীন মুখের দুই মাড়ি পরস্পর চাপিয়া ধরে। ব্রিটিশের বেয়নেটে চোয়াল দুইটা ভাঙিয়া ভিতরের দিকে ঢুকিয়া গিয়াছে। গালের দুই পাশে গ্রীষ্মকালীন খরাসর্বস্ব দুইটা পুকুর যেন। তাহাদের তলদেশ বুঝি মুখের ভিতর একে-অপরের প্রান্তভূমি চুম্বন করিয়াছে। কানে কিছুই শোনে না। তবু রেডিওটা তাঁহার চাই। ফিজোর নামটা যদি একবার শুনা যায়। ১৮৭৯ খ্রীষ্টাব্দে এই রিশাং-এর প্রতিরোধ বাহিনীর কাছেই অস্ত্র নামাইয়া আত্মসমর্পণ করিয়াছিল এক রেজিমেন্ট ব্রিটিশ বাহিনী।  

ইতিহাস—বর্তমান—ভবিষ্যৎ
অদ্য যাহা ইতিহাস, একদিন তাহাই ভবিষ্যৎ ছিল। কেম্ব্রিজের ইতিহাসের এক অধ্যাপক এমনটাই বলিয়া থাকেন তাঁহার ছাত্রদের। আমরা যাহারা ‘ষত্ব ণত্ব বিধিতে সিদ্ধ’ শিক্ষিত শহুরে মানুষ তাহারা ইতিহাস ও ভবিষ্যতকে প্রস্রাবরত পুরুষের ডান ও বাম পদ সদৃশ দুই পার্শ্বে ছড়াইয়া মধ্যিখানে যথায় মূত্রত্যাগ করিতেছি, তাহার নাম দেওয়া হইয়াছে বর্তমান।

তবে একটা ইন্টারভিউ হয়ে যাক—ফেব্রুয়ারি, ১৯৫২
’৫২ সালের ১২ই ফেব্রুয়ারি, দিল্লিতে প্রচণ্ড শীতে সাংবাদিক বৈঠক করিতেছেন ঊনচল্লিশ বৎসরের ছোটোখাটো চেহারার, ফর্সা, রোগাপাতলা এক কবি ও আগুনখেকো নেতা আংগামি জাপু ফিজো। যাঁহার মুখের ডানপার্শ্ব পক্ষাঘাতজনিত কারণে বেশ খানিকটা বাঁকা। তামাম ভারতের সাংবাদিক হতবাক হইয়া শুনিতেছে তাঁহার কথা। ফিজো বলিতেছেন,
আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম আমরা চালিয়ে যাব। এবং একটি স্বতন্ত্র নেশনের প্রতিনিধিরূপে নেহরুর সঙ্গে আবার একদিন দেখা হবে বন্ধুত্বপূর্ণ বন্দোবস্তের জন্য।
ঝাড়খণ্ড নেতা জয়পাল সিংহ ফিজোর সম্মানে এক দ্বিপ্রাহরিক ভোজের আয়োজন করিয়াছেন। রাষ্ট্রীয় ভবনের ডাইনিং প্লেসে বিরাট ও সুদৃশ্য খাবার টেবিলে কাচের বাটি হইতে চিকেন রেজালা তুলিয়া দাঁতে কাটিতে-কাটিতে জয়পাল ফিজোকে বলিলেন,
দেখুন, ভারতকে আরও টুকরো টুকরো ক’রে নতুন পাকিস্তান বানানোয় আমাদের সম্মতি নেই। আপনি বরং স্বতন্ত্র রাষ্ট্রের দাবি না ক’রে উত্তর-পূর্বে একটা উপজাতীয় রাজ্য গঠনের জন্য সংগ্রাম করুন। যেমন আমি করছি ঝাড়খণ্ড নিয়ে।
উত্তরে কবি তাঁহাকে জানাইলেন, 
আপনারা ইতিহাস আর ভূগোলে বড্ড কাঁচা। আপনাদের অবস্থান থেকে আমরা আপনাদের নর্থ-ইস্ট। আমি এখানে একটু সংশোধন ক’রে দিচ্ছি, আমরা আপনাদের ভারত রাষ্ট্রের নর্থ-ইস্টে অবস্থিত ভারতের প্রতিবেশী রাষ্ট্র। দুই, আমরা কোনও উপজাতি নই। একটা স্বতন্ত্র জাতি। আমাদের ভাষা কোনও উপভাষা নয়। আমাদের সংস্কৃতি কোনও উপ-সংস্কৃতি নয়। আপনি বোধহয় জানেন না যে, আমরাই, নাগারাই সবচেয়ে বেশি স্বশাসিত। আপনার এইসব না-জানাগুলো দোষের নয়। আপনারা নিজেদের দেশে জাতীয় আন্দোলন করেছেন। ইংরেজদের সাথে চিঠিপত্র লেখায় আপনারা অনেকদিন ছিলেন ব্যস্ত। জানার সময় পাননি। আমাদের দেশে সত্যাগ্রহ করতে তো যাননি আপনারা। কোনও আইন অমান্য করতেও যাননি। কোনও গান্ধী টুপি পরা কংগ্রেস নেতা কখনও এইসব পাহাড়ে আসেননি। আজকে আপনারা নিজেদের দেশে ক্ষমতায় এসেছেন এবং আমাদেরকে ভারতের সাথে জুড়ে দিতে চাইছেন। বেশ তো, তবে একটা ইন্টারভিউ হয়ে যাক। আপনাকে একটা প্রশ্ন করি, বলুন তো, এই যে আমাদের এখানে আমরা নাগা, মিজো, খাসি, জয়ন্তীয়ারা একসাথে থাকি, আমাদের নামে এই নাগা-মিজো-খাসি-জয়ন্তী পাহাড়গুলোর নাম হয়েছে নাকি এই পাহাড়গুলোর নামেই আমাদের নাম? আপনি ইন্টারভিউ বোর্ডের সামনে দাঁড়িয়েছেন মিস্টার ইন্ডিয়া। বলুন? কী যোগ্যতা আছে আপনার যে আমরা আমাদের নেশন আপনাদের হাতে তুলে দেব? আমাদের মধ্যে জাতিভেদ নেই, আপনাদের আছে। আমাদের মধ্যে লিঙ্গবৈষম্য খুবই কম, আপনারা প্রগতিশীলেরা এখনও এর থেকে বেরুতে পারেননি। ভারতের মানচিত্রের সাথে আমাদের কোনও টান নেই। আপনাদের টানটা কী বলুন তো? ভারতের অন্যান্য জায়গার লোকেদের থেকে অনেক বেশি গণতান্ত্রিক আমরা। আপনাদের সভ্য মানুষদের মতো শেয়ার মার্কেটে ব’সে চেঁচামেচি করি না। 
ভোজসভা শেষে ফিজো যখন বাহির হইয়া আসিতেছেন তখন দোর্দণ্ড্যপ্রতাপ পরাক্রমশীল রাজার কোনও দূত যেরূপে তুচ্ছ বিদ্রোহীর সম্মুখীন হয় সেইরূপে জয়পাল ফিজোর সম্মুখে আসিয়া দাঁড়াইলেন। এই শীতেও জয়পালের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম। ফিজো জয়পালের সেই ঘামগুলির দিকে তাকাইয়া বলিলেন,
আপনি হয়ত জানেন সাতচল্লিশ সালে আমি এসেছিলাম এখানে গান্ধীর সাথে দেখা করতে। উনি ঠিক কী বলেছিলেন আমায়, আপনার জানা উচিত। উনি বলেছিলেন, আমরা চাইলেই স্বাধীনতা ঘোষণা করতে পারি। কেউ আমাদের ভারতে যোগ দিতে বাধ্য করতে পারে না। দিল্লি যদি সৈন্য পাঠায় তাহলে তিনি নিজে নাগা পাহাড়ে এসে আমাদের সঙ্গে লড়বেন। গান্ধী এও বলেছিলেন, উনি দিল্লিকে বলবেন, একজন নাগাকেও গুলি করবার আগে তারা যেন গান্ধীকে গুলি করে।      
গাড়িতে উঠিয়া আবার নামিয়া আসিলেন ফিজো। পাদানিতে ডান পা রাখিয়া জয়পালকে হাতের ইশারায় ডাকিলেন। জয়পাল নিকটে আসিলে ফিজো বলিলেন,
আমি ফিরে গিয়ে আপনাকে ইন্টারভিউয়ের রেজাল্ট পাঠিয়ে দেব।

শুধু হাড় আর হাড়—অক্টোবর, ’৫২
ফিজো অরণ্যাবৃত পর্বতে ফিরিয়া গেলেন। নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিল খোনোমা গ্রামের আংগামি নাগাদের লইয়া গ্রামে গ্রামে গড়িয়া তুলিল গৃহরক্ষী দল। ঊনিশ শতকের শেষার্ধে এই গ্রামের লোকেরাই রহস্যময় কুয়াশার ভিতর জাগিয়া উঠা পাহাড়ের চুড়ায় শ্বেত সমুদ্রের দ্বীপে আর অরণ্যাবৃত পর্বতমালায় আংগামি রিশাং সাখরির নেতৃত্বে রুখিয়াছিল হানাদার ব্রিটিশ সৈন্যকে। এইবারে আরও একটা যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হইল এই গ্রাম। ঊনিশ শতকের সেই বিপ্লবীদের সন্তান-সন্ততিরাই রাত্রি জাগিয়া পোস্টার লিখিল। ‘স্বাধীনতা চাই এখন, স্বাধীনতা চাই অনন্তকাল’। ‘এটাই আমাদের প্রাণের কথা, এটাই হবে আমাদের মরণকালেরও কথা’। অসমের রাজ্যপাল আকবর হায়দারির সচিব নাগা নেশন পত্রিকায় আন্দোলনকে ব্যঙ্গ করিয়া লিখিলেন এক কুকুরের গল্প। যাহার মুখে ছিল এক টুকরা হাড়। ফিজো বলিলেন, শুধু হাড় আর হাড়। ওর কি ধারণা আমরা কুকুর? অক্টোবরে দিল্লিকে ফিজো পাঠাইলেন তাঁহার চরমপত্র। তাহাতে লিখিলেন,
এমন একটা জিনিসও নেই যাতে ভারতীয় আর নাগাদের মধ্যে মিল আছে। ভারতীয়দের দেখা মাত্র আমাদের মনে এক অন্ধকার বিষণ্ণতার বোধ জেগে ওঠে।  

পাপা, ওরা চলে যাচ্ছে—এপ্রিল, ’৫৩
       কোহিমায় নেহরুর সভা। সঙ্গে বর্মার প্রধানমন্ত্রী উ নু। নেহরু পরিয়া আছেন তাঁহার বিখ্যাত জহর কোট। কন্যা ইন্দিরাও তাঁহার পাশে। মঞ্চে নেহরু প্রবেশমাত্র নাগা শ্রোতারা সভা ত্যাগ করিয়া উঠিয়া গেলেন। যাইবার সময় স্বীয় অন্তর্বাস নামাইয়া পশ্চাদ্দেশ অনাবৃত করিয়া দেখাইতে ভুলিলেন না। মঞ্চে তখন মাইক্রোফোন বসিয়া গিয়াছে। তাহাতে কানেকশানও আনিয়া দিয়াছেন সাউন্ড মেকানিক। ইন্দিরা তাঁহার পিতাকে বলিলেন, পাপা, ওরা চলে যাচ্ছে। পরিষ্কার শুনা গেল সেই কথা।  

জ্বলছে প্রাণে অনেক জ্বালার চকমকি আজ
       অসম রাইফেলসের এক বিরাট ডিভিসন তো ছিলই, এইবার আরও এক রেজিমেন্ট গোলন্দাজ, সতেরো ব্যাটেলিয়ন ইনফ্যান্ট্রি আর অসম রাইফেলসের পঞ্চাশটি প্ল্যাটুন হড়হড় করিয়া ঢুকিয়া পড়িল নেফায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরিত্যক্ত বিপুল অস্ত্র লইয়া ফিজোও সাজাইলেন তাঁহার প্রতিরোধ বাহিনী। তাহার সেনাধ্যক্ষ হইলেন জেনারেল কাইটো। তাঁহার অধীনে চারিজন সেনাপতি। যাঁহাদের সৈন্যদলে রহিল ব্যাটেলিয়ন আর কোম্পানি। জাপানি আর ব্রিটিশ রাইফেল, স্টেন গান, মেশিন গান, হাতে নির্মিত গাদা-বন্দুক আর প্রত্যক্ষ সংগ্রামের জন্য দাও লইয়া প্রায় পনেরো হাজার গেরিলা সৈন্য তুয়েনসাং-এর জঙ্গলে দাঁড়াইয়া রহিল ভারতীয় সৈন্যকে মোকাবিলার জন্য। ইহা এমন এক দেশ যেস্থলে ভালোমতো ঘাঁটি গাড়িয়া থাকা একটা ছোট প্ল্যাটুন একটা ডিভিসনকে, একটা কোম্পানি একটা আস্ত আর্মি কোরকে রুখিতে পারে। একবার তাহাদের বাপ-ঠাকুর্দা এই জঙ্গলেই ব্রিটিশকে রুখিয়াছে। এইবার তাহাদের পালা। পায়ের নীচে যে পিষ্ট হয়, সরকারি বুটের চাপকে তাহার অধিক কে চিনিতে পারে? ব্রিটিশ চলিয়া গিয়াছে। তাহার বুট পরিয়াছে ভারত। রাজা যায় রাজা আসে। রং বদলায় বুট বদলায় না। বুটের নীচে প্রকৃত পেরেক হইয়া জন্ম নিল কয়েক সহস্র তরুণ আংগামি। ওদিকে মহান ভারতীয় সেনাবাহিনী তাহাদের নৃশংসতাকে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হইল। নিরস্ত্র নাগাদের মারিয়া তাহাদের উলঙ্গ মৃতদেহ টাঙানো হইল গাছে। ফিজো তাঁহার সেনাবাহিনীর সহিত এইবার গড়িলেন অনিয়মিত সেনাদল। গ্রামে গ্রামে প্রস্তুত হইল ছোট ছোট স্বেচ্ছাসেবী দল, বার্তাবহ দল, নারী স্বেচ্ছাসঙ্ঘ। গঠিত হইল নাগাল্যান্ডের ফেডেরাল সরকার। অঙ্কিত হইল স্বাধীন নাগাল্যান্ডের জাতীয় পতাকা। তবে, আরও একটি কাজ বাকি ছিল ফিজোর। ভারতকে তাহার ইন্টারভিউয়ের ফলাফল জানানো। নয়া দিল্লি ইহার সাত দিন পর একটি খাম পাইল। খাম খুলিয়া দ্যাখে তাহাতে একটি শাদা কাগজ। কাগজে লিখা, ‘ডিসকোয়ালিফায়েড’। নিম্নে আংগামি জাপু ফিজোর সহি।
চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায়
বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন শান্তির সহায়ক শক্তি। শ্বেত কপোত উড়িতেছে তাহার দু’ডানা মেলিয়া। বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন নির্জোট শক্তির পক্ষে। বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন বাঁকে করিয়া গান্ধীর শান্তির ললিত বাণী লইয়া যায়। বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন আলোচনার মাধ্যমে বিশ্বশান্তির পক্ষে। বহির্দুনিয়ায় ভারতের তখন বহুত্ববাদের কথা। বহির্দুনিয়ায় ভারত তখন সোশ্যালিস্টিক প্যাটার্ন অব ভিউ।
বহিরাগত এবং সাংবাদিক প্রবেশ রুদ্ধ করিয়া এহেন বহির্দুনিয়ার সম্পূর্ণ অগোচরেই ভারতীয় সেনাবাহিনী তখন তাহার বন্দুকের নল হইতে উৎসারিত ক্ষমতা লইয়া নেফায় ঢুকিয়াছে এবং তাহার ‘ক্লিন অ্যান্ড সাকসেস্‌ফুল’ অপারেশন সম্পন্ন করিতেছে।
ইহারও কয়েক যুগ পর সারা দেশ মাতাইয়া দিবে একটি গান। সঙ্গে তাহার পাগল করা বাজনা আর মদালসা কন্ঠ। চোলি কে পিছে কেয়া হ্যায় চোলি কে পিছে। প্রশ্নগুলো সহজ আর উত্তরও তো জানা।

ফিজো কোথায় গেলেন!
       ’৫৬ হইতেই ফিজো নিখোঁজ। যুদ্ধ চলিতেছে। ফিজোর নেতৃত্বেই চলিতেছে। কিন্তু ফিজো নাই। ওই কুয়াশা আর জঙ্গল ছাকনি দিয়া ছাকিয়াও ফিজো নাই। গ্রাম জ্বলিতেছে। গির্জা জ্বলিতেছে। আসল লোকটার দেখা নাই। ’৫৬-তেই ফিজো বর্ডার পার হইয়া বর্মায়। সেখান হইতে পূর্ব পাকিস্তান। সেখান হইতেই আন্দোলন পরিচালনা। কিন্তু এইবারে সময় হইয়াছে ‘ভারত’ নামের এই তথাকথিত শান্তির দূতের ঘুঙ্ঘট উত্তোলনের। জলের তলায় ডুবিয়া থাকা প্রাণী যেভাবে হঠাৎ ভুস্‌ করিয়া উঠিয়া আসে, ’৫৯ সালে ফিজো আচমকাই উঠিয়া আসিলেন লন্ডনে। পুরাটাই ডুবসাঁতারে আসা। পূর্ব পাকিস্তান হইতে এল-সালভাদোরের একটি জাল পাসপোর্ট জোগাড় করিলেন। সোজা সুইটজারল্যান্ড। যোগাযোগ হইল দক্ষিণ আফ্রিকার বর্ণবৈষম্য আন্দোলনের কর্মী মাইকেল স্কটের সহিত। তাঁহারই সাহায্যে ইংলন্ডে আসিলেন ফিজো। একের-পর-এক সাংবাদিক সম্মেলনে গণপ্রজাতান্ত্রিক ভারত রাষ্ট্রের সামূহিক ঘোমটা উন্মোচিত হইল। বিলাতের সংবাদপত্র ভরিয়া গেল ভারত সরকার ও সেনাবাহিনীর ধর্মে ও কর্মে মহান এই দুর্ধর্ষ কীর্তিতে। দিকে দিকে রব উঠিল ‘এন্‌কোর এন্‌কোর’।
       দিকে দিকে ভারতও অন করিল তাহার মিডিয়া মেশিন। আচমকা মৎস বাহির হইয়া আসিলে কিছু ত্রাহিমধুসূদন শাক তো দরকার হইবেই। দিবালোকে অকস্মাৎ উন্মুক্ত লজ্জাস্থান আচ্ছাদনে তৎপর হইয়া অতঃপর তাই ভারতীয় সরকারি মিডিয়া অত্যন্ত যুক্তিপূর্ণভাবে আত্মপক্ষ সমর্থনে জানাইলেন যে, ফিজো ম্যাট্রিক ফেল। তিনি প্রথম জীবনে মোটর-পার্টসের ব্যবসায় ব্যর্থ হইয়াছেন। অতঃপর বীমা কোম্পানির দালালি করিতে গিয়াও সফল হন নাই। পক্ষাঘাতে তাঁহার মুখও বিকৃত হইয়াছে। অতএব ইত্যাদি এবং এমতসব ব্যর্থতা ও বিফলতার ভগ্নমনোরথের ভগ্ন চক্র দ্বারা তাঁহার মানসিক গঠন নির্ধারিত হইয়াছে।

শীত, ’৫৯
এই শীতেই বোধহয় মরিয়া যাইবে রিশাং। জ্বরে আর হাঁপানিতে কাহিল। চোখে দেখে না। কানে শোনে না। তবু রেডিওটা কানে গুঁজিয়া আছে। বয়স ৯৯। আর কিছুই মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে, সেই যেন কত শ’ বছর আগে, যেন এই জন্মেরও আগে, তুয়েনসাং-এর ঘন জঙ্গলে অস্ত্র মাটিতে রাখিয়া তাঁহার সামনে হাত তুলিয়া দাঁড়াইয়া আছে ব্রিটিশ রেজিমেন্ট। প্রস্রাবে মাখামাখি হইয়া, প্রস্রাবের এই ঝাঁঝাল ও উগ্র গন্ধকেও তাঁহার মনে হয় জঙ্গলের পাতা আর কুয়াশার গন্ধ। হাতের রেডিওটিকে মনে হয় গ্রেনেড। বয়স ৯৯। চোখে দেখে না। কানে শোনে না। আর কিছুই মনে পড়ে না।    

পুরু ও আলেকজান্ডার
       এ গল্প ইতিহাসের গল্প নয়। গল্পেরও একটা ইতিহাস থাকে, যদি সেই ইতিহাসের দিকে তাকাই তবে হয়ত দেখিব, আজ যাহা ইতিহাস একদিন তাহা অভীষ্ট ও কাঙ্ক্ষিত ভবিষ্যৎ ছিল না। যেহেতু ইহা গল্প, তাই কল্পনায় কিছু গোরুও থাকিবে। উহাদিগের মধ্যে কিছু গোরু যেমন গোমাতা হইবেন, কিছু গোমাতা বৃক্ষারোহণও করিবেন। কিছু গোরু দুর্ভিক্ষে খরায় মাঠে-ঘাটে জলহীন ডোবায় মরিয়া পড়িয়া থাকিবে। সেই গোরুগুলা অবশ্য গোমাতা হইবে না। আমরা বরং গাছে উঠা গোরুটার সহিত একটু কথা বলি। দেখি সে কী বলিতেছে। 
      
আমিঃ ও গোরু, তুমি গাছে উঠিয়াছ কেন!
গল্পের গোরুঃ আমাকে তো তুমিই তুলিয়াছ গাছে। এখন নামিব কী প্রকারে বলো
আমিঃ নামিবে পরে। এইবেলা নামিলে আবার ঘাস চিবাইতে শুরু করিবা। আমার কথা শুনিবা না
গ.গোঃ কী শুনিতে চাও বলো
আমিঃ যাহা জানো তাহাই বলো
গ.গোঃ আমি অনেক কিছুই জানি। তুমি কোনটা শুনিতে চাও সেইটা বলো
আমিঃ এই গল্পের শেষে কী হইল? 
গ.গোঃ কী আবার হইবে। তুমি মনে করো একটা বাটী পাইলে। বাটীতে দশটা ঘর। দশটা ঘরে দশ জনা লোক। তাহার মধ্যে একটা ঘরে তুমি কোনও কালেও যাও নাই। সেই ঘরের লোকটাকেও তুমি চেনো না। একদিন যখন তুমি গোটা বাটী নিজের নামে করিতে গেলে, তখন সেই একটা ঘরের লোক বলিল আমি তো তোমাকে চিনি না। তুমিও আমাকে চেনো না। তুমি কখনও আমার সহিত আসিয়া গল্প করো নাই। তুমি খালি বাকি ন’জনের ঘরেই গিয়াছ, চা পান করিয়াছ, পান খাইয়াছ। পান খাইয়া ঠোঁট আরক্ত করিয়া ফস্‌ করিয়া দিয়াশলাই দিয়া সিগ্রেট জ্বালাইয়াছ। সিগ্রেট জ্বালাইয়া ঊর্ধ্বপানে ধুম্র ত্যাগ করিয়াছ। এখন আমার ঘর আমাকে আলাদা করিয়া দাও। আমি তোমার বাটী হইয়া থাকিব না। এই তো গল্প।
আমিঃ তুমি ফিজোর কথা বলো
গ.গোঃ ফিজো একটা চিঠি লিখিয়াছিল, তাহা জানো?
আমিঃ চিঠি? কাহাকে লিখিয়াছিল?
গ.গোঃ কাহাকেও না
আমিঃ কাহাকেও না মানে?
গ.গোঃ আরে, ফিজো একজনকে চিঠি লিখিয়াছিল, তাহার নাম কাহাকেও না
আমিঃ কী লিখিয়াছিল তাহাতে?
গ.গোঃ সে জানিতো আলাদা বাটী তাহার হইবে না
আমিঃ  হইবে না কী প্রকারে? 
গ.গোঃ কী করিয়া হইবে বলো, তাহার ঘরের একদিকে চীন, একদিকে বর্মা, আরেকদিকে পূর্ব পাকিস্তান। এই প্রকার স্থানে আলাদা বাটী হয়? হইলেও কে দিবে?
আমিঃ তাহা হইলে এত হাঙ্গাম সে করিল কেন?
গ.গোঃ দ্যাখো, আমি তো গোরু। যদি দেশের সব ঘাস ফুরাইয়াও যায়, আমাকে যদি মানিয়া লইতেই হয় যে আমাকে এখন হইতে পোকামাকড় আর হাঁস-মুরগি ধরিয়া খাইতে হইবে, তথাপি কি আমি ঘাস খাইবার কথা ভুলিতে পারিব, বলো? যুদ্ধে পরাজয় বরণ করা যাইতে পারে, কিন্তু জীবনে কি পরাজয় বরণ করা যায়?  

’৬৩-র পয়লা ডিসেম্বর নাগাল্যান্ড রাজ্য গঠিত হইল। ’৬৪ সালে নাগাল্যান্ডের ব্যাপটিস্ট চার্চ গঠন করিল পীস মিশন। সেপ্টেম্বরে নাগাল্যান্ডের রাজ্যসরকার আর ফেডারাল রিপাবলিক অব নাগাল্যান্ডের মধ্যে যুদ্ধবিরতির চুক্তি হইল। ওই মাসেই নাগা স্বাধীনতা সংগ্রামীদের সহিত আলোচনায় বসিল ভারত সরকার। এই আলোচনায় মুখামুখি হইলেন নাগা ন্যাশনাল কাউন্সিলের নেতা আইজ্যাক স্যু এবং ভারতের বিদেশ সচিব ওয়াই. ডি. গুণ্ডেভিয়া। আলোচনার শুরুতেই আইজ্যাক বলিলেন,
আজ আমরা এখানে দুই নেশন হিসেবে পাশাপাশি এসে দাঁড়িয়েছি—নাগারা আর ভারতীয়রা।   

…………………………………………………......
[‘নাগা ক্রনিকল্‌’; ‘নাগাল্যান্ড : দ্য নাইট অব দ্য গেরিলাজ’; ফিজোর লেখা ‘এ ফেট অব দ্য নাগা পিওপল্‌ : অ্যান অ্যাপীল টু দ্য ওয়ার্ল্ড’ প্রভৃতি বই এবং বিশেষ ক’রে ঐতিহাসিক রামচন্দ্র গুহ’র ‘ইন্ডিয়া আফটার গান্ধী : দ্য হিস্ট্রি অব দ্য ওয়ার্ল্ডস্‌ লার্জেস্ট ডেমোক্র্যাসি’—এই বইগুলো থেকে দু’হাত ভ’রে তথ্য, নথি, রেফারেন্স ব্যবহার করেছি। ব্যবহার করেছি সুমনের দু’টি গানের লাইন। একটি বহুল প্রচারিত হিন্দি গানের কলিও। এ লেখাকে ফিকশন না ব’লে ফিল্মের ভাষায় ডকুমেন্টারি বলা যায়।—লেখক]

২৩ জুন, ২০১৬



অর্জুন বন্দ্যোপাধ্যায়

Arjun Bandyopadhyay

Monday, June 19, 2017

অনন্ত এবং আমি, আমি এবং অনন্ত : রঙ্গন রায়

অনন্ত এবং আমি, আমি এবং অনন্ত

একটা নাটকে আমায় 'অনন্ত' নামে একটি চরিত্র দেওয়া হয়েছিল। আমি কিছুতেই চরিত্রে ঢুকতে পারছিলামনা। রিহার্সালে কথা শুনতে হত - 'তোমার দ্বারা কিস্যু হবেনা।' তারপর যেদিন আমি অনন্তের ভিতর ঢুকলাম অনন্ত আমার ভিতর ঢুকে বসলো। আর সে নড়তে চায়না। আমি এবার বের হতে চাইলাম। পারলাম না। পাগলের মত আয়নার সামনে দাপাদাপি করে অনন্তকে টেনে হিঁচড়ে বের করতে করতে রেডিয়ামের মুখোশ পড়ে বেরিয়ে আসলো অনন্ত – ওর চোখ আমার মত, নাক আমার মত, কান আমার মত, সবই আমার মত। আমি আয়নায় তাকালাম – আমার মুখটা ধীরে ধীরে মুখোশ হয়ে যাচ্ছে। অনন্ত বেরিয়ে এলো, আমার মুখটাকে নিয়ে অনন্ত চলে গেলো। তখন থেকেই আমি আমার আসল মুখটা খুঁজে চলেছি… সদর গার্লসের নীলসাদা পোশাকের বালিকাদের দেখি – ওরা আমায় দেখে সভয়ে নাক সিঁটকে সরে যায়। আমি করলার উপত্যকায় দোলনা ব্রীজের নিচে শুয়ে থাকি, সূর্যের দিকে আমার শরীর উন্মুক্ত থাকে…

আমার বড় বড় চুল দাড়িতে আটকে থাকে নাটকের প্রপস্… মুখোশটা খুলতে পারছিনা বলেই আমায় কেউ কোন নাটকের দলে নিচ্ছে না। আমি গ্রীনরুমে ফিরে যেতে চাই, আয়নার পাশে বাল্ব-মেকআপ কিঞ্চিৎ বুক দুরুদুরু… নাহ্, মাথার ভেতর সব গন্ডগোল হয়ে যাচ্ছে। আমার সমস্ত শরীর মানুষের মাংস দিয়ে তৈরী, নীল রঙের লুঙ্গিটা খসে পড়লেই আদিম পোশাক পড়ে দাঁড়িয়ে থাকবো ট্রাফিক সিগন্যালে… আমার ঠোঁট অনেকদিন সিগারেটের ছোঁয়া পায়নি, কিন্তু মুখোশ সিগারেট খাচ্ছে দেখলে অনেকে লজ্জা পেতে পারে - অনেকে ভয় পেতে পারে - অনেকে অস্বস্তি বোধ করতে পারে... সবার চিন্তা আমার মাথায় এসে জট পাকাচ্ছে কেন?

সাবধান!  দেশপ্রিয় পার্ক আসছে। ট্রামলাইন থেকে ছড়িয়ে পড়তে পারে স্বাধীনতা।

স্বাধীনতার ওপারে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে রয়েছে অনন্ত। আমাদের আশেপাশে ঘুরে বেরাচ্ছে ওয়ার্ম হোল। অনন্ত ঢুকে পড়ছে আর বেরিয়ে আসছে। মুখোশ মুখ নিয়ে চলে এলাম অডিটোরিয়াম। সমস্ত উইংস জুড়ে অজস্র মানুষ এসে মিলিত হচ্ছে ফোকাসে, শাওয়ার হলো বেবি ফলো এবং স্পটলাইট জুড়ে নাটক এগিয়ে চলেছে। অনন্ত ফিরে আসছে, কন্ট্যাক্টলেন্স থেকে ঠিকরে বের হচ্ছে কাল্পনিক অশ্রু... দর্শকাসন ছুড়ে দিচ্ছে করতালি। পর্দা সরানোর খেলা খেলতে খেলতে সার্কাসের বাঘ ঝাপিয়ে নামলো আর নাটক দেখার অপরাধে আমার হাত পৌঁছে গেল আইনের সাথে করমর্দনে। বলুন ধর্মাবতার, আমি গরু খাইনি শুয়োর খাইনি  নাটক দেখেই বিচার পেয়ে গেলাম! তারপর দেখা গেল অনন্তের মাথার মধ্যে এসে পড়েছে সকালের আকাশে টাঙানো রোদ - মাথার ছায়ায় ঢেকে যাচ্ছে আমার ধড়।

আমি ক্রমশ ঢাকা পড়ে যাচ্ছি। আমি ক্রমশ একা হয়ে যাচ্ছি। আমি ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছি।

ফাঁকা মঞ্চ। অন্ধকার্। দৃশ্যপট নেই। উইংসের আড়ালে প্রম্পটার নেই। গ্রিনরুমে আর্টিষ্ট নেই। অডিটোরিয়ামে দর্শক নেই। একটা সরু আলোর রেখা নেমে আসছে ধীরে ধীরে, সেই আলো জুড়ে ওড়াউড়ি করছে হাজার প্রজাপতি। আমি সমস্ত আলোটা নিতে চেষ্টা করছি। মাথাটা ভারী হয়ে আসছে, যেন এই মাত্র মস্তিষ্ক ফেটে বেরিয়ে আসবে অভিনয়, আর অভিনয় মানেই অনন্ত… সমগ্র থিয়েটারে অনন্ত ছড়িয়ে পড়েছে... সেধিয়ে যাচ্ছে অনন্তে…













রঙ্গন রায়

Rangan Roy

Tuesday, June 13, 2017

বিদিশা কোত্থাও নেই : সুপ্রিয় সাহা

বিদিশা কোত্থাও নেই
প্রত্যেকটা ধারনাকে ভেঙে দিতে প্রমান লাগে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ। কিছুদিন যাবত পর্ণ সাইট গুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমার জন্মগত ধারনা ভেঙে যাচ্ছে যে, ওরাল সেক্স শুধুমাত্র বহিরবিশ্বেই বহুল প্রচলিত, সেখানকার ছেলেমায়েরাই তাতে স্বাভাবিক!! বেশ কিছু এমএমএস বা লিকড ভিডিও ডাউনলোড করে দিনের পর দিন লক্ষ্য করলাম কত অবলীলায় আমাদের দেশীয় মেয়েরা আঁখের খেতের ঘেরাটোপে, পার্কের নির্জনে কিমবা স্কুল বাথরুমে কখনও স্কুল শাড়ী খুলে কিমবা বোরখার ঘোমটা হটিয়ে মুখে চালান করছে পুরুষঠ পুরুষাঙ্গ। এইসব ঘটনা আমার পূর্ব ধারনাকে ভেঙে দিতে সাহায্য করেছে শুধু, কিন্তু ওরাল সেক্স নিয়ে আমায় কোন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছে দিতে পারেনি। বরং এগুলো আমায় বিচলিত করেছে, বার বার করে মনে পড়িয়ে দিয়েছে বিদিশাকে।
বিদিশাকে নিজের মতো করে পাওয়ার কোন বন্দবস্ত আমি করে রাখতে পারিনি কিমবা সেও করে দিতে চায়নি। তার কোন ফোন নাম্বার নেই আমার কাছে। নেই কোন স্থায়ী ঠিকানা। সে কোন ঈশ্বরও নয় যে আমি তাকে ডাকলেই ঘোমটা হটিয়ে নজরানা দেবে আমায়, বরং এটা স্বীকার করতে কোন অসুবিধে নেই যে তার কোন ছবিও নেই আমার হাতে। কেন নেই কেন নেই এসব ভেবে আপনারা যারা মাতাল হচ্ছেন তাদের এই লেখা পড়ার বয়স হয়নি এখনও-এছাড়া আমার কীই বা বলার থাকতে পারে!
কোন এক শনিবারের বিকেল শেষে শহুরে ধুলো থিতিয়ে চাকার দাগ মিটে যাচ্ছে এমন অন্ধকার। আমি আছি কিমবা নেই হয়তো পৌঁছে যাব এইমাত্র কিমবা যাবনা জানি না। শীত পড়ছে। যেসব শীতে কোলকাতার মানুষ গায়ে রঙ্গিন স্বপ্ন জড়ায় এমন শীতে সেখানে এখন শুধুই দীর্ঘশ্বাস। বাড়ি ফেরার পালা, লাঠির মাথায় উঁচু করে আটকে থাকা সদ্য টিয়ার বাচ্চা, পায়ের আঠা ডানায় জড়াজড়ি, অপেক্ষা আর অপেক্ষার শুরু কবে তার মনিব ভুলে যাবে খাঁচার ছিটকিনি। দূরে ভেঙে যাওয়া অজয়ের পাড়। একটু পরেই একতারা কাঁদবে। লক্ষ্মীসায়রে এখন একাকীত্ব ঘনাবে। ক্রমশ একা হতে হতে তার জল এখন শুধুই স্থির।
এমনই এক সন্ধ্যায় আমি বিদিশাকে কাছে টেনে নিই, হাতে ধরিয়ে দিই ফেলে যাওয়া অক্ষত মাটির ভাঁড়। সোনাঝুরির মেলা ভেঙ্গেছে প্রায় সময় পেরিয়ে গেছে গোটা দুটো দিন। এমন দিনে, এমন মাতাল সন্ধ্যেয় কেউ কোত্থাও নেই, অথচ কী ভীষণ ভাবে আছি আমরা। জ্যান্ত দুটো মানুষ। বিদিশার সাথে আমার দেখা হওয়ার কোন কথা ছিল না আসলে কখনই তো থাকেনা কথা। কিন্তু কিছু কথা না থাকলেও তো মানুষ কথা রেখে দেয় ঠিকই। এখন বন্ধ চায়ের দোকান। নিকানো , আলপনা দেওয়া তার মাটির উনুন। বিদিশা সেই আলপনায় সাঁওতালদের রেখাচিত্র খুঁজতে ব্যস্ত। আমি বলি, এই যে আলপনা, সে তো এই মাটির উনুনের আঁচে পুড়েই মরবে, তবুও কেন দেয় বলতো?
বিদিশা হাসে। তার হাসি এখানকার শীতের মতই বড্ড তীক্ষ্ণ। নিভে যাওয়া উনুনের উপর থেকে স্বপ্নিল কেটলি এনে গরম চা ঢেলে দিই তার হাতে ধরা মাটির কাপে। তারপর বসি তার পায়ের নীচে। একটা তালগাছের গুঁড়ি, বিদিশার কাপড়ের স্পর্শে উষ্ণ থেকে উষ্ণতর হচ্ছে ক্রমাগত। আমার হিংসে বাড়িয়ে দিচ্ছে। বাড়িয়ে দিচ্ছে  ছুঁতে চাওয়ার স্বাদ।
এখন নিভন্ত সোনাঝুরির দল, কেউ কুড়িয়ে নিয়ে গেছে তাদের ঝেড়ে ফেলা মায়া। দীর্ঘ পথ বেয়ে এখনি ফিরল যে সাঁওতালি পুরুষ তার ঘরে উঁকি দেওয়ার ইচ্ছে জাগে বিদিশার। তাকে নিরস্ত্র করে আমার অভিমানে বুক বুজে আসে, আমিও তো রোজ রোজ পার করি তীব্র এক রাস্তা! সন্ধ্যের আলো আরও কমে এলে ওর ঠাণ্ডা লাগে। আমি আমার শাল খুলে বিদিশাকে জড়াই না, বরং সেই আরও একটু ঘন হয়ে আসে আমার কাছে। এও কি একপ্রকার বিশ্বাসঘাতকতা! কে জানে! আমরা এগিয়ে যেতে চাই। আমারদের সুনীল কে মনে পড়ে। কোন এক গভীর রাত্রে তিনি নাকি এখানেই গান ধরেছিলেন, আজ জ্যোৎস্না রাতে... কিন্তু এখনও আকাশে চাঁদ ওঠেনি, হতে পারে আজ জ্যোৎস্না নয়। আসলে বিদিশা আমাকে ভুলিয়ে দেয় সব সময়জ্ঞান।
হতে পারে এখন গভীর রাত কিমবা নয়। লক্ষ্মীসায়রের বুকে এখন আমরা দুজন ছাড়া কিছু সোনাঝুরি। এই শীতেও আমরা পাশাপাশি শুয়ে। শরীরের নীচে নরম পাতা দেবে যায় কিছুটা। ভালো লাগে। বিদিশাকে গল্প বলি -
এই যে দেখছ সায়রের ওই দূরের কর্নার, ওখানে একটা পাথরকে এখানে সকলেই খুব জাগ্রত মনে করে। বিদিশার চোখ দুটো ড্যাবডেবে হয়ে ওঠে। শরীরটা আরও একটু টেনে নেয় আমার দিকে। আমি গোটা চাদরটা দিয়ে ঢেকে নিই নিজেদের।
     যারা এখানে নতুন সংসার করে, মানে ধরো নতুন বিয়ে হল, বা বিয়ে না করেও যারা নতুন সংসার পাতছে বা চাইছে, তারা সংসারের যাবতীয় টুকিটাকি যা লাগবে, সেসব যদি এই দেবীর কাছে মানত করে, তবে কিছুদিনের মধ্যেই নাকি সব ব্যবস্থা করে দেয় এই জাগ্রত দেবী।
বিদিশা আমার কথা শোনে। আমি তার মুখ থেকে কিছু শোনার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে থাকি। কিন্তু আমাকে নিরাস করে সে তার মুখটা শুধু বাড়িয়ে দেয় আমার আরও কাছে। আমি ডুবে যাই এই দেবীর আহ্বানে।
কখন যে চাদর সড়ে যায় খেয়াল থাকেনা। খুব দ্রুততায় নেমে আসি নীচে। সমস্ত লক্ষ্মীসায়র যেখানে তার গভীরতা নিয়ে অপেক্ষা করছে আমার জন্য, শুধু আমারই জন্য। লালায় ভরে ওঠে মুখ, তবুও তৃষ্ণা মেটে কই! হটাৎ আমি উঠে পড়ি ওর পেটের উপর। ওর নরম বুক জোড়া থেকে আশ্চর্য এক তরল গড়িয়ে নামছে নাভির দিকে। আমার জাং ভিজে জ্যাবজেবে। আমি মুখ থেকে একে একে চুল গুলো বার করে সমস্ত লেপটে দিই সেই নরম আঠায়। ক্রমশ লোমশ হয়ে ওঠে ওর হৃদপিণ্ড। বলি- তোমার বয়স বাড়ছে বিদিশা। বড্ড চুল উঠে যাচ্ছে।
সে শুধুই হাসে। আমার শীত শীত ভাব আসে। ব্যাখ্যা না থাকার মতো এক অজানা ভয় ঘিরে ধরার আগেই কামড়ে ধরি তার কামার্ত ঠোঁট। আমাদের মুখ ভিজে যাচ্ছে, ভরে উঠছে চুলের মতো সরু লিকলিকে কিছু পোকায়। তবুও আমরা কেউই পরাস্ত হতে চাই না। বরং এই ভালোলাগাটাকে আয়েশ করি নিজেদের মতো।
এখানে কোন পাহাড় নেই। তবুও এক পাহাড়ি অলসতা ঘিরে ধরে? সায়রের জল আমায় ভীষণ ভাবে টানে কি টানে না জানি না, তবুও অতলে নেমে যাবার ইচ্ছে হয়। বাতি নিভে যাচ্ছে পাশের পাড়ায়। সোহাগে সোহাগে ভরে উঠছে মেঠো সব শরীর, এমন চিন্তা শুধুই ক্লান্তি বয়ে নিয়ে আসে। এসব সময়ে আমার গ্রাম্য কুকুর হতে হচ্ছে করে, খড় বিচুলি থেকে শুষে নিচ্ছি শেষ ওম। বিদিশা ঈশারা করে গভীর রাত, ঘরে ফেরার সময় বাড়ন্ত।
এই উলঙ্গ রাত। বিদিশাকে কোলে তোলার ইচ্ছে আমায় জাগায় না। আমরা পাশাপাশি হাঁটি, একে অন্যেতে মিশে গিয়ে হাঁটি। শুধু হাঁটতেই থাকি। দূরে আমাদের হোটেল দেখা যায়। তার মিটমিটে জ্বলতে থাকা আলোর রেখা দেখা যায়। দেখা যায় গেটে হয়তো আমারই জন্য অপেক্ষারত দারোয়ানের আবয়ব। তখনও বিদিশার দীর্ঘশ্বাস আমার কানের লতিতে।















সুপ্রিয় সাহা

Supriya Saha

Sunday, June 11, 2017

ভালু : ডাকনামে সমুদ্র

 ভালু

আমরা সবাই জড়ো হয়েছিলাম একটা সর্ষেক্ষেতে। আসলে আগের বছর এখানে সর্ষেচাষ হয়েছিলো। তারপর একবছর আর কিছুই হয়নি। তাও নামটা থেকেই গেছে। আম্মু আর দিভাইকে পাচ্ছিলাম না। ওদের নাকি জঙ্গলের দিকে নিয়ে গেছে। রশিদ এর প্যান্টের দড়িটে খুলে যাচ্ছে। ওর আম্মুকেও নিয়ে গেছে। রশিদ কাঁদছিলো বোকার মত। আব্বু তো বল্লো, একটু বাদেই আম্মু আর দিভাই চলে আসবে। রশিদের আম্মুও। আজ সাত নম্বর রোজা। আব্বুর রোজা ভেঙে গেছে। একবার খারাপ কথা বলেছে আব্বু। বাড়িতে খারাপ কথা বলে না আব্বু। রশিদের এর বাবার মত মাকে মারেও না। রশিদ একবার রাতে ওর আব্বু আম্মু কে কিসব করতে দেখেছিলো। আমার আব্বু আম্মু কেন ওসব করে না? আমি কেন দেখতে পাই না? আম্মুরা এখনো ফিরছে না জঙ্গল থেকে। ওদিক থেকে পচা পচা গন্ধ আসছে। কুকুর পচলে যেমন গন্ধ আসে। আম্মুরা জঙ্গলে কি করছে? ইসস। ওদের সাথে গেলে ভালো হতো। রশিদ আর আমি একবার লুকিয়ে জঙ্গলে গেছিলাম। তারপর আর যাওয়া হয়নি। ওই জঙ্গলে এখন কিরকম সব লোক থাকে। আব্বু বলে, ওরা জওয়ান। ওদের বন্দুক থাকে। রশিদ একবার ওদের কাছে বন্দুক চেয়েছিলো। একটা লোক বলেছিলো, আগে তোর আম্মি কে নিয়ে আয়। রশিদের আম্মি সেদিন রশিদকে খুব মেরেছিলো। কি হতো একবার গিয়ে বললে? বেশ মজা হতো।

আম্মুরা ফিরে এসেছে। সবাই খুব কাঁদছে। ইসস আম্মির গলায় কেমন কালশিটে। আম্মু কাঁদছে। রশিদের মা পেট চেপে মাটিতে শুয়ে। সবাই এসেছে, দিভাই খালি আসে নি। আব্বু ওই লোকগুলোর কাছে গিয়ে কিসব বলছে। ওরা হাসছে। দিভাই কি জঙ্গলে হারিয়ে গেছে? ভালু আছে নাকি ওই জঙ্গলে। দিভাই কে কি ভালু...

দিভাই এর সাথে সাহিন ভাইয়ের শাদি হওয়ার কথা ছিল। দিভাই ছাড়া গ্রামের সবাই ফিরে এসেছে। জঙ্গলের দিক থেকে খুব পচা পচা গন্ধ আসছে। অনেকগুলো কুকুর একসাথে মরে গেলে যেমন গন্ধ আসে আর কি... দিভাই এর একটা ভালু আছে। সাহিন ভাই দিয়েছিলো। লাল রঙের। সেটা জড়িয়ে আজ ঘুমালে নিশ্চয় দিভাই মারবে না।
















ডাকনামে সমুদ্র
Ocean in the name